গোয়া: আরেকটি যুদ্ধজয় ও উজ্জীবনের কাহিনি

ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জি

 



শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

ডেম্পো আর সালগাঁওকর। নামদুটোর সঙ্গে বাঙালির চেনাজানা ফুটবলের সূত্র ধরে। আসলে দুই পরিবারের নাম যাদের আয়ের উৎস খনির মালিকানা। এরকম পরিবার আরও বেশ কিছু আছে। এরাই গোয়ার মাইনিং ব্যারন। পর্তুগিজ আমল থেকে গোয়া রাজ্যের খনিজ সম্পদ আহরণের অধিকার এইসব পরিবারভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির। তাদের অধিকার সনদ বলছে এই অধিকার তারা বংশপরম্পরাক্রমে চিরকাল ভোগ করবে। যদিও ১৯৬১-তে পর্তুগিজ রাজত্বের অবসানের পর কাগজেকলমে তাদের অধিকার অনেকাংশে সীমিত হয়েছে, বাস্তবে এই ব্যারনরা এক শক্তিশালী লবি— সুদূরবিস্তৃত তাদের প্রভাব।

যদিও গোটা দেশে যত লোহা তোলা হয় তার প্রায় অর্ধেক এই অতি ক্ষুদ্র রাজ্যটি থেকে, গোয়ার পরিচিতি তবু তার বেলাভূমি আর কাজু ফেনির জন্য। কিন্তু এই ট্যুরিস্ট ব্রশিওরের বাইরের গোয়াও একসময় ছিল ছবির মতো সুন্দর। পশ্চিমঘাট পর্বতের ঢেউ ছিল ঘন বর্ষা অরণ্যে ঢাকা। এখনও গোয়াতে ঢোকার সময় এই সবুজ কার্পেটের ওপর দিয়েই বিমান উড়ে যায়, কিন্তু আর একটু নিচে এলেই চোখে পড়ে সেই কার্পেটের সঙ্গে একদমই বেমানান অজস্র দগদগে ক্ষত। যেখানে যেখানে ওপেন কাস্ট মাইনিং-এর বলি হয়েছে প্রকৃতি। গোয়াতে যতটুকু মাইনিং হয় তার পুরোটাই ওপেন কাস্ট পদ্ধতিতে— সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে কুৎসিত ও ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি। ওপেন কাস্ট মাইনিং-এ প্রথমেই নির্বিচারে ধ্বংস করা হয় লিজ নেওয়া জমিতে থাকা যাবতীয় গাছপালা। তারপর এক বিরাট গহ্বর খোঁড়া হয় দানবীয় সব যন্ত্র ব্যবহার করে। যে টপসয়েল সেই কোন আদিযুগ থেকে পোষণ করেছিল আদিম এক অরণ্যকে, তা উপড়ে ফেলা হয়। গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে লাল রঙের এক বিশাল ক্ষত।

মজার কথা হল গোয়ার খনিজ ভাণ্ডার (বেশিরভাগটাই আয়রন ওর) মোটেও খুব উঁচু মানের নয়। এক টন খনিজ নিংড়ে বের করতে চার টন মাটি কাটতে হয়। অর্থাৎ যা উৎপাদন হয় তার তিনগুণ বর্জ্য, এবং সেই বর্জ্য লিজ এরিয়ার মাঝে ফেলা যুক্তিসঙ্গত নয়। এভাবেই যত্রতত্র গজিয়ে উঠতে থাকে বাতিল মাটির পাহাড় যা বৃষ্টিতে গলে গিয়ে ঝোরা আর স্রোতস্বিনীর জলের রং করে দেয় টকটকে লাল। এত মাটি বইতে গিয়ে বুজে যায় জলের ধারা, নদী উপচে পড়ে বন্যা হয়। অন্যদিকে ওপেন কাস্ট মাইনিং-এর ফলে ভৌমিক জলস্তর ক্রমশ নেমে যেতে থাকে, গ্রামের কুয়ো যায় শুকিয়ে, সরকারি ট্যাপের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয় গ্রামবাসীদের, কখনও কখনও খনি মালিকরা জলের ট্যাঙ্ক পাঠায় গ্রামে। কোথাও বা অনবরত বিস্ফোরণের শব্দ আর ধুলোতে জেরবার স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্ত করতে বাস স্টপ তৈরি করে দেওয়া হয় বা সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের সম্মতি কেনা হয়। প্রকৃতির যে অকৃপণ দানে একসময় অবাধ অধিকার ছিল প্রান্তিক মানুষের, আজ তারই কিয়দংশ পেতে হলে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট আঁতাতের সামনে হাঁটু গেড়ে ভিখারির মতো বসতে হয় তাদের।

এই নিম্নমানের খনিজ তুলতে গিয়ে মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র‍্যের সর্বনাশ যখন ঘটানো হচ্ছে তখন ধরে নেওয়া যায় জাতির উন্নতির জন্যই এই বলিদান। আরও মজার তথ্য হল গোয়া থেকে উত্তোলিত খনিজ পুরোটাই রপ্তানি হয়। হাতের কাছে মার্মাগাঁও বন্দর হয়ে সেই খনিজ চলে যায় নানা দেশে, তাদের শিল্পায়নের অসীম চাহিদা মেটাতে। ১৯৪৭ সালে রপ্তানি শুরু হয়, সে বছর মোটে একশো টন। ১৯৫৪ সালে পরিমাণটা গিয়ে দাঁড়ায় দশ লক্ষ টনে। মূলত চিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ২০০৪ নাগাদ খনিজ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় তেত্রিশ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ, চিনের খনিজ কাঁচামালের বুভুক্ষা মেটাতে গিয়েই ধ্বংস হচ্ছে গোয়ার প্রকৃতি।

এই লেখাতে এখনও পর্যন্ত বর্তমান কালের ব্যবহার হলেও, সুখবর, বাস্তবে এখন গোয়াতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী লৌহখনিজ নিষ্কাশন বন্ধ। প্রধানত এই পরিস্থিতি গোয়া ফাউন্ডেশন নামে এক পরিবেশবাদী সংগঠনের কয়েক দশক ধরে অক্লান্ত চেষ্টার সুফল। ২০১২ সালে গোয়া ফাউন্ডেশনের দাখিল করা জনস্বার্থ মামলার ভিত্তিতে এবং জাস্টিস শাহ কমিশনের বে-আইনি মাইনিং সংক্রান্ত রিপোর্ট সংসদে পেশ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুসারে গোয়াতে সমস্ত রকম মাইনিং বন্ধ হয়ে যায়। পর্তুগিজ আমল থেকে শুরু করে এই প্রথম। এই জনস্বার্থ মামলার রায় বেরোয় ২০১৪ সালে। এই রায়ে ২০০৭ পরবর্তী সময়ে গোয়া রাজ্যে চলা সমস্ত খনিজ নিষ্কাশনকে বেআইনি বলা হয়। রাজ্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়, এবং পুরনো মাইনিং লিজ বাতিল করে নতুন করে লিজ বন্টন করতে আদেশ দেওয়া হয়। এবার লিজ বণ্টন করতে হবে কড়াভাবে বিধিনিষেধ মেনে। কিন্তু রাজ্য সরকার আইনি ছিদ্র বের করে ৮৮টি লিজ রিনিউ করে। এর বিরুদ্ধে ফের জনস্বার্থ মামলা করে গোয়া ফাউন্ডেশন। ২০১৮ সালে সেই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় ওই লিজগুলিকে বাতিল করে। এরপরেও খনি খোলার চেষ্টা চলতে থাকে, চলতে থাকে নানা স্তরে আইনি উতোরচাপান। দু বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর গোয়া সরকার এবং বেদান্ত লিমিটেডের তরফ থেকে ২০১৮-র আদেশ সম্পর্কে রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয় এ বছর জুলাই মাসে। লক্ষ্যণীয়, ইতিমধ্যে ২০১৮-তে যাঁরা আদেশ দিয়েছিলেন সেই দুই বিচারপতি জাস্টিস মদন বি লোকুর এবং জাস্টিস দীপক গুপ্তা অবসর নিয়েছেন। আনন্দের কথা, এবারও সরকারপক্ষ এবং খনি মালিকরা হেরেছে। খারিজ হয়ে গেছে রিভিউ পিটিশন। এরপর রাজ্য সরকারের হাতে ২০১৮-র আদেশ মেনে পুরনো সমস্ত লিজ বাতিল করে নতুন করে নিলাম করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকছে না। ভারতের সাধারণ মানুষের হাতে দেশের সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের সামনে মাইনিং ব্যারনদের লবিইং অন্তত এবার ব্যর্থ হল। এটা সমস্ত পরিবেশ সচেতন মানুষের জন্যই খুশির খবর।

একইসঙ্গে এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পরিবেশের প্রশ্নে দলমতনির্বিশেষে সমস্ত সরকারই কতটা অসংবেদনশীল। নাম-কা-ওয়াস্তে পরিবেশ দপ্তর থাকলেও তাদের আসল কাজ যেন কোনরওকমে নগ্ন সত্যকে ডুমুরপাতা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা। বিভিন্ন দপ্তরের মাঝে ‘পাসিং দ্য বাক’ খেলা হয়, আর অন্যদিকে অবাধে চলতে থাকে প্রকৃতি-ধ্বংস— বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল। একমাত্র যে লজিকটি বারবার তুলে ধরা হয় তা হল অর্থনৈতিক উন্নতি। কিন্তু এ কেমন উন্নতি যা একটা জ্যান্ত বাস্তুতন্ত্রকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, পরমুখাপেক্ষী করে তোলে এমন কি বেশিরভাগ মানুষকেও?

কোন রঙের দল সরকার গড়ছে সেটা আর গুরুত্ব রাখে না। পরিবেশের প্রশ্নে সবাই সমান। এবং গোয়ার সমস্যা বিভিন্ন স্কেলে আমাদের সবার জীবনেই সত্যি। এখন আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর ঘাড় নেড়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারি, যেটা আসলে পালানো। অথবা আমরা গোয়া ফাউন্ডেশনের মত নাছোড় লড়াই করতে পারি। প্রায় সবই গেছে, হয়তো বাকিটুকুও যাবে, তবু একটা শেষ মরিয়া চেষ্টা।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...