বিশ্বের নীড় নাকি নিঃস্বের ভিড়: একটি মিথ্যে ছবি আর অনেকগুলো সত্যি কথা

সোমজিৎ হালদার


প্রাক্তন ছাত্র, বিশ্বভারতী

 

 

 

শান্তিনিকেতনে অমিত শাহ আসার আগের দিন হঠাৎ একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। ভেঙে পড়া ঘণ্টাতলা আর চারদিকে লুটিয়ে পড়া গাছের ডালপালা। শাহজি আসবেন বলে নাকি এই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। কথাটা সত্যি নয়। বেশ কিছুদিন আগে ঝড়বৃষ্টি আর মৃদু ভূমিকম্পের কারণে গাছ পড়ে নাকি বিপত্তি। তবে কর্তৃপক্ষের পাঁচিল তুলতে যত উদ্যোগ, ঘণ্টাতলা সারাতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কিন্তু ভাইরাল হয়ে যাওয়া এই ছবি, তার সঙ্গে নেটিজেনদের ক্ষোভ— বিচ্ছিন্ন কোনও বিষয় নয়। এই ক্ষোভ আসলে এমন একটা দল, এমন কিছু মানুষের বিরুদ্ধে যাঁরা গুজব, মিথ্যাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক অস্ত্র বানিয়ে তুলেছেন। আর এই ভুল তথ্য বা ‘মিথ্যে’ দিয়েই যেন কিছুজন একটা পাল্টা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। শুধরে নিতে বললে বলছেন, ছবিটা না হয় সত্যি নয়, কিন্তু বিশ্বাস নেই ভাঙনের কারবারিদের। প্রতীকী। ঘণ্টাতলার ঘণ্টায় বিপদসঙ্কেত বাজলেও ধরতে পারিনি আমরা। পুরো কাঠামোটাই তাই ভেঙে পড়ল বোধহয়।

পুরনো যা কিছু তার প্রতি বর্তমান উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর এক অদ্ভুত আচরণ। প্রতাপশালী সম্রাটেরা যেমন নিজেদের নামে সন তারিখ চালু করে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চাইতেন, সেই স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ উপাচার্যের কথায় আচরণে। উঠল বাই তো গেট বসাই। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তার দুপ্রান্তে দুটো বিরাট গেট বসল। রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থের নামে নামকরণ করলেই কি লোহার শৃঙ্খল পেলব হয়ে যায়? স্বার্থপর দৈত্যের (বেমানান উপমা! কারণ দৈত্যের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছিল) সে বাগানে সাধারণ পথচারীদের গতিবিধিও এবার থেকে নিয়ন্ত্রিত। যে রাস্তায় মানুষের পা পড়বে কিনা বলা যাচ্ছে না, উপাচার্য তার নাম রেখে দিলেন স্বামী বিবেকানন্দের নামে। জেএনইউ-য়ে বিবেকানন্দের মূর্তি স্থাপনের সঙ্গে মিল খুঁজতে আপনাকে নেটপাড়া অবধিও দৌড়তে হবে না। ন্যারেটিভ এক। স্থান কাল বুঝে অনুবাদ করিয়ে চলেছেন। তবে মহাপুরুষদের মহানুভবতা সহ্য হবে না বলে খানিক কেটেছেটে নিচ্ছেন। শান্তিনিকেতনের নীচু তারে বাঁধা অনুষ্ঠানেও মাইক ধরে মাতব্বরি, ফলে যে কোনও অনুষ্ঠান এখন চক্কোত্তিবাবুর সাংবাদিক সম্মেলন। বাপবাপান্ত শাপশাপান্ত করার প্ল্যাটফর্ম।

মানুষের প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষয়ের ইতিহাসও ধারাবাহিক। শান্তিনিকেতনের ক্ষয়ে যাওয়ার হাহুতাশ বোধহয় তার শুরুর দিন থেকেই ছিল। এতকিছুর পরেও এখানকার পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রকাশ আছে অনেক কাজে। প্রত্যেক ঋতুতে গাছপালার রং বদলে যাওয়ার সঙ্গে দৈনন্দিনতা ও নান্দনিকতার চেহারা বদলে যাওয়ার কথা তো কোনও রোমান্টিক অতিশয়োক্তি নয়। পড়ে আসা বেলায় শালবীথি ধরে হেঁটে যাওয়ার মধ্যে একইসঙ্গে পূর্ণতা ও শূন্যতার যে অলীক যোগের সন্ধান, সেরকমটা বড় একটা ঘটে না। উপাচার্যমশাই ক্যাম্পাসে প্রবেশের অধিকারটুকুই কেড়ে নিলেন বা কিছু ক্ষেত্রে অহেতুক নিয়ন্ত্রণ করলেন। সেখানে দাঁড়ানো প্রহরীদের মারের ওপর দিয়ে কজন আর ফুল পৌঁছে দেবে? শমীন্দ্র পাঠাগারের খোলা বারান্দায় গল্পগুলো জমবে না। রেলিং দিয়ে সেবাড়ি সুরক্ষিত করা হচ্ছে আর প্রাণ হয়েছে পলাতকা। খাঁচার বেওসায় পাখির খোঁজ আর কে রেখেছে!

মাস্টারমশাইরা চুপ। কর্তার ইচ্ছেয় তাঁরা নড়ছেন চড়ছেন কিন্তু মুখটি খুলছেন না। বিজেপির কার্যকলাপের সঙ্গে উপাচার্যের এই বিষয়ে দারুণ মিল। তিনি সবকিছুতেই নোটিস জারি করেন। লিখিত নিয়ম। সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলা যাবে না। সেই আঁটুনি এতই জোরদার যে বেচারা জনসংযোগ আধিকারিক পর্যন্ত কাজ পান না। স্লিপের ক্যাচ উইকেটকিপার ধরে নিলে কি আর সবসময় ভালো লাগে? অতএব কাগজওয়ালাদের চাপ কমেছে। লেখার শেষে ‘ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি’ কপিপেস্ট করে নিলেই হল। ভদ্রলোকের মুখে রা নেই। মুখ খুললেই তাঁকে শোকজ, সাসপেনশন বা বদলি। পিঠ বা চাকরি বাঁচাতে অনেকেই নিরুপায়। কথায় কথায় মামলা ঠোকেন ভদ্রলোক। মামলার খরচে আরও একটু পাঁচিলের কাজ এগিয়ে নেওয়া যেত না কি উপাচার্যমশাই?

সত্য এবং আরও সত্যের খোঁজ। রবীন্দ্রদর্শনের মূল কথা। মুখে গুরুদেব গুরুদেব বলে তাকেই বানিয়েছেন মিথাচারের আখড়া। সম্প্রতি অমর্ত্য সেনের নামে এমন একটি অসত্য কথা বলে বিশ্বভারতীর মুখ পুড়িয়েছেন। সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এক অধ্যাপক নেতাকে শোকজ পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রশ্নহীন আনুগত্যের এই দাবি প্রাতিষ্ঠানিকতার মূল শর্ত। খোলা বাতাসের আয়োজন সেখানে রাখতে চাইছেন না কর্তৃপক্ষ। প্রাক্তনীদের উদ্দেশ্যে বিষোদগার নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকা চাই টাকা চাই— এই তো দাবি। এদিকে দেখা যাচ্ছে বিশ্বভারতীর আর্থিক খরচের তথ্যপ্রকাশ অনিয়মিত। কোনও কোনও খাতে টাকা নাকি ফিরেও যাচ্ছে। পড়াশোনা বিষয়ে আলোচনা নেই। সে বিষয়ে প্রাক্তনীদের সাহায্য নিতে কোনও আগ্রহ নেই। বরং তাঁদের অংশগ্রহণ যাতে কমে আসে তার আয়োজন চলছে। ‘স্মরণ’ বা ‘স্মৃতিবাসর’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন পুরনো ছাত্রছাত্রী আশ্রমিক প্রাক্তন কর্মী অধ্যাপক অনেকে। অনুষ্ঠান করতে হলে টাকা চাই— এবছর বিশ্বভারতীর দাবী। আশ্রমজীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের কাছে চাওয়া হচ্ছে ঘরভাড়া। কর্তৃপক্ষের যুক্তির অভাব নেই। স্বেচ্ছাচারীর কোনওকালেই যুক্তির অভাব থাকে না। তবে খাতিরদারি কম নেই। দুদিন পর পরই ঘুরে যান বিজেপি নেতারা। সাংসদ এসে এনআরসি বোঝান, নেত্রী এসে সমাধান করেন মেলার মাঠের রহস্য। আর প্রতিবাদ হলেই চেনা বুলি, ‘রাজনীতির জায়গা নয়।’ শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতন গড়ে ওঠাই তো রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক বার্তা। সেখানে অরাজনৈতিকতার ভ্রম-জামা গায়ে চাপালেই যে আসলে পিছনে হাঁটা।

প্রতিবাদের রাস্তা বন্ধ করো। রাস্তা আটকে, সিসিটিভি লাগিয়ে, ছবি তোলা নিষেধ বলে। লড়িয়ে দিচ্ছেন একপক্ষের সঙ্গে অন্যপক্ষকে। অবিশ্বাসের সুর। যে প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের কথা ক্লাসে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনেছি, তাঁকে অচেনা লাগে। বাড়ছে স্তাবকের ভিড়। প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে চিঠি পৌছে যাচ্ছে। ভয়ের পরিবেশ। এরপরেও যাঁরা পা মেলাবেন মিছিলে? আওয়াজ তুলবেন ‘শান্তিনিকেতনের মাটিতে দাঙ্গাবাজের জায়গা নেই?’ তাঁদের গৃহবন্দি করে রাখা হবে। অমিত শাহ যাতে নিরাপদে পোস্তভাত খেয়ে বাউলগান শুনতে পারেন তার জন্য পুলিশ বিশ্বভারতীর দুই ছাত্রনেতাকে নজরবন্দি করে রাখল। প্রতিষ্ঠান তার ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছে— একথা তো কষ্টকল্পনাতেও আসবে না।

তাই হয়েছে। তাই হতে থাকবে। কারণ এখানে কেউ কারও পাশে নেই। বন্ধু ভেবে কথা বলতে গিয়ে দেখবেন বন্ধুটি হস্টেলছাড়া। তার জায়গা নিয়েছে একটা পাঁচিল। ঢেকে যাচ্ছে শান্তিদেব ঘোষের বাড়ি, চাপা পড়ে যাচ্ছে পুরনো যা কিছু। আর সং সেজে আশ্রমসঙ্গীতের কথাগুলো পালটে দিচ্ছে সুব্রহ্ম্যনমের মতো কেউ।

আসুন, ঘুমাই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. লেখার সঙ্গে একদম সহমত। আমরা প্রাক্তনী রা শান্তিনিকেতনের খোলা মাঠে ঘুরে এসেছি এতদিন,এখন ইচ্ছা থাকলেও যেতে ভরসা পাইনা। ভয় হয় আগেকার মতো প্রাণের আরাম মনের আনন্দ আত্মার শান্তি পাব কিনা?

আপনার মতামত...