একুশে হুঁশের স্তব্ধতা

আকাশনীল আলম ঘটক

 


সাহিত্যের ছাত্র

 

 

 

একুশ তো পার্বণ।

পার্বণ তো উদার হওয়ার দিন, উদাত্ত কণ্ঠে মিলেমিশে চলার দিন। হয়তো তাই, না? গান কবিতা স্লোগান?

‘আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে…’

‘আমি চাই নেপালি ছেলেটা গিটার হাতে
আমি চাই গাইতে আসবে গাইতে আসবে কলকাতাতে’

কে এই আমি?
গায়ক? বাঙালি গায়ক নিশ্চয়ই, কারণ বাংলা গান, বাঙালির গান!

অথবা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’

কোন বাঙালি? বাঙালি মুসলমান? হয় নাকি?
বাংলাদেশের না পশ্চিমবঙ্গের?
কে গাইছে এই গান?
এই পার্বণের এই গান তো আন্তর্জাতিক, কিন্তু এই গান কার অন্তর জাগাতে চায়?

পার্বণেরও গেস্ট হোস্ট থাকে। পার্বণ সবার, কিন্তু দায়িত্ব তো আয়োজকদের।

আয়োজনের প্রয়োজন নৈতিক কিন্তু তৎপরতা?

রাজনৈতিক? কেন অন্তর-নৈতিক নয়? এখনও মুজিবকে শুনতে পান সেই হাজার হাজার লোকের সামনে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি ভীষণ আবেগের সঙ্গে উচ্চারণ করছেন জয় বাংলা?

মুজিবকে না হয় দেখেননি, কিন্তু আজ যারা বলছেন জয় বাংলা, তারা বলছেন কোন প্রয়োজন থেকে? কোন বাংলার কথা তারা বলছেন? যে বাংলায় নেপালি গোর্খাদের জন কেরি থেকে হালহেদ হয়ে বিদ্যাসাগরের বাংলা ব্যাকরণ শিখতে বাধ্য করা হয়? এই ব্যাকরণ বাংলা তো? সংস্কৃতর সঙ্গে ইউরোপীয় গ্রামার মিশে নেই তো?

মেটিয়াবুরুজের ডকে বা তিলজালার গলিতে এর কোনও প্রভাব পড়বে? এইসব গলির ভাষা কি আমাদের জয় বাংলার প্রতিধ্বনির সহধ্বনি হয়েছে কখনও কোনওদিন? কিংবা কারখানার ভাষা? সেখানে ভাষা আছে, না আছে ঘাম আর মেশিনের আওয়াজ? সেই কারখানায় কারা কাজ করেন? জয় বাংলা বলার আগে আমরা তাদের কী ভাষা তা শুনে দেখেছি? সেটা বাংলা কিনা আমরা জানি তো? কলকাতার রাস্তায় এত বিহার থেকে, ওডিশা থেকে, পাঞ্জাব থেকে লোক দেখা যায় কেন, তারা কি বাংলায় কথা বলেন, তবে বাংলা জানেন শিখে নিয়েছেন, কিন্তু সেই বাংলা কি যথেষ্ট বাংলা? আমাদের বাজার, যে বাজার থেকে আমরা সবাই জিনিস কিনি সেই ভাষা বাংলা তো? বাংলার বস্তিগুলোতে কি ভাষা ব্যবহার করা হয়? সেই ভাষার ধ্বনি অথবা অর্থ কি জয় বাংলা অথবা হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান এই দুয়ের কোনও স্লোগানই মর্যাদা দিতে পারবে? যে ভাষাতেই তারা কথা বলুন না কেন, তারা যেটা বলেন, সেটা কি আদৌ আমরা শুনতে চাই না শুনতে পারব?

২১ তো পার্বণ। অদ্ভুত পার্বণ। পার্বণের ইতিহাসের থেকেও আছে পার্বণের বর্তমান। আজকের বাংলায় সেই ইতিহাস নিজের মত করে তৈরি করছে তার আচার। প্রত্যেক পার্বণের আচার থাকে, সেই আচার কোচদের গ্রামে বা টোটো জনজাতির প্রায় মৃত ভাষাকে সঙ্গে নেবে?

কিন্তু জয়বাংলার থেকেও বেশি আজকের বাংলায় শোনা যাচ্ছে হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্থানের একটি স্লোগান, আপনিও শুনেছেন নিশ্চয়ই। সমস্ত আওয়াজ পেরিয়ে এই আওয়াজকে আমাদের কানে পৌঁছে দিচ্ছে বাংলা ভাষার ধারক বাহকেরা। কিন্তু তিনটি শব্দই তো ফারসি। হিন্দু শব্দের প্রথম ধর্মীয় ব্যবহার আজকের ভারতশত্রু চিনের এক বৌদ্ধ পর্যটন পুস্তক থেকে প্রাপ্ত, ইন্তু শব্দটির ব্যবহার আমরা সেখানে পাই এবং প্রথম পূর্ণ বয়ান হিন্দু শব্দটি পাওয়া যায় আল-বেরুনির ১১ শতকের তারিখ আল হিন্দ গ্রন্থে। রোমিলা থাপার দেখাচ্ছেন যে হিন্দু শব্দটি ব্যবহার হয়েছিল প্রথম ধর্মীয় অর্থে মুসলমান নন এমন বাকি সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে বোঝাতে, তারা কেউ বৌদ্ধ, জৈন এবং বৈদিক ধর্মাচারী মানুষ। উনিশ শতকের আগে হিন্দু ধর্মের প্রয়োজন ভারতবর্ষের হয়নি। কিন্তু আজকের ভারতে? বাংলায়?

কোন আইন টা বাংলায় পড়েছেন আপনি? ভারতের সবথেকে বর্বর আইনগুলি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে মিশা ইউএপিএ হয়ে এক্কেবারে আপনার কৃষি আইন। সেই ভাষার কথা ভাবেন যে ভাষা আইনের ভাষা। আমাদের দেশে আইন লেখা হয়েছে এমন এক ভাষায় জনসাধারণ যার মানে বোঝেন না। যার মানে বুঝতে লাগে কোট-প্যান্ট-টাই পরা আইনজীবী। কী সেই ভাষা? ক্ষমতার ভাষা, ইংরেজি, বিশ্বের ভাষা, উপনিবেশের ভাষা, উপনিবেশের পরবর্তীতে ‘নব-অধীনতার’ ভাষা। স্কুল থেকে কলেজ থেকে আইন এবং স্বাস্থ্যসাথীতে।

পার্বণ মজার, পার্বণ আনন্দের, ফূর্তিতে মানুষ অনেক কিছু থেকে বিস্মৃত হয়।

হয়তো আমি ভুলে গেছি প্রত্যেক ভাষাতেই, তা সে মান্য কিংবা scheduled ভাষা হোক কিংবা প্রায় মৃত, খিদে শব্দটি আছে। আমরা ভুলেই গেছি ভাষার বাঁচা মরা মানুষের সঙ্গে, মানুষের চাই ভাত। আমরা ভুলে গেছি ভাতের খোঁজে মানুষ হয়েছেন অভিবাসী কিংবা শরণার্থী। আমরা কি ভুলে গেছি বঞ্চনার একটি ব্যবস্থা আছে এবং সেই ব্যবস্থাপনার ভাষা সর্বদা এক? এই ব্যবস্থার সরঞ্জাম নানা ভাষার মারপ্যাঁচে মানুষকে পথের ভিখারি বানিয়ে ছাড়ে এবং তারপরেই দয়ার ভাষায় কিছু দান করে।

ভারতের সংসদে ভাষা ব্যবহার হয়, না হয় আওয়াজ?
সংসদীয় দলের আধুনিক জ্যামিতি কেমন ভাষায় হয় যা মানুষের বোধগম্য?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভাষা কি ভাষা আছে না শুধু ইমোটিকন?
তাহলে?
একুশ?
শুধুই ফেব্রুয়ারি?

পাশের লোককে জিজ্ঞেস করুন। এই আত্মীয়তার জন্যই তো সভ্যতার শুরুর দিন থেকে তৈরি হয়েছিল ভাষা। তিনি না জানলে তার পাশের লোক। যদি জয় বাংলা এবং হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান-এর বাইরে কোনও উত্তর পান, নিশ্চয়ই পাবেন, একটু জানাবেন?

কিন্তু এত প্রশ্ন কেন? এ কি লেখা না সম্ভাব্য প্রশ্নমালা মাধ্যমিকের?

তাই শেষ প্রশ্ন কবিতায় না হয়…

একজন কবি বলতেন,

Not the ones speaking the same language, but the ones sharing the same feeling understand each other

সর্বজনায় একই ভাষা কয়
যেজনায় একই স্পন্দ পায়
সেই হয় ভাষার সহায়

তিনিই বলেছেন,

Silence is an ocean. Speech is a river.
When ocean is searching for you, don’t walk into the language river.
Listen to the ocean,
Bring your talky business to an end.
Traditional words are just babbling in that presence and babbling is a substitute for sight.

স্তব্ধতা সমুদ্র। শব্দ নদী।
সমুদ্র যখন খুঁজছে তোমায়, কেন যাও নদীর কাছে?
সমুদ্রের কথা শোনো।
শব্দ থামাও।
আধ আধ কও কথা
সেই আধারে
পাবে দেখো
সবচেয়ে গভীর দেখা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...