অগ্নিবলয়: আত্মানুসন্ধানের আলোকিত বর্ণমালা

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

 

চাঁদ ভেসেছিল একা, ভালবেসেছিল,
ছাদ হয়ে তারাজ্যোৎস্না, অশ্রুর আড়ালে
বছর বছরগুলি জলের মতোন
আঙুলের ফাঁক দিয়ে কালসিন্ধু পানে ছুটে গেল।

অগ্নিবলয় পড়তে পড়তে এই কবিতাটির কথা  মনে পড়ল আমার। কবি তৃষ্ণা বসাকের টাইম মেশিন কবিতার কয়েকটি উজ্জ্বল পংক্তি। কেন মনে হল এই কথাগুলো? আসলে আমরা সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছি এক আশ্চর্য ভূমি। এই অনুসন্ধানই আমাদের জীবনপথ। সময় থেকে সময়ান্তরে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে টাইম মেশিন। আঙুলের ফাঁক দিয়ে কালসিন্ধু ছুটে যাচ্ছে। কবি ঔপন্যাসিক বা শিল্পী তো সময়ের ছবিই তুলে আনেন তাঁর লেখায়। এই সময় আবহমান সময়। অগ্নিবলয় পড়তে পড়তে তাই অনিবার্যভাবে মনে এল লাইনগুলি। মাথার ভেতর যেন সময়ের  নিঃসীম আগুনের অমোঘ অলাতচক্র।

অগ্নিবলয় সাহিত্যিক তৃষ্ণা বসাকের পঞ্চম উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রভূমিতে রয়েছে অ্যালিসিয়া নামের একটি মেয়ে। তবু এই গল্প  নিছক অ্যালিসিয়ার কাহিনি হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে এক অগ্নিময় সময়ের অনুভূতি এবং এক রহস্যভূমির অনুসন্ধান। যে বিস্ময়ের সূচনা একটা কাঠের বাক্সের দিকে তাকিয়ে।

অ্যালিসিয়া দেখছে “ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স, কালোর উপর সোনালি, লাল, সবুজে আঁকা ফুলফললতাপাতার অপূর্ব কারুকাজ। ওর ঢাকনা খুললেই যেন বেরিয়ে পড়বে সম্পূর্ণ অজানা অদেখা রহস্যময় এক দেশ।” উপন্যাস খুলে যাচ্ছে সময়ের এই ঢাকনা সরিয়ে।

স্টেলার পার্কে আগুন লাগার ঘটনার মধ্য দিয়ে কাহিনির শুরু। সেই আগুনের ভেতর নিজের দগ্ধ অতীতের শেকড় খুঁজে পেয়েছিল অ্যালিসিয়া। এ এক আশ্চর্য আগুন, “সে আগুনের জ্বলন আরও তীব্র। ক্রায়োজেনিক নাইট্রোজেনের মতো সে আগুন ক্ষত পোড়ায় না, বাড়িয়ে তোলে।” এ আগুন এমনই আগুন যা “৯১১ টিপলেও নেভানো যায় না”।

উপন্যাস পড়তে পড়তে আমরা পেরিয়ে আসি অনেকগুলি স্তর, অনেকগুলি বলয়। বহুমাত্রিক দিগন্তে ছড়িয়ে যায় ভাবনা। আমেরিকার সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে কলকাতায় নিজের শিকড় খুঁজতে এসেছে অ্যালিসিয়া। তার সঙ্গে একই প্লেনে সহযাত্রী হয়ে কলকাতায় এসেছে আর্মেনিয়ান মেয়ে কেট ম্যাকনিল। প্লেনে কেট এবং তার সিট ছিল পাশাপাশি। এই অবস্থান শুধু তাদের উড়ানের নৈকট্য নয়। এই নৈকট্য আরও গভীর তাৎপর্যবাহী।

কেট কলকাতায় তার  আর্মেনিয়ান জাতিসত্তার শিকড়সন্ধানী। দুজনেরই বাবামায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তাদের যন্ত্রণার রেখচিত্র মিলিত হয়েছে একই ছেদবিন্দুতে। এই সমীকরণ গল্পবৃত্তে আত্মিক বন্ধনের ইঙ্গিত পরিস্ফুট করেছে। তাদের ভাবনা, তাদের উদ্দেশ্য, তাদের অভিমুখ যেন পাশাপাশি  হাতে হাত রেখে পেরিয়ে আসছে দীর্ঘপথ। তাদের যাত্রাপথে ঢুকে যাচ্ছে পার্ক স্ট্রিটের একটি বহুতল স্টেলার পার্কের ভয়ঙ্কর দৃশ্য। যার বর্ণনা তৃষ্ণার কলমে উঠে এসেছে এভাবে—

টপফ্লোর দুটোয় আগুন লেগেছে। বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে গোটা চত্বর। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। তার মধ্যে অ্যালিসিয়া দেখল, ছ’তলার কার্নিশে বিপজ্জনকভাবে বসে একটা লোক পাগলের মতো একটার পর একটা ফোন করে যাচ্ছে। ওকে, ওকে এক্ষুণি বাঁচানো দরকার। অ্যালিসিয়া অস্থির হয়ে চারদিকে তাকাল। ওর চারপাশে অনেক লোক। সবাই ওর মতোই ছটফট করছে। কেউ কেউ মোবাইলে পটপট ছবি তুলছে লোকটার।

সময়ের বিষাক্ত ধোঁয়ায় চেনা যাচ্ছে না লোকটার মুখ। অ্যালিসিয়া এই আগ্নেয় ঠিকানার সামনে দাঁড়িয়ে। তার মনে

হঠাৎ একটা অ্যালবাম খুলে যায় ভেতরে কোথাও। সবুজ পার্ক, দুধসাদা পালকের মতো নির্ভার এক বালিকা। লাল বেঞ্চের এককোণে, এই দৃশ্যপটের কিছু গায়ে না-মেখে বসে আছে ছোট্ট অ্যালান। মেয়েটা খেলা শেষ করে তাকে ধরে ধরে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। পার্ক থেকে বেরিয়ে দুটো ব্লক পেরোলে তাদের বাড়ি। সামনে একটা মেপল গাছ। গাছটা দেখলেই তার মনে হয়, বাড়ি এসে গেছে। সেই বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে সেদিন থমকে গেল তারা। আগুন যেন গ্রাস করেছে বাড়িটাকে। ঠাণ্ডা সে আগুনের জ্বলন আরও তীব্র।

কাহিনির পরিসরে আছে অনেকগুলি অসমাপ্ত বৃত্ত। একদিকে সত্তরের দশক, মুক্তির দশক। গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার অগ্নিবর্ষী আহ্বানের মধ্য দিয়ে নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়। বন্দুকের নলই যখন শক্তির উৎস, সেই সময়ের  দুটো পরিবারের গল্প এখানে আছে। এক পরিবারের তিন ভাই। যাদের মধ্যে বড়ভাই বিশ্বদেব মুখার্জি মার্কিন মুলুকের রেডিও ফিজিক্সের লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিজ্ঞানী। যুক্তিমনস্ক বস্তবাদী মানুষ বিশ্বদেবের চেতনার রূপান্তর তাকে ভিন্ন সত্তায় বদলে দেয়। দেশে ফিরে জ্যোতিষচর্চা ও তন্ত্রমন্ত্রে আস্থাশীল হয়ে ওঠে সে। বুদ্ধদেবও দাদার পথ অনুসরণ করে রেডিও ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করতে যায় বিদেশে। দুর্ঘটনায় চোখ নষ্ট হলে দেশে  ফিরে আসে। ছোটভাই আনন্দ নকশাল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সমাজবদলের স্বপ্ন তার চোখে। আনন্দের হারিয়ে যাওয়া এই কাহিনিকে বাঁক দিয়েছে। নিরুদ্দেশ হলেও সে বেঁচে আছে  কোথাও। তাকে খুঁজে পেতে পথ থেকে ভিন্নপথে নেমে এসেছে দাদা বিশ্বদেব।

অন্য পারিবারিক বৃত্তে আমরা পাই বিমান তার বোন মৌসুমী, তার বাবা, মা, এবং তাদের সেজকাকা অমর ভট্টাচার্যকে। অমর চরিত্রের জীবনজিজ্ঞাসা, তন্ত্রমন্ত্র এবং গতিজাড্যের এক আশ্চর্য সমীকরণ তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

আনন্দকে খুঁজতে তন্ত্রমন্ত্রের দুনিয়ায় অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে দাদা বিশ্বদেব। নিজের ঐতিহ্যের শেকড় খুঁজতেই আমেরিকার সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে ছুটে এসেছে অ্যালিসিয়া। এসে কলকাতায় সে দেখছে তার দগ্ধ অতীত।

এই কাহিনির ভেতর বিভিন্ন চরিত্রের বর্ণময় কোলাজ। আছে অচিন রায়ের মতো প্রতিবাদী কবি। শব্দের মগ্ন সাধনায় যে তাচ্ছিল্য করতে পারে সমস্ত পার্থিব চাহিদা।

অগ্নিবলয় উপন্যাসে মানুষের শিকড়ের অনুসন্ধান, আত্মানুসন্ধান এবং ঐতিহ্যের অনুসন্ধানের পাশাপাশি আছে এক বিস্ময়ভূমির অনুসন্ধানও। সমগ্র উপন্যাসের বুনন টানটান, গতিশীল থ্রিলারের মতো। আশ্চর্য জাদুকৌশল সঞ্চারিত হয়েছে সমগ্র উপস্থাপনায়। ভাষার সুনিপুণ শৈলী গল্পের শরীরে শুধু অলঙ্কার নয়, প্রাণের দ্যোতনাও সরবরাহ করেছে। দর্শনে রয়েছে স্বচ্ছ এবং সময়চ্যুত ভাবনার বিস্তৃতি। অদ্বৈত অর্থময়তায় যা আমাদের তন্ময় করে দেয়। উপন্যাসের ব্লার্বে দ্বিধাহীন অক্ষরে উঠে এসেছে গল্পের নিউক্লিয়াস—

এই উপন্যাস একদিকে যেমন অগ্নিবলয় পেরিয়ে বহুতর অন্বেষণের এনট্রপি, তেমনই এর পরতে পরতে এক অনাবিষ্কৃত কলকাতা, তার রহস্যময় গলি, উত্তাল সত্তর দশক, হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মানুষজন— সবই যেন জীবন আর মৃত্যুর মাঝের কোনও অনিশ্চয় ধূসরতায় আঁকা। হলুদ তুলোট কাগজের জন্মপত্রের মতো অলীক আয়ুর স্বপ্ন আর জলের মতো মোছা স্বপ্ন।

জীবন এক রহস্যের নাম। এর বাঁকে বাঁকে অনিশ্চয় ধূলিপথ। অন্ধকারে ঢাকা আছে অনন্ত আগামী। এর কোনও ছক নেই, তত্ত্ব নেই, ব্যাকরণ নেই। অগ্নিভয়, জন্মকুণ্ডলীর জাদুবাক্সের ঢাকনা খুলে অমর ভট্টাচার্য বিশ্বদেবকে জানিয়েছিল এই অনিবার্য নিয়তি। আগুনের বলয়ের মধ্যেই শেষ হয়েছিল বিশ্বদেবের জীবনচক্র।

কমিউনিটি লিভিং থেকে আরম্ভ করে আর্মেনিয়ান মিথ, ভারতীয় সংস্কৃতি— সবকিছু মিলেমিশে গেছে এক আশ্চর্য জাদুবাক্সে। এই উপন্যাস সেই বিস্ময়ভূমিরও অনুসন্ধান।

অগ্নিবলয় । তৃষ্ণা বসাক । আকাশ । প্রচ্ছদ – অভিজিৎ রায় । মূল্য – ১৫০ টাকা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...