অসংসদীয় শব্দের তালিকা গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও সঙ্কুচিত করল

পবিত্র সরকার

 



শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ

 

 

 

 

দেশের শাসক দল সংসদে পরিহার্য বা অসংসদীয় শব্দের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সংসদে এই শব্দগুলি ব্যবহার করা যাবে না, বা কোনও সাংসদ আলোচনায় এই তালিকাভুক্ত কোনও শব্দ ব্যবহার করে ফেললে, তা সেদিনের নথি থেকে পরিহার করা হবে৷ তালিকাটা দেখে এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে শাসক দল বিজেপি বুঝতে পেরেছে যে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সহকর্মীদের ওপর কোন কোন দিক থেকে আক্রমণ আসবে৷ অর্থাৎ তাদের নিজেদের দুর্বলতাগুলো তারা নিজেরাই যেন চিহ্নিত করেছে। ‘কোভিড-স্প্রেডার’, ‘নিষ্কর্মা’ বা ‘অসত্যবাদী’, এই রকম অজস্র শব্দ তারা সকলের সুবিধার জন্য নিজেরাই যেন সঙ্কলন করে দিয়েছে, যে এই সমস্ত গালাগালগুলো আমাদের করা যেতেই পারে কিন্তু আমরা তা করতে দেব না৷

এটাই হল মূল ঘটনা। সংসদ অবশ্যই একটি তর্ক-বিতর্কের জায়গা, এবং সেই বিতর্কের কিছু আদর্শ আছে। পাশাপাশি, সংসদ এমন একটা জায়গা যেখানে প্রতিপক্ষকে একটু খোঁচা দিয়ে, একটু ব্যঙ্গ করে, wit বা কথার চমৎকারিত্ব দেখিয়ে সাংসদদের নিজেদের মতপ্রকাশ ও বিপক্ষকে আক্রমণ করার একটা সুযোগ থাকে৷ এই গণতান্ত্রিক পরিসরটা তৈরি করে দিয়েছে আমাদের সংবিধান। এই পরিস্থিতিতে, সংসদে নিষিদ্ধ শব্দের একটি তালিকা তৈরি করে দিয়ে এবং তার মাধ্যমে বক্তাদের বিশেষ করে বিরোধী পক্ষের বক্তাদের আক্রমণের পরিসরকে সঙ্কুচিত করে দেওয়ার অধিকার শাসক দলের আছে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ এ অধিকার হয়ত আদালতের আছে। সুপ্রিম কোর্ট, যাঁরা সংবিধান ব্যাখ্যা করার চূড়ান্ত মালিক, তাঁরা হয়তো বলতে পারেন যে সংসদে এই শব্দগুলো ব্যবহার করা যাবে কিনা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেসব করার আগেই সংসদ নিজেই একটা তালিকা ঘোষণা করে দিল, এ ঘটনা আমার মতে একদিকে গণতন্ত্রের অধিকারকে যেমন সঙ্কীর্ণ করল, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ করে দিল।

এছাড়াও যেটা বলার, তা হল, এই তালিকা প্রকাশ এক হিসেবে শাসক দলের তরফে নির্বুদ্ধিতার কাজ হয়েছে। কারণ এত দীর্ঘ তালিকা কে পড়তে যাবে! আমি শুনেছি এই অসংসদীয় শব্দের সঙ্কলনটি একটি মস্ত বড় বই হয়েছে। এত বড় বই কে মুখস্থ করতে যাবে? আদৌ সকলের পক্ষে শব্দগুলো মনে রেখে বক্তৃতায় সেগুলো এড়ানো সম্ভব কিনা— সেটা একটা প্রশ্ন।

এছাড়াও ভাষাতে অনেক উপায় আছে বিরূদ্ধচারীকে তীব্রভাবে আক্রমণ করার। প্রতিটি ভাষার মধ্যেই এই ধরনের প্রচুর সম্ভাবনা থাকে। ‘আপনি কিছুই করেননি, আপনি নিকম্মা!’— এই কথাটি না বলে আমি যদি বলি, ‘আপনার দপ্তর অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে’, একই অর্থ প্রকাশ পায়। একই অর্থবোধক এই বিকল্প পথগুলি কি ওই তালিকায় নথিবদ্ধ আছে? অথবা আমি বলতে পারি, ‘You have produced green banana’, সেক্ষেত্রে বক্তার মুখ বন্ধ করা যাবে কী করে? এইসব শব্দ বা বাক্যবন্ধগুলিও কি ওই তালিকায় আছে? এইভাবে কত শব্দকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব? আদৌ সম্ভব কি? ভাষা তো এক সীমাহীন বস্তু। যেকোনও ভাষায় একটি কথাকে নানাভাবে বলা যায়, ভালোভাবে বলা যায়, খারাপভাবে বলা যায়, না বলতে হ্যাঁ বোঝানো যায়, হ্যাঁ বলতে না বোঝানো যায়— এমনই অজস্র তার ব্যঞ্জনা। শুধু এর উপরেই Pragmatics বলে একটা শাস্ত্র তৈরি হয়েছে৷ তাই, বিরোধী উচ্চারণকে রোখার জন্য শাসক দল কত বড় তালিকা তৈরি করবে! এ তো বস্তুত অসম্ভব! অতএব একজন দক্ষ সাংসদ, যার বুদ্ধি আছে, যার ভাষার ওপর দখল আছে, তিনি এইসব শব্দ বাদ দিয়েও শাসক দলকে তীব্র আক্রমণ করতেই পারেন৷ আমি সেই সম্ভাবনার দিকেই সাগ্রহে তাকিয়ে আছি৷

কিন্ত এতদসত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়, তা হল, এই কাজের মধ্য দিয়ে সংসদীয় পরিসরকে খাটো করা হল। এই ঘটনার সঙ্গে আরও একটি বিষয় সংযুক্ত করে দেখা উচিত। সংসদ ভবনের বাইরে গান্ধিমূর্তির পাদদেশে সাংসদদের ধর্নায় বসার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অথচ ধর্না সংবিধান মেনে প্রতিবাদ প্রতিরোধের এক শান্তিপূর্ণ উপায়। এর মাধ্যমে কাউকে কোনও দৈহিক আক্রমণ করা হচ্ছে না, শুধু গান্ধিজির মূর্তির সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বসে থাকা হচ্ছে। সেই অধিকারটিও শাসক কেড়ে নিলেন। শাসকের এইসব কাজকর্মে কোথাও যেন একটা স্বৈরতান্ত্রিক রূপ প্রকাশ হয়ে পড়ছে৷ সংসদ ভবনের মাথায় স্থাপিত সিংহের মূর্তির মধ্যে দিয়েও তা বোঝা যাচ্ছে। যেন একথা বলার চেষ্টা হচ্ছে যে— আমাদের দিকে তাকাও আর ভয় পাও। গণতান্ত্রিক পরিসরে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের জায়গাটা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে তার পরিবর্তে সন্ত্রাসের আবহাওয়া তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষত, আমরা যদি মহম্মদ জুবেইর, তিস্তা শীতলওয়াড়, ভারভারা রাও সহ একাধিক সাংবাদিক, চিন্তাবিদ ও সমাজকর্মীদের গ্রেফতারের ঘটনার দিকে তাকাই, মনে হবে দেশে যেন এক অঘোষিত জরুরি অবস্থা চালু করা হয়েছে। অশীতিপর স্ট্যান স্বামীকে জেলখানায় আবদ্ধ রেখে মারা যেতে একরকম বাধ্যই করা হল। বিরোধীদের গ্রেফতার করা, জেলবন্দি রাখা বা তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই শুধু নয়, কয়েক বছর আগে গৌরী লঙ্কেশ, কালবুর্গি, পানসারের মতো নির্ভীক মানুষজনকে প্রকাশ্যে খুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে একটা শ্রেণি সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা অস্ত্র ধরে মানুষ খুন করতেও পশ্চাদপদ নয়। পাশাপাশি, সাভারকরকে মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে একাসনে বসানো হচ্ছে। নানা পত্রপত্রিকায় সভাসমিতিতে সুকৌশলে বারবার এই কথা আউরে যাওয়া হচ্ছে যে— Savarkar was no less a patriot। অর্থাৎ সমস্ত দিক থেকে একটা paradigm shift অর্থাৎ ভারতবর্ষের খোলনলচে বদলে ফেলার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। চারিধারে ভয় ধরানোর মতো পরিবেশ গড়ে উঠছে, গণতন্ত্রে যা মোটেই কাম্য নয়। জানি না, পরের প্রজন্মের জন্য আমরা কোন দেশ রেখে যাব। সবমিলিয়ে একে আমি ভারতীয় গণতন্ত্রের এক চরম দুর্দিন বলেই মনে করি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...