উপন্যাসের নাট্যায়ন: ‘গড়িয়া কৃষ্টি’র দুটি প্রযোজনা— ‘মাধুকরী’ ও ‘কালপুরুষ’

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

নাটক দেখতে শুরু করেছি মাধ্যমিক পাশের কিছুকাল পর থেকেই, অ্যাকাডেমি মঞ্চে ‘ম্যাকবেথ’-এর মাধ্যমে যার সূত্রপাত। শেক্সপিয়র, ইবসেন, সোফোক্লেস পেরিয়ে যখন হ্যারল্ড পিন্টার, এভাল্ড ফিশার, ফ্রেডরিখ ডুরেনম্যাটদের কথা আওড়াতে শুরু করলাম— আমার বাবা কোনও সূত্রে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আজকাল কি মূল বাংলা নাটকের বড্ড অভাব দেখা দিয়েছে? পুরনো উৎকৃষ্ট সমস্ত সংস্কৃত নাটককেও তো আর সেভাবে মঞ্চে অভিনীত হতে দেখি না!” কথাটা পুরোপুরি ঠিক ছিল না। আমিও খুঁজেপেতে দেখিনি সেভাবে। বাংলা রঙ্গমঞ্চে এখনও দাপটের সঙ্গেই জাঁ-পল সার্ত্র অথবা জর্জ অরওয়েলের পাশাপাশি কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়দের সগর্ব উপস্থিতি। তারও পাশাপাশি লোকনাট্য থেকে শুরু করে অর্গ্যানিক থিয়েটার, বাংলা নাটকের ইতিহাস ও পরিসর এখন অনেকটাই বিস্তৃত হতে পেরেছে। এই নাট্যসংস্কৃতির কল্যাণেই, অ্যাকাডেমির কাছে তৃপ্তি মিত্র সভাঘরে রুপোলী পর্দাতে সাবটাইটেল ফেলে পোলিশ নাটকেরও অভিনয় হতে দেখেছি। অভিনয় দেখেছি সারারাতব্যাপী মহাকাব্যিক এক নাটক ‘ঊরুভঙ্গম’-এর। বিশেষ করে পছন্দের নাটকের নামগুলি যদি বা আওড়াতে শুরু করি, সে হয়তো বা ডায়রেক্টরির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছবে। কিন্তু আজ বিশেষ একটি দলের বিশেষ দুটি নাটকের প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হল। ব্যক্তিগত পরিচিতির সূত্রে সেই দলটির পুরোধা যিনি, তাঁর সঙ্গে আলাপ। মহামারি-উত্তীর্ণ সময়কে কাটিয়ে প্রথম যেদিন প্রোসেনিয়ামের দুনিয়াতে ফিরেছিলাম, সেই প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল তাঁরই সৃষ্টির মাধ্যমে। এক বছর, সাত মাস, এগারো দিনের এক অসম্ভব বিরতি কাটিয়ে— ১২ মার্চ ২০২০র পর (সেদিন অ্যাকাডেমি মঞ্চে অভিনীত হয়েছিল ‘সংসৃতি’র প্রযোজনায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটক ‘শের আফগান’), ২৩ অক্টোবর, ২০২১— অ্যাকাডেমিতে ফিরেছিলাম ‘কালপুরুষ’-এর সঙ্গে। সমরেশ মজুমদারের সৃষ্টি অবলম্বনে ‘গড়িয়া কৃষ্টি’র নিবেদন, নাটক ও নির্দেশনায় সিতাংশু খাটুয়া। অভিনয়ে… সেই নামগুলো নাহয় পরে বলছি। গতানুগতিক ভঙ্গিতে আলোচনা বা সমালোচনাতে আমার পারদর্শিতা অল্প। আমি বরং প্রথমে সৃষ্টির বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলি।

‘কালপুরুষ’ পড়তে পড়তে, এমনকি দেখতে দেখতেও ব্যক্তিগতভাবে যা কিছু উপলব্ধি করেছিলাম— আমাদের এই সমাজ, আসলে এক হিমবাহের মতো। সেই হিমবাহের বিশালতা, স্থবিরতা এবং একই সঙ্গে সুপ্ত যে জঙ্গমতা, তাতেই তার প্রকাশ। অনিমেষ, মাধবীলতা অথবা অর্ক, অথবা কিনা আমার আপনার মতোই একেকজন মানুষ— আমরা প্রত্যেকে আসলে সেই বিশালতর হিমবাহেরই একেকটি অংশমাত্র, নুড়ি, পাথর অথবা তুষারের খণ্ডের মতো। যাদের অন্তরের যে দর্শন, অন্তরের যে বিশ্বাস— তা হয়তো বা এক, হয়তো বা ভিন্ন, হয়তো বা একমুখী অথবা ভিন্নমুখী, বহুসূত্রে প্রবাহিত— কিন্তু, কোথাও গিয়ে দাঁড়িয়ে তারা যখন একসূত্রে, একই অভিমুখে, অন্তত গড়পড়তাভাবে হলেও একই দিকে একটু একটু করে এগোতে চেষ্টা করে, ঠিক তখনই যেন হিমবাহরূপী সেই বিশাল সমাজও একটু একটু করে হলেও সামনের দিকে এগোয়। এই অগ্রসরের পথে বিশ্বাসটাই জরুরি। এই হিমবাহের গতিবেগ অল্প। তবু আমাদের মিলিত একেকটি প্রচেষ্টাতেই সেই সমাজের শরীরে জঙ্গমতা আসে। যৌথখামারের স্বপ্ন কারও একার নয়। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন কারও একার নয়। ভালোভাবে বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্খা কারও একার নয়। এমনকি, কোনও বিশেষ তত্ত্বেরও অধীন নয়। যৌথ মানে সংশ্লেষ। যৌথ মানে সবাইকে নিয়ে অস্তিত্বযাপন। সেই অস্তিত্বযাপনেরই গল্প বলে ‘কালপুরুষ’। হ্যাভ আর হ্যাভ নটদের বৈষম্যকে ঘুচিয়ে, নতুন এক শ্রেণিহীন সমাজেরই স্বপ্নকে গড়ে তোলবার কথা বলে ‘কালপুরুষ’। ‘কালবেলা’ ট্রিলজির এই শেষতম সৃষ্টিকে বইয়ের পাতা থেকে মঞ্চে তুলে এনে উপস্থাপিত করাটা বড় সহজ কর্ম নয়। কিন্তু সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে।

প্রায় আড়াই ঘন্টার দীর্ঘ এক প্রযোজনা। তবু এই সৃষ্টি নাট্যমোদী মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। অনুসন্ধান করে দেখেছি, ‘গড়িয়া কৃষ্টি’র ইতিপূর্বের দুটি প্রযোজনাও যে কেবলই সাহিত্য-নির্ভর তা নয়, বিশেষ করেই সেগুলি উপন্যাস-নির্ভর। ইতিপূর্বে তারা কলকাতার দর্শকমণ্ডলীকে উপহার দিয়েছে ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ ও ‘মাধুকরী’। প্রথম নাটকটি সম্প্রতি দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হয়েছে। দ্বিতীয় নাটকটিকে সরাসরি মঞ্চে রূপায়িত হতে দেখারও সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রথম দেখেছি ‘কালপুরুষ’, তার পরবর্তীতে আমার ‘মাধুকরী’-যাপন।

‘কালপুরুষ’-এর মঞ্চের কথায় যদি ফিরে আসি, সহজ মঞ্চের দুটি স্তরকে খুব সরাসরিই সেখানে দেখা গেছে। সামনে থেকে দেখলে মঞ্চের ডানপাশে আনুভূমিকভাবে গড়ে উঠেছে দরমার ঘরের তিন নম্বর ঈশ্বরপুকুর লেন, আর বামপাশে একটা উঁচু মঞ্চের মতো রয়েছে। দৃশ্যবিশেষে কখনও বা সেটি পার্টি অফিস, কখনও বা ঊর্মিমালার বাড়ি, কখনও বা হাসপাতাল, কখনও বা থানার অভ্যন্তর; আর এই উঁচু মঞ্চটির ঠিক নীচের অংশটিই নাটকের শেষাংশে গিয়ে পালটে যাবে থানার গারদে। দুরকম সমাজের এই চিরন্তন বৈপরীত্যকে সূক্ষ্ম একটা উচ্চতার তফাত দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। মাঝে কিছু সময়ের জন্য আবার সেই ঈশ্বরপুকুর লেনই হয়ে যাবে জলপাইগুড়িতে অনিমেষের ভিটে। দৃশ্যচয়ন ও পরিকল্পনার ভিতরে এক সুন্দর যাতায়াত। অভিনয়ের দিক থেকে দেখলে প্রত্যেক চরিত্রের অভিনয়ই নজর কেড়েছে। পরিমিতি ও শৃঙ্খলাবোধ তাদের বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়েই পরিলক্ষিত। অনিমেষের চরিত্রে সিতাংশু খাটুয়া, অর্কের চরিত্রে ঋক এবং ঊর্মির চরিত্রে গান্ধর্বীর কথা তো বলতেই হয়, পাশাপাশি মাধবীর চরিত্রে রোকেয়া, বিলুর চরিত্রে অভিজ্ঞান— এমন প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিনেতারা নজর কেড়েছেন। নাটকের প্রথমার্ধের একটি দৃশ্যে মূল চার চরিত্র মঞ্চের সামনেটায় এসে দাঁড়ায়, গমগমে আবহের সঙ্গে তাদের চারপাশে ঘটে যেতে থাকে এক উত্তাল রাজনৈতিক সময়ের উদযাপন। সময়, পুলিশের লাঠি, স্লোগান, আন্দোলন, লাল পতাকার স্পর্ধাজ্ঞাপন, সময়— সবকিছুই। সবকিছু থেমে গেলে মায়াবী আলোতে তখনও মঞ্চে ওরা চারজনেই দাঁড়িয়ে থাকে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। সমাজের প্রতিটা যুদ্ধে এভাবেই, একেকটি করে চরিত্রে ওরা হারিয়ে যেতে যেতেও ভেসে থাকতে চেষ্টা করে। দাগ কেটে যেতে চেষ্টা করে। নাটকটি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল এতটাই যে, দেখতে দেখতে মৃণাল সেনের ছবি ‘কোরাস’-এর একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ছিল। যেখানে এক শ্রমিক আরেক শ্রমিককে হতাশাক্লিষ্ট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল, একই ইস্যুতে তিনখানা পলিটিক্যাল পার্টি তিনবার করে ধর্মঘট করেছে, এভাবে কোনও লড়াইতে কি জেতা সম্ভব? আসলে, ঐক্যের চেয়ে বড় কোনও অস্ত্র হয় না, সততার চেয়ে বড় কোনও শক্তি হয় না। কৃষক আন্দোলনের এই বিজয়মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রঙ্গমঞ্চে ‘কালপুরুষ’-এরও এই উদযাপনকে তাই স্বতঃস্ফূর্ত বলা উচিত। অভিবাদন জানানো উচিত। স্রষ্টা বা শিল্পীর কাজই হল চলমান সময়ের অনুবাদ। যে কাজ একসময়ে কোনও সাহিত্যিক শুরু করেছিলেন, আজ কোনও নাট্যকারের হাত ধরে সেই বৃত্তটিই যেন আরও সম্পূর্ণতা পেল। নাটকের শেষে কলাকুশলীদেরই হাতে হাতে মঞ্চে জ্বলে উঠল ‘কালপুরুষ’!

উপন্যাসের নাট্যায়ন। সেই প্রসঙ্গেই বলতে চেয়েছিলাম। ‘কালপুরুষ’ উপন্যাসের যে বিস্তৃতি, তাকে মাত্র আড়াই ঘন্টার সময়কালের মধ্যে মঞ্চে সুনিপুণভাবে তুলে আনা— সেই ভাবনাটিই সবচেয়ে বিস্ময়ের। উপন্যাসটি পড়ার পাশাপাশি, দৃশ্যায়ন ও সমগ্র পরিকল্পনা নিয়ে এক স্পষ্টতর উপলব্ধি থাকলেই যা সম্ভব। এই কাজে নাট্যকার পুরোপুরি সফল। কিন্তু আমরা যারা ক্রিটিক, আমাদের তো আবার পুনরায় যাচাই করে না দেখলে পরে কিছুতেই মন ওঠে না। তাছাড়া এক নাটকের আলোচনায় সবটুকু শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছিল না। আকারে প্রকারে অমন বড় বড় একেকটা উপন্যাসকে কিভাবে অনায়াসে নাট্যকার মঞ্চে তুলে আনছেন সেই বিষয়টাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে সেদিন পৌঁছে গিয়েছিলাম মিনার্ভায়। ‘গড়িয়া কৃষ্টি’র প্রযোজনায় সেই মঞ্চে সেদিন নিবেদিত হয়েছিল বুদ্ধদেব গুহর সুবৃহৎ উপন্যাস ‘মাধুকরী’র নাট্যরূপ। শহরের বিপরীতে এক জঙ্গুলে উপলব্ধির গল্প। বড় বাঘের মতোই বাঁচতে চাওয়া চিরস্বাধীন, বুক চিতিয়ে চলাফেরা করা পৃথু ঘোষের উপাখ্যান। কিন্তু সেই পৃথুকেও কিনা বাঁধা পড়তে হল ভালোবাসায়? নাকি হল না? একদিকে বুদ্ধদেব গুহের সেই চিরন্তন অরণ্যপ্রেম, অন্যদিকে জটিল মনস্তত্ত্বের এক টানাপোড়েন— এই দুয়ের মাঝে পড়ে তারও যে নাট্যরূপ সম্ভব, সেটি কেমন করে সম্ভব— তা জানতেই হাজির হয়েছিলাম।

নাটক হিসেবে ‘কালপুরুষ’-এর চেয়ে একদমই আলাদা গোত্রের নাটক ‘মাধুকরী’। এখানে সমষ্টিগত সংগ্রাম নেই, আছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। চূড়ান্ত স্বাধীনচেতা এক মানুষের সুখী-অসুখী সংসার যাপনের গল্প। কিন্তু সেই সংসার শহুরে নয়, স্ট্যাটাস-সচেতন নয়। কেরিয়র-সফল পৃথু ঘোষ সমস্ত পার্থিব মোহকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের আজন্ম বোহেমিয়ান সত্তাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে। তাই সংসারের প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে কিসের যেন তাড়নাতে ছুটে ছুটে বেড়িয়েছে কুর্চির কাছে। বিজলির কাছে। সে যতই বড় বাঘের মতো করে স্বাধীন, একাকী, গম্ভীর জীবনের স্বপ্ন দেখে থাকুক না কেন, ভিতরে ভিতরে সেও যে কেবল ভালবাসারই কাঙাল। সেই ভালবাসায় এক নিখাদ শুদ্ধতা আছে। কামনা আছে, অথচ কামের বিকৃত রূপটি নেই। সকলে এর উপলব্ধি করতে পারে না। তাই তো নাটকের সংলাপে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বিরক্ত পৃথু বলে ওঠে, “আমি কেবল তোমার কাছে ভিক্ষেই চাইতে পারি— একে মাধুকরী বলে না।” মাধুকরীর দান বড় পবিত্র। বড় উদার। মানুষ হিসেবে পৃথু ঘোষ ঠিক ততটাই উদার হতে পেরেছিল। সব মিলিয়ে দু ঘন্টা কুড়ি মিনিট, আমরা অভিভূত হয়ে বিচরণ করেছিলাম পৃথু ঘোষ, ঠুঠা বাইগ্গা, কুর্চি, বিজলি, তুসুদের এক অদ্ভুত পৃথিবীতে। মঞ্চের পিছনে বিশাল করে আঁকা একটি জঙ্গলের দৃশ্য, রাতমোহনার পার— যে বিশাল জঙ্গলের পটভূমিতেই পৃথু ঘোষের মাধুকরী যাপন। আজকের এই বস্তুসর্বস্ব পৃথিবীতে জানি না কেউ পৃথু ঘোষের মতো হতে চাইবে কিনা, কিন্তু পৃথু ঘোষ নিজেই যে সেই আত্মবিশ্বাসের কথা সদর্পে ঘোষণা করেছে। সে বলেছে, “পৃথু ঘোষকে মনে রাখবে আগামী শতকের মানুষেরা!” এই ভবিষ্যদ্বাণীও কি একদিন সত্যিই সাকার ও সজীব হয়ে উঠবে? হয়তো উঠবে। আজকের পৃথিবীতে মানুষ নিজেকে খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে। প্রাপ্তির ভাঁড়ারটা যখন প্রত্যাশার চাইতেও বেশি হয়ে উঠে ঘিরে ঘিরে ধরে একেকটা অস্তিত্বকে, মানুষ তখন গাছ, ফুল, লতা, পাতা, নদী, ভালোবাসাকে উপলব্ধি করে। গড়িয়া কৃষ্টির ‘মাধুকরী’তে বিশেষ করে যদি একজনের কথাও বলতে হয়— সে পৃথু, যার চরিত্রে রূপদান করেছেন নির্দেশক সিতাংশু খাটুয়া স্বয়ং। দীর্ঘ নাটক জুড়ে তাঁর প্রায় ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ একটি উপস্থিতি, আর তারই সঙ্গে সমস্ত শরীর থেকে ফুটে পড়া পরিশ্রম। যোগ্য সঙ্গতে রোকেয়া, গান্ধর্বী, ঋক ও অন্যান্যরা। দীর্ঘ এই নাটকের সমগ্র কোরিওগ্রাফিক দৃশ্যগুলিকে একে একে গড়ে তুলেছিলেন প্রসেনজিৎ বর্ধন। কোভিড মহামারি তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তবু নির্দেশকের কথায়, ‘কৃষ্টি’র প্রতিটি কথায়, প্রতিটি কাজে প্রসেনজিৎ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। ‘মাধুকরী’র শেষ দৃশ্যে কলাকুশলীরা যেভাবে মঞ্চে এক এক করে উপস্থিত হলেন, সেই বিশেষ কোরিওগ্রাফিক ভাবনাটিকে কুর্নিশ করতে হয়। যাঁরা নাটকটি দেখেছেন বা দেখবেন, তাঁরাই জানবেন কেমন সেই পরিকল্পনা। নাটকের শেষে দাঁড়িয়ে আমরা সকলেই বোধহয় ভিতরে ভিতরে পৃথু ঘোষ হতে চাইছিলাম। সকলেই বোধহয় সেই বড় বুনো বাঘের মতোই একাকী কিন্তু রাজকীয় জীবন কাটাতে চাইছিলাম।

বিশেষ করে এই দুটি নাটক দেখার বিষয়ে, তাদের উপলব্ধির বিষয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। তার কারণ, আমি ভিতরে ভিতরে খুব সত্যি করে মনে করি, একজন স্রষ্টা বা শিল্পীর কাজই হলো চলমান সময়ের অনুবাদ। শিল্পীর চিরকালীন হওয়াটা জরুরি, কিন্তু তারও আগে বোধহয় সমকালীন হওয়াটাও একইরকমে জরুরি। কারণ শিল্পীর যে কেবল মহাকালের পথে নিজের অস্তিত্বরক্ষার দায় থাকে না, বরং সার্থক শিল্পী সমাজের জন্য কাজ করেন। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ‘কালপুরুষ’কে মঞ্চে আনাটা দরকার ছিল। একেকজন মানুষের আদর্শ, সেই আদর্শ যদি সৎ হয়, তবে সেই আদর্শের জন্য সংগ্রাম, এই কথাগুলোকে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করাটা প্রয়োজন ছিল। আজকের পৃথিবীতে, বা চিরকালেই, যদি কোনও মানুষ আদর্শের জন্য মৃত্যুকে অবধি অস্বীকার করে, তবে সেই আদর্শের সত্যটাকে মেনে নিতেই হয়। সেই বিশ্বাসটাকে মেনে নিতেই হয়। সেই অদ্ভুত এক ইউটোপিয়ান সত্যের জন্য চিরন্তন সংগ্রামের নাম ‘কালপুরুষ’। নাট্যকার এবং কলাকুশলীরা যে যত্ন নিয়ে তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তাকে সাধুবাদ না জানালে পরে অন্যায় হত। পক্ষান্তরে অন্যদিকে দাঁড়িয়ে, পৃথু ঘোষ আর ‘মাধুকরী’। এই চূড়ান্ত এক বস্তুসর্বস্ব পৃথিবীতে কোথাও যেন এক দারুণ বোহেমিয়ান শিল্পীর নিজের মতো করে বাঁচার গল্প। নিজের স্বাধীনতায় উজ্জীবিত হয়ে দাপিয়ে বেড়ানোর উপাখ্যান। একেকটি উপন্যাসের বিশালত্বকে, ক্রমানুগ দক্ষতায় এভাবে মঞ্চে উপস্থাপিত করতে পারাটা কেবল কৃতিত্বের নয়, পরিশ্রমের। সেই তুমুল পরিশ্রমকেই এই লেখাটি উৎসর্গ করলাম। বাংলা নাটক এভাবেই এগিয়ে চলুক, প্রতিটি পথে, প্রতিটি নতুন বিস্তৃতিতে… আর যুগের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ভালোবাসে বলেই গড়িয়া কৃষ্টির তরফে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমগুলিতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের আগামী নিবেদন, আবারও সাহিত্যনির্ভর, আবারও সমরেশ মজুমদার, আগামী বছরেই তাঁদের প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হতে চলেছে, ‘গর্ভধারিণী’। আমরা তারই অপেক্ষা করে থাকব, অনেক অনেক প্রত্যাশায়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...