মিহির সেনগুপ্ত নতুন সাহিত্যের স্রষ্টা

শারমিনুর নাহার

 



ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-এর বাংলা ভাষা শিক্ষক

 

 

 

অভিজিৎ সেনের (সেনগুপ্ত) লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও মিহির সেনগুপ্তের লেখার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ওঠেনি ওঁকে চেনার আগে। কত লেখাই তো আমাদের নজরে পড়ে, চলতে ফিরতে চোখাচোখি হয়, কারও প্রচ্ছদ আকর্ষণ করে, কাউকে আবার কেবল ছুঁয়ে দেখি, কারও নাম পছন্দ হয়, আবার কারও এমন কিছু একটা থাকে যেটা হয়ত সাধারণ বিষয়কে ছাপিয়ে একটা অসাধারণতার দিকে তাড়িত করে। তেমন কোনওভাবেই আমার মিহির সেনগুপ্তের লেখার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। পরিচয় হল উনি যখন ঢাকায় এলেন, একটা সাহিত্য উৎসবের আমন্ত্রণে— ২০১৫ সালে। আয়োজকদের একজন ওঁর সাক্ষাৎকার নিতে বললেন। তখনই মূলত মিহির সেনগুপ্তকে পড়া শুরু। ব্যাপার যেটা ঘটল তাকে এক কথায় নেপোলিয়নের যুদ্ধজয়ের মতো বলা যায়— ”তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন’। তাঁকে পড়তে গিয়ে তিনিও আমার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেঁথে নিলেন। এমন করে লেখা যায়? এটাও লেখার ফর্ম? সত্যি বলতে আমি যেন নিজেকেই খুঁজে পেলাম। বলা বাহুল্য প্রথমেই পড়েছিলাম ওঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিষাদবৃক্ষ’। কেবল বয়ান কেবল স্মৃতিচারণ। মিহির সেনগুপ্ত নানা সময় নিজেই বলেছেন “আমার সাহিত্যিক হওয়ার কোনও ইচ্ছা ছিল না বা কখনও ভাবিনি লিখব। কিন্তু তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ পড়ে মনে হল এমন লেখা তো আমিও লিখতে পারি। সেই থেকে শুরু।”

‘তুষিত স্বর্গের সন্ধান’ বইয়ে যেমনটা বলেছেন— “আমি যেন ছিলাম এক নিঃসীম নীল আকাশের মতো। ক্রমশ সেখানে বাষ্পের পর বাষ্প জমতে একসময় তা মেঘে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু মেঘের চলনদার যে বায়ু তার সন্ধান ছিল না। মেঘ জমেছিল ঢেরই, কিন্তু বর্ষণ হল না প্রায় কিছুই। প্রতিটাকে যথেষ্ট যথেষ্ট লালন করা হয়নি ফলে অকালে সামান্য বৃষ্টিপাত হয়েই মেঘটা নষ্ট হয়ে গেল। আমার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং তা নিয়ে লেখালেখির ব্যাপার এরকমই। এখন অবেলায় ছেঁড়া-ফাটা স্মৃতি হাতড়ে সেই অতীতচারিতাই করি।”— কী সরল স্বীকারোক্তি, এত অবলীলায় কলকলিয়ে খলখলিয়ে বয়ে চলেন যেন দুর্গম পাহাড় থেকে নেমে আসা খরস্রোতা কোনও নদী সমতলে এসে নিজের চারপাশ অবলোকন করছে, জনপদকে সমৃদ্ধ করছে। সরসতার সঙ্গে কোমলতা এবং পাঠককে সঙ্গী করে চলা— এই হল মিহির সেনগুপ্তের লেখার বৈশিষ্ট্য। পাঠকের হাতের উপর হাত রেখে আরব্য রজনীর মাদুর বিছিয়ে মেঘের উপরে মেঘ পেরিয়ে, বন-আদার-বাদার-নদী-জলা-খলা-খন্দ পার হয়ে এক নতুন দেশে নিয়ে চলেন। যে দেশ সুজলা শ্যামলা শস্য শ্যামলা সে হাজার বছরের চিরচেনা সুবর্ণগ্রাম, ধানসিড়ি, সন্ধ্যা বা কীর্তনখোলা। সঙ্গে থাকা পাঠকের হাতটি সঘন অনুরণনে বলতে চাইবে মেঘেদের ওপারে পিসিদের গ্রাম— সেখানেই মিলন আমাদের, এই কখন এলেন… বসেন… একটু গুড়ের সন্দেশ— এই আর একটু মশাই… আর একটু নিন।

মিহির সেনগুপ্তের লেখা আমার কাছে ‘আমি যে বড় খুঁজেছি আমায়’, ‘তুমিও খোঁজ তোমায়’। এই আমাকে— নিজেকে খোঁজার— অনুসন্ধানে ব্রতী থেকেছেন তিনি জীবনভর। আরও একটু গভীরে প্রবেশ করলে— আমাকে খোঁজা মানে হল আমায় চেনা। নিজেকে জানা। বাংলার চিরায়ত লোকায়ত দর্শন— বৈষ্ণব দর্শনের জীবাত্মাকে অনুসন্ধান করা। নিজের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে তিনি তাই বলতে চেয়েছেন। বৈষ্ণব দর্শন বাউল দর্শনে এসে কেবল নিজেকে জানা, নিজেকে চেনা, নিজেকে সমৃদ্ধ করা, আত্ম-অনুসন্ধান— এই সাধনাই থিতু হয়। মিহির সেনগুপ্ত তেমনি নিজেকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে, নিজের মাটিকে আত্মস্থ করতে গিয়ে ইতিহাস খুঁড়েছেন, মানুষে মানুষে বন্ধনকে আত্মমুক্তির পথ ভেবেছেন। নিজেই নিজের সৃষ্টিকে বলতে চেয়েছেন নৃতত্ত্ব, কখনও মেমোরেন্ডাম, কখনও অতীতচারিতা। আমি যে বড় খুঁজেছি আমায়।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রথম গল্প নিরুদ্দেশ যাত্রা— সেখানে রঞ্জু মায়ের ঘরে কী একটা ফেলে এসেছে— এই খুঁজতে খুঁজতে অপ্রকৃতস্থ রঞ্জু ঝড়ের রাতে মায়ের ঘর ফেলে সারা শহর ঘুরতে থাকে। আমি কোথায় কী যেন হারিয়ে এসেছি— উদভ্রান্ত-উদ্বিগ্ন রঞ্জু এক সময় শিমুলগাছের নীচে শুয়ে পড়ে। মিহির সেনগুপ্তও ‘বিষাদবৃক্ষ’-এর মধ্যে নিজের হারানো শৈশব খুঁজেছেন… কৈশোর খুঁজেছেন… একে একে নানা চরিত্র, সম্পর্ক, আত্মীয়-অনাত্মীয়, কোথাও কোথাও পিছরারা খালের এত নিপুণ বর্ণনা পড়ে মনে হয় আমিও সেখানে ছিলাম। যদিও সেই ভৌগোলিক জনপদ নেই, নেই পিছরারা খাল— কেবল রয়ে গেছে মিহিরদার দেখা… বেড়ে ওঠা… স্মৃতি। কী তীব্রতা শব্দের, অনুভূতির— না পড়লে বোঝানো কঠিন। ‘বিষাদবৃক্ষ’ পড়তে গিয়েই সবাই নিজের ছেলেবেলাকে অনুসন্ধান করতে যাবেন এবং ফিরে যাবেন স্মৃতিতে। দেখবেন সব ধোঁয়া। বাস্তবতা সত্য না আপনার স্মৃতি সত্য এই নিয়ে দোলাচল উপস্থিত হবে। এখানেই মিহির সেনগুপ্তের সার্থকতা।

মিহির সেনগুপ্তর পুরাণ নিয়ে লেখা ‘চক্ষুষ্মতী গান্ধারী’ বাদ দিলে সব লেখাই অনেকটা জীবনীভিত্তিক। কোনও লেখায় তেমন গল্প নেই, মানে প্রথাগত গল্প যাকে বলা হয়। নেই কোনও একক চরিত্র। চরিত্র অনেকাংশে লেখক নিজে। মোটকথা কল্পনাপ্রবণতা বলতে যা বোঝায় তা নেই কোনও লেখায়। নিজেও সাক্ষাৎকারে এমনটা বলেছেন। ‘শরণার্থীর মুক্তিযুদ্ধ’, যে বইটা বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে যুদ্ধদিনের কথা জ্বলজ্বলে ছবির মতো উঠে এসেছে। “আমাকে কথাশিল্পী বলা যায় না, বড়জোর বলা যেতে পারে কালচারাল অ্যানথ্রোপলজি বলার চেষ্টা করেছি।” যখন যেখানকার স্মৃতি লিখেছেন সেখানকার সমাজ-ভূপ্রকৃতি-সংস্কৃতি-জনসংস্কৃতি-প্রত্নতত্ত্ব বলেছেন নিবিড়ভাবে। তাই মিহির সেনগুপ্তের লেখা কেবল সাহিত্য নয় এটা সমাজতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, সবই। লেখাগুলো প্রথাগত নভেলের মতো নয়। সেখানে নেই চরিত্রের উত্থান-পতন। একটা জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরার কারণে সেখানে থাকে প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র। পুরো অঞ্চলের ভৌগোলিক, সামাজিক, ইতিহাস সব মিলিয়ে একটা সমাজগবেষণা, সমাজমনস্তত্ত্ব।

সমাজমনস্তত্ত্ব, প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র এসবের মধ্যে দিয়ে কেবল নিজের অনুসন্ধান করেছেন। কারও সঙ্গে আড্ডা, ফোনালাপ, বই পড়বার গল্প, জীবনের বাঁকে বাঁকে নানা পথ পরিক্রমার কথোপকথন, জীবনের লার্নিং এসব তিনি এনেছেন। নিজের প্রতি বিদ্বেষ, রাগ, অভিমান, সংশয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের দোদুল্যমানতা, দন্দ্বভাবনা, কল্পনা অর্থাৎ যে জীবন আমরা যাপন করি বা করে এসেছি নানা বয়সে সেখানে নানা ক্লেদ, আনন্দ, বিষাদ জমা পড়েছে অদ্ভুতভাবে। মিহির সেনগুপ্ত সেগুলোকে সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পড়তে পড়তে মনে হবে এগুলো খুব সাধারণ, বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনে প্রত্যেকেরই ঘটে। কেউ বলে— কেউ থাকে নিশ্চুপ। মিহির সেনগুপ্ত এই বলা, চারণের মধ্য দিয়ে নিজেকে খুঁজেছেন। আনন্দ পেয়েছেন নিজের সঙ্গে নিজে আড্ডা দিতে। আজ এপার থেকে জানতে ইচ্ছা করে দাদা, পেয়েছিলেন কী যা অনুসন্ধান করেছেন অর্ধেক জীবনভর?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3775 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...