হিন্দুত্ববাদ বনাম সর্বজনীনতা

অনুপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

 



প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

 

 

 

হিন্দুত্ব শব্দটির অভিধানগত মানে হল “হিন্দু ভাব”। যদি ঠিক বুঝে থাকি তবে এই শব্দটি হিন্দু মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। অথচ এই শব্দটা নিয়ে প্রায় রোজই আমরা নানারকম আলোচনা শুনতে পাই। ইতিমধ্যে “হিন্দুত্ব” শব্দটি থেকে হিন্দুত্ববাদী শব্দটিও তৈরি হয়ে গেছে। নতুন শব্দটির অভিধানগত অর্থ হওয়া উচিত “এমন কেউ যিনি হিন্দু মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি নিজের বৈশিষ্ট্য করে তোলার জন্যে সচেষ্ট হন।” মজার কথা হচ্ছে সাধারণ ব্যবহারে সব হিন্দুকে এমনকি সব নিষ্ঠাবান/নিষ্ঠাবতী হিন্দুকেও কিন্তু হিন্দুত্ববাদী বলা হয় না। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী যে হিন্দুরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-বিরোধী তাদেরই হিন্দুত্ববাদী আখ্যা দেওয়া হয়। হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের আকাঙ্খাই এই সংখ্যালঘু-বিরোধী মনোভাবের কারণ।

সাভারকার তাঁর ১৯২৩ সালে প্রকাশিত “হিন্দুত্ব” নামক বইটিতে হিন্দুরাষ্ট্রে হিন্দু ছাড়াও কিছু অন্য ধর্ম, যেমন শিখ, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মবিশ্বাসী মানুষদেরও নাগরিক হওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচনা করেছেন কিন্তু মুসলমান এবং খ্রিস্টান সম্পর্কে তাঁর আপত্তি থেকেই গেছে। তাঁর মতে:

That is why Christian and Mohammedan communities, who were but very recently Hindus and in a majority of cases had been at least in their first generation most unwilling denizens of their new fold, claim though they might have a common Fatherland, and an almost pure Hindu blood and parentage with us, cannot be recognized as Hindus; as since their adaptation of the new cult they had ceased to own Hindu civilization (Sanskrit) as a whole. They belong, or feel that they belong, to a cultural unit altogether different from the Hindu one.[1]

সেই কারণেই আজ হিন্দুরাষ্ট্রের প্রবক্তারা মুসলমান এবং খ্রিস্টানমুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখেন এবং এই স্বপ্নই তাঁদের বাধ্য করে হরিদ্বার ধর্মসভায় মুসলমান গণহত্যার ডাক দিতে। রামনবমী এবং ঈদের মিছিল ঘিরে তৈরি হয় অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ।

২০১৪ সালে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর থেকেই বিজেপি তার হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্নটা সার্থক করবার কথা ভাবতে শুরু করে। যেহেতু সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে তাদের মনোভাবটা ভোটের ময়দানে খুব সোচ্চারভাবে বলতে চায়নি এবং কয়েকজন মুসলমান নেতাও দলে থেকে যান, তাই তাঁদের এক-আধজনকে প্রার্থীও করে। অনিচ্ছার সঙ্গে করা কোনও কাজই সার্থকতা লাভ করতে পারে না। বোধহয় সেই কারণেই আজ থেকে আর মাত্র এক মাসের মধ্যে সংসদে, রাজ্যসভায় এবং ভারতবর্ষের কোনও বিধানসভায়ই বিজেপির কোনও মুসলমান প্রতিনিধি থাকছে না। লোকসভায় বিজেপির শেষ মুসলমান সাংসদের মেয়াদ ২০১৪ সালে শেষ হয়েছিল৷ ২০১৯ সালের পরে কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৩১টি বিধানসভায় বিজেপির পক্ষ থেকে একজনও মুসলমান বিধায়ক ছিলেন না এবং রাজ্যসভার বিজেপি দলের শেষ মুসলমান সাংসদ ৭ জুলাই পদত্যাগ করতে চলেছেন৷

ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এবং সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভায় মোট ৪৯০৮টি আসন রয়েছে। লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি আসন, রাজ্যসভার জন্য ২৪৫টি আসন এবং বাকি ৪১২০টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির আইনসভাগুলির জন্য বরাদ্দ। বর্তমানে বিজেপির লোকসভার পাশাপাশি ১৭টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, যার ফলে একজনও মুসলমান প্রতিনিধি না থাকাটা মোদিজির বলা ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগানের সঙ্গে মেলে না। এই স্লোগান এবং হিন্দুরাষ্ট্রের ভাবনার মধ্যের দ্বন্দ্বটিকে বিজেপি কীভাবে মোকাবিলা করে সেইটাই দেখার।

আমরা আগেই দেখেছি যে ২০১৯-এর পরে সংসদ বা ভারতবর্ষের কোনও বিধানসভাতেই বিজেপির কোনও মুসলমান প্রতিনিধি ছিলেন না। অচিরেই রাজ্যসভার শেষ তিনজন সদস্যেরও মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। সাংবাদিক ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এম জে আকবর, যিনি ২০১৮ সালের অক্টোবরে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অসংখ্য মহিলার যৌন নিপীড়নের অভিযোগের কারণে তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তাঁর মেয়াদ ২৯ জুন শেষ হতে চলেছে৷ বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সৈয়দ জাফর আলমের মেয়াদ ৪ জুলাই শেষ হবে এবং মাত্র তিনদিন পরে, মুখতার আব্বাস নকভি, রাজ্যসভার সংসদের উপনেতা এবং কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রীর মেয়াদ ৭ জুলাই শেষ হচ্ছে৷ এর ফলে সংসদের কোনও কক্ষেই বিজেপির কোনও মুসলিম সাংসদ থাকবেন না। লোকসভায় বিজেপির শেষ মুসলিম সাংসদ ছিলেন শাহনওয়াজ হুসেন, যিনি ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিহারের ভাগলপুর থেকে জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৪ এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কোনও মুসলমান প্রার্থীই জিততে পারেননি। ২০১৪ সালে, বিজেপি মোট ৪৮২টি আসনের মধ্যে মাত্র সাতজন মুসলমানকে প্রার্থী করেছিল। তবে, শাহনওয়াজ হোসেন সহ তাদের সকলেই হেরেছিলেন। শাহনওয়াজ হোসেনের নাম আলাদা করে বলবার কারণ তিনি আগের বারে একজন সাংসদ ছিলেন। ২০১৯ সালে গেরুয়া শিবির ছয়জন মুসলমানকে প্রার্থী করেছিল— তিনটি জম্মু ও কাশ্মিরে, দুটি পশ্চিমবঙ্গে এবং একজন লাক্ষাদ্বীপে— কিন্তু আবারও, তাদের কেউ একটি আসনও জিততে সক্ষম হননি।

বিজেপির মুসলমান প্রার্থীদের ধারাবাহিক খারাপ ফল দুটি উপায়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: প্রথমত, তাঁদের বেশিরভাগই মুসলমান-অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রার্থী হয়েছেন এবং মুসলমান সম্প্রদায় গেরুয়া পার্টির উগ্র, সাম্প্রদায়িক কর্মসূচি দ্বারা বিরক্ত হয়ে বিজেপি প্রার্থীর হার নিশ্চিত করতে ভোট দিয়েছেন। যদিও বিজেপি কখনও মুসলমানদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেনি এমন নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল মুসলমান সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী দিয়েও তাঁদের বিশেষ সমর্থন পাওয়া যায়নি। তাই কয়েক বছর ধরে দলের অনেক নেতা সমর্থনের জন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাইরের লোকদের দিকে মনোনিবেশ করা শুরু করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে যদি একটি নির্বাচনী এলাকায় ৩০ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যা থাকে তবে বিজেপি প্রার্থী নিশ্চিত জানেন যে জয়ের জন্য তাঁদের বাকি ৭০ শতাংশ থেকেই যতটা সম্ভব বেশি ভোট পেতে হবে। সংখ্যার আনুপাতিক হিসাবও হিন্দু জনসংখ্যার দিকে বেশি মনোযোগকে মান্যতা দেয়। দ্বিতীয়ত, বিজেপি নজর করেছে যে মুসলমান প্রার্থীদের ভোটে দাঁড় করিয়েও তারা কোনও সুবিধে পায়নি বরং তাঁদের প্রার্থী হওয়ার কারণে হিন্দু ভোটও ভাগ হয়েছে, যার মধ্যে কিছু ভোট বিজেপি থেকে হিন্দু বা বিরোধী দলের অন্যান্য অমুসলমান প্রার্থীদের দিকে চলে গেছে। তদুপরি, অনেকে এও বিশ্বাস করেন যে তাঁদের দলটি এই আসনগুলিতে ততটা উত্সাহের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না যতটা  এমন জায়গাগুলিতে করে যেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে কম মুসলমান ভোটার রয়েছে। বিজেপির এই আচরণ হয়তো হিন্দুরাষ্ট্র স্থাপনের প্রবল আকাঙ্খারই বহিঃপ্রকাশ।

২০১৪ সালের নির্বাচনে, যখন বিজেপি প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল যাকে ‘মোদি তরঙ্গ’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তখন দলটি সামগ্রিকভাবে সমস্ত ভোটের ৩১ শতাংশ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তবু মুসলমান প্রার্থীরা তাদের অমুসলমান প্রতিপক্ষের তুলনায় যথেষ্ট খারাপ ফলাফল করেছিলেন। যেখানে মুসলিম প্রার্থীরা গড়ে প্রায় ৮০,০০০ ভোট পেয়েছিলেন, সেখানে বিজেপির অমুসলমান সম্প্রদায়য়ের প্রার্থীরা গড়ে প্রায় ৩.৫ লাখ ভোট পেয়েছিলেন। লোকসভা নির্বাচনই একমাত্র নির্বাচন নয় যেখানে মুসলমানরা বিজেপি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ২৮টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভায় এই মুহূর্তে বিজেপির একজনও বিধায়ক নেই। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত, দলটির বিধানসভায় মোট চারজন মুসলমান বিধায়ক ছিল— জম্মু ও কাশ্মির এবং অসমে একজন করে এবং রাজস্থানে দুজন। আব্দুল গনি কোহলি ২০১৪ সালে জম্মু ও কাশ্মির-এর রাজৌরি জেলার কালাকোট থেকে জয়লাভ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে বিজেপি-পিডিপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি এখনও দলের সঙ্গেই আছেন। ইউনুস খান ২০১৩ সালে রাজস্থানের দিদওয়ানা থেকে বিজেপির টিকিটে জিতেছিলেন এবং পরবর্তীকালে বসুন্ধরা রাজে সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে, তিনি টঙ্ক থেকে কংগ্রেসের শচীন পাইলটের কাছে হেরেছিলেন। রাজস্থানের অন্য মুসলমান বিজেপি বিধায়ক ছিলেন হাবিবুর রহমান, যিনি ২০১৩ সালে নাগৌর থেকে জয়ী হয়েছিলেন। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার জন্য গেরুয়া দল ছেড়েছিলেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন আমিনুল হক লস্কর, যিনি ২০১৬ সালে অসমের সোনাই থেকে জিতেছিলেন। তিনি পরে ২০১৯ সালে রাজ্য বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হন। তবে ২০২১ সালের নির্বাচনে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের লস্কর করিম উদ্দিন বারভূইয়ার কাছে হেরে যান।

বিজেপি যখন পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনও সে মুসলমানদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে এমন কোনও সমঝোতার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ২০২৪-এর নির্বাচনের আর দুই বছরেরও কম সময় বাকি থাকা সত্ত্বেও বিভেদমূলক রাজনীতি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের কোনওরকম কমতি দেখা যাচ্ছে না। এই মন্তব্যগুলি শুধুমাত্র মুসলমানদের বিজেপি থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই বছরের শুরুর দিকে পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরে মন্দির-মসজিদ রাজনীতির উত্তাপ এই বিভাজনকে আরও প্রকট করে তুলছে।

বিপরীতে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, যার মধ্যে নবী মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিজেপির দুই মুখপাত্রের বিবৃতি ফাটলকে আরও প্রশস্ত করছে। বিজেপির এই দুই মুখপাত্রের বিরুদ্ধে কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশগুলি থেকে এই পর্বের আন্তর্জাতিক নিন্দার বিষয়টিও এখানকার মুসলমানদের নজর এড়ায়নি। এইভাবে, দলটির পক্ষে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা ক্রমাগত আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এই কথাটা বিজেপি বোঝে না এমন নয়। বর্তমান সরকার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন জায়গায় এনে ফেলেছে যে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে এই অবস্থার কারণ কেবলমাত্র সরকারের অক্ষমতা বলে মনে হয় না, বরং  মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীদের হাতে সমস্ত সম্পদ তুলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টাও হতে পারে। ভোটের ময়দানে সামাল দিতে তাই তার হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তিকেই তুলে ধরতে হবে। প্রমাণ করতেই হবে হিন্দুরা বিপন্ন। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী ভারতবর্ষে ৭৯.৮ শতাংশ হিন্দু, ১৪.২ শতাংশ মুসলমান, ২.৩ শতাংশ খ্রিস্টান, ১.৭ শতাংশ শিখ, ০.৭ শতাংশ বৌদ্ধ এবং ০.৪ শতাংশ জৈন। তাই মুসলমান ও খ্রিস্টান মিলিয়ে ১৬.৫ শতাংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করার থেকে ৭৯.৮ শতাংশ হিন্দু ভোটের মূল্য বিজেপির কাছে অনেক বেশি।


[1] Savarkar, V. D., “Hindutva”, pp. 100-101.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...