জন্মদ্বিশতবর্ষে বিদ্যাসাগরের ‘পুনর্নির্মাণ’: যুক্তিবিরোধী, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, অসুস্থ ইতিহাসচর্চার নব দৃষ্টান্ত

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

 

বিগত বছরটি ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মের দুশো বছর পূর্তির বছর, কাজেই তার কিছু আগে পরে যে বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত নানা বইপত্র বেরোবে সেটা স্বাভাবিক, এবং হয়েছেও তাই। বেশ কয়েকটি নতুন বই বেরিয়েছে, কিছু পুরনো বইয়ের পুনর্মুদ্রণ হয়েছে, বেশ কয়েকটি পত্রিকা বিদ্যাসাগরকে নিয়ে বড়সড় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে অনেকগুলোই যথেষ্ট উচ্চমানের। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ এতদিনে বেরিয়েছে, তবু আজও তাঁকে নিয়ে চর্চা সম্পূর্ণ হয়নি। তাই তাঁকে নিয়ে নতুন লেখালেখি আজও বাহুল্য বোধ হয় না, যদি সত্যিই তাতে নতুন সারবস্তু কিছু থাকে। সেরকম নতুন সারবস্তু খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা যে আজও বিলীন হয়নি এই দুশো বছর পরেও, তার কারণ দ্বিবিধ। প্রথমত, বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত বহুসংখ্যক নথিপত্র আজও অধরা। দ্বিতীয়ত, সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন আধুনিকতম পদ্ধতি-প্রকরণ ও তত্ত্বকাঠামো ব্যবহার করে তাঁর সম্পূর্ণতর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন আজও বাকি। বিদ্যাসাগর-চর্চার মূল উপাদান আজও আসে তাঁর সমসাময়িক বা প্রায়-সমসাময়িক চার জীবনীকারের রচনা থেকে— চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিহারীলাল সরকার এবং সুবলচন্দ্র মিত্র। আর মূল উপাদান বলতে আছে বিদ্যাসাগরের নিজের লেখা একটি আত্মচরিত যা তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সামান্য একটুখানি মাত্র লিখে উঠতে পেরেছিলেন। পরবর্তীকালে অনেক পরিশ্রমে আরও কিছু নথি/তথ্য ইত্যাদি উদ্ধার করেন ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরবিন্দ গুহ। সেগুলো এক জায়গায় করে এঁরা দুজন এবং বিনয় ঘোষ, গোপাল হালদার প্রমুখ গবেষকেরা রচনা করেন বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্মের পূর্ণতর ভাষ্য। আজ পর্যন্ত বিদ্যাসাগর-চর্চায় মূল প্রামাণ্য উৎস বলতে মোটামুটি এগুলোই। তবে, এগুলোকে ভিত্তি করে পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য বই ও প্রবন্ধ। বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন রকমের পাঠকের জন্য। কখনও তার উদ্দেশ্য হয়ত বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্মের সহজ ও সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা, কখনও তারই অন্যতর ভাষ্য নির্মাণ, আবার কখনও বা তারই কোনও বিশেষ দিকের খুঁটিনাটির ওপর উজ্জ্বলতর আলোকবর্ষণ। তবু বোধহয় তাঁকে নিয়ে জানা বাকি থাকে অনেক, এবং সেইহেতু, বলাও। এই দুশো বছর বাদেও। কে জানে, হয়ত বাকি থাকবে পাঁচশো বছর বাদেও। আরও তথ্য চাই, আরও অনাবিষ্কৃত নথিপত্র চাই, আরও নিরপেক্ষ নির্মোহ বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ চাই, চাই আরও নিরেট ও শক্তিশালী তত্ত্বকাঠামো। চাই, চাই, চাই!

তা, এত সব যদি চাই, তো কী কী চাই না তবে? সে কথাটাও তো হওয়া জরুরি! হ্যাঁ, যা যা চাই না, তার দৃষ্টান্ত সবই পাওয়া যাবে আমাদের আজকের আলোচ্য বইটিতে। বইটির নাম ‘বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান’। লেখক দেবোত্তম চক্রবর্তী। প্রকাশক ‘কলাবতী মুদ্রা’। বেরিয়েছে এ বছরেরই গোড়ায়।

এই একুশ শতকের তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের হাতে ভারত, ব্রিটেন তথা বাকি গোটা পৃথিবীর ঔপনিবেশিক ও প্রাগৌপনিবেশিক অর্থনীতি-সমাজ-ইতিহাস-সংস্কৃতি বিষয়ে যে তথ্যভাণ্ডার এবং বিশ্লেষণী পদ্ধতি রয়েছে, সামান্য কিছুকাল আগেও তা ছিল অমিল। আজ আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় উনিশ শতক সঙ্গতভাবেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক আসনে বসেছে, কারণটি স্বতঃপ্রতীয়মান। অষ্টাদশ শতকের ভারত আর বিশ শতকের ভারতের মধ্যে যে আকাশ পাতাল ফারাক, মাত্র এক-দেড়শো বছরের ব্যবধানে এত ফারাক ভারতবর্ষ আর কখনও দেখেনি তার কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে। এবং, এই ফারাকটির মধ্যেকার এক নির্ধারক হাইফেন হয়ে অবস্থান করছে উনিশ শতক, বিশেষ করে উনিশ শতকের বাংলা। অথচ দুঃখের বিষয়, এই শতক ও তার মূল কুশীলবদের মূল্যায়নের প্রশ্নে শিক্ষিত বাঙালির একাংশের মন আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের হাত ধরে কঠোর তথ্যভিত্তিক যুক্তিতর্কের বদলে আজও নিশ্চিন্ত আশ্রয় পায় ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী কিছু ক্লিশে লব্জমাত্র সম্বল করে দাঁড়িয়ে থাকা রোমান্টিকতা-আক্রান্ত ঐতিহাসিক বিকৃতির অন্ধকার কানাগলিতে। ঠিক কীভাবে, তার কিছু আত্যন্তিক নমুনা এখানে পাওয়া যাবে।

এ বইটির প্রকাশের প্রাক্কালে প্রকাশনাকর্মের উদ্যোক্তাদের তরফে ফেসবুকে বইটিকে নিয়ে কিছু ‘প্রোমোশন’ বা প্রচার হয়েছিল, সেগুলো থেকে বইটির প্রতিপাদ্য বিষয়, অবস্থান ও মেজাজের কিছু আন্দাজ পাওয়া যায়। তার দুটি দৃষ্টান্ত এইরকম [হুবহু উদ্ধার]:

কয়েক দশক ধরে সীমান্তের দুপাশে নবজাগরণীয় পুরোধা পুরুষেরা বিদ্যাসাগরের কর্ম ইত্যাদি নিয়ে যে বিস্তৃত মিথাবলী তৈরি করেছিলেন, তাদের উত্তর প্রজন্ম আজও সে সব অতিকথা এবং তার ভিত্তিকে প্রশ্ন করার কলিজে তৈরি করতে পারেননি। ইওরোপমন্য লুঠেরা হিন্দুত্ববাদী সাম্রাজ্য পোষিত নবজাগরণের অন্যতম সংগঠক বিদ্যাসাগরের কর্ম ও কৃতি বিষয়ে প্রশ্ন তুললেন দেবোত্তম।

এবং,

জন্মের দুশো বছর পরেও বিদ্যাসাগরকে ঘিরে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির চিরাচরিত চর্বিতচর্বণ চলতে থাকুক, লুঠেরা উপনিবেশের প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন অব্যাহত থাকুক তাঁদের। শুধু অগণন অন্ত্যজ হিন্দু ও দরিদ্র মুসলমান এবং আর্ত ও অসহায় নারী, সেই দাসত্বের দোসর হবেন না। সুকৌশলে তাঁদের চিরদিন অপাংক্তেয়, বঞ্চিত করে রাখার দিন শেষ। তাই, তাঁরা তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করবেন বিদ্যাসাগরকে। তাতে যদি তিলে তিলে গড়ে তোলা সযত্ন ‘নির্মাণ’ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তবুও তাঁদের প্রতিস্পর্ধী দৃপ্ত উচ্চারণ থমকে যাবে না এক মুহূর্তের জন্যেও। কারণ তাঁদের কথা কেউ বলেনি এতদিন, পরেও বলবে না। তারা যে ‘ছোটলোক’।

প্রকাশের আগে বইটির খানিকটা অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল একটি পরিচিত ব্লগ-সাইটে। সেখানে পাঠকদের কিছু মন্তব্য/প্রশ্নের উত্তরে লেখক সগর্বে যা ঘোষণা করেছিলেন, তার কিছু নমুনা এই রকম [হুবহু উদ্ধার, আবারও]:

একটা দুশো বছরের পুরনো বাড়ির সবে প্লাস্টার খসানোর পর্ব শুরু হয়েছে। তাও যথেষ্ট রেখে-ঢেকে। বীরসিংহের মাটির বাড়িটাকে প্রথমে উপনিবেশের জল-সার দিয়ে পোক্ত একতলা বানানো হয়েছে। তার পরে স্বাধীন (!) ভারতে উপনিবেশের যেসব দাস রয়ে গেছে, তাঁদের অর্থে ও উদ্যমে বাড়িটাকে দোতলা বানানোর পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। এতদিনে ছোটলোকরা শাবল-গাঁইতি নিয়ে নেমেছে। এখন প্লাস্টার খসানো হবে সাবধানে। ষষ্ঠ অধ্যায় থেকে একটা একটা করে ইট খুলে নেওয়া হবে। আর তৃতীয় পর্ব আসার আগেই বাড়ির ভিত পুরো ধসে যাবে।

এবং, উনিশ শতকের ইতিহাস বিষয়ে দুই সুপরিচিত ধর্মনিরপেক্ষ গবেষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এবং আশীষ লাহিড়ীর উদ্দেশে,

চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাখলাম এই ভক্তিবাদীদের দুই ধর্মবাবা রামকেষ্ট ভটচাজ আর আশীষ লাহিড়ীকে এই খোলা খাতায় স্বনামে লিখতে। দেখব তাঁদের খাঁচায় কত দম আছে।

লেখক নিজে একজন উচ্চবর্ণ ‘ভদ্রলোক’, এবং শিক্ষকতার মত একটি মার্কামারা ভদ্রলোকি পেশায় যুক্ত, এবং তার ওপর আবার তিনি ইংরেজি ভাষারই শিক্ষক, যা কিনা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রকট সাংস্কৃতিক আমদানি। তবুও সম্পূর্ণ অকারণে নিজেদেরকে ‘ছোটলোক’ পক্ষ সাব্যস্ত করে, এবং পূর্ববর্তী সমস্ত বিদ্যাসাগর-গবেষককে (বস্তুত যাবতীয় শিক্ষিত ভদ্রলোককুলকেই) সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের অংশীদার এলিট-শ্রেণি সাব্যস্ত করে, এই রকম বাতিকগ্রস্ত আত্মগর্বী পাগলপারা গর্জনে বইটি ভরপুর। এতটাই, যে, কোথাও কোথাও হাস্য সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কাজেই, তারও দু-একটা নমুনা চেখে না দেখলেই নয়। তবে, বইটির শিরোনামে কিন্তু একটা বেশ নিরীহ ভাব আছে, ‘নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণ’ শব্দগুচ্ছের মধ্যে আছে এক ধরনের প্রতিশ্রুতি— তথ্যযুক্তি দিয়ে নিরপেক্ষ ও পরিশ্রমসাধ্যভাবে প্রতিপাদ্য নির্মাণের মিথ্যে আশ্বাস। লেখক সম্ভবত প্রথমেই পাঠককে বিমুখ করতে চাননি, এবং তার ফলে শুধু শিরোনামেই নয়, ‘ভূমিকা’তেও রাখতে চেয়েছেন মিথ্যে আশ্বাসের রেশ। ২০ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন,

দ্বিতীয় পর্বের বিভিন্ন অধ্যায়ে সমাজসংস্কারক বিদ্যাসাগর সারা জীবন বিধবাবিবাহ প্রবর্তন এবং বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিবারণের ক্ষেত্রে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

তার পরের পৃষ্ঠাতেও, ‘ভূমিকা’-র একেবারে শেষে, তিনি প্রতিশ্রুতি দেন,

সবচেয়ে বড় কথা— আলো-আঁধারের দ্বিমাত্রিক বিদ্যাসাগর নন, এই অকিঞ্চিৎকর লেখাটিতে তন্নিষ্ঠ প্রয়াস অব্যাহত থাকবে তাঁর আলোছায়া ঘেরা জীবনের ধূসর জটিল জ্যামিতিক বিন্যাসের বহুমাত্রিক উন্মোচন।

কিন্তু, উঁহু, নাঃ! বিদ্যাসাগরের ‘অক্লান্ত পরিশ্রম’ বলতে লেখক ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটা আমরা একটু পরেই দেখব। তবে, এ বইয়ে বিদ্যাসাগরের ‘আলোছায়া ঘেরা জীবনের [?] ধূসর জটিল জ্যামিতিক বিন্যাসের বহুমাত্রিক উন্মোচন’ তো নেইই, এমনকি ‘আলো-আঁধারের দ্বিমাত্রিক বিদ্যাসাগর’-ও নেই। তার বদলে যা আছে তা ‘আলো-আঁধার’ নয়, শুধুই নিরেট নিশ্ছিদ্র আঁধার— সমগ্র পৃথুল বইটি জুড়ে ক্রমাগত একপেশে অযৌক্তিক সন্দেহবাতিকগ্রস্ত একঘেয়ে অভিযোগের ক্লান্তিকর ফিরিস্তি। ভূমিকা থেকে সামান্য কিছুদূর এগিয়েই পঞ্চম অধ্যায়ের শেষে (পৃষ্ঠা ৭৯) তিনি লেখেন,

…… তার আগেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সফল করার লক্ষ্য নিয়ে, বাংলার দেশি ধানের মাঠে বিলিতি ওকের চারাগাছ রোপণের জন্য বিপুল বিক্রমে নেমে পড়বেন বিদ্যাসাগর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল কিংবা কলেজে দেখা যাবে কতিপয় উচ্চবর্ণের অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীর দৃপ্ত উদ্ধত স্বার্থপর পদচারণ। নানাবিধ ‘সংস্কার’-এর পরেও তাঁর শিক্ষার অঙ্গন থেকে একই রকমের ব্রাত্য, অবাঞ্ছিত থেকে যাবে দরিদ্র অন্ত্যজ হিন্দু ও নিম্নশ্রেণির মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা। জনশিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে তাঁর মুখে শোনা যাবে অবিকল শাসকের সুর।

এবং তৃতীয় পর্বের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে (পৃষ্ঠা ৩৬৯), যখন কাহিনির জাল প্রায় গুটিয়ে আসছে, তখন তিনি লেখেন,

এইভাবে ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রার্থিত প্রায় সমস্ত বিষয়— বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে ভাষাকে সংস্কৃতানুগ করে তোলা, ‘ঐতিহ্যময়’ হিন্দুযুগের কাল্পনিক জগৎ গড়ে তোলা, মুসলমান বিদ্বেষের বীজ রোপন করা, দেশের বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের অনুল্লেখ, ব্রিটিশ শাসকদের প্রায় ঈশ্বরের স্তরে পর্যবসিত করা ইত্যাদি— হয়ে ওঠে বিদ্যাসাগরের তিনটি পাঠ্যপুস্তকের মূল বিষয়বস্তু। অতঃপর শাসকের বদান্যতায় গ্রন্থগুলিকে বাংলার স্কুল-কলেজের পাঠ্যতালিকার অন্তর্গত করে তিনি সুকৌশলে বাংলার সরলমতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে ঔপনিবেশিক শিক্ষার যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, পরবর্তীকালে সেটাই হয়ে ওঠে তাঁর পাঠ্যপুস্তক রচনার এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য। তাঁর প্রকাশনার ব্যবসা ক্রমে এতটাই স্ফীত হয়ে ওঠে যে, একটা সময়ে এই জগতে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন তিনি।

লেখকের তরফে এই যে উন্মত্ত অসুস্থ গর্জন, তার সঙ্গে গোড়া থেকেই চমৎকার সঙ্গত করেছেন প্রকাশকেরা। ‘প্রকাশকের কৈফিয়ত’ অংশে লেখা হয় (পৃষ্ঠা ১৩),

এই কলকাতা নির্ভর নব্য সাম্রাজ্যপোষিত নবজাগরিত, ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোকেদের অন্যতম নেতা তাত্ত্বিক হয়ে উঠলেন রামমোহন রায়, তস্যপৌত্তলিকশিষ্য দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং একাকী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। প্রথমে কোম্পানি, পরে রাণীর দক্ষিণ এশিয়াকে আরও বড় লুঠযোগ্য, আরও বড় সাম্রাজ্যভোগ্য করে যাওয়ার সমস্ত কৃতিত্ব প্রাথমিকভাবে এই তিন মহাতেজের। উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনে এই তিনজনের সাম্রাজ্য বন্ধুত্ব প্রকাশ এবং সমান্তরালভাবে কীভাবে এরা ইউরোপ গঠনে বাংলা লুঠে সাম্রাজ্য নির্দেশ পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে।

[শেষ বাক্যটির অসংলগ্ন গঠন সহ হুবহু উদ্ধৃত]

প্রকাশকের তরফে চার পাতার (পৃষ্ঠা ১১-১৪) ‘বয়ান’-টিতে বেশ কয়েকটি বানান ভুল। ‘সঙ্গঠন’, ‘মদদ’, ‘সমৃদ্ধতা’, ‘প্রত্যক্ষ্য’, ‘কেন্দ্রিভূত’, ‘আক্রমন’। সঠিক বাংলা লেখাটা সাম্রাজ্যবাদ-নির্দেশিত কোনও ভদ্রলোকি চক্রান্ত কিনা, এবং তাকে অসম্মান করাটা কোনও ছোটলোকি বিদ্রোহের অঙ্গ কিনা, সে কথা অবশ্য এখানে খোলসা করে ব্যাখ্যা করা নেই। তবে, মূল পাঠ্যে বাংলা ভাষার দশা যে তত খারাপ নয়, এটা মানতেই হবে। মূল পাঠ্যের লেখক সম্ভবত ‘প্রকাশকের বয়ান’ অংশটির প্রুফ দেখার সুযোগ পাননি। তা সে যাইহোক, ক্ষুদ্র এই প্রকাশকীয় বক্তব্যের আসল গুরুত্ব কিন্তু তার ভাষায় বা বানানে ততটা নয়, যতটা অন্তর্বস্তুতে। বইটির ভেতরের যে মোদ্দা কথাগুলো এতবড় বইটিতেও লেখক পরিষ্কার করে বলে উঠতে পারেননি, সেই কথাগুলো এখানে গোড়াতেই বলে রেখেছেন প্রকাশকের তরফের প্রতিনিধিদ্বয়। লেখক যদি চারশো পাতা জুড়ে ধস্তাধস্তি করে থাকেন বিদ্যাসাগরীয় ‘হিস্ট্রি’-র খুঁটিনাটি নিয়ে, প্রকাশক তবে মাত্র চার পাতাতেই বলে দিয়েছেন তার ‘হিস্টোরিওগ্রাফি’ (এবং সেইহেতু, ওই চার পাতার হিস্টোরিওগ্রাফি-টি আবার আমি যদি এখানে চার লাইনে বর্ণনা করি, কেউই তাতে সম্ভবত খুব বেশি অপরাধ নেবেন না)! এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এটা ছাড়া গোটা বইটি শুধুই বিদ্যাসাগর বিষয়ে লেখকের ব্যক্তিগত বিদ্বেষের চিহ্ন হয়েই থাকত, তার পেছনের ইতিহাসতাত্ত্বিক ‘ইন্টেনশন’ বা অভিপ্রায়টি হয়ত বা ধরা পড়ত না, এবং সেইহেতু ধরা পড়ত না নিজের মধ্যে অন্তর্লীন এই তাত্ত্বিক অভিপ্রায়টি সম্পর্কে লেখকের নিজেরই আত্মপ্রতারণামূলক, স্ববিরোধী, ধোঁয়াটে চৈতন্যের স্বরূপটিও।

প্রকাশক তরফের বক্তব্য, প্রাগৌপনিবেশিক বাংলা তার চাষি, কারিগর ও অন্যান্য নিম্নবর্গীয় শ্রমজীবীর ‘অক্লান্ত প্রচেষ্টায়’ অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল কৃষি, শিল্পোৎপাদন এবং সংস্কৃতিতে (‘সোনার বাংলা’)। আমাদেরকে সযত্নে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, এ কৃতিত্ব যতটা মধ্যযুগীয় বাংলার শ্রমিক-কৃষক-কারিগরের, ঠিক ততটাই শাসকবর্গ নবাব-বাদশাদেরও, কারণ, এই সমৃদ্ধি ঘটেছিল ‘প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে’ [হুবহু উদ্ধৃত]। আমাদেরকে এও বলা হয়, ইউরোপ তখন জ্ঞান ও অর্থনীতিতে ভারত ও বিশেষত বাংলার চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল (‘অধমর্ণ’), এবং অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্রিটেন তথা ইউরোপ যে হঠাৎই লাফ দিয়ে বাকি পৃথিবীর চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ও জ্ঞান সরবরাহ হয়েছিল এখান থেকেই— ‘লুঠ’ হয়ে। ফলত, লেখক যখন এক প্রবল বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় এবং একপেশেভাবে বাছাই করা বিপুল তথ্যের বাতিকগ্রস্ত ইন্টারপ্রিটেশন সহযোগে বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম বর্ণনা করতে থাকেন, তখন সব সময়েই তার পশ্চাৎপটে এই ‘সোনার বাংলা লুঠ হয়ে যাওয়ার’ ন্যারেটিভ হাজির থেকে তাকে এক অত্যাশ্চর্য ভুয়ো-গম্ভীর তাৎপর্যে মণ্ডিত করতে থাকে। ইংরেজরা এসেছিল এ দেশ লুঠ করতে, এবং অর্থনৈতিক আগ্রাসন বজায় রাখার পক্ষে অপরিহার্য এক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও তারা চালিয়েছিল, ইউরোপীয় শিক্ষাদীক্ষার প্রচলন যার অঙ্গমাত্র— এবং বিদ্যাসাগর ও অন্যান্য সমস্ত ‘নবজাগরণ-চরিত্র’ হলেন সে প্রক্রিয়ারই আজ্ঞাবাহক ভৃত্য— লেখকের বিদ্যাসাগর-মূল্যায়নের পেছনের ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা বলতে স্রেফ এটুকুই। এখন মুশকিলটা হচ্ছে, স্বপ্নিল অতীতচারিতা আর জাতীয়তাবাদী অভিমানকে লালনপালন করার প্রশ্নে এ ধরনের ‘হিস্টোরিওগ্রাফি’ বা ইতিহাসতত্ত্বের কিছু আবেগী মূল্য থাকলেও, এর ঐতিহাসিক মূল্য যৎসামান্য। কেন, সেটা সংক্ষেপে বলে রাখা যাক।

প্রথমত, তখনকার ইউরোপ যদি সমসাময়িক ভারত তথা বাংলার চেয়ে দরিদ্রতর ও অজ্ঞতর হয়ে থাকে, তো সে দেশের অল্প কয়েকজন মাত্র এই বিরাট দেশে এসে কীভাবে সব কুক্ষিগত করে ফেলতে পারল, সে ধাঁধার ব্যাখ্যা এখানে নেই, থাকাটা অসম্ভব বলেই নেই। বস্তুত, ইতিহাস সম্পর্কে আজ আমরা যা জানি তা এ বইয়ের উপরোক্ত ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাটির সম্পূর্ণ বিপরীত। এ দেশে মুসলমানরা আসার বহু আগে থেকেই বিদ্যাচর্চার উৎসাহ ফুরিয়ে আসতে থাকে এবং চতুর্দশ শতকের পরে বিজ্ঞান গণিত ইত্যাদি বিষয়ে আর কোনও মৌলিক কাজই হয়নি, আর দর্শনচর্চা পুরোটাই ছিল অর্থহীন ধর্মতাত্ত্বিক বাগাড়ম্বরের কবলে। সামাজিকভাবেও, প্রবল কুসংস্কার ও জাতপাতের সমস্যা খর্ব ও উদ্যোগহীন করে রেখেছিল আমাদের। মুসলমানদের আগমনে সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক নানা পরিবর্তন হলেও, বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয়নি, এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিরাট কিছু পরিবর্তন ঘটেনি। অথচ ইউরোপে পঞ্চদশ শতক থেকে ছাপাখানা আবিষ্কার, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি ও অন্যান্য নানা কারণে চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানচর্চায় বিপ্লব ঘটে যায়, কোপার্নিকাস ব্রুনো গ্যালিলিও কেপলার প্রমুখ বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী একগুচ্ছ আবিষ্কারে দুনিয়া সম্পর্কে দৃষ্টিটাই পাল্টে যায়, বেকন এবং দেকার্ত আবিষ্কার করেন বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতি। একই কথা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও। ইউরোপ যখন একের পর এক বানিয়ে চলেছে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিচিত্র বিষয়ের ছাপা বই, জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, ঘড়ি, পাম্প, ইঞ্জিন— তখন কিন্তু এ দেশীয় ধনীশ্রেষ্ঠ বণিকেরা ইউরোপীয় বণিকদের কাছ থেকে সে সব মোটেই দাবি করছেন না! সে সব বস্তু যে আদৌ আছে এই ধরাধামে, এবং সেগুলো হাতে থাকা এবং না থাকার মধ্যে যে পার্থক্য বিস্তর, এই বোধটাই তাঁদের ছিল না। আদিম হাতিয়ার এবং বংশানুক্রমিক দক্ষতামাত্র সম্বল করে দেশীয় কারিগরবর্গ যে অনুপম হস্তশিল্প বানাতেন (মূলত সুতিবস্ত্র), যৎসামান্য মূল্যে তা কারিগরের কাছ থেকে হস্তগত করে, এবং তার উন্নতিসাধন কীভাবে হবে সে নিয়ে একটুও মাথা না ঘামিয়েই, সোনারুপোর বিনিময়ে তা বিদেশি বণিকের কাছে বেচে ফুলেফেঁপে উঠতে পারলেই তাঁদের সুখ। দেশীয় বণিকেরা যে এসবের বিনিময়ে বিদেশি বণিকদের কাছ থেকে সোনারুপো আদায় করতে পারতেন, এ নিয়ে আজও এ দেশের শিক্ষিত দেশাভিমানীজন গর্ব করে থাকেন। তাঁরা একটু তলিয়ে ভাবলে হয়ত বুঝতে পারতেন, এটা আসলে পশ্চাৎপদতারই লক্ষণ।

শুধু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-সাহিত্য-কলা-সংস্কৃতি জাতীয় ‘জ্ঞান’ নয়, অর্থনৈতিক ইতিহাসের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা দেশের ‘সোনার বাংলা’ বা ‘সোনার ভারত’ জাতীয় ন্যারেটিভ নিয়েও। প্রথমত, আজ এইটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, কমপক্ষে পনেরোশো খ্রিস্টাব্দ থেকেই (হয়ত বা তারও আগে) ইউরোপের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গেছিল, এবং ষোলোশো খ্রিস্টাব্দ থেকেই আভ্যন্তরীণ কৃষি সঙ্কটের জন্য মাথাপিছু জাতীয় আয় হু হু করে নামতে থাকে, এবং সেইহেতু ইউরোপ তথা ব্রিটেনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ফাঁকটিও বাড়তে থাকে হু হু করে। কৃষি সঙ্কট ঘটেছিল, কারণ, ক্রমবর্ধমান চাহিদার চাপে ক্রমশ আরও বেশি বেশি জমি কৃষির আওতায় এলেও আদিম কৃষিপদ্ধতির দরুণ একক জমিপিছু কৃষি-উৎপাদন আদৌ বাড়ছিল না, ফলে দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক দখলদারির ফলে যে কিছু উচ্চপদস্থ ইংরেজ অকল্পনীয়রকম ধনী হয়ে উঠেছিল তাতে সন্দেহ না থাকলেও, শেষ পর্যন্ত যে সম্পদ এ দেশ থেকে ও দেশে গিয়ে হাজির হত তা ও দেশের তৎকালীন মোট জাতীয় আয়ের তুলনায় খুবই নগণ্য ছিল, ফলে ইউরোপের আর্থিক সমৃদ্ধির পেছনে এর ভূমিকা খুব বড় করে দেখানো কঠিন। তৃতীয়ত, ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক অসাম্য আদৌ প্রাগৌপনিবেশিক নবাব-বাদশাদের আমলের চেয়ে বেড়েছিল কিনা, এবং বেড়ে থাকলেও ঔপনিবেশিক শাসকের পদক্ষেপের ফল হিসেবেই বেড়েছিল কিনা, সর্বশেষ হিসেবনিকেশ গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে সে নিয়েও। ফলত, ‘সোনার বাংলা লুঠ হয়ে দখলদারী ধনী ইউরোপ গড়ে ওঠা’-র এই আবেগী হিস্টোরিওগ্রাফি বস্তুনিষ্ঠ তথ্যভিত্তিক যৌক্তিক বিশ্লেষণজাত বাস্তব ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা সৃষ্টিতে আদৌ কোনও ভূমিকা নিতে পারেনা, বরং ভুয়ো ইতিহাসচর্চার রাস্তাটি খুলে দেয় খুব চওড়া করেই, যে রাস্তা ধরে অনায়াসে বহুদূর হেঁটেছে আমাদের এই আলোচ্য গ্রন্থটি। ঠিক কীভাবে, সেটা আমরা দেখব একটু পরেই।

এই ‘ইতিহাসতত্ত্ব’-টি সম্পর্কে এখানে আরও দুয়েকটি কথা বলে রাখা ভালো, কারণ সেটা অদূর ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে। একে সিরিয়াস বৈদ্যায়তনিক ইতিহাসচর্চার কোনও নির্দিষ্ট ধারার সঙ্গেই পুরোপুরি মেলানো কঠিন, কারণ, সিরিয়াস ইতিহাসচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় ‘রিগর’ বস্তুটির নামগন্ধও এখানে নেই। তবুও, অবস্থান ও মেজাজের দিক থেকে, এবং তথ্যসূত্রগুলোকে খুঁটিয়ে দেখলে, ‘পোস্ট কলোনিয়াল’ ধারার সঙ্গে এর নৈকট্যটাই সম্ভবত বেশি করে চোখে পড়বে। এই ‘পোস্ট কলোনিয়াল’ ইতিহাসতত্ত্বকে কয়েকটি বাহ্যিক সাদৃশ্যের কারণে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের মার্ক্সীয় বয়ানের (বা বিশেষত তার নকশালপন্থী উপ-বয়ানের) খুব নিকটবর্তী বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেটা আসলে এক হিমালয়প্রতিম বিভ্রম। কেন, সেটা ব্যাখ্যা করার আগে একবার দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন বাহ্যিক মিলের কারণে দুটোকে এক জিনিস বলে ভুল হয়। প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান (মার্ক্সবাদীরাও মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদেরই এক অতি পরিণত দশা, এবং সেইহেতু প্রবল বিরোধিতার যোগ্য)। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা মূলস্রোতের ইতিহাসকে প্রশ্ন করা, উপনিবেশিত জাতির দৃষ্টিকোণ থেকে নতুনভাবে ইতিহাসকে দেখবার চেষ্টা (স্বভাবতই, মার্ক্সবাদী একে ‘নিপীড়িতের দৃষ্টিকোণ’ হিসেবে গণ্য করে সহানুভূতিশীল হবেন এবং সমর্থন করবেন)। তৃতীয়ত, উপনিবেশের সম্পদের বাস্তব দখলদারি ও শোষণের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে উপনিবেশকারীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা (মার্ক্সবাদীরা যেভাবে অর্থনীতিকে ‘ভিত্তি’ ও সংস্কৃতিকে তার ‘উপরিকাঠামো’ ধরে নিয়ে সমাজ ও ইতিহাসের বিশ্লেষণ করতে চান, এটা তার সঙ্গে অন্তত কিছু দূর পর্যন্ত মেলে, শেষপর্যন্ত না হলেও)।

কিন্তু আসলে, এই বিভ্রান্তিকর বাহ্যিক মিলগুলো সত্ত্বেও, পোস্ট কলোনিয়াল ইতিহাসতত্ত্ব ও মার্ক্সীয় ইতিহাসতত্ত্ব যে মূলগত ও আন্তরিকভাবে পৃথক, সেটা বোঝা যায় একটু তলিয়ে ভাবলেই। প্রথমত, মার্ক্সবাদীরা ঔপনিবেশিকতাবাদের যতই কঠোর সমালোচনা করুন, মধ্যযুগীয় নবাব-বাদশাদের কখনওই গৌরবান্বিত করবেন না— অথচ এখানে মধ্যযুগীয় ‘সোনার বাংলা’-র কৃতিত্ব কৃষক-কারিগরের সঙ্গে সমানভাবেই দেওয়া হয়েছে শাসকদেরও (‘প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে’)। দ্বিতীয়ত, মার্ক্সবাদীদের অভিযোগের বর্শামুখ থাকে উৎপাদন-ব্যবস্থার মালিকানা ও মূল নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে তাদের দিকে, আর এখানে মূল নিশানায় রয়েছে ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা নব মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ও তাদের উত্তরসূরিরা (প্রকাশকদের ভাষায় ‘ভদ্রবিত্ত’, যদিও শব্দটির প্রয়োগ অনেকটা সুকুমার রায়ের ‘দ্রিঘাঞ্চু’-র মত, যার ব্যঞ্জনা আছে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও অর্থ নেই)। তৃতীয়ত, এখানে ব্রিটিশের ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ সংক্রান্ত যে ব্যাখ্যান, পোস্ট কলোনিয়াল ইতিহাসতত্ত্বের ঐতিহ্য ও রীতিনীতি মেনে তা প্রায়শই বাগাড়ম্বরসর্বস্ব, ধোঁয়াটে, কাল্পনিক, উদ্ভট এবং হাস্যকর। তার সঙ্গে কখনওই ব্রিটিশ অর্থনৈতিক স্বার্থের কোনও সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না, মার্ক্সীয় ‘ভিত্তি-উপরিকাঠামো’ বিশ্লেষণ-পদ্ধতিতে যা অপরিহার্য। যেমন, লেখক যেভাবে বিধবাবিবাহ আইন চালু করার পেছনে ব্রিটিশ পুরুষের যৌন উদ্বেগ লক্ষ করেছেন, একে তো তার মধ্যে পোস্ট কলোনিয়াল বাগাড়ম্বরের ওপরে লাকানীয় সাইকো-অ্যানালিটিক্যাল ননসেন্সের ছায়া পড়ে এক অতি খোলতাই বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে (কাণ্ডটি সজ্ঞানে ঘটেছে বলে মনে হয় না যদিও), আর তার ওপর তাতে করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই বা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে কী যে সুবিধে হয়েছে প্রশাসন বা ব্যবসায়ে, সেও বোঝা যায়নি মোটেই। চতুর্থত, মার্ক্সবাদ যেহেতু পশ্চিমি যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সন্তান, অতএব তা বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানকে স্বীকার করে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে সম্মান করে। কিন্তু পোস্ট কলোনিয়ালিস্ট ইতিহাস (এও আদতে পশ্চিমিই, যদিও যুক্তিবিরোধী) পশ্চিমি বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে উপনিবেশিত জাতির ওপরে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে দেখতে চায়, যার আসলে আলাদা কোনও মূল্য নেই কিন্তু যা বিজিত জাতির ওপরে স্রেফ গায়ের জোরে চাপানো হয়েছে। অর্থাৎ, এই যে আমরা আজ রোগভোগ হলে কবিরাজি জড়িবুটির বদলে অ্যান্টিবায়োটিক খাচ্ছি, সেটা আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়, এক সময়ে ইউরোপের হাতে অধীন হয়ে ছিলাম বলে। ফলত, তা আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের বিশেষ সত্যতা বা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে অস্বীকার করে, এবং প্রতিটি জাতির জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সমান্তরাল জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসর হিসেবে দেখে, যার কোনওটিই অন্য কারও চেয়ে কম বা বেশি সত্যি নয়। এবং, এর পশ্চাৎপটে সব সময়ই যে উত্তর-আধুনিক প্রজ্ঞাটি কাজ করে সেটা এই যে, সর্বজনীন ও সংস্কৃতি-নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান বলে আসলে কিছু হয়না। বিগত শতকের শেষার্ধে উত্তর-আধুনিক বিজ্ঞান-সমালোচনার ধারায় এ ধরনের প্রবণতা কিছু শক্তি সঞ্চয় করলেও, আজ আর বৈদ্যায়তনিক পরিসরে কেউই একে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। তবু, আমাদের শিক্ষিত সচেতন সমাজের একাংশের কাছে আজও এর গুরুত্ব আছে, সম্ভবত বিজ্ঞানমনস্কতার প্রবল দুর্দশার ফলে।

বিদ্যাসাগর: নির্মাণ-বিনির্মাণ-পুনর্নির্মাণের আখ্যান
দেবোত্তম চক্রবর্তী
প্রকাশক: কলাবতী মুদ্রা
প্রথম প্রকাশ
: পৌষ, ১৪২৭, জানুয়ারি, ২০২১
মূল্য: ৬২০ টাকা

ভূমিকাটা বোধহয় বড্ড বড় হয়ে গেল, এবার বইয়ের ভেতরকার বক্তব্যে ঢুকতে হয়। এই পৃথুল বইটির প্রায় প্রতি পাতাতেই অযৌক্তিক আপত্তিকর কথাবার্তা এত বেশি যে, তার সব কিছু ঠিকঠাক আলোচনা করতে গেলে এর চেয়েও পৃথুল আরেকটি বই লিখতে হবে। কাজেই, সে দিকে না গিয়ে বরং অল্প কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ছুঁয়ে অতি সংক্ষিপ্ত সমালোচনার একটি ‘আউটলাইন’ বা রূপরেখা অন্তত খাড়া করা যায় কিনা দেখা যাক। আসল সমালোচনায় ঢোকবার আগে বইটির একটি অতি-সংক্ষিপ্ত অথচ সামগ্রিক বিবরণ দেওয়া দরকার, তা না হলে, যাঁরা ইতিমধ্যে বইটি পড়ে উঠতে পারেননি তাঁদের বুঝতে অসুবিধে হতে পারে (বলা বাহুল্য, যাঁরা বইটি পড়েছেন, আমার এ সমালোচনা শুধুমাত্র তাঁদের উদ্দেশেই নয়)। বইখানি পৃথুল, আয়তনে ও মূল্যে। প্রায় সাড়ে চারশো পাতার বইটির দাম ছশো কুড়ি টাকা, বাংলাদেশি সংস্করণ আটশো কুড়ি টাকা। প্রকাশকের বক্তব্য, ভূমিকা, উপসংহার, গ্রন্থপঞ্জী ইত্যাদি বাদ দিলে বইটির মূল পাঠ্যাংশ তিনটি পর্বে বিভক্ত, এবং প্রতিটি পর্ব আবার অনেকগুলো অধ্যায়ে। প্রথম পর্বে এগারোটি, দ্বিতীয় পর্বে আটটি এবং তৃতীয় পর্বে পাঁচটি অধ্যায় আছে। মোটা দাগে বললে, প্রথম পর্বটি বিদ্যাসাগরের শিক্ষাসংস্কার নিয়ে, দ্বিতীয় পর্বটি তাঁর সমাজ-সংস্কার নিয়ে, এবং তৃতীয়টি ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান নিয়ে।

এই পর্বগুলোর আগে অবশ্য একটা ছোট্ট তিন পাতার ‘ভূমিকা’ আছে, সেটা ছোট হলেও অনুধাবনযোগ্য। এখানে বিদ্যাসাগরের নানা জীবনী এবং স্মরণাত্মক লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন, বাংলার বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে প্রথম থেকেই অলৌকিকতামণ্ডিত করতে চেয়েছেন, যাতে তাঁর সত্যিকারের মূল্যায়ন না হতে পারে, এবং ইংরেজের দখলদারি কর্মকাণ্ডের আজ্ঞাবহ ভৃত্য হিসেবে তাঁর ভূমিকা চাপা পড়ে যায়। বলা বাহুল্য, এটি এক উদ্ভট ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব। এভাবে বিষয়টিকে হাজির করার ধারণাটিও আসলে বিদ্যাসাগর-সম্পর্কিত একটি অপেক্ষাকৃত অপঠিত বই থেকে না বলিয়া গ্রহণ করা, তবে সে অন্য প্রসঙ্গ। আপাতত এটুকু বলে রাখা যাক, বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে প্রথম দিকের দু-একটিতে মাত্র এ ধরনের প্রবণতা আছে, মূলস্রোতের বিদ্যাসাগর চর্চায় যার আদৌ কোনও গুরুত্ব নেই। শিশু বিদ্যাসাগরের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু জ্যোতিষীয় দৈবী ভবিষ্যদ্বাণী এবং জনৈক মরফিন-আসক্ত ধর্ম-সাধকের অলীক দর্শন— এ দিয়ে বিশেষ কোনও ষড়যন্ত্র প্রমাণ হওয়া খুব মুশকিল। তখনকার দিনে প্রতিটি ব্রাহ্মণবাড়িতে নবজাত প্রতিটি শিশুরই ঠিকুজি-কোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ গণনা করানো হত, এবং তার ভবিষ্যৎ বিষয়ে যা যা বললে অভিভাবকদের খুশি করে কলাটা মুলোটা পাওয়া যাবে, সে সব ফলাও করে বলতে গণৎকার মহোদয় বিন্দুমাত্র কসুর করতেন না। পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর বাস্তবিকই মহীরূহসম হয়ে ওঠায় সে সব বাণী যে প্রাচীন জীবনীকারদের কাছে গুরুত্ব পাবে, তাতে যেমন আশ্চর্যের কিছুই নেই, ঠিক তেমনিই বিদ্যাসাগর চর্চায় তার গুরুত্বও কিছুই নেই। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র দেখতে পাওয়াটা বিদ্যাসাগর-গবেষকদের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়, বরং দ্রষ্টার বাতিকগ্রস্ততার প্রমাণ।

প্রথম পর্বের প্রথম পাঁচটি অধ্যায়ের সময়কাল বিদ্যাসাগরের আগের, মানে, পলাশী যুদ্ধের পর থেকে শুরু করে তাঁর সক্রিয় কর্মকাণ্ড শুরুর আগে পর্যন্ত। ইংরেজরা কেমন করে কর ফাঁকি দিত এবং আদায় করত, সেই নিয়ে প্রথম দুটো অধ্যায়। আর, কীভাবে ইংরিজি শিক্ষা চালু হল, এইসব নিয়ে পরের তিনটি অধ্যায়। খুব অজানা কথা কিছু নয়, তবু কষ্ট করে লেখক তার বর্ণনা দিয়েছেন, কারণ তিনি মনে করেছেন, এভাবে বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্মের মূলে পৌঁছনো যাবে। ‘হযবরল’ গল্পের সেই বিখ্যাত কুমির-উকিল আদালতে ব্যাখ্যা করে বলেছিল, এটি মানহানির মামলা, মান মানে কচু, এবং কচু হল গিয়ে গাছের মূল, অতএব বিষয়টার মূলে যাওয়া দরকার। যুক্তি যেমনই হোক, কুম্ভীর মহোদয় যে বিষয়ের মূলে যেতে চেয়েছিলেন সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের লেখক মহোদয়ও বিষয়ের মূলে যেতে চান, তাঁর যুক্তি যেমনই হোক না কেন। প্রথম দুটি অধ্যায় ‘সাহেব এবং মোসাহেবদের লুঠ কিসসা’ বিষয়ক। মোগল বাদশা আর বাংলার নবাবের হাত থেকে বাংলা ছিনিয়ে নিয়ে ইংরেজরা কীভাবে ছলে বলে কৌশলে অর্থ সংগ্রহ করেছে তার রোমাঞ্চকর বিবরণ এখানে আছে। সবই বহুকথিত, কাজেই বলার বিশেষ কিছু নেই, দেখার আছে শুধু লেখকের গর্জন ও হাহাকার। তবু, দুটি কথা অন্তত না বললেই নয়। এক, ইংরেজরা বাদশাহি ফরমানের জোরে যে কর আদায় করছিল (বা ব্যবসার শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছিল) সবই আগে প্রাপ্য ছিল বাদশা কিম্বা নবাবের। ফলত, কৃষক ও কারিগর লুঠ হওয়ার নাম করে লেখক যে কান্নাকাটি করেন, বস্তুত তা হচ্ছে নবাব-বাদশাদের হকের টাকা মারা যাবার দুঃখে হাহাকার! এবং দুই, সে অর্থটি পরিমাণের দিক থেকে ইংল্যান্ড ও ভারত উভয় দেশেরই তৎকালীন জাতীয় আয়ের তুলনায় যৎসামান্য। লেখক ২৭ পৃষ্ঠায় হিসেব দিয়েছেন, পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী আট বছরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা পথে ও বিপথে প্রায় ষাট লাখ পাউন্ড আদায় করেছিল, বছর-প্রতি যার গড় দাঁড়ায় সাড়ে সাত লাখ পাউন্ড। সেটা তৎকালীন ব্রিটিশ জাতীয় আয়ের প্রায় একশো ষাট ভাগের এক ভাগ, এবং তৎকালীন ভারতের জাতীয় আয়ের প্রায় হাজার ভাগের এক ভাগ। কাজেই, তাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অল্প গুটিকয় ধুরন্ধর স্থানীয় কর্তা আর তাদের ঘনিষ্ঠ সাঙ্গপাঙ্গরা ফুলে ফেঁপে উঠলেও, ব্রিটেন বা ভারত কোনও দেশের অর্থনীতিতেই সামগ্রিকভাবে তার খুব একটা প্রভাব থাকার কথা না, আর জাতীয় অসাম্যের হিসেবেও তাতে খুব বেশি হেরফের হবার কথা না। ফলত, এই দুটি অধ্যায়ের মাধ্যমে লেখক যেভাবে বিষয়টির ‘মূল’-এ পৌঁছতে চেয়ে বিদ্যাসাগরীয় কর্মকাণ্ডের পেছনকার অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার মুলোটি পাঠকের সামনে ঝুলিয়েছেন, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি খুব একটা জোরালো হয়নি। কে না জানে, অর্থই অনর্থের মুলো!

পরবর্তী তিনটি অধ্যায় ইংরেজি শিক্ষার (বিদ্যাসাগর-পূর্ব) প্রস্তুতিপর্ব নিয়ে, কিন্তু তিনটিরই শিরোনাম বিভ্রান্তিকর, তথ্য-যুক্তির দশাও তথৈবচ, এবং বক্তব্য বিষয় নিতান্ত উদ্ভট ও হাস্যকর। তার মধ্যে প্রথমটির শিরোনাম, “হেস্টিংস থেকে আমহার্স্ট— সংস্কৃতের আবাহন, সংস্কৃতির বিসর্জন”। তার প্রতিপাদ্য বিষয়টা হল, যদিও ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তি ও যুক্তিবাদ অ-ইউরোপীয়দেরকে মনুষ্যেতর বলে ঘৃণা করত, তবুও তারাই আবার এখানে এসে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরির জন্য সংস্কৃত ভাষাকে মহান ও ফারসিকে নিকৃষ্ট বলে প্রচার করে। লেখক তার দুটি ‘প্রমাণ’ হাজির করেছেন। এক, উইলিয়াম জোন্স সংস্কৃত শিক্ষায় উৎসাহী ছিলেন এবং ফারসিকে গুরুত্ব দেননি, আর, হ্যালহেড সাহেব বাংলার ব্যাকরণ লিখেছিলেন! বস্তুত, এর সবই ভুল। ইউরোপের উনিশ শতকীয় যুক্তিবাদীরা অনেকেই অ-ইউরোপীয়দেরকে নিজেদের চেয়ে নিকৃষ্ট ভাবতেন ঠিকই, কিন্তু আবার অনেকেই তাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চারও ছিলেন। সত্যি বলতে কী, সব মানুষেরই মর্যাদা যে আদতে সমান, এই ‘হিউম্যানিস্ট’ ধারণাটিই ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির দান। আর, জোন্স সাহেব আসলে ফারসিতে সুপণ্ডিত ছিলেন, সে সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং ভারতে আসার আগেই ফারসি শেখার একটি বইও লিখেছিলেন যার বহু সংস্করণ নিঃশেষিত হয়েছিল। হ্যালহেড সাহেব বেচারা যে আমাদের ভাষার প্রথম ব্যাকরণ লিখে কী অপরাধটা করলেন, সেটা লেখকের শত এলোমেলো গর্জন পাঠ করার পরেও কিছুতেই বুঝে ওঠা যায় না। তিনি নাকি ‘নিজের পছন্দসই ব্যাকরণ’ বানিয়েছিলেন, যাতে ‘ভাষার আসল পকড়’-টা সাহেবদের হাতেই থাকে। ‘নিজের পছন্দসই ব্যাকরণ’ মানে? বাংলা ভাষা যা নয় তেমন ব্যাকরণ? কিন্তু, তাহলে তো দেখাতে হয়, বাংলা ভাষার নিয়মকানুন বলে ওখানে যা বলা হয়েছিল তা সত্যি নয়, হ্যালহেড সায়েব ভুল ব্যাকরণ লিখেছিলেন। না, লেখক সে সব কিছু দেখাননি, এবং এমন উদ্ভট অভিযোগ করলে যে ওইরকম কিছু একটা প্রমাণ দেখাতে হয়, সেটা বোধহয় লেখক জানেনই না! আর, ‘ভাষার আসল পকড়’-টাই বা কী বস্তু? কোথায় থাকে ‘ভাষার পকড়’— ব্যাকরণে না অভিধানে? একটা ভাষার ভুলভাল ব্যাকরণ বানালে ‘ভাষার পকড়’ হাতে চলে আসে বুঝি? ভারি মজা তো! কোন ভাষাবিদের কাছ থেকে এমন সব আশ্চর্য সত্য জানা গেল?

এ বইয়ের সবকটি অধ্যায়ই এইরকম, তার সম্পূর্ণ আলোচনা এখানে সম্ভব নয়, এবং সেটা বোধহয় জরুরিও নয়। কাজেই আমি এখানে শুধু কয়েকটা মাত্র প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমেই বলা দরকার লেখকের কেন্দ্রীয় প্রবণতা ও লিখন-পদ্ধতিটির কথা। ইতিহাস-লেখকের কাজ তথ্যের পাহাড় কুঁদে ঐতিহাসিক সত্যকে পুনর্নির্মাণ করা, সেটা বিজ্ঞানীর কাজ, কারুশিল্পীরও বটে। বর্তমান লেখকের পদ্ধতিটি ঠিক তার বিপরীত— আগেই একটি ষড়যন্ত্রমূলক গল্প বানিয়ে নিয়ে তারপর তার ওপর এখান সেখান থেকে খুশিমত খামচে খামচে বস্তা বস্তা তথ্য ঢালতে থাকা। সম্ভবত লেখকের ধারণা, যদি গুচ্ছ গুচ্ছ পণ্ডিতি গ্রন্থের রেফারেন্স ও উদ্ধৃতি দিয়ে বইটিকে বেশ পৃথুল করে তোলা যায়, তো সেটাই তাঁর প্রামাণ্যতার পক্ষে যথেষ্ট হবে। বলা বাহুল্য, ধারণাটি ভুল। উদ্ধৃতি ও রেফারেন্স যত পাহাড়প্রমাণই হোক না কেন, তার মধ্যে মৌল যুক্তিবোধ ও ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা না থাকলে লেখকের বাতিকগ্রস্ততাই শুধু প্রমাণিত হয়, তাঁর প্রতিপাদ্যটি নয়। কয়েকটি স্তম্ভিতকারী দৃষ্টান্ত পেশ করা যাক।

পঞ্চম অধ্যায়ের শিরোনাম, “দেশজ শিক্ষাব্যবস্থার অপমৃত্যু— দেশি ধান বনাম বিলিতি ওক”। এর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ইংরেজরা আসার আগে দেশে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা ছিল, এবং ইংরেজরা (এবং সেইহেতু বিদ্যাসাগরও) আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের নাম করে আসলে সেটা ধ্বংস করেন। তৎকালীন সাহেব-সমীক্ষকদের যে হিসেবনিকেশ তিনি দিয়েছেন, তার একটি গর্বিত নমুনা এইরকম— ১৮২৯ সালে বোম্বে প্রদেশে মোট জনসংখ্যা ৮৬,৮১,৭৩৫, এবং তার মধ্যে ছাত্র ৩৫,১৫৩ জন (পৃঃ ৬৮)। একটু পাটিগণিত সহযোগে স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করলে লেখক বুঝতেন, ওর অর্থ হচ্ছে দশমিক সাত পাঁচ (০.৭৫) শতাংশ! অকারণ গর্ব ভালো নয়, তাই না? এই ব্যবস্থাটা এমনকি বিলেতের শিক্ষাব্যবস্থার চেয়েও উন্নত এই আখাম্বা দাবিটি তোলার আগে তিনি যদি ব্রিটেনের শিক্ষা-ইতিহাস একটু পড়ে নিতেন তো দেখতে পেতেন, সেখানে সপ্তদশ শতকেই প্রায় চল্লিশ শতাংশ সাক্ষরতা ছিল। তা, ব্রিটেনের শিক্ষা-ইতিহাস তিনি না-ই পড়তে পারেন, কজন শিক্ষিত বাঙালিই বা তা পড়েন? কিন্তু, যে দেশে যে কালে নিউটন-শেক্‌স্‌পিয়ার-লক-বয়েল-হার্ভে প্রমুখের অস্তিত্ব আছে সে দেশে সেই কালে যে শিক্ষাদীক্ষার হাল সমকালীন ভারতের চেয়ে কিছু ভালো হবার কথা, সেই বোধটুকুও যদি না থাকে, তো খামোখা ইতিহাসচর্চা করতে আসার দরকার কী? ওই একই অধ্যায়ের শেষে লেখক প্রাগৌপনিবেশিক শিক্ষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষার সাঙ্গীকরণ’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি হাজির করেছেন। এ উদ্ধৃতির কারণ হল, সেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রাগৌপনিবেশিক বাংলা-বিহারের ‘এক লক্ষের উপর পাঠশালা’ নামক সুবিখ্যাত ভুল তথ্যটির উল্লেখ করেছেন, এবং তাঁর শৈশবকালীন শিক্ষার এক স্মৃতিমেদুর বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু, লেখক যদি রবীন্দ্রনাথের ওই প্রবন্ধটি গোটাটা পড়ে বোঝার চেষ্টা করতেন তাহলে জানতে পারতেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে এক অত্যন্ত দেশ-আবেগী ভঙ্গিতে আসলে আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষার পক্ষেই সওয়াল করছেন! আশ্চর্যের কথা হল, লেখক আসলে শুধু যে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধটি পড়েননি তা নয়, তিনি এমন কি তার শিরোনামটিও ঠিকঠাক পড়েননি। তাঁর দেওয়া শিরোনামের ‘সাঙ্গীকরণ’ বানানটি ভুল এবং হাস্যকররকম অর্থ-বিপর্যয়কারী, ওটা আসলে হবে ‘শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ’!

ষষ্ঠ অধ্যায়ের নাম, “বিদ্যাসাগরের কর্মজগতের শুরু— সাহেবসুবোর সুধাসঙ্গ”। প্রতিপাদ্য বিষয়, ১৮৪৪ সালে সংস্কৃত কলেজে পণ্ডিতের পদ খালি হওয়ার পরে শিক্ষাসচিব মৌয়াট-এর প্রস্তাব সত্ত্বেও সে পদ গ্রহণ না করে বিদ্যাসাগর যে তা তারানাথ তর্কবাচষ্পতিকে দিয়ে দিলেন, সেটা আসলে বহুকথিত বিদ্যাসাগরীয় ঔদার্যের প্রমাণ নয়, তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল সেক্রেটারি মৌয়াট সাহেবকে তৈলমর্দন করা, যাতে তিনি ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হতে পারেন! সমস্যা হচ্ছে, সেটা সত্যি হতে গেলে আট বছর পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোথায় কী হবে সেটা বিদ্যাসাগরকে শুধু যে আগাম ছকে রাখতে হবে শুধু তাইই নয়, ইতিমধ্যে কোন কোন পদ থেকে কে কে অপসারিত হবেন বা মারা যাবেন সেটাও তাঁকে আগে থেকে জেনে রাখতে হবে! আরও সমস্যা হচ্ছে, তিনি যদি এত ঔদার্য না দেখিয়ে সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিতের পদটি তক্ষুনি নিয়েই নিতেন, তাতেও যে তাঁর আট বছর পরে ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হতে ঠিক কোথায় আটকাত, সেটাও আদৌ বুদ্ধিগ্রাহ্য নয়।

পরের অধ্যায়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে যা যা প্রশাসনিক সংস্কারসাধন করেছিলেন সেগুলোর উদ্দেশ্য আসলে ইংরেজের তৈলমর্দন এবং শিক্ষার ব্যবসায়ীকরণ। দৃষ্টান্ত— অবৈতনিক সংস্কৃত কলেজে ভর্তির ফি দু টাকা করে দেওয়া। তাঁর নিজের যুক্তি ছিল, ছাত্ররা যেহেতু যখন খুশি কলেজ ছেড়ে দেয় এবং খুশিমত কিছুকাল পরে আবার ভর্তি হতে আসে, অতএব একটা ভর্তিমূল্য ধার্য করলে এ বিশৃঙ্খলা হয়ত কিছু কমবে। কিন্তু লেখক এখানে বলতে চান, ও সব শৃঙ্খলা-টৃঙ্খলা পুরো বাজে কথা, আসল উদ্দেশ্য অন্য। প্রমাণ? বিদ্যাসাগরের দেওয়া ১৮৫৩ সালের হিসেব, যাতে দেখা যাচ্ছে এ বাবদ আদায় হয়েছিল “মাত্র ৪০ টাকা” (পৃঃ ৯৯)! লেখক না হয় সাক্ষরতার শতাংশ কষতে পারেন না, কিন্তু তাই বলে চল্লিশকে দুই দিয়ে ভাগটাও করতে পারবেন না? সেটা করলে অনায়াসেই দেখতে পেতেন, ওই সময়কালের মধ্যে (এক বছরের দুই-তৃতীয়াংশ) অন্তত কুড়িটি ছেলে দু টাকা করে গচ্চা দিয়ে আবার ভর্তি হয়েছিল। মানে, গোটা বছরে হয়ত বা মোট ত্রিশ, সেই সময়কার ছাত্র সংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ! তারপরেই তিনি লিখেছেন, কর্তৃপক্ষকে বিদ্যাসাগরের দেওয়া সমগ্র ২৮ বছরের ছাত্র-তালিকা থেকে নাকি ‘দেখা যায়’, একটিও ড্রপ আউট ছিল না। আসলে কিন্তু ঘটনা তার বিপরীত— ওই তালিকা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, প্রায় প্রতি বছরেই ড্রপ আউট হত, এবং মোটের ওপর ওই হারেই হত!

১৬৯ পৃষ্ঠায় তিনি সিপাহী বিদ্রোহকে ‘সামন্ত বিদ্রোহ’ বলে আখ্যা দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন, এবং স্বপক্ষে নানা বাগবিস্তার করেছেন। আবার, ১৯৫ পৃষ্ঠায় ইতিহাসবিদ ডি ডি কোসাম্বিকে তিনি মহানন্দে উদ্ধৃত করছেন এই ভরসায় যে, কোসাম্বি সেখানে নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের ঔপনিবেশিক পূর্বসূরিদের ‘দালাল’ বলছেন। কিন্তু, আনন্দের প্রবল ঝোঁকে লেখক মহাশয় এইটা আর পড়ে দেখার সময় পাচ্ছেন না যে, ওই একই অতিক্ষুদ্র উদ্ধৃতিটিতে কোসাম্বি সিপাহী বিদ্রোহকে ‘দ্য লাস্ট আপসার্জ অফ ফিউডালিজ্‌ম্‌’ বলছেন! এমন নির্বোধ, বা এমনকি অসৎ উদ্ধৃতির দৃষ্টান্ত আরও আছে। ৪০৫ ও ৪০৬ পৃষ্ঠায় তিনি সুশোভন সরকারের ‘নোট্‌স্‌ অন দ্য বেঙ্গল রেনেসাঁ’ নামক ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের ১৯৭৯ সালে সংযোজিত টিকা উদ্ধৃত করেছেন। তাতে ইতিহাসবিদ শ্রীসরকার বলছেন, বাংলার নবজাগরণের কুশীলবদের তিনটি সমস্যা ছিল। এক, তাঁরা ব্রিটিশ শাসনেই আমাদের উন্নতি হবে বলে মনে করতেন, পরাধীনতা ও ঔপনিবেশিক শোষণকে গুরুত্ব দেননি। দুই, তাঁরা ছোট বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন, এবং দেশের আমজনতার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তিন, হিন্দু এলিট ও মধ্যবিত্ত সমাজের বৃত্তে আবদ্ধ ছিলেন বলে হিঁদুয়ানি থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেননি, ফলে মুসলমানদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। মুশকিল হচ্ছে, এর মধ্যে কিছু সত্যি থাকলেও, এখানে লেখক তা যেভাবে উদ্ধৃত করেছেন তা মিথ্যায় আচ্ছন্ন। লেখক এখানে মোটেই উল্লেখ করেননি যে, শ্রীসরকারের মূল বইটিতে আসলে বঙ্গীয় নবজাগরণকে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে দেখা হয়েছে তাতে এই নবজাগরণ ভারতের স্বাধীনতাকামী আধুনিক জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ও রাজনীতির উন্মেষের একটি অপরিহার্য ধাপ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বর্তমান আলোচ্য বইটির ঐতিহাসিক অবস্থানের ঠিক বিপরীত। ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পি সি জোশির অনুরোধক্রমে এটি লেখা হয়েছিল, খুব সম্ভবত কম্যুনিস্ট পার্টির কর্মীদের কাছে নবজাগরণের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরবার জন্যই। ফলত, ১৯৭৯ সালে সংযোজিত এই নোট-টি একটি প্রান্তিক সংশোধনী মাত্র, যাতে তার মূল বক্তব্য আদৌ পরিবর্তিত হয় না। এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয়ের অবকাশ নেই। ১৯৭৯ সংস্করণে যেখানে এই টিকাটি সংযোজিত হয়েছিল, সেখানে ঠিক তার আগেই তার ব্যাখ্যায় স্বয়ং সুশোভন সরকার খুব পরিষ্কার করেই বলেছিলেন, দৃষ্টিভঙ্গির কোনও মৌলিক পরিবর্তনের ফলে নয়, বরং অতি-সরলীকরণকে পরিহার করে কিছু ঐতিহাসিক জটিলতাকে ধারণ করার জন্যই এই সংযোজন, যে অতিসরলীকরণ আগের সংস্করণে থেকে গিয়েছিল তাড়াহুড়ো করে বইটি শেষ করতে গিয়ে। তিনি আরও বলেছিলেন, আগের সংস্করণটি তার উদ্দেশ্য খুব সফলভাবেই সুসম্পন্ন করতে পেরেছিল। ফলত, নবজাগরণের কুশীলবদের ব্রিটিশ দালাল প্রতিপন্ন করবার পক্ষে শ্রীসরকারের এ উদ্ধৃতিটি আসলে সহায়ক তো নয়ই, বরং অতি বিপজ্জনক।

কিন্তু, এগুলোও আসলে সবচেয়ে বড় গণ্ডগোল নয়, লেখক মহোদয় সবচেয়ে সাংঘাতিক বিপর্যয়টি ঘটিয়েছেন বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্রে। এ প্রসঙ্গে লেখকের অত্যাশ্চর্য প্রতিপাদ্যটি খুঁটিয়ে লক্ষ করলে উন্মত্ততার বহর দেখে হতবাক হতে হয়। তাঁর মতে, সতীদাহ রদ এবং বিধবা-বিবাহ প্রচলন— এ দুটোই হচ্ছে সাহেবদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, এবং সে ব্যাপারে যথাক্রমে রামমোহন ও বিদ্যাসাগর ছিলেন তাদের হাতের পুতুল মাত্র— এ দুই কীর্তির মধ্য দিয়ে আসলে উপনিবেশ-দখলদার ব্রিটিশ পুরুষ ঔপনিবেশিক নারীদের উদ্ধারকর্তা হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল! কিন্তু, এত কষ্ট করে এইসব করে তাদের লাভ কী? সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসন ও অর্থনীতির স্বার্থই বা এ দিয়ে ঠিক কীভাবে পূরণ হবে? বলা বাহুল্য, তার কোনও যৌক্তিক উত্তর নেই, থাকা সম্ভবও না। ফলে লেখক সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বয়ান ছেড়ে চলে গেছেন নারীবাদের সাইকো-অ্যানালিটিক্যাল ব্যাখ্যার বাগাড়ম্বরে, ডেকে নিয়ে এসেছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মহোদয়াকে (পৃঃ ২৬৯)। বিস্তর অবান্তর ডিটেলিং সহযোগে তিনি তাঁর গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম পাঁচটি দীর্ঘ অধ্যায় জুড়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, বিধবা বিবাহ আইনের ফলে আসলে বিধবাদের হাত থেকে সম্পত্তির অধিকার ছিনিয়ে নেবার ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু, সেটা করেই বা ব্রিটিশ প্রশাসনের কী এমন বিরাট লাভ? এত বড় প্রশ্নের একটি মাত্র ছোট্ট উত্তর এ বইতে আছে— ব্রিটিশ সভ্যতা ‘পুরুষতান্ত্রিক’! কী কাণ্ড, প্রাগৌপনিবেশিক হিন্দুসমাজ তবে অপুরুষতান্ত্রিক ছিল বুঝি? বিধবাদেরকে আবার বিয়ে করার অধিকার দিয়ে যে খুব ঠিক কাজ হয়েছিল, এই সাদা সাপ্টা কথাটাকে অস্বীকার করার জন্যে যে লোকে পাতার পর পাতা জুড়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কত অবান্তর কথা বলতে পারে, এ বইটি না পড়লে তা বিশ্বাস করাই কঠিন। যেভাবে মনুস্মৃতি থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন যে মধ্যযুগীয় বাংলায় (এবং সেইহেতু ভারতেও) বিধবাদের অধিকার ব্রিটিশ আমলের চেয়ে অনেক বেশি ছিল, তার বিশদ আলোচনা খুব মজার হতে পারত, কিন্তু এ পরিসরে আর তা সম্ভব না। শুধু এটুকু বলে রাখা যাক, তা শুধু হাস্যকর আগড়ম বাগড়ম নয়, নিখাদ অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত।

লেখকের গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায়? সম্ভাব্য সবখানেই। প্রাচীন ঐতিহ্য-কাতর সংরক্ষণশীল জাতীয়তাবাদ, শূন্যগর্ভ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বাগাড়ম্বর, পোস্ট কলোনিয়াল তাত্ত্বিক ধোঁয়াশা আর হাস্যকর রকম উৎসাহী সাব-অল্টার্নিস্ট সেল্‌ফ্‌-লেবেলিং বিচিত্র অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি নড়বড়ে এবড়োখেবড়ো এক ধরনের তাত্ত্বিক অবস্থান। আগে থেকে ষড়যন্ত্রের গল্প সাজিয়ে তার সপক্ষে বস্তা বস্তা তথ্য এখান সেখান থেকে খামচে আনবার বিচিত্র অযৌক্তিক পদ্ধতি। ‘লজিক’-এর বদলে সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা। এবং সর্বোপরি, ‘ইতিহাস’ নামক বস্তুটির বিরাটত্ব, জটিলতা ও নৈর্ব্যক্তিকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা। বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা জাতির ষড়যন্ত্র দিয়ে যে ইতিহাস নির্মিত হয় না, তারা যতই শক্তিশালী হোক না কেন— এই কথাটা বুঝতে না পারা।

আলোচনাটা হয়ত একটু বড়ই হয়ে গেল, এমন একটি বইয়ের পক্ষে। কিন্তু, পাঠকের প্রতি সাবধানবাণী কিঞ্চিৎ বিস্তারিত হলে ক্ষতি কী?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

4 Comments

  1. শেষপর্যন্ত পড়ে যা বোঝা গেল তা হল – (১) এত মাথা না খাটিয়ে লেখক বইটির নাম ‘বিদ্যাসাগর অপনির্মাণ’ রাখতে পারতেন। (২) লেখক জটায়ুর (লালমোহন বাবু) আধুনিক সংস্করণ যিনি আগে ক্রিমিনাল ঠিক করে নিয়ে তারপর তার ঘাড়ে অপরাধটি চাপানোর চেষ্টা করেন !

    • জটায়ুর বইটির সম্ভাব্য নাম — “নিন্দাসাগরে বিদ্যাসাগর” !

  2. যে কোনও ব্যক্তিত্বের, তিনি যত বড়ো মনীষী-ই হোন না কেন, তাঁর নির্মোহ, নির্মোক মূল্যায়ন জরুরি। ইতিহাসের স্বার্থে, সমাজপ্রগতির স্বার্থে। কিন্তু সে মূল্যায়ন যদি অবাঞ্ছিত অসূয়া ও বিদ্বেষপ্রসূত হয়, তথ্য-যুক্তির পরিবর্তে তা অকারণ ও অপরিণামদর্শী নিন্দাবাদে পর্যবসিত হয়, তাহলে তাকে মূল্যায়ন বলা চলে না। দেবাশিসের পর্যালোচনা থেকে মনে হচ্ছে, আলোচ্য গ্রন্থটি গুরুতরভাবে সে দোষে দুষ্ট। আগে মূল্যায়নের উপসংহার টেনে তারপর তাকে সঙ্গত দেখানোর উদ্দেশ্যে খাবলা খাবলা তথ্য ইতিউতি গুঁজে দেওয়াকে আর যাই হোক, গবেষণা কর্ম বলা চলে না; তার মধ্যে যতই না কেন আত্মগর্বী গর্জননির্ঘোষ থাক।

  3. এরকম লেখা আমাদের পড়ানোর জন্যও ধন্যবাদ।
    বই এর লেখকের ‘হামবড়ো’ ভাব যে কেবল লেখকের নিজের মানসিক অশান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়,তা বারংবার পেয়েছি।

আপনার মতামত...