জঁ-লুক গোদার সেই আশ্চর্য প্রতিভাবান যিনি ব্যাকরণের বই ছিঁড়ে ফেলেছিলেন এমনভাবে যাতে পড়তে অসুবিধে না হয়

পিটার ব্র্যাডশ

 


পিটার ব্র্যাডশ দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ফিল্ম ক্রিটিক। তাঁর এই নিবন্ধটি ১৩ সেপ্টেম্বর দ্য গার্ডিয়ান-এ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রবুদ্ধ ঘোষ এবং পীযূষ দত্ত

 

 

 

বিশ শতকের শেষ মহান আধুনিকতাবাদীটি চলে গেলেন। শেষদিকে জঁ লুক গোদার দেদীপ্যমান কিন্তু নিভৃতবাসী এক চলচ্চিত্রমন-অধিনায়ক হয়ে বেঁচে ছিলেন— ঠিক যেন চে গেভারা নিজেকে খুনিদের থাবা থেকে বাঁচিয়ে বলিভিয়ার জঙ্গলে বসে এখনও বিপ্লবের ছক এঁকে যাচ্ছেন— বৃদ্ধ, নিভৃতচারী— কিন্তু সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে দ্রোহের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারেন যেকোনও মুহূর্তে— জঁ লুক গোদারের ভূমিকাও শেষদিকে অনেকটা সেরকম। গোদারকে প্রথমে দেবতুল্য জ্ঞানে পুজো করা হল, মাথায় তুলে নাচা হল, তারপরে খানিকটা ওই ‘অনেক তো হল’ ভেবে সরিয়ে রাখা হল। একসময়ে প্রবল চর্চা, বাকি সবকিছুকে নস্যাৎ করে দেওয়া এবং তাঁর আকর্ষণে বিমোহিত থাকার পরে হঠাৎই ভাঁটার টান। ফরাসি নবতরঙ্গ হলিউডকে যেমন কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তেমনই গোদারের চলচ্চিত্রভাবনা। দৃশ্যশ্রাব্য শিল্পে গোদারের স্বতন্ত্র চিন্তাপথ এখনও অনেক নতুন ভাবনার অভিমুখ খুলে দেয়।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে গোদার নামক বোমার প্রথম বিষ্ফোরণ ঘটে ১৯৬০ সালে A Bout de Souffle বা ব্রেথলেস চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে। ফ্রঁসোয়া ত্রুফোঁর লেখা গল্প থেকে চলচ্চিত্র— প্যারিস শহরে এক আমেরিকান তরুণীর (জঁ সেবার্গ) সঙ্গে এক পলায়নরত গাড়িচোরের (জঁ পল বেলমোন্দো) দ্বন্দ্বমুখর প্রেমের কাহিনি। গোদার সব ব্যকরণ বই ছিঁড়ে ফেললেন, কিন্তু এমনভাবে, যাতে সেই বইটি পড়তে অসুবিধে না হয়। মূল কাহিনি থেকে বারবার সরে সরে যাওয়া, প্রথাভাঙা সংলাপদৃশ্য, ভেরাইট লোকেশন, ন্যারেটিভ-ভাঙার অনুশীলন এবং জাম্প-কাট— অনুপ্রাণিত ও স্বেচ্ছাকৃত ভুল সম্পাদনা, সব মিলিয়ে মনে হবে যেন এক চলচ্চিত্রশিক্ষাহীন স্বতঃপ্রণোদিত পরিচালক নতুন ভাষা নির্মাণের জেদ ধরে নেমেছেন।

A Bout de Souffle

১৯৬০-এর দশক গোদারের চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল একটা সময়। দৃশ্য ও স্লোগান পৃথিবীকে পাল্টে দিতে পারে এমন একটা সময় তখন— গোদার রুদ্ধশ্বাস গতি ও মসৃণতায় ছবি বানাতে লাগলেন। তাঁর অনেক কিছু বলার আছে, অথচ তা বলতে হবে এক অনায়াস নান্দনিকতায়— মহাদেশীয় স্থিতধীর অন্য এক উদাহরণ প্রস্তুত করে দিলেন তিনি। গোদারের ওই ছবিটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে গেছে— যেখানে ফিল্মের একটা রোল হাতে ধরে ধরে নিরীক্ষণ করছেন তিনি। কিন্তু বিরক্ত, কুঞ্চিত-ভ্রূ, জেদি কেউ ছবিটি দেখে বিস্মিত হতেই পারেন— কালো চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিলে তিনি কিন্তু এত খুঁটিয়ে দেখতে পারবেন না। তাঁর চলচ্চিত্রের মূল ভাবনাগুলি ছিল— যৌনতা-সম্পর্কিত নীতিবোধ এবং সঙ্গম ও প্রেমের যন্ত্রণাময় অসম্ভাব্যতা আর এই সবকিছুর মধ্যে অন্তর্লীন এক রাজনৈতিক আলোচনা। Bande a part (১৯৬৪) ও Two or Three Things I know about Her (১৯৬৭) এই সময়ের এমন দুটি চলচ্চিত্র, যেখানে প্রাণশক্তি আর শিল্পরীতির অনবদ্য মিশেল রয়েছে— রয়েছে যুগপৎ হর্ষোৎফুল্ল হয়ে লাফিয়ে ওঠা এবং নামার সময় অভিকর্ষকে নস্যাৎ করা।

Bande a part

কিন্তু, সেই সময়ের— বলা ভালো, গোদারের সমস্ত ছবির মধ্যেই— যে ছবিটি আমার সবচেয়ে প্রিয় তা হচ্ছে, ‘Une Femme Mariee’ (১৯৬৪)। একইসঙ্গে অদ্ভুত পরিণত এবং একটি মাস্টারপিস— এর সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় অ্যাগনেস ভার্দার ‘Cleo 5 to 7’। অনুপম সুন্দরী শার্লটের ভূমিকায় মাশা মেরিইল। একজন বিবাহিতা তরুণীর সঙ্গে একজন সুদর্শন অভিনেতার পরকীয়ার গল্প। চরম শৃঙ্গাররসে ভরপুর, কিন্তু বিশুদ্ধ উৎকৃষ্টতা ছবিজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। ছবিটি মূল-কাহিনি থেকে সরে সরে গিয়ে কাহিনি উপস্থাপনের প্রাবন্ধিক পাঠ দেয় এবং একইসঙ্গে একজন নিষ্ঠ চলচ্চিত্রদর্শককে প্যারিসে ভ্রমণ করায়। গোদার এমনভাবে সাবটাইটেল ব্যবহার করেছেন যাতে মনে হয় শার্লট ভাবছে এবং যৌনতা বিষয়ে দুই নারীর কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে সে। উডি অ্যালেনের ‘অ্যানি হল’-এর কথা প্রসঙ্গত মনে পড়তে পারে। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটি অন্যতম ছবি যার যৌন-আবেদন ও বিস্ময়োপাদান মনকে মুগ্ধ করে। গোদারের ‘Contempt’ (১৯৬৩) ছবিটির থেকেও এই ছবিটি আমাকে বেশি টানে।

Une Femme Mariee

সচরাচর ‘Pierott le Fou’ (১৯৬৫)-এর মতো গোদারের ছবিতে একটা অদ্ভুত উন্মাদনা লক্ষ করা যায়। যেখানে তিনি হলিউডের শিশুসুলভ মেলোড্রামাকে সোজা মুখে ব্যঙ্গ করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এরপরেও কিন্তু গোদারের ছবি সুদীর্ঘ আলোচনার একটা পরিসর বজায় রাখতে সক্ষম হয়। গোদার বারবার সামরিকীকরণ এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছেন তাঁর ছবিতে। বারবার তাঁর ছবিতে ফিরে এসেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা, মৃত্যুশিবিরের অসহ্য অস্বস্তিজনক দৃশ্য। এবং অতি অবশ্যই ফিরে এসেছে ভিয়েতনাম প্রসঙ্গ। ৬০-এর দশকের এই ঘটনার ধাক্কাতেই গোদার দ্বারস্থ হন মাওবাদী মতাদর্শ এবং বামপন্থী ভাবনাচিন্তার।

Pierott le Fou

অজস্র চলচ্চিত্রকারদের মাঝে গোদারই একমাত্র, যিনি একইসঙ্গে তাত্ত্বিক, চলচ্চিত্র সমালোচক, গবেষক। যিনি চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রের ভবিষৎ নিয়ে রীতিমতো জরুরি কিছু চর্চা দুনিয়াকে দিয়ে গেছেন। তবে অদ্ভুতভাবে গোদার কখনওই চলচ্চিত্রকে সদ্যোজাত শিল্পমাধ্যম হিসেবে সে অর্থে উদযাপন করেননি। তাঁর ভাবটা কতকটা ছিল যেন— চলচ্চিত্র তাঁর সদ্যোজাত অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ‘Weekend’ (১৯৬৭)-এ দেখা যায় তিনি বলছেন, “গল্পের শেষ, চলচ্চিত্রের শেষ।” এক্ষেত্রে গোদার, অনেকটাই সাহিত্য সমালোচক জর্জ স্টেইনারের মতো, যিনি ঘোষণা করেছিলেন, হয় ট্র্যাজেডি মৃত আর নয় তো জার্মান ভাষাটাই মৃত। গোদারও একথা মনে করতেন যে, চলচ্চিত্র মৃত। গোদার নিজেকে সেই রহস্যময় মানুষটিতে পরিণত করলেন, যিনি ‘ফিল্ম’ নয়, ‘সিনেমা’ বানানোর আকাঙ্খা লালন করতেন। তিনি ‘শব্দ’ এবং ‘চিত্র’-কে চলচ্চিত্রের ওই চার দেওয়ালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি প্রচণ্ডরকমভাবে চলচ্চিত্র সমালোচক আন্দ্রে বাজাঁ-র ‘Cahiers du Cinema’ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। গোদার নিজের জীবনের প্রথমার্ধ, ওই পত্রিকায় চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে শুরু করেন। এবং নবতরঙ্গ ছবির ধারক এবং বাহক হিসেবে আবির্ভূত হন।

Weekend

তুলনা আসাটা অস্বাভাবিক নয়। গোদার যেন সিনেমার রোবোস্পিয়ার, বা জন লেনন— যেক্ষেত্রে পল ম্যাকার্টনি বলতে হবে ফ্রসোঁয়া ত্রুফোকে, যিনি মূলত মূলধারার নব্যতরঙ্গ ছবি তৈরির দিকে মন দিয়েছিলেন। গোদারকে এই মাধ্যমের সক্রেটিসও বলা যায়— যাঁর নাকি পরীক্ষানিরীক্ষা হয়নি এমন সিনেমাকে সিনেমা বলেই মনে হত না।

গোদারের ছবি, ‘Goodbye to Language’, ছবিটি আমেরিকান সমালোচকদের মতে ২০১৪-র সেরা ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়। তাঁর আরেকটি ছবি, ‘Socialisme’ (২০১০), ছবিটির বিষয়বস্তু ছিল রাষ্ট্রহীনতা এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতা বোধ। এই ছবিটি আদতেই, ভাবনা এবং চিত্রের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ। এর অধিকাংশ দৃশ্যই একটি ক্রুজ জাহাজে তোলা হয়। সোশালিজম সম্পর্কে গোদারের ধারণা কী ছিল, তা কি আমাদের কৌতূহলী করে তোলে না? এর উত্তর কিন্তু ইতিহাসেই রয়েছে। এই যে ক্রুজ জাহাজটি ব্যবহার করেছিলেন গোদার সেটি কুখ্যাত কোস্টা কনকর্ডিয়া জাহাজ, যেটি ২০১২-র এক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়। অনেকেরই মত, পয়সার লোভে আরও বেশি যাত্রী তোলার জন্য এই প্রমোদ-তরণীটির আকার লম্বাটে করে ফেলা হয়েছিল, যাতে তার ঊর্ধ্বাংশ হয়ে গেছিল অত্যধিক ভারী। আমার যেন মনে হয়, এই পরবর্তীকালের ছবিগুলিতে গোদারের ক্যামেরার লেন্স যেন একটা শক্তিশালী টেলিস্কোপে পরিণত হয়েছিল। যেন তিনি বহু দূর থেকে মানবসমাজকে লক্ষ করছেন, যেন অন্য একটি গ্রহ থেকে।

Goodbye to Language

গোদারের পরবর্তী জীবন দেখে বহু অনুগামী আশাহত হন। অথবা বলা চলে, ষাটের দশকের যে চরিত্রটিকে তাঁরা বিগ্রহ বানিয়েছিলেন— যে কিনা অস্বীকার করে নিজেকে বেচতে, বড় হতে, বাণিজ্যিক ছবি বানাতে, ডানদিকে ঝুঁকতে— তাঁকে এখনও নায়কোচিত ভঙ্গিমায় পেশ করবার ক্ষেত্রে খানিক তাঁরা অস্বস্তিতে পড়ে যান। কারণ তিনি তো একই রকমের গোঁয়ার রয়ে গেলেন! যদিও তাঁর যৌনতাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য পুরনো— ফলত প্রান্তিক হয়ে যেতে শুরু করেছিল। তাঁর ইজরায়েলের প্রতি ঘৃণাও সময়ে সময়ে ইহুদিবিদ্বেষের সীমারেখা লঙ্ঘন করে ফেলত। আবার অনেকের কাছেই ‘ব্রেথলেস’-এর পর তাঁর সবচেয়ে বড় মাস্টারপিস হল Histoire(s) du Cinema (১৯৯৮৮-৯৮)— আট পর্বের একটি ভিডিও ডকুমেন্টেশন। এই ছবিটির মধ্যে দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় চলচ্চিত্রপ্রেমী গোদারকে। এই ছবিটি আমার কাছেও বেশ আগ্রহের। এই ‘Histoire (s) du Cinema’-তে একটা অদ্ভুত রহস্যময়তা লুকিয়ে রয়েছে।

এ-কথা বলতে বাধা নেই এ দুনিয়ায় গোদারের মতো কেউ ছিল না, এবং আসবেও না।‌ এই কারণেই তাঁর মৃত্যু দিনটাকে ফ্যাকাশে— বিষণ্ণ করে দিয়ে গেল। আজকের দিনটি তাঁর ছবি ‘Une Femme Mariee’ দেখার এবং একথা উপলব্ধি করবার যে— তাঁর ছবি ঠিক কতটা আকর্ষণীয় হতে পারে।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...