গঘ তরিকার মরমিয়া হরিদ্রা সূর্যমুখী

গঘ তরিকার মরমিয়া হরিদ্রা সূর্যমুখী -- শফিকুল কবীর চন্দন

শফিকুল কবীর চন্দন

 

এক পার্থিব বিষয়
ফুলদানিতে সূর্যমুখী
টেবিলে রাখা
যার রং— হলুদ ও স্পন্দিত
গহন নিবিড় এক চিত্রকর্ম
প্রতিটি ফুল ভিন্ন সংস্করণে
হয় নির্জীব
বা ইচ্ছেপূরণ
অথবা পূর্ণপুষ্পিত
কিংবা মাঝামাঝি কিছু
হয়তো পাকানো এবং ঈষৎ বাঁকানো
অথবা আনত
কিংবা পুরো উদোম
দীপ্তিময় সূর্যমুখী
রচিত সাকুল্য গাঁথা
ফুলের তোড়া
ফলত পরিপূর্ণ
সাধারণত্বের শৃঙ্খলায়
খোদ এ আবিশ্বে।[[১]]

ফুলের ছবি জগতের কোন চিত্রশিল্পী না এঁকেছেন। গঘও এঁকেছেন। প্রবলভাবেই আঁকতে চেয়েছেন। সূর্যমুখী ফুল সারাদিন সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। মানে সকালে থাকে পুবমুখী। আর সূর্যের সাথে সাথে ক্রমাগত পশ্চিমমুখী হতে থাকে। গঘ নিজেও ছিলেন সূর্য মুখাপেক্ষী।

আমারও প্রার্থনা ছিল উচ্চারিত হৃদয়ের কাছে
মেঘমুখী ফুল তুমি সূর্যমুখী হও [[১ক]]

হলুদিয়া সূর্যমুখী। সূর্যের মুখাপেক্ষী স্বর্ণমুখা হয়ে এইখানে জিতে যায় হলুদ। গ্রীষ্ম দিন। সূর্যমুখীর উজ্বল হলুদের তীব্র আশ্লেষ। ভ্যান গঘের নিষ্কলুষ সূর্যমুখীর সংগ্রহশালা। সূর্যমুখী তাঁর বুকের বিশাল ক্যানভাসে রং তুলিতে যে দিব্য উন্মাদনা সৃষ্টি করে সে সূর্যমুখী চিত্রকলার নন্দনতত্ত্বের আরকে অমরত্বের দাবি তুলে ভিনসেন্ট স্রষ্টাকে স্মরণ করে তাঁর চিত্রপ্রেমীরা।

ঠিক এমন এক সূর্য, যার আলোর রং ব্যাখ্যায় চাই অন্য শব্দ। তাকে আমি হলুদই বলতে পারি, ঈষৎ ম্লান হলুদ, স্বর্ণালী গোঁড়ানেবু রং। কী যে চমৎকার হলুদ! [[২]]

গঘের জড়জীবন চিত্র খুব বেশি আলোচিত নয়! ব্যতিক্রম তাঁর সূর্যমুখীরা। শুধু তাই নয়, তন্মধ্যে সমতল পৃষ্ঠে বা ফুলদানিতে বিশ্রামরত সূর্যমুখীরা গঘের সৃষ্টিকুলে অন্যতম বিষয়ী ‘তারকা’ হয়ে রয়েছে। প্রফুল্ল হলুদে বিষয় পুনর্নবীকরণের প্রচেষ্টায় তাঁর অন্বেষণ শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে ক্রমাগত লক্ষণীয় মাত্রায় আগ্রহোদ্দীপক। একগুচ্ছ বর্ণ প্রয়োগ ছাড়াই একবর্ণের সূর্যমুখীর সৃষ্টি প্রকল্প তাঁকে নাছোড় করে রেখেছিল। মতান্তরে সূর্যমুখীকে চিত্রাঙ্কনের বিষয় করে ১২টি চিত্র এঁকেছিলেন ভ্যান গঘ।

ভিনসেন্টকে থিও একবার বলেছিল,

তুমি থেকো তোমার মতোই। নিজস্বতা নিয়ে। ইম্প্রেশনিস্টদের থেকে শিখে নাও শুধু আলো আর রঙের খেলা। অন্ধ অনুকরণ করবে কেন? তুমি যে তুমিই। তোমার চেতনা, স্পর্শ, অনুভবের সূক্ষ্মতা ছড়িয়ে দিও নিজের মতো করে। তুলির টানে/পেন্সিলের আঁচড়ে। তোমার ছবিতে আনো সূর্যের উজ্জ্বল বিভা, আনো আকাশের মুক্তি। ক্যানভাস ভরিয়ে দিও তোমার অবরুদ্ধ আর অবদমিত যত আবেগের রঙে।

ভিনসেন্ট হলুদ বোঝেন সূর্যমুখীতে, গম যবের ক্ষেতে, খড়ের গাদায় দুনিয়াদারির আলোর বনে। হলুদ হরফে আঁকা আলোর ইশতেহারে। অস্থিরমতির আঁকার প্রেম হয়ে যায় চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া সতেজ হলুদ সূর্যমুখীর সাথে।

গঘের হলদে আলোর জগৎ। ছবির দুনিয়ায় আলোর দখলদারির গঘিয় আঙ্গিকে অন্যআলোর উপস্থাপন। এক অস্থির বাতুল সত্তা নিয়েও কী প্রবলভাবে বেঁচে থেকে আঁকাআঁকি করা যায়। আলোর দিকে পক্ষপাত নিয়ে দৃষ্টি দেওয়া যায়। সূর্যস্নাত রঙে মাতাল দৃশ্যচিত্র সব। প্রগলভ ভিনসেন্ট সূর্য, গ্রীষ্ম, আকাশের রং ছড়িয়ে দেন ইচ্ছেমতো।

বাহারি পুষ্প ধরায় ফোটে
সমাধি কী তার তথ্য রাখে!
তুরীয় আলোর জানা
ধ্যানাত্মা উড়বে তখন
যখন সে শিল্প হবে
সূর্যমুখী, সূর্যসঙ্গী। [[৩]]

হলুদ অনুরাগ, সূর্যানুরাগ, উত্তাপের রংবিহার তাঁর রংজমানার বিষয়আশয়। সূর্যমুখীর রাজ্যে তাঁর রঙের সারমর্ম হাজির করতে ‘যাজকীয় বর্ণপ্রয়োগ বিধি’র বৈপরীত্যে বিভ্রান্তির অবকাশকে থোড়াই কেয়ার ভাব। তাঁর হলুদ রংশৈলী পাঠের অত্যাবশ্যকীয় অধ্যায় ‘ভিনসেন্ট স্টাইলের সূর্যমুখী’র নিখুঁত পৃষ্ঠা।

ঝাপসা দৃষ্টির বৈকল্য নয়, বরং প্রচলিত ‘রংআদর্শের’ বাইরে নিজস্ব রং ব্যবহার যা তার প্রস্বর গহন স্বরের ব্যাপ্তির নিরীক্ষা। দৃষ্টিবর্ণ বিশারদদের কথিত ‘রংঘাটতি’তে না ভুগলে এই ধাঁধানো ‘হরিদ্রা’ প্রভাবিত আঁকাসকলের জন্মই যে হত না। জন্ম হত না সোনালী বরণে সেজে ওঠা গঘীয় প্যালেটের।

প্রকাশবাদী রংতত্ত্বে প্রতিপক্ষ পদ্ধতির রং প্রয়োগের বিপরীতে তাঁর স্বীয় নিরীক্ষার ছবি সূর্যমুখী। ফলে হলুদ টেবিলে হলুদ ফুলদানি হলুদ রঙের দেয়ালের পটভূমিতে হলুদ সূর্যমুখী কী আলোই না ছড়াচ্ছে! এই হলুদে ঘোর গঘের ‘হলদেবিষয়ীর বৈচিত্র’ বলা যেতে পারে।

কী দুর্দান্ত হলুদ। সূর্যের প্রতি তার দারুণ এক পক্ষপাত। [[৪]]

হলুদ রঙের প্রতি ভ্যান গঘের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রকৃতপক্ষে অনেক জল্পনা প্রচলিত। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনায় স্পষ্টত যে, গঘের রঙের স্কিমটিতে তাঁর চূড়ান্ত ইচ্ছাধীন ‘রংদৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা’র কোনও বালাই নেই। উজ্বল, কোমল হলদে, চমকপ্রদ সূর্যমুখী সব ভিনসেন্ট জমানার অনন্য সৃষ্টি।

গঘের সমসাময়িক শিল্পী এডগার দেগাস বিনয়ের সাথে বলেছিলেন,

শিল্পী যা দেখেন তা শিল্প নয়, বরং অন্যকে দেখাবার নিমিত্তে যা সৃষ্ট তাই শিল্প।

হলুদ সূর্যের রং— আমাদের গ্রহের জীবনদায়ী। তা জীবন, শক্তি, সুখ, আশা, স্বাধীনতা সমার্থক। অথচ ‘হলুদতত্ত্বে নাজেহাল’ করবার না করবার দুরকম বৈপরীত্যই দৃশ্যমান। যেন ইয়েলো মেলইয়ো।

জানা ভালো, দৃশ্যের বাইরেই প্রকৃত বাস্তব, শব্দের বাইরেই জীবনের আসল দর্শন। জেনো, ভুল সংখ্যক পাপড়ি নিয়েই ভ্যান গঘের সূর্যমুখী উচ্চতর সত্য হয়ে যায়। [[৫]]

রঙের ভারসাম্য ও সম্প্রীতিতে তাঁর নিজস্ব রংতত্ত্ব তৈরি করেছিলেন। যা গভীর উপলব্ধিজাত পরিপূরক রংতত্ত্ব বোঝার সাথে সম্পর্কিত। আর প্রত্যাখ্যাতের রংবাজিই তাঁর নান্দনিক অভিজ্ঞান।

তাঁর চিত্রচর্চা— অনুশীলন, উদ্ঘাটক তথা জীবনবাজি এক মহড়া। যাকে তিনি ‘নতুনধর্ম’ অর্থাৎ যাপনধর্মের শেষ বিপর্যয় হিসেবে দেগে দিয়েছিলেন!

ভিনসেন্ট ১৮৮৮ সালের আগস্টের মাঝামাঝি আর্লস থেকে ভাই থিওকে লেখেন—

তুমি যখন জানবে যে আমি কিছু চমকপ্রদ সূর্যমুখী আঁকছি তখন তুমি নিশ্চয়ই আশ্চর্য হবে না।…..

আমার হাতে তিনটি আঁকা ক্যানভাস আছে, প্রথমটা হালকা পশ্চাদপটের উপর সবুজ ফুলদানিতে তিনটে মস্ত বড় ফুল। ….. দ্বিতীয়টায় তিনটে ফুল, একটায় বীজ ধরেছে, পাপড়িতে ডোরাকাটা দাগ, আর একটা সবে আরম্ভ করা হয়েছে, এদের পশ্চাদপটে রয়েল ব্লু। আর তৃতীয় যে ক্যানভাসটা তাতে হলুদ ফুলদানিতে বারোটি ফুল। শেষটায় আলোর উপর আলো নিয়ে করা, আমার মনে হয় ওটাই সবচে ভালো হবে। হয়তো এর পরেই আমার থামা হবে না।’ ‘…..গগ্যাঁর সাথে প্রত্যাশিত বসবাসের সময় আমাদের নিজস্ব কর্মশালাকে সাজিয়ে তুলতে বড় বড় সূর্যমুখীই যথেষ্ট।

মায়া কোলাহলে, ঋতুসঙ্কল্পে ফুলগুলি ফুটে ওঠে ক্যানভাসে। ভিনসেন্টের ফুলদানিতে সুর্যমুখীর দল মুখ তোলে। এঁকে যাচ্ছেন পর পর হলদে সূর্যমুখী ফুলের ছবি। সবার আগে ঐ সূর্যমুখী দখল করে নেয় ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের হলুদ ধাঁধার জাদু। যেখানে গ্রীষ্মের প্রখর আলোয় দেখা সূর্যমুখীদের ক্যানভাসের রংবাহারি অবয়বে ধরতে মেতে ওঠেন ভ্যান গঘ, তখন স্মিত হাস্যোজ্বল হলুদ সূর্যমুখী আর সূর্যের সাথে আপাতত তার যত দেনাপাওনা। অমরত্বের ইশারায় সূর্যমুখীদের হলদে ঝলক বিহ্বল রূপ দেখতে চিত্রামোদীদের তখনও বিস্তর অপেক্ষা যদিও।

ভ্যান গঘ তাঁর বোনকে এক পত্রে, স্যাঁ রেমি, ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০ লেখেন—

মনে হয়, আমার সমস্ত ছবিই শেষ পর্যন্ত গভীর উদ্বেগ আর যন্ত্রণার ফসল, সে জন্য সকলের কাছে ক্ষমা চাই। যদিও ওই গ্রাম্য, অমার্জিত সূর্যমুখীর ছবিতে ওরা কৃতজ্ঞতার প্রতীক খুঁজে পেয়েছে।

বিষয়ের অনুষঙ্গে ভ্যান গঘ রঙিন, তাঁর নিরানন্দ বিষণ্ণতার একঘেয়েমি থেকে সূর্যালোক নাটকীয় রংবদলের নিমিত্ত। ফলে অপ্রত্যাশিত সংঘাত সাহসী ‘রংবাজি’ হয়ে সমন্বয়ের সুর ও ঐক্যের রূপরেখারই অনুধ্যান হয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে। যা নিজেকে নির্মাণ প্রস্তাবনায় প্রশ্রয়ীত করে থাকবে।

আকুতিভরা হলুদ রঙের মর্মভেদী আঁচড়গুলো— ব্যক্তিগত বিহ্বলতা নিয়েই তাঁর বিষণ্ণতা সহ অবচেতনে আপনিই মিশে যায়। তাঁর অমোঘ সৃষ্টির মরমিয়া আধুনিকের ‘গান ও গৌরব’-এর দর্শক হয়ে অনিমেষ তাকিয়ে আমরা যাচাইয়ে না মেতে যাচ্ঞার নৈকট্যবোধে বিলীন হই গঘের হলুদ আখ্যানে।

আমি এখানে আমার ক্যানভাসগুলি রাখছি, এবং আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে আমার সূর্যমুখীদের রাখছি। [[৬]]

কর্জ সূত্রাসূত্র:

  • [[১]] প্রিমা মেত্তা, মনুষ্য
  • [[১ক]] আজিজুল হক, মেঘমুখী সূর্যমুখী
  • [[২]] ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ
  • [[৩]] সারা যিওয়েট, সূর্যমুখীর সত্তা
  • [[৪]] ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ
  • [[৫]] কোমল আর কড়ি, কুমার চক্রবর্তী
  • [[৬]] ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...