প্রসঙ্গ: অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাঠতন্ত্র’

সত্যবান রায়

 

লেখক, লিখন, পাঠ ও পাঠক, এই সমূহ সৃষ্টি ও সত্তার সমাবেশে বা সমাহারে নির্মাণ হয় যে বিশ্ব তাকে হয়তো সহজ কথায় পাঠবিশ্ব বা পাঠকবিশ্ব বলা যেত, কিন্তু সমাবেশের অভ্যন্তরীণ জটিলতাকে তা আধারিত করার পক্ষে যথেষ্ট হত না। তাই এই সমাহারকে পাঠতন্ত্র নাম দিয়ে প্রাবন্ধিক অর্ধেন্দু সম্ভবত বিষয়টির প্রতি সুবিচার করেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর মূলত পাঁচখানি সন্দর্ভ নিয়ে এই পাঠতন্ত্র। এছাড়া সংযোজিত আছে পরিশিষ্টের কিছু নিবন্ধ, অনূদিত একটি রচনা ইত্যাদি। আলোচিত হয়েছে পাঠাভ্যাসের ইতিহাস, পড়ুয়া থেকে পাঠকে উত্তরণের সম্ভাব্যতা, পাঠকের কাছে প্রত্যাশা, ব্যাপ্ত প্রকাশনার সমুদ্রে দিশেহারা পাঠকের সমস্যা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। আর তার আবহে আছে লেখকের নিজস্ব প্রতীতি— অ্যাকাডেমিক কি নন-অ্যাকাডেমিক “যেভাবেই হোক মানুষকে লেখাপড়া করতেই হবে। সেটার চেয়ে জরুরি আর কিছু নেই।” নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়। যজুর্বেদের সময় থেকে এই আসন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিসরে আরোহণ বা অবহোরণের পথে সমাজ ও যাপনের সমূহ জটিলতা এই বিশ্বে কিংবা তার অন্তর্গত ‘সাবসেট’ পাঠতন্ত্রে আমাদের মতো অমৃতের পুত্র-পুত্রীদের স্থানাঙ্কের খোঁজই লেখকের অভীপ্সা। প্রথম সন্দর্ভে তাই তাঁর প্রয়াস ধ্বনি, সঙ্কেত ও লিপির ইতিহাস-পর্যায়কে প্রেক্ষাপটে রেখে পাঠচেতনার উৎস সন্ধান। সেইসঙ্গে প্রবন্ধকার খড়ির গণ্ডি টানেন শুধু পড়ুয়া এবং পাঠকের মধ্যেই নয়, পাঠকের গুণগত বৈচিত্রের মধ্যেও, যথা সাধারণ পাঠক, নিবিড় পাঠক ও আদর্শ পাঠক। লেখকের এই বিন্যাস আমাকে ভাবতে বাধ্য করে— পাঠক কে? তার স্বরূপের সংজ্ঞা কী? যদি সাহিত্যের ছায়াপথে এই পাঠককে খুঁজতে যাই, বেশ মজাই লাগে গুরুগম্ভীর বিষয়-যাপন থেকে কিছুটা লঘু সরণীতে সরে আসার ছলে। চারুলতা-য় নিঃসীম দ্বিপ্রহরের একাকিত্বে বার্মা-টিকের শেলফের বইয়ের সারিতে মন্দাক্রান্তা তালে দক্ষিণ করকমলের সুচারু অঙ্গুলিরাশি চালনার সঙ্গে চারু-মাধবীর বঙ্কিমের সন্ধান, মৃদুকণ্ঠে গলায় তখন স্ব-আরোপিত সুর— বঙ্কিম… বঙ্কিম… বঙ্কিম…। এবং হাতে উঠে আসে রেক্সিন-বাঁধাইয়ের একখানি কপালকুণ্ডলা। এই নির্মিতি এক পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়— বঙ্কিম-অনুরক্তা বটে, তবে তার উৎসে যতটা হয়তো কর্মব্যস্ত স্বামীর বিচ্ছিন্নতা ততটা মননশীলতা নয়। তবে সেই সীমাবদ্ধতা চারুর নয়। মুদ্রণের যুগ আসার পরেও কিছু সময় লেগেছিল পাঠক তৈরি হতে। মাইকেলেই বলা যায় পাঠকের রূপবদলের শুরু, আর বঙ্কিমের হাত ধরে সাহিত্য-পাঠকের যাত্রা শুরু। পাঠক কে? ‘মাই ডেজ অ্যামং দ্য ডেডস আর পাস্ট’— স্কলার কবি রবার্ট সাদি যখন স্বগতোক্তির মতো বইয়ের পৃষ্ঠার মগ্নতায় নিজের দিবস-রজনীকে অতীতচারীর সঙ্গে সংলাপ ও ভাব-বিনিময়ে সঁপে দেন, সেখানে পাঠক নিবিষ্ট স্কলার বটে, কিন্তু বহির্বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে যেন তার কিছুটা অনভিপ্রেত ব্যবধান। কিন্তু এই ব্যবধান হয়তো বা জরুরি পাঠকের যথার্থ ভাববিশ্বে। পাঠক কে? সেই যে নদীতীরে শিখগুরু ভগবত-লীলা পাঠে মগ্ন আছেন, শিষ্য রঘুনাথ এসে একজোড়া হিরণ্যবলয় গুরু-চরণে রেখে প্রণাম করলেন। ভ্রূক্ষেপহীন গুরু সহাস্য কুশল জিজ্ঞাসা করে আবার পাঠে রত হলেন। অসাবধানে স্বর্ণবলয়-জোড়ার একখানি নদীতে গড়িয়ে গেলে, উদভ্রান্ত রঘুনাথ এপার-ওপার করেও সন্ধানে বিফল হয়ে সর্বদ্রষ্টা গুরুকেই শুধালেন যদি তিনি বলে দেন নদীর অতলে কোথায় আছে সেই বলয়। পাঠসুখে সামান্য যতি টেনে গুরু উত্তর দিয়েছিলেন— দ্বিতীয় বলয়খানি ছুঁড়ি দিয়া জলে/ গুরু কহিলেন, ‘আছে ওই নদীতলে।‘ শিখগুরু, রবার্ট সাদি বা চারুলতার স্পেস-টাইমে বিস্তর ব্যবধান। তবু পাঠকের মডেল খুঁজতে গেলে এদের প্রত্যেকের থেকেই যদি কিছু কিছু আহোরণ করি! লেখকের তো কালবিভাজন হয়— প্রাচীন লেখক, মধ্যযুগের লেখক, আধুনিক বা উত্তর-আধুনিক লেখক ইত্যাদি। পাঠকের কি অনুরূপ বিভাজন সঙ্গত? তিনশো খ্রিস্টপূর্বাব্দের গ্রিক সম্রাট যদি এখন দাঁতের মাজনের ফেরিওয়ালা, নেপোলিয়ান যদিবা একালের ট্রাকড্রাইভার তবে আজকের আধুনিকোত্তর পাঠক কার উত্তরসূরি কিংবা অপভ্রংশ? শীলভদ্রের নালন্দার স্নাতকের না অতীশ দীপঙ্করের ছাত্রের? পাঠতন্ত্রের প্রবন্ধকার অবশ্য দুজন অত্যাশ্চর্য পুরুষের ব্যাপ্ত পাঠের জগতের বা পাঠতন্ত্রের হদিশ দিয়েছেন, যা সত্যিই বিস্ময়কর— যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ এবং নীরদ চৌধুরী। শুধু কবিতার জন্য অমরত্বকে প্রত্যাখ্যান করনেওয়ালাদের নাম আমরা ঢক্কানিনাদে জেনেছি, কিন্তু জেনেছি কি যে ম্যাথু আর্নল্ডের একখানিমাত্র কবিতার পাঠ করে নীরদচন্দ্র সরকারি চাকরি ছাড়লেন কেবলমাত্র বৈদগ্ধ সাধনার জন্য? পাঠকের বিবর্তন এবং স্বরূপ-সন্ধানে এই যাত্রার পাশাপাশি অর্ধেন্দুর ভাবনা-তটে এসেছে অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যরাজি। তার মধ্যে দুখানি প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি পাঠকের সমস্যা নিয়ে— সাতসমুদ্রের মতো বিপুল পাঠ্যবিষয় এবং পুস্তকরাশির মধ্যে ব্যক্তি-পাঠক তার সীমিত জীবনকালে কীভাবে নির্বাচন করবেন পাঠ্যতালিকা। বইমেলার স্টল থেকে স্টলান্তরে টাইটেলের খোঁজে এসে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায়শই স্টলে আসীন ব্যক্তিটির এক প্রশ্নের সম্মুখীন হই— আপনি ঠিক কী ধরনের বই চাইছেন? যেন এক্ষুণি আমাকে জানাতেই হবে আমি রান্নার বই চাইছি না স্মৃতিকথা, কোয়ান্টাম থিয়োরি না অসীম রায়। বিরক্তি চেপে রেখে আমি বলি, সেটা যদি আমি নিজেই জানতাম! প্রাসঙ্গিক মনে ভেবে হাতে নিই বছর পঁচিশ আগে প্রকাশিত ‘অব্যয়’ পত্রিকার মূল্যবান একখানি সংখ্যা-বিশেষ (জানুয়ারি ১৯৯৭), যেখানে প্রকাশিত ছয়খানি প্রবন্ধই পাঠক নিয়ে। সেই হিসেবে এটি অঘোষিতভাবে বিশেষ পাঠক সংখ্যা। পাঠকের পাঠ-নির্বাচনের সমস্যা নিয়ে দীপেন্দু চক্রবর্তী তাঁর ভাষ্যে অবশ্য বিষয়টির দায় পাঠকের ব্যক্তিগত মানসলোকের বাইরেও অন্যত্র খুঁজেছেন— ‘যখন সাহিত্য ছিল শ্রুতিনির্ভর তখন শ্রোতার সঙ্গে সাহিত্যিকের যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ ছিল এখন তা সম্ভব নয়। এখন লেখক জানেন না তাঁর পাঠক কারা। এখন পাঠক মুখোমুখি হয় সাহিত্যিকের লেখার সঙ্গে, সাহিত্যিক ব্যক্তিটির সঙ্গে নয়। আর পাঠকের চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে বিজ্ঞাপন। মিডিয়া নানানভাবে বলে দেয় কোন বইটি পড়তে হবে, এবং কেন। পাঠক এখন একটা মস্ত কারখানার যন্ত্রাংশ মাত্র। তার আসল স্বাধীনতা নেই। তথাকথিত কমিটেড পাঠককেও অনেক সময় লড়াই দিয়ে হারতে হয় চারপাশের এই মানসিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে।’ দীপেন্দুবাবুর বিশ্লেষণ ক্ষুরধারতুল্য। তবু প্রশ্ন জাগে পাঠক কি তবে সিস্টেমের হাতের পুতুল হয়েই থাকবে? অন্তত তার একাংশকে সিস্টেম ছাড়িয়ে মাথা তোলার স্পর্ধী হতে হবে মেধা ও অন্বেষার আয়ুধে। এই দিকটির সমর্থনে অর্ধেন্দু ব্যয় করেছেন সম্পূর্ণ একটি নিবন্ধ। সেইসঙ্গে পরিশিষ্টে সংযোজিত করেছেন ১০০খানা বইয়ের তালিকা, জন লাবক এবং পেঙ্গুইন-কৃত। তাঁর নিজস্ব নির্মাণে ১০১টি বাংলা বইয়ের তালিকাও আছে। আছে প্রন্থপঞ্জী ও তথ্যসূত্র। বলা নিষ্প্রয়োজন কোনও তালিকাই সর্বজনসম্মত হতে পারে না। তবু এই সংগ্রহ সিরিয়াস পাঠকের কাছে আলোকবর্তিকা-স্বরূপ। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি পাঠকের সার্ভাইভাল বা উদ্বর্তনকে ঘিরে, বিশেষত যখন দরজায় ঘা দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ যাবতীয় প্রাযুক্তিক আয়োজন ও উপচার। পাঠকের সংখ্যা হ্রাসের আশঙ্কায় সংস্কৃতির অবনমন ইত্যাদি। লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ পেয়েছিল পাঠের অধিকার ও একই সঙ্গে উত্তরাধিকার। তবু এই দীর্ঘ ইতিবৃত্ত ছেড়ে আধুনিক ইতিহাসাশ্রয়ী অভিজ্ঞানে স্পষ্ট হয় এদেশে আধুনিক পাঠকের উত্তরাধিকার দুটি শতাব্দীর। অর্থাৎ এদেশে ছাপাখানার প্রচলনের সঙ্গেই। তার আগে পুথি-পাণ্ডূলিপির কালে সাহিত্যকলা ছিল জনসভার নয়, রাজসভার সাহিত্য। ‘জনসভার সাহিত্য’-এর পৃষ্ঠায় বিনয় ঘোষ সেই রেশ টেনে বলেছিলেন সাহিত্য একালেও সেই ঈপ্সিত জনসভায় পৌঁছতে পারেনি, এই সংসদীয় গণতন্ত্র বা মুদ্রণের আধুনিকতম উত্তরণেও নয়। পাঠকবৃত্তের সীমানা ছিল রাজবৃত্তের চৌহদ্দিকে ঘিরে মূলত। ছাপাখানার আগের যুগে কজন পড়েছিলেন ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’ বা ‘অন্নদামঙ্গল’? বিনয় ঘোষের মতে মুদ্রণযন্ত্রই স্বরস্বতীর মুক্তিদাতা, গণতান্ত্রিক চেতনার প্রথম স্তর। সেই অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে সাদা কাগজে কালির লিপি দিয়ে হুড়মুড় করে একাল এসে দাঁড়িয়েছিল সেকালকে আড়াল করে। নিঃশব্দ, ধীর কিন্তু স্থিত প্রজ্ঞায়, হীরামালিনীর ছলকে ওঠা বাগবিন্যাস ও ভঙ্গি আর কি রুদ্ধ থাকতে পারে শুধু কৃষ্ণনগর রাজবাটির সিন্দুকে? বঙ্কিমের সমসাময়িক পাঠককে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। সে এগিয়েছে আস্থাশীল পদক্ষেপে। আজ তবে পাঠকের ক্রমবিলীয়মানতার চিহ্ন কি প্রকট! “আজ কি ঘুচিল চিহ্ন তাহার/ উঠিল পথের তৃণ”। পাশ্চাত্য জীবনধারায় বীতশ্রদ্ধ স্যামুয়েল জনসন বলেছিলেন, এ প্রজন্মের মানসিক ব্যাধি হচ্ছে পাঠে অসহিষ্ণুতা। এই শঙ্কাকে কেন্দ্রে রেখে লেখক অর্ধেন্দু নির্মাণ করেছেন এক দীর্ঘ পরিসর যেখানে পাঠ ও পাঠকের সঙ্কটের লেখচিত্র একালের প্রযুক্তি-বিন্যাসের ওপর সমাপতিত। পাঠকের ভাববিশ্বের সন্ধানকে আপনি যদি সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আদিকল্প এবং বিবর্তনের চালচিত্রে দেখতে চান, তবে ঠিক এইসময়ের দার্ঢ্য আলোচনার ভুবনে অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠতন্ত্রের তত্ত্বতালাশ ঝাঁকুনি দেবে, আপনার বোধকে সহায়তা দেবে।

পাঠতন্ত্র
অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
ঋতাক্ষর
নভেম্বর ২০২১
১৩৫ পৃষ্ঠা
২৫০ টাকা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...