করোনাকালে

করোনাকালে -- অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

 

একজন লোক ধান মাথায় চাপিয়ে চলেছে ঘরের পথে। বাইকে বসে দেখছি। ধানের পাঁজামাথায় লোকটা চলে যাচ্ছে আলপথ দিয়ে, এঁকেবেকে। এই সময় অঘ্রানের মিষ্টি রোদ, কমলালেবুর মত রং— বিছিয়ে আছে ধানমাঠে। ওদিকের ধান উঠে যাওয়া মাঠে ছেলের দল মাস্কহীন অবস্থায় ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। এদিকে সরু আলপথে চলমান একটি রোগা, লম্বা চাষি, লোকটা নুয়ে আছে, ধানও নুয়ে আছে মাটির প্রতি। পৃথিবীও নুয়ে যাচ্ছে মাটির প্রতি। কুয়াশা মুড়ে ফেলছে মাটিকে। মাটি মুড়ে ফেলছে আমায়। সেই মাটি, যা ছুঁয়ে থাকে জ্যোতিকে।

জ্যোতি বুঝে ফেলেছে, আমি ওকে ভালোবাসি।

এই বোঝাটা তার উপর। আমি তাকে বুঝতে দিইনি। জানতেও দিইনি। কিন্তু তবু যদি সে বুঝে ফেলে জীবনের সার সত্যটুকু, আমার কী দোষ? আমি কেবল তাকে ভালোবেসে গেছি। তার দিক থেকে কোনও কিছুরই প্রত্যাশা করিনি। তবু সেই ভালোবাসার কুয়াশা যদি তাকে ঘিরে ধরে, বাতাসে ভেসে তার কাছে পৌঁছে যায় করোনাভাইরাসের মতন— আমার কী-ই বা করার আছে! বাইকের উপর বসে আমি সেই কুয়াশা নামা দেখি। দেখি মানুষজন পাকা ধান কেটে নিচ্ছে শেষ বিকেলের আলোয়।

অথচ এই কিছুদিন আগেও, এই ধানগুলি কাঁচা ছিল। কাছে গিয়ে দেখে এসেছি আমি, সেই ধানের উপর ফড়িং ওড়ে। বড় বড় ফড়িং। উড়তে উড়তে তারা অনেকটা উপরে চলে যায়, কোথাও ঘুরতে ঘুরতে ফিরে আসে তারা ধানের মায়ায়। বা জ্যোতির টানে।

আমাকে একবার বলেছিল জ্যোতি, ওই যে জমিগুলি দেখছ, সেখানে আমাদের জমি আছে। একফালি জমি, কিন্তু তাতে ধান ফলে।

আমি অবাক হয়ে বলি, জমি যতই একফালি হোক না-কেন, তাতে ধান ফলতে বাধা কোথায়? অমনি একগাল হেসে জ্যোতি মাথা নাড়ে। বলে না-না, সেকথা নয়—

–তবে?
–আসলে ওই ধানগাছ…
–আসলে কী?

সেদিন অত ধানের ভেতর সেই একফালি জমিকে আমি আলাদা করে নিতে পারিনি। কী করে করব? একই উচ্চতায় ধানগাছ বেড়ে উঠেছে আর সেখানের ফড়িংদের ধরে খাবার জন্য বাতাসে ডিগবাজি খাচ্ছে বাঁশপাতি পাখিরা। কতশত পাখি তারা। ফড়িংও প্রচুর। ফলে এই যে ফড়িং কমে যাচ্ছে, সেটা যেমন ফড়িংরা বুঝছে না, আমিও বুঝছি না। শীতের বাতাস দিচ্ছে, গা একটু শিরিশির করছে আর ভাবছি জ্যোতি কী করছে এখন?

জ্যোতিকে আমি ভালোবেসেছি অনেকদিন। হয়তো জ্যোতিও সেই থেকেই আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি বোকাসোকা মানুষ— সেটা বুঝলাম দেরিতে। তাতে মুশকিল হল এই যে, জ্যোতির বাড়ির সামনে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। ওর বাড়ি থেকে বের হওয়া, বাড়ি ফেরা আর দেখতে পারি না। একটু দূরে দাঁড়াই। এখান থেকে ওদের পাড়ার গলিপথ চোখে পড়ে।

এদিকে দাঁড়িয়ে থাকলে হোগলাবন চোখে পড়ে। বর্ষার দিনে লোকালয়ের জল চলে যেত হোগলার বনে। বর্ষা শেষ হল এই তো সেদিন! বর্ষা শেষ হতে না-হতেই হেমন্তকাল পড়ে গেল। ধান পাকতে শুরু করল। খেয়াল করে দেখেছি, প্রতিদিনই তারা রং পাল্টায়। আর একেবারে পেকে লাল-হলুদ হয় যখন, মনে হয় নবান্ন এল বুঝি। জানি না জ্যোতিদের বাড়ি নতুন ধানকে সাদরে বরণ করে নেওয়া হয় কিনা।

একটা লোক উবু হয়ে বসে আছে একটি জমির পাশে। একবার বসছে, খানিক পর দাঁড়াচ্ছে। তার সামনের জমির ধান এখনও লাল-হলুদ হয়নি। সবুজ-হলুদ হয়ে আছে। লোকটা আসলে তার জমি দেখছে। ধানগাছ পরীক্ষা করছে। সবার ধান ঘরে উঠে যাচ্ছে, তার ধান এখনও তৈরি নয়। সে কবে কাটবে ফসল? কবে তুলবে সোনার ধান? সে চিন্তিত। এমনি করে তাকিয়ে আছে ধানগাছদের প্রতি যেন সে দেখছে নিজের সন্তানদের। এদিকে আকাশের অবস্থা ভালো নয়। বৃষ্টি হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। হেমন্তে বৃষ্টি হলে, অনেক ধানের বিপদ। যারা সেদিনই ধান তুলে নিতে পারেনি, ফেলে রেখেছে জমিতেই। পাঁজা করে পড়ে আছে সে-সব। যাদের লোকবল আছে, তারা ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। সত্যি বৃষ্টি এলে মাটিতে শুইয়ে রাখা ধানের বিপদ।

আদরের সঙ্গে নিজের জমির এই যে ধান দেখে যাচ্ছে লোকটা— এ কি জ্যোতির বাবা হতে পারে? জানা নেই। আমি জ্যোতির বাবাকে কোনওদিন দেখিনি। চিনিও না। শুনেছি তিনি কাজ করতেন একটি জুটমিলে। সেটি বন্ধ হলে একটি গেঞ্জিকলে কাজ নেন। আর টুকটাক চাষ করেন। ছিপ নিয়ে মাছ ধরেন। না, তার কোনও মোবাইল নেই।

বাইক লক করে লোকটার কাছে যাই। তিনি বাঁকা চোখে তাকান। খানিক দেখেন আমাকে। বলেন, জমির দালাল নাকি? এখানে কী মনে করে?

–না না, আমি হেসে ফেলি।
–তবে? সন্দিগ্ধ চোখের দৃষ্টি তাঁর।
–এমনিই। খুব সুন্দর ধান ফলেছে। এটা কি আপনার জমি?
–হ্যাঁ। পরের জিনিসকে আদর করতে যাব কেন?

আচ্ছা ঠ্যাঁটা লোক তো! দূর তাকিয়ে দেখি, সেই ধান মাথায় চাষি চলে গেছে গ্রামের আড়ালে। ভদ্রলোক নিজের খেয়ালেই বলেন, আসলে কী জানেন, এবার এদিকের জমি আর হয়তো রাখা যাবে না। ওই যে রাস্তাটা বাঁধিয়ে দিল সুন্দর করে, উঁচু করল— অমনি জমিহাঙরদের নজর এদিকে ঘুরে গেল। দিল্লি রোডের দিকে আর কোনও জমি বাদ নেই। বাইরে থেকে দেখতে হোগলার বন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সব বিক্রি হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সব ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে কী হবে বলুন তো? সেই জলা-জঙ্গলে যেসব প্রাণী বাস করত— তারা হয় মারা যাবে নয় পালাতে চেষ্টা করবে। পালিয়ে তারা যাবে কোথায়? এখানে আসবে কিছু। আর এখানেও জমির দালাল ঘুরছে, অনেক টাকার লোভ দেখাচ্ছে— মানুষ লোভী জাত, কতদিন জিভের ঝোল টানবে বলুন?

–তাই বুঝি আমাকে জমির দালাল বলে মনে হল?
–একদম। কারণ বেশ কদিন ধরে দেখছি আপনি বাইক নিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুর করছেন। কিছু মাতাল, ধান্দাবাজ ও আয়েশি লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করছেন। তাই বলা।

কোনও উত্তর দিলাম না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি মিঠে রোদে আমার লাল বাইকটি গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর ওদিকের নয়ানজুলিতে দু হাতে ছিপ ফেলে উবু হয়ে বসে আছে সেই মাতাল লোকটা।

ভদ্রলোক সেটি খেয়াল করে বললেন, ওকে দেখলেন? ওর কথাই আমি বলতে চাইছিলাম। মুখে অনেক বড় বড় কথা বলে, এদিকে অকম্মার ঢেঁকি সব! এইসব করে সংসার চলে? লকডাউনের সময় বললাম, এখন তোদের হাতে কাজ নেই— আমার জমিতে কাজ কর, টাকা দোব কিছু। তোর কিছু হবে, আমারও পরিশ্রম কমবে। করলই না!

বলে তিনি হাত উল্টে দিলেন। কৌতূহলী হয়ে বললাম, কেন?

–ও বলল, ও একজন লেবার, লেবারই থাকবে। চাষি হবে না।
–অ্যাঁ!
–বুঝুন! নেহাত ওর বউটা স্কুলে রান্না করে, তাই চলে যাচ্ছে। লকডাউনে স্কুল নেই বটে, তবে বউটা কর্মঠ— সংসারের জন্য খাটে। ওই চালায়। আর এই মিনসে মাল খায় আর মাছ ধরে। বদের কাঁড়ি একটা!
–ওর একজন সাঙাত আছে।
–জানি। সে আরও তিলে খচ্চর! নিজেকে বড় মিস্তিরি ভাবে, এদিকে অকম্মার ঢেঁকি! এমনি মুখে কথা বলবে, ঘাড় নাড়বে— যেন ওর বোঝার বাইরে কিছু নেই। এদিকে মাসের মধ্যে আদ্দেক দিন ঘরে বসেই কাটায়। আর এখন লকডাউনে পুরো বসে।
–সে আর আসে না দেখি।
–দেখেছি। কে জানে তার আবার কী হল। ও থাকে ওই সামনের বাগদি পাড়ায়। ওদের তো জীবনধারণের কোনও ছিরিছাঁদ নেই। সেদিন দেখলুম দুদল মারপিট করেছে, পাড়ায় বিশাল জটলা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশগাড়ি। একজন পুলিশগাড়ির বনেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ঝামেলা দেখছে।
–জ্বর হয়েছে বলছিল তো।
–কোভিডবিধি তো মানে না। দেখুন গে, করোনা হয়ে মরল কিনা! আজকাল আর কেউই মানে না! এদিকে ইংলন্ডে করোনার নতুন স্ট্রেন দেখা দিয়েছে, হাজার হাজার লোক মরছে। বড়দিনে চিড়িয়াখানায় দেখুন, ভিড় আটচল্লিশ হাজার লোকের! ভাবতে পারছেন কী অবস্থা? পজিটিভ হলে সব রাস্তায় পড়ে মরবে— অত হাসপাতাল কোথায়, বেড কোথায়, ডাক্তার কোথায়? করোনা হবে বলে আমরা ভয়ে ভয়েই সারা হয়ে যাচ্ছি!
–এই বাড়ি আপনার?
–হ্যাঁ।
–বাড়িতে বেশ বাগান করেছেন দেখছি। কলাগাছে কাঁদি এসেছে। লাল বস্তায় মুড়ে রেখেছেন।
–হুম! এই প্রথম যেন খুশি হলেন ভদ্রলোক। মাস্কের আড়ালে হাসি দেখা গেল যেন। বললেন, পেঁপেও ধরেছে।

বললাম, বাজার যান?

–নাঃ! তিনি জোরে জোরে ঘাড় নাড়লেন। বলেন, ভ্যানে করে ঘুরে ঘুরে বাজার নিয়ে আসে একজন। যা লাগে তার কাছ থেকেই নিই। আর রেখে দিই ওই চালাটায়।

বলে তিনি আঙুল তুলে দেখালেন। দরমার একটা ছোট্ট ঘর করা আছে বাসস্থানের লাগোয়া। টালির চাল। টিনের দরজা। তাতে তালা মারা। বললেন, আমার জমির ফসল ওখানেই রেখে দিই। নিই আর খাই। বাইরে থেকে যা কেনা হয়, সেও ওখানেই থাকে। একদিন রেখে পরদিনে গরমজলে চুবিয়ে ধুয়ে তার পর কাটাকুটি ধোয়াধুয়ি— কিচ্ছু করার নেই— করোনার হাত থেকে বাঁচতে আমাকে এই উপায় নিতে হয়েছে। করোনা চলে গেলে আবার বারান্দায় সবজি ফেলে কাটাতে বসব।

–কাজের লোক?
–ছাড়িয়ে দিয়েছি। করোনার সময় ওসব আপদ ঘরে ঢোকায়! মাথা খারাপ হয়ে যায়নি আমার। খবরের কাগজও সেই থেকে বন্ধ। এখন যা খবর দেখা ও পড়া— সবই টিভিতে। তবে কাজের লোক থাকলে ভালো হত। স্ত্রীর শরীর খারাপ, পুরোটা একা পারে না, আমি সাহায্য করি।
–আর মাছ?
–একটি বুড়ি আসে। সেই কড়া লকডাউনের সময় রুই, কাতলা, চারামাছ খেয়েছি খুব। কেটে ধুয়ে দিয়ে যায়। একঘন্টা গরমজলে ফেলে রাখি মাছের টুকরোগুলো। তার পর ধোয়া আর রান্না। এছাড়া ঘরে চাল ছিল, আমার জমির, অসুবিধে হয়নি। রাস্তার ওদিকে একটা মুদিখানা আছে, সেটাই সকালে আর সন্ধের দিকে একঘন্টার জন্য খুলত। গ্রামেরই ছেলে। ওখান থেকেই মালপত্র নিই। আর এখন শীতের মরশুম, সেই বুড়ি রোজ ভোলামাছ আনে। বর্ষায় যেমন ইলিশ খেতে পারিনি, এই শীতেও ভেটকি জুটবে না। বাজারে না গেলে ওসব হয় না। এই বুড়ির রেস্ত কম, ওসব মাছ তুলবে কেমনে? একটা সিলভারের হাঁড়িতে করে মাছ আনে, মাথায় চাপিয়ে। ঘুরে ঘুরে বেচে। আমরা কজন তার বাঁধা খদ্দের।
–বাড়ির সামনে তো উঠোন আছে। আর এখানের জমি তো উর্বর। সেখানে কিছু লাগান না?
–বেগুনগাছ করেছি কিছু। তাছাড়া সবজি চাষের ঝামেলা আছে। সব সময় পেছুতে লেগে থাকতে হয়। কিন্তু বড় গাছের পিছনে সময় দিতে হয় না। তাই পেঁপে, কলাগাছ। পুজোর জন্য জবাগাছ। এই—
–ছেলে মেয়ে?
–এক মেয়ে, জামাই আইটি সেক্টরে কাজ করে। কিছুদিন আগে, মানে পুজোর আগে তার এক কলিগের করোনা হল। সেই কলিগ আবার জামাইয়ের একদম পাশের টেবিলেই বসে। খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম, জানেন। জামাই যদি পজিটিভ হয়ে যায়, ওদের একটি ছোট বাচ্চা আছে, বছর চারেক বয়স, তার কী হবে? জামাই কোরেন্টাইনে ছিল পনেরোদিন। ঈশ্বর সহায়, জামাইয়ের কিছু হয়নি। আবার কাজে জয়েন করেছে।

বললাম, এখন কি ওয়ার্ক ফ্রম হোম বন্ধ হয়ে গেছে?

–ওদের হয়েছে। ঘর থেকে আর কতদিন চালাবে? পুজোর আগেই হয়েছে। আর তখনই তো জামায়ের কলিগ পজিটিভ হল। সে নিয়ে কী চিন্তা আপনি ভাবতে পারবেন না। উফ, যা দিন গেছে!
–মেয়ে-জামাই আসে?
–নাঃ, আমিই বারণ করেছি। বলেছি সব মিটলে আসতে। যদিও জামাই গাড়ি কিনেছে এই লকডাউনেই, লাল টুকটুকে চারচাকা, বলেছি সব মিটুক, তার পর গাড়ি দেখাতে আসিস। তোরা ভালো থাক, আমরাও থাকি। ভিডিও কলেই কথা হয়। সেইভাবেই গাড়ি দেখলাম। এই ভালো, কী বলেন? আচ্ছা, আপনার পরিচয়টা কী? জমির দালাল যে নয়, সেটা আগেই জেনেছি। আপনি এই কোভিড পরিস্থিতিতে রোজ ঘুরে বেড়ান এখানে, কেন?
–আসলে— বলে একটু কেশে নিই। এদিক-ওদিক দেখি। অজস্র পাখিরা ইচ্ছেমতো দলবেঁধে ধান উঠে যাওয়া মাঠে নামছে আর হইচই করে উড়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে যেমন শালিক আছে, তেমনি আছে পায়রা, ঘুঘু, ছাতারে। মনে পড়ল। আমাদের পাড়ায় আজ একজন কোভিড পজিটিভ হয়ে মারা গেছেন। তিনি আমার ছেলেকে খুব ভালোবাসতেন। রোজ একটা না-একটা ফল কিনে আমার ছেলের জন্য নিয়ে আসতেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকতেন। ছেলের হাতে দিতেন। ভদ্রলোকের হার্টের অসুখ ছিল। কোভিডের ধাক্কা আর সামলাতে পারেননি। কো-মর্বিডিটি। হার্টিফেল করেই মারা যান।

বলি, আমার জীবিকা বলতে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারি।

–ও, বুঝেছি। এখন স্কুল বন্ধ থাকলেও আপনাদের তো হাজিরা দেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। সেই যাতায়াতের ফাঁকে দাঁড়ানো— এই তো?
–হুম।
–তাছাড়া নানারকম সরকারি ভাতা ও কার্ডের জন্য স্কুলবাড়িকেই ব্যবহার করা হয়। বাঁশ ঘিরে মাইক বাজে, রবীন্দ্রনাথ বাজেন। বেশ ব্যবস্থা।

ঘাড় ফিরিয়ে তাকাই। সেই মেছুড়ে। দিব্ব্যি বসে আছে ছিপ নিয়ে। ফাতনার দিকে দৃষ্টি স্থির। বাতাসে তেমনি রোদ ভেসে আছে। বকেরা উড়ছে। অনেক উঁচু আকাশে চিলও উড়ছে। কে জানে, আজ কত মাছ তার কপালে জমা হল।

ভদ্রলোক বললেন, তা বেশ। আমি হেলথে ছিলাম, জানেন। একটি হাসপাতালের বড়বাবু। পাঁচ বছর আগে অবসর নিয়েছি। সেই থেকেই এই জমি, বাগান আর মাঠের ধার, হোগলাবন নিয়ে বেশ কেটে যায়। দুটি ঘর, এই বেশ। একতলা দোতলা করিনি, কী হবে? একটা ছেলে থাকলে ভেবে দেখতাম, নেই যখন—

তাঁকে থামিয়ে বললাম, তাই আপনি হেলথ নিয়ে এত সচেতন।

ভদ্রলোক হেসে বলেন, তা কথাটা অস্বীকার করব না। আমি কোথাও যাই না, এই মাঠটুকু ছাড়া। আর আমার বাড়ির পাশেই মাঠ, তাই আমার কোনও বিপদ নেই। কেউ না-থাকলেও আমি মাস্ক পরেই বের হই। তবে এর খারাপ দিকও আছে।

–কীরকম?
–জানেন, আমার মেজভাই সেদিন এসেছিল। বাড়িতে ঢুকতে দিইনি, জানালা দিয়ে কথা বলে খেদিয়ে দিয়েছি। ওর কিডনিতে পাথর হয়েছে, সেটির জন্য কষ্ট পাচ্ছে, অপারেশন দরকার, যদি মেডিকেলে কিছু করে দিতে পারি— সেই জন্য এসেছিল। কিন্তু মেডিকেল তো এখন কোভিড, আমি কী করব? তাছাড়া চাকরি হয়ে গেছে অনেকদিন হল। এখন তারা আমার কথা শুনবে কেন। চেয়ার চলে গেলে আর যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, সেটা যারা চাকরি না-করেছে তারা বুঝবে না। সেই কথাই ওকে বুঝিয়ে বললাম। ও চুপচাপ চলে গেল। বুঝলাম, ও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাছাড়া ওকে বসতে বলিনি, বুঝতে পারছি ভাইয়ের খারাপ লেগেছে কিন্তু কিছু করার নেই। এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল ঘুরে বেড়াচ্ছে— এই অবস্থায় ওকে বাড়িতে ঢোকানোর জন্য রিক্স নিতে পারিনি বুঝলেন। এই বাড়িতে আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে দুজনে থাকি। যে কেউ একজন এফেকটেট হলে দুজনকেই মরে পড়ে থাকতে হবে। এগিয়ে আসার কেউ নেই— কেউ দেখবে না, এই প্যান্ডেমিক সিচুয়েশনে কাউকে ডাকাও যাবে না। কোভিড নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মরছে কারা বলুন তো? পুলিশ আর হেলথের লোক। এরাই তো সামনে থেকে লড়াই করছে। তবে একটা জিনিস কী জানেন তো, কোভিড নিয়ে শহরের তুলনায় গ্রাম কিন্তু কম এফেকটেট। আপনি পরিসংখ্যান দেখুন— আমার কথার মিল পাবেন। হয়তো খোলামেলা পরিবেশের জন্য। আমাদের এই গ্রামে আজও পর্যন্ত একজনও করোনা আক্রান্ত হয়নি।
–এই যে আমার সঙ্গে কথা বলছেন, ভয় করছে না? আমি জানতে চাই।
–না। খেয়াল করে দেখেছেন কী, আমি কিন্তু আপনার থেকে ছয় ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছি। দুজনের মুখেই মাস্ক। আমার হাতে গ্লভস। তাই পজিটিভ হওয়ার চান্স কম। ঘর ঢুকে নিজেকে পুরো স্যানিটাইজ করব। তাছাড়া আপনি শিক্ষক মানুষ, সচেতন ব্যাক্তি। বাইক নিয়ে যাতায়াত করেন— পাবলিক ট্রান্সপোর্ট তো ব্যবহার করেন না— অনেক সেফ। ওই যে মাছ ধরছে, মুখে মাস্ক দেখেছেন? মাস্ক আছে, তবে সেটা থুতনিতে! আর একটা কথা কী বলুন তো, অনেকদিন কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বলিনি। তাই একটু ইচ্ছেও গেল বলতে পারেন। আর ইচ্ছে গেলেই যে সব ধরনের মানুষদের সঙ্গে কথা বলা যাবে, তা কিন্তু নয়। তাছাড়া আছি ফাঁকা জায়গায়, এখানে অতটা ভয় নেই। ফাঁকা মাঠ তো চারিদিকে—

জ্যোতির বাবার চটকল আজ প্রায় তিনবছর হল বন্ধ হয়ে গেছে। দুই হাজার শ্রমিক কাজ করত। কিন্তু কারখানা বন্ধ হতেই শ্রমিকদের মধ্যে আর্থিক দুরবস্থা দেখা যায়। তার পর লকডাউন ও আমফানে ওদের অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে। মাঝে জ্যোতির বাবা একটা গুমটিও লাগিয়েছিল রাস্তার ধারে। পরে গেঞ্জিকলে কাজ পেতে এখন সেটি বন্ধ আছে। অনেকে অন্য চটকলে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করছে। এই অবস্থায় বন্ধ জুটমিলের সামনে শ্রমিকমেলা শুরু হওয়ায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।

জ্যোতির সঙ্গে যখন দেখা হয় কথা হয় তখন এইসব কথাও উঠে আসে। জ্যোতি বলে, ফাউলাইয়ের টাকা বাবা পেয়ে গেছে। সেই টাকায় আমার দোতলা হচ্ছে। কিন্তু সকলে তো আর কাজ পায় না। তাদের অবস্থা খারাপ। শ্রমিকমেলা বন্ধ করতে হবে বলে তারাই বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।

এখান থেকে জ্যোতিদের বাড়ি দেখা যায়। এতটাই ফাঁকা ও নীঃসৃম শূন্যতা সেখানে বিরাজ করে যে একটা দোতলা উঠছে দেখতে পাই— কিন্তু সেটা যে জ্যোতিদেরই বাড়ি আমি সেটা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারি না। যে বাড়িটা উঠছে তার ছাদের একদিকে বসানো আছে নীল রঙের জলের প্লাস্টিক ট্যাঙ্ক। এখান থেকে দেখা অসম্ভব এই শীতের সময় আজও সেখানে বাঁশপাতি পাখিরা ওড়ে কিনা।

–আপনার জমির ধান কবে কাটবেন?
–চারিদিক সব ফাঁকা হয়ে গেছে না? সব ধূ ধূ করছে। কেবল আমিই এখনও কাটিনি। আমার জমির ধান রয়ে গেছে। আসলে কি জানেন, ওতে চড়ে ওই যে পাখিরা দোলে—

কথাটায় গা-টা একটু শিরশির করে। সেদিনের ঘটনার পর জ্যোতির মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হলেও আমি এখনও স্বাভাবিক হতে পারিনি। তবে ওর মা খুব স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছে আমার সঙ্গে, যেন কিছুই ঘটেনি।

–আসলে ধানগুলো কেটে নেব, আমিই কাটব, একটু সময় নিচ্ছিলাম আর কী!

বলে ভদ্রলোক বসে পড়েন জমির আগে, একেবারে পেকে হলুদ হয়ে গেছে সব ধানশীষ, গাছদের পাতা। অন্যরা আলু বসানোর জন্য জমি চষে ফেলেছে। এখন মাটিতে খুপরি কেটে জল দিচ্ছে। ফাঁকা মাঠে অজস্র পাখিরা চরে বেড়াচ্ছে।

ভদ্রলোক উঠে পড়লেন জমি ছেড়ে। আমার দিকে রসস্থ চোখে তাকিয়ে বললেন, গুড় পাচ্ছেন?

–গুড়? হঠাৎ এই কথায় অবাক হলাম।
–আরে এইসময় গুড় তো একটাই— খেজুড়ে গুড়। পাচ্ছেন?

হেসে বলি, আমার সুগার।

–সে তো আমারও। তাই বলে শীতের দিনের গুড় খাবেন না, সে কেমন কথা? শীত চলে গেলে আর পাবেন? আখের গুড় বারোমাস পাবেন। কিন্তু এই জিনিস? এই কয়মাস মাত্র। আমাদের ওই মাঠে গতবছরেও একদল লোক এসে জ্বাল দিয়ে গুড় বানাত। ওরা থাকত খড়ের ঘরের ভেতর। ওদের কাছে গিয়ে বসে থাকতাম, কাঠের আগুনে গাঁ সেঁকতাম। গরম গরম গুড় ঝোলা ভরে নিয়ে এসেছি কত্ত। ফেরত আসার সময় শেয়ালের তাড়াও খেয়েছি। আর পনেরোদিন অন্তর সুগার টেস্ট করিয়েছি।

বলে ভদ্রলোক নিজের মনেই হাসলেন। মাথা নাড়লেন আপনমনে। তার পর বিড়বিড় করে বললেন, কী ছিল আর কী হল! কবে যে টিকা বেরুবে। রোজই শুনি আজ আসছে কাল আসছে— কিন্তু কই? টিকা নিয়েও পজিটিভ হয়ে যাচ্ছে! তাই বেরুলেও যে নিশ্চিত থাকবে, তার কোনও কথা নেই। কত লোক মারা গেল, কত সেলিব্রিটিও করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারল না। বেঁচে আছি, এই ঢের! আবার মাঝে মাঝে ওই দূরের ধান উঠে যাওয়া মাঠে পাখিনামা দেখে মনে হয়, বেঁচে আছি, এই ঢের!

–আর রাত?
–মানে?
–রাত কীভাবে নামে এখানে?
–রাত! বলে ভদ্রলোক দম নিলেন। বললেন, তা, রাত নামে এখানে। নামে। তিনি মাথা নাড়েন।
–কীভাবে নামে? বলে আগ্রহ ভরে তাকাই। একটু যেন কাছে আসতে যাই তাঁর। তিনি ছিটকে সরে যান। দূরত্ব…দূরত্ব।
–রাতে আমরা ঘুমাই না।
–কী করেন?
–জানালা দিয়ে দেখি। আর হ্যাঁ, রাতে বেরোই—
–ঘর থেকে?
–হ্যাঁ। আমি আর আমার মিসেস ঘর থেকে বেরিয়ে আলোয় আসি।
–আলো?
–চাঁদের আলো।
–আচ্ছা!
–এই যে বাঁধানো উঁচু রাস্তা দেখছেন, এটাকে আমরা বলতাম বাঁধ। এদিকে আসলে গ্রাম বলে কিছু নেই, বাঁধের ধার ধরে পরপর ঘর, মানুষের বাস। এগুলিই এখন গ্রাম। পুরানোদিনের দূরগ্রামের লোকেরা বলত বাঁধের মানুষ।
–বেরিয়ে কী করেন?
–উঁচু বাঁধ মানে রাস্তায় বেরিয়ে আমরা পা ঝুলিয়ে বসি। পা দোলাই। এক্কাদোক্কা খেলি।
–মানে!
–ছেলেবেলায় আমার মিসেস তাই খেলতেন। বলে তিনি মুখ ফেরালেন।
–আচ্ছা!
–ছেলেবেলায় ঠাকুমার কাছে শেখা মুখে মুখে প্রচলিত নানা ছড়া কাটেন আমার মিসেস। তখন চাঁদ ওঠে, অনেকটা করে আলো দেয় আর শেয়াল ডাকে, প্যাঁচা ডাকে। হালকা শীতের বাতাস বয়, নানা পোকারা ডাকে, নয়ানজুলির মাছেরা লাফায়— মনে হয়, এই বেশ। এই আলো, বাতাস, এই শ্বাস, বেঁচে থাকা— মরে গেলে এসব পাব? তাই সাধ করে মরণকে ডেকে আনব কেন?
–সুগার টেস্ট আর করাচ্ছেন না?
–নাঃ!
–শেষ কবে করিয়েছেন?
–লকডাউনের আগে। এখন রোজ তেতো খাই আর খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করি। মেটফরমিন ঔষধ আগে দুটি করে খেতাম— সকাল সন্ধে। পাঁচশো মিলিগ্রাম করে দুটি। এখনও তাই খাই। বুঝি, অনেকদিন হয়ে গেল, একবার টেস্ট করানো বা ডাক্তার দেখানো দরকার— কিন্তু বিশ্বাস করুন, বাইরে যেতে হবে, অটো-টোটো চেপে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, সেখানে গাদা ভিড়, সরকারি হাসপাতালে যে যাব, সেখানের ভিড়ের বোঝা বলে বোঝানো কহতব্য নয়। ভাবলেই আমার গা-হাত-পা সব ঝিমঝিম করে। ডাক্তাররা সব কী হারে আক্রান্ত হচ্ছে দেখছেন তো? আশিজন ডাক্তার মারা গেছেন। এই অবস্থায় চেম্বারে গিয়ে দেখানোর নাম হলেই থরহরি কম্প হয়। আমি কী একটু বেশি বলে ফেলছি?
–না। বেশি ভয় পাচ্ছেন।
–ভয় পাব না? এই অবস্থায় ভয় পাব না!
–জমিতে কাজটাজ করেন?–করি করি। মাটি কোপাই, একটি একটু করে। সুগারটা যেন বশে থাকে। যদি কো-মর্বিডিটি হয়ে যায়— সব শেষ! তাই ঠিক করেছি‌ ধানও এবার নিজে কাটব, আলু বসানোর কাজটা নিজেই করব। আমাদের এদিকে আলু ওঠে একটু নাবি করে, শেষ চৈত্রে। তখন বসন্তকাল এসে যায়। আমি আমার ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে ওই দূরে দূরে অবস্থিত বসন্তের গাছেদের পাতাঝরা দেখি। আসলে কী জানেন, ওই যে ধান উঠে যাওয়া ফাঁকা মাঠে ছেলের দল ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, সেদিনও ওরা এমনি করেই ঘুড়ি ওড়ায়। সেই আশ্বিন মাস থেকে শুরু হয়েছে, এখন অঘ্রান শেষ হতে চলছে— সেই চৈত্রের খর রোদে ঘুড়ি উড়িয়ে বোশেখ পড়লে তবে ওদের ছুটি— জানেন? আকাশটাও যেন তখন রেহাই পাবে। এইসব ছেড়ে মরে যেতে কী ভালো লাগে, বলুন? আমি যদি একটু সাবধানে থাকি, আত্মীয়দের থেকে দুরত্ব বজায় রাখি, সেটা কি দোষের? বেঁচে থাকাটা, বেঁচে থাকতে চাওয়াটা দোষের নয়, কী বলেন? সবাই তো বেঁচে থাকতেই চায়! এমনকী মরার পরও বেঁচে থাকতে চায় নানা কাজের মধ্য দিয়ে। টিকা বেরুলেই আমি আবার সবাইকে কাছে ডেকে নেব— ঠিক কিনা?

বললাম, আপনার ভাই কী করে বললেন?

–গ্রামে একখানা মুদিখানা চালায়। আমাদের আসল বাড়ি এখান থেকে কিমি তিনের দূরে, একেবারে ইন্টিরয়র গ্রামে। আমি এই জমিটা অনেকদিন আগেই কিনে রেখেছিলাম। অবসর নেবার দশবছর আগে থেকেই এই বাড়িটা বানানোর কাজ শুরু করি। গত একবছর আমি গ্রামে যাইনি। মা-বাবা এখনও আছেন, দেখতে যাইনি একদিনও। তবে হ্যাঁ, ফোনে খবর নিই। ওদের দেখাশোনা ভাইরাই করে।

লোকটা বাড়িটা ঘেরেনি। তবে চারধারের সীমানা নির্ধারণ করা আছে পরপর পোঁতা বিশ-ত্রিশখানা সুপারিগাছ দিয়ে। এছাড়া নারকেল গাছও করেছে তিনটি। তাতে ডাব ফলে আছে।

এইসময় একটি সিড়িঙ্গে চেহেরার ছেলে এসে দাঁড়াল রাস্তার উপর। তার মুখে মাস্ক নেই। সে বললে, কাকাবাবু ডাব পেড়ে দেব?

–সে দিবি। কিন্তু মুখ ফাঁকা কেন তোর?
–এই পরে নিচ্ছি।

বলে একগাল হেসে সে প্যান্টের পকেট থেকে একটি মাস্ক বের করে মুখে এঁটে নেয়। তার পর ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বলে, স্যার কেমন আছেন?

ছেলেটাকে আমি চিনি। ও-ও চেনে। ওর নাম শ্যাম চৌধুরী। আমি কোনওদিনও ওর স্যার ছিলাম না, আজও নেই। ও আমাকে চেনে জ্যোতির সঙ্গে মেলামেশার সুবাদে। ছেলেটা আদতে বিহারি, থাকে জ্যোতিদের পাড়ায়। কিন্তু জন্ম-কর্ম এখানেই বলে বাংলাটা ভালোই বলে। ওর কাজ বলতে রেলেকাটা দেহ সরানো। মজুরি মেলে চারশো টাকা। এছাড়া ও চারশো সাত চালায়। মাঝে মাঝে লালবাতির এলাকায় যায়। নেশাভাঙের অভ্যেসও আছে। লকডাউনে দেশে ফিরে গেছিল, সেখানে সার্কাসে খেলা দেখাত। একবার দোতলা থেকে টিউবলাইটের স্তূপে ঝাঁপ মেরে খেলা দেখাতে গিয়ে পা ভেঙেছিল। এখন ভাঙা পা একটু টেনে হাঁটে। হাতে-গায়ে শুকিয়ে যাওয়া লম্বা লম্বা কাটার দাগ। নিউ নর্ম্যালে এখন আবার এখানে ফিরেছে। ওর বউ পোয়াতি। কদিনের মধ্যেই বাচ্চা হবে। তাই কাজ খুঁজছে।

ভদ্রলোক বললে, তোমার স্যার এসেছেন, একটু আপ্যায়ন তো করতে হয় নাকি? ডাব পাড়ো। কচি ডাব খাওয়াই।

চুপ করে থাকি। সে অম্লানবদনে গাছে উঠে যায়। সাবলীলভাবে পুরুষ্টু একটি কাঁদি নামিয়ে আনে। সুন্দর, পুরুষ্টু গোল ডাব। এই ডাবের জল খুব মিষ্টি ও চমৎকার স্বাদের হয়। জলের পরিমাণ হয় একগ্লাস।

ভদ্রলোকের মিসেসও বেরিয়ে এসেছিলেন ঘর থেকে। মুখে মাস্ক। হাতে গ্লভস। গায়ের চামড়া হলুদ হয়ে গেছে। হাতের নীল শিরা উঠে এসেছে উপরের চামড়ায়। কাঁচাপাকা চুল অবিন্যস্ত। অত্যন্ত শীর্ণ চেহেরা। দেখলে ভয় নয়, মায়া জাগে এইজন্য একটা আতঙ্ক মানুষকে কীভাবে বিষাদগ্রস্ত করে ফেলে দেখে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, পেড়ে নাও। যে কোনওদিন চুরি হয়ে যাবে। লোকজন যা—

বলে তিনি আমার দিকে একবার তাকিয়ে যেমন দ্রুতপদে ঘরের বাইরে এসেছিলেন তেমনি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।

মজুরি বাবদ দুটি ডাব নিয়ে সে চলে যায়। বাজারে গিয়ে এগুলি ত্রিশ টাকা করে বেচলেই শ্যাম পেয়ে যাবে ষাট টাকা। এমন নধর সুন্দর, কালো দাগহীন ডাব চোখের পলকেই বিক্রি হয়ে যাবে।

ভদ্রলোক বললেন, কাল কি এদিকে আসবেন? আসুন না একবার।

বলি, কাল? কেন?

আজ ডাবের কাঁদিটি চালাতে ঢুকিয়ে রাখব, আপনাকে খাওয়াব কাল। আমিও খাব, আমার মিসেসও খাবেন। বুঝতেই পারছেন, করোনার টাইম—, যদি করোনার জীবাণু ছেলেটার হাত থেকে ডবে লেগে থাকে তো—

মুখ উঁচু করে আমি দূর দেখলাম। মেছুড়ে সেই লোকটা নেই। মাছধরা সাঙ্গ করে লোকটা সাইকেলে চেপে কখন যে ধাঁ হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি। এখন জায়গাটা ফাঁকা, শূন্য।

না, ভুল হল। ফাঁকা নয়। ধানমাঠের একটি ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়েছে। ঘুড়িটি নামছে সেখানেই। আর ছেলের দল ঘুড়িটি লুটে নেবার জন্য একসঙ্গে দৌড় লাগিয়েছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...