যে জীবন সাপেদের, সিঁড়িদের

যে জীবন সাপেদের, সিঁড়িদের -- রুচিরা

রুচিরা

 

 

‘কনগ্রেচুলেসান্স অন ইওর অফার ফ্রম ট্রু টেকসিস্টেম। উই আর ডিলাইটেড টু অফার ইউ দ্য পোজিসান অফ …’

অফার লেটারটা বার বার পড়ে বিজয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে। প্রায় থার্টি পারসেন্ট বেশি মাইনে। তার ওপর পারফরমেন্স ইন্সেন্টিভ।

মাস ছয়েক ধরে নতুন চাকরির চেষ্টা করে চলেছে। অফিসের কাজ সামলে, কলিগদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রাথমিক টেলিফোনিক ইন্টারভিউ অ্যাটেন্ড করাই একটা চ্যালেঞ্জ। সেটা পেরোলে কোম্পানির অফিসে গিয়ে তিন চার রাউন্ড করে ফেস টু ফেস ইন্টারভিউ। এই সব ম্যানেজ করতে গিয়ে মরিয়া হয়ে সব সিক লিভ, সব আর্নড লিভ শেষ করে ফেলেছে।

এটাই ওর প্রথম কোম্পানি। প্রথম প্রেমের মতো কিছু আনকোরা আবেগ, অমলিন সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে এই কোম্পানির সঙ্গে। তাই বুঝি অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি এতদিন। প্রাণপণ চেষ্টা করেছে মানিয়ে চলার।

প্রথম কয়েক বছর মোটামুটি মসৃণ ছিল জীবন। নতুন কাজ শেখা আর আনন্দে কাজ করা। এছাড়া কোনও ভাবনাচিন্তা ছিল না। দু বছর পরে ও প্রথম প্রোমোশান পেল আর তারপরই সমীকরণগুলো ধীরে ধীরে বদলে গেল। অকারণে কৃত্রিম একটা কাজের চাপ সৃষ্টি করা শুরু হল। শুরু হল অশোভনভাবে তুলনা টানা— দেখো ও কত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ফেলেছে। ওর কাজটায় জটিলতা কত বেশি, ওর কাজের গুণগত মান কত ভালো, কত নিখুঁত সেটা ও কিছুতেই বোঝাতে পারত না। আস্তে আস্তে অন্য ছেলেমেয়েরা টিম লিড-এর পছন্দের লোক হয়ে গেল। তাদের মাইনে বেশি বাড়ত, তাদের প্রোমোশান আগে হত। সে অনুভব করত যেন ইচ্ছে করেই কঠিন কাজগুলো বেছে বেছে ওকে দেওয়া হচ্ছে। অন্যরা যখন সব কাজ শেষ করে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেতে যেত বা থিয়েটারে নতুন কী মুভি এসেছে তা নিয়ে আলোচনা করত তখনও সে ডেস্কে ঘাড় গুঁজে কাজ করে যেত। মনে হত ওর চারিদিকে অসংখ্য সাপ হিস হিস করছে। সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে যে কেউ।

আরও একটা প্রোমোশান পাওয়ার পর অবস্থা আরও জটিল হয়ে গেল। শুধু ঘাড় গুঁজে কাজ করলেও চলবে না। কথা বলতে হবে। ভিজিবিলিটি বাড়াতে হবে। ও চিরকালই চুপচাপ কাজ করে যাওয়ার দলে। ওর চোখের সামনে ওর করা কাজ অন্য একজন করেছে বলে প্রশংসা আদায় করে নিত। ও লজ্জায় চুপ করে থাকত। যারা দিনে ডাকাতি করে, যারা এত নির্লজ্জ হতে পারে তাদেরকে ও কী বলবে, কীভাবে বলবে? কেউ কেউ ওর কাজের দশটা ভালো দিক ইচ্ছে করে উপেক্ষা করে শুধু কী ভুল করেছে সেটাকেই বড় করে দেখাত। মিটিঙে সিনিয়ারদের সামনে শুধু সেই ভুলটাকেই দশগুণ করে আলোচনা করত। মাথা হেঁট হয়ে যেত ওর। স্বপক্ষ সমর্থনে কিছু বলতে গেলে উত্তর আসত— অন্য কেউ ভুল বিবৃতি দিচ্ছে মনে হলে তোমাকে মিটিঙে জোর গলায় জানাতে হবে তোমার বক্তব্য। তোমার দায়িত্ব নিজেকে ও নিজের কাজকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রচার করা। কিন্তু দাম্ভিকদের মতো নিজের গুণাগুণ ও গাইবে কী করে? বিষাক্ত কর্পোরেট কালচারে নিজেকে খুব বেমানান লাগত ওর। চারিদিকে হিস হিস করা সাপেদের ভিড়ে ও কেঁচো হয়ে থাকত সবসময়।

একদিন আর থাকতে না পেরে দিদিকে বলেছিল ওর সমস্যা। দিদির পরামর্শেই চাকরির চেষ্টা করা শুরু করে। ওর নিজের টেকনিক্যাল নলেজের ওপর ভরসা ছিল। বিশ্বাস ছিল ইন্টারভিউয়ের জন্যে একটু প্রস্তুতি নিলে কিছু একটা ঠিক জোগাড় করে ফেলবে। তাও ছ মাস লেগে গেল একটা চাকরি পেতে।

 

দুই

প্রথমে মাকে ফোন করে জানায়। মা জানলে বাবাও জানবে। বাবাই খুশি হবে বেশি।

মা শুনে অদ্ভুত এক উদাসীনতা নিয়ে বলে— মাইনে বেড়েই বা কী লাভ, লাভের গুড় পিঁপড়েতেই খেয়ে যাবে। তুই তো সব তোর শ্বশুরমশাইকে দিয়ে দিবি।

সব ভালো লাগা চুপসে যায় বিজয়ার। সত্যিই তো। তার মাইনে বাড়া মানে তার শ্বশুরমশাইয়ের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স মোটা হওয়া। উনি হয়তো আরও একটা বাড়ি কিনবেন পরের বছরে। কিন্তু সেই বাড়িগুলোর মালিকানাতে কোথাও তার নাম থাকবে না। প্রতিবাদ জানালে বলবেন— সব তো তোমাদের জন্যেই করছি। রমেশ আর তুমি কি আলাদা!

এসব শুরু হয়েছিল সেই বিয়ের যোগাযোগের সময় থেকে। প্রথমে কাস্ট সাবকাস্ট ছাড়াও জন্মের মুহূর্ত-দিন-রাশি-গণ-নক্ষত্র ইত্যাদি আট-দশরকম পয়েন্ট ম্যাচ করিয়ে তৈরি হল বিবাহযোগ্য পাত্রের লং লিস্ট। সে লিস্ট ধরে ধরে বাড়ি-ঘর, পারিবারিক অবস্থা, ছেলের মাইনে-চেহারা-পদমর্যাদা দেখে তৈরি হল শর্ট লিস্ট । সেই লিস্ট থেকে পাত্র-পাত্রী দেখাশোনা করে বাবা-মা নির্বাচন করল উইনার, যার গলাতে জয়মাল্য পরাবে বিজয়ালক্ষ্মী রামস্বামী।

সব কথাবার্তা পাকা হওয়ার দিন, হবু শ্বশুরমশাই বিজয়াকে বললেন—

–মা, তোমার পে স্লিপটা দেখাও তো আমায়।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও পে স্লিপটা ফাইল থেকে বার করে ওনার হাতে তুলে দেয়। উনি ভালো করে দেখেশুনে ধার্য করেন বিয়ের পর কতটা টাকা তাকে সংসার খরচ বাবদ দিতে হবে, কতটা জমা রাখবে ব্যাঙ্কে আর কতটা হাতখরচের জন্যে ব্যবহার করবে। ওর বাবা মা শুনে উচ্ছ্বসিত— “ভদ্রলোক কী দূরদর্শী। এই জন্যেই এত সম্পত্তি করতে পেরেছেন। ব্যাঙ্গালোরে নিজেদের দোতলা বাড়ি। নানা জায়গায় আরও দুটো ফ্ল্যাট কিনে ভাড়া দেওয়া আছে।” বিজয়ার যদিও সেই রায় বিশেষ মনঃপুত হয়নি। কিন্তু নিশ্চুপ থেকেছে।

ওর চাকরিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাবাও কি তাই করেনি? প্রথম মাসের মাইনে থেকেই নিজের খরচ আর মেসের ভাড়াটুকু রেখে বাকি সবটাই বাবাকে পাঠিয়ে দিত সে। আর বাবা সেগুলো ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করত বা সোনা কিনত। বিজয়া জানতেও চায়নি কখনও। বাবা সরকারি দপ্তরে অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন সারা জীবন। অর্থের ব্যাপারে তার থেকে ভালো কে-ই বা বোঝে! ছোট থেকেই শুনে এসেছে জীবনের এক নম্বর থাম্ব রুল— ‘যখনই হাতে একটু পয়সা জমবে, একটু সোনা কিনে রাখবে। আপদে বিপদে সোনাই তোমাকে দেখবে।’ জমানোর ব্যাপারে এমন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা দেখেই সে বড় হয়েছে। সুতরাং শ্বশুরমশাইয়ের ইচ্ছেটা সেদিন অপছন্দ হলেও দূরদর্শিতাই মনে হয়েছিল তার।

কিন্তু হতবাক হয়ে গিয়েছিল যখন বিয়ের পরে শ্বশুরমশাই ওকে ডেকে বললেন—

–জমানোর জন্যে যে টাকাটা আলাদা করে রেখেছ, সেটা আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিও। আমি তো সিনিয়র সিটিজেন, তাই ফিক্সড ডিপোজিট করলে বেশি ইন্টারেস্ট পাব।

রমেশের সঙ্গে কথা বলেও লাভ হয়নি। সে বাবা-মার মুখের ওপর একটা কথাও বলতে পারবে না। তাছাড়া রমেশের টাকাও শ্বশুরমশাই-ই ফিক্সড ডিপোজিট করেন। ঝামেলা না বাড়িয়ে বিনা আপত্তিতে টাকা ট্রান্সফার করে দিয়েছিল।

তারপর থেকে যখনই তার মাইনে বেড়েছে তখনই শ্বশুরমশাই সেই হারে ব্যাঙ্কের টাকা জমানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তার হাতখরচ অবশ্য বাড়েনি তেমন। অফিস যেতে এখনও তাকে ভাবতে হয় বাস ধরবে না অটো। ওলা বা উবের ধরতে গেলে দশবার ভাবে। একদিন অফিস কলিগদের সঙ্গে বাইরে খেতে যেতেও ইতস্তত করে। তার সামাজিক সম্পর্কগুলোর মধ্যেও তাই তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য দেওয়াল। সবাই ধরেই নিয়েছে সে কোনও আনন্দ উদযাপন পছন্দ করে না।

সেও যেন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেই ঘেরাটোপে। নিজের জন্যে একটু হিসেবের বাইরে খরচ করে ফেললে কেমন একটা অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। অর্থ ব্যাপারটা সারাজীবন মরীচিকার মতো অধরা আর অবোধ্য রয়ে গেছে তার কাছে।

 

তিন

নতুন অফিসে জয়েন করারপর প্রায় দু সপ্তাহ একটানা ট্রেনিং চলল। শুধু টেকনিক্যাল ট্রেনিং নয়, বিহেভিয়ারাল ও ম্যানেজেরিয়াল স্কিল উন্নত করার ট্রেনিংও।

‘ইউ আর দ্য ড্রাইভার অফ ইওর রিলেশানসিপ। আইডেনটিফাই দ্য স্কিলস, গোলস দ্যাট ইউ ওয়ান্ট টু অ্যাচিভ।’

ট্রেনার সবাইকে অনুরোধ করে একটা করে তাদের পার্সোনাল আর প্রফেশনাল গোল সবার সঙ্গে শেয়ার করতে। প্রফেশনাল গোলের পাশাপাশি অনেকেই তাদের ব্যাক্তিগত জীবনের নানা ইচ্ছের কথা জানায়। কেউ ফটোগ্রাফার হতে চায়, কেউ মিউজিক অ্যালবাম প্রকাশ করতে চায়, কেউ তার বয়স্ক দাদু ঠাকুমাকে তীর্থভ্রমণে নিয়ে যেতে চায়, কেউ প্যারাডাইভিং করতে চায়, কেউ ছমাসের মধ্যে ম্যারাথন দৌড়ে নামতে চায়। বিজয়া নিজের গোল নিয়ে কিছু বলতে পারল না। অনেক ভেবেও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না কী চায় সে। কিছু কি চায়? ট্রেনার ওর কনফিউশান নোট করে নেয়। এই সব ইনপুট ওদের মেন্টরদের সঙ্গে শেয়ার করা হবে বলে জানায়। মেন্টররা ওদেরকে পার্সোনাল আর প্রফেশানাল গোল অ্যাচিভ করতে সাহায্য করবে।

দিন দুয়ের মধ্যে ঠিক হয়ে গেল কে কোন প্রোজেক্টে কাজ করবে। পরদিনই ওর রিপোর্টিং। ম্যানেজার মিঃ আনন্দ কৃষ্ণমূর্তি ওকে ডেকে পাঠায়। ওর গত কয়েক বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোঁজ নিলেন। তারপর জানালেন ওকে এক মাসের জন্যে আমেরিকার মিনেসোটায় যেতে হবে একটা প্রোডাক্টের প্রাথমিক টেকনিক্যাল ও বিজনেস নলেজ শিখে নেওয়ার জন্যে। ওখানে কয়েকজন এক্সপার্ট আছেন। তাদের কাছে শিখে ফিরে এসে এখানে পুরো টিমকে শেখাতে হবে।

–আমি আগে কখনও আমেরিকা যাইনি। সব কিছু কি ম্যানেজ করতে পারব?
–সব কিছুই কখনও না কখনও প্রথমবার করতে হয়। কোনও নির্দিষ্ট কারণ থাকলে এখনই জানাতে পারো। না হলে দু দিন ভেবে নিয়ে আমাকে কনফার্ম করো।

বিজয়া উঠে চলে আসতে যাচ্ছিল তখন ম্যানেজার বললেন,

–আর একটা কথা। যখন তুমি তৎক্ষণাৎ কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, তখন ভাবার জন্যে দু-এক দিন সময় চেয়ে নেবে। তক্ষুনি তাড়াহুড়ো করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার কোনও দরকার নেই।

ওর কনফিউশনটা প্রকাশ করা একেবারেই ঠিক হয়নি। আসলে বিজয়া ঠিক প্রস্তুত ছিল না। আগে কখনও দেশের বাইরে যায়নি। একদিনের জন্যেও গোপীকেও ছেড়ে থাকেনি। মাত্র তিন বছর বয়সে সে কি মাকে ছেড়ে থাকতে পারবে? রমেশ, শ্বশুর, শাশুড়ি সবাই কি রাজি হবে ওর বাইরে যাওয়াতে? নতুন অফিসে ঢুকেই এরকম একটা সুযোগ পেয়েও না বলাটা ভালো দেখায় না। কিন্তু কেরিয়ারের জন্যে ছেলেকে ফেলে বিদেশ যাওয়াটাও মন থেকে মেনে নিতে পারছে না।

বাড়িতে ফিরে আলোচনা করতে শ্বশুরমশাই জিগ্যেস করেন—

–ওখানে থাকাখাওয়া ছাড়া আলাদা কোনও টাকা দেবে?
–অবশ্যই দেবে।

শাশুড়ি হইহই করে বলে ওঠেন— যাও যাও, ঘুরে এসো। আমরা গোপীকে ম্যানেজ করে নেব।

তার দৃঢ় বিশ্বাস যে এক মাসে একটু বেশি টাকা হাতে আসবে সেটাই শ্বশুর-শাশুড়ির রাজি হওয়ার একমাত্র কারণ। তাও সে তার দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে রাজি হয়ে যায় যেতে।

ভিসার জন্যে চেন্নাই যেতে হল। রমেশই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল। হোটেলে থাকল তিনজনে। মেরিনা বিচে সময় কাটাল ঘন্টা দুই। চেন্নাইয়ে থাকেন এরকম দু-একজন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও দেখা করল।

ভিসা হাতে পাওয়ার পর দিদির সঙ্গে গিয়ে একটা ভালো ব্যাগ, অফিসে পরার মতো কয়েকটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস আর জুতো কিনল। অফিস থেকে কিছু টাকা দিয়েছে প্রথমবার বাইরে যাবে বলে।

মেন্টর মিঃ মাইকেল থমাসের সঙ্গে প্রথম মিটিং হল আমেরিকা যাওয়ার দিন দুই আগে। তখন ও খুব ব্যস্ত। ফ্লাইট টিকিট, হোটেল বুকিঙের ডিটেলস হাতে পায়নি। বারবার ফলোআপ করতে হচ্ছে। প্রোডাক্টের ওপর প্রাথমিক কিছু পড়াশোনা শেষ করার চেষ্টা করছে।

মাইকেল বললেন— আমি বেশি সময় নেব না। শুধু একটা কথা জানিয়ে রাখি। এই কোম্পানি স্মার্ট প্রিন্সিপ্যাল ফলো করে। আমরা মনে করি সবার জীবনে এক বা একাধিক স্মার্ট গোল থাকা উচিত। স্মার্ট কথাটার মানে স্পেসিফিক, মেজারেবল, অ্যাচিভেবল, রিয়েলিস্টিক ও টাইমবাউন্ড। আগামী পাঁচ বছরে আপনার গোল কী, কী অর্জন করতে চান— আমেরিকা গিয়ে কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই ভাবনাটাকে একটু নাড়াচাড়া করবেন। ফিরে এসে এই নিয়ে আমরা আবার বিস্তারিত আলোচনা করব।

 

চার

বরাতজোরে ব্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্ট থেকেই একটা ফ্যামিলি পেয়ে গিয়েছিল যারা ওর সঙ্গে একই ফ্লাইটে মিনিয়াপোলিস এসেছে। তাই নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ও আমেরিকা এসে পৌঁছল।

হোটেলের শাটল সার্ভিস আছে— রোজ অফিস পৌঁছে দেয় ও আফিস থেকে পিকআপ করে আনে। নতুন কাজও খুব ভালো লাগছে। সব কলিগরা খুব হেল্পফুল। অশান্তি শুধু খাওয়ার সময়। অফিসের ক্যন্টিনে স্যান্ডুইচ, কফি আর ফ্রুটজুস ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। স্যান্ডুইচ তার গলা দিয়ে নামতে চায় না। কদিন কলিগদের সঙ্গে বাইরে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেতে গেল। সেখানে খুব অল্প কিছু ভেজিটেরিয়ান বা ভেগান আইটেম পাওয়া যায়। ডিনারটা অপেক্ষাকৃত বেটার। হোটেলের কাছাকাছি একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেয়েছে। অফিস থেকে ফেরার সময় ওখানে থেকে খাবার প্যাক করে নিচ্ছে রোজ।

খাওয়ার অসুবিধে আর গোপীর জন্যে মনকেমন করাটা বাদ দিলে বিদেশ সফর নিয়ে তার কোন আভিযোগ নেই। জীবনে এই প্রথমবার যেন পাখি খাঁচা থেকে বেরিয়ে মুক্ত আকাশে ওড়ার স্বাদ পেয়েছে। মন এমন খুশি খুশি লাগেনি কত দিন। বুকের ভেতরের এক তালা বন্ধ ঘর যেন সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে।

এসে থেকে সবসময় ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরছে আর বারবার ঘুরে ফিরে আয়নায় দেখছে নিজেকে। কী যে স্মার্ট লাগছে। ওয়ালমার্ট গিয়ে অফিসিয়াল ড্রেসের সঙ্গে মানানসই একটা হাল্কা স্টাইলিশ জ্যাকেট আর জিনসের সঙ্গে পরার জন্যে একটা টপ কিনেছে।

এই প্রথম সে একা একা নিজের জন্যে জামাকাপড় কিনল। ছোটবেলা থেকে দিদির ছোট হয়ে যাওয়া জামাই পরে এসেছে বেশি। জন্মদিন, দীপাবলি আর পোঙ্গলে নতুন জামা হত। দুই বোনের জন্যে সমান টাকা বরাদ্দ করত বাবা। দিদি সব সময় আগে নেচে নেচে গিয়ে বেশি দামী জামা কিনে নিত, তারপর যা টাকা পড়ে থাকত তাই দিয়ে কেনা হত ওর জামা। উৎসবে অনুষ্ঠানে মামা বা পিসিরা মাঝেমাঝে জামা উপহার দিত। তারা দুই বোনে পিঠোপিঠি বলে একই সাইজের জামা আনত। সেখানেও দিদি ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের পছন্দেরটা আগে নিয়ে নিত। যেটা পড়ে থাকত সেটা বরাদ্দ হত ওর জন্যে। একটা সময় অভিমান হত খুব। তারপর নিজের অজান্তেই কবে অভিমান পাল্টে গেছে উদাসীনতায়।

বিয়ের জন্যে যখন শাড়িগয়না কেনা হল তখন তার পছন্দ অপছন্দ কেউ জানতেও চায়নি। মা আর দিদিই ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করেছিল। মা একবার ওকে জিজ্ঞেস করেছিল বিয়ের শাড়িটা ওর ভালো লেগেছে কিনা। দিদি বলল— ভালো লোককে জিজ্ঞেস করেছ মা। ওর কোনও পছন্দ অপছন্দ আছে? ও জলের মত। যে পাত্রে রাখবে তার আকার ধারণ করবে।

দিদির এই সর্বক্ষণ কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যবহার আর তাকে সব ব্যাপারে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা খুব বিরক্তিকর। কিন্তু দিদি ওকে ওর নিজের থেকেও বুঝি বেশি চেনে। ও তো সত্যিই স্থির নিস্তরঙ্গ জলের মতো। প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক, নিজের অপছন্দটাও স্পষ্ট ভাষায় জানাতে শেখেনি আজও।

বিয়ের পর শাশুড়ি একদিন কমার্শিয়াল স্ট্রিটে গিয়ে ওর জন্যে বেশ কয়েকটা সালোয়ারকামিজ আর শাড়ি কিনে আনে। ও মৃদু প্রতিবাদ করেছিল— আমি নিজেই কিনে নিতাম।

–এই তো দুটো দিন মাত্র সপ্তাহে ছুটি পাও। আবার কেন কষ্ট করে বেরোবে। আমি গিয়েছিলাম তাই কিনে আনলাম। এখানে কোয়ালিটি কত ভালো আর সস্তা। মলগুলোতে অনেক বেশি দাম নেয়।

সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলেছে। বছরে দু-তিনবার শাশুড়ি মা কোনও না কোনও মার্কেটে যাবেন ও একসঙ্গে চারটে করে ড্রেস বাড়ির সবার জন্যে কিনে আনবেন। কত সময় জামার রং, স্টাইল অপছন্দ হয় ওর। রমেশকে বললে বলে— ‘ইচ্ছে করলে নিজে দোকানে গিয়ে পছন্দমতো কিনে নাও।’ কিন্তু এত জামা কী হবে! আর যাওয়া হয় না দোকানে, নিজের পছন্দে কেনা হয় না জামাকাপড়।

রমেশের কাছে তার অপছন্দ প্রকাশ করতে পেরেই যেন সে পরিতৃপ্ত হয়ে যায়।

 

পাঁচ

মিনেসোটায় এসে প্রথম উইকেন্ডটা হোটেলে বসে, হোটেলের আশেপাশের দোকানে উইন্ডোশপিং করে কেটে গেল। দ্বিতীয় উইকেন্ডে ঠিক করে গুগল ম্যাপ দেখে ঘুরে বেড়াবে। সকাল সকাল মল অফ আমেরিকা এসে সারাদিন বাস-ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো যাবে এরকম একটা ডে পাস কিনে নেয়। প্রথমেই যায় একশো বছর আগে তৈরি সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল দেখতে। তারপর ওখান থেকে বাস ধরে চলে যায় ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটা। মিসিসিপি নদীর ধারে ইউনিভার্সিটির বিশাল ক্যাম্পাস। ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে পড়া মিসিসিপি নদী দেখে গায়ে কাঁটা দিল ওর। ধীরেসুস্থে ঘুরে বেড়াল ক্যাম্পাসের ভেতরে। চমৎকার সুন্দর সব ডিপার্টমেন্ট বিল্ডিং। যেন ছোটবেলায় গল্পের বইয়ে পড়া কোনও রূপকথার রাজাপ্রাসাদ।

ভাগ্যিস সফটওয়ারে কাজ করেছিল তাই এসব চাক্ষুষ দেখার সুযোগ মিলল। সে তো পড়তেই চায়নি কম্পিউটার। অঙ্ক ভালোবাসত। অঙ্ক নিয়েই গ্রাজুয়েশান করেছিল। মাস্টার্স করে টিচার হওয়ার ইচ্ছে ছিল। দিদি তখন কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছে। জোর করে ওকে এমসিএ-তে ভর্তি করে দিল।

–এখন কম্পিউটারের যুগ। ছাত্র পড়িয়ে কত পয়সা রোজগার হবে তোর?

এমসিএ পাশ করেও সে চাকরি পায়নি কোনও। কোয়েম্বাটুর ছোট শহর। কোনও ক্যাম্পাস ইন্টারভিঊ হয়নি। বাড়িতে বসে বসে ভাবছিল স্কুলে যোগাযোগ করবে। অঙ্ক বা কম্পিউটারের টিচার হিসেবে জয়েন করে যাবে কোথাও। সে আশাতেও জল ঢেলে দিল দিদি। দিদির তখন বিয়ে হয়ে গেছে। এক উইকেন্ডে বাড়ি এসে খুব চেঁচামিচি করল— ‘বাড়িতে বসে বসে জীবন নষ্ট করছিস।’ জোর করে নিয়ে গিয়ে ব্যাঙ্গালোরের এক পেয়িং গেস্ট অ্যাকোমোডেশানে ঢুকিয়ে দিল। ভর্তি করে দিল কম্পিউটারের ছ মাসের একটা ট্রেনিং কোর্সে। ট্রেনিং শেষ হলে তারা ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করে দেবে। কড়া নির্দেশ ছিল, ট্রেনিং শেষ করে চাকরি না পেয়ে যেন বাড়ি না ফেরে।

দিদির ওপর এক অন্ধ আক্রোশে সে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, কেঁদেছিল বেশ কদিন। কোনওদিন বাড়ি ছেড়ে থাকেনি সে। এত বড় একটা অজানা অচেনা শহর। ভাষাটাও বোঝে না তেমন। তারপর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ট্রেনিং শেষ করে একটা সফটওয়ার কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে তবেই বাড়ি গিয়েছিল সে।

মানুষ হিসেবে সে বাধ্যতার চরম উদাহরণ। নিজের জীবন নিয়ে একটা সিদ্ধান্তও সে একা নেয়নি। বড়রা যখন যা বলেছে মুখ বুজে আদেশ তামিল করে গেছে। দিদি বলে— ‘সাধুর মতো নির্বাণ লাভ করে গেছিস এই বয়সে।’ ও আসলে লেবার ক্লাসের মানুষ। ওর মতো মানুষের জীবনের আবার কী লক্ষ্য থাকবে? চারিদিকের সাপেদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চাকরিতে একটু উন্নতি করা। আর বাকি জীবনটা নিস্তরঙ্গ জলের মতো নির্বিবাদে কাটিয়ে দিতে পারলেই চলবে।

 

ছয়

রাত্রে রমেশকে ফোন করে জানায় তার রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা।

–এখানেই কোথাও একা একা যাও না। বিদেশে গিয়ে এত রিস্ক নিয়ে একা একা বেড়াতে যাওয়ার কী দরকার ছিল। যদি রাস্তা না খুঁজে পেতে বা কিছু হয়ে যেত রাস্তায়।

মুড অফ হয়ে যায়। দিদির মতো স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা কেন হতে পারল না সে। দিদির চেহারা শীর্ণ, কৃশকায় অথচ হাবেভাব জঙ্গলের অতিকায় হাতির মতো— পথে যা পড়বে সব ধ্বংস পদদলিত করে এগিয়ে যাবে। কে রাগ করবে, কে খারাপ ভাববে, কে কী মনে করল ওসব গ্রাহ্য করে না। যা চায়, হাসিল করে। পছন্দ অপছন্দ সবই অসংশয়ে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারে। বিয়ের পাত্র বাছাইয়ের সময়ও কী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। ও একবার বলেছিল— ‘দিদি, এত খুঁতখুঁত করিস না, বাবা মার ওপর ভরসা রাখ।’ দিদির তাৎক্ষনিক জবাব— ‘ভিন্ডি, কুমড়ো কিনলেও দেখেশুনে কিনি আর সারাজীবন একসঙ্গে থাকব দেখেশুনে নেব না?’ দিদিকে সে সত্যিই হিংসে করে।

পরের উইকেন্ডটাই তার হাতে শেষ উইকেন্ড। যা পারবে ঘুরে দেখে নেবে সে। বাড়িতে কাউকে কিছু জানানোর দরকার নেই। আবার কোনওদিন আমেরিকা আসা হবে না হয়তো।

অফিস যাতায়াতের সময় খেয়াল করেছে নানা গাড়ির নাম্বার প্লেটে লেখা আছে— ‘টেন থাউজেন্ডস লেকস’। কিছু কিছু বোর্ডেও লেখা আছে ‘মিনেসোটা, দ্য ল্যান্ড অফ টেন থাউজেন্ডস লেকস’। খুব কৌতূহলী হয়ে অফিস কলিগদের সঙ্গে কথা বলে। জানতে পারে লাস্ট বরফ যুগের সময় হিমবাহগুলো বারবার এগিয়েছে আর পিছিয়েছে। তার ফলে নানা জায়গায় নানা আকারের গর্ত তৈরি হয়েছিল। সেই গর্তের মধ্যে আটকে রয়ে গিয়েছিল বরফ, সেই বরফই পরে গলে জল হয়ে তৈরি হয়েছে লেক। এখনও এগারো হাজারেরও বেশি লেক আছে মিনেসোটায়।

অফিসের এক কলিগ সারা রাজি হয়ে যায় ওকে লেক দেখাতে নিয়ে যেতে। নেক্সট উইকেন্ডে তার গাড়িতে বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে। লেক হ্যারিয়েট, লেক অফ আইলস, মিনেহাহা ফলস দেখে সে ওকে আনে মিসিসিপি নদীর ধারে। অনেকক্ষণ নদীর হাওয়া সেবন করে, একটা থাই রেস্টুরেন্টে খেয়ে ওকে হোটেলে ড্রপ করে দেয়।

পরের উইকেন্ডেই বাড়ি ফিরবে বলে বাড়ির সবার জন্যে কিছু কেনাকাটা করে নেয়।

 

সাত

ব্যাঙ্গালোরে ফিরে আসে নতুন এনার্জি নিয়ে। এসেই পুরোদমে নলেজ ট্রান্সফারের কাজ শুরু হয়ে যায়। নতুন প্রোজেক্ট। বিজয়া টেকনিক্যাল লিড কাম প্রোজেক্ট ম্যানেজার। কিছু এক্সপিরিয়েন্সড ছেলেমেয়ে ছাড়াও, নতুন অনেক কলেজ পাশআউট ছেলেমেয়ে জয়েন করেছে টিমে। টিমকে শিখিয়ে প্রোডাক্টিভ করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। টিমের জন্যে একটা ট্রেনিং প্ল্যান বানিয়ে রিপোর্টিং ম্যানেজারকে সাবমিট করে।

মেন্টরের সঙ্গে মিটিংয়ের দিন এসে যায় আবার।

–কী ভাবলেন পার্সোনাল আর প্রফেশনাল গোল নিয়ে?
–কিছু ভেবে পাইনি। গোল থাকার কী দরকার?
–আমরা তো খুঁটিতে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছাগল নয় যে ঘাস খাওয়া, ঘুমানো আর বংশবৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছু লক্ষ্য থাকবে না জীবনে? পাথরের মতো নির্জীবভাবে সারাটা জীবন কাটানো মনুষ্যজীবনের কী অপচয় ভাবুন। যাদের আর্থিক, শারীরিক বা সামাজিক কারণে কিছু করার উপায় থাকে না, তাদেরও জীবনে অনেক অপূর্ণ ইচ্ছে থাকে। আপনার নেই?
–তেমন বড় কিছু নেই।
–তাহলে আমরা কাজের কথায় আসি। আপনি চাকরি করেন কেন?
–এই একটা জিনিসই বোধহয় ঠিকঠাক করতে পারি।
–গ্রেট। কিন্তু আপনি নিশ্চয় জানেন যে চাকরিতে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। কর্পোরেটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই হবে। লার্ন অ্যান্ড গ্রো। সেটাই সারভাইভ করার একমাত্র অপশান। টেকনিক্যাল না ম্যানেজারিয়াল— কোন দিকে গ্রো করতে চান?
–ম্যানেজার হিসেবেই। কিন্তু কর্পোরেট পলিটিক্সকে আমি খুব ভয় পাই। পিপল ম্যানেজমেন্ট কি পারব? কী জানি। নিজে কাজ করা সহজ। অন্যকে দিয়ে কাজ করানো বেশ কঠিন ব্যাপার।
–অতটা কঠিনও নয়। জাস্ট ইউ হ্যাভ টু বিলিভ ইন ইওরসেলফ। আই ক্যান হেল্প ইউ দেয়ার।
–ক্যান ইউ?
–অবশ্যই। লেট আস স্টার্ট টুডে।… আপনি আমেরিকা গিয়ে কোন জিনিসটা উপভোগ করেছেন?
–সম্ভবত নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করার স্বাধীনতা।
–এখন এই জীবনে কোনটা হলে বেশ স্বাধীন লাগত। কী মনে পড়ে প্রথম?
–যদি গাড়ি চালাতে পারতাম! পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ওপর এই রোজকার নির্ভরশীলতা ভালো লাগে না।
–হোয়াই ডোন্ট ইউ স্টার্ট ড্রাইভিং দেন?
–ড্রাইভিং জানি না। এই ট্রাফিকে ড্রাইভ করার সাহস নেই আমার।
–ফেক ইট টিল ইউ মেক ইট।
–মানে?
–মিথ্যে মিথ্যেই না হয় ভাবুন যে আপনি পারবেন ড্রাইভ করতে। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করুন ড্রাইভিং শিখতে। দেখবেন এই ছোট্ট একটা পদক্ষেপ জীবনে কীরকম বিশাল পরিবর্তন এনে দেবে। প্লিজ ট্রাই ইট আউট।
–মিথ্যে মিথ্যে ভাবা যায় নাকি আবার? আচ্ছা চেষ্টা করে দেখব।
–ধন্যবাদ। পরের মাসে আবার দেখা হবে। আশাকরি তখন কিছু সুখবর পাব।

‘ফেক ইট টিল ইউ মেক ইট’ কথাটা মাথার মধ্যে গেঁথে রইল দু’দিন। একদিন লাঞ্চ তাড়াতাড়ি শেষ করে বেরোল। অফিসের কাছেই একটা মারুতি ড্রাইভিং স্কুল আছে। সেখানে গিয়ে কথা বলে ইমিডিয়েটলি ভর্তি হয়ে গেল। লাঞ্চ ব্রেকে ক্লাসগুলো করবে। ঠিক করল আপাতত বাড়িতে কাউকে জানাবে না।

দিদিকে বললেই বলবে— তুই ড্রাইভিং করবি। তাহলেই হয়েছে। রমেশ শুনলে বলবে— কী দরকার এত রিস্ক নেওয়ার। আবার মনের জোর হারিয়ে ফেলবে সে।

প্রথমে কম্পিউটারে সিমুলেটর ট্রেনিং সেশন দিয়ে শুরু হল। তারপর লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার জন্যে ট্রাফিক নিয়মের ওপর একটা পরীক্ষা দিতে হল। এরপর যেদিন প্রথম গাড়ি চালানো শেখাবে সেদিন ট্রেনার ওকে একটা খুব জনবহুল জায়গার ভেতরে দিয়ে অনেকটা রাস্তা ড্রাইভ করে একটা বিশাল এবড়োখেবড়ো ফাঁকা মাঠে নিয়ে এল। এইরকম জায়গায় এত বড় একটা ফাঁকা মাঠ যে থাকতে পারে ভাবা যায় না। একটু ভয় ভয় করছিল। কেউ কোথাও নেই। দূরে কিছু বাচ্চারা খেলছে। বাড়িতে কেউ জানেও না। প্রথমে ট্রেনার ওকে গাড়ির বনেট খুলে সমস্ত পার্টসের নাম আর তাদের কাজ বোঝাল। তারপর অনেকটা দূরে দূরে পাথরের টুকরো, ইট, লাঠি এইসব রেখে ট্র্যাক বানিয়ে ওকে সেই ট্র্যাক ধরে চালাতে বলল। স্টিয়ারিঙে হাত দিয়ে যেইমাত্র ও ট্রেনারের নির্দেশমতো গাড়ি চালাতে শুরু করল অমনি বুকের মধ্যে কোথা থেকে একরাশ আত্মবিশ্বাস এসে জড়ো হল।

বাড়ি ফিরে রমেশকে বলল যে ও গাড়ি চালানো শিখতে ভর্তি হয়েছে।

–দারুণ তো। একটু শিখে নেওয়ার পরে আমার সঙ্গে বেরোবে প্রাকটিস করতে। বাবা-মাকে কিছু জানানোর দরকার নেই।

দিদিকে জানাতে দিদি বলল— তাও ভালো। একটু সুমতি হয়েছে আমেরিকা থেকে ফিরে। হাঁদার মতো রোজ অটো করে যাতায়াত করছিলি এত বছর ধরে। এরপরে একটা গাড়ি কিনিস।

দ্বিগুণ উৎসাহে সে শিখতে শুরু করে। লাঞ্চ টাইমে ড্রাইভিং স্কুল আর উইকেন্ডে রমেশের সঙ্গে রাস্তায় প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ছাড়াও থিওরি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হল। একদম শেষ দিনে টায়ার বদলানো শেখাল। তারপর ড্রাইভিং পরীক্ষা দেওয়ার ডেট পেল দিন পনেরো পরে।

এর মধ্যে ওর নেক্সট মেন্টরিং সেশান চলে এল। ও আধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল সুখবরটা মাইকেলকে জানাবে বলে। মিটিং রুমে ও ঢোকা মাত্র মাইকেল বলল—

–ব্যাপার কী? ইউ আর গ্লোয়িং উইথ কনফিডেন্স। আই ক্যান অলরেডি সি দ্য চেঞ্জেস।
–একদম তাই। আমি ভাবিনি আমি ড্রাইভ করতে পারব। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। আপনার সাহায্য ছাড়া আমি কখনওই এটা অর্জন করতে পারতাম না।
–গ্রেট টু সি ইট।

ও ডিটেলে ওর ড্রাইভিং শেখার গল্প বলে। মাইকেল ধৈর্য্য ধরে সব শোনে। তারপর বলে—

–এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। কন্টিনিউয়াসলি আপনাকে লক্ষ্য স্থির করে সেটা অর্জন করার চেষ্টা করে যেতে হবে। আপনার আত্মবিশ্বাস আপনাকে লক্ষ্য অর্জন করতে সাহায্য করবে, কিন্তু সেই অবস্থায় টিকে থাকার জন্যে এবং সিঁড়িতে আরও ওপরে ওঠার জন্যে অনেক পরিশ্রম ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন। আপনি ধীরে ধীরে সব বুঝে যাবেন।
–ধন্যবাদ। আমি চেষ্টা করব নিজেকে ইম্প্রুভ করার।
–আপনাকে সচেতনভাবে জীবনের প্রতি একটা আশাবাদী মনোভাব, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। কিছু করা সম্ভব নয় বলে হাল না ছেড়ে দিয়ে, কীভাবে করা যেতে পারে সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হবে।
–মনে রাখব।
–এর পর থেকে তিন মাসে একবার এই মিটিংটা হবে। কিন্তু যে কোনও সময় দরকার হলেই আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

 

আট

এই প্রথম তার জীবনে সে সিঁড়ির উপস্থিতি অনুভব করে। যেন তার জীবনের ভার লাঘব হয়ে গেছে। লঘু পায়ে এক গগনচুম্বী সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে প্রায় উড়ে উড়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে সে। আরও কিছুটা উঠে গেলেই যেন সে ছুঁয়ে ফেলবে আকাশের সাতরঙা রামধনু।

ড্রাইভিং পাশ করে গাড়ি কিনবে সিদ্ধান্ত নেয়। রমেশ জানাল বিজয়ার গাড়ি কেনায় তার কোনও আপত্তি তো নেই। কিন্ত বাবাকে হ্যান্ডেল করার দায় সম্পূর্ণ তার। সুতরাং একদিন ডিনার টেবিলে শ্বশুরমশাইকে ও নিজের গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত জানায় আর বলে ওর গাড়ির লোন শোধ না হওয়া পর্যন্ত ফিক্সড ডিপোজিটের জন্যে কোনও টাকা ও দিতে পারবে না।

উনি বৌমার স্পর্ধা দেখে রেগে বাক্যরহিত হয়ে গিয়েছিলেন কয়েক মিনিট। তারপর বললেন—

–গাড়ি কিনে এত টাকা নষ্ট করার কোনও দরকার নেই।
–আমার যাতায়াত করতে খুব অসুবিধে হচ্ছে।
–এতদিন হচ্ছিল না? আমেরিকা থেকে ফিরে দুটো ডানা গজিয়েছে।

এই নিয়ে আর কোনও কথার উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি বিজয়া। তারপর থেকে শ্বশুরমশাই বিজয়ার সঙ্গে সরাসরি বাক্যালাপ বন্ধ করেছেন। খুব দরকার হলে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থার্ড পারসনে কথা বলছেন।

বিজয়া একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আর পিছু হটতে রাজি নয়। তার মনের বদ্ধ দরজা যেন খুলে গেছে হঠাৎ। আর তার ভুলে যাওয়া, মরে যাওয়া, দীপান্তরে নির্বাসিত সব ইচ্ছেরা সব আগল ভেঙে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

ঠান্ডা লড়াই চলতে থাকল বাড়িতে। তার মধ্যেই লোন নিয়ে গাড়ি কিনে ড্রাইভ করে অফিস যাতায়াত শুরু করে দেয় বিজয়া।

 

নয়

অফিসে প্রোজেক্টের প্রথম ডেলিভারি খুব সাকসেসফুল হল। ক্লায়েন্ট এবং স্টেকহোল্ডাররা সবাই খুব খুশি। ব্যাঙ্গালোরের এই কোম্পানির ওপর অনেক ভরসা বেড়ে গেছে আমেরিকার হেড অফিসের লোকজনের।

বিজয়া প্রথম বছর ভালো ইনক্রিমেন্ট পেয়েছে, পারফরমেন্স ইন্সেন্টিভ হিসেবেও ভালো টাকা পেয়েছে। এইবার সে তার কষ্টার্জিত ইন্সেন্টিভের টাকা শ্বশুরমশাইয়ের হাতে তুলে দিতে চায় না। কিন্তু রমেশের মাধ্যমে শ্বশুরমশাই চাপ দিতে থাকেন।

–ঐ টাকাটা তো এক্সট্রা। ওটাকে ফিক্সড ডিপোজিট করা উচিত এক্ষুনি। না হলেই খরচ হয়ে যাবে।
–আমি ফিক্সড ডিপোজিট করে দেব।
–আমি করলে ইন্টারেস্ট বেশি পাব।
–আমি মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা রাখব বা শেয়ারে ইনভেস্ট করব। ওখানে টাকা আরও বেশি বাড়বে।
–খবরদার শেয়ারে ইনভেস্ট করবে না। কপর্দকশূন্য করে ছাড়বে।
–ঠিক আছে। আমি ভেবে দেখব কী করা যায়। কিন্তু আমি নিজের টাকা নিজে ম্যানেজ করতে শিখতে চাই।

এই কথা বলা মাত্র ঝড় বয়ে যায় বাড়িতে। শ্বশুরমশাই ওর বাবাকে ফোন করে ওর নামে প্রচুর নিন্দেমন্দ করে।  অভিযোগ করে যে তাদের আশকারাতেই এমন দুর্বিনীত ব্যবহার করতে শিখেছে। ঠান্ডা লড়াই তো চলছিলই, এখন পুরোদমে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রমেশ ওকে অনেক অনুনয়বিনয় করে যে সে তার বাবার হয়ে ক্ষমা চাইছে। কিন্তু ও দয়া করে মিটিয়ে নিক এই অশান্তি।

–তুমি বলো কীভাবে মেটাব? আমি নিজের টাকা নিজে ম্যানেজ করতে চাই। সারাজীবন আমি অন্যের ওপর নির্ভর করতে চাই না। আমার উদ্দেশ্য তো কিছু খারাপ নয়।
–তোমার উদ্দেশ্য ভালো। তোমার কথায় যুক্তিও আছে। কিন্তু তুমি তো বাবাকে জানো।
–কিন্তু কখনও না কখনও তো আমরা বড় হব। শুরুটা তো একদিন করতেই হবে।

সমস্যা মেটে না। বাড়িতে আগুন জ্বলতেই থাকে। কিন্তু বিজয়ার মনে যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। স্পষ্ট করে ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারার আনন্দ।

বিজয়ার বাবা ওকে কোয়েম্বাটুর ডেকে পাঠায় আলোচনার জন্যে। দিদিকে ফোন করে সব জানায়। ঠিক করে দুজনে সামনের দীপাবলির ছুটিতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোয়েম্বাটুর যাবে। নিজেরাই টার্ন নিয়ে গাড়ি চালাবে।

 

দশ

ছোটবেলাটা ভাবলে কেবল দাবার বোর্ডের কথা মনে পড়ে। বাবা আর মা হচ্ছে রাজা আর মন্ত্রী। ও একটা ছোট্ট বোড়ে। আর বাকি সব গুটি— গজ, ঘোড়া, নৌকো সবকিছু তার দিদি। সবাই তাকে সর্বক্ষণ ঘিরে রয়েছে ও নানারকম নির্দেশ দিয়ে চলেছে।

নিয়ম-নিষেধের বেড়াজালে বাঁধা জীবনযাপন। সেখানে মাপা হাসি, মাপা আনন্দ, মাপা দুঃখ, মাপা চাওয়াপাওয়া। একটুও বাড়বাড়ন্ত নেই কিছুর। নিরাপদ নিরুপদ্রব নির্বিঘ্ন জীবনযাপন। পা পিছলে গেলে পড়ে যাওয়ার আগেই হাত ধরে ফেলার মানুষ আছে। রাস্তা হারিয়ে ফেললে ঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেবে কেউ।

সাপ নেই সিঁড়ি নেই। হারানোর ভয় নেই, সাফল্যের উন্মাদনা নেই, যুদ্ধজয়ের আনন্দ নেই।

ছোটবেলাটা যেন একটা সাদা কালো ছক কাটা আলো ছায়া ভরা ঘর।

আলো আলো দিনগুলোতে মা স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসত বাড়ি। দিদি তখন কোনো বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে বেরিয়েছে। বাড়িতে শুধু মা আর ও। মায়ের গা ঘেঁষে বসে ও মার ছোটবেলার গল্প শুনত। জামশেদপুরের গল্প, সুবর্ণরেখা নদীর গল্প, দলমা পাহাড়ের গল্প। বিশাল একান্নবর্তী পরিবার ছিল মায়ের। মা সব ভাইবোনেদের সঙ্গে কেমন আনন্দে মজায় দুষ্টুমিতে দিন কাটাত। কলকাতা বেড়াতে যেত শীতের ছুটিতে। গল্প শোনার থেকে বেশি ও মাকে দেখত— ভালোবাসত মার আলো ভরা উজ্জ্বল চোখমুখ দেখতে।

খুব হাসি ও আনন্দে ভরা ছিল সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার দিনগুলোও। বাবা চার বছর ছাড়া এলটিসি পেত। তখন ওদেরকে বেড়াতে নিয়ে যেত ট্রেনে করে। খুব দূরে নয়— তামিলনাড়ুতেই বা বড়জোর আশেপাশের রাজ্যে। হোটেলে থাকত আর গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে বেড়াত।

দুঃখী দুঃখী কালো দিনগুলো সব দিদির ওপর অভিমানে ভরা। দিদি ওর আঁকা ছবি নিয়ে, হাতের লেখা নিয়ে, গান গাওয়া নিয়ে, চুল বাঁধা নিয়ে, ওর সব কিছু নিয়েই হাসাহাসি করত। কত সময় দিদির ওপর রাগ করে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির নীচে অন্ধকার জায়গাটায় ঢুকে মুখ কালো করে বসে থাকত সে।

অথচ দিদির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সব সুখস্মৃতিও। প্রত্যেক শনিবার স্নান করে স্কার্ট আর ব্লাউজ পরে লম্বা চুলে দুটো বিনুনি করে চলে যেত কলোনির একমাত্র হনুমান মন্দিরে। ঠাকুরের কাছে ভক্তি ভরে প্রার্থনা সেরে মন্দিরকে গুনে গুনে আটচল্লিশবার প্রদক্ষিণ করত দুজনে।

কী আনন্দই না ছিল স্কুলের সেই লম্বা ছুটির দিনগুলোতেও। দুজনে ছাদে উঠে পুরনো বিছানার চাদর দিয়ে নানা কায়দায় ঘর বানাত আর সেই ঘরে বসে বসে খেলনাবাটি নিয়ে খেলত। খেলতে খেলতে কখন শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ত ওদের বানানো খেলাঘরে।

বাড়ি আসতেই কত শত স্মৃতিরা ভীড় করে আসে। তিন চারদিনের ছুটি হইহই করে কেটে যায়।

বাবার সঙ্গে টাকা পয়সা ম্যানেজমেন্ট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। বাবা ওর স্বনির্ভর হওয়ার ইচ্ছেকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু স্টকসে ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন, মন থেকে সম্মতি দিতে পারেনি।

–যদি একান্তই শেয়ারে ইনভেস্ট করতে চাও তো একটা ফর্মাল ট্রেনিং নিয়ে তারপরেই বিনিয়োগ করা শুরু করো। সময় নিয়ে ধীরে ও ধরে খেলবে। তাড়াতাড়ি লাভ করার কথা ভাববে না। ভবিষ্যতে অভিজ্ঞতা বাড়লে তখন সেই মতো সিদ্ধান্ত নেবে।

দীপাবলির দিন সেই ছোটবেলার মতো খুব ভোর ভোরঘুম থেকে ওঠে সবাই। জিনজেলি তেল মেখে স্নান করে নতুন জামাকাপড় পরে সেজেগুজে রেডি হয়ে যায়। বাজি ফাটানো শুরু করার আগে বিজয়ার মা সবাইকে এক চামচ করে সেই ভয়ানক হোমমেড সর্বরোগহরা লেগিয়াম খাইয়ে দেয়। তারপর বাজি ফাটানো চলে ঘন্টা খানেক। ততক্ষণে প্রায় সকাল হয়ে এসেছে। তারপর শুরু হল নানারকম খাবার বানানো আর খাওয়াদাওয়া। লাড্ডু, মুরুক্কু, জাঙ্গিরি, ওক্কারাই, আধিরসম, বাদুসা।

 

এগারো

বছর তিন চার দ্রুত কেটে গেছে। সিঁড়িতে ওঠায় এখন সে অনেক সচ্ছন্দ ও আত্মপ্রত্যয়ী। কর্পোরেট দৌড়ে ওর সমসাময়িক লোকজনের থেকেও অনেকটা এগিয়ে গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আমেরিকা ইওরোপ ঘুরে এসেছে।

ট্রেনিং নিয়ে ইনভেস্টমেন্ট শুরু করেছে অল্প অল্প। মানি ম্যানেজমেন্ট নিজে শিখছে আর রমেশকে শেখাচ্ছে একটু একটু করে। রমেশও যেন নেশা পেয়ে গেছে। শ্বশুরমশাইও কিছুটা বাধ্য হয়ে আলগা করেছেন রাশ। সম্পর্ক একটু ঠান্ডা হয়ে গেলেও অসহনীয় নেই। জীবনট অনেকটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

এই সময় কোম্পানির নতুন সিইও হিসেবে নিযুক্ত হন মিঃ ড্যানিয়েল উইলসন। তিনি এসেই ঘোষণা করেন—

–ঊই আর গোয়িং টু টেক সিগনিফিক্যান্ট মেজারস টু স্ট্রেংদেন আওয়ার ফাইনান্সিয়াল পোজিশন।

তিনি কস্ট সেভিংসের জন্যে পুরো ব্যবসাটাকে রিঅরগানাইজ করতে চান। ডিপার্টমেন্টগুলোকে রিস্ট্রাকচার করবেন এবং কোম্পানির প্রত্যেকটা পোজিশনকে রিভিজিট করবেন।

এক মাসের মধ্যেই খুব তৎপরতার সঙ্গে পৃথিবীর সব ডিপার্টমেন্ট হেডদের সঙ্গে মিটিং শুরু করলেন। জেনে নিতে শুরু করলেন লাভক্ষতির হিসেব, স্ট্রেন্থ আর উইকনেস, আন্দাজ করছেন কেপেবিলিটি। সেই আনুযায়ী ডিসাইড করবেন কতটা বাজেট দেওয়া হবে কোন ডিপার্টমেন্টকে। প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টওসেই অনুযায়ী তাদের টিমের বাজেট ঠিক করবে। শুরু হবে জটিল এক নাম্বার গেম। টিমে কতজন থাকবে? টিমে জুনিয়ার, মিডিয়াম আর সিনিয়ারের রেশিও কেমন হবে? কারা বাদ যাবে খেলা থেকে? অন্য টিম কি তাদের খেলায় ডাকবে নাকি এক্সট্রা প্লেয়ার হিসেবে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হবে? কাউকে কি বিতাড়িত করা হবে?

পুরো হায়ার ম্যানেজমেন্টে নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। টপমোস্ট লেভেলের অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছেন। আর সেই ফাঁকা জায়গায় সিইও তার পরিচিত লোকদের এনে বসিয়ে দিচ্ছেন। কিছু পুরনো লোকজন অমঙ্গল আসন্ন আশঙ্কা করে চাকরি খুঁজে নিয়ে রিজাইন করতে শুরু করেছে। তারা যখন নতুন কোম্পানিতে যাচ্ছে তখন তাদের কিছু পছন্দের লোকজনকেও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে হঠাৎ করে এক অভূতপূর্ব মাস মাইগ্রেশান শুরু হয়ে গেছে।

বিজয়ার প্রোজেক্টেও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ টিমমেম্বার রিজাইন করেছে। সামনেই একটা বড় প্রোডাক্টের প্রোডাকশান কাটওভার। বিজয়া প্রোজেক্টের ডেলিভারি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আর একজনকেও যাতে না হারাতে হয় সেই লক্ষ্যে সবার সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করতে শুরু করে। কেউ যেন প্যানিক করে ছেড়ে না দেয়।

এর মধ্যেই একদিন ডিরেক্টর মিঃ কৃষ্ণমূর্তি ওকে ডেকে পাঠালেন। বললেন ও যে তিনটে প্রোজেক্ট ম্যানেজ করে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রোজেক্টটা সবচেয়ে কম প্রফিটমেকিং। ওই টিমের সাইজ এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলতে হবে।

–কোন প্রোজেক্টে মুভ করা হবে ওদের?
–দে উইল বি আস্কড টু গো।

শুনে মুখ শুকিয়ে যায় বিজয়ার। ওরা সবাই খুব ভালো রিসোর্স। সেলস টিম প্রোজেক্ট ধরতে পারছে না বলে প্রফিট হচ্ছে না। তার জন্যে ওরা কেন শাস্তি পাবে?

–প্রোজেক্টটাকে কস্ট-এফেটিভ দেখাতে না পারলে গোটা প্রোজেক্টটাকেই বন্ধ করে দেবে। জুনিয়ার এবং সিনিয়র দুরকমেরই টিম মেম্বারকে এমনভাবে আইডেন্টিফাই করো যাতে প্রোজেক্টের কাজ যতদূর সম্ভব কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
–এতগুলো মেম্বার কমে গেলে কীভাবে নেক্সট ডেলিভারি করব স্যার?
–হায়ার ম্যানেজমেন্টের এটাই নির্দেশ। উই আর জাস্ট ফলোইং দ্যা অর্ডার। দুদিনের মধ্যে আমার লিস্টটা চাই।

বিজয়া শ্লথ গতিতে নিজের ডেস্কে ফিরে আসে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। হৃৎপিণ্ডটা যেন রেস করছে। মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে পারছে না কিছু। কী করে সে কাউকে ছাঁটাই করবে। নিজের অনিচ্ছে সত্ত্বেও সে আজ এক বিষধর সাপে পরিণত হয়েছে।

টিমের লিস্টটা নিয়ে নামগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টে। প্রত্যেকটা নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক একটা প্রাণবন্ত মুখ মনে পড়ে। নামগুলো তো শুধু নাম নয়, একরাশ সম্ভবনাময় জীবন। তাদের প্রত্যেকের এক একটা নিজস্ব গল্প রয়েছে।

কিশোর দু মাস আগে বিয়ে করেছে, সবে গাড়ি কিনেছে লোন নিয়ে। পূর্ণিমা খুব ট্যালেন্টেড আর পরিশ্রমী মেয়ে, সবে ম্যাটারনিটি লিভ থেকে ফিরেছে। রাজেশ ফ্ল্যাট কিনেছে, এখন চাকরি গেলে কীভাবে লোন শোধ করবে? অর্ণবের বিশাল ফ্যামিলি, ও একমাত্র উপার্জন করে। মিতালি চাকরিটা কিছুতেই ছাড়তে চায় না বলে অনেক দূর থেকে কত কষ্ট যাতায়াত করে। বিকাশ কলেজ পাশ করে জয়েন করেছে মাত্র ছমাস। ভাস্কর একটু স্লো। কিন্তু খুব সিনসিয়ার। সাধারণ কাজ দিলেও কোন অভিযোগ ছাড়াই রাতদিন খেটে কাজ শেষ করে দেয়।

বুঝতে পারে না কীসের ভিত্তিতে কাকে বাদ দেবে, কাকে রাখবে। তাও দু চারজন নয়, এতগুলো ছেলেমেয়েকে। ওর সঙ্গে কত দিনের সম্পর্ক, কত সৌহার্দ্য। ঘুমোতে পারে না রাত্রে।

পরের কদিন অফিসের বেসমেন্টের পার্কিং লটে গাড়িটা পার্ক করে স্টিয়ারিং হাতে চুপ করে বসে থাকে। অফিস ঢুকতে ইচ্ছে করে না তার। সারা শরীর বিদ্রোহ করে। গাড়ির বাইরে পা দিলেই যেন সে একটা আস্ত সাপে পরিণত হয়ে যাবে। গা শিরশির করে ওঠে ওর।

লিস্টটা জমা দেওয়ার পরের সপ্তাহ থেকে ডিরেক্টর মিঃ কৃষ্ণমূর্তি অফিসে আসা বন্ধ করে দিলেন। অফিসিয়ালি বলা হল উনি ছেড়ে দিয়েছেন। অন্য একজন ডিরেক্টর দায়িত্ব নিয়ে নিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।

সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে লে অফ শুরু হয়ে গেছে। যাচাই করার কোনও উপায় নেই। যা হচ্ছে তার থেকে কয়েক গুন বেশি করে গুজব ছড়াচ্ছে মুখে মুখে। মানসিকভাবে সবাই খুব দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভয় করছে বিজয়ারও। যেন হঠাৎ করে চারিদিক থেকে সব সিঁড়িরা উধাও হয়ে গেছে। আবার সাপেরা ঘিরে ধরেছে তাকে। সাপের বিষে সে অসাড় হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

 

বারো

নিজের এক আঁচড়ে অনেকগুলো ছেলেমেয়েকে চাকরি থেকে বিতাড়িত করার পরে প্রায় এক মাস হয়ে গেছে। ও এখনও সহজ হতে পারেনি। টিমের বাকি মেম্বারদের দিয়ে কাজ ডেলিভারি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না।

একদিন হিউম্যান রিসোর্সের হেড ওকে ডাক পাঠায় বারোতলার বোর্ডরুমে। নতুন ডিরেক্টর আর একজন হিউম্যান রিসোর্স টিমের লোক বসে ছিলেন রুমে।

খুব মোলায়েম গলায় দুজনে মিলে ওকে বুঝিয়ে বললেন, কোম্পানির লিডারশিপ টিম স্ট্রাটেজিক্যালি রিঅ্যালাইন করছে ব্যবসাটাকে। কোম্পানির লোকসংখ্যা দশ থেকে পনেরো শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হবে। ও যে প্রোডাক্টটা ম্যানেজ করছিল সেটা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই ওর ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরমেন্স রেটিং থাকা সত্ত্বেও ওকে ওরা চাকরিতে রাখতে পারছে না। আজই ওর লাস্ট ডেট। ও ইচ্ছে করলে নিজেই পদত্যাগ করতে পারে। সেটা ওর নিজের কেরিয়ারের জন্যেও ভালো হবে।

–ইউ নো হাউ ডিফিকাল্ট ইট ইজ ফর আস টু মেক দিস ডিসিশান।

বলেই একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় সই করার জন্যে। সেখানে লেখা আছে, সে নিজের প্রয়োজনে, নিজের ইচ্ছেয় পদত্যাগ করছে। বিজয়া সই করে দেয় সেই কাগজে।

ল্যাপটপ আর আইডি কার্ড জমা দিয়ে দেয়। একটা ফাইল রেডি করাই ছিল, সেটা ওর হাতে ধরিয়ে দেয়। তাতে সমস্ত দরকারি কাগজপত্র আছে। এমনকি তার সব গুণাবলি লেখা এক্সপিরিএন্স সার্টিফিকেটও রাখা আছে।

–নাও ইউ আর ফ্রি টু গো। থ্যাঙ্কস ফর অল ইয়োর ওয়ার্ক।

 

তেরো

আশ্চর্যভাবে তার মনটা নির্ভার লাগে। আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা পেঁজা তুলোর মতো হাল্কা লাগে নিজের অস্তিত্বকে। সাপ আর সিঁড়ির তফাত করতে পারে না সে আজ। ভেবেছিল ওকে ছাঁটাই করলে ও সর্পাঘাতে গড়িয়ে পড়বে নীচে। কিন্তু মনে হছে কোন এক অচেনা সিঁড়ি বেয়ে আজ ওর উত্তরণ হল।

চাকরি যেন একটা ভারী মোটা নোঙর দিয়ে বেঁধে রেখেছিল তাকে এই বস্তুবাদী, ভোগবাদী পৃথিবীর সঙ্গে।

ছোটবেলা থেকে শুধু একটাই লক্ষ্য ছিল— ভালো করে পড়াশোনা করা, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা যাতে বড় হয়ে একটা ভালো চাকরি পাওয়া যায়। আর চাকরি পেয়ে লক্ষ্য পদোন্নতি করা, আরও পয়সা রোজগার করা, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আরও ওপরে উঠে যাওয়া। সিঁড়িভাঙা সফরে সারাক্ষণ তাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে যাতে কোনও সাপ ছোবল মেরে তার সাফল্যকে বিষিয়ে না দিতে পারে, সিঁড়ি থেকে ঠেলে না ফেলে দিতে পারে কেউ। চোখে ঠুলি পরে একলক্ষ্যে একনাগাড়ে কবে থেকে সে দৌড়ে চলেছে।

এত দিনে একটু ফুরসত হল দাঁড়ানোর, বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার, বয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে প্রাণ ভরে অনুভব করার, চোখ ভরে পরিপার্শ্বকে নজর করার, তারিয়ে তারিয়ে এই নশ্বর মনুষ্যজীবনটাকে উপভোগ করার। নাহ্‌, এই রকম নোঙরহীন সে ভেসে বেড়াতে চায় জীবনের নদীতে আরও কিছু দিন, আরও কিছু সময়।

বাড়ি ফিরে গাড়িটা পার্ক করছে, মিঃ কৃষ্ণমূর্তির ফোন— ইজ ইট গুড টাইম টু স্পিক টু ইউ?

প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর বললেন—

–তোমার রিজাইন করার খবর পেয়েছি। আমি জয়েন করেছি একটা স্টার্ট আপ কোম্পানিতে— ইনফোটেক প্রাইভেট লিমিটেড। তুমি কি জয়েন করতে আগ্রহী? পে প্যাকেজ নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না।
–থ্যাঙ্কস ফর দ্য অফার, স্যার। আমি দুদিন সময় চাই ভেবে দেখার জন্যে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

আপনার মতামত...