মোদি সরকারের ৭ বছর: সাংবিধানিক ভারতের গঙ্গাযাত্রা

শান্ত মিত্র

 

প্রাবন্ধিক, সমাজভাবুক, পেশায় করণিক

যে কোনও আধুনিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা সমাজে এক স্তরের গণতন্ত্রের চিহ্নবাহী। সর্বসম্মতিতে গৃহীত সংবিধানের দিকনির্দেশক নীতিমালা রাষ্ট্র পরিচালনার সাধারণ দিক নির্দেশ সূচিত করে। এই দিক থেকে দেখতে গেলে দেশের জনসাধারণের মনে “সংবিধান-সম্মত”ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা বলতে তাই বোঝায়, সাংবিধানিক সংস্থাগুলির রাষ্ট্রের কাছে মান্যতা, দেশের আইনের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, নাগরিকদের জন্য সংবিধান-প্রদত্ত আইনি ও স্বাভাবিক ন্যায় বিচারের প্রতি শ্রদ্ধা, নিপীড়ন রোধ, সংখ্যালঘুদের প্রতি সমান আচরণ ইত্যাদি। এছাড়া জাতি হিসেবে স্বাধিকার রক্ষা ইত্যাদি বৃহত্তর পরিসরে রাষ্ট্রের ভূমিকা তো আছেই। এই সবকটি বিষয়েই গত সাত বছরে মোদি সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ করে আমাদের দেশটিকে একটি একনায়কতান্ত্রিক দেশে পর্যবসিত করার রাস্তা নিয়েছে। ১০০ বছর আগে নির্মিত  যে পশ্চাদমুখী এক অবৈজ্ঞানিক কল্পসমাজের দিকে আমাদের দেশকে নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের, মোদি সরকার সেই লক্ষ্যে একটির পর একটি পদক্ষেপ করছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সাংবিধানিক কাঠামোর ভারতকে জাতি-বিদ্বেষী একনায়কতন্ত্রী ভারতে পরিণত করা।

আমরা বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করব। প্রথমে আমরা দেখি কীভাবে কেন্দ্রীয় এবং যেসব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে, সেখানে তারা জনতার রায়কে পদদলিত করছে এবং ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কঠামোর যতটুকু পরিসর রয়েছে, সেগুলি কীভাবে বলপ্রয়োগ মারফৎ পদদলিত করছে। অনেক উদাহরণের মধ্যে থেকে আমরা কয়েকটিকে বেছে নিচ্ছি। ২০১৮ সালের মে মাসে হায়দ্রাবাদে পঞ্চদশ ফিনান্স কমিশিনের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ৬টি অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যের প্রতিনিধিরা একযোগে অভিযোগ করেন যে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ধারা লঙ্ঘন করে এই অ-বিজেপি রাজ্যগুলির কেন্দ্রের কাছ থেকে সমহারে ঋণ পাওয়ার এবং রাজ্যের আওতায় থাকা বিষয়গুলির বাজেট নির্মাণে রাজ্যের সুবিধার কথা ভাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর আগে কেরলে এপ্রিল মাসে এই একই বিষয়ে সভাতে একই অভিযোগ ওঠে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলির জন্য সংবিধানের অবশ্যপালনীয় সমতা নীতি থেকে সরে আসার অবস্থানের কোনও পরিবর্তন করেনি।

পরের যে ঘটনাটি আমাদের দেশের সংবিধান-প্রদত্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর সজোরে আঘাত হানে, তা হল রাজ্যের আওতায় থাকা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়কে একতরফাভাবে এবং সাংবিধানিক পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে শিক্ষা বিলকে আইনে পরিণত করা। এই কাজ করার পেছনে যে সরকার অনেকদিন থেকেই রাজ্যগুলির ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অসাংবিধানিকভাবে সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেওয়ার আয়োজন করে, তা বোঝা যায় যদি আমরা সংক্ষেপে ঘটনাপরম্পরা বিচার করি। এই নীতির খসড়া নিয়ে কোনও আলোচনার শুরুর আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত কিছু নতুন নতুন সংস্থা গঠন করে এবং এযাবৎ চলে আসা সংস্থাগুলিকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়। সরকারের লুকোনো উদ্দেশ্য ছিল এই নতুন সংস্থাগুলির মাধ্যমে নতুন শিক্ষনীতি রূপায়িত করা। অন্যথায় বলা যায় যে, এই শিক্ষনীতি দেশের জনগণের জনাদেশে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা এড়িয়ে গিয়েই সরকার ভবিষ্যতের একটি নীতির রূপায়ণের পথে পা বাড়ায় যা কেবল সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, ন্যায়নীতির দিক থেকেও একটি অনৈতিক কাজ।  মোদি সরকার দ্বিতীয়বার মন্ত্রীসভা গঠনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে এই শিক্ষানীতি নিয়ে এক ৪৮৪ পাতার রিপোর্ট জমা করে। বোঝাই যায়, রিপোর্টের কাজ আগে হয়ে না থাকলে এত অল্প সময়ে এত বড় রিপোর্ট প্রস্তুত করা বাস্তবত অসম্ভব। এই এত বড় রিপোর্টের জন্য খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। সময়, রসদ ও অন্যান্য সমস্ত অসুবিধাকে উপেক্ষা করে এই খসড়ার খুঁতগুলি চিহ্নিত করে দু লক্ষ প্রতিক্রিয়া সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা পড়ে, কিন্তু সরকার সেই প্রতিক্রিয়ার কোনও গুরুত্বই দেয়নি। বোঝাই যায়, সরকার একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে স্রেফ আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করেছিল।  সরকারের কাছে সংবিধানসম্মত সংসদের যে কোনও গুরুত্বই নেই তা বোঝা যায় যখন আমরা দেখি যে সরকার মন্ত্রীসভায় এই নীতি বলে যে দলিলটি প্রকাশ করেছে আর দেশের মানুষকে যে দলিলটি পাশ হল বলে প্রচার করেছে, তার মধ্যে ফারাক বিস্তর। যেমন, দেশের মানুষের জন্য বরাদ্দ হল বিলের এক ছোট সারাংশ এবং সর্বমোট ১৩টি পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড, যা ভারতের অধিকাংশ জনতার পক্ষে দেখাই সম্ভব নয়, তা ভারতের সব সরকারি ভাষাতেও দেওয়া হয়নি। সাংবাদিক এবং বিরোধী দলের সাংসদদের প্রশ্নের জবাবে একটি ৬০ পাতার নীতিমালা পাঠানো হয়, যেটি সংসদে যা গৃহীত হয়েছিল সেই পাঠটি মোটেই নয়। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অমান্য করেও সংসদে যে পাঠটি নিয়ে আলোচনা হল, সেটি সরকার সামনে আনল না, আর যে পাঠটি নিয়ে প্রায় কোনও আলোচনা হয়নি, এমন পাঠটি এই সব ঘটনা যখন চলমান, সেই সুযোগে মধ্য রাত্রে, বিল পাশ হওয়ার ৩৪ ঘন্টা পরে চুপিচুপি মানরসম্পদ বিকাশ মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে তা দিয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য দুটি সংস্করণ জনপরিসর থেকে স্রেফ গায়েব করে দেওয়া হয়! সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানোর এমন লজ্জাজনক ঘটনা ১৯৪৭ সালের পর সম্ভবত এই প্রথম ঘটল।

এরপর আমরা আসি সারা দেশ গত ছয় মাস ধরে উত্তাল যে ঘটনাটি নিয়ে, সেই তিনটি কৃষি বিল কীভাবে আইনে পরিণত করল মোদি সরকার, সেই পদ্ধতি নিয়ে। প্রথমেই যে প্রশ্নটি তুলতে হবে তা হল ভারতের সংবিধান কি ভারতের সংসদকে এই জাতীয় বিল আনার বা তাকে পাশ করার অধিকার প্রদান করেছে? সংবিধান বিশেজ্ঞদের মত হল, না করেনি। যে অধিকার সংসদের নেই, সাংবিধানিক বা আইনসঙ্গতভাবে যে অধিকার ভারতের সংসদ প্রয়োগ করতে পারে না, সেই অ-সাংবিধানিক “অধিকার” প্রয়োগ করার জন্য মোদি সরকার, খুব মৃদু সমালোচনামূলক ভাষায় প্রকাশ করলে বলতে হয় যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার জনগণের সঙ্গে জালিয়াতি বা চাতুরি করেছে। তারা তাদের ইচ্ছেমতো কৃষি, খাদ্যসামগ্রী, কৃষিজাত উৎপন্ন ফসল ইত্যাদির অর্থ পরিবর্তন করে সেগুলিকে কর্পোরেট-বান্ধব সাধারণ পণ্যে পর্যবসিত করে দিয়েছে, যা তারা সব রাজ্যগুলির সহমত ছাড়া এই পরিবর্তন করতে পারে না।

ভারতের সংবিধান মতে কৃষি সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনটি তালিকা আছে। প্রথম তালিকাটি কেন্দ্রের তালিকা, এই তালিকাভুক্ত বিষয় কেন্দ্র একতরফাভাবে ঠিক করতে পারে। দ্বিতীয় তালিকাটি রাজ্য তালিকা, যা রাজ্য নিজে ঠিক করবে, যেখানে কেন্দ্রের কোনও হাত নেই এবং তৃতীয়টি যুগ্ম তালিকা, যা কেন্দ্র-রাজ্য যুগ্মভাবে ঠিক করবে। কৃষির ক্ষেত্রে জমি, উৎপাদন, কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ সহ বেশিরভাগ বিষয়ই রাজ্যের আওতায়, তা নিয়ে কেন্দ্র নাক গলাতে পারে না। সব তালিকা মিলিয়ে বিভিন্ন ধারায় কৃষি কথাটি এসেছে ১২ বার (প্রথম তালিকায় ৪ বার, দ্বিতীয় তালিকায় ৬ বার এবং তৃতীয় তালিকায় ২ বার)। প্রথম তালিকায় “কৃষি” এসেছে এই কথা বলার জন্য যে কৃষিক্ষেত্রে কী কী বিষয়ে কেন্দ্রের এক্তিয়ার থাকবে না (সাংবিধানিক ভাষায় “এক্সক্লুশান” বা কেন্দ্রের আওতার বাইরে এই অর্থে) তা ব্যখ্যা করার জন্য। রাজ্য তালিকায় সেই একই কথাটি এসেছে কী কী অর্থে রাজ্য কৃষি বিষয়ে পদক্ষেপ করতে পারবে, (অর্থাৎ, “ইনক্লুশান”, রাজ্য কী করতে পারবে, এই অর্থে)  যার মূল সুর রাজ্যগুলিই কৃষিক্ষেত্রে আইনকানুন প্রণয়নের যথযথ কর্তৃত্বের অধিকারী। তাই সাংবিধানিক মতে “এগ্রিকালচারাল ল্যান্ড”, “এস্টেট ডিউটিস” এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেন্দ্রের সংসদের কোনও আইন বা বিধি তৈরির এক্তিয়ার নেই, এই বিষয়ে যাবতীয় এক্তিয়ায় একান্তভাবের রাজ্যের অধিকারভুক্ত বিষয়।

রাজ্যের হাতে ভারতের সংবিধান-প্রদত্ত যে ক্ষমতা রয়েছে তা খর্ব করার জন্য মোদি সরকার কৃষিজাত খাদ্যের সংজ্ঞা পরিবর্তিত করে এই পরিবর্তিত সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে বর্তমানের তিনটি কৃষি আইন চালু করেছে। বলাই বাহুল্য, কেন্দ্রীয় সরকারের এই সংজ্ঞা পরিবর্তনেরও এক্তিয়ার নেই, কেননা বিষয়টি রাজ্য তালিকাভুক্ত। এই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর চরম আঘাত হেনেছে।

এই অসাংবিধানিক বিল তিনটি পার্লামেন্টে যে কায়দায় গৃহীত হয়েছে, সেই পদ্ধতিও অসাংবিধানিক, তা জনপ্রতিনিধিদের অধিকারে হস্তক্ষেপ, যা আমাদের দেশের চালু সংবিধান অনুমোদন করে না। এই বিল তিনটি লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাশ করার পর তা রাজ্যসভায় পাশ হলেই মাত্র আইনের রূপ পায়। কিন্তু রাজ্যসভার কেন্দ্রের শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাই বিরোধী সদস্যদের বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও এই বিলগুলি সরাসরি ভোটাভুটিতে না তুলে শাসক দল বিলগুলি ধ্বনিভোটে পাশ করিয়ে নেয়, যা চূড়ান্ত অসাংবিধানিক কাজ। এই অসাংবিধানিক কাজ যাতে দেশের মানুষ দেখতে না পায়, সেইজন্য সরকার রাজ্যসভা টিভি অচল করে দেয়। রাজ্যসভায় বিরোধীদের দাবি মেনে বিলগুলি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবিও সরকারপক্ষ উপেক্ষা করে। বিজেপি সহ সংসদের সব কটি রাজনৈতিক দল সহমতে পৌঁছেছিল যে বিলগুলি নিয়ে সংসদে অন্তত চার ঘন্টা আলোচনা হবে। কিন্তু আলোচনাকালে দেখা গেল যে এই বিলগুলি নিয়ে আলোচনার জন্য মাত্র ৪৫ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে আছে যে সংসদের যদি একজন মাত্র সদস্যও কোনও একটি বিষয়ে সংসদে সরাসরি ভোটাভুটি দাবি করেন, তাহলে স্পিকার সেই বিষয়ে ভোট করতে বাধ্য থাকবেন। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদ পরিচালনার জন্য সংবিধানের নিয়মকানুন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে সাংবিধানিকভাবে দেশ পরিচালনার মূলে কুঠারাঘাত করেছেন।

এরপর আসি ফরাসি দেশ থেকে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টিতে। এই কেনাকাটাতে যেভাবে সাংবিধানিক পদ্ধতিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানো হয়েছে, তা আমরা গত শতকের ষাট-সত্তর দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিআইএ-র মদতে প্রতিষ্ঠিত সামরিক একনায়ক শাসিত দেশগুলিতে দেখেছি। ফরাসি দেশ থেকে এই কেনাকাটা নিয়ে নানান প্রশ্ন ওঠায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে তাঁর মন্ত্রীসভা এবং এই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে এড়িয়ে গিয়ে কথাবার্তা শুরু করে দেন, যা দেশের আইনবিরোধী কাজ। এই কেনাকাটা যে মন্ত্রকের আওতায়, তাদের তৈরি করা কমিটি অফ সিকিওরিটি পর্যন্ত এই বিষয়ে কিছুই জানত না, প্রতিরক্ষামন্ত্রীও জানতেন না।  এই কেনাকাটার যেসব শর্ত আগেই দুপক্ষ মেনে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সম্পূর্ণ সংবিধান বহির্ভূত উপায়ে সেই সব শর্ত অনেকখানি বদল করেন। পরে ভারতের কম্পট্রোলার জেনারেল তাঁর রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে আগের শর্ত অনুসারে ভারতের ২০ শতাংশ অর্থ  সাশ্রয় হত, কিন্ত প্রধানমন্ত্রীর এই একতরফা  শর্ত বদল করার ফলে ভারতের মাত্র ৬ শতাংশ আর্থিক সাশ্রয় হয়েছে।

কাশ্মিরের ক্ষেত্রে ৩৭০ ধারা বাতিল এবং কাশ্মিরকে খণ্ডে খণ্ডে পরিণত করার প্রক্রিয়াতেও আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি ও সংবিধানের প্রতি উপেক্ষাকেই নজর করতে পারি। কেন্দ্রীয় সরকার আগস্ট ৫, ২০১৯ ঘোষণা করে যে তারা প্যাটেলের “ইচ্ছা অনুসারে” কাশ্মিরের জন্য সংবিধানের ৩৭০ ধারার পাশাপাশি ৩৫ নং ধারাটিতে পরিবর্তন আনল। এই ধারাগুলি রদ হওয়ার ফলে জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখ পরিণত হল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে, এগুলি আর ভিন্ন রাজ্য রইল না। আমাদের দেশে ৩১ অক্টোবর জাতীয় ঐক্য দিবস হিসেবে পালিত হয়, ঠিক সেই দিন এই খণ্ডীকরণ অনুষ্ঠিত হল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নতুন লেফটেনান্ট গভর্নর নিয়োগ করার পর্বও সমাপ্ত হল। এই কাজের হাত ধরে এল সম্পূর্ণ “লক-ডাউন” (তখনও কোভিডের খবর মেলেনি এদেশে), সব ধরনের পরিবহন স্তব্ধ, ৪৫ লক্ষ ইন্টারনেট গ্রাহকের পরিষেবা বন্ধ। ঐ অঞ্চলে প্রবেশ ও বাইরে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল। ৭০ লক্ষ কাশ্মিরবাসী কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়লেন। এই ঘটনার ৭১ দিন পর, অক্টোবর ১৩, ২০১৯ টেলিফোন পরিষেবা খুবই খণ্ডিতভাবে চালু হল— কেবল মোবাইলের “পোস্ট-পেড” গ্রাহকরাই এই পরিষেবা পেতে শুরু করলেন। কেবল হাসপাতালে ইন্টারনেট পরিষেবা চালু হল জানুয়ারি, ২০২০তে। বলাই বাহুল্য, কাশ্মিরের মহারাজ হরি সিং-এর ভারতভুক্তির চুক্তিপত্র অনুসারে ভারত সরকার এই পদক্ষেপ করতে পারে না। রাষ্ট্রসঙ্ঘের দ্বারা ঘোষিত গণভোটের পূর্বে “স্থিতাবস্থা” বজার রাখার নীতিরও তা বিরোধী।

আর সর্বশেষে যে ঘটনাটি ঘটল, তা থেকে আর অনুমান নয়, নিশ্চিত করেই বলা যায় যে ভারত সরকার সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপরিচালনার পরিবর্তে একনায়কতন্ত্র দ্বারাই অতঃপর দেশটিকে শাসন করবে। আরব সাগরের অভ্যন্তরে ভারতের হাতে থাকা দ্বীপপুঞ্জ-র নাম লাক্ষাদ্বীপ। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে অ্যাডমিনিস্টেটর করে পাঠানো হয় এক বিজেপি প্রতিনিধি, প্রফুল খোদা প্যাটেলকে, যিনি সমস্ত সাংবিধানিক পদ্ধতি এড়িয়ে গিয়ে লাক্ষাদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি তৈরি করে দ্বীপটিকে বাণিজ্যিক পর্যটন সহ অন্যান্য পরিবেশ-বিধ্বংসী কাজের জন্য উন্মুক্ত করার কাজ শুরু করেছেন। দ্বীপবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই বেআইনি ও অসাংবিধানিক কাজের বিরোধিতা করে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের “রাইট টু লাইভলিহুড” ধারাকে লঙ্ঘন করে বলপূর্বক উচ্ছেদ, সরকার-নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে জমির মালিকদের নিজের খরচায় তাদের জমি “উন্নয়ন” করা, জমির মালিক সেটি না করলে তাকে বিপুল পরিমাণে জরিমানা করা ইত্যাদি ধারাগুলি নিতান্তই অসাংবিধানিক। স্থানীয় মানুষের খাদ্যাভাসের কথা বিবেচনা না করে কেন্দ্রীয় সরকারের সারা দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার যে কর্মসূচি, সেটি রূপায়ণের জন্য লাক্ষাদ্বীপে গোহত্যার ওপর নিষেধাজ্ঞা সহ গোমাংস ভক্ষণের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু হয়েছে। সংসদে এই নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার পর্যন্ত স্বীকার করা হয়নি।

মোদি আমলে আর যে বিষয়টি গণতন্ত্র এবং প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা তা হল সংবিধান-প্রদত্ত ব্যক্তির নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ। এদেশে সরকার মনে করে সরকারের নীতির বিরোধীরা সবাই চক্রান্তকারী, বিদেশি রাষ্ট্রের গুপ্তচর। এদেশে কেন্দ্রের সরকারের নীতির বিরোধিতা করার অর্থ “রাষ্ট্রদ্রোহিতা”। এই সরল সমীকরণের বশবর্তী হয়ে ভারতীয় সমাজের স্তরে স্তরে যে ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে, তার যুক্তিগ্রাহ্য প্রশমনের পরিবর্তে সরকারের একনায়কতন্ত্রী মনোভাব সেই ন্যায়সঙ্গত ও সংবিধানসম্মত ক্ষোভকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে প্রচার করে সরকারের থেকে ভিন্ন মতের মানুষদের ভারতে ফৌজদারি আইনের অপপ্রয়োগ করে তাঁদের জেলে পাঠাচ্ছেন। তাঁরা ভুলে গেছেন যে অদূর অতীতে তাঁরাই সরকারের বিরোধিতা করে আজকে দিল্লির মসনদে আসীন হয়েছেন।

ভারতের বিখ্যাত প্রায় সব আইনজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিরা, এমনকি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান ন্যায়াধীশবৃন্দ তাঁদের সংখ্যালঘু রায়-এ প্রায় এই কথা বলেন যে ভিন্ন মত পোষণের অধিকার ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলির এক সুদৃঢ় স্তম্ভ।

ভারতের সংবিধান রচয়িতারা ভারতকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করার সময় জানতেন যে এই দেশে বিভিন্ন চিন্তার, ধারণার, বিশ্বাস রয়েছে। তাই কোনও একটি চিন্তা, ধারণা বা বিশ্বাস জোর করে সবাইয়ের চাপিয়ে দেওয়ার তাঁরা বিরোধী ছিলেন। এই বিষয়টি রাজতন্ত্রে শোভা পায়, রাজার ধর্মকেই প্রজার ধর্ম বলে রাজতন্ত্র ধরে নেয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের একাধিক প্রাক্তন বিচারপতি ভারতের সংবিধান ঘেঁটে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার যে সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, এই মর্মে সরব হয়েছেন।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি ২৪ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন মুখ্য ন্যায়াধীশ, শ্রী দীপক গুপ্তা, সুপ্রিন কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতায় তিনি সংবিধানের ধারা ধরে ধরে ব্যাখ্যা করে জানান যে কীভাবে ভারতীয় সংবিধান ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকারকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

The right of freedom of opinion and the right of freedom of conscience by themselves include the extremely important right to disagree. The right to disagree, the right to dissent and the right to take another point of view would inhere inherently in each and every citizen of the country.

কিন্তু কেন্দ্রে আসীন সরকার সংবিধানের এই স্পষ্ট দিক নির্দেশ মানেন না। যাঁরাই স্থিতাবস্থার বিরোধী অবস্থান নেন, যেমন আগামী দিনের দেশের চালকের আসনে বসার উপযুক্ত ছাত্রদল, বরিষ্ঠ সাংবাদিক, অধ্যাপক, সমাজকর্মী, আদিবাসী নারী, অধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মী বা পেশাগত দিক থেকে আইনজীবী, তাঁদের সরকার সাধারণ অপরাধীর সঙ্গে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে অন্যায্য শাস্তির ব্যবস্থা পাকা করেছে। দুটো সাম্প্রতিক উদাহরণ আমাদের কাছে সরকারের কাজকর্মের একটা সাধারণ ছক তুলে ধরে। আমাদের মনে পড়বে জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাফুরা জারগার-এর কথা। কেবলমাত্র সরকারের একটি কাজের প্রতিবাদ করায়, গর্ভবতী এই ছাত্রীটিকে ইউএপিএ-র মতো অসাংবিধানিক আইনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উপধারা, ২০ (ও)-তে গ্রেপ্তার করা হয়। অথবা চিত্রসাংবাদিক, মাসরাত জাহারা-র কথাই ধরা যাক, যিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে কাশ্মিরের সাধারণ মানুষ ৩৭০ ধারা বিলোপ-পরবর্তী কালে কেমন আছেন, তার মর্মস্পর্শী সচিত্র বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তাঁকেও এই একই ধারায় কারাগারে পাঠানো হয়। আরও অনেক মামলার মতো এই দুটি ক্ষেত্রে দেশের নাগরিকদের প্রকাশ্যে সরকারের চেয়ে ভিন্ন মত প্রকাশকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক মানুষদের চোখে না পড়ে পারে না।

১৮৫৭-র বিদ্রোহের ব্যাপ্তি এবং জনপ্রিয়তা দেখে ইংরেজ সরকার এই দেশের মানুষদের মুখে কুলুপ এঁটে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৮৬০ সালে ভারতীয় ফৌজদারী বিধির ১২৪ক ধারা আমদানি করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইংরাজ শাসনের বিরুদ্ধে যেকোনও ধরনের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা “সিডিশন” হিসেবে গণ্য করার আইনি স্বাধীনতা আদায় করা। লজ্জার এবং দুঃখের কথা যে ১৯৪৭ সালের পর সেই ধারা বাতিল তো হয়নি, তাকে আরও বেশি আঁটোসাটো করার আয়োজন প্রতিদিন চোখে পড়ছে। ১৮৬০ সালের এই ধারা প্রয়োগ করে সম্প্রতি গুজরাটের এক সাংবাদিক দাভাল প্যাটেলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়ে, কেননা তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর কিছু কাজের সমালোচনা করে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন!

এই বিষয়ে  ন্যায়াধীশ চন্দ্রচূড়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য,

The blanket labelling of dissent as anti-national or anti-democratic strikes at the heart of our commitment to protect constitutional values and the promotion of deliberative democracy.

আমাদের দেশের গণতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে ন্যায়াধীশ দীপক গুপ্তা আরও বলেন,

Rule of majority is an integral part of democracy but majoritarianism is the antithesis of democracy. In a democracy like ours where we have elections based on the first past the post principle, the government in most cases does not represent the majority of the population, and often not even the voting electorate.

Therefore, when those in power claim that they represent the will of all the people that is more often than not a totally baseless claim. They may be the elected government voted on the first past the post system by a large number of voters, but it cannot be said that they represent the entire will of the people.

এই বক্তৃতার অন্যত্র তিনি আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

The very essence of democracy is that every citizen has a right to participate not only in the electoral process but also in the way in which our country is run. This right becomes meaningless if that person cannot criticize the actions of the government. The citizen, is not only a participant in the democratic process, he is an integral part of the country and has a right express his views even if they be totally contrary to the views of those in power.

ভারতীয় সংবিধানের বিভিন্ন অংশের ব্যাখ্যার পর ন্যায়াধীশের মন্তব্য,

When the rule of law disappears, we are ruled by the idiosyncrasies and whims of a few.

শুধু ন্যায়াধীশ গুপ্তা-ই নন, মুম্বই হাইকোর্টের বিচারপতি গৌতম প্যাটেলের এই বিষয়ে বক্তব্য আরও পরিষ্কার। ডিসেম্বর ২০১৯-এ তথ্য জানার অধিকার সংক্রান্ত এক মামলায় গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে এক আলোচনায় ন্যায়াধীশ প্যাটেল বলেন,

A government committed to democracy and the Constitution has nothing to fear from information and dissent… Adjudication cannot be done as per the palate of the ruling government. Doing that would be the very essence of fascist regime and going away from a constitutional mandate.

সরকার চেয়েছে আমাদের দেশে একদল “কন্সটিটিউশনাল লিগালিস্ট” তৈরি করতে, যারা শাসকদের একনায়ক হয়ে ওঠার পথে আইনি, সাংবিধানিক এবং সংস্থাগত বাধাকে আইনের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে এড়িয়ে গিয়ে, দেশের নাগরিকদের কাছে সংবিধানের এই লঙ্ঘনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। এই কাজ হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইতালি, ফ্রাঙ্কোর স্পেন, পিনোচেটের চিলিতে আমরা দেখেছি। আমরা এও দেখেছি, এই সব তথাকথিত লিগালিস্টরা একনায়কদের আশীর্বাদ পেয়ে সরকারের উচ্চপদ, রাষ্ট্রদূত, রাজ্যের গভর্নর, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। এঁদের কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বিশ্বযুদ্ধের সময় দখলীকৃত দেশগুলিতে গণহত্যার বিষয়টি “সুসংগঠিত” করেছেন। চোখ মেললে আমরাও আমাদের দেশে ন্যায়াধীশদের সরকারের পক্ষে বিতর্কিত রায় দেওয়ার পর পুরস্কার হিসেবে নানান পদে অধিষ্ঠিত হতে দেখছি। এ যেন সেই ইতিহাসের ফিরে আসা।

এই সব প্রবণতা রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের কাছে আগামীতে “আচ্ছে দিন”-এর আদৌ ইঙ্গিতবাহী নয়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3324 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...