একদিন। বৃষ্টিতে। বিকেলে।

রোদ্দুর মিত্র

 

‘আপনি যে নম্বরটি ডায়াল করেছেন, সেটি বর্তমানে ব্যস্ত আছে। অনুগ্রহ করে কিছু বছর পরে আবার চেষ্টা করুন…’

অতএব— আর ভয় নেই, টান নেই, পেছন ফিরে নির্দোষ চাহনির অর্থও নেই আর কোনও। এখন যে প্রলাপের মতো হেঁটে চলা, এই যে রাত মানেই নির্ঘুম আর নির্জীব— শাশ্বত বলতে এটুকুই। ঘরের প্রকাণ্ড আয়না গতকালের তুলনায় খড়কুটোহীন। বোধকরি সেইজন্যেই দেহের ভার গেছে কমে। রবিঠাকুরের গানের মুখোমুখি দাঁড়ালে যেমনটা হয়। তুলোর বীজের মতো ভাসতে ভাসতে ভাসতে ইচ্ছেমতো হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্খায় ভেতরের অন্য আমি দরজা ঠেলে চুপিসারে বাইরে বেরিয়ে আসে। যার বহিরঙ্গে কারা যেন খুব যত্নে, বিশুপাগলের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে দুঃখ। যেহেতু দুঃখ অ্যাবসলিউট, মিছিমিছি এক পশলা বৃষ্টি নামলে ক্ষতি নেই! কিন্তু ভিজে গেলে যে গল্পটা থেমে যাবে! অতএব, ‘ট্যাক্সি, ট্যাক্সি…’, উঠে পড়া যাক।

দিগন্তরেখার ওপার থেকে ঝেঁপে বৃষ্টি… আবছা হতে হতে পচাপুকুরের নিস্পন্দ সবুজে তলিয়ে যাচ্ছে কলকাতা। এখানে অটোর চিলচিৎকার নেই, আকাশখেকো হাইরাইজ নেই, ট্র্যাফিকের সব সিগন্যাল এখানে লাল। পচাপুকুরের গভীর থেকে জলের পাতলা সেলোফেনের উল্টোপিঠের পৃথিবীটাকে টুকরো টুকরো শ্যাওলাধরা পাঁচিলের মতো দেখায়, সমস্ত রাস্তাঘাট যেন আশ্চর্য একেকটা শুঁয়োপোকা— আণুবীক্ষণিক পায়ের তলায় জগতের পুঁজরক্ত, পায়ের তলায় হাজার হাজার বছরের দুঃখ। এক পলকের এই জীবনে, পাঁচিলে পাঁচিলে শুঁয়োপোকা তার স্বভাবজাত নিশ্চলতা ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে! সারি সারি পাঁচিল মুছে গিয়ে পড়ে থাকবে এক অনন্ত সুসময় এবং অনন্ত ভূখণ্ড— সব ধরনের ভায়োলেন্স ধুয়েমুছে ভ্যানিশ! এটাই হয়তো অগুনতি শুঁয়োপোকার দাবী, তাই বিদ্রোহ। শুঁয়োপোকার এবং পথের বিদ্রোহ। পাশে পাশে চলেছে একটা হলুদ ট্যাক্সি। উইন্ডস্ক্রিনে ছিটকে আসছে বৃষ্টির কথা আর নিষ্ঠুর ওয়াইপারব্লেড নিজের ছন্দে অবিচলিত থেকে মুছে দিচ্ছে সেসব। ওসব পড়তে নেই, মনে পড়তে নেই… সেটি বর্তমানে ব্যস্ত আছে।

একটা শুঁয়োপোকা, যে আসলে কলকাতা শহরেরই একটা রাস্তা, ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করল, সে প্রজাপতি হয়ে গেছে। হলুদ ট্যাক্সির জানলা গলে ভেতরে ঢুকে, তার ধূসর ডানা জাপটে ধরে আমাদের অন্তরের সেই আমিটাকে নিয়ে উড়ে গেল যেখানে সন্ধে নামে। ট্যাক্সির রূপ বদলে হল টানারিক্সা।

‘সে খুব ভবঘুরে, সাজায় বহুদূরে, আলেয়া জুড়ে জুড়ে, আলোর স্তূপ…’

শেষ বিকেলের নিভন্ত রোদ্দুরের সঙ্গে অশ্বত্থপাতার ছায়ারা যখন খুনসুটি করে, বাতাস লেগে যখন দুলে দুলে উঠল, প্রজাপতি সেই ছায়ার কাটাকুটিতে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করল নিজেকে। তার মতোই ধূসর ডানা, যেমন খুশি নাচতে পারে, এই ছায়াও তো তারই দোসর— তার অন্দরের কেউ!

তখনও আলো নিভে আসেনি। আলোআঁধারির এই সন্ধিক্ষণে আকাশ থেকে টুপটুপ করে মায়া খসে পড়ে। ভোর হয়ে এল যেন! দু-একটা পায়রা এমনভাবে ডানা ঝাপটায় যে, বোঝা দায় সেই পালকে ফিরতি পথের আকুতি আছে, নাকি নবউড়ানের প্রস্তুতি! দারুণ নিঃসঙ্গ ছাদের আলসে ধরে এই সময়েই কবিতার ঘোর আসে। গোটা বিকেল জুড়ে লাল ফিতের বিনুনি বেঁধে তিন্নি ছাদময় কিতকিত খেলছিল। ঘেমেনেয়ে মেয়েটা এখন গা ধুয়ে, পাউডার মেখে অঙ্ক করতে বসবে। তিন্নিকে চমকে দিয়ে বেগানা বেহালার সুর অন্ধকারের সঙ্গে গাঢ় হতে হতে পাড়াটাকে মাকড়সার জালের মতো জড়িয়ে নেবে, যার কেন্দ্রে একা তিন্নি। তিন্নির অঙ্কখাতার পেছনে আঁকিবুঁকি।

মাকড়সার সুরেলা জালের মাঝে আটকা পড়েছে সেই টানারিক্সা। ভেতরে অন্য আমি। কেন্দ্রে তিন্নি। কেন্দ্র থেকে আসছে অনিবার্য সব টান। অলৌকিক কোনও শক্তি তাকে ক্রমাগত টেনেটেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই বিন্দুতে। সেখানে যাওয়া নিষেধ, তবুও কী দুর্লঙ্ঘ্য আকর্ষণ! কী মারাত্মক বেহালার ছর, নেশায় নেশায় আরেক আত্মীয় এসে জুটে যায় পাড়ার রোয়াকে— এস্রাজ। টানারিক্সা করে এলোপাথাড়ি ঘুরে ঘুরে যতই ছিটকে বেরোতে চায়, কেন্দ্র থেকে পড়ে টান। এই তাহলে জীবন। নিজের অন্তরীক্ষ থেকে উঠে আসছে কবিতা, কবিতা, আর কবিতা…

তবে ভুলে গেলে চলবে না মাকড়সার জাল ছিঁড়ে বেরোনোর কথা। প্রয়োজনে আবার বৃষ্টি আসুক, ট্যাক্সি থামিয়ে উঠে পড়া যাবে, ট্যাক্সি না পেলে ট্রাম। কিন্তু আপাতত জালের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘুরে মরি অন্য আমি। তাকে গড়ে তুলি দুঃখে দুঃখে। দুঃখ যেহেতু অ্যাবসলিউট! বছর, দশক, শতক… যতই ব্যস্ত হোক, ফোনের পর ফোন করে যাওয়াতেই নিজের অস্তিত্বের সুখ। আবার অসুখও বটে।


ঋণ: সম্বিত বসু

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...