দ্য লায়ন কিং

অয়নেশ দাস

 



গদ্যকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

হায়দ্রাবাদ ১৯৯৯

অ্যানিমেশন শিখতে যাওয়ার সুবাদে হায়দ্রাবাদে বসে দেখেছিলাম ওয়াল্ট ডিজ়নির ‘দ্য লায়ন কিং’। দেখার পর মনে আছে, আমার যা মতামত ছিল, বলেছিলাম পাশে বসে একসঙ্গে ছবিটি দেখা ভিনরাজ্যের সহপাঠীকে। সহপাঠী আমার পিঠে আলতো চাপড় মেরে বলেছিল— ‘রিল্যাক্স, ইট’স জাস্ট আ কার্টুন ফিল্ম।’ দু দশক বাদে অবিকল একই প্রতিধ্বনি শুনলাম আরেক বন্ধুর থেকে— ‘রিল্যাক্স, ইট’স জাস্ট অ্যান এমব্লেম।’

যেন চমকেই ফিরে গেলাম হায়দ্রাবাদে— দু দশক আগে স্টুডিওর ওয়াচরুমে। তখনকার দিনের সর্বাধুনিক ডলবি স্টিরিওর কেরামতিতে হঠাৎ ছোট্ট হলরুম কাঁপিয়ে, কান ফাটিয়ে, বুক কাঁপিয়ে যেন সোজা পেটের মধ্যে ঢুকে গেল এক পুরুষ সিংহের জলদগম্ভীর গর্জন। প্যালারামের পিলে হলে সেদিনই পটল তুলত। আমারটা কোনওরকমে রক্ষা পেয়েছিল। পর্দা জুড়ে প্রাইডল্যান্ড। ধু ধু সাভানার মাঝখানে জেগে আছে তেরছা মনোলিথের মতো এক টিলা। তার মাথায় জঙ্গলের রাজা মুফাসা। মুখ তুলে তার অবিশ্বাস্য পৌরুষময় গর্জনে আপামর জঙ্গলবাসীকে সে জানিয়ে দিচ্ছে তার অজেয় পুরুষকার, তার শ্রেষ্ঠত্ব। আর সে পৌরুষের নিচে প্রশ্নহীন আনুগত্যে নতজানু বাকি জঙ্গলবাসী। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় তার স্বদন্ত ঝলসে উঠছে। ফুলে উঠেছে তার কেশর— চরম ম্যাসক্যুলিনিটির অবিসংবাদী সিম্বল।

২০১৯-এ নতুনভাবে আবার রিলিজ করল ‘দ্য লায়ন কিং’। যদি অন্য কিছু ভাবনা থেকে থাকে, তাই আবার দেখলাম নতুন অ্যানিমেটেড ছবিটি। না, মূল ন্যারেটিভের বিশেষ কোনও পরিবর্তন নেই সেখানে। শুধু পুরনো প্রযুক্তির হাতে আঁকা সেল অ্যানিমেশন বদলে অত্যাধুনিক থ্রি ডি প্রযুক্তিতে মুফাসা, সিম্বার শরীরী ভাষা হয়ে উঠেছে আরও বাস্তবধর্মী, আরও জীবন্ত এবং আরও ভয়ঙ্কর রকম আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী।

একবিংশ শতাব্দীর লায়ন কিং

 

নয়া দিল্লি ২০২০

ডিসেম্বর মাস। প্রধানমন্ত্রী এক শিলান্যাস অনুষ্ঠানে একবিংশ শতকের আধুনিক ভারতীয় জনমানসের দুর্মর আকাঙ্খার বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি এক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন। সে আকাঙ্খা মোতাবেক ঔপনিবেশিক শাসকের হাতে তৈরি সংসদ ভবনটির বদলে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল নিরঙ্কুশ ভারতীয়ত্বে নির্মিত এক নতুন সংসদ ভবনের। সেই প্রস্তাবিত নতুন ভবনটির শিলান্যাসকে কেন্দ্র করেই এই অনুষ্ঠান। ৯৭১ কোটি টাকার আনুমানিক খরচে আধুনিক ভারতবাসীর আকাঙ্খাকে ইট-সিমেন্টে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পেলেন মহামান্য টাটা প্রজেক্টস লিমিটেড। এবং ঘোষণা অনুযায়ী স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপনের স্মারক হিসেবে নতুন ভবনটির দ্বারোদ্ঘাটন হতে চলেছে ২০২২-এই।

তখনও আমি অবশ্য জানতাম না তার মাথায় স্থাপিত হবে সারনাথের সিংহ চতুষ্টয়। মানে যাকে আমরা অশোকস্তম্ভ বলে জানি, চিনি সেই ছেলেবেলা থেকে। জেনারেল নলেজের বইয়ের আগেই তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ক্রিকেটের ম্যাচে টসের সুবাদে। পয়সার যেদিকটাকে হেড বলে সেদিকটায় ঢালাই করা তিনটে সিংহের মূর্তিটাই যে অশোকস্তম্ভ, তা তো জেনে গিয়েছিলাম সেই ছোট্টবেলা থেকেই। সে তো শুধু সরকারি শিলমোহর নয়, আমাদের জীবনের প্রতি পদে ছড়িয়ে ছিল তা।

 

সারনাথ ১৯০৫

মধ্যযুগের চৈনিক পরিব্রাজকদের লেখা পুঁথিপত্র অনুসরন করে বারাণসীর কাছে সারনাথে খোঁড়াখুঁড়ি চালাচ্ছিলেন ব্রিটিশ ভারতে কর্মরত জার্মান সিভিল ইঞ্জিনয়ার ও শখের প্রত্নতাত্ত্বিক ফ্রিডরিশ অস্কার ওয়ের্টেল। তিনিই সারনাথের বিখ্যাত লায়ন ক্যাপিটাল বা আমরা যাকে জানি অশোকস্তম্ভ হিসেবে, তার পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের হকদার। ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য রাজা অশোক স্থাপিত সম্পূর্ণ স্তম্ভটি কালের নিয়মে তিন টুকরো হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল, যদিও তার উপরের অংশটি অর্থাৎ লায়ন ক্যাপিটালটি সৌভাগ্যক্রমে অবিকৃত ছিল।

সারনাথে আবিষ্কারের পর লায়ন ক্যাপিটাল

অশোকের সময়ের ভারতবর্ষ জুড়ে তিরিশ থেকে চল্লিশ ফুট উচ্চতার এরকম বিভিন্ন স্তম্ভ পুরাতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে মৌর্য সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বিভিন্ন বৌদ্ধ তীর্থযাত্রাপথে এবং পাটলিপুত্র অনুসারী রাস্তায় এই স্তম্ভগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। শুধু সিংহ নয়, বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্যে অলঙ্কৃত ছিল মৌর্য স্তম্ভগুলি। এর মধ্যে সারনাথের স্তম্ভটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এখানেই অবস্থানকালে বুদ্ধ তাঁর বিখ্যাত চারটি আদর্শ সত্যের (চত্বারি আর্য্যসত্যাণি) উপদেশগুলি দিয়ে যান। ঐতিহাসিক গুরুত্ব তো বটেই, স্থাপত্যশিল্পের দিক থেকেও এর অসীম গুরুত্ব।

স্থাপত্যের দিক থেকে অনেকে অশোকের স্তম্ভগুলির গঠনশৈলীতে গ্রিক প্রভাব লক্ষ করেছেন। অনেকেই আবার ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সারগোনিড অ্যাসিরিয়া এবং ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একিমেনিড পারসিয়ার শিল্পশৈলীর প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করেছেন। সে যাই হোক, একই সৌধের ওপর খাড়া স্যান্ডস্টোনে খোদিত অনুপম ভাস্কর্যের এই স্তম্ভগুলি আজও শিল্পপ্রেমী মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

রোমিলা থাপারের মতে, শিল্পশৈলীর মতোই রাজার প্রতীক হিসেবে সিংহের ব্যবহারটিও মৌর্যযুগে শুরু হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের অনুসরণেই। যদিও মৌর্য সিম্বল হিসেবে সিংহের ব্যবহার ক্ষমতার একটি অন্য ধারণাকে তুলে ধরে, যা কোনও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, এক বিশ্বজনীন রাজার (চক্রবর্তী) সেই ক্ষমতা যা সর্বাঙ্গে ব্যবহৃত হয় সর্বত্র ‘ধম্ম’-কে প্রতিষ্ঠা করার অভিপ্রায়ে।

এবং সত্যিই, কারও চোখ এড়াবে না, বুদ্ধের চারটি আদর্শ সত্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সারনাথের সিংহ মূর্তিগুলিতে এক উদার সৌম্যতা, এক মিতবাক নান্দনিকতা প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক শিল্পশৈলীর এক অনিন্দ্যসুন্দর ভাস্কর্যে যেন খোদিত হয়ে আছে।

অ্যাসিরিয়ান ভাস্কর্যে সিংহ

 

নয়া দিল্লি ১৯৪৭

২২ জুলাই তারিখে কন্সিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে জওহরলাল নেহরু স্বাধীন ভারতের সম্ভাব্য পতাকা ও প্রতীকের বিষয়ে এক খসড়া প্রস্তাবনা রাখেন। অশোকের সময়কার মৌর্য সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাতী ও উদার যুগটিকেই তিনি বেছে নেন অনুপ্রেরণা হিসেবে। নেহরু চেয়েছিলেন ভারতের ইতিহাসের সেই স্বর্ণময় যুগটি থেকেই যেন ভবিষ্যতের আধুনিক ভারত যেন তার আদর্শ ও মূল্যবোধের উপাদান খুঁজে নেয়।

Now because I have mentioned the name of Asoka I should like you to think that the Asokan period in Indian history was essentially an international period of Indian history. It was not a narrowly national period, it was a period when India’s ambassadors went abroad to far countries and went abroad not in the way of an empire and imperialism but as ambassadors of peace and culture and goodwill.

–Jawaharlal Nehru at the Constituent Assembly

কিন্তু তখনও অজানা ছিল মৌর্যযুগের কোন চিহ্নটি হতে চলেছে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের প্রতীক। স্বাধীনতা তখন প্রায় দোরগোড়ায়। অথচ প্রতীকের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছেন নেহরু ও অন্যান্য নেতারা। ভারতের সমস্ত আর্ট স্কুলগুলির থেকে খসড়া ডিজাইন চেয়ে পাঠানো হল। কিন্তু তাদের পাঠানো কোনও কিছুই পছন্দ হচ্ছিল না। এমন সময় এক সিভিল সার্ভিস অফিসার বদরুদ্দীন তৈয়বজি এবং তার স্ত্রী সুরইয়া তৈয়বজি নেহরুকে সারনাথে আবিষ্কৃত অশোকের লায়ন ক্যাপিটালটিকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে প্রস্তাব করলেন। তারপর বাকিটা ইতিহাস। তাঁদের মেয়ে লায়লা তৈয়বজি স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন—

So, my mother drew a graphic version and the printing press at the Viceregal Lodge (Now Rashtrapati Niwas) made some impressions and everyone loved it. Of course, the four lions have been our emblem ever since.

My mother was 28 at the time. My father and she never felt they had ‘designed’ the national emblem – just reminded India of something that had always been part of its identity.

দীননাথ ভার্গব তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্র। নন্দলাল বসুর তত্ত্বাবধানে দীননাথ জাতীয় প্রতীকের চূড়ান্ত স্কেচটি আঁকলেন স্বাধীন ভারতের সংবিধানের প্রথম পাতায়। মুণ্ডক উপনিষদ থেকে নেওয়া হল নীচের কথাটি— সত্যমেব জয়তে।

 

নয়া দিল্লি ২০২২

প্রস্তাবিত নতুন সংসদ ভবনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। গত ১১ জুলাই সেই ভবনের ছাদে ব্রোঞ্জের তৈরি সাড়ে ন হাজার কিলোগ্রামের আর সাড়ে ছয় মিটার উচ্চতার জাতীয় প্রতীকটির একটি রেপ্লিকার উদবোধন করলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।

ছেলেবেলায় স্কুলের টিফিনে সাতসকালে মায়ের গুঁজে দেওয়া দশ পয়সায় লেখা থাকত এক একটি রঙিন বরফের তৈরি সস্তা অথচ আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ছেলেবেলাদের জন্য মহার্ঘ্য সব আইসক্রিমের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে খরচ হওয়ার আগে ক্লাসটিচারের চোখ এড়িয়ে সাদা পাতায় পেন্সিলের ঘষায় দশ পয়সার ‘হেড’-এর দিক থেকে জলছবির মতো ফুটিয়ে তুলতাম যে চিরচেনা চিহ্নটি, প্রধানমন্ত্রী তাকে কোন জাদুমন্ত্রে ভ্যানিশ করে দিলেন। বরং পরের দিন খবরের কাগজে ছবি দেখে আমার স্মৃতিতে অবধারিত তাড়া করে এল ‘দ্য লায়ন কিং’। সূক্ষ্ম, শৈল্পিক সৌম্যতা ঝেড়ে ফেলে সারনাথের অহিংস সিংহেরা তীক্ষ্ণ স্বদন্ত বার করে হয়ে উঠেছে হিংস্র। দর্পিত পেশিবহুল পৌরুষের যাবতীয় হিংস্রতা নিয়ে নতুন ভবনের প্রাসাদোপম উচ্চতা থেকে রাজা মুফাসার মতো সে যেন আমাদের মতো অধীন অধস্তনদের কাছ থেকে গর্জন করে দাবি করছে প্রশ্নহীন বশ্যতা। অ্যাসিরিয়ান শিল্পকলার মাধুর্যে জারিত কোমল পেলব কেশর বদলে গিয়েছে। তার বদলে পুরুষ সিংহ মুফাসার প্রবল কেশর তার যান্ত্রিক থ্রি-ডি বাস্তবতার মতো জান্তব পৌরুষে স্ফীত হয়ে এসেছে।

বিরোধী দলগুলি যতই জাতীয় প্রতীকের অপমান-টান বলে চিৎকার করুন না কেন, তাদের থেকে আসা অভিযোগগুলিকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেন না কেন্দ্রীয় সরকার। ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী টুইটার পোস্টে অবলীলায় যা বলার বলে দিয়েছেন—

Sense of proportion and perspective. Beauty is famously regarded as lying in the eyes of the beholder. So is the case with calm and anger. The original Sarnath Emblem is 1.6-metre high whereas the emblem on the top of the New Parliament building is huge at 6.5 metres.

মুম্বই জে জে স্কুল অব আর্টসের ছাত্র, অওরঙ্গাবাদ নিবাসী সুনীল দেওরে হলেন এই অশোকস্তম্ভের এই নতুন শিল্পকীর্তিটির ভাস্কর। তিনিও এইসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। ভাস্করের মতে, সারনাথের ভাস্কর্যটির সঙ্গে নতুনটির আকার ছাড়া কোনও অমিল নেই। দৃশ্যগত দিক থেকে দুটোই হুবহু এক। অনেকে যে তাও নতুনটির মধ্যে রাগী সিংহমশাই খুঁজে পাচ্ছেন তা আসলে কিনা পার্সপেক্টিভ অর্থাৎ কিনা দৃষ্টিকোণের পার্থক্যের জন্য, বিশেষ করে নিচ থেকে দেখার জন্য মালুম হচ্ছে।

তেমনটা যে নয় তা দেওরে মশাই-ও খুব ভালো করেই জানেন। এই পার্থক্য চোখে পড়িয়ে দেওয়ারই জন্য বরং বলা ভালো। উপরে যাই বলুন না কেন এই সিম্বলিজমের সচেতন বদল ঘটানোর দায়িত্ব তিনি ভালোই পালন করেছেন। আমি অতি সাধারণ মানুষ। আমার চোখে যা পড়েছে তাই পাঠকদের দেখতে বলব। সুনীল দেওরের কথামতোই তিনটি আলাদা পার্সপেক্টিভ থেকে তুল্যমূল্য দেখার চেষ্টা করব যে সুনীল দেওরে আসলে কোন দায়িত্ব পালন করেছেন।

পার্সপেক্টিভ ১
পার্সপেক্টিভ ২
পার্সপেক্টিভ ৩

এবার পাঠকই উত্তর দেবেন। এছাড়া শিল্পের মান ও শৈলীর দিক থেকেও এই পার্থক্য এতই বেশি যে তা বোঝার জন্য বিশেষ শিল্পবোদ্ধা হতে হয় না। জেএনইউ-এর ভিশ্যুয়াল স্টাডির অধ্যাপক ওয়াই এস আলোনের মতে—

There is no comparison between the old and the new. The majesty and grandeur that the original exudes is just amazing. The new one is more 20th century in terms of sculptural language.

শিল্প ও শৈলী, এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলবে। কিন্তু যদি বলি ফার্স্ট ইম্প্রেশনের কথা, তাহলে সেইসব সূক্ষ্ম বিতর্কে যাওয়ার অনেক আগেই সহসা আমার মনে পড়ে গেল ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট ড্যান হাসলার-ফরেস্ট-এর ‘দ্য লায়ন কিং’ দেখার প্রতিক্রিয়া।

No matter how you look at it, this is a film that introduces us to a society where the weak learned to worship at the feet of the strong.

পাঠক, এই প্রতিক্রিয়ায় ‘দ্য লায়ন কিং’ ছবিটির জায়গায় শুধু নতুন সংসদ ভবনের ছাদের নতুন জাতীয় প্রতীকটিকে মনে করে নিন।

 

নয়া ভারত ২০২২

বেশ কয়েক দশক ধরেই ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। পুরনো ভারতের ভিতর থেকে ক্রমশ এক নতুন ভারত উঠে আসছে। এক নয়া ভারত। যার অনেকগুলি প্রত্যক্ষ সিম্বলিজমের মধ্যে একটি অবশ্যই এই বদমেজাজি সিংহ মশাই। এই শাসকদল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারি স্তরে ভারতীয়ত্বের (বলা ভালো নেহরুকৃত পুরনো ভারত) পুরনো প্রতীকগুলিকে খুব সচেতনভাবেই বদলে দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে, ভারতীয়ত্বের প্রতিটি সংজ্ঞায় এক অতি আগ্রাসী, শক্তিশালী পৌরুষময় ইমেজ প্রতীকীকরণের ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। যেখানে নরম পৌরুষের, জেন্ডার ফ্লুইডিটি ইত্যাদির কোনও জায়গা নেই। তার বদলে এক পেশিবহুল সর্বাত্মক পৌরুষের আওতাধীন এক চরম একমাত্রিক, বিষমকামী সমাজব্যবস্থা বিভিন্ন সিম্বলের রূপ ধরে উঁকি দিতে শুরু করল।

যেমন ধরা যাক জাতীয় পশু বাঘ। সিম্বলিজমের অদল-বদল খেলায় বাঘের ঘরেই টাগের প্রথম কোপটি পড়ল। এখনও বোধহয় জাতীয় পশুর তকমাটা বাঘের ঘরেই আছে। কিন্তু কতদিন টিঁকবে বলা মুশকিল। সেখানে সিংহমশাই-এর দখল নেওয়াটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা। পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন মেক ইন ইন্ডিয়ার প্রতীক হিসেবে এক অগ্রসরমান সিংহমশাই তার জায়গা বহুদিন আগেই জায়গা করে নিয়েছে।

কিন্তু বাঘ কী দোষ করল? সেও তো দস্তুরমতো আগ্রাসী হতে পারে! অন্তত নেতাজি তাঁর ফরোয়ার্ড ব্লকের পতাকায় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে লাফ দেওয়া বাঘমামার যে প্রতীক গ্রহণ করেছিলেন, তাই দেখে তো বাঘের পৌরুষ বা আগ্রাসন নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না! তাহলে বাঘ কোথায় কম গেল? কারণ বাঘের কেশর নেই। পুরুষ বাঘ ও স্ত্রী বাঘের মধ্যে কোনটি কে অন্তত ভালো করে না দেখলে সনাক্ত করা কঠিন। সিংহের কেশর তার পৌরুষের অতি-দৃশ্যমান প্রতীক। এই কেশর নিয়েই সিংহ আলাদা। তার পৌরুষে কোনও সন্দেহ থাকতে পারেই না। পুরুষ সিংহ তাই পরম পৌরুষের একমেবদ্বিতীয় প্রতীক। পৌরুষ, আগ্রাসন ও রাজক্ষমতার যুগ-যুগান্তের অবিচল স্টিরিওটাইপ। জঙ্গলের রাজা কে? আফ্রিকা। আর আফ্রিকার রাজা বলতে আমাদের কী মনে পড়ে তোপসে? কেন? সিংহ!

যদিও বিভিন্ন গবেষণায় আজ জানা গিয়েছে যে সিংহসমাজের যে স্টিরিওটাইপ চলে এসেছে, যা আমরা দেখি ‘দ্য লায়ন কিং’ ছবিতে, আদপে সেরকমটা নয়। সিংহদের প্রাইডে অধিকাংশ সময়ে শিকার করে আসলে সিংহিরা। প্রাইড যে কেবল পুরুষ সিংহের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় চলে তাও নয়। এমনকি অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে যে প্রাইড অনেক সময়েই আসলে মাতৃকুলভিত্তিক। তাছাড়া, সিংহিদেরও কেশর অবিরল নয়। যেমন কেশরবিহীন পুরুষ সিংহও অবিরল নয়। সিংহসমাজও যথেষ্ট জেন্ডার ফ্লুইড ও বহিমাত্রিক। যদিও বিজ্ঞানের এইসব তথ্যে উগ্র স্টিরিওটাইপের নির্মাণ থেমে থাকে না। অনায়াসেই ভারতের রাজা বলতে চোখের সামনে ভাসিয়ে দেওয়া যায় গিরের কেশরধারী পুরুষ সিংহের ইমেজ। অবশেষে সেই ইমেজের নির্মাণ সম্পূর্ণ রূপ নেয় ব্যাক্তিমানুষে। পুরুষ-সিংহ আসলে হয়ে ওঠে সিংহ-পুরুষ। দুজনেই ‘লায়ন অব গুজরাট’। দুজনকেই আসলে হয়ে উঠতে হয় ‘লায়ন অব নিউ ইন্ডিয়া’। এবং সে ‘লায়ন’ সারনাথের নিরামিষ, বৌদ্ধ, কমনীয় সিংহমূর্তি হতে পারে না। এ ভারত নতুন ভারত। বিজেপির চন্দ্র বোস এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে সেই কথাই বলে ফেললেন—

But let us not always criticise. Maybe India is different today.

অনেকে বলবেন ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে সিংহের ব্যবহার তো ভারতের ইতিহাসে এক চিরকালীন এবং ধারাবাহিক প্রপঞ্চ। রোমিলা থাপার তো লিখেই গিয়েছেন এ ব্যাপারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রাচীন সময়েই ভারতে আমদানি হয়েছিল এই প্রতীকের ব্যবহার। কিন্তু মনে রাখতে হবে ভারতে তা সর্বাত্মক ছিল না। অনেক বেশি করে সে জায়গা ছিল হাতির। ভারতের অন্যান্য প্রাণীদের থেকে এমন কিছু বেশি আদর ছিল না সিংহ মশাই-এর। এমনকি শাকাহারী প্রাণীদেরও এই প্রতীকীকরণের ক্ষেত্রে শুধু যথেষ্ট নয়, বরং বেশি-ই প্রাধান্য ছিল। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে একসময়ে রাজত্ব করে বেড়াত সিংহের দল। তাই অ্যাসিরিয়া ও পারসিয়ায় সিম্বল হিসেবে সিংহের ব্যবহার ছিল স্বাভাবিকভাবেই যত্রতত্র। শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে এই সিম্বলের ব্যবহারও সেখান থেকেই ভারতে এসে পৌঁছয়।

মধ্যপ্রাচ্যে বাইবেল ও কোরান-হাদিশ পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও সে ঐতিহ্য অব্যাহত ছিল। এমনকি রাজতন্ত্রের আড়ালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদের শুরুয়াত যখন নির্মম আগ্রাসনে তার আদিম পুঁজির সংগ্রহে উন্মত্ত, তখনও যে প্রতীকের তলায় তার যাবতীয় নৃশংস উন্মত্ততা, তা ছিল সিংহ। উদাহরণ হিসেবে পাঠককে ব্রিটেনের জাতীয় প্রতীকটি দেখে নিতে অনুরোধ করব। এক দাঁত-নখ বার করা আদ্যন্ত আগ্রাসী সিংহের ইমেজ দিয়ে হয়েছিল ‘ব্রিটিশ সিংহ’ প্রতীকের নির্মাণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ পোস্টার। মজার ব্যাপার গ্রেট ব্রিটেন বা শ্রীলঙ্কা, কোনও দেশেরই স্থানীয় পশু সিংহ নয়

তো সারনাথেও তো ব্যবহার হয়েছে সিংহ প্রতীক! তবে? একটি ইতিহাস এখানে মনে রাখতে হবে। কিছু ঐতিহাসিকের মতে যেহেতু সারনাথ গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, তাই সিম্বল হিসেবে এই সিংহের এই ব্যবহারও ওতপ্রোতভাবে বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। বুদ্ধ ছিলেন শাক্যবংশের সন্তান। এবং শাক্যবংশের প্রতীক ছিল সিংহ। ফলে এই সিম্বলের ব্যবহার সারনাথে অনিবার্যভাবেই ঘটেছিল। কিন্তু গৌতমের জীবন ও মননের মতোই সারনাথের অশোকনির্মিত লায়ন ক্যাপিটালও ছিল মননে ও দৃশ্যমানতায় অনন্য। সে প্রতীক হয়ে উঠেছিল ত্যাগ, সহিষ্ণুতা ও উদারতার প্রতীক। নেহরুর ভবিষ্যৎ স্বাধীন ভারতের প্রতীক-কল্পনার সঙ্গে তাই মিলে গিয়েছিল অশোকের সারনাথ প্রতীক। স্বাধীন ভারতের শান্তি, বহুত্ববাদ ও সহিষ্ণুতার প্রতীক। আজকের বাস্তবতায় যা হয়ে গিয়েছে ‘পুরনো ভারত’ (আবার পড়া ভালো, নেহরুর ভারত)। কেমন ছিল সে পুরনো ভারত?

পাকিস্তানে যাওয়ার সমস্ত সুযোগ থাকলেও বদরুদ্দীন ও সুরাইয়া তৈয়বজি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বহুত্ববাদী স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে তাঁরা থেকে যান দিল্লিতেই। কন্যা লায়লা তৈয়বজির স্মৃতিচারণায় ডুব দেওয়া যেতে পারে একবার।

Despite the scars of Partition, there was a unity and sharing. The struggle for freedom had bound very diverse people together. People connected then to a broader identity – Indianness rather than caste or community.

India can be likened to a salad— a mix of many languages, faiths, food, clothing, cultures, social practices…. Their interplay gives that salad its colour, flavour and consistency and makes India so special. The ingredients cannot be boiled down and mashed into a bland majoritarian porridge. That would rob our extraordinary country of most of its flavour. The sauce that blends those different elements together is insaniyat (humanity). If the sauce goes bad, so does the country.

এবং এক সহজ সরল ভারতে বড় হয়ে উঠেছিলেন লায়লা।

India in those decades seemed a simpler, less splintered, less materialistic place. Rich or poor, we all shared the lengthy power cuts, spent hours waiting for those long distance, so-called “lightning” telephone calls. Cabinet ministers, company directors, generals, all drove in the same Ambassador cars and drank the same Indian rum and whiskey. There were no malls, no fancy foreign brands or designer labels. The darzi sat in the verandah stitching our clothes. Everyone lived within 15 minutes of each other and dropped by in the evenings for ‘potluck’, bearing a dish. Traffic jams and road rage were unheard of. Lutyens’ Delhi was not a pejorative. The conversations, sitting on modda chairs in our lawns, eating samosas, pedestal fan whirring, were about non-violence, secularism, democracy, socialism, non-alignment: outdated words that have now turned sour.

যেমন করে ‘হাকুনা মাটাটা’য় ভর করে লায়ন কিং মুফাসার সন্তান সিম্বাও বড় হয়ে উঠেছিল প্রাইড থেকে দূরে, জঙ্গলের আরেক প্রান্তে। হাকুনা মাটাটা অর্থাৎ ‘নো ওরি’। এক নির্ঝঞ্ঝাট, ধীর-স্থির নরম-সরম জীবন, যেখানে পুরুষ সিংহ হয়ে ওঠার দায় নেই, তাই দাঁত-নখ বার করে পৌরুষোচিত আগ্রাসনেরও কোনও দরকার নেই। সেখানে অধস্তন প্রাণীদেরও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে আনন্দে বেঁচে থাকা যায়। খানিকটা কি এই পুরনো ভারতের কথা বলতে চেয়েছেন লায়লা?

In my childhood in the 1950s, we lived opposite Teen Murti House. In the early mornings we went out riding with the then Prime Minister Jawaharlal Nehru and his family. Now, the thought of a prime minister out on horseback, cantering down the leafy lanes of Delhi, without Black Cat escorts, sirens and Sten guns in sight, seems fantastic.

হাকুনা মাটাটা চিরস্থায়ী হয় না। মুফাসার আত্মা সিম্বাকে মনে করিয়ে দেয় তার রাজরক্তের কথা। তার ইমেজ, তার ঐতিহ্যের কথা। সমাজনির্মাণের এক যথাযথ ‘ব্যালান্স’-এর কথা, যে ব্যালান্স নির্মিত হয় অবিকল্প পৌরুষের গৌরবগাথায়, মনুসংহিতার নির্দেশের মতো একাধারে পৌরুষ ও অন্যদিকে রক্তের জাত্যাভিমান যেখানে নির্ধারক হয় সে নির্মাণের। সারনাথের সিংহের বৌদ্ধ অহিংসতা আর হাকুনা মাটাটার ন্যাকামি ছেড়ে সিম্বা অচিরেই হয়ে ওঠে হিন্দুত্ববাদের পরম পুরুষ সিংহ। হিংস্রতার প্রবল বিক্রমে সে প্রাইড পুনর্দখল করে। মুফাসার সাম্রাজ্য আবার পুনঃস্থাপিত হয়। নতজানু প্রজাদের অভিবাদনে মুখরিত প্রাইডে ‘ব্যালান্স’ ফিরে আসে। আর স্ট্যান স্বামী, তিস্তা শীতলওয়াড়ের মতো সে ‘ব্যালান্স’-এ অসুবিধে ঘটানোদের স্থান হয় প্রাইডের বাইরে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ঘেটোতে। কী মনে হচ্ছে? ড্যান হাসলার-ফরেস্ট তো বলেই দিলেন—

As we watch the herbivores congregate to bow down before their newborn ruler, “The Lion King” presents a seductive worldview in which absolute power goes unquestioned and the weak and the vulnerable are fundamentally inferior. In other words: “The Lion King” offers us fascist ideology writ large…

সেদিন হায়দ্রাবাদের ওয়াচ রুমে পাশের সহপাঠীকে বলতে পারিনি। আজ নতুন সংসদ ভবনের মাথায় বসানো সারনাথের সিংহ চতুষ্টয়ের নতুন অবতার দেখার পর কিন্তু না বলে থাকতে পারিনি, নো, ইট’স জাস্ট নট অ্যান এমব্লেম। কারণ ওদের দেখে আমি রীতিমতো ভয় পাচ্ছি। ওদের নির্মম, ক্রূর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। ওদের তলোয়ারের মতো স্বদন্তের দিকে তাকিয়ে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত নেমে আসছে। আমার জন্ম কোনও শ্রমিক=রাষ্ট্রে হয়নি, কোনও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নয়। আমার সম্বল ছিল পড়ে পাওয়া একটুখানি পুরনো ভারতবর্ষ, যেখানে আমাকে অন্তত ভয়ে মরতে হত না। আমি নতুন সংসদ ভবনের ছাদের রেলিং উজিয়ে সাড়ে ন হাজার কিলো ব্রোঞ্জের নীচে প্রাণপণে খুঁজে চলেছিলাম মুণ্ডক উপনিষদের উদ্ধৃতিটি। পাচ্ছি না দেখে আরেক বন্ধু আমায় হেসে বলল— ছানি পড়েছে নাকি তোর চোখে? ওই তো লেখা— ‘সঙ্ঘমেব জয়তে’।

 

ঋণস্বীকার:

  • The Wire
  • Ladyscience.com
  • Scroll.in
  • Washington Post
  • BBC
  • Downtoearth.org.in
  • Indian Express
  • Theheritagelab.in
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...