ভারত-এর ধারণা

রোমিলা থাপার এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক

 

‘হিস্ট্রি ফর পিস’ কনফারেন্সের তৃতীয় বার্ষিকীর বিষয় ছিল ভারত-এর ধারণা। তারই অংশ এই কথোপকথনটি। হয়েছিল কলকাতায় আইসিসিআর-এর সত্যজিৎ রায় অডিটোরিয়ামে ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট। ২০১৯-এর ১৫ এপ্রিল এই কথোপকথানের ট্রান্সক্রিপশন হিস্ট্রি ফর পিস-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়। আমরা সেটিরই বঙ্গানুবাদ তিন পর্বে প্রকাশ করছি। প্রথম পর্ব গত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এ-মাসে দ্বিতীয় পর্ব।

রোমিলা থাপার: হ্যাঁ, এই ভারত-এর ধারণা-র প্রসঙ্গে— ভারত-ই কেন, যে কোনও জায়গার ধারণার ক্ষেত্রেই এটি সত্য— তুমি যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা তুলে এনেছ, যে খুব অবশ্যম্ভাবীভাবেই এই ধারণা বিষয়টা পরিবর্তনশীল। এ কোনও অনড় অটল বস্তু নয়। ১৯৪৭-এ ভারত-এর যে ধারণা আমি পেয়েছিলাম, তা পালটে গেছে। বাস্তবতা যত এই ধারণা-র মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে, ধারণা-টি তত নিজের আকার পরিবর্তন করে নিয়েছে। সেই ৫০-৬০-এর দশকে ডায়াস্পোরাকে অনেকটা প্রান্তিক ভাবা হত। ভাবা হত, এঁরা কিছু অসন্তুষ্ট অসুখী মানুষজন, যাঁরা একটু ভালো চাকরি বা ভালো খাওয়া-পরার জন্য বিদেশে পড়ে আছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউএসএ-র চাইতে ইউকে-কে একটু বেশি ভালো জানি। আমি দেখেছি, প্রাথমিকভাবে কিন্তু কিছু অন্যরকম মানুষজনই গেছিলেন বাইরে। যেমন ধরো, নাবিকরা। বা কোনও বিশেষ পেশার শ্রমজীবী মানুষরা যাঁদের নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্যই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁরা সত্যিই প্রান্তিক ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করল যখন থেকে পেশাদাররা বাইরে যাওয়া শুরু করল, মধ্যবিত্ত অভিবাসী হওয়া শুরু করল। দুটো জিনিস ঘটল তখন— বস্তুত এখনও ঘটে চলেছে। প্রথমত, তারা এতটাই ভালো করতে লাগল যে, দেশের মধ্যবিত্তশ্রেণির কাছে তারা রোলমডেল হয়ে উঠল। ফলত, তাদের অভিব্যক্তিতেও এই কথা ফুটে বেরোতে থাকল যে তারা প্রচণ্ড প্রভাবশালী। আরেকটা জিনিস খুব কৌতূহলোদ্দীপক। তাদের সংস্কৃতিটা কিন্তু আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের সংস্কৃতির চেয়ে ভিন্নতর হয়। প্রাথমিকভাবে তো অবশ্যই। আমার ধারণা যতদিন একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় মার্কিন বা ব্রিটিশ রাজনীতিতে ঢোকেনি, বা যথেষ্ট পরিমাণে পারস্পরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়েথা শুরু হয়নি, ততদিন এই ভিন্নতা বজায় ছিল। আমি অবশ্য এ বিষয়ে ভুলও হতে পারি। যাইহোক, ডায়াস্পোরাদের সঙ্গে যেটা ঘটল সেটাকে কিন্তু নাকচ করে দেওয়া যাবে না। বরং, যেটাকে বলা যেতে পারে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় অভিব্যক্তি, তা দেশের মধ্যবিত্তশ্রেণির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করা শুরু করল। এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ১৯৬০-এর দশকে যে মধ্যবিত্তশ্রেণিকে আমরা চিনতাম, আজকের মধ্যবিত্ত কি ধারণার দিক থেকে, কি আদর্শের দিক থেকে তার চেয়ে সম্পূর্ণই আলাদা। একটা জিনিস আমার খুব চমকপ্রদ লাগে। ধরো, টিভি চালিয়েছি খবর দেখার জন্য। অ্যাডভার্টাইজমেন্ট হচ্ছে— বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞাপন। সেখানে ওরা প্রায়ই সব জমকালো ল্যাবরেটরি দেখায়, বিদেশি সব স্কলাররা এসে লেকচার দিচ্ছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বর্ণনা করতে গিয়ে ওরা জোরে জোরে বলে, ‘তোমার গন্তব্য: সাফল্য!’ আমি সবসময় ভাবতাম, হ্যাঁ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্তব্য হিসেবে শিক্ষা, জ্ঞান, চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটানো, সবই হতে পারে। কিন্তু সাফল্য! আর এই সাফল্য মানেটাই বা কী! টাকা রোজগার করা আর ক্ষমতাশালী হওয়া? আমার কিন্তু মনে হয় সেই সময়ের থেকে এই জায়গাতেই একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

কিন্তু আমি বোধহয় একটু প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলাম। আমরা সেই জিনিসটা অনুসন্ধানের চেষ্টা করছিলাম, যেটা আমাদের সামনে এসেছিল, এবং এই এত পরিবর্তনের কারণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আমি অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে যে মারাত্মক অবসেশন তৈরি হয়েছিল সেটার কথা বললাম। এই অবসেশন যুক্তিযুক্ত ছিল ঠিকই কিন্তু এতে যেটা হল ধর্ম এবং ভাষার প্রতি আমরা ততটা মনোযোগ দিলাম না। মনোযোগ দিলাম না সাধারণভাবে যেটাকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বলা হয় সেটার প্রতিও। ভারতে একটা প্রবণতা আছে। এখানে ধরে নেওয়া হয় ধর্ম অতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোনও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া। যেমন, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারলে আমরা সমস্ত সমস্যাই সমাধান করতে পারব। ভাষা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষমেশ সেটার সমাধান হল সেই পদ্ধতিতে, যে পদ্ধতিতে গণতন্ত্র তার সমস্ত সমস্যা সমাধান করে থাকে। ভাষাগত রাজ্যের সমর্থনে ভোট নেওয়া হল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে মান্যতা দেওয়া হল। ভাষাভিত্তিক রাজ্যগুলো কী করেছে সেটা ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু আমার মনে হয় এই বিষয়টাই দেশের জাতীয়তাবাদের ধারণা সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে রইল।

আর তারপরই সেই সাংস্কৃতিক প্রবচনের আগমন ঘটে যা সংস্কৃতিকে সর্বদাই ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়, সে তেমন হোক বা না-হোক। এর মাধ্যমে আমি যেটা বলতে চাইছি, যখন কেউ ভারতীয় সংস্কৃতির সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করে, যদি দেখা যায় যে আমার ধারণার সঙ্গে তার যৎসামান্যই মিল রয়েছে, তখনও কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয় না— ‘সমগ্র ভারতীয় সমাজের সংস্কৃতিটা ঠিক কী? ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সংস্কৃতিটা ঠিক কীরকম?’ আসলে এটা সবসময়েই ওপরতলার সংস্কৃতি— সেটাকেই ভারতীয় হওয়ার অভিজ্ঞান বলে চালাতে চাওয়া হয়। সত্যি কথা বলতে, আজ এই যে এত সমস্যা, তার একটা মূল কারণ কিন্তু এইটা— এই যে ভারতীয়ত্বের অভিজ্ঞানটা, এটার ব্যাপ্তি যথেষ্ট বেশি নয়। এটা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা এবং তর্কবিতর্কও হয়নি যে আমরা কোথাও একটা পৌঁছতে পারব। এমন একটা কোথাও যেখানে বলা যাবে— ‘হ্যাঁ, হতে পারে এটি একটি আদর্শ অভিজ্ঞান নয়। কিন্তু যখন কেউ একজন বলে যে ‘আমি একজন ভারতীয়’ তখন সে যা বোঝাতে চায় তার প্রায় সবটাই এই অভিজ্ঞান দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায়।’

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: হ্যাঁ, এটা আমারও মনে হয় যে এই ভারত-এর ধারণা কারও নিজের ভাষাগত গোষ্ঠীর মধ্যে মেটোনাইমিক হয়ে ওঠে। যারা বিদেশে ভারত সম্পর্কে কথা বলে, প্রায়ই আমি দেখেছি, ভারতের সব ক্ষেত্রেই যে বহুত্ব রয়েছে সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। শ্রেণি এবং জাতের কথা ছেড়েই দিলাম, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের বিষয়টাই দেখো না… […]। আমার মনে হয় এটা একটা বড় সমস্যা। মানে, আমি বলতে চাইছি, অনেক সময় স্কলারশিপের ক্ষেত্রেও, হয়তো কোনও নামও করা হয়নি, কিন্তু এরকম ভেবে নেওয়া হবে যে বাংলাই হল ভারত, আবার ভারতই হল দুনিয়া। এটাই কিন্তু জাতীয়তাবাদের একটি পাঠ।

আমি তো এটাও বুঝতে পারি না কেউ ‘ভারত’ কেন ভাববে! যাইহোক, যদিও সেটা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু যদি কেউ ভাবে, তাকে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যে সব ভারতীয় একরকম নয়। আর এখন তো এদের মধ্যে একটা জিনিস হারিয়েই যাচ্ছে। বিদেশে হারাচ্ছে, দেশে হারাচ্ছে। আমার কাছে কিন্তু এটা একটা ভয়ানক লজ্জার বিষয়। যেমন ধরো, যখন আমরা বড় হচ্ছি, খুব ছোট একটা জিনিস, ধরো কিছু হারাল, আমরা বলতাম ‘ওফ হো! জাহির পিরকে একটু নুন-জল দিতে হবে!’ এখন সব গণেশ! কিছু হারিয়ে খুঁজে পেতে চাইছ— গণেশ! মানে ধরো, আমি বলতে চাইছি, ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত মানুষ হিসেবে এই হাজির পিরকে নুনজল দেওয়া নিয়ে আমরা কখনও ভাবিইনি। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে ব্যাপারটা। কিন্তু এখন, তুমিও জানো, এই ব্যাপারগুলোই হারিয়ে যাচ্ছে।

কখনও বিদেশে কাউকে দেখে ‘সালাম আলাইকুম’ বললে সে বলে ‘তুমি মুসলিম?’ আমি বলি, ‘না তো! এটা একটা ভারতীয় অভিবাদন। কেন, কোনও সমস্যা আছে?’ এইগুলি আমাদের প্রতিদিন অভ্যাস করা উচিত। আমি খুবই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এইভাবেই একজন নিজের সত্তাকে ভারতীয় সত্তা থেকে বিযুক্ত করে ফেলে।

তুমি বলছিলে স্বাধীনতার পর তোমাদের ভাবনাটা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল, কারণ সেভাবেই দারিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। গরিবি হটাও। এখন এই বিষয়ে আমি দুটো কথা বলতে পারি, জানো! কারণ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এ অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি— এই বিষয়ে আমাকে একজন বিশেষজ্ঞ ঠাওরানো হয়েছে। বাচ্চা লোগ, হাত তালি লাগাও! জানো, আমার এক চমৎকার সহকর্মী আছেন— জেভিয়ার সালা-ই-মার্টিন— যে চমৎকার অর্থনীতিবিদ মানুষটি কম্পিটিটিভ ইনডেক্স আবিষ্কার করেছেন। তা তিনি আমাকে বললেন, “দেখো, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর মিটিং-এ যাওয়ার সুবাদে আমি তোমাকে বলতে পারি, যেহেতু আমি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নতুন জায়গাগুলি দেখাব তাই ওখানে রোয়ান্ডার অর্থমন্ত্রী বা কানাডার অর্থমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন। তাঁরা কিন্তু এই একই বিষয়ে কথা বলবেন না। তবুও আমি তাঁদের দুজনের সঙ্গেই কথা বলতে পারব। কিন্তু সামাজিক অন্তর্ভুক্তি? সে তো তোমাদের হাতে।” এই বিভেদরেখাটাই এখন মুছে গেছে, এক্কেবারে মুছে গেছে। আমি এখন ঘানা থেকে আসছি। ঘানা এই সবেমাত্র তাদের প্রথম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) স্থাপন করল। এখানে কিছু ডায়াস্পোরিক রীতিরেওয়াজ আছে, কিন্তু আমি আমার মুখ দেখাতে চাইনি— আমি কেবল ওদের কথা শুনতে চেয়েছিলাম। আর ওরা কী বলছে? বলছে, ‘এখন আর স্বাধীনতা নয়, এখন অর্থনৈতিক বৃদ্ধিই ওদের লক্ষ্য।’ ভারতীয়রা এইভাবেই চিন সম্পর্কে বলে থাকে। ফলে, এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পুরো বিষয়টিই সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে বাদ দেওয়ার, ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যটাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার…

থমাস পিকেটি একজন চমৎকার মানুষ। কিন্তু ৯০-এর দশকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলি অতটা খারাপ কেন হয়ে গেল, সে সম্পর্কে তাঁর চমকপ্রদ ইউরোপ-কেন্দ্রিক বইটি কিছু বলে না। সোমালিরা, রোয়ান্ডানরা এবং তুর্কিরা আসার জন্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা তাদের নিয়মকানুন পালটায়। ফলে তারা আর কোনওভাবেই পিকেটি-বর্ণিত সেই আদর্শ দেশ নেই। কিন্তু মজাটা হচ্ছে এই পরিবর্তনের বিষয়ে পিকেটি সম্পূর্ণ নীরব। আরও বলা যায়, তিনি পুঁজির চেয়ে উত্তরাধিকারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, ইত্যাদি। শুধু ট্যাক্স ইত্যাদি দিয়ে দিলেই কাজ হবে না। কিন্তু এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রশ্নটা ভারত-এর ধারণার সঙ্গে খুবই অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তশ্রেণির উত্থান ঘটছে, সব জায়গায় বিদ্যুৎ এসেছে, সব জায়গায় শৌচাগার বসেছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি— এই যে প্রশ্নটা, আমার মনে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক দিয়ে এই প্রশ্নটাকে দেখা উচিত। যেমন, এরকম হতে পারে, যে শিক্ষার প্রশ্নটাকে আমরা নিচ থেকে উপর পর্যন্ত নতুন করে তুলে আনলাম। কারণ শিক্ষা তো শুধু শেখা এবং জ্ঞান আহরণ করা নয়, শিক্ষা মানে প্রশ্ন, প্রশ্ন করাও বটে। যেমন তুমি এই যে গুড এডুকেশনের কথা বললে, এও তো সেই প্রশ্ন করাই। শিক্ষার এইযে ধারণাটা নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা দুজনেই এই জগতে বহুদিন ধরে আছি, আর, তুমি ভেবে দেখো, এই ব্যাপারটা আর নেই। এই যে তুমি অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কথা বললে আমাকে, আলোচনা করলে, এতে বোঝা যাচ্ছে যে তুমি একটা কিছু উত্তর পেতে চাইছ। আমারও তাই মনে হয়। যারা ‘ভারত-এর ধারণা’ নিয়ে আলোচনা করে, এই বিষয়টা এবং ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’-এর বিষয়টাতে তাদের ফোকাস করা উচিত।

রোমিলা: এখানে এটা পরিষ্কার করে দেওয়া যাক যে কেউ বাচ্চাটাকে স্নানের গামলায় বসিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে না। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ধারণার বিপক্ষে কেউ নয়, আরও যদি সেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি দারিদ্র সম্পর্কিত হয়। এটা একটা মৌলিক। হ্যাঁ, যেটা হয়েছে, এই ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, এবং সেই ব্যর্থতা নিয়েই চালিয়ে যাচ্ছিলাম, যতদিন না এই হালের উন্নয়ন নিয়ে কথাবার্তা শুরু হল। নতুন মন্ত্রটা এখন উন্নয়ন। সবাই এই নিয়ে বক্তৃতা করছে। বলছে, “আমরা উন্নয়নের পক্ষে।” এর অর্থ কী? আমরা কিন্তু কখনওই এর অর্থটা বিশদে বলিনি বা বলছি না, কিন্তু আমরা উন্নয়নের পক্ষে! আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা হল অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিয়ে আমাদের যে কামনাটা তৈরি হয়েছিল সেটা দোষের নয়, আমরা যেটা ভুল করেছি সেটা হল, এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্য জিনিসগুলির প্রতিও আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল, যা থাকতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এই অন্য জিনিসগুলির মধ্যে একটি হল জাতপাত সংক্রান্ত ভেদাভেদ।

আমার মনে আছে, ৬০-৭০-এর দশকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে খুব সামান্যই কথাবার্তা হত। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম— একজনের ইচ্ছা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, সে ভাবে ‘জাতিভেদ প্রথাকে ধ্বংস করতেই হবে।’ কিন্তু এ নিয়ে কিছুই করা হয় না। এবং বিষয়টা আস্তে আস্তে নজরের বাইরে চলে যায়। আর উল্টোদিকে, এইরকম সময়েই জাতপাতব্যবস্থা রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে শুরু করল। সর্বজনীনতা সম্পর্কে নেহেরুর যে প্রকৃত ধারণা ছিল সেটা হল, প্রতিটি মানুষেরই একটি করে ভোট— এবং এই ভোটের দৌলতেই প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। কারণ, তিনি ভোট দেবেন তাঁর নিজের মতো। বরং রাজনৈতিক দলগুলিই তাঁকে নিজেদের পক্ষে আনার জন্য বোঝাতে চাইবে। কিন্তু ঘটেছে তার উল্টোটা। এখন সব ভোটব্যাঙ্ক। নির্বাচন হয় সেই ভোটব্যাঙ্কের ওপর ভিত্তি করে। রাজনৈতিক দলগুলি মানুষকে বোঝায় ঠিকই— তবে সেটা তাঁর একার ভোটের জন্য নয়। বোঝায় যাতে তিনি ঠিকঠাক ভোটব্যাঙ্কে থাকেন। আমার মতে এই অনুশীলন প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রকেই নাকচ করছে। খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি— কিন্তু কেউ উদ্বিগ্ন হচ্ছে না। আর হ্যাঁ, এই ইস্যুটিকে কখনও এইভাবেও দেখা হল না যে— কী করে আমরা একটা শ্রেণিবদ্ধ কাঠামোযুক্ত (হায়ারার্কিকাল) সমাজব্যবস্থাকে কিছুটা কম শ্রেণিবদ্ধ কাঠামোযুক্ত সমাজব্যবস্থা বানাব? এই হায়ারার্কি বিলোপ করা যাবে না, কিন্তু কম সে কম কমানোর চেষ্টা কি করছ তুমি?

আর প্রকৃতপক্ষে আমি মনে করি এখানেই দুটি মৌলিক দিক আছে। এবং আবারও, এগুলিকেও ৬০-এর দশকে কিছুটা ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু ওইটুকুই। একটা তো তুমি যেমন বললে— শিক্ষা। আমরা, এই অবস্থাতেও, এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা পেয়েছি যা একটা পর্যায় পর্যন্ত মানুষকে ভাবতে শেখাত। এই বিষয়টা পুরোপুরি চলে গেছে। মানুষকে ভাবতে শেখানো আর হয় না। ছাত্রছাত্রীকে প্রশ্ন করতে শেখানোকে এখন সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আমাদের রাজনীতিকরাও কখনওই বলেন না— “আপনারা প্রশ্ন করুন।” আবার আমাদের মতো কেউ কেউ আছে যারা মনে করে শিক্ষা দেওয়ার মূল কথাটাই হল প্রশ্ন করতে শেখানো। এটা হয়নি। এটা অংশত আমার মনে হয় ভাষার প্রশ্নটা এর সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য। অর্থাৎ যে ভাষায় আমি বলব, সেই ভাষাটা। এইখানে— আবারও আমি ভুল হতে পারি— তবে আমার ধারণা যদি আমাদের একটা দ্বৈত-ভাষা-ব্যবস্থা থাকত— একটা স্থানীয় বা আঞ্চলিক ভাষা, আর একটা ইংরাজি— তাহলে বোধহয় প্রশ্ন অনেক বেশি হতে পারত। এর খুব সহজবোধ্য একটা কারণ হচ্ছে স্থানীয় ভাষার বইগুলির তুলনায় ইংরাজি বইগুলিতে প্রশ্ন করার অবকাশ অনেক বেশি থাকে। অবশ্যই সমস্ত ভাষার ক্ষেত্রে এটা সত্য নয়। তবে অনেক ভাষাই আছে যারা অন্য ভাষার তুলনায় বেশ কিছুটা এগিয়ে। হতে পারে তাদের ক্ষেত্রে অনুবাদ বেশি হয়েছে বলে। বা এও হতে পারে সেই সব ভাষায় বিশ্লেষণী লেখকের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু আমার সবসময়েই মনে হয় একটা ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাছ থেকে অনেক মূল্যবান জিনিস শেখা যায়। অন্যথায় মাত্র একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে মানুষ কিছুটা সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ে। আর যদি সত্যিই ভাষার প্রশ্নটাকে ধরো, দেখবে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশ্নটা দুটো ভিন্ন ভাষায়—ধরো, হিন্দি আর মালয়ালম— একইভাবে ব্যাখ্যাত হয়নি। তফাত আছে। আমি কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সে বিচার করছি না। কারণ এখানে সেটা বিবেচ্য নয়। কিন্তু তফাত যে আছে সেটা সত্য। আর আমার মনে হয় আমাদের এটা উপলব্ধি করা উচিত যে, অন্য জায়গা থেকে আমরা যেটা পাচ্ছি সেটাই আমাদের অন্যরকমভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে। মানে আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যে আমরা যা শিখেছি, তার চেয়ে অন্যরকমভাবে।

ভাষা ছাড়া শিক্ষার বিষয়বস্তুও একটা বড় ব্যাপার। এখানে আমি ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে চর্চাটাকে নিয়ে আসতে চাই। জাতীয় আন্দোলনের সময় কিন্তু আমরা হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাকে তুলে ধরিনি। এরকম বলিন যে, হিন্দুরাই হবে প্রথম শ্রেণির নাগরিক। দ্বিতীয়ত, এই আবার আমার মনে হয় যে, ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি নিয়েও আমরা যথেষ্ট আলোচনা করিনি। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কিন্তু শুধু দুটি ধর্ম পাশাপাশি বাস করাই নয়, তাদের সম-মর্যাদারও। এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কত দূর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করবে, ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চায় সেটিও আসা দরকার। আর শিক্ষা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এখন, বিশেষ করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে শিক্ষার বিষয়বস্তু কে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং কে শিক্ষার পেছনে অর্থ জোগাচ্ছে তার ওপরেই এই বিষয়বস্তু কীরকম হবে তা নির্ভর করে। আমাদের এখন সমস্যা হচ্ছে কারণ রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষতার থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ হয়, তবে শিক্ষার বিষয়বস্তু যাতে কোনওভাবেই স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনের শক্তি এবং প্রতিপত্তি দিয়ে প্রভাবিত না হয়, সেটা কিন্তু সুনিশ্চিত করা যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে শিক্ষা একটা ক্ষেত্র যেখানে ৭০-এর দশকে যখন এই বিষয়গুলি আবির্ভূত হতে শুরু করল, তখন আমাদের আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল বলে আমার মনে হয়।

পাঠ্যপুস্তক নিয়ে প্রথম বড় বিতর্কটা হয় জরুরি অবস্থার পর মোরারজি দেশাই সরকারের সময়। তখন আমরা যারা এনসিইআরটি-র পাঠ্যবইয়ের একদম প্রথম দফায় লিখেছিলাম সবাই সব দিক থেকে আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এই সময়টাতেই, জানো, আমরা সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে পাঠ্যবইকে পুরোপুরি মুক্ত করার জন্য আরও বেশি জোর দিতে পারতাম। তখন বুঝতে পারিনি এতে কতটা ক্ষতি হতে পারে। ওরকমই চলতে দিয়েছিলাম। যাই হোক, বিষয়টা হল, শিক্ষার বিষয়বস্তু এক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে যতটা চর্চা হওয়া প্রয়োজন আমরা এখনও পর্যন্ত তার চেয়ে অনেক কম করে থাকি। সেটি হল দেওয়ানি বিধির প্রশ্ন। আমাদের কি ধর্মীয় আচার অনুযায়ীই দেওয়ানি বিধিগুলি চালিয়ে যাওয়া উচিত? ১৯৫৬ সালে যখন হিন্দু কোড বিল আনা হয় সেটা এক অর্থে একটা সদর্থক পদক্ষেপ ছিল বটে। এটিকে সে সময়ে ভয়াবহ আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয় যে-সব আমরা এখন ভুলেই গেছি। কিন্তু এটা একটা প্রয়াসমাত্রই ছিল— দেওয়ানি বিধির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধর্মীয় কোডকে সাফসুতরো করার প্রয়াস। আর এখন তো অজস্র। শুধু মুসলিম পার্সোনাল ল বা হিন্দু কোড বিল-এর মতো ধর্মীয় কোডই নয়, আছে হরিয়ানার খাপ পঞ্চায়েতরাও। সে হল জাতপাতের আইন— এবং সেই আইন যদি ভাঙা হয়, তবে মেরে ফেলাও হয়। দাবি করা হয় এসবই নাকি দেওয়ানি বিধির বাইরে— অফিসিয়ালি নয় অবশ্য— তাও চমকে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়! প্রশ্নটা পরিষ্কার: এখনও কি স্মস্ত জাত এবং ধর্মের স্বতন্ত্র আইনগুলি অবলুপ্ত করে একটা সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের সময় হয়নি? যে দেওয়ানি বিধিতে জাত-ধর্মের কোনও প্রভাব থাকবে না?

ফলে ভারত-এর ধারণা তৈরি করতে আমি এই দুটি জিনিসকে খুবই গুরুত্ব দেব— শিক্ষার বিষয়বস্তু এবং দেওয়ানি বিধি। এর মাধ্যমেই ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণও সম্ভব, আর সম্ভব সেই সমাজের দিকে অগ্রসর হওয়া যেরকম একটা সমাজ আমাদের সবার প্রত্যাশিত ছিল।

গায়ত্রী: আমি যেটা বলতে চাইছি: এই আমরাটা কারা? দেখো, আমি বেশি সময়টাই আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের থেকে দূরে কাটিয়েছি। এবং এটাও সত্যি যে আমি সম্পূর্ণভাবেই একটা ধর্মনিরপেক্ষ আইনের পক্ষে। তা, এতে কোনও সমস্যা নেই। আমার মনে আছে অমর্ত্য সেন আমাকে একবার রোম থেকে ফোন করে বলেছিলেন, “আমি খুব দুঃখিত যে আমি ভেবেছিলাম তুমি মৌলবাদের সমর্থক। আমি এরকম ভেবেছিলাম কারণ তুমি তো সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ নিয়ে কাজ করো।” আমি বললাম, “অমর্ত্য, তাও তুমি ফোন করলে কারণ তোমার খারাপ লেগেছে, তুমি বুঝতে পেরেছ আমি ওটা নই।” আমি মৌলবাদী নই। তবে এটা সত্যি ধর্ম সম্পর্কে এই প্রকাশ্য আলোচনাটাকে যদি একটা সঙ্কটে নিয়ে আসা যায়, তবে বিশ্ব-ইতিহাস ফিরে দেখার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই আলোচনাটাকে আমরা আর কোনওভাবেই সমর্থন করতে পারি না। করলে আমরা আর ধর্মনিরপেক্ষ থাকব না। আমাদের এমন আচরণ করতে হবে যেন ধর্ম গিয়ে একদম বাড়ির বাথরুমে আশ্রয় নেয়— সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্তরে। কিন্তু সারা পৃথিবীর কোথাওই এটা পালিত হয় না। ফলে আমরা আইন পাশ করে নিতেই পারি। যেমন হেনরি দ্য ফোর্থ-এ শেক্‌সপিয়ার বলেছেন, “আই ক্যান কল দ্য স্পিরিট্‌স ফ্রম দ্য ভাস্টি ডিপ।” আমার ধর্মনিরপেক্ষ আইন আছে। তাই আমি ধর্মনিরপেক্ষ। যে-কেউই ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু যখন আমার দরকার, তখন সেই আইন সাড়া দিচ্ছে তো? হটস্পার নাটকে সেটাই জিজ্ঞেস করেছিল, তাই তো? আর এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ধর্মকে অতীন্দ্রিয় ধারনার থেকে আলাদা করাটা একটা কঠিন বিষয়। অতীন্দ্রিয় শব্দটার জন্য দু;খিত, কিন্তু তুমি জানো আমি এ বিষয়ে অস্পষ্ট। এই ধর্ম কিন্তু এমনকি তৃণমূল স্তরেও কাজ করতে পারে। আমি তৃণমূল শব্দটা ঘৃণা করি, কিন্তু আমি কী বলতে চাইছি বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই, ওরা নিচের স্তরের মানুষদের কিছু পাইয়ে দেয়। রাজনৈতিকভাবে চালিত না হলে এরকম স্তরেও এরা কাজ করতে পারে। যেমন ধরো বাংলাদেশে খুব গরিব মানুষদের সঙ্গে আমি কুরবানির মাংস খেয়েছি। তারা এতটাই গরিব যে তাদের মাংস প্রায় খাওয়াই হয় না। তাতেও আমাকে মাংস খেতে দেখে ওরা বলল, “দিদি, আমরা খাচ্ছি তো ঠিক আছে, আপনি কেন খাচ্ছেন?” ওরা আমার ধর্ম রক্ষা করতে চাইছে। যতক্ষণ একটা হিসাত্মক বিভেদ না তৈরি করে দেওয়া হয়, ততক্ষণ কিন্তু জিনিসগুলি এইরকমই।

প্রেসিডেন্সি— হিন্দু কলেজের দ্বিশতবার্ষিকীর কথা মনে পড়ছে। আমি একটা পাঠ করেছিলাম, যেখানে কলকাতার প্রথম বিশপ বলছেন (এটি প্রকাশিত), ‘এই নেটিভগুলো এতটাই গর্দভ যে ওরা ভাবে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর হাজারটা উপায় আছে। অথচ সঠিক উপায়টা তো আমরাই খালি জানি। যেহেতু এখন ওদের ধর্মগ্রন্থগুলো পড়ানো যাচ্ছে না, তাই ওরা মারে-র গ্রামারটাই পড়ুক ভালো করে। আমি সেটাই হিন্দু কলেজের জন্য অনুমোদন করেছি।’ তাহলে এটাকে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার উপায় হিসেবে কীভাবে ভুল করা হল? কেন আমরা ভাবতে পারি না যে এই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে সত্যি সত্যিই কোনও আবরণ দিতে গেলে একটা নির্দিষ্ট ধরনের ক্লাস মোবিলিটির প্রয়োজন? এর অনেক কিছুই কিন্তু ছিল। সে তোমার ইউনিয়ন জ্যাক নামানোর মতোই আবার এক কাহিনি।

এখন আমি এই মানুষগুলোর সঙ্গে অনেকদিন ধরে থাকছি— প্রায় ৩০ বছর। ফলে তারা এখন মেনে নিয়েছে যে আমার আচার আচরণ এরকমই। হয়তো ভাবে এর কারণ আমি আমেরিকায় থাকি। ভালো কথা। তা একদিন আমি ওদের একজনের প্লেট থেকে একটা টমেটোর স্লাইস নিয়ে খেয়েছি। কিছু ভাবিওনি। ও বাবা! মোটামুটি ৭৫ সেকেন্ড মতো একেবারে হিরন্ময় নীরবতা। এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমি একসাথে কাজ করি, একসাথে থাকি, একসাথে খাই, সমস্ত কিছু করি— কিন্তু একজন ব্রাহ্মণ তোমার এঁটো প্লেট থেকে খেল! দেখো, এই হচ্ছে বিশ্বাস! এই জিনিসকে উপড়ে ফেলার জন্য কিন্তু খালি একটা ধর্মনিরপেক্ষ আইন বানালেই যথেষ্ট নয়। কেউ সেটাকে আত্মস্থ করবে না।

ফলে আমার উপলব্ধি এটাই যে আমাদের প্রথমে ঠিক করতে হবে ‘আমরা’ কারা। এই ‘উন্নয়ন’ কোনওরকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই পুঁজির দুনিয়ায় আমাদের উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। সামাজিক কাজে পুঁজিকে ব্যবহার করার কথা তো ছেড়েই দিলাম। এই যে সমস্ত স্বনির্ভর যোজনাগুলি আর তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কেউ বলেই না এগুলো কীভাবে চালাতে হয়। ফলে প্রশ্নটা উন্নয়ন, আর এই উন্নয়ন-এর ভেতরে ভাষার প্রশ্ন।

তুমি জানো আমি আমেরিকায় ইংরাজি পড়াই। এবার আমি তোমায় বলতে পারি, একজন শিক্ষক যদি খুব নিরপেক্ষ হয় তবে তার ইংরাজি টেক্সটে ততটা আত্মবিশ্বাস থাকবে না। হ্যাঁ আমি তোমার সঙ্গে একমত যে, এর অর্থ এই নয় যে আমি স্থানীয় ভাষার টেক্সট উদযাপনের কথা বলছি। তবে এটা আমায় স্বীকার করতেই হবে যে ৩০ বছর এই মানুষগুলির সঙ্গে থাকার জন্য ইংরাজি ভাষার টেক্সটে আমার আত্মবিশ্বাস একটা অন্য জায়গায় চলে গেছে। আর এটাও সঙ্গে সঙ্গে বলব, এই যে এখন বাজারে গ্লোবাল সাউথ-এর আইডিয়াটা আসছে, এ একেবারে তীব্র বিপরীতমুখী এক বর্ণবৈষম্যবাদী আইডিয়া। এতে শ্রেণিকে একেবারেই উপেক্ষা করা হয়েছে। কারণ ওরা এই ইংরেজি জিনিসটা একদম কোনও জ্ঞান ছাড়াই ভাসাভাসাভাবে করতে চাইছে। ওরা এই বিকল্প জ্ঞানচর্চা চালু করতে চাইছে। খুবই সমস্যার ব্যাপার।

সুতরাং আমার মনে হয় যে সামগ্রিক প্রশ্নটি হল ভাষা নিয়ে কী করা উচিত— আবার একটু প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছি— আমার একটা প্রোজেক্ট আছে জানো, যার জন্য কখনওই অর্থের সংস্থান হবে না। কারণ এটিতে মধ্য আফ্রিকার অলিখিত ভাষা, সেই অলিখিত ভাষার সম্পদ, বেঁচে থাকা ভাষা/বেঁচে থাকার ভাষা, প্রচারকরা তার মাধ্যমে প্রচার চালান যাতে নির্বাচনের ঠিক আগে জাতিগত হিংসা ইত্যাদি ঘটে… যেগুলি আবার জাতিসঙ্ঘের জ্ঞান অনুযায়ী ‘সংরক্ষণের প্রয়োজন’। ওদের বক্তব্য, ‘এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে! এগুলোকে সংরক্ষণ করা উচিত!’ আমার ভাষার বাস্তুতন্ত্রের ধারণাও আছে, কিন্তু যেটাও এখানে আলোচ্য নয়। সুতরাং এই ভাষাগুলি যেভাবে ব্যবহার হওয়া উচিত ছিল, যার জন্য নাকি উন্নয়ন, তুমি জানো, শেষমেশ কৃষি এবং স্বাস্থ্যতে এসে ঠেকল। একদিক থেকে এই প্রশ্নটি ভারতের সীমানা ছাপিয়ে একটি বৈশ্বিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের উন্নয়ন, সারা বিশ্বে উন্নয়ন বলতে যা বোঝানো হচ্ছে, তেমনই। এ নিয়ে আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে আমাদের কাছে এখন একটা স্থিতিশীল অনুন্নয়ন রয়েছে এবং এটাকেই স্থিতিশীল উন্নয়ন বলে চালানো হচ্ছে। কাকে স্থিতিশীলতা বলে? যাকগে, সে নিয়ে আর আলোচনার দরকার নেই, কারণ আমরা ভারত-এর ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করছি। আর আমি দুঃখিত যে আমি এই এত কথা বলে চলেছি। তবে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন এবং ইংরেজিতে পাণ্ডিত্য, ইংরেজি ভাষা এবং ইউরোপীয় ভাষায় পাণ্ডিত্যের প্রশ্ন— উভয় প্রশ্নেই অনুমোদিত অজ্ঞতার ধারণা সম্পর্কে ভাবা উচিত। আমরা তো এখানেই বসবাস করি। আরও একটা আইডিয়া, যে এই ভাষাগুলিকে নিয়ে কী করা উচিত যাদের কোনও পরীক্ষা না নিয়েই ইংরেজির চেয়ে ভালো বলা হচ্ছে। এটি একটি পরিপূর্ণ ক্ষেত্র। আমি কিন্তু শুধু তোমার সঙ্গে একমত হতে চেয়েছিলাম— তবে চাইছিলাম সমাধানটা একটু কম সহজ করতে— এই বলে যে তারা আরও একটু পড়লে আরও ভালো হত—

 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...