অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

চারটি কবিতা

 

গানের খাতা

কীভাবে একটা অবয়ব ক্রমশই সন্ধ্যারূপ নিচ্ছে।
হেরে যাওয়া মানুষের ভূমিকায়
বন্ধক থাকছে এযাবতকালের নিয়মকানুন, উত্তরাধিকারজনিত বসতভিটে।
অনেক অনেকদিন আগে এক রাখাল ছিল আর ছিল তার বাঁশি—
এইভাবে একটা গল্প শুরু হয়
বিস্তৃত মাঠ ক্রমশই নগর হয়ে উঠলে
বাঁশিওয়ালা দেশান্তরী একা একা!
নিঃশব্দে চলে যাওয়ার ভিতর যে ঝঞ্ঝামুখরতা স্থির হয়ে আছে
তার চিহ্ন বুকে নিয়ে থমথমে হয়ে থাকে শাখাপ্রশাখার জ্যামিতিক বিন্যাস
পায়ের পাতার ওঠাপড়ায় বেজে ওঠা সুর
শিকড় পর্যন্ত তাকে জাপটে কোথাও বৃন্দাবনী সারং
অনেক উঁচু টাওয়ারের মাথায় রোজ এসময় যে দোয়েল এসে শিস দেয়
সে কি লম্বা বিনুনী পিঠে ফেলা গানদিদি ছোটবেলাকার,
অসময়ে হারমোনিয়াম ফেলে ছাই হয়ে যাওয়া…?

 

শ্মশানযাত্রা

চিঠি লেখা ভুলে গেছি বলে কথা জমানোর অভ্যেস হারিয়ে ফেলেছি।
গাছের গায়ে আটকে পড়া ছেঁড়া ঘুড়ি দেখে মনে হল আজ
সুতো ছিঁড়ে গেলে সমস্ত উড়ান এরকমই অনাদরে সেঁটে থাকে।
ভাতের আঠায় লোভী পিঁপড়ের মত ঘুরঘুর করে পরিত্রাণহীন বেঁচে থাকা!
একটা আয়নার সামনে অঙ্গভঙ্গির বাহুল্য আর গোলাপী দেওয়াললিখন।
অঘোষিত বনধের দুপুর, নিশান ওড়ানো কত রাষ্ট্রদিবস আর ভরপেট ভোজ শেষে মুখ মুছে ঘরে ফিরে দেখা নখদাঁত সযত্নে তোরঙ্গে সাজানো।
তারপর রাত্রি গভীর হলে মেঘের আড়াল থেকে তীর, বজ্রপাত, অস্ত্রের নিখুঁত মহড়া। বেঁচে আছি কী ভীষণ—
চলমান মৃতদেহ বেবাক আঁকড়ে নিজেদের। এ ওকে টপকে যাই— কেউ কারও কথা আর শুনি না, বুঝি না, একান্তে জমিয়ে রাখি না।

 

মহড়া

মহামারির দিন ফুরোবেই। স্পষ্ট পড়তে পারব ঠোঁটের ফুটে ওঠা নিরুচ্চার, আবারও। এই বিশ্বাস বাতাসে ভরে ফুসফুসের কাতর প্রদাহ প্রত্যেক নিশ্বাসে লিখে দিল যাতায়াত। অথচ মড়ক পেরিয়ে মুখোশ থেকে মুখ আর আলাদা হচ্ছে না কিছুতেই।

উন্মুক্ত দেওয়ালের গায়ে হাসিচিহ্ন রাখি। এত নিঃশব্দে সরে যাওয়া অভ্যেস করি যাতে কোনও আঘাত না থাকে। ক্ষতদাগ পুষে রাখা পায়ের তলায় যেরকম খুব আড়ালের, সেটুকু গোপন। শুধু আর জোর নেই পা দুটোর, জুতোগুলো জানে।

 

বিভ্রম

সামান্য এলোমেলো সাজিয়ে দিই ছবি, মানে যাকে অক্ষর ভাবো। নতুন কিছুই ঘটে না। পাখির ভিতর খাঁচা এঁকে দেখি সকলেরই বুক জোড়া খাঁচা আর খাঁচার ভিতর ছটফট ডানা। ফল কেটে গাছ লিখে দেখি বীজপত্রের ঘুমে চরাচর জোড়া বন লগ্ন ছিলই। কান্নাকে হাসি নামে ডেকে একই চোখ ভরা ছলাত আওয়াজ। ঘুম আর জেগে থাকায় তফাত করার আগেই রাত হয়ে যায় অথবা ভোর। অসহ্য আলোতেও চোখ অন্ধকার হয়ে আসে তখন। আমার মধ্যে থেকে তুমি আর তোমার মধ্যে থেকে সে পরস্পরকে দোষারোপ করতে করতে কাঁটাবনে নেমে যায় অতঃপর।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*