কোভিডে লুঠ শিশুদের ভবিষ্যৎ, দায় এড়াতে পারে না সরকার

অম্লান বিষ্ণু

 



শিক্ষক, সমাজকর্মী

 

 

 

 

মাস্টারমশাই, খুব চাপে পড়ে গিয়েছিলাম!– বলছিলেন শম্ভু শীল, উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া ব্লকের এক দিন-আনি-দিন-খাই বাসিন্দা। “মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, আমার বৃদ্ধা মা আর বাচ্চাদুটোর মুখে দুবেলা খাবার দিতে পারব তো? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর কথা না-হয় ছেড়েই দিন। লকডাউন-এ যে এমনটা হতে যাচ্ছে, প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি স্যার! জানলে খরচ আরও কমানো যেত,” শম্ভুর গলায় আশঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা অনুতাপ— পরিস্থিতি আগাম বুঝে উঠতে না-পারার জন্য “যখন লকডাউন শুরু হল, সকলের মতো আমারও মনে হয়েছিল, এটা করা অবশ্যই দরকার। মোদিজি যেমন বিনীতভাবে আমাদের কাছে মাত্র তিনসপ্তাহ সময় প্রার্থনা করলেন, মনে হচ্ছিল, এত বড় মাপের একজন লোক, দেশের প্রধানমন্ত্রী, করোনা ঠেকাতে দেশের কাছে কেবল ২১টা দিনই তো চেয়েছেন! তারপর ভাইরাস চলে যাবে। আবার সব আগের জায়গায় ফিরে আসবে। কিন্তু, কোথায় কী?”

দুই মেয়ে, বৃদ্ধা মা আর স্বামী-স্ত্রী মিলে মোট পাঁচজনের সংসার। মেয়ে দুটি পাড়ার প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। শম্ভু একটি পা-ভ্যানে আখমাড়াই মেশিন লাগিয়ে, পাড়ায় পাড়ায় আখের রস বিক্রি করেন। স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করেন। দুজনের ঘামে-শ্রমে অল্প কিছু সঞ্চয় হয়েছিল। সেইসঙ্গে সরকারি একটা অনুদানও মিলে যায়। তাই ২০১৯-এর শেষের দিকে পুরনো মাটির বাড়িটা ভেঙে তাঁরা একটা ছোটখাটো পাকা বাড়ি তৈরির কাজে হাত দেন। কিন্তু বাড়ি সম্পূর্ণ করার আগেই ভাইরাসের মর্জিতে দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। ততদিনে শম্ভুর সব সঞ্চয় তো শেষ হয়েছেই, বাজার থেকে চড়া সুদে ঋণের একটা বোঝাও জমে উঠেছে। ভেবেছিলেন, আখের রস ফেরি করে খুব তাড়াতাড়িই ওই দেনা মুক্ত হবেন। আর স্ত্রীর আয় দিয়ে মায়ের চিকিৎসা এবং মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে সঞ্চয় শুরু করা যাবে। কিন্তু, করোনাঝড় শম্ভুর মতো গরিব, খেটে খাওয়া, সাধারণ মানুষের প্রায় সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। শুধু করোনাঝড়ই বা বলি কীভাবে? আসলে প্রতিদিনই ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ওঁদের স্বপ্ন চুরি করছিল অনেকদিন ধরে, করোনা এসে এক ঝটকায় একেবারে নিঃস্ব করে দিল। তবুও, ওঁরা শেষ পর্যন্ত ভরসা করেছেন। থালা বাজিয়েছেন, তোশকের তলা থেকে বাঁচিয়ে রাখা খুচরো পয়সা বার করে মোমবাতি কিনেছেন। তারপর সন্ধ্যাবেলায় সব আলো বন্ধ করে মোমবাতি, প্রদীপ জ্বালিয়ে রাষ্ট্রনেতার প্রতি আস্থা দেখিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্র-নির্ধারিত ২১-এর গিঁট কিছুতেই টপকাতে পারেননি।

আসলে শুরুর ওই ২১ দিন যে হিমশৈলের চূড়ামাত্র, সেটা শম্ভুদের মতন খেটে খাওয়া মানুষগুলো বোঝেননি! বোঝার কথাও নয়, দেশ বিপন্ন হলে শ্রমজীবী মানুষেরা যে একমাত্র সরকারের ওপরেই ভরসা করবেন, সেটা তো একপ্রকার নিশ্চিত ব্যাপার। তবে, এঁদের বোড়ে সাজিয়ে ছদ্মযোদ্ধা বানিয়ে মাঠে নামানো তো শাসকের পুরনো খেলা! এখন সেই খেলায় উপরি পাওনা হিসেবে বোড়েদের ওপর চলছে দেশপ্রেম নামক হিন্দুত্ব টিকার ট্রায়াল। কিন্তু, টিকা তো দেশের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান নয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় হাজারো সমস্যা। সেগুলো নিয়েই তাঁরা এগোতে থাকেন, যেটুকু সরকারি ব্যবস্থা আছে, তার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু, করোনা-মোকাবিলার নাম করে সরকার সেই জরুরি, একান্তভাবে আবশ্যিক পরিষেবাগুলো বন্ধ করে দিল।

সরকার অবশ্য মুখে অনেককিছুই বলেছে। অনেক অনেক টাকা বরাদ্দের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু, সেসব কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। করোনারোগী তো বটেই, অন্যান্য ক্রনিক রোগীরাও চিকিৎসা পাননি। একদিকে অপরিকল্পিত লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ। চিকিৎসকদের কার্যত খালি হাতে যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিকরা ট্রেনের তলায় পড়ে ‘বডি’ হয়ে গিয়েছেন। অন্যদিকে রাজ্যের সরকারি রেশন দোকানে উপচে পড়েছে ভিড়। গণবন্টন ব্যবস্থার এই উদ্যোগে মানুষ সুবিধা পেয়েছেন সেটা নিশ্চয়ই ঠিক, তবে ব্যবস্থাটিকে পুরোপুরি সদর্থক করে তোলার প্রশ্নে ইতিবাচক সরকারি ভূমিকার অনেক অভাব মানুষ লক্ষ করেছেন। আর এই ডামাডোলের  মাঝে কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমশ দেশ বিক্রির পথে এগিয়েছে একপ্রকার বিনা বাধায়। চুপিচুপি একের পর এক গণবিরোধী বিল পাশ হয়েছে এই অতিমারি কালেই। যার শুরু হয়েছিল, জাতীয় শিক্ষানীতি বিলটির মধ্য দিয়ে। সাধারণ মানুষকে কথার জাদুতে ভুলিয়ে বিভ্রান্ত করার সবরকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল বিলটিতে।

জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, তাই এটা নিয়ে এখানে নতুন করে আর কোনও আলোচনা চাইছি না। তবে, শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সম্প্রতি একটি ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় অধ্যাপক গণেশ দেবী আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, নতুন শিক্ষানীতিতে আশ্রমের যে ধারণার কথা বলা হয়েছে, সেটা পরোক্ষে আরএসএস-এর অনুশীলন কেন্দ্র গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ। প্রফেসর দেবীর সঙ্গে সহমত পোষণ করে শুধু যোগ করতে চাই, বিল-এ ‘বিজ্ঞান ও মাইথোলজি’কে মেলানোর বিষয়টাকে হালকাভাবে নেওয়াটাও বোধহয় মূর্খতা হবে। মানে শিক্ষানীতি হলেও, এটি আসলে আমাদের দেশের শাসকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার একটা বিশেষ উপায়, যার মাধ্যমে মগজে কার্ফু জারি রেখে মানুষের চিন্তাচেতনাকে একেবারে শুরু থেকেই বিনাশ করা যায়। অর্থাৎ পুঁজিবাদী শক্তির চরম আস্ফালনের দিকটাকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে ঢেকে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টার জন্ম হচ্ছে এই নীতি কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে।

সকলেই জানেন, অতিমারিতে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে শিক্ষার্থীরা। সমস্ত শিক্ষার্থীই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে প্রাথমিক, বা আরও পরিষ্কার করে বললে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মধ্যে অতিমারির প্রভাব সর্বোচ্চ। আমাদের রাজ্যে শহরের সরকারি প্রাথমিকে মূলত একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরাই আসে। কারণ, শহর, আধা-শহর বা মফস্বলে লেখাপড়ার বেশিরভাগটাই এখন বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দখলে। গ্রামের ক্ষেত্রেও তারা ক্রমশ আগ্রাসী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এখনও গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিই ভরসা রেখেছেন। সে ক্ষেত্রে গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত শিক্ষার্থীর অভাব দেখা যায় না। কিন্তু এই অতিমারি সেই সবুজ পৃথিবীর প্রায় মূলোচ্ছেদ করে ফেলেছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষিকা-শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সম্পর্কহীনতা কার্যত গোটা একটা শিক্ষাবর্ষকেই শেষ করে দিতে চলেছে। গত ন মাস ধরে বিদ্যালয়ের সঙ্গে দিদিমণি-মাস্টারমশাইদের যোগাযোগের একমাত্র সেতু ছিল মিড-ডে মিল দেওয়া। ডিসেম্বর মাসে অবশ্য ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেওয়া ও ভর্তি নেওয়ার জন্য শিক্ষিকা-শিক্ষকদের বেশ কদিন স্কুলমুখী হতে হয়েছে। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ দু পক্ষেরই ক্ষতির কারণ হয়েছে। কার্যত কাজ না-করে মাইনে নেওয়ার দায়ে শিক্ষকরা সমাজে ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছেন। সমাজের সব স্তর থেকেই তাঁদের নানা ধরনের ব্যঙ্গবিদ্রুপের স্বীকার হতে হচ্ছে। এদিকে সরকারি উদাসীনতায় তাঁরা কিছু করেও উঠতে পারছেন না। এই না-পেরে ওঠারও একটা ইতিহাস আছে। এক বঞ্চনার ইতিহাস। পাঠক্রম, পঠনপাঠন, শ্রেণি পরিচালনার নীতি নির্ধারণে তাঁদের, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষিকা-শিক্ষকদের, কোনও ভূমিকা কোনওদিনই ছিল না, আজও নেই। ফলে, তাঁরা এ ক্ষেত্রে নিধিরাম সর্দার বই কিছু নয়। শিক্ষক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে একটা বলার জায়গা আছে বটে, কিন্তু সরকারের বন্ধু বা বিরোধী, সব সংগঠনই এখনও পর্যন্ত এই ব্যাপারে পুরোপুরি নির্বিকার! আবার দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকার ফলে বেশকিছু শিক্ষিকা-শিক্ষক স্কুলে না-আসাটাকেও তাঁদের অধিকার বলে মনে করছেন।

অন্যদিকে, স্কুলে আসতে না-পেরে বহু শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যার স্বীকার হচ্ছে। দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে পড়াশুনার পরিবেশ না-পাওয়ার ফলে লেখাপড়ার সঙ্গে তাদের দৈনিক যোগাযোগের বিরাট অভাবও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাসের নামে যা শুরু হয়েছে সেটা একেবারেই প্রহসন। ২০১৪ সালের ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে-র দিকে যদি নজর রাখলে দেখতে পাব, ভারতের মাত্র ২৭ শতাংশ পরিবারে কোনও সদস্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। আর এদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ পরিবার অনলাইন ক্লাস করতে সক্ষম। ২০২০ সালেও এই অবস্থায় বিশেষ কিছু বদল আসেনি। আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে কম্পিউটার ব্যবহার করা পরিবারের সংখ্যা মেরেকেটে ৪০ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রাচুর্য এখনও শহরে অনেক বেশি। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের অনেকেই হোটেলের বয়, ইটভাটার শ্রমিক, কৃষিক্ষেত্রে বা কোনও স্বচ্ছল পরিবারে দিনমজুরি খাটছে। কয়েকদিন আগে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক শিক্ষকের বয়ানে দশম শ্রেণিতে পাঠরত একটি কিশোরের প্রতিদিন সকালে বহুদূর সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি দুধের জোগান দেওয়ার কাহিনি জানা গেল। আবার, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হুগলির এক দিদিমণি ফেরিঘাটে দেখলেন তাঁদের স্কুলের এক তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হোটেলে ভাত-ডাল পরিবেশন করছে। এমন অসংখ্য সত্যের মুখোমুখি আমাদের এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কোভিড-১৯! যা, পেরিয়ে এগিয়ে চলার পথ সমাজের সকলের কাছে খুবই বন্ধুর ও দীর্ঘমেয়াদি, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

কোভিড-১৯ মানুষের জীবনযাত্রার খোলনলচে বদলে দিয়েছে। স্যোশাল ডিসট্যান্সিং, মাস্ক, ভার্চুয়াল জীবনে স্বচ্ছন্দ হচ্ছেন একাংশ। আর তার বাইরে আরও অনেক বড় একটা অংশ দিনমজুরির মতো একদিন একদিন করে বাঁচতে চাইছেন। এক সকালে খবরের কাগজ খুলে একজন শিক্ষিকা একটু চমকেই উঠলেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত চুরি-করতে-গিয়ে-গ্রেফতার-হওয়া মানুষটির ছবি তাঁর খুব চেনা। তিনি তাঁদের স্কুলের একজন অভিভাবক। কাজহারা একজন মানুষের এই পরিণতি আমাদের গণতন্ত্রের কাছে অত্যন্ত হতাশার! চরম খিদের মাঝে এই সময়ে একের পর এক নাবালিকার বিয়ে হয়ে যাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সম্প্রতি বীরভূমের একটি গার্লস হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষিকা রেজিস্ট্রেশনে অনুপস্থিত নবম শ্রেণির একটি মেয়ের খোঁজ নিতে তার বাড়ি গিয়ে দেখেন, মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়ির লোক জানান, “পড়াশুনা নেই, বাড়িতে বসে আছে, ভাল ছেলে পাওয়া গেল, তাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।” তিনি ওই গ্রামে আরও খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন যে, এই সময়ের মধ্যে এমন আরও অনেক মেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে কী ভয়ানক ঘটনা ঘটতে পারে এই ঘটনাগুলি তারই সাক্ষ্য দিয়ে যায়। যা, জাতির পক্ষে অত্যন্ত লজ্জার!

তবে অন্ধকারের মাঝে আলোর রেখাও আছে। দক্ষিণ দিনাজপুরের একদল শিক্ষক দলবেঁধে স্কুল এলাকায় সপ্তাহে কয়েকদিন করে পারস্পরিক দূরত্ব ও কোভিড বিধি মেনে লেখাপড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সকাল, সন্ধ্যায় এলাকা ভাগ করে তাঁরা বাড়িতে গিয়েও পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এমন নানা উদ্যোগ লক্ষ্য করা গিয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা-শিক্ষকরা বাড়িতে গিয়ে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর বার্ষিক মূল্যায়ন নিয়েছেন। নানান উপায়ে যে একদল ব্যতিক্রমী শিক্ষক, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও এলাকার টিউশন শিক্ষকদের নিয়ে লেখাপড়া চালু রেখেছেন, সেটাও কম বড় কথা নয়। কিন্তু এসব কিছু একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি এখনই স্কুল খোলা না-যায়। পরপর সবকিছুই আনলক হয়েছে, কিন্তু স্কুল এখনও বন্ধ। এটা আর একেবারেই বাস্তব বা যুক্তিসঙ্গত ভাবনা নয়। প্রতি মাসে একবার করে  মিড-ডে মিল দেওয়া হচ্ছে, সেটা অবশ্যই ভাল দিক। কিন্তু সেই খাবার অপ্রতুল। চাল, আলু, ছোলা, সাবান এটাই শিক্ষার্থী পিছু শেষ কয়েকমাস এমনকি জানুয়ারি মাসের মিড-ডে মিল সামগ্রী। পরিমাণের প্রশ্নে নাই বা এলাম, কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে বাচ্চাদের সুষম খাবার দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের মনে রাখা দরকার, অন্তত এক বেলা সুষম খাবার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের কর্তব্য তেমনি তা শিক্ষার্থীদের অধিকারও বটে।

শম্ভু শীল আখের রস বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি এখন দিনমজুর। আগে প্রতি মাসে যে পরিমাণ সব্জি,  অল্পকিছু মাছ, ডিম, দুধ, এক বা দু দিন মাংসের জোগান তিনি এবং তাঁর স্ত্রী পরিবারকে দিতে পারতেন, তাতে টান পড়েছে। এখন কিছু আনাজপাতি, কয়েকদিন ডিমের জোগান এলেও মাছ, মাংস, দুধের জোগান দেওয়া তাঁদের কাছে উৎসবের সমান। এরই মাঝে যেটা সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন, তাঁর মেয়ে দুটোর লেখাপড়া হবে তো? এতদিন স্কুল বন্ধ থাকার পর, এতদিন লেখাপড়া থেকে আলাদা থাকার পর, তাদের মতো লেখাপড়ার জগতে ‘অনধিকার প্রবেশকারী’র লেখাপড়ার নিশ্চয়তা কি সরকার দিতে পারবে? নাকি কেবল দেশপ্রেমের শুকনো বুলি দিয়ে চিড়ে ভিজিয়ে চলবে? কথায় কথায় সরকার সন্ত্রাসবাদ, দেশদ্রোহ, ও অন্তর্ঘাতের ভয় দেখায়। কিন্তু, শিশুদের অধিকার লুঠ করে নেওয়াতে কি দেশদ্রোহের মাত্রা কিছু কম আছে? কোটি কোটি শিশুর ভবিষ্যতের ওপর এমন প্রাণঘাতী আক্রমণ কি সন্ত্রাসবাদ নয়? এ-প্রশ্নটা না-তুললে দেশকে রক্ষা করা যাবে না। দেশ মানে তো কেবল একটা ভূমিখণ্ড নয়, দেশ মানে মানুষ। আর দেশের ভবিষ্যৎ তার শিশুরা।  তাদের ভবিষ্যতের ওপর হানাদারির অপরাধ কি দেশ ক্ষমা করবে?

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...