হাসান আজিজুল হককে যেটুকু জেনেছি

তুষার পণ্ডিত

 


গদ্যকার, ইতিহাস গবেষক, প্রাবন্ধিক, দিবারাত্রির কাব্য পত্রিকার সংযুক্ত সম্পাদক, পেশায় শিক্ষক

 

 

 

হাসান আজিজুল হকের প্রয়াণলেখ লিখতে বসে, একটি দৃশ্যই কেবল ঘুরেফিরে আসছে দু চোখের চারপাশে। আমার দৃষ্টিপথকে আচ্ছন্ন করেছে ষোলো বছরের এক কিশোর— যে প্রবল পরাক্রমে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াটা ভেঙে ফেলতে চাইছে; অনিবার্য ব্যর্থতায় তার সারা শরীর বেয়ে নেমে আসছে রক্তধারা। অবিরাম। গত দু দশকের সংসর্গে, লিখনে যেটুকু জেনেছি তাঁকে— এই একটিমাত্র মূর্তিই জেগে রয়েছে আমার চৈতন্যে। এসব টের পেয়েছি তাঁর বাংরবার মাতৃভূমিতে ফেরার আকুলতায়। এ যে নিছক তাৎক্ষণিক আবেগতাড়না নয়, তাঁর অস্তিত্বের মূলে প্রোথিত। এটা সত্যি না হলে কাটোয়া শহরে বসে লেখা কবিতাপ্রতিম ভাষায় তাঁর হাহাকার এত কুলপ্লাবী হয়ে উঠত না—

ফিরেছি,
এখন নেবে কি আমাকে?
তুমি জানো, ‘ও’ চলে গেছে
সমস্ত বিকিয়ে দিয়ে পৃথিবীর পথে
শূন্য খোল শুধু পড়ে আছে
কেন নেবে তাকে?

এই দীর্ণ হাহাকার, এই নিবিড় ব্যাকুলতা, এই তীব্র আত্মগ্লানির শরীর জুড়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে সেই কাঁটাতারের বেড়া ভাঙতে চাওয়া ব্যর্থ কিশোরের বেদনার্ত মুখচ্ছবি।

‘শকুন’, ‘ভূষণের একদিন’ এসব গল্পে কথাকার হাসান আজিজুল হকের প্রতি যৌবনকালেই যে মুগ্ধতা জন্মেছিল সেখানে কোনও ব্যক্তিপরিচয়ের প্রক্ষেপ নেই। তিনি যে আমাদের এই কাটোয়া মহকুমারই ভূমিপুত্র, প্রথম জেনেছিলাম বন্ধু সম্পাদক আফিফ ফুয়াদের কাছে। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পত্রিকার তরফে তিনি সংবর্ধনা নিতে আসবেন কলকাতায়, একথা শোনামাত্রই লাফিয়ে উঠি। ঘরের ছেলেকে ছুঁয়ে দেখার উচ্ছ্বাস তখন সীমাহীন। হাসানকে ফোনে প্রস্তাবটা জানানো মাত্রই তিনি বললেন, “কাটোয়া থেকে ডাক এসেছে, আমি কি না গিয়ে পারি?” সেটা ১৯৯৮-র মে মাস। আমার বাড়িতে দু রাত কাটানোর স্মৃতি অমলিন থেকে যাবে আমৃত্যু। কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগারের দ্বিতলের উদ্বোধন ঘটল তাঁরই হাতে। আক্ষেপ করলেন, “পাসপোর্ট হাতে আমাকে ফিরতে হচ্ছে নিজের ভিটেয়। এটা যে আমার কাছে কতটা লজ্জার, কতটা অপমানের, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।” পরদিন তিনি পা রাখলেন মঙ্গলকোটের যবগ্রামের মাটিতে। ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া মানুষটি জীবনের মহামূল্যবান প্রথম ষোলোটি বছর যাপন করেছেন, বেড়ে উঠেছেন ‘য’গাঁয়েরই আলো বাতাসে। ভিটেসংলগ্ন পুরনো গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ থাকলেন। এক ষোলো বছরের বিষণ্ণ, রক্তাক্ত কিশোরের গভীর তলদেশ থেকে বেজে উঠল ধাতব যন্ত্রণার মত এক ধ্বনি—

ওইখানেই আমার শিকড় আছে গো!

এরপরেও হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আমাদের শারীরিক নৈকট্য ঘটেছে বার দুই। ১৯৯৮-এ বাংলাদেশ ফিরে তিনি লিখছেন আমাকে—

প্রিয় তুষার… কাটোয়ার অনুষ্ঠান আমার জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা। জীবনে সম্মান বড় কম পাইনি – কিন্তু কাটোয়ার মানুষের সম্মান আমার মাথার মণি হয়ে থাকবে চিরকাল।

২০০৪ সালের নভেম্বরে তাঁর দ্বিতীয়বার কাটোয়া আসা। তাঁকে সম্মাননা জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কাটোয়া রবীন্দ্র পরিষদ ও কাটোয়া মহকুমা গ্রন্থাগার। ইতোমধ্যে দুই বাংলাতেই তাঁর লোকপ্রিয়তা বেড়েছে অনেকখানি। অথচ আমাদের কাছে তিনি একইরকম সহজ-সরল, অন্তরঙ্গ। এবার তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি হই টেপরেকর্ডারসহ। বাল্যকালের নানা স্মৃতিসহ, সমাজ, দর্শন, সাহিত্য বিষয়ে তাঁর ‘অফবিট’ সব কথাবার্তা প্রকাশিত হয়েছিল আমার সম্পাদিত ‘বাউলবাতাস’ পত্রিকায়।

২৪ নভেম্বর দুপুরেই তিনি আমাকে শোনান সেই কবিতা, যার শেষটা এরকম—

ক্ষমা করো
এখন নগ্ন শিশু দাঁড়িয়েছে
গ্রহণ করো, গ্রাস করো।

কবিতাটা নিজের কণ্ঠে পড়ছেন যখন, তাঁর দু গাল বেয়ে নেমে আসছে অবিরল অশ্রুধারা। একবার মনে হল, হাতটা বাড়িয়ে দিই— খুব যত্নে করপুটে আহরণ করে রাখি সেই দেশহারানো যন্ত্রণায় চুঁইয়ে নামা স্ফটিকবিন্দু। সামান্য অশ্রুও কখন পরম অমূল্যরতন হয়ে ওঠে।


*ভেতরের ছবিগুলি লেখকের সংগ্রহ থেকে

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...