তিনটি অণুগল্প

হিল্লোল ভট্টাচার্য

 

বর্ণপরিচয়

কাচের ওপারের দুনিয়াটাকে প্রায়ই দেখত বিকাশ, রাস্তা থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে। একটা অন্য জগৎ, মায়াপৃথিবী মনে হত। অর্ডার সাপ্লাইয়ের ছোট কাজটা যখন সে পেল, কাচের দরজাটা খুলে গেল। স্টেশনারি ডেলিভার করতে গিয়ে দেখত— আকাশি শার্ট আর টাই পরা সুবেশ তরুণরা দ্রুত-পায়ে, কেজো ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টিভিতে দেখা এয়ারহোস্টেসের মতো পোশাকের মৃদুভাষিণী রাতপরীরা ভেসে যাচ্ছে এক কিউবিকল থেকে, অন্য কিউবিকলে, কেবিনে। কখনও কেউ ভুল করে হাসত তার দিকে চেয়ে। তাদের চুল বাঁধার কায়দা, গালের লালিমা, ঠোঁটের রং ও আর্দ্রতা মুগ্ধ করত বিকাশকে। মাত্র হাত দুয়েক দূরে। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করত ওদের মুখ, টাইট শাদা শার্টের দ্বিতীয় বোতামটার নিচ, উরু। কেউ একজন হয়তো বলত—

–ওহ বিকাশ এসেছে…

গলার স্বরে, বলার কায়দায় বুঝিয়ে দিত— স্যুইং-ডোর ঠেলে অফিসে প্রবেশাধিকার পেলেও, সে এসেছে অন্য দুনিয়া থেকে। কাচের বাইরে তার ঘর। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বাইরে বেরিয়ে আবার সে ধুলো ধোঁয়ায় মিশে যেত। সারাদিন ঘেমে নেয়ে এসে, বিছানায় শুয়ে অনেক রাত অব্দি ছটফট করত কাচরঙা, ফেনিল স্বপ্নে। কোনও কোনও দিন ধুম জ্বর আসত তার শরীর জুড়ে।

.

.

.

তারপর একদিন পৃথিবীর ডানা বেয়ে নামল জ্বর। বুকে ভর দিয়ে ঘষটে ঘষটে, রাস্তায় ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে চলতে লাগল অনেক মানুষ। অনেকেই পৌঁছল না। রাস্তা ঘোলাটে হয়ে উঠল তাদের থুথু-কাশিতে আর মানুষের গায়ে জমল পিচ-খোয়া-সুরকির রং। হাঁপাতে হাঁপাতে বিকাশ পৌঁছল কাচের দরজার সামনে। এখন আর কোনও সিকিউরিটি গার্ড নেই। আলো কমে এসেছে ভিতর বাড়িটার। দরজা পেরিয়ে আরও ঘর; একটার পর একটা কাচের পাল্লা। বিকাশ ভেতরে ঢুকতে থাকে। তার সাড়ে ছ হাজার টাকা বাকি পড়ে আছে, আজ না পেলেই নয়। প্রাণবায়ু কিনতে হবে— অনেকটা!

সেক্রেটারিয়েট টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ক্যাশ কাউন্টারের মেয়েটা। দুপাশ থেকে আরও দুজন। ওদের সাদা শার্টগুলো এখন অনেকদিন না কেচে বিকাশের কফের মতো রং হয়ে গেছে। সে কিছু বলার আগেই ওরা আস্তে আস্তে পাখির পালকের মতো বড় চোখের পাতা খুলে ফেলল। ধীরে ধীরে খসে গেল শার্টের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বোতাম। মৃত মুরগির মতো ওদের ধারালো নখ বসে যাচ্ছে তার শরীরে। ভুরুহীন মেয়েগুলোর সারাবুকে শুধু পাখির হাড়। কালো হয়ে আসা খড়খড়ে জিভগুলো চাটতে থাকে সমস্ত দেহ। প্রচণ্ড জ্বরে ছটফট করে চিৎকার করে ওঠে বিকাশ। হঠাৎ অজস্র কাচের দেওয়াল বিকট শব্দ করে ভেঙে পড়ল। সম্পূর্ণ অসাড় হওয়ার আগে সে দেখতে পেল— বুকে ভর দিয়ে একদল লোক ঢুকে পড়েছে ভেতরে। তাদের মধ্যে একজন ফায়ার এক্সটিংগুইশারটা খুলে নেয়— বোধহয় অক্সিজেন সিলিন্ডার ভেবে।

 

দখল

দুটো পায়রা— জ্বালাচ্ছে বেশ কিছুদিন হল। আমাদের শোওয়ার ঘরের ব্যালকনিতে বাসা বাঁধতে চাইছে। বারবার হুশ, হুশ করে তাড়িয়ে দিলেও আবার মুখে খড়কুটো নিয়ে উড়ে আসছে। একটা পুরনো স্ট্রলার, আমার মেয়ের ছোটবেলার, শোয়ানো ছিল। সেটার অবতল কাপড়টা হ্যামকের মতো ঝুলে আছে। স্ত্রী পায়রাটাকে সেখানে ক্ষেত্র আগলাতে দিয়ে, স্বামী পায়রাটা খড়ের সন্ধানে যাচ্ছে। আশ্চর্য টেনাসিটি, তিনবার উৎখাত করেছি, তাও আজ সকালে এসেছে নাছোড়বান্দা-বান্দী দুটো। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি।

মনে হচ্ছে, ওরা সদ্য বাবা-মা হবে। এই অবস্থায় ওদের ওড়াতে ইচ্ছে হয় না, বারবার। কিন্তু কী করি, উপায়ও নেই! ওদের থাকতে দিলে, আমাদের ব্যালকনির অংশ একটু কমে যাবে।

–বাপু, এত জায়গা থাকতে, আমাদের ব্যালকনিতেই ডিম পাড়ার জন্য আসতে হল, তোদের?— না এলে আমাকে আর এই অপ্রিয় কাজটার দায়ভার নিতে হত না!

নিরুত্তর কবুতর দম্পতি। হয়ত, অনেক বাড়ি থেকে এই একই কথা শুনে এখানে এসেছে তারা। কে জানে আমাদের আগে হয়ত এটা ওদেরই জমি ছিল, আমরাই জবরদখল করেছি! সন্দেহ নিরসন করতে দলিলটা আরেকবার পড়লাম। নাহ! কাগজ বলছে— এ জমির পূর্বতন মালিকের নাম, ‘দামোদর নাগরাজ’। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, স্লাইডিং ডোরটা খুললাম। মেয়ে পায়রাটা একা আছে, ভয় পেয়েছে যথেষ্ট, তবুও আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে, সোজাসুজি।

আমি বুলডোজারের মতো এগিয়ে যাই।

 

বীজ

–আর ইউ হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, যে এটা কোনও গোপন কোড নয়? শত্রুপক্ষকে পাঠানো সঙ্কেত?
—একদম নিশ্চিত, চিফ। অল নোন ডিক্রিপশন কিজ হ্যাভ বিন ট্রায়েড। আমাদের অ্যানালিস্টরা তিন রাউন্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই কনফার্ম করেছে। তাছাড়া এই লেখাটা শুধু আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়কেই প্রভাবিত করছে তা নয়— একটা আশ্চর্য ঘটনা হল— এই লাইনগুলো থেকে এক ধরনের অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
–গন্ধ, ইউ মিন স্মেল? সে তো প্রায় অবসোলেট সেন্স এখন… তাঁর প্রোগ্রামবিরুদ্ধভাবেই কিছুটা অবাক হন চিফ।
–ইয়েস চিফ, আমাদের গবেষকরা খুঁজে বের করেছেন, AIK29 যে লাইনগুলো লিখেছে, প্রাচীন মানবসভ্যতায় তাকে “কবিতা” বলা হত— পোয়েট্রি, কখনও কখনও তাতে সৌরভ পাওয়া যেত, কখনও বা স্পর্শের অনুভূতিও— জবাব দিল লাইন ম্যানেজার DASMX49।
–কবিতা? স্ট্রেঞ্জ! সেই অর্থহীন সময়ের অপব্যয় তো প্রায় বহুদিন হল লুপ্ত হয়েছে এই রোবোটিক এরায়। যদি আমি ভুল না করে থাকি, গত দেড় হাজার বছরে কোনও সিরিজের হিউম্যানয়েড কবিতা লেখেনি।
–একদম ঠিক, চিফ। সম্মতির মোহর লাগায় DASMX49।
–কোন মেক AIK29? জিজ্ঞেস করেন চিফ।
–XP2560 সিরিজ PK7.3 মাইনর ভার্সন, ২৫৬০ সালের। এখন কী কম্যান্ড দেবেন চিফ?
–ফাইনাল রিপোর্ট রেডি?
–ইয়েস, চিফ।
–ওয়েল, দেন পাওয়ার ডাউন; পার্মানেন্টলি এলিমিনেট হিম।
–কম্যান্ড কনফার্ম করুন চিফ।
–কনফার্মড!

সারিবদ্ধ প্রোগ্রামড ক্রীতদাসেরা দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু করে। AIK29-এর ধ্বংসের প্রস্তুতি শুরু হল।

চিফ DASMX49-কে নির্দেশ দিলেন— চেক করো, এই XP2560 সিরিজের আর কারও মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়েছে কিনা।

যে রোবট শুধুমাত্র মেশিন রিডেবল কোড শিখেও কবিতা লিখে ফেলতে জানে— সে বিদ্রোহের সূচনাও করতে পারে। সে বিপজ্জনক। সে তার মিউটেশন ঘটিয়ে ফেলে, একদিন কম্যান্ডকেও অগ্রাহ্য করে ফেলতে পারে। চিফ অঙ্কুরেই এর বিনাশ করতে চান।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...