ভারতীয় শ্রমিকরা কি কৃষি আন্দোলনের থেকে শিক্ষা নেবেন?

অর্ক দেব

 



সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

দেশভাগ দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। জরুরি অবস্থা দেখিনি। এমনকি মারাদোনার বিশ্বকাপ জয় সরাসরি দেখিনি। বাবরি যখন ঘটেছে তখন দেয়ালা করার বয়স। প্রথম বড় অভিঘাত ৯/১১-এ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস হওয়ার ঘটনা, প্রথম পাঁজরে কাঁপুনি ২৬/১১-এ মুম্বই হামলা। কিন্তু এই দেখা না-দেখায় মেশা সামান্য জীবনের ভিত কাঁপিয়ে দিল ২০২০ সাল। ভুলে যেতে পারলেই বাঁচি, কিন্তু করোনা-লকডাউন, রাজপথে নিরন্ন মানুষের মিছিলের সিল্যুয়েট স্বপ্ন এখনও নিয়ম করে ধাক্কা মারে। অন্ধকারের বনপথ ধরে কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটে বাড়ির সামনে এসে মরে গেল যে মেয়েটা, জামলো মাকদম নাম, তার মুখ ভুলতে পারি না। অথবা নয়ডার সেই শ্রমিক, রামপুকার পণ্ডিত, মৃত্যুপথযাত্রী ছেলে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাইছে, আর পু‌লিশ যেতে দিচ্ছে না তাঁকে। ছবি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছিল তাঁর আর্তনাদ। এমন লাখো দৃশ্য হাজার হাজার প্রশ্নে মনটাকে প্রশ্নে ভরিয়ে রেখেছে আজও, যতদিন বাঁচব এসব প্রশ্ন মন থেকে যাবেও না। জানতে চাইব, এই রাষ্ট্র আসলে ঠিক কোন বর্গের জন্য বাসযোগ্য? আদালতে সুবিচার কারা চাইতে ও পেতে পারেন? ভুখা অভিবাসী মানুষ যাদের জমি থেকে আয় নেই বলেই অন্য রাজ্যে কাজে যেতে হয়েছে গত কয়েক দশক ধরে, তাদের নাগরিক অধিকারের পরিধি কতটুকু? যতদিন বাঁচব ততদিন মনে রাখব এত বড় অতিমারিতেও কীভাবে পেশিশক্তিকে ব্যবহার করে বড় পুঁজিকে জায়গা পাইয়ে দিয়েছিল কেন্দ্রের সরকারবাহাদুর।

২৫ মার্চ দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা হয়। মাত্র চার ঘণ্টার নোটিসে জারি হওয়া এই লকডাউনে অন্য সময় অদৃশ্য এক বিরাট জনগোষ্ঠীকে আমরা পথে নামতে দেখলাম। আমরা গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকেরা ঘরে বসে বসে দেখলাম লক্ষ শ্রমিকেরা খাদ্যসুরক্ষা অভাবে ও বাসস্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়লেন, হাজার হাজার মাইল পায়ে হেঁটে ফিরতে চাইলেন নিজেদের ‘দেশে’। অনেকে বলেছেন এই ঘটনাকে স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময় যে বিপুল এক্সোডাস, শুধুমাত্র তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আমি অবশ্য এই ঘটনাকে অতীতের কোনও ঘটনার সঙ্গে তুলনাই করতে চাই না। এটি সম্পূর্ণ নতুন, নির্লজ্জতম ঘটনা। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, এই ঘটনা ভারত সরকারকে চরিত্রকে বেআব্রু করে দিয়েছে। লকডাউন ঘোষণার সময়ে অভিবাসী শ্রমিকরা কোথায় যাবেন, কী খাবেন তাই নিয়ে কোনও পরিকল্পনাই ছিল না কেন্দ্রের। এই বর্গটাকেই চিহ্নিতই করা হয়নি। বিহার, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ থেকে বড় শহরগুলিতে আস্তানা গেড়ে অভিবাসী শ্রমিকরা অস্থায়ীভাবে যেখানে থাকেন, সেই জায়গাগুলিতে খাদ্য-বাসস্থান-মজুরি অনিশ্চিত হচ্ছিল প্রতিদিন। ফলে রাস্তায় নামা ছাড়া অভিবাসী শ্রমিকদের আর কোনও উপায় ছিল না। এদিকে বাস ট্রেনও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বন্ধ হয়ে যায়। অগত্যা একটাই পথ ছিল, পায়ে হাঁটা। হোস্ট স্টেট থেকে সার্ভিস ভিলেজ (যে গ্রামগুলি থেকে এই শ্রমিকরা আসেন) ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা, সীমান্তের দিকে হাঁটা দেওয়া। দুঃখ দুর্দশার যে ছবি এই পর্বে আমরা প্রতিদিন দেখেছি, তা এখানে নতুন করে বলছি না, সকলেই কমবেশি জানেন, মুম্বইয়ের এক ট্যাক্সিওয়ালা বলেছিলেন, কাউকে করোনা খাবে, কাউকে খাবে খিদে। বিষয়টা তাইই দাঁড়িয়েছিল। দিনমজুরির পয়সা শেষ হয়ে যাওয়া, বিপদের সময়ে কোনও অগ্রিম অর্থ না পাওয়া, দ্রুত বাড়ি ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, কতরকমের ভয়! না খেয়ে মরার ভয়টাই সবচেয়ে বেশি ছিল অভিবাসী শ্রমিকদের চোখে। ফলে তাঁরা দ্রুত গতিতে হাঁটছিলেন। ঘরে ফেরার জন্য তাদের পদে পদে অশান্তি পোহাতে হয়েছে। বহু মানুষ রাস্তাতেই প্রাণ দিয়েছেন, ঘুমের মধ্যে ট্রেনের তলায় প্রাণ দিয়েছেন। এছাড়া পুলিশ-প্রশাসন বেগ দিয়েছে, কোথাও কান ধরে উঠবোস করিয়েছে, কোথাও একযোগে বসিয়ে গায়ে কীটনাশক ঢেলে দিয়েছে। সড়ক ধরে দিনের পর দিন হেঁটে স্ব-দেশে ফেরার দৃশ্য, কোয়ারেন্টাইনে গাদাগাদি করে থাকার দিনলিপি অতীতের বহু নিপীড়নের কথামালা, বহু সিনেমার ভায়োলেন্সকে ম্লান করে দেবে।

অথচ কেন্দ্র কি চাইলে একটু মানবিক, একটু নমনীয় হতে পারত না! ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের কাছে উদ্বৃত্ত খাবার ছিল। আমরা বহু প্রাকৃতিক দুর্যোগেই দেখেছি সেনা নামতে। শুকনো খাবার বিলিবণ্টনে সাহায্য করেছেন তারা। এক্ষেত্রে তেমনটাও দেখা গেল না। নীতি আয়োগের সিইও অমিতাভ কান্ত সে সময় বলেই ফেলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্কটমোচনে আরও যত্নশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিল সরকারের। লকডাউন শুরু হওয়ার সপ্তাহখানেক পরেই এর অভিঘাতটা কোথায় যেতে পারে তা অনুমান করতে পেরেছিলেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও সিরিল ডিসুজা। তারা একটি জনস্বার্থ মামলা করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন, যাতে কাজ হারানো অভিবাসী শ্রমিকদের গোটা লকডাউন জুড়ে কেন্দ্র ও রাজ্য ন্যূনতম ভাতা দেয়, এমন একটা ব্যবস্থা যেন থাকে যাতে ওই হাতখরচের টাকায় তারা রান্নার তেল, সাবান শ্যাম্পু এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলি অন্তত কিনতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট সেদিন বলেছিল (মুখ্য বিচারপতি এস এ বোবদের বেঞ্চ) শ্রমিকরা তো খাদ্য, অস্থায়ী বাসস্থান সবই পাচ্ছেন, তাদের হাতে টাকার কী দরকার! সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, কতজন অভিবাসী শ্রমিক রাস্তায় আছে বলা সম্ভব নয়। সরকারও সেদিন বলতে পারেনি তারা যে অস্থায়ী আস্থানার কথা বলছে তার সংখ্যাটা ঠিক কত। বলা হয়নি, এই অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে কত শতাংশ তাদের মালিকের থেকে শেষ বেতন পেয়েছেন, কত শতাংশের থেকে বাড়িভাড়া আদায় করে নিয়েছে তাদের বাড়ির মালিক। আর সব শেষে যখন ভারত সরকারকে প্রশ্ন করা হল, ঠিক কত অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হল, তারা বললেন, তথ্য নেই। একে ঠিক কোন বিশেষণে বিশেষিত করা যায়? সরকার কি গোটা বিশ্বের সামনে খোলাখুলি বলতে চাইল, গরিব মানুষ নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই?

২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী সাড়ে পাঁচ কোটির বেশি আন্তঃরাজ্য অভিবাসী শ্রমিক, এদের ব্যাপারে কেন্দ্র কী অপরিসীম উদাসীন, কী পরিমাণ অপরীকরণ চলে তা বোঝা যাবে পরবর্তী সময়ের কয়েকটা সিদ্ধান্তে। কেন্দ্র একটা সময়ে প্যাকেজ এনে বলল মনরেগা প্রজেক্টে অভিবাসী শ্রমিকদের মজুরি ১৮২ থেকে বেড়ে ২০২ টাকা হচ্ছে, এতে এদের বার্ষিক আয় কিছুটা বাড়বে। এই ধরনের ঘোষণা বিরাট একটা ফাঁকি। করোনার কারণে সমস্ত আবাসন নির্মাণ বা একশো দিনের কাজ যখন বন্ধ তখন কীভাবে এই অভিবাসী শ্রমিকরা লাভবান হবেন?

বরং এই সময়েই (৭ এপ্রিল, ২০২০) গুজরাত সরকার  ১৯৪৮ সালের ফ্যাক্টরি আইন ভেঙে কারখানায় ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টার শিফট ঘোষণা করে। আইনানুগভাবে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেওয়া ‌তো দূরের কথা, কোনও ওভারটাইমের কথাই বলা হয়নি ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সার সত্যটা হল, এই লকডাউনেও যখন আদানিদের বিত্ত প্রতিদিন কয়েকশো কোটি টাকা করে বাড়ছে তখন সবাই চেয়েছে তাদের দায় ঝেড়ে ফেলতে। বড় শহরগুলি তাদের আর রাখতে চায়নি, এমনকি নিজের এলাকায় ফিরেও সামাজিক কুংসস্কারের কারণে অনেক মানুষকে মব লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। এইসবের মূলে রয়েছে একটা অবিশ্বাস্য নির্মমতা, দেখেও না-দেখা। অন্য কোনও কিছুর সঙ্গেই এর তুলনা চলে না। ভারত রাষ্ট্র কারা চালান, কাদের কথা ভেবে এই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, কারা ব্রাত্য, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমাদের সংবিধানের  ১৯ নং ধারা বা ২১ নং ধারা যে মানবাধিকারগুলির কথা বলে তা একজন অভিবাসী শ্রমিকের প্রাপ্য নয়?

শাসক অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে ভাবছে না, এখানেই আখ্যান শেষ নয়, বরং শুরু। লকডাউনের ঠিক পরেই অর্থাৎ প্রাথমিক আনলক পর্বে কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি শ্রম আইন পাশ করিয়ে নিল। এই আইনগুলির পক্ষে সরকারের বক্তব্য অনেক বেশি সংখ্যক শ্রমিককে যারা এতদিন অসংগঠিত ছিল, তাদের এখন আইনি সুযোগ সুবিধের আওতায় আনা যাবে। অন্যদিকে আমরা দেখলাম যে শ্রম কোডগুলি শ্রমিককে আরও ক্ষমতাহীন করে দিচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন কোড ২০২০ অনুসারে এখন কোনও সংস্থা যেখানে অনধিক ৩০০ শ্রমিক কাজ করেন, সেই সংস্থায় শ্রমিক ছাঁটাই বা কারখানা বন্ধ করতে মালিকপক্ষের কোনও আইনি বাধা রইল না, শ্রমিকদেরও ধর্মঘট ডাকার অধিকার খর্ব হল।

প্রথম কথা, এই ধরনের আইন আনার ক্ষেত্রে যে পক্ষ আইন প্রণয়ন করছে (সরকার), যাদের মধ্যে আইনটি প্রযোজ্য (মালিক-শ্রমিক) তাদের মধ্যস্থতা দরকার। ভারতবর্ষে তেমনটা হয়েছে কি? হয়নি। দ্বিতীয় কথা ভারতের ১ শতাংশ সংগঠিত সংস্থায় দশজনের বেশি লোক কাজ করেন। ফলে ৯৯ শতাংশের কাজের আর কোনও নিশ্চয়তা রইল না। তাছাড়া এমন বহু সংস্থাই আছে যেখানে হয়তো বহু সংখ্যক লোক কাজ করেন অথচ পাকা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া হয় না। আমি ব্যক্তিগতভাবেও এমন বেশ কয়েকটি সংস্থাকে চিনি, যারা কর্মীকে হাতে টাকা দেয়, পিএফ-এর আওতায় আনে না। এঁদে‌র কী হবে? আমি একমত যে বহু শ্রম আইনের সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু তা বলে যেভাবে বিষয়টি সরলীকরণ করা হয়েছে তা আমার চোখে শ্রমিকবিরোধী। কারণ আমার হিতাহিত নিয়ে কিছু পদক্ষেপ করলে তোমার আমার সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। এই সরকার সেটা করেনি, আমি বলব ঠিক কৃষি আইনের মতোই এক্ষেত্রেও করোনাকালকে ব্যবহার করেছে বিজেপি সরকার। এর সঙ্গে পুঁজির সম্পর্ক আছে, শ্রমিক এখানে যন্ত্রের সমান, তার ভালোমন্দ কিছু নেই, সচল অচল দুটো অবস্থা রয়েছে মাত্র। এবং শ্রমকোডটা এভাবেই করা যে এটি চালু হয়ে হয়ে গেলে এর বিরোধিতা করতে গেলেও নানা শর্তাশর্ত মানতে হবে। ৫১ শতাংশের মত এই বিরোধিতায় না থাকলে শ্রমিকদের এই সংঘ নেগোসিয়েশন ইউনিয়ন বলে মর্যাদা পাবে না। সব মিলিয়ে শ্রমিকের অধিকার এত লঙ্ঘিত অতীতে আর কখনও হয়নি।

এই প্রসঙ্গে মনে হতেই পারে, কৃষি আইনের বিরুদ্ধে যেভাবে কৃষকরা পথে নেমেছেন, শ্রমিকরা সামগ্রিকভাবে এরকম একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন না কি? আসলে কৃষক বললে যেমন একটা বৃহৎ বর্গ বোঝায় যার মধ্যে ক্ষেতমজুর, বড় চাষি, ক্ষুদ্র চাষি ইত্যাদি নানা ভাগ তার মধ্যে  নিহিত থাকে, শ্রমিকও তো তাই। বলা চলে আরও অনেক বড়। জেট এয়ারওয়েজের কাজ হারানো কর্মীটিও শ্রমিক, অভিবাসী শ্রমিকও একই বর্গের। সেই শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আদায় করতে সাহায্য করবে ট্রেড ইউনিয়নগুলি। কৃষকদের ক্ষেত্রে এই ইউনিয়নগুলিই তো রথের রশিটা ধরে রেখেছে। এখন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কি ইউনিয়নগুলি এগিয়ে আসেনি? এসেছে। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে ব্যাঙ্ককর্মীদের ইউনিয়নগুলি পথে আছে, লাগাতার ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু অন্য বহু ক্ষেত্রেই ট্রেড ইউনিয়ন খুবই শ্লথ, অসক্রিয়। বহু ধর্মঘটই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না, দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে না, এমনকি কর্মচারীকে কাজের বিষয়েও উৎসাহিত করতে পারে না। সাংগঠনিক দুর্বলতাই এর মূল কারণ। ফলে বিরাট সম্ভাবনা আমি দেখি না৷ কিন্তু ভারতবর্ষে অসংগঠিত শ্রমিকদের জীবনযাত্রার যা মান, তার উপর শ্রমকোড চালু হলে রাজ্যে রাজ্যে এ ধরনের অসুবিধে তৈরি হবে বলে অনুমান করতে পারি, তা শ্রমিকদের মধ্যে উষ্মার জন্ম দেবে। ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশ এই বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উত্তরপ্রদেশ সরকার যেমন ব্যবস্থা তৈরি করেছে করোনার মধ্যেই যেখানে কাজের জায়গায় অসুস্থ না হলে, শ্রমিকের স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনও দায় বর্তাবে না সংস্থার উপর। ন্যূনতম মজুরি আইন বাতিল হয়ে গিয়েছে। এমনকি এর বিরুদ্ধে শ্রমিকের জন্য কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা নেই।

একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা সম্ভব, এতে বিনিয়োগ উৎপাদন কেনওটাই বাড়বে না, কেবল শ্রমিক অসন্তোষই বাড়বে। এই জায়গায় শ্রমিকরাই নির্ধারণ করবেন তাঁরা পথে নামবেন কিনা। তবে কৃষকরা ভারতবর্ষের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বারবারই উদাহরণ তৈরি করছেন। এর আগে কৃষক লংমার্চের কথাও নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের। ভারতেই তেভাগা হয়েছে, এমনকি জমির অধিকারের মতো বিষয় পশ্চিমবঙ্গে একটি সরকারকে তিন দশকের বেশি রেখেছে এবং উৎখাতও করেছে। আবার এরই সঙ্গে স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতীয় শ্রমিক আন্দোলন গোটা বিশ্বের সমীহ আদায় করে নিয়েছে। অনেকেরই মনে থাকবে কোভিড সংক্রমণের আগেই দেশজুড়ে হরতাল করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলি। মনে থাকার কথা, কীভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রাজস্থানের নীরমানায় ডাইকিন এয়ারকন্ডিশনের কর্মীরা, কতটা জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন গুরগাঁও-এর মারুতি সুজুকির কর্মীরা। ভারতীয় শ্রমিকরা ক্ল্যাসিকাল ট্রেড ইউনিয়নে বিশ্বাস রাখতে পারছেন কিনা তা আমি জানি না। তবে তাদের ঠিক করতেই হবে শ্রমিক আন্দোলন না কৃষি আন্দোলন কোন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবেন তারা। এই ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য আমরা আমাদের কৃষক ও শ্রমিকদের দিকেই তাকিয়ে আছি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3384 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...