“একটা বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ অসম্ভব নয়”— কথোপকথনে নোম চমস্কি

স্ট্যান কক্স

 


স্ট্যান কক্স দি ল্যান্ড ইনস্টিটিউটের বরিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক এবং দি পাথ টু আ লিভেবল ফিউচার: আ নিউ পলিটিক্স টু ফাইট ক্লাইমেট চেঞ্জ, রেসিজম, অ্যান্ড দি নেক্সট প্যানডেমিক এবং দ্য গ্রিন নিউ ডিল অ্যান্ড বিয়ন্ড: এন্ডিং দ্য ক্লাইমেট ইমারজেন্সি হোয়াইল উই স্টিল ক্যান গ্রন্থদুটির প্রণেতা। শেষোক্ত গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন নোম চমস্কি। বর্তমান সাক্ষাৎকারটি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন কপ-২৬-এর প্রাকমুহূর্তে নেওয়া হয়েছিল এবং প্রথম TomDispatch.com-এ গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। বাংলা অনুবাদ করেছেন অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়কে এড়ানোর লক্ষ্যে যে লড়াই চলছে, এই মাসটি নিঃসন্দেহে সেই লড়াইয়ের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী সপ্তাহেই স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন (কপ ২৬) শুরু হতে চলেছে, এবং সেখানে আলোচকেরা চূড়ান্ত উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চলেছেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে বিশ্ব-অর্থনীতি যেমনভাবে চালানো হচ্ছে, সেভাবেই চালানো হবে, নাকি গুরুত্ব দেওয়া হবে পরিবেশ পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক প্যানেল আইপিসিসি যে রিপোর্ট দিয়েছে তার ওপর? সেই রিপোর্টে স্পষ্টতই বলা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ চলতে থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষেই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাপকাঠিকে ছাড়িয়ে যাবে।[1] অথচ এখনও অবধি ধনী দেশগুলির তরফে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা মোটেই বিশ্বব্যাপী এই উষ্ণতা বৃদ্ধিকে রুখতে কার্যকরী নয়। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন-প্রশাসনের জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনাও কোনও নিরাপদ ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে নেই।[2] আসন্ন মার্কিন কংগ্রেসের অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক তাঁদের পরিকল্পনাটিকে পাশ করিয়ে নিতে না পারলে, আবার যখন সেই সুযোগ আসবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

অবিচার, অসাম্য এবং মানুষের কীর্তিকলাপের কারণে জলবায়ুর যে বিপর্যয় ঘটতে চলেছে, বিশ্বমানবতা ও সভ্যতার ওপরে তার প্রভাব যে কী ভয়ানক হতে পারে, সে বিষয়ে বিগত বেশ কিছু দশক ধরে নোম চমস্কি বিশ্বের অন্যতম এক সোচ্চার ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা যে সমস্ত ভয়াবহ সম্ভাবনা অথবা ভবিষ্যদ্বাণী শোনাচ্ছেন, তার মূল কারণ উপলব্ধি করতে, এবং এতকিছুর পরেও এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া এবং পরবর্তীতে মানবতার জন্য এক বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ আদৌ সম্ভব কি না সেই বিষয়ে অধ্যাপক চমস্কির মতামত জানতে আমি আগ্রহী ছিলাম। তিনি সানন্দে ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে আমার সঙ্গে কথা বলতে সম্মত হয়েছিলেন। নীচের সাক্ষাৎকারটি ১ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে হওয়া সেই আলোচনাটিরই একটি পরিমার্জিত রূপ।

অধ্যাপক চমস্কি, বর্তমানে যাঁর বয়স ৯২, বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক গ্রন্থের প্রণেতা, সেগুলিও আবার বিবিধ ভাষায় অনূদিত। ক্ষমতার সমালোচনা ও অধিকাংশ সময়েই সাধারণ ব্যক্তিমানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে পেশ করা তাঁর বক্তব্যগুলি একাধিক প্রজন্মের সমাজচিন্তক ও সমাজ-আন্দোলনকারীর সামগ্রিক ভাবনা ও কার্যকলাপকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক এমেরিটাস পদে রয়েছেন। তাঁর সাম্প্রতিক দুটি বই হল, কনসিকোয়েন্সেস অব ক্যাপিটালিজম: ম্যানুফ্যাকচারিং ডিসকন্টেন্ট অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স (মার্ভ ওয়াটারস্টোনের সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত), এবং ক্লাইমেট ক্রাইসিস অ্যান্ড দ্য গ্লোবাল গ্রিন নিউ ডিল: দ্য পলিটিক্যাল ইকনমি অব সেভিং দ্য প্ল্যানেট (রবার্ট পলিন ও সি জে পলিক্রোনিউয়ের সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত)।

স্ট্যান কক্স: ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর, ২০২১— সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কর্তৃক আয়োজিত আসন্ন ২৬তম আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলনের মঞ্চে যে সমস্ত দেশগুলি আসতে চলেছে, তাদের অধিকাংশই নিঃসরণের বিষয়ে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বৃহদংশে সেগুলি সামগ্রিকভাবে অপর্যাপ্ত। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়কে রুখতে গেলে কোন পথে যাওয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?

নোম চমস্কি: প্যারিস চুক্তির সময় যাঁরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁরা আইনগতভাবে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী ছিলেন, যা কিনা খেলাপ করা যেত না। কেবলমাত্র মৌখিক বা লিখিত ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ প্রতিশ্রুতিতে তাঁরা ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। কিন্তু সেই সময়, এই বিষয়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রতিবন্ধকতার নাম রিপাবলিকান পার্টি। একথা সবসময়ই পরিষ্কার ছিল যে, রিপাবলিকান পার্টি কোনওদিনই আইনগত চুক্তির বিষয়ে সম্মত হত না। একথা সত্যি, আজকের রিপাবলিকান পার্টি একটি রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও তার সমস্ত রকম ভণিতাকেই খোলাখুলি বিসর্জন দিয়ে তাঁরা কেবলই কর্পোরেট সেক্টর এবং চূড়ান্ত-ধনীদের স্বার্থের বিষয়েই চিন্তা করে থাকেন। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জনসংখ্যার বিষয়ে তাঁদের কোনও হেলদোলই নেই। তাঁরা কোনও রকমের চুক্তিই মানতেন না, আর সেই কারণেই প্যারিস চুক্তির উদ্যোক্তারা শেষমেশ মৌখিক বা লিখিত ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ প্রতিশ্রুতিতেই সমস্ত ব্যাপারটিকে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হন, যার মধ্যেই এই সমস্যাগুলি নিহিত ছিল— যেগুলি নিয়ে আপনার প্রশ্ন।

আমরা ছয় বছর পিছিয়ে গিয়েছি। এর মধ্যে চার বছর গিয়েছে ট্রাম্পের শাসনকালে। যে সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার খোলাখুলিভাবে বাড়ানো হয়েছে, এবং তার পাশাপাশি সমস্ত ধরনের পরিবেশ-সংক্রান্ত নীতিপ্রয়োগ ও প্রণয়নকারী সংস্থার ক্ষমতাকে নির্মমভাবে খর্ব করা হয়েছে— যারা কিনা অন্তত কিছুটা পরিমাণে হলেও এই ক্ষতির ব্যাপ্তিকে কমাতে পারত। কিছুটা পরিমাণে হলেও এই নীতিগুলি প্রয়োগের কারণে জনসাধারণের একটি বিশেষ অংশ পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেত, বিশেষ করে দরিদ্র এবং কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ। মনে রাখতে হবে যে, এরাই পরিবেশ দূষণের কারণে সবচাইতে বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাম্প যে সমস্ত দেশকে ‘বর্জ্যের উৎসস্থল’ বা ‘শিটহোল কান্ট্রিজ’ বলে উল্লেখ করে থাকেন, সেই সব দেশের গরীবস্য গরীব জনতাই পরিবেশগত এই বিপর্যয়ের কারণে সবচাইতে বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ যে বিপর্যয়ের পিছনে তাদের আক্ষরিক অবদান সবার চেয়ে কম।

এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। যেমনটা আপনিও আপনার নতুন বই দ্য পাথ টু এ লিভেবল ফিউচার-এ লিখেছেন— অবশ্যই বাসযোগ্য এক ভবিষ্যৎ সম্ভব। দায়িত্বশীল, স্থিতপ্রজ্ঞ, বর্ণ-নিরপেক্ষ এক পরিবেশ নীতিও প্রণয়ন করা সম্ভব। এর জন্য দাবি করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বিশ্বজুড়ে তরুণ-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে এই দাবিই জানাচ্ছে।

অন্যান্য দেশগুলিরও এই বিষয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আছে, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আমি মনে করি, এই বিষয়ে সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত রেখেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসারও আগে, এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তির পথে বাধার সৃষ্টি করেছে। সেই চুক্তিকে আইনগতভাবে রূপায়িত হতে দেয়নি। যদিও, পরে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আমেরিকা পুরোপুরিই প্যারিসের সেই ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ প্রতিশ্রুতিগুলি থেকেও সরকারিভাবে বেরিয়ে এসেছিল।

আমরা যদি এই বিষয়ে (রিপাবলিকানদের চেয়ে) তুলনামূলকভাবে ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ ডেমোক্র্যাটদের দিকেও তাকাই, দেখব তাঁরাও এই বিষয়ে একেবারেই নির্দোষ নন। মধ্যমপন্থী ডেমোক্র্যাট সেনেটর জো মানচিনের কথাই যদি ধরি, তিনি সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলির থেকে প্রচার-অর্থ নিয়ে থাকেন। কাজেই তাঁর অবস্থানও তাই জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলিরই মতামতের সঙ্গে মিলে যায়। যেমনটা তিনি বলে থাকেন— বিলুপ্তিকরণ নয়, উদ্ভাবন! অ্যাক্সন মোবিল সংস্থারও তাই মত, “চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের দায়িত্ব নেব,” তাঁরা বলে থাকেন, “আমরা বিবেকবান প্রতিষ্ঠান। আমরা ভবিষ্যতের এমন কিছু কিছু প্রযুক্তির পিছনে বিনিয়োগ করছি যা কিনা পরিবেশে আমরা ঠিক যে পরিমাণে দূষণ যোগ করছি, তাকে আবার শুষে ফেরত নিয়ে নেবে। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে, কেবল আমাদের উপরে বিশ্বাস রাখুন।” বিলুপ্তিকরণ নয়, শুধুমাত্র উদ্ভাবন— যা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে— আর যদি বা তা হয়ও, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে, অনেক সীমিতও হয়ে পড়বে।

এবারে আসা যাক আইপিসিসি যে রিপোর্ট দিয়েছে তার কথায়। নিঃসন্দেহে এই সংস্থার তরফে প্রকাশিত, বিগত সবকটি রিপোর্টের থেকে এই রিপোর্টে আরও মারাত্মক সমস্ত আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে; এবং সরাসরি বলা হয়েছে যে এখন থেকে প্রতি বছরে আমাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ধাপে ধাপে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে কমিয়ে আনতে হবে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এই ব্যবহারকে শূন্যে নামিয়ে আনতেই হবে। অথচ, এই রিপোর্ট প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘ওপেক’ গোষ্ঠীভুক্ত তৈল-উৎপাদক সংস্থাগুলির কাছে আবেদন জানালেন খনিজ তেল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য— যাতে কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি গ্যাসের দাম কমে, এবং স্বভাবতই নাগরিকদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ে। পেট্রোলিয়াম-ব্যবসা সংক্রান্ত জার্নালগুলিতে অচিরেই হইচই পড়ে গেল। প্রচুর মুনাফার এক সম্ভাবনা উন্মোচিত হল, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে “কীসের বিনিময়ে?” আসলে, বেশ কয়েক লক্ষ বছর ধরে আমরা মানুষেরা এই পৃথিবীর বুকে রাজত্ব চালালাম, এই কি যথেষ্ট নয়? আমরা যদি পৃথিবীর বুকে একেকটি সজীব প্রজাতির গড় আয়ুকে ধরি, তাহলে দেখা যাবে সেগুলি মোটামুটি সমস্ত ধরনের জীবের ক্ষেত্রেই কমবেশি এক লক্ষ বছর। মানুষই বা কেন সেই রেকর্ডকে ভাঙতে যাবে? ‘সকলের জন্য সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা’ খামোখা না ভেবে, ধনী সংস্থাগুলোকে আরও ধনী করে তুলে পৃথিবীকে জঞ্জালের ঝুড়িতে পাঠানোটাই কি সহজতর উপায় নয়?

কক্স: বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে যে আশু বিপর্যয় ঘটতে চলেছে, এই প্রসঙ্গে আপনি একবার বলেছিলেন, “যেখানে সমস্ত আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটাই মুনাফা তৈরিতে ও সেই মুনাফাকে ক্রমাগত আরও বাড়িয়ে তুলতে একান্তভাবে বদ্ধপরিকর, অন্য কোনও দিকেই তার নজর নেই— সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা শক্ত।” কিন্তু এক্ষেত্রে একমাত্র রাষ্ট্রব্যবস্থাই পারে নিরপেক্ষভাবে, সমানাধিকার এবং সুবিচারের বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে, দরকারি পরিবর্তনগুলিকে প্রণয়ন করতে। এই মুহূর্তে আমরা যে জরুরি পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে দাঁড়িয়ে আপনার কি মনে হয় যে মার্কিন প্রশাসন পারবে জাতীয় সম্পদ বা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধকে আরোপ করতে অথবা সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে সমানাধিকার এবং পর্যাপ্ত ব্যবহারকে নিশ্চিত করতে? এমন সমস্ত নীতি প্রণয়ন করা মানে কিন্তু স্থানীয় জনসাধারণ অথবা ব্যক্তিবিশেষের পার্থিব জীবনে সুখসুবিধা, অথবা যথেচ্ছ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের যে স্বাধীনতা তাতে হস্তক্ষেপ করা।

চমস্কি: আসলে আমাদের বাস্তব পরিস্থিতিটাকে বুঝতে হবে। আমি চাইব আরও মুক্ত, আরও উদার এবং ন্যায়পরায়ণ একটি সমাজের দিকে এগোতে— যেখানে সম্পদের উৎপাদন করা হবে কেবলই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে, মুনাফার কথা ভেবে নয়। শ্রমজীবী মানুষেরা নিজেরাই তাঁদের জীবনের গতিপ্রকৃতিকে নির্ধারণ করবেন, আজীবন কোনও প্রভুর দাসত্ব করে চলবেন না। কিন্তু এমন একটি স্বপ্নকে সফল করতে হলে প্রচুর সময় প্রয়োজন, আর ততদিনে আমরা কিন্তু আমাদের এই আশু পরিবেশগত কঠিন সমস্যাটির সমাধানের বিষয়ে অনেকটাই পিছিয়ে যাব। অর্থাৎ, এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ব্যবহার করেই যা করার করতে হবে।

এখন, গত চার দশকে যেভাবে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ চলেছে, তা এক শব্দে বলতে গেলে ‘ধ্বংসাত্মক’। জনসাধারণের এক বিরাট অংশের উপরে এই কার্যকলাপের আঘাত নেমে এসেছে, বৈষম্য বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং গণতন্ত্র ও পরিবেশ— দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এতদসত্ত্বেও, একটা বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ সম্ভব। আমাদের এমন একটা সমাজে থাকার কোনও প্রয়োজন নেই যেখানে কোটিপতিদের করছাড়ের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য নীতি নির্ধারিত হয়, এবং কোটিপতিরা একজন শ্রমজীবী মানুষের থেকে লঘু হারে কর প্রদান করে থাকেন। আমরা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এমন একটি ব্যবস্থায় থাকতে চাই না যেখানে, আয়ের নিরিখে সবচেয়ে নীচে থাকা ৯০ শতাংশ জনতার থেকে ৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের কর আদায় করা হয়, ওপরতলার মাত্র ১ শতাংশ মানুষের উন্নতির জন্য। র‍্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্টে এই কথা লেখা হয়েছে, যদিও আমি মনে করি সেখানেও সংখ্যাগুলিকে অনেক কমিয়ে-সমিয়ে দেখানো হয়েছে। তবু, এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়েও এই ব্যবস্থাকে পালটানো সম্ভব, পালটানো উচিত, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সময়।

প্রশ্ন হচ্ছে— আমরা কি ‘তুলনামূলকভাবে কম আগ্রাসী রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান’গুলির একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে এই পরিবেশগত বিপর্যয়কে ঠেকাতে পারব? আমার যুক্তি বলছে যে আমরা পারব, এবং তার জন্য অত্যন্ত সাবধানী ও জটিল কিছু কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যেগুলির মধ্যে কয়েকটির বিষয়ে আপনি আপনার নতুন বইতে উল্লেখ করেছেন, আমার বন্ধু ও সহলেখক অর্থনীতিবিদ রবার্ট পলিনের তরফেও বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আরেক পণ্ডিত অর্থনীতিবিদ, জেফরি স্যাচস, তিনি একটু অন্য ধরনের কয়েকটি অর্থনৈতিক মডেলকে ব্যবহার করেও, মোটামুটি আমাদেরই কাছাকাছি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মনে রাখতে হবে যে এই প্রস্তাবগুলির অধিকাংশই আন্তর্জাতিক শক্তি সংগঠন, বা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও সমতা রেখে চলে। এই সংগঠনটি কিন্তু মোটেই কোনও জঙ্গি আন্দোলনকারী সংগঠন নয়, বরং বিভিন্ন শক্তি-উৎপাদক সংস্থাগুলির তরফেই এই সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল। বক্তব্য এই যে, সকলেই মোটামুটিভাবে কাছাকাছি— একই দৃষ্টিভঙ্গিতে— একই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে।

এমনকি এই বিষয়ে, এই প্রস্তাবগুলির সঙ্গে মোটামুটি সম্মতি রেখে আলেকজান্দ্রিয়া ওক্যাসিও-কর্তেজ এবং এড মার্কির তরফে একটি ‘কংগ্রেসনাল রেজল্যুশন’ও আনা হয়েছে, এবং আমার মনে হয় সেটিকে যথাযথভাবেই বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব। এই রূপায়ণের জন্য মোট জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ মাত্র ব্যয় হবে— কিন্তু এর ফলে শুধু যে সমাধানগুলিই রূপায়িত হবে তাই নয়, বাসযোগ্য একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। এমন একটি ভবিষ্যৎ যেখানে দূষণ থাকবে না, ট্র্যাফিক জ্যাম থাকবে না, কেবল থাকবে আরও গঠনমূলক, উৎপাদনমূলক কাজের সুযোগ, উন্নততর কর্মসংস্থান। এই সমস্ত কিছুই সম্ভব।

কিন্তু এর সামনে বেশ কিছু গুরুতর প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। যেমন জীবাশ্ম-জ্বালানি উৎপাদক সংস্থাগুলি, ব্যাঙ্কগুলি, অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা কিনা কেবলমাত্র মুনাফার বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনও কিছুই বোঝে না, বা আর কোনও কিছুর জন্যই কাজ করে না। আসলে নতুন উদারনৈতিক সমাজব্যবস্থার মূল স্লোগানটিই তো তাই ছিল, অর্থনীতির গুরু মিল্টন ফ্রিডম্যান যেমনটা বলেছিলেন, প্রতিষ্ঠানগুলির তরফে জনসাধারণ অথবা কর্মীবর্গের প্রতি কোনওরকম দায়িত্ব থাকারই প্রয়োজন নেই, তাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত মুষ্টিমেয় কিছুজনের জন্য মুনাফাকে যতটা সম্ভব বাড়িয়ে তোলা।

নেহাত জনসাধারণের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে বলে, অ্যাক্সন মোবিলের মতো একেকটি সংস্থা নিজেদেরকে বিবেকবান ও পরোপকারী হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করে— যেন বা দিবারাত্র তারা জনসাধারণের ভালোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। একে আমি বলি ‘গ্রিনওয়াশিং’!

কক্স: বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং নিষ্কাশনের বিষয়ে ইদানীং সবচেয়ে বেশি করে যে সমাধানগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়, সেগুলির অধিকাংশই বিপুল পরিমাণে বায়োমাস অথবা জৈববস্তুকে ব্যবহার করে— যেগুলি আবার লক্ষ-কোটি একর পরিমাণ জমিতে উৎপাদিত হয়, অর্থাৎ যাকে পেতে গেলে বিরাট একেকটি সুস্থিত বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে এবং বিশেষভাবে নিম্ন-আয়ের, নিম্ন-নিঃসরণের কোঠায় থাকা গরীব দেশগুলির খাদ্য নিরাপত্তাকে অবধি যার ফলে প্রভাবিত হতে হবে। এখন এই প্রসঙ্গে, গবেষক অথবা নীতিবাদীদের একাংশ আবার লেখালিখি শুরু করেছেন যে, পরিবেশগত সুবিচারের বিষয়ে যে মূল বক্তব্যগুলি ভাবা হচ্ছে তাতে, “দরিদ্র জনসাধারণ এবং দরিদ্র দেশগুলির কথা” বিশেষভাবে মাথায় রাখতে হবে এবং “কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে তাঁদের রক্ষা করাই নয়, পরিবেশ পরিবর্তনকে ঠেকাতে গিয়ে তাঁদের জীবন বা জীবিকা যাতে কোনও ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়” সেই বিষয়টাকেও মাথায় রাখতে হবে। সেই ক্ষেত্রে, এই ধরনের নীতি প্রণয়নের ফলে “এখন কার্বন উৎপাদিত হোক, পরে না হয় তাকে শোষণ করা যাবে”-জাতীয় প্রকল্পগুলিও সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে, এবং তারই পাশাপাশি কার্যত ‘পরিবেশ-রক্ষা’র নামে একটি নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হওয়ারও সম্ভাবনা থাকবে। আপনার কি মনে হয় ক্রমান্বয়ে এই বিশ্বউষ্ণায়ন যতই বাড়তে থাকবে ততই পৃথিবীতে ঘুরপথে এই ধরনের শোষণও বাড়তে থাকবে? আর জৈবশক্তি ও কার্বন শোষণের যে পদ্ধতিগুলি নিয়ে আজকাল আলোচনা করা হয়, সেগুলির বিষয়েই বা আপনার কী অভিমত?

চমস্কি: এটি সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক কিন্তু অত্যন্ত প্রচলিত একটি প্রক্রিয়া। কেউ কি জিজ্ঞেস করেছেন, আজকে পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক যে সমস্ত বর্জ্যগুলি সমাজে উৎপাদিত হয়, সেগুলি আদতে যায় কোথায়? সেগুলি কিন্তু আমাদের সুসজ্জিত বাংলোগুলির পিছনের বাগানে ফেলা হয় না। সেগুলি গিয়ে ফেলে আসা হয় সোমালিয়ার মতো দেশেই, যারা নিজেদের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনওভাবেই রক্ষা করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলি দীর্ঘদিন যাবৎ তাদের পরমাণুকেন্দ্রগুলি থেকে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সোমালিয়ার উপকূলবর্তী এলাকায় ফেলে আসছে। এর ফলে সেই এলাকাগুলিতে স্থানীয় মৎস্যব্যবসা থেকে শুরু করে স্থানীয় শিল্প অবধি সবকিছুই বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ তো এক বীভৎস ব্যাপার!

আইপিসিসির শেষতম রিপোর্টে সরাসরি জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহারকে সর্বোতভাবে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অভিমত পেশ করা হয়েছে। আমরা যদি সত্যিসত্যিই এটা করতে না পারি, তাহলে আমরা একটা অপরিবর্তনশীল অবস্থার দিকে চলে যাব। যেখান থেকে আমাদের ফেরার আর কোনও সুযোগই থাকবে না, এবং আর্থিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষেরাই, যাঁদের কিনা এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের পিছনে কোনও হাতই নেই, তাঁরাই সবচেয়ে আগে, সবচেয়ে বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাংলাদেশের সমতলভূমিতে যে মানুষেরা বসবাস করেন, তাঁদের কথাই ধরুন। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলিতে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ভারতবর্ষে যে মানুষেরা বসবাস করেন, গ্রীষ্মে সেই দেশের কোনও কোনও অংশে তাপমাত্রা ১২০ডিগ্রি ফারেনহাইটকেও ছাপিয়ে যায়। এভাবে পৃথিবীর বিশাল একেকটি অংশকে একেবারে বাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে দেখলেও আমাদের আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

ইজরায়েলি ভূবিজ্ঞানীদের একটি দল সম্প্রতি তাদের একটি গবেষণার নিরিখে সরাসরি সেদেশের সরকারকে সমালোচনা করে বলেছে যে, কেন সেই প্রশাসন তাদের বর্তমান নীতিগুলির বিষয়ে পরিবেশগত দায়ভারকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে— যে নীতিগুলির মাধ্যমে সেদেশের সরকার ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আরও নতুন সমস্ত গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্র তৈরির ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে। সেই বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অচিরেই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন উষ্ণতা একটি উষ্ণ জাকুজির তাপমাত্রাকেও ছুঁয়ে ফেলবে এবং নীচু এলাকাগুলি সম্পূর্ণরূপে জলমগ্ন হয়ে পড়বে। জেরুজালেম বা রামাল্লায় হয়তো মানুষ থাকবে, কিন্তু মূল জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশকে এই বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। আমরা কি এই ভবিষ্যৎকে পালটানোর চেষ্টা করব না?

কক্স: এই সমস্ত অবিচারের পিছনে নব্য-শাস্ত্রীয় অর্থনীতির যে প্রভাবটি কাজ করে, তা কিন্তু আজও পরিবেশ বিষয়ক অর্থনীতির যে মডেলগুলি রয়েছে, সেগুলির মধ্যে ‘সম্মিলিত যাচাই পদ্ধতি’ বা ‘ইন্টিগ্রেটেড অ্যাসেসমেন্ট মডেল’ হিসেবে থেকে যাচ্ছে, এবং এর মাধ্যমে সেই মডেলগুলিতে ‘ব্যয় ও ব্যয়ের বিনিময়ে প্রাপ্ত উপকারিতা’ বা সহজ কথায় ‘কস্ট বেনিফিট’ অ্যানালিসিসের একটা ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে— এমনকি সেই সমস্ত পদ্ধতির মাধ্যমে কার্বনের সামাজিক মূল্য অবধি নির্ধারণের একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। এই সমস্ত ব্যাখ্যাকে তুলে এনে আজকের অর্থনীতিকেরা কি আদতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য একটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেই জুয়া খেলার মতো করে উড়িয়ে দিতে চাইছেন? আপনার কী অভিমত?

চমস্কি: দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা অথবা আমাদের আমেরিকারও যে সমস্ত প্রান্তিক সম্প্রদায়— তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলার কোনও অধিকারই আমাদের নেই। এই ধরনের সমস্ত বিশ্লেষণগুলিকে আপনি যদি কোনও শিক্ষামূলক সেমিনারে আলোচনা করতে চান, নিশ্চয়ই করতে পারেন। কিন্তু দয়া করে সেগুলিকে নীতি হিসেবে প্রণয়ন করতে চাইবেন না। দয়া করে সেই ঔদ্ধত্য দেখাবেন না।

এই প্রসঙ্গে পদার্থবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। পদার্থবিদেরা কখনওই এমন কোনও পরীক্ষাকে তাঁদের গবেষণাগারে করে দেখতে উৎসাহ বোধ করেন না যা কিনা পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাঁরা কখনওই স্রেফ ‘কী হতে পারে’ এটা জানার জন্য এমন কোনও পরীক্ষাকে হাতেকলমে করে দেখতে চেষ্টা করেন না। কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা সেটা করে থাকেন। এই সমস্ত নব্য-শাস্ত্রীয় অর্থনীতির ধারণাগুলির ওপরই ভিত্তি করে আশির দশকে পৃথিবীর সমস্ত অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে দারুণ একটা বিপ্লব আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। যার শুরুটা করেছিলেন কার্টার, এবং তারপর একে একে রেগান ও থ্যাচার সেই পথে হেঁটেছিলেন। বাকি পৃথিবীর তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষমতা, সেই কারণে এই নিওলিবেরাল অর্থনীতির আক্রমণে সারা পৃথিবীতে যে ফল দাঁড়িয়েছিল তা ভয়ানক। এটা বোঝার জন্য কোনও জিনিয়াসের প্রয়োজন পড়ে না। খোলাখুলিভাবে তাঁদের বক্তব্যই ছিল যে, “প্রশাসনই হচ্ছে সমস্যা”।

তার মানে কিন্তু এই নয় যে সরকার বা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিতে অস্বীকার করবে, সরকার কেবল সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়গুলিকে অন্য কারও হাতে বদলি করে দেবে। সিদ্ধান্ত সেই নিতেই হবে। যদি সেই সিদ্ধান্তগুলি সরকারকে নিতে না হয় (সরকার, কিছুটা হলেও জনগণের ইচ্ছাতে চলে), তাহলে সেই সিদ্ধান্তগুলি নেবে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন একেকটি সংস্থা, বা তেমন কোনও একেকটি ক্ষমতার উৎস— যাদের জনসাধারণের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতাই নেই। এই সূত্রে ফ্রিডম্যানের উপদেশ মানলে সমাজের প্রতি সেই সমস্ত ক্ষমতাশালীদের আর কোনও দায়িত্বই থাকছে না, অথচ সেই সমাজই আসলে তাদের ক্ষমতার আসনে বসিয়েছে। তারা এবারে, নিশ্চিন্তে কেবল নিজেদের মুনাফা বাড়ানোতে মনোনিবেশ করতে পারে।

এর পরবর্তীতে এলেন মার্গারেট থ্যাচার। যিনি সটান বলে বসলেন যে, আদতে সমাজ বলে কোনওকিছুরই নাকি কোনও অস্তিত্ব নেই, যা আছে তা কেবল একক অণু-পরমাণুর মতোই একেকজন ব্যক্তির উপস্থিতি— যাঁরা কোনওভাবে এই বাজার-অর্থনীতিতে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছেন। অবশ্যই একথা বলার পর, তিনি এর সঙ্গে আর একটি পাদটীকা জুড়তে ভুলে গিয়েছিলেন। তাঁর বলা উচিত ছিল, ধনী এবং ক্ষমতাশালীদের জন্য অবশ্যই সমাজের অস্তিত্ব রয়েছে। চেম্বার অব কমার্স রয়েছে, গোলটেবিল সম্মেলন রয়েছে, এএলইসি এবং আরও সমস্ত কিছু রয়েছে। তাঁরা সময়ে সময়ে একত্রিত হন, আলোচনা করেন, পরস্পরের ওকালতি করেন। এঁদের জন্য সমাজের প্রবল অস্তিত্ব রয়েছে, কেবল বাকিদের জন্য— আমাদের জন্যই তার কোনও অস্তিত্ব নেই। আমাদেরই কেবল বাজার অর্থনীতির ওঠানামার ফলে ভুগতে হয়। তাঁদের হয় না। তাঁদের বাঁচানোর জন্য সবসময়ই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ধনীদের সর্বক্ষণের রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রবল পরাক্রমশালী এই রাষ্ট্র সদাজাগ্রত থাকে, আর তারই সঙ্গে থাকে সেই রাষ্ট্রের পুলিশ ও অন্যান্য দমনমূলক শক্তিরা— যাতে করে ধনীদের নিরাপত্তা আরও সুনিশ্চিত হয়।

কক্স: এসব কিছুর মধ্যেও আপনি আশা কোথায় দেখছেন?

চমস্কি: আজকের তরুণ প্রজন্ম। আমি তাদের মধ্যেই আশার সম্ভাবনা দেখতে পাই। গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ধর্মঘটের আয়োজন করা হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা পথে নেমেছিলেন, এই জলবায়ু বিপর্যয় রুখতে, পরিবেশের এই বিনাশ আটকাতে। সম্প্রতি দাভোসে উচ্চকোটি, উচ্চবর্গদের সম্মেলনে উঠে দাঁড়িয়ে গ্রেটা থুনবার্গ বলেছে, “কী করে সাহস হয় আপনাদের!” সে বলেছে, “কী করে সাহস হয় আপনাদের— আমার সমস্ত স্বপ্ন, আমাদের শৈশব, আপনাদের ফাঁকা কথার ফুলঝুরি দিয়ে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার! আপনারা আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।” এই কথাগুলো প্রত্যেক মানুষের বিবেকে প্রজ্বলিত অক্ষরে খোদাই করে দেওয়া উচিত, বিশেষত আমাদের প্রজন্মের তরফে যাঁরা প্রতিনিধি, তাঁদের তো বটেই। আমরা যারা ওদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি এবং এখনও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের, প্রতিটি দেশের তরুণতর প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছি।

আমাদের সামনে এখন লড়াইয়ের সময়। এই লড়াই জেতা সম্ভব, কিন্তু যত দেরি হবে ততই সেই জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে আরও ক্ষীণতর হতে থাকবে। আমরা যদি দশবছর আগে এই জায়গাতে আসতে পারতাম, তাহলে অনেক সহজে এই লড়াই জেতা যেত। একমাত্র দেশ হিসেবে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিয়োটো চুক্তিতে সই করতে অস্বীকার না করত, এই লড়াই আরও সহজ হতে পারত। আমরা আরও যতদিন এভাবে অপেক্ষা করব, ততই আমরা আরও বেশি করে আমাদের পুত্রপৌত্রাদি তথা পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে যাব। হাতে এগুলিই বিকল্প আমাদের, ব্যক্তিগতভাবে আমার হাতে যদিও আর বেশি সময় নেই— কিন্তু আপনাদের হাতে তা রয়েছে। সুন্দর, বাসযোগ্য, পরিবেশ-বান্ধব এক ভবিষ্যৎ সম্ভব, এবং আমরা চাইলে তার জন্য অনেক কিছুই করতে পারি— আরও অনেকটা দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই।


[1] ipcc. Sixth Assessment Report.
[2] Major Climate Action at Stake in Fight over Twin Bills Pending in Congress. NYT. 10 Oct 2021.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...