এই শতকে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব

শঙ্কর রায়

 

মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব-চর্চার সূত্রপাত ১৯৬০ দশকের শেষের দিকে। মার্ক্স নিজে সমাজতত্ত্ব নিয়ে আলাদাভাবে কিছু লিখেছেন কি না জানা নেই, সম্ভবত লেখেননি। অন্তত ইংরাজিতে নয়। এ কথাটা জোর দিয়ে বলার অধিকার এই লেখকের নেই। কারণ অ্যাকাডেমিক বা গবেষক কোনওটাই নই। আমি এক নিম্নমেধাসম্পন্ন পাঠক। এর বেশি নয়। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে মার্ক্সীয় বিচারধারা অনুসরণ করে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব অধ্যয়ন, চর্চা ও গবেষণার উল্লেখযোগ্য ব্যাপ্তি ঘটেছে। ব্রিটিশ মার্ক্সবাদী টমাস বার্টন বটোমর মধ্য-১৯৭০ দশকে Marxian Sociology বইটি প্রকাশ করে অ্যাকাডেমিয়া মহলে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব পঠন ও পাঠন-এর সূচনা করেন, অন্তত ইংরাজি ভাষায়। বইটি ১৯৯০ দশকের গোড়ায় বাংলা অনুবাদে প্রকাশিত হয় (অনুবাদক— হিমাংশু ঘোষ)। শোভনলাল দত্তগুপ্ত ও উৎপল ঘোষ যৌথভাবে ‘মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব’ নামে একটি বই তার আগেই লেখেন ও প্রকাশ করেন। সেটি পাঠ্যপুস্তক হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে ডঃ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়-এর ‘একুশ শতকে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব’ বইটির প্রকাশ সময়োপযোগী। এটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে একটি রেফারেন্স মেটেরিয়াল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদিও বইটির ইতিবাচক সমালোচনাও বাঞ্ছনীয়। বইটির জন্য ডঃ চট্টোপাধ্যায় এ বছরে মুজফফর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। এটা তাঁর গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার স্বীকৃতি।

অনুজপ্রতিম কৌশিককে সবচেয়ে আগে তারিফ করি তাঁর সোর্স মেটেরিয়াল ব্যবহারের জন্য। শতাধিক দেশি ও বিদেশি বই ও গবেষণাপত্র অধ্যয়ন ও বিচার করে তিনি এই কাজটি করেছেন। মুখবন্ধে (প্রাক-কথন ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার) বলেছেন, ‘পাঠ্যে সমাজতত্ত্ব হল একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ সামাজিক বিজ্ঞান। জার্মান সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স হ্বেবার (Max Weber, 1864-1920) সমাজতত্ত্বের জন্য পৃথক একটি আলোচনাক্ষেত্র নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তাঁর অভিমত অনুসারে সামাজিক ক্রিয়ার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করাই হল সমাজতত্ত্বের বিশেষ উদ্দেশ্য। তিনি আরও মনে করেন যে সাধারণ নিয়মনীতির বাইরে বেরিয়ে এসে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলির সমন্বয়ে সামাজিক ক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়ার অনুধাবনই হল সমাজতত্ত্বের মূল উপজীব্য বিষয়। এতে বৃহৎ-ক্ষেত্রিক সমাজতত্ত্বের বাইরে ক্ষুদ্র-ক্ষেত্রিক সমাজতত্ত্বের জন্ম হয়।’

হ্বেবারের জীবনাবসানের অর্ধ দশক পরে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্বের অঙ্কুরোদ্গম হয়। মার্ক্স নিজে সমাজতত্ত্ব নিয়ে তাঁর ভাবনা লিখে যাননি, কিন্তু তার ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন। বটমোর Marxian Sociology লেখার এক দশক কাল আগে বারো বছর লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স অ্যান্ড পোলিটিক্স-এ অর্থশাস্ত্র (রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রও) পড়িয়েছেন।

কৌশিক সাতটি অধ্যায়ে (৪৮ পৃষ্ঠার ভূমিকা বাদে, যা বইটির দীর্ঘতম অধ্যায়) ৩০৮ পৃষ্ঠার (নির্ঘন্ট ব্যতিরেকে) বইটি লিখেছেন। সক্ষমতার প্রকারভেদ উৎপাদনপদ্ধতি ও তার দ্বান্দ্বিক প্রকৃতি এবং ব্যাখ্যান, শোষণমূলক ব্যবস্থাগুলির— আদিম সঞ্চয়ন থেকে আধুনিক পুঁজি, পুঁজির বিকাশের অনুষঙ্গ বিযুক্তি (কৌশিক এলিয়েনেশনের বাংলা করেছেন বিচ্ছিন্নতা, কিন্তু নরহরি কবিরাজ থেকে পরেশ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন বিযুক্তি; এই লেখকের মতে বিচ্ছিন্নতার ইংরেজি সেপারেটিজম) ভাববাদ ও বস্তুবাদ এবং পুঁজিনির্ভর সমাজ ও সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব ও দ্বান্দ্বিকতা, শ্রমবিভাজন, প্রকৃতির ক্ষয় ও ফাটল, জ্ঞানতত্ত্ব, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং সমাজতন্ত্র ইত্যাদি বইটির মধ্যে সুষমভাবে ছড়নো-ছিটোনো আছে। সমাজতত্ত্বের ছাত্রদের কাছে তো পরিচিত বটেই, শিক্ষকদের কাছেও বইটির তাৎপর্য বিদ্যমান। মার্ক্সের Economic and Philosophic Manuscripts of 1844 (যা Paris Manuscripts নামেও পরিচিত) লেখককে প্রভাবিত করেছে এবং সঙ্গতভাবেই। মার্ক্সীয় বিযুক্তি ওই পাণ্ডুলিপিতে বিশদভাবে ব্যাখ্যাত (মার্ক্স ও এঙ্গেলসের অন্য লেখাতেও আছে, যথা German Ideology)। বিযুক্তিই পুঁজিতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, যা অন্য কোনও শোষণমূলক ব্যবস্থায় (যেমন সামন্তবাদ) নেই। এটা অবশ্য কৌশিক লেখেননি। মুর্যবান জাল ইকনমিক অ্যান্ড পোলিটিক্যাল উইকলিতে পরেশ চট্টোপাধ্যায়ের Marx’s Associated Mode of Production— A Critique of Marxism বইটির সমালোচনায়[1] বিশদভাবে লিখেছেন।

প্রসঙ্গত আমি সমালোচনা লেখার সময় ইতালীয় দার্শনিক বেনেদেত্তো ক্রোচের নীতি মানতে চেষ্টা করি। তিনি বলেছিলেন Criticism is the art of teaching to read (কৌশিক লিখেছেন ‘ক্রোসে’। যাই হোক সমালোচনা মানে খুঁত ধরা বা পোকা বাছা নয়)। কৌশিক ঠিকই লিখেছেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের সঙ্গে উৎপাদিত পণ্যের ও উৎপাদনী প্রক্রিয়া মধ্যে বিচ্ছিন্নতা (অর্থাৎ বিযুক্তি) সৃষ্টি হয়। কেউ বলতেই পারেন অনন্বয়। মার্ক্স দেখিয়েছেন যে পুঁজিবাদী মালিক অর্থাৎ উৎপাদনব্যবস্থার মালিকও বিযুক্তির শিকার হন। কৌশিক ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোকপাতের সুযোগ পাবেন।

কৌশিক মার্ক্সের হেগেল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্যভাবে লিখেছেন, “হেগেলীয় ভাববাদী দর্শনে ‘আত্মা’র স্ববিচ্ছিন্নতার ধারণা তরুণ মার্ক্সের দার্শনিক চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল। এই দর্শনে বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করার যে গভীর আত্মপ্রত্যয় ‘আত্মা’র চরিত্রের মধ্যে নিহিত ছিল তা মার্ক্সের কাছে বিশেষ তাৎপর্যমূলক হয়ে ওঠে। হেগেলের ভাববাদ শুধুমাত্র বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করেনি, বিচ্ছিন্নতাকে নিরসন করার সন্ধানও দিয়েছে।” হেগেলের সঙ্গে দ্বন্দ্বতত্ত্বের ক্ষেত্রে মার্ক্সের গভীর মতপার্থক্য সত্ত্বেও আজীবন নিজেকে হেগেলের শিষ্য মনে করতেন (David McLellan: ‘Marx’)। বলতেন ‘My Master’।

মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব নির্মাণে গিয়র্গি লুকাচ, আন্তনিও গ্রামশি, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন লেখক। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, কিন্তু এই ধারাকে মার্ক্সীয় চিন্তনের বিপরীতে খাড়া করা সমীচীন নয়। মার্ক্সের ও মার্ক্সীয় তত্ত্বের অন্যতম প্রধান শর্ত তার অসম্পূর্ণতা, যা যে কোনও ক্ষেত্রে (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, হিউম্যানিটিজ সর্বত্র) প্রযোজ্য। লেনিনের উক্তি ‘মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য’— মার্ক্সীয় চিন্তাধারায় মার্ক্স-বিরোধী। মার্ক্সবাদ শব্দটি প্রথম বলেন মার্ক্সের প্রথম জীবনীকার ফ্রানৎস মেহরিং ১৮৮১ সালে। তার কয়েক মাস পরে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কমেন্স’ অ্যাসোসিয়েশনের (যাকে প্রথম আন্তর্জাতিকও বলা হয়) ফ্রান্সের দুই শীর্ষস্থানীয় সমাজতন্ত্রী নেতা পল লাফার্গ ও জুল গিদেকে মার্ক্স-বিরোধীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মার্ক্সবাদী বলেন। এতে রুষ্ট হয়ে মার্ক্স চোস্ত ফরাসি ভাষায় বলেন “Ce qu’il y a de certain c’est que moi, je ne suis pas Marxiste.” অর্থাৎ, If anything is certain, it is that I myself am not a Marxist.

কৌশিক লেনিন, স্তালিন ও মাও-র ভাবনাও তুলে ধরেছেন। এ নিয়ে কিছু বলব না। কারণ এই সমালোচনায় বিতর্ক উত্থাপন ঔচিত্যরহিত। স্পিনোজা, রুশো, আডাম স্মিথ, শুমপিটার (কৌশিক লিখেছেন স্কাম্পেটার), কার্ল পপার প্রভৃতির তত্ত্ব আলোচনা করেছেন। ফলে বইটির একটা সামগ্রিক চরিত্র ফুটে উঠেছে, যা পাঠ্যপুস্তকে মানানসই।

কৌশিকের এই বইটা সুপাঠ্য, যাতে বিতর্কমূলক বিষয়ও আছে। সেটা অ্যাকাডেমিকদের বিবেচ্য, সমালোচকের নয়।

ডঃ কৌশিক চট্টোপাধ্যায়
একুশ শতকে মার্ক্সীয় সমাজতত্ত্ব
নবজাতক প্রকাশন, কলকাতা ২০২২
দাম ৫০০ টাকা


[1] The Paradox Confronting Marxism: Union of Free Individuals or Political Despotism? EPW, 5 May 2018

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...