বিশ শতকে জাপানি বিজ্ঞান: হাই-টেক সামুরাই

আশীষ লাহিড়ী

 



বিজ্ঞানের দর্শন ও ইতিহাসের গবেষক, প্রবন্ধকার, অনুবাদক

 

 

 

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপানের অস্বাভাবিক দ্রুত বৈজ্ঞানিক সাফল্যের কারণ বোঝাতে গিয়ে অনেক সময় “হাই-টেক সামুরাই” চিত্রকল্পটি প্রক্ষেপ করা হয়। সামুরাইদের সামন্ততান্ত্রিক জাপানের ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় বললে খুব ভুল হবে না। তফাত এই, এইসব জাপানি ক্ষত্রিয়রা আবার প্রাচীনকালের ভারতীয় ব্রাহ্মণদের মতোই বিদ্যাচর্চায় একাগ্র হতেন। এঁদের গুণাবলি আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক জাপানের একটা সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে গণ্য হল, আর তার সঙ্গে যুক্ত হল অতি-অগ্রসর প্রযুক্তির আত্মীকরণ, তাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চা ছাড়া যার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ বজায় রাখা যায় না। হিদেকি ইয়ুকাওয়া (১৯০৭-১৯৮১), শিনিচিরো তোমোনাগা (১৯০৬-১৯৭৯), শৈওচি সাকাতা (১৯১১-১৯৭০) আর মিৎসুও তাকেতানি (১৯১১-২০০০) জাপানি পদার্থবিজ্ঞান জগতের চার দিকপাল। এখানে আমরা বিশেষ করে সাকাতা আর তাকেতানি সম্বন্ধে একটু আলোচনা করে প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে বোঝবার চেষ্টা করব।

 

শৈওচি সাকাতা

শৈওচি সাকাতা-র জন্ম ১৯১১ সালের ১৮ জানুয়ারি, এক শিক্ষিত সরকারি উচ্চ পদাধিকারী পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন খোদ জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সচিব। সাকাতার ছোটবেলা কেটেছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণে। খুব ভাল ভাল শিক্ষালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পান, পড়াশোনাতেও খুবই ভাল ছিলেন। শুধু পদার্থবিজ্ঞান নয়, নানা বিষয়ে যুক্তিবাদী ও বস্তুবাদী বিশ্লেষণে ছোটবেলা থেকেই তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল, নইলে আঠেরো বছর বয়সে এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে এঙ্গেল্‌সের ডায়ালেক্‌টিক্‌স অব নেচার জাপানিতে অনুবাদ করবেন কেন? পরে যখন কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হলেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রগতিবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হল।

শৈওচি সাকাতা

কিয়োতো থেকে স্নাতক হবার পর ১৯৩০ সালে তিনি তোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভরতি হলেন।  কিন্তু সেখানে বেশিদিন না থেকে সাকাতা কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়েই আবার ফিরে এলেন। ১৯৩১এ পরমাণুকণা বিজ্ঞানকে তাঁর বিষয় হিসেবে বেছে নিলেন। ১৯৩৩-এ পাশ করে বেরোলেন। ঠিক তার চার বছর আগে অন্য দুই বিখ্যাত জাপানি পদার্থবিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়া আর শিনিচিরো তোমোনাগা-ও ওইখান থেকেই পাশ করে বেরিয়েছিলেন। এই তিনজনের মধ্যে গবেষণাসূত্রে একটা বন্ধন গড়ে উঠেছিল, যদিও এঁদের সকলের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি হুবহু এক ছিল না।

অবশেষে পদার্থবিজ্ঞানীদের জাপানি মক্কায়, অর্থাৎ জাপানি পদার্থবিজ্ঞানীদের পিতামহ ভীষ্ম ইয়োশিও নিশিনা (১৮৯০-১৯৫১)-র ল্যাবরেটরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেলেন সাকাতা, প্রথমে গবেষক ছাত্র হিসেবে, পরে ১৯৩৪ মার্চ অবধি রিসার্চ অ্যাসোশিয়েট হয়ে। তোমোনাগা আর মিৎসুও তাকেতানির সঙ্গে আলাপ ও বন্ধুত্ব হল। তাকেতানির সঙ্গে এই বন্ধুত্ব আজীবন অক্ষুণ্ণ ছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে সাকাতা চলে এলেন ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইউকাওয়ার সঙ্গে মেসন কণা এবং আরও কিছু বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন। ইউকাওয়া যখন কিয়োতোয় চলে এলেন, সাকাতাও সেখানে একটা সাময়িক প্রভাষকের চাকরি নিলেন। পাশাপাশি ওসাকায় ক্লাস নেওয়া আগের মতোই চলল।

১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধল। জার্মানি, ইতালির সঙ্গে জাপান যোগ দিল অক্ষশক্তি পক্ষে। ১৯৪০-এর ফেব্রুয়ারিতে সাকাতা জাতীয় গবেষণা পরিষদের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হলেন। সেই প্রথম বিশুদ্ধ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা ছাড়া বিজ্ঞান-পলিসির জগতের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হল। ১৯৪২-এর এপ্রিলে ডক্টরেট পেলেন, তারপরই তাঁর ‘দুই-মেসন তত্ত্ব’ পেশ করলেন। ততদিনে দ্বিতীয় যুদ্ধের দামামা প্রচণ্ড জোরে বাজতে আরম্ভ করে দিয়েছে। যুদ্ধের কাজে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের লাগানোর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। খুব সম্ভব তারই অঙ্গ হিসেবে সাকাতাকে কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক গবেষণা সংস্থার অস্থায়ী সদস্য করা হল।

১৯৪৫-এর মার্চ থেকে বোমাবর্ষণের মাত্রা এত বাড়ল যে সাকাতার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা ফুজি পাহাড়ের কাছে এক নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। বন্ধু তাকেতানি তাঁকে ডেকে নিলেন ফুশিমি গণবিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়াবার জন্য। এই সময়ে অবসরকালে তিনি পড়েন জে ডি বার্নাল-এর যুগান্তকারী বই দ্য সোশ্যাল ফাংশান অব সায়েন্স। মার্কসবাদের দিকে তাঁর ঝোঁক ছাত্রকাল থেকেই ছিল। এইবার আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে মিলে মার্কসবাদী বিজ্ঞানী বার্নাল-এর বইটি জাপানিতে অনুবাদ করার কজে হাত দিলেন। এই বইটি তাঁর দিগ্‌দর্শন ঘটাল। বার্নাল বিজ্ঞানকে কমিউনিজমের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন:

“কর্মপ্রয়াসের দিক থেকে বিবেচনা করলে, বিজ্ঞানে আর কমিউনিজমে কোনও তফাত নেই। বিজ্ঞানে লোকে নিজের ব্যক্তিগত কৃতি বিসর্জন না-দিয়ে নিজেকে সচেতনভাবে একটি সর্বজনীন উদ্দেশ্যের অধীন করতে শিখেছে। … বিজ্ঞানে লোকে একে অপরের সঙ্গে হাত মেলায় এ কারণে নয় যে উচ্চতন কর্তৃপক্ষ তাদের হাত মেলাতে বাধ্য করেছে, কিংবা তারা কোনও নেতাকে বেছে নিয়ে তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছে; বিজ্ঞানে লোকে একে অপরের সঙ্গে হাত মেলায় এ কারণে যে, তারা উপলব্ধি করে, এইরকম সচেতনভাবে হাত মেলালে তবেই প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। হুকুম নয়, পরামর্শই হল কর্মের নিয়ন্তা।”[1]

এইসব কথা যেন আমলাদের ওপর বিজ্ঞানীদের কর্তৃত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার কাজে লাগল। বৃহৎ পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত  জাপানে প্রশ্ন উঠল: পুঁজিতন্ত্রর সঙ্গে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে কি মেলানো যায়? বার্নালের “ল্যাবরেটরি গণতন্ত্র”-র ধারণাটা সাকাতার খুব পছন্দ হল, যা ব্যক্তির নির্দেশনাকে গণতান্ত্রিক “নিয়ন্ত্রণে”র সঙ্গে মেলাল। সাকাতার মনে হল জাপানের মতো সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ-তাড়িত পুঁজিতান্ত্রিক দেশে সামুরাই ভাবাহিত অধ্যাপকরা যেভাবে গবেষকদের ওপর সর্বময় আধিপত্য বিস্তার করেন, তার এক প্রতিষেধক বার্নালের এই ধারণা। বিজ্ঞানকর্মীদের কাজের স্বাধীনতা আদায়ের জন্য সক্রিয় হলেন সাকাতা।

কিন্তু শুধু উচ্চবর্গের পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্যই গণতন্ত্র দাবি করেই ক্ষান্ত না হয়ে অন্য বহুতর গোষ্ঠীকে তিনি এর আওতায় আনতে উদ্‌গ্রীব হলেন। বার্নাল যেন তাঁর জন্য এক কর্মসূচি রচে দিলেন, যে-কর্মসূচিতে মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণা ফলিত গবেষণার চেয়ে উচ্চ স্থান পাবে, আর সেই সঙ্গে থাকবে এমন এক নিয়ামক নীতি যা বিজ্ঞানের সম্ভাব্য ক্ষতিকর ফলগুলির ওপর নজরদারি জারি রাখবে। শুধু তাই নয়, তাঁর গবেষণাকর্মেও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ পড়েছিল। ১৯৬৪ সালে তাঁর গবেষণাপত্র পড়ে উল্লসিত হয়েছিলেন খোদ মাও সেতুং: “সাকাতা বলছেন, মৌল কণাগুলি অবিভাজ্য, কিন্তু ইলেকট্রন বিভাজ্য। এ কথা বলে তিনি তো দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অবস্থানই গ্রহণ করছেন।”[2]

 

সাকাতা মডেল: নোবেল অবহেলা

নিল্‌স বোর এবং সি মুলার-এর নিমন্ত্রণে সাকাতা ১৯৫৪ সালের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নিল্‌স বোর-এর ইনসস্টিউটে কাজ করেন। তরুণ কয়েকজন জাপানি পদার্থবিজ্ঞানীর কাজের পরিচয় দেওয়ার উপলক্ষে তিনি নাকানো এবং নিশিজিমা আবিষ্কৃত পরীক্ষালব্ধ একটি সূত্রের কথা বলেন। এঁরা কাজ করেছিলেন জোরালো আন্তঃক্রিয়া-যুক্ত কণার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে। বর্তমানে এটি নাকানো-নিশিজিমা-জেলমান সূত্র নামে পরিচিত। দেশে ফিরে সাকাতা এই বিষয়টির অন্তর্লীন পদার্থবৈজ্ঞানিক ক্রিয়ার রহস্য উদঘাটনের কাজে হাত দিলেন। তারই পরিণতি প্রসিদ্ধ ‘সাকাতা মডেল’। তিনি দেখালেন, জোরালো আন্তঃক্রিয়াযুক্ত কণাগুলি গঠিত হয় প্রোটন, নিউট্রন আর ল্যামডা-ব্যারিয়ন নামক কতকগুলি “ইষ্টকখণ্ড” দ্বারা। আর এই কণাগুলির ধর্ম যথাক্রমে আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক এবং স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক-এর সদৃশ। এই সাকাতা মডেলের সূত্র ধরেই মারে জেল-মান আর জর্জ জোয়াইগ তাঁদের কোয়ার্ক মডেলটি তৈরি করেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে সাকাতা স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর ১৯৫৬ সালের এই “সাকাতা মডেলে”র জন্য।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ১৯৬৯ সালে যখন এর জন্য নোবেল প্রাইজ দেওয়া হল, তখন সেটা পেলেন শুধু জেল-মান আর জোয়াইগ। পরে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল কমিটির ১৯৪৫-৭২ পর্বের সদস্য আইভার ওয়ালের প্রকাশ্যে এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তারও একটা পটভূমি আছে। ১৯৭০-এর সেপ্টেম্বরে হিদেকি ইয়ুকাওয়া ওয়ালেরকে জানান যে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়নপত্র লেখবার সময়েই সাকাতা অসুস্থ ছিলেন; এখন সে-অসুস্থতা খুবই বেড়েছে। এর তিন সপ্তাহ পরে সাকাতার মৃত্যু হয়। ইয়ুকাওয়া সে-খবর জানিয়ে ওয়ালেরকে লেখেন, পুরস্কারটা পেলে মৃত্যুপথযাত্রী সাকাতা প্রভূত সম্মান ও উৎসাহ পেতে পারতেন। ইয়ুকাওয়া সমেত বেশ কয়েকজন অগ্রণী জাপানি কণা-পদার্থবিজ্ঞানী লেখেন, সাকাতার কাজের গুণমান সম্পর্কে নোবেল কমিটির কী ধারণা সেটুকু জানতে পারলেও তাঁরা কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা পাবেন। এরই উত্তরে ওয়ালের প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন।

 

মিৎসুও তাকেতানি: কারাকপাট-ভাঙা বিজ্ঞান

সাকাতার সমবয়সী প্রিয়সখা মিৎসুও তাকেতানি (১৯১১-২০০০)-র পারিবারিক পরিমণ্ডল ছিল একেবারেই অন্যরকম। তাঁর বাবা একটি কয়লাখনিতে প্রযুক্তিবিদের কাজ করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সে-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চিনের তাইওয়ান-এর একটি কয়লাখনিতে চাকরি নিতে বাধ্য হলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়া শেষ-করা শিশু তাকেতানি সেখানে একটি জাপানি বিদ্যালয়ে ভরতি হলেন। তাকেতানির বাবা ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’, ‘সচিত্র বিজ্ঞান’ জাতীয় নানান জনবোধ্য বিজ্ঞানপত্রিকা কিনে দিতেন সন্তানদের। বালক তাকেতানির মনে এগুলির জোরালো ছাপ পড়েছিল। আর সেই সঙ্গে আরও একটা বিষয় তার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল: সে হচ্ছে, চিনের মানুষের ওপর জাপানি উপনিবেশবাদের অন্যায় উৎপীড়ন।

বাবা-মা দাদা রয়ে গেলেন তাইওয়ানে। তাকেতানি ফিরে এলেন জাপানে। কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে ভূ-পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসে ভরতি হলেন। একই সঙ্গে আর্টস বিভাগে দর্শনের ক্লাসগুলিতেও যেতে থাকেন। কিয়োতোয় তাঁর বন্ধুত্ব হল রসায়ন আর গণিত বিভাগের দুটি ছেলের সঙ্গে, যারা তোকিও-ভিত্তিক ‘বস্তুবাদ চর্চা সমাজ’-এর দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এঙ্গেল্‌সের প্রকৃতির দ্বন্দ্বতত্ত্ব তাদের নিত্যপাঠ্য ছিল। ১৯৩৩ সালে, তাকেতানি তখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ইয়ুকিতোকি তাকিকাওয়া-কে চাকরি থেকে ছাঁটাই করার নির্দেশ এল সরকারি স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সরকারি খরবদারির বিরুদ্ধে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা প্রতিবাদে সরব হল, কিন্তু আইন বিভাগ ছাড়া অন্য সব বিভাগের মাস্টারমশাইরা চুপ করে রইলেন। ঘটানাটা তাকেতানির মনকে নাড়া দিল।

মিৎসুও তাকেতানি

১৯৩৪-এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরোলেন তাকেতানি। তাঁর ফাইনাল বর্ষের প্রোজেক্টের বিষয় ছিল: “পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান কীভাবে চর্চা করা উচিত?” ঘষামাজা করে ১৯৩৬ সালে এটাই একটি বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশিত হল। এই প্রবন্ধে তাঁর মার্কসীয় দর্শনচর্চার ছাপ স্পষ্ট। তাঁর মূল কথাটা ছিল এই যে, নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান চর্চা করতে হবে একটি ত্রি-স্তর জ্ঞান-আহরণী তত্ত্ব (থিওরি অব কগনিশন) অনুযায়ী। মৌলিক বিজ্ঞান-চিন্তক হিসেবে খানিকটা পরিচিতি হল তাঁর।

সবই তো হল, কিন্তু চাকরি? পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে তাকেতানির কাছে চাকরিটা একান্ত প্রয়োজন। অনেক কষ্টে কিয়োতোর এক মাধ্যমিক ইস্কুলে আংশিক সময়ের পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষকের কাজ পেলেন। সক্রিয় বিজ্ঞান গবেষণা কিন্তু থেমে থাকল না। ওসাকা বিশ্ববিদালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে বিনা-মাইনের সহকারীর কাজ করতে লাগলেন। এই ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ইয়ুকাওয়া, সাকাতা আর কোবায়াশির সঙ্গে মেসন তত্ত্বর ওপর কাজ শুরু করেন তিনি।

বিশ্ব সংস্কৃতি নামক পত্রিকায় বিজ্ঞানের বিকাশ ও বিজ্ঞানের দর্শন সম্বন্ধে মার্কসবাদী তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার অপরাধে জেলবন্দি হয়েছিলেন তাকেতানি, কিন্তু অভিজাত বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ইয়োশিরো নিশিনার হস্তক্ষেপে মুক্ত হন। এই সময়েই ফ্যাসি-বিরোধী সংস্কৃতিকে রক্ষা করার তাগিদে সেগাই বুঙ্কা নামে একটি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীতে যোগ দিলেন তাকেতানি। গোষ্ঠীর মুখপত্রটি বেশ ভারী, জনপ্রিয়ও বটে। নন্দনতত্ত্ব, দর্শনের প্রবন্ধ আর পৃথিবীর নানা দেশের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের খবর বেরোত সেই কাগজে। সেখানে কাজুও তানি ছদ্মনামে লিখতে লাগলেন তিনি। যথারীতি ফ্যাসিস্ট জাপানের শাসকরা ১৯৩৬-এ ওই গোষ্ঠীর মূল পরিচালকদের অর্ধেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করল। ইয়ুকাওয়ার মেসন তত্ত্ব গবেষণার সহযোগিতায় ব্যস্ত তাকেতানি কিয়োতোয় থাকাটা আর নিরাপদ নয় বুঝে  এক বন্ধুর কাছে কোবে-তে চলে গেলেন। কিন্তু রেহাই পেলেন না। ১৯৩৮-এর ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে কিয়োতো চালান করে দেওয়া হল। ১৯৩৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি আটক রইলেন কিয়োতো থানায়, কতকগুলো চোর ডাকাত গুণ্ডা বদমাশের সঙ্গে একটা ঘুপচি ঘরে। অবশেষে স্বয়ং ইয়ুকাওয়া এসে তাঁর সহকর্মীর জামিন হয়ে দাঁড়াবার পর তিনি মুক্তি পেলেন। মুক্তি পাওয়ার পরেও তিনি ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে বিনা পয়সার সহকারী রূপে পরমাণু বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাজ আর সাইক্লোট্রন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে লাগলেন। সবটাই ভালবাসার মেহনত। কিন্তু দিন চলত কী করে? ল্যাবের পরিচালক তাকেতানিকে কিছু টাকা দিতেন, আর বাকিটা আসত স্থানীয় ফুজি নাগাতা জাহাজ কারখানার সঙ্গে যুক্ত একটি ইস্কুলে পড়িয়ে।

এই এলোমেলো জীবনযাত্রার শোধ তুলল শরীর। ১৯৪০-এ প্লুরিসি হয়ে এক মাস হাসপাতালে কাটালেন। বন্ধুরা চিন্তিত। এভাবে চললে তো সে মরে যাবে। তাঁদেরই প্রয়াসে অবশেষে তাকেতানি যুক্ত হলেন রাইকেন-এ শিনিচিরো তোমোনাগার গবেষণা সহকারী হিসেবে। নির্দিষ্ট মাসমাইনে এখানেও নেই, তবে এক নামকরা প্রকাশকের কাছ থেকে জলপানি হিসেবে কিছু টাকার বন্দোবস্ত হল। দেখাদেখি অন্য এক প্রকাশকও এগিয়ে এল। একরকম করে চলে যেত তাঁর। রাইকেন-এর নিশিনা ল্যাবে তখন ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ বার করে নেওয়ার কাজ চলছে। তাকেতানি এর তত্ত্বীয় দিকটি নিয়ে কাজ করতে লাগলেন।

১৯৪৪ সালে একটি রুশ ডাক্তারি ছাত্রীকে বিয়ে করার কয়েক মাস পরেই পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তাঁকে অন্তর্ঘাতের অভিযোগে আটক করল। অথচ মজা এই, তিনি যে-কাজটা করছিলেন সেটা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে আটক অবস্থাতেও তাঁকে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হল। আটক অবস্থাতেই তিনি ইউরেনিয়াম-২৩৫ আলাদা করার তাপ-বিচ্ছুরণ পদ্ধতির তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করেন, এমনকী পরমাণু বোমা ফাটালে ক্ষতির পরিমাণ কী হতে পারে সেটাও গণনা করে ফেলেন। প্রচণ্ড হাঁপানিতে ভুগে ১৯৪৪-এর ১০ সেপ্টেম্বর বাড়ি যাওয়ার অধিকার পেলেন, পুলিশ থানায় নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার শর্তে। পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে বিজ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের প্রবক্তা হিসেবে তখন তাঁর জাপান-জোড়া নাম।

যুদ্ধর পরে জাপানের প্রসিদ্ধ পদার্থবিজ্ঞানী-চতুষ্টয়ের একজন বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেন তাকেতানি। অন্য তিনজন সাকাতা, তোমানাগা, ইয়ুকাওয়া। তবে তাকেতানির খ্যাতি যত না পদার্থবিজ্ঞানী রূপে, তার চেয়ে বেশি ‘মৌল কণা তত্ত্ব গোষ্ঠী’ নামক একটি সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে। বিজ্ঞানের সামাজিক ভূমিকা এবং গণতন্ত্রীকরণ নিয়ে আন্দোলনের পুরোভাগে চলে আসেন তিনি।

 

উপসংহার

আধুনিক জাপানের বিজ্ঞানীকুল সামন্ততান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত হননি, আবার ঐতিহ্যর ওপর নতুনের যে-অভিঘাত পড়েছিল তাকেও অগ্রাহ্য করেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেকার বিবিধ বিশ্বাসতন্ত্রর ঘাত-প্রতিঘাতের আবহে তাঁদের বিকাশ। নানা ধরনের দর্শন তাঁদের ওপর ক্রিয়া করেছিল। হিদেকি ইয়ুকাওয়ার কছে মার্কসবাদের কোনও আকর্ষণ ছিল না। মিৎসুও তাকেতানি আর শৈওচি সাকাতার ক্ষেত্রে ঠিক উলটো। ইয়ুকাওয়া নিজের সাফল্যের পিছনে এক ধরনের প্রাচ্য স্বজ্ঞার ক্রিয়া লক্ষ্য করেছিলেন। প্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁর ধ্যানধারণা চিনের তাওবাদী দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ছোটবেলায় চৈনিক সবেকি সাহিত্যচর্চা তাঁর বিজ্ঞানচিন্তাকে একটা বিশেষ তারে বেঁধে দিয়েছিল। চৈনিক আর জাপানিদের চিন্তার একটা বিশেষ ধরনের “প্রাচ্য পরিমার্গ” আছে বলে তিনি মনে করতেন। শিনিচিরো তোমোনাগার সাংস্কৃতিক প্রভাবগুলি কিন্তু ইয়ুকাওয়ার মতো অতটা প্রাচীন-ঘেঁষা নয়। তিনি তাঁর পিতার কাছে কান্টীয় দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জাপানি দার্শনিক নিশিদার চিন্তাও তাঁকে বেশ প্রভাবিত করেছিল। যার মূল কথা হল, জ্ঞান দুভাবে অর্জন করা যায়: এক, প্রত্যক্ষ উপলব্ধির দ্বারা, দুই, আত্ম-সচেতনতার দ্বারা।

দার্শনিক মতের এত বিভিন্নতা সত্ত্বেও এই জাপানি পদার্থবিদরা মিলেমিশে কাজ করতেন। মেসন তত্ত্বের বিকাশের ইতিহাস তার উদাহরণ। পশ্চিমে অত্যধিক প্রতিযোগিতার চাপে এইভাবে কাজ করাটা প্রায় উঠেই গিয়েছিল।

পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিও এঁদের ভিন্নতার একটা কারণ। তোমোনাগা আর ইয়ুকাওয়ার ছেলেবেলা কেটেছিল উচ্চমার্গের নিশ্চিন্ত পারিবারিক ঘেরাটোপে। মার্কসবাদের সঙ্গে তাঁদের কার্যত কোনও পরিচয়ই ঘটেনি, যদিও তখন শিক্ষিত জাপানিদের মধ্যে সেটাই ছিল রেওয়াজ। জাপানের মানুষের সামাজিক সমস্যাগুলো কী, সে বিষয়ে এঁরা দুজন কার্যত অনবহিত ছিলেন। অপরদিকে, তাকেতানির কাছে জীবন নির্বাহ করাটাই একটা কঠিন সংগ্রাম। তার সঙ্গে মিশেছিল সক্রিয় সোচ্চার ফ্যাসি-বিরোধী আন্দোলন, যা তাঁকে সরাসরি জাপানি শাসকশ্রেণির শত্রুতে পরিণত করেছিল। আবার পরিশীলিত, ধনী, উচ্চ-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে আসা সত্ত্বেও সাকাতা এই তাকেতানির ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন, মার্কসবাদী দর্শনকে তাঁর জীবনের ও বিজ্ঞানকর্মের পথনির্দেশক করে নিয়েছিলেন। গবেষণার পদ্ধতিতন্ত্র আর বৃহত্তর সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তোমোনাগা আর ইয়ুকাওয়ার সঙ্গে এঁদের বিস্তর তফাত ছিল, বিশেষ করে যুদ্ধের পরে পূর্বোক্ত দুজনই মার্কিন সাম্রাজ্যাবদের প্রতি নরম মনোভাব গ্রহণ করার সময় থেকে। দেখবার বিষয় এই যে এত পার্থক্য সত্ত্বেও বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এঁদের মধ্যে কিন্তু কোনও সরাসরি সংঘাত বাধেনি। তার একটা কারণ অবশ্য এই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এঁরা ভৌগোলিক অর্থে জাপানের তিনটি আলাদা অঞ্চলে কাজ করতেন: ইয়ুকাওয়া কিয়োতোয়, তোমোনাগা তোকিওয়, আর সাকাতা নাগোয়াতে।

তোমোনাগা আর ইয়ুকাওয়া আমেরিকা-প্রভাবিত এলিট ধাঁচের বিজ্ঞান-নীতিকে বরণ করে নিয়েছিলেন। ইয়ুকাওয়ার মতো তোমোনাগাকেও রবার্ট ওপেনহাইমার প্রিন্সটনে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমেরিকা ভ্রমণ তাঁকে শুধু বিজ্ঞান পলিসির দিক থেকে নয়, ব্যক্তিগত জীবনাচরণের, এমনকী বেশভূষার দিক থেকেও বদলে দিয়েছিল। অপরদিকে সাকাতা আর তাকেতানি জে ডি বার্নালের “ল্যাবরেটরি গণতন্ত্রে”র আদর্শে জাপানের বিজ্ঞান-পলিসিকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিল এলিট ধাঁচের বিজ্ঞানচর্চার পলিসি। আরও একটা কথা না বললেই নয়। জাপানের মার্কসবাদী বিজ্ঞানীরা কিন্তু কখনও মার্কসবাদের নামে সোভিয়েত রাশিয়ার মতো লাইসেঙ্কোবাদী অ-বিজ্ঞানকে প্রশ্রয় দেননি। তাঁদের “সর্বহারা” বিজ্ঞান বিজ্ঞানের রাজপথ থেকে সরেনি কখনও।

কেবল একটা জায়গায় এঁদের মধ্যে কোনও অমিল ছিল না। সে হচ্ছে, ধর্মকে বিজ্ঞান থেকে শতহস্ত দূরে রাখা। এইসব মিলিয়ে জাপান ষাট-সত্তর বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারির একটি বিজ্ঞানোন্নত দেশে পরিণত হয়। ১৯০০ সাল আর ১৯৭০ সালের মধ্যে জাপানের এই অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক উন্নতির একমাত্র তুলনা বোধহয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

 

মূল তথ্যসূত্র: Low, Morris. ‘Science and the Building of a New Japan’, London: Palgrave Macmillan. 2005.


[1] Bernal, J. D. ‘The Social Function of Science’. (1939). 1975, MIT.
[2] Talk On Sakata’s Article. August 24, 1964.Selected Works of Mao Tse-tung’. “Chairman:  I have asked you to come here today because I want to look into the article by Sakata [Shoichi]. Sakata says that basic particles are indivisible while electrons are divisible. In saying this, he is taking the stand of dialectical materialism.”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. লেখাটি জরুরি মনে হয়েছে, কারণ, জাপানি বিজ্ঞানিদের জীবন চিন্তা কর্ম এসব নিয়ে বাংলায় এর আগে তেমন বলার মত কিছু পড়েছি বা দেখেছি বলে তো মনে পড়েনা। অথচ, বিশ শতক ও তার পরবর্তী পৃথিবীতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে চর্চায় জাপানকে বাদ দিলে চর্চা ভীষণভাবে অসম্পূর্ণ থাকবে। পরে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত লেখা লিখুন, দাদা!

আপনার মতামত...