ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এবং বর্তমান নাগরিক সমস্যা — একটি বিশ্লেষণ

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 



কবি, গদ্যকার

 

 

 

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা দিয়ে লেখাটি শুরু করা যাক। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির অধীনে অধ্যাপক আর কে মল-এর নেতৃত্বে মহামানা সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ইন ক্লাইমেট চেঞ্জ সেন্টার-এর করা সমীক্ষাটি উত্তর-পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত এবং দক্ষিণ-মধ্য ভারতকে ‘হিটওয়েভ হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সম্প্রতি যার মধ্যে পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের বেশ কিছুটা অঞ্চল ভয়াবহ তাপপ্রবাহ সমন্বিত এলাকার মধ্যে পড়ছে। এইসব অঞ্চল লো ডায়ারনাল টেম্পারেচার রেঞ্জের মধ্যে পড়ে, অর্থাৎ এইসব এলাকায় দিন এবং রাতের ভেতর উষ্ণতার পার্থক্য থাকে যৎসামান্য। এর সঙ্গে এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও খুব কম। ১৯৫১ সাল থেকে ২০১৬ সাল অবধি গত সাত দশক ধরে প্রি-মনসুন (মার্চ থেকে মে) এবং প্রি-সামার মনসুন (জুন থেকে জুলাই) সময়কালের তথ্য জোগাড় করে তার একটি গড় থেকে মোটামুটি উপরোক্ত ধারণাটিতে আসা গেছে। জীবস্বাস্থ্য, কৃষিজ উৎপাদন এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের উপর যার প্রভাব অনস্বীকার্য। এই প্রসঙ্গে হিট ওয়েভ কী সে বিষয়ে একটি আলোকপাত করা যেতে পারে। স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ৪.৫ ডিগ্রি বেশি এবং সামগ্রিকভাবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হলে তাকেই হিট ওয়েভ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই ৪.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে মাত্রাটি ৬.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছে গেলে তা ‘সিভিয়ার হিট ওয়েভ’-এর আওতায় পড়ে। গত মরসুমে বর্ষা দেরিতে আসার জন্য দিল্লির কিছু অংশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে দশকের সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা গেছিল, যার মধ্যে দিল্লিতেই খোদ তাপমাত্রা উঠে গেছিল ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

এদেশের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের অবস্থানটিও এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু ভারতবর্ষেই নয়, ২০১৯ সাল গোটা বিশ্বের নিরিখেই সাংঘাতিক তাপপ্রবাহ-সমন্বিত একটি বছর, যার সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়নের যে একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উচ্চচাপ-জনিত প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই বীভৎস হিট ওয়েভ জোনগুলি তৈরি হয়ে ওঠার পেছনে অনেকাংশেই দায়ী। ইউরোপ মহাদেশে ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯— এই চারটি বছরে ‘হিট এক্সট্রিম’-এর ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। আফ্রিকা থেকে আসা অ্যান্টি-সাইক্লোন ‘লুসিফার’ থেকে ইতালির সিসিলিতে চলা একটি তাপপ্রবাহে ইউরোপের সর্বাধিক তাপমাত্রা ৪৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ছুঁয়ে গেছে সাম্প্রতিক আগস্ট মাসের একটি দিন, যা ১৯৭৭ সালে গ্রিসের ৪৮ ডিগ্রিকে ছাড়িয়ে চলে গেছে অনেকটাই। সাইবেরিয়ায় গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সাল সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রাযুক্ত বছর হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট অঞ্চল এবং পশ্চিম কানাডায় সাম্প্রতিক হিটওয়েভ থেকে প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত ঘটতে দেখা যাচ্ছে প্রায়ই। এবছরের ২৫ জুন থেকে ১ জুলাই এই অঞ্চলের প্রায় ৭০০ জনের মৃত্যুর কারণ সরাসরি এই তাপপ্রবাহ। এর সঙ্গে এটাও জেনে রাখা ভালো, সারা বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে অন্তত ৬০০ জনের মৃত্যু তাপপ্রবাহ-জনিত সমস্যা থেকেই হয়। গোটা বিশ্বের নিরিখে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে উত্তর গোলার্ধে তাপপ্রবাহের ঘটনা ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই প্রসঙ্গে এসে পড়ে শহুরে তাপ দ্বীপ বা আর্বান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব। বড় বড় শহরের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী শহরতলি বা গ্রামগুলির থেকে অনেকটাই বেশি তাপ ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ছে, যা তাদের আক্ষরিক অর্থেই আর্বান হিট আইল্যান্ডে পর্যবসিত করছে। কংক্রিট, অ্যাসফাল্ট ইত্যাদি দ্রব্যগুলির বেশি ব্যবহারে সূর্যালোক শোষণ করার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি তথাকথিত উন্নয়নের নামে বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে সেই অর্থে কুলিং বা শীতলীকরণ কিছুই না হওয়ায় একধরনের মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে শহরগুলি। এর সঙ্গেই এসে যাচ্ছে আর্বান ক্যানিয়নের প্রসঙ্গ। দুদিকে উঁচু বাড়ি দিয়ে ঘেরে শহরের রাস্তাগুলি বায়ু চলাচল প্রতিহত করে একধরনের ক্যানিয়নের মতো আকার ধারণ করছে যা হিট স্ট্রেসকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনয়ত। পাশাপাশি গাড়ি, কারখানা ইত্যাদি থেকে নিঃসরণ এবং সামগ্রিক এনার্জি ফ্লাক্স এই তাপ-দ্বীপগুলিকে নিঃশব্দ ঘাতকে রূপান্তরিত করছে। মজার কথা হল, এই সমস্যা থেকে বেরোনোর জন্য প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা এয়ার কন্ডিশনার বা এয়ার কুলার ব্যবহারের প্রবণতা, যা শেষমেশ গরম বাতাস বাইরে নিঃসরণ করে একধরনের পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ তৈরি করে হিট আইল্যান্ডের মূল সমস্যাকে কমানোর বদলে বাড়িয়েই তুলছে। এইধরনের হিট ফ্লাক্স সন্ধের পর বেড়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, ১ মিলিয়ন বা তার বেশি জনসংখ্যাযুক্ত শহরের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী শহরতলির থেকে দিনের বেলা গড়ে ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এই পরিমাণটিই সন্ধেবেলা বেড়ে হয়ে যায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর পাশাপাশি এসে পড়ছে জনসংখ্যা, বিশেষ করে শহরগুলিতে বসবাসকারী জনসংখ্যার দিকটিও। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০৩০ সালের মধ্যে শহরে বসবাসকারীর সংখ্যা ২০১৮-এর হিসেবের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যাবে, এবং ২০১৬-র হিসেবে ১০ মিলিয়ন জনসংখ্যাযুক্ত শহর বা মেগাসিটির সংখ্যা ৩১ থেকে ২০৩০ সালে বেড়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৩।

তাপপ্রবাহের এইসব ঘটনার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে এসে পড়ছে স্বাস্থ্যের উপর। যাকে এককথায় শ্রেণিবিভাগ করলে নিম্নলিখিতভাবে আলোচনা দেখা যেতে পারে:

কার্ডিও-ভাস্কুলার এবং তারপরই পালমোনারি এফেক্টের পর হিট স্ট্রেনের প্রকোপ মানসিক অবসাদ, কর্মদক্ষতা হ্রাস এবং নবজাতকের বৃদ্ধি ও অসুস্থতাতেও এসে পড়ছে। সাধারণত তাপপ্রবাহ বাড়লে মানবশরীর একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামে। কিউটেনিয়াস ভেসোডাইলেশনের মাধ্যমে শরীরের পেশী থেকে ত্বকের দিকে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে তাপকে ত্বকের মাধ্যমে বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যার অন্যতম মাধ্যম ঘাম নিঃসরণ। এই ভেসোডাইলেশনের সময়ে সবচেয়ে বেশি চাপ হৃদযন্ত্রের উপর পড়ে। স্থানীয় করোনারি টিস্যুর চাহিদায় হৃৎপিণ্ডকে আরও বেশিবার পাম্প করতে হচ্ছে, যা একটা সময় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে এমন রোগীর ক্ষেত্রে এই অবস্থাটি একধরনের মিসম্যাচ সৃষ্টি করছে অক্সিজেন চাহিদা এবং অক্সিজেন মাত্রার মধ্যে, যা কার্ডিয়াক ইশ্চিমিয়া, কার্ডিয়াক ইনফার্কশন এবং শেষমেশ হার্ট ফেলিওর বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যু ডেকে আনছে। অতিরিক্ত ঘাম ডেকে আনছে ডিহাইড্রেশনের ঘটনা, যা শেষমেশ সেই রক্তের পরিমাণ কমিয়ে কার্ডিও-ভাস্কুলার স্ট্রেন তৈরি করছে। ক্রনিক ডিহাইড্রেশন থেকে কিডনি ফাইব্রোসিস পর্যন্ত হতে পারে, এবং খুব স্বাভাবিক এইধরনের রোগীর হৃদরোগের সমস্যা থাকলে, সেই সমস্যা আরও ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পুরনো সমস্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে নতুন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে শরীরের থার্মোরেগুলেটরি ক্ষমতা, যার ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের চাপে একটা সময়ে পেরে উঠতে না পেড়ে ঘটাচ্ছে হিট স্ট্রোকের ঘটনা।

কার্ডিও-ভাস্কুলার সমস্যার পর তাপপ্রবাহের দ্বিতীয় সর্বাধিক কারণ শ্বাসযন্ত্র এবং ফুসফুসজনিত সমস্যা। তাপপ্রবাহ থেকে ফুসফুসে ক্ষতি, পালমোনারি ইডিমা, অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি ডিস্ট্রেস সিন্ড্রোম অথবা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি-র সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাপপ্রবাহজনিত কারণে বেড়ে যাওয়া বায়ুদূষণের সমস্যাও। বলা বাহুল্য, এইসব সমস্যা আক্ষরিক অর্থেই ইরিভার্সিবল, অর্থাৎ শরীর একটা সময়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় চলে এলেও ক্ষতি যা হওয়ার তাকে আটকানোর আর কোনও উপায় থাকে না।

এইসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকে কিছু অনুঘটকের প্রভাবও। ইদানীংকালে মানসিক স্ট্রেসজনিত সমস্যা থেকে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় তা সাময়িকভাবে উপকারে এলেও হিট স্ট্রেনের মতো ঘটনায় এইসব ওষুধ, ড্রাগ তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে হু হু করে। তার সঙ্গে ধূমপান বা মাদকদ্রব্যে আসক্তি স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য রোগের মতো এক্ষেত্রেও সমস্যা বাড়ানোর জন্য বহুলাংশেই দায়ী। এবং এই মানসিক সুস্থতার প্রসঙ্গেই যখন আসা হল, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানবমননের ওপর হিট এক্সট্রিমের অনস্বীকার্য প্রভাবও উল্লেখ করা জরুরি। তাপপ্রবাহজনিত শারীরিক অসুস্থতার জন্যই মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে একা থাকার প্রবণতা, যা অতিরিক্ত গরমের ভয়ে ঘরের বাইরে না বেরনোর প্রতি এক ধরনের আসক্তি থেকেই যে জন্ম নিচ্ছে, তা বলে বোঝানোর অপেক্ষা রাখে না। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানসিক অবসাদজনিত রোগীর ক্ষেত্রে হিট এক্সট্রিম থেকে মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি, এর পেছনে শরীরের তাপনিয়ন্ত্রক অংশগুলির ক্ষমতাহ্রাসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টগুলির নেগেটিভ এফেক্ট। স্বাভাবিকভাবেই রক্ষক আর রক্ষক থাকছে না…

বিশ্ব-উষ্ণায়ন সংক্রান্ত বেশ কিছু সমীক্ষায় ধরা পড়েছে গ্রহের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রামক রোগগুলির প্রাদুর্ভাবের সরাসরি সম্পর্ক, যার পেছনে বেশি তাপমাত্রায় রোগের ভেক্টর বা বাহকগুলির বাড়বাড়ন্তর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মানুষের আচরণগত দিকটিও। হিট-স্ট্রেস থেকে মশারি ব্যবহারে অনীহা থেকে ডেকে আনছে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঘামের ফলে যত্রতত্র জল খাওয়ার ফলে ডেকে আনছে জল-বাহিত রোগ, যা মূলত বাড়ির বাইরে অধিকাংশ সময় কাটানো মানুষজনের ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে এব্যাপারে সন্দেহ নেই।

খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রাসঙ্গিক বয়সের শ্রেণিবিভাগটিও। ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষজনের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়ার পাশাপাশি এসে পড়ে শিশু বা নবজাতকদের ক্ষেত্রে খুব মারাত্মক কিছু সমস্যার প্রসঙ্গও, কারণ একথা ভুললে চলবে না শরীরে থার্মোরেগুলেটরি সিস্টেম বা তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরাসারি বয়সের সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত। এরিয়া-টু-মাস রেশিও বড়দের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হওয়ায় একটা সময়ে বহিত্বকের চেয়ে বাইরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে গেলে (এক্ষেত্রে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াল ছাড়িয়ে গেলে) শিশুদের শরীর অনেক বেশি পরিমাণে শুষ্ক তাপ গ্রহণ করে। এই উচ্চ-তাপমাত্রা বেশি হারে ইভাপোরেটিভ কুলিং দিয়ে পূরণ হয়ে গেলেও ডিহাইড্রেশনের ক্ষেত্রে সেই পূরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় না। শিশুদের অসুখ বা রোগের ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা যতটা সচেতন থাকেন, তুলনায় জল খাওয়ার ব্যপারে অনীহা থাকায়, দেখা যায় কোনওরকম লক্ষণ ছাড়াই শিশুদের শরীরে এই ডিহাইড্রেশন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, যা একটা সময়ে শিশুমৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনছে।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত দিকগুলিও ভীষণভাবেই প্রাসঙ্গিক। আউটসাইড ওয়ার্কারদের ক্ষেত্রে হিট স্ট্রেনে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় যুক্ত হচ্ছে খুব বেশি মেটাবলিক হিট উৎপাদন, চারপাশে বায়ু চলাচলে সমস্যা আছে এমন জায়গাগুলিতে কাজ করার ঘটনা, কাজের চাপ, অতিরিক্ত কায়িক শ্রম, আর্দ্রতা ইত্যাদি। মেটাবলিক হিটের পরিমাণ স্বাভাবিক অবস্থা অর্থাৎ ১০০ ওয়াট থেকে অতিরিক্ত কায়িক শ্রমের ক্ষেত্রে বেড়ে হয়ে যেতে পারে ২৫০ থেকে ৫০০ ওয়াট। কৃষক, শ্রমিক বিশেষ করে কন্সট্রাকশন ওয়ার্কারদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলি অনেকটাই বেশি সন্দেহ নেই। পেশাগত চাপ, মালিক পক্ষ থেকে জোরজবরদস্তি, কাজ চলে যাওয়ার ভয় থেকে তাঁরা এই বীভৎস শ্রম থেকে সাময়িক নিবৃত্তিতেও অনীহা দেখাচ্ছেন, যা আসলে ভয়াবহ শারীরিক সমস্যায় পর্যবসিত হচ্ছে। এর সঙ্গে এসে পড়ে ক্রীড়ায় যুক্ত থাকা মানুষজনের স্বাস্থ্যের দিকগুলিও। ক্রান্তীয় দেশগুলিতে খেলতে খেলতে মাঠেই অসুস্থ বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনাগুলিও ঘটছে সেই হিট স্ট্রোক বা পরোক্ষভাবে হিট স্ট্রেন থেকে বেড়ে যাওয়া কার্ডিও-ভাস্কুলার সমস্যার জন্যই।

সামগ্রিকভাবে এই সমস্যার এককথায় মোকাবিলা অসম্ভব। কিয়োটো বা প্যারিস চুক্তির মতো ঠান্ডা ঘরের আলাপ আলোচনায় যার কোনও মীমাংসা কোনওদিনই সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত থেকে সমষ্টিগত উন্নয়নের পাশাপাশি বৃক্ষচ্ছেদনের ভয়াবহ অভ্যাস সমূলে উৎপাটন করার দিকটিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে বদল, মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের উন্নয়ন, কাজের সময় বেঁধে দেওয়া— এসে পড়ে এইসব পরোক্ষ দিকগুলিও। যদিও এসব তাত্ত্বিক কথা। নগরায়ন বা ইঁদুর দৌড় যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আশার দিকটি খুবই সামান্য সন্দেহ নেই। অনেকটা সেই অন্ধকার টানেলের ভেতর দেখতে পাওয়া দূরের আলোর মতো, যা বাইরের সূর্যের আলোর চেয়ে দূর থেকে আসা ট্রেনের আলো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সরু টানেলে দাঁড়ানো, কিংবা পালিয়ে বেড়ানো আমরা কাউন্টডাউন ছাড়া আর খুব বেশি করতে পারি কি?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...