ভীমা-কোঁরেগাও: ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় গণতন্ত্র

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

 

 

 

সময় যত অতিক্রান্ত হচ্ছে ভীমা-কোঁরেগাও চক্রান্ত মামলা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দ্বিতীয় ‘রাইখস্ট্যাগ’ হয়ে উঠছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানিতে ভয়ঙ্কর আর্থিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। এই পর্বে হিটলারের নেতৃত্বে ন্যাশানাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি এক উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসাবে উঠে আসে। সংসদীয় ব্যবস্থায় অংশ নিয়ে তারা ১৯৩২ সালের জুলাই মাসের নির্বাচনে ৩৭.২৭ শতাংশ ভোট পায়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সে বছর আবার নির্বাচন হয় নভেম্বর মাসে। সেবার তাদের ভোট প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। নির্বাচনে না জিতলেও ভন হিন্ডেনবার্গের সমঝোতায় হিটলার হন চ্যান্সেলর। এরপর ১৯৩৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাইখস্ট্যাগ (জার্মান সংসদ) পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ গতিতে এ খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে যে জার্মান সংসদে আগুন লাগিয়েছে কম্যুনিস্টরা। হিটলার ও তার গেস্টাপো বাহিনি শুরু করে কম্যুনিস্ট নিধন যজ্ঞ। তারপর নভেম্বর মাসে যে নির্বাচনী প্রহসন অনুষ্ঠিত হয় তার স্লোগান ছিল “ওয়ান পিপল-ওয়ান ফুয়েরার-ওয়ান ইয়েস”। রাইখস্ট্যাগ পরবর্তী জার্মানি প্রত্যক্ষ করে দেশ জুড়ে এক ফ্যাসিবাদী শাসন যেখানে সংবিধান, মৌলিক অধিকার, প্রতিবাদ, ভিন্নমত পদদলিত হয়। আজ একথা প্রমাণিত যে রাইখস্ট্যাগের আগুন লাগানোর ঘটনা ছিল হিটলারের পরিকল্পিত চক্রান্তের অংশ যা ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনের ড্রেস রিহার্সাল।

একইভাবে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি ভীমা-কোঁরেগাওতে দলিতদের জমায়েতকে কেন্দ্র করে অশান্তির অভিযোগে একের পর এক মামলা দায়ের করা, সেই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিক বুদ্ধিজীবীদের জেরা ও সবশেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার রোমহর্ষক চক্রান্ত প্রথমে কর্পোরেট বান্ধব টিভি চ্যানেলে প্রচার ও তারপর অধিকার আন্দোলনের অগ্রণী কর্মীদের (এখনও পর্যন্ত ১৪) ভীমা কোঁরেগাও মামলায় কুখ্যাত ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত করা শাসকদের বৃহত্তর চক্রান্তের অংশ। এই মামলার প্রেক্ষাপট, মামলার গতিপ্রকৃতি, সাক্ষ্যপ্রমাণ তথা এই ঘটনা পরবর্তী সময়ে সাধারণভাবে যে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠকে দেশদ্রোহী বলে কারাগারে নিক্ষেপ করার মধ্যে একটা কৌশল কাজ করছে যা মূলগতভাবে আমাদের রাইখস্ট্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই নিবন্ধ ভীমা-কোঁরেগাও মামলার সেই বহুমাত্রিকতাকে স্পর্শ করার একটা প্রয়াস মাত্র।

 

ভীমা-কোঁরেগাও শব্দবন্ধটি কেন ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে তা উপলব্ধি করতে হলে আমাদের অবশ্যই ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরাতে হবে। ১৮১৮ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটিশ কোম্পানির ৯০০ জন সৈন্যের এক ব্যাটেলিয়ন যখন ক্যাপ্টেন এফ এফ স্ট্যানটুনের নেতৃত্বে সেরুর থেকে পুনের দিকে যাচ্ছিল তখন ভীমা নদীর তীরে কোঁরেগাও বলে এক গ্রামের সামনে তাদের গতিরোধ করে পেশোয়ার নেতৃত্বে ২০,০০০ মারাঠা সৈন্যের এক বিশাল বাহিনি। দীর্ঘ যাত্রার ফলে ক্লান্ত, রসদে টান পড়া কোম্পানির বাহিনির পরাজয় অনিবার্য ছিল। কিন্তু কোম্পানির বাহিনি, যাদের একটা বড় অংশ ছিল দলিত মাহার সম্প্রদায়, বীর বিক্রমে লড়াই করে। এই যুদ্ধে কোনও পক্ষ নির্ণায়ক জয় না পেলেও মারাঠারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এটি ছিল শেষ ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের মধ্যে একটি। এই আংশিক বিজয়কে সংহত করে কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানি মারাঠাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এই বীরত্বকে স্মরণ রাখার জন্য কোম্পানি ৬০ ফুট লম্বা একটি সৌধ নির্মাণ করে। সৌধটির চারপাশে মার্বেল পাথরের উপর ইংরেজি ও মারাঠাতে যুদ্ধে নিহত শহীদদের নাম লেখা হয়, এই তালিকায় ২০টির বেশি নাম দলিত অস্পৃশ্য মাহারদের।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনিতে মাহারদের বীরত্বের কথা স্মরণ করা দলিত নেতৃত্বের কর্মসূচির অন্যতম অংশ ছিল, যার অনুষঙ্গ অবশ্যই ছিল ভীমা কোঁরেগাও-এর বিজয়স্তম্ভ। এরকমই এক সভায় (১ জানুয়ারি, ১৯২৭) উপস্থিত হন দলিত সম্প্রদায়ের উদীয়মান নেতা মাহার পরিবারের সন্তান বাবাসাহেব আম্বেদকর। ভীমা কোঁরেগাও-এর যুদ্ধে মাহারদের বীরত্বের ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনুভব করে আম্বেদকর এটিকে এক দলিত তীর্থের রূপ দেন ও তার পরামর্শক্রমে প্রতিবছর ১ জানুয়ারি এখানে বার্ষিকী পালনের অনুষ্ঠান হয়ে আসছে।

ভীমা-কোঁরেগাও বিজয়স্তম্ভ ও জয়ন্তী পালনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিতর্ককে মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেক পণ্ডিত বলেছেন এই জয়ন্তী পালনের কোনও অর্থ হয় না। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিজয়কে নিজেদের বিজয় হিসাবে ঘোষণা করে আদতে দলিতরা ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যার শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ তুলনামূলক উদারতা দেখিয়ে বলছেন যে এক্ষেত্রে দুটি ইতিহাসের অস্তিত্ব আছে— বিষয়টি নির্ভর করে পাঠকের ওপর, অর্থাৎ মারাঠা বা মাহার, কে কোন ইতিহাসটা পড়বে তার ওপর। কেউ কেউ আবার যুক্তিতর্কের ধার না ধেরে সোজাসুজি যাঁরা দীর্ঘ সময় জয়ন্তী পালন করছেন, তাঁদের দেশদ্রোহী বলে দেগে দিচ্ছেন।

এখন কোনও ঘটনার ঐতিহাসিকতা ও তাৎপর্য বিচারের মানদণ্ড কী হবে? ইতিহাস কি সময়নিরপেক্ষ, বস্তুনিরপেক্ষ, সামাজিক প্রেক্ষাপট বিযুক্ত কোনও বিমূর্ত ধারণা? যেমন ভারতের ক্ষেত্রে দলিতদের ইতিহাস কি চতুবর্ণভিত্তিক জাতপাতব্যবস্থা ও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের একাধিপত্যের আখ্যানের মধ্যে পাওয়া যায়, না কি বিস্মরণই তার একমাত্র ভবিতব্য? এক্ষেত্রে দলিতরা ব্রিটিশদের ‘জয়’কে উদযাপন করছেন না, সেই অর্থে পেশোয়াদের পরাজয়ও মূল বিষয় নয় (এ তথ্য স্বীকৃত যে মাহার সম্প্রদায় প্রথমে পেশোয়াদের দলে নাম লেখাতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের সেই আবেদন ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করা হয়)। তাঁরা আসলে এই জয়ন্তী পালনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ‘অংশ’ হওয়ার আনন্দ অনুভব করেন। হিন্দু বর্ণব্যবস্থার শুরু এক চক্রান্তমূলক গল্পের মধ্য দিয়ে যেখানে বলা হয় বিশ্বস্রষ্টা ব্রহ্মার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, হাত থেকে ক্ষত্রিয়, উদরদেশ থেকে বৈশ্য ও পদযুগল থেকে শূদ্রদের জন্ম। তাই রামচন্দ্র কর্তৃক দলিত শম্বুক হত্যা, মহাগুরু ধনুর্ধর দ্রোণের চক্রান্তে একলব্যের পতন, পঞ্চপাণ্ডব ও রাজমাতা কুন্তীর নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে পঞ্চ সন্তান সহ এক শূদ্রানীর জতুগৃহে পুড়ে মরা মূলধারার ইতিহাসে স্বাভাবিক ন্যায়পরায়ণ জীবনচর্চার প্রতীক হিসাবে পরিগণিত। দলিতরা ইতিহাসের পাদটীকা হয়ে থেকে যায়। এই অস্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় প্রথম ভিক্ষুণী সুজাতা (যিনি জাতিগত পরিচয়ে অন্ত্যজ শ্রেণির ছিলেন), শিবাজির হয়ে রায়গড় অভিযানে অংশ নেওয়া মাহাররা বা শিবাজির পুত্র শম্ভুজির হত্যার পর অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সাধনকারী রুইদাসরা ইতিহাসের সরণী থেকে দূরে সরে যান। ভীমা- কোঁরেগাও-এর বিজয়স্তম্ভে উল্লেখিত মাহারদের নামগুলি আসলে এতদিনের চলে আসা অস্বীকৃতি ও বিযুক্তির বিরুদ্ধে সশব্দ প্রতিবাদ।

 

তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের ২০০ বছর, বাবাসাহেব আম্বেদকরের ভীমা-কোঁরেগাওকে দলিত তীর্থস্থান হিসাবে  ঘোষণার ৯১ বছর ও স্বাধীনতার ৭১ বছর পরে ২০১৮ সালে এই জয়ন্তী পালনের বিরুদ্ধে দিল্লির তখতে বসে থাকা শাসকদের প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের বর্তমান বাস্তবতাটাও বিবেচনার যোগ্য। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএ সরকারের দিল্লির মসনদে প্রতিষ্ঠা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের কাছে ছিল ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’ স্লোগানের আড়ালে রাজনৈতিক হিন্দুত্ব প্রকল্পের সফল রূপায়ণ। এই প্রকল্প সমগ্র হিন্দু সমাজকে একমাত্রিক সুসংহত একক হিসাবে দেখে এবং মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘অপর’ হিসাবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এই প্রকল্পের সব চেয়ে বড় সমস্যা হল আবহমান কাল ধরে চলে আসা হিন্দু সমাজের অন্তর্বিরোধ, বর্ণপ্রথা যার জ্বলন্ত বহিঃপ্রকাশ। দলিতরা এই পরিকল্পনার শরিক হতে পারে না কারণ উচ্চবর্ণের আধিপত্যবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত এই প্রকল্প সরাসরি দলিতদের আঘাত করে। ভারতে দলিতদের উপর আক্রমণ ও নির্যাতন কোনও নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু একই সঙ্গে একথাও মনে রাখা দরকার যে নরেন্দ্র মোদির ভারতবর্ষে দলিতদের ওপর আক্রমণের ঘটনা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে চরিত্রগতভাবে ফ্যাসিবাদী এই প্রকল্পের আরেকটি উপাদান হল কর্পোরেট আনুগত্য ও তাদের জন্য দেশের জল-জমি-সম্পদ বিক্রির ব্যবস্থা করা। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদের নীল নকশার বিপ্রতীপে অবস্থিত দলিতদের প্রতিরোধের ছবিটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা ও তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র বিদ্রোহ, গুজরাটের উনার ঘটনার বিরুদ্ধে দলিতদের ঐতিহাসিক পদযাত্রা আর ভীমা কোঁরেগাও ঘটনার প্রতিবাদে ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি সংগঠিত প্রতিরোধ অখণ্ড হিন্দু সমাজ গঠনের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। একই সঙ্গে উল্লেখনীয় পূর্ব ও মধ্য ভারতে আদিবাসীদের কর্পোরেটবিরোধী লড়াই ও অবশ্যই এদেশের নাগরিক অধিকার আন্দোলন। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রতিস্পর্ধাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাহায্যে দমন করার জন্য শাসকেরা এক ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি করতে চায়, যার বাস্তব প্রয়োগ হল এই মামলাটি।

 

ভীমা-কোঁরেগাও মামলা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে তার মূল কথা হল ম্যাসাচুসেটস স্থিত আর্সেনাল কনসালটিং তার ফরেনসিক রিপোর্টে বলেছে এই মামলার ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের প্রধান প্রমাণ হিসাবে যে চিঠিটি ব্যবহার করা হয়েছে তা আদতে বিপ্লবী কবি ভারভারা রাওয়ের ফেক আইডি তৈরি করে রোনা উইলসনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে পাঠানো হয়েছিল। ২২ মাস ধরে রোনার অ্যাকাউন্টে এই তথ্য সমাবেশিত করা হয়েছিল। এই নিয়ে বর্তমান নিবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করছি না কারণ বিষয়টি ইতিমধ্যে বহুআলোচিত (এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার জন্য শান্ত মিত্রের প্রবন্ধ, ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম দ্রষ্টব্য)। কিন্তু যারা শুরুর সময় থেকে এই মামলার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন তাদের কাছে এই খবর নতুন নয়।

একথা সবার জানা যে ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি ভীমা-কোঁরেগাও জয়ন্তী পালনকে কেন্দ্র করে অশান্তির অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকে যে এফআইআর দায়ের করা হয় তাতে গণআন্দোলনের কর্মী সুধীর ধাওয়ালে ছাড়া পরবর্তীকালে গ্রেপ্তার হওয়া আর কারও নাম ছিল না। এমনকি ধাওয়ালের ক্ষেত্রেও ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি অভিযোগ দায়ের করা হয়, তাঁর বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালানো হয় ১৭ এপ্রিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় ৬ জুন। এই দীর্ঘ সময় নেওয়ার অর্থ একটাই হতে পারে— তা হল এঁদের বিরুদ্ধে জাল সাক্ষ্য তৈরি করা। নাটকের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল এর পরে, যখন পুনের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার রবীন্দ্র কুমার ও পাবলিক প্রসিকিউটার উজ্জ্বলা পাওয়ার সংবাদমাধ্যমকে জানালেন যে অভিযুক্ত রোনা উইলসনের ল্যাপটপ থেকে পুলিশ একটা চিঠি উদ্ধার করেছে যার মর্ম হল যে অভিযুক্তরা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। এই পর্বে কীভাবে মহারাষ্ট্র পুলিশ আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করে তা দেখে নেওয়া যেতে পারে। ২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর এক নির্দেশিকায় আদালত বলে যে পুলিশ কখনও চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত কোনও মামলার তথ্য, অনুসন্ধান প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণ, অভিযুক্তদের নাম ও তাদের সামাজিক অবস্থান সংবাদসংস্থার কাছে প্রকাশ করতে পারবে না। আইনজীবী রাহুল ঠাকুরের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বলেন, প্রায়ই দেখা যায় মূল তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়ে যায়, ফলে অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, সর্বোপরি তদন্তের গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। অথচ এক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, যে মামলায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তার গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রমাণ’ চিঠিটি দুটি পেটোয়া চ্যানেলের হাতে।

এই চিঠি কেন সত্য নয় তা নিয়ে ২০১৮ সাল থেকেই বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল সাংবাদিক ও লেখক প্রেমশঙ্কর ঝা-এর প্রবন্ধ— ‘If Modi Assassination Plot Letter is Fake, Indian Democracy is in for Dangerous Times’ (outlookindia.com). এই চিঠির ছত্রে ছত্রে যে অসঙ্গতিগুলি ছিল তা প্রেমশংকর আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে কীভাবে চিঠির প্রথম অংশে জনৈক R রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সমস্যা ও কর্মীদের কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারপর হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বন্দুক ও গুলির জন্য ৮ কোটি টাকা চেয়েছেন। যে চিঠিতে মোদিকে হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেই একই চিঠিতে সহমর্মী সংগঠন, রাজনৈতিক দল, দলিত ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে ঐক্যের প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছে। একটি নিষিদ্ধ ও গোপন সংগঠনের চিঠিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও তাদের কমরেডদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কোন গোপন সংগঠনের কর্মী কি এভাবে কাজ করে? আমরা প্রবীণ সাংবাদিকের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত যে চিঠিটি জাল। তখনই অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে আগামী দিনে আরও জাল চিঠি, ছবি, ভিডিওকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আরও জোরলো হবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। পরের পর্বে গ্রেপ্তারির ঠিক আগে বিশিষ্ট আইনজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের বন্ধু সুধা ভরদ্বাজের নামে একটি জাল চিঠি সারাদিন ধরে কিছু নির্বাচিত মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী গৌতম নওলাখাকে গ্রেপ্তারের সময় দিল্লি হাইকোর্টকে না জানিয়ে অতিমারির সময় তাকে পুনাতে স্থানান্তর করা হয়। এই মামলায় বন্দীদের চিকিৎসার ব্যাপারে বারবার উচ্চ আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এইভাবে ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস, মিডিয়া ট্রায়াল সব নিয়ে ভীমা কোঁরেগাও হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় রাইখস্ট্যাগ।

 

ভীমা-কোঁরেগাও মামলাকে কেন ভারতের বর্তমান শাসকেরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের ক্ষেত্রে একটা উদাহরণ হিসাবে স্থাপন করতে চাইছে তা বোঝার জন্য ২০১৪ পরবর্তী ঘটনাগুলোর দিকে নজর ফেরানো দরকার। যে কোনও সরকার-বিরোধী কণ্ঠস্বরকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘আর্বান নকশাল’ তকমা মেরে প্রথমে পেটোয়া মিডিয়ার সাহায্যে তাকে জনমানসে গণশত্রু প্রতিপন্ন করা, তারপর সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতা প্রভৃতি অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে দানবীয় ইউএপিএ আইনে মামলা দায়ের করে জেলবন্দি করার একটা চেনা কৌশল নয়া নাগরিকত্ব বিরোধী আন্দোলন, দিল্লি দাঙ্গার সময় প্রতিবাদী নাগরিক উদ্যোগ বা কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনের সময় লক্ষ করা যাচ্ছে। আইন বিষয়ক ওয়েব পোর্টাল ‘Article 14’ তাদের সমীক্ষায় দেখিয়েছে—

  • গত দশকে (২০১০-২০) যত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছে তার নব্বই শতাংশ হয়েছে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর।
  • ইউপিএ সরকারের তুলনায় এনডিএ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ শতাংশ।
  • ২০১০ সাল পরবর্তী উত্তরপ্রদেশে ১১৫টি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছে, এর মধ্যে ৭৭ শতাংশ হয়েছে যোগী আদিত্যনাথের সময়।
  • সাম্প্রতিক সময়ে কৃষক আন্দোলনে ৬টি, নাগরিকত্ব-বিরোধী আন্দোলনের সময় ২৫টি, হাথরাস গণধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় ২২টি ও পুলওয়ামার ঘটনার সময় ২৭টি রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে (সমস্ত তথ্য ২০২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত)।

আবার ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে ইউএপিএ আইনে ২০১৪ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ২৮৩৩ যা ২০১৯ সালে হয়েছে ৫,১৩৪। এই সমস্ত কিছু দেখে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি  মদন লোকুর মন্তব্য করেছেন— “It is now clear (from these data) that the law is not being misused, but is being abused.” এই গোটা পর্বে আমরা দেখেছি সরকারি নীতির বিরুদ্ধে সরব হলে, তা তিনি মানবাধিকার কর্মী হোন বা নাট্যকর্মী, কবি বা সাংবাদিক, কৌতুক শিল্পী, চিকিৎসক বা পরিবেশকর্মী— রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অনিবার্য লক্ষ্যবস্তু তিনি। এই ফ্যাসিবাদী প্রকরণের সূচনাবিন্দু হিসাবে ভীমা-কোঁরেগাও ষড়যন্ত্র মামলা চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...