উত্তরের পথে পথে…

শ্রাবন্তী মিত্র

 

বেশি খুব কিছু চাইনি জীবনে, শুধু মেঘ আর রোদ্দুরে মাখামাখি করা একটা আস্ত গোটা দিন ছাড়া। কতবার ভেবেছি ট্রেন ধরে একা একা পালিয়ে যাব, মেঘ-পাহাড়ের দেশের ছোট্ট একটা গ্রামে। তবে ইচ্ছের সঙ্গে যে ধৈর্যের একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে, সেটা যতক্ষণ না নিজের জীবনে টের পেয়েছি, ততক্ষণ আর “বেরিয়ে পড়া”টা সত্যি সত্যি হয়ে ওঠেনি। আমার আজকের গল্পের অনেকটা জুড়েই রয়েছে এই বেরিয়ে পড়াটা, যেটাকে সম্বল করেই আমার বেঁচে থাকবার ইচ্ছেটা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে, আর এই ইচ্ছেটাকে জীবিত রাখার জন্য দরকার প্রাণভরা অক্সিজেনের, আর অক্সিজেন মানে তো, কু……… ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক………

পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেই দিন… আহা! ভাবলেই পিঠটা এখনও হালকা ব্যথা ব্যথা করে… আমি তো জীবনেও ট্রেন ধরবার ক্ষেত্রে কোনও স্টেশন ট্যাক্সি বা ওলা-উবেরে যাই না, যাই মেট্রো, বাস আর লোকাল ট্রেনে, কারণ, আমার সফরটা বাড়ি থেকে বাইরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায়। যাইহোক, শিয়ালদা অবধি ওই পিঠের বস্তাটাকে বয়ে নিয়ে যেতে যেতে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা থেকেই মনে পড়ে গেছিল আর কি পিঠের ব্যথার কথাটা। তারপর, বোঁচকা-বুঁচকি এদিক-ওদিক সাইড করবার পর, ট্রেনটা যখন ফাইনাল হুঙ্কার দিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল, তখন মনে হল যাক, “সত্যিই যাচ্ছি তাহলে!”… তারপরের গল্প থুরি এপিসোডগুলো তো আপনাদের সকলেরই জানা। থেকে থেকে হা হা, হো হো, হ্যাঁচ্চো, খকখক, সরে এসো না, উফফ! কী গন্ধ!, নেটওয়ার্ক নেই, দাদা লাইটটা অফ করুন, ফোনের সাউন্ডটা কমান এবং ফাইনালি, সেই অসীম সাড়াজাগানো শব্দের বিচ্ছুরণ… ঘহহহহররররররররর… ফু…… ঘহহহহররররররররর। এটাও যখন কানে সয়ে গেল, তখন একটু ঘুম এল এবং তার কিছুক্ষণের মধ্যেই… বিপুল করতালির মাধ্যমে একদল উৎসাহিত জনগণ খিলখিল করতে করতে… “এনজেপি এসে গেছি, এনজেপি এসে গেছি, খুব ভালো ঘুম হয়েছে… এঁহে, এঁহে।” আমি এসব শোনার পরেও দাঁতে দাঁত আর কানে হাত চেপে, নিজেকে বোঝালাম, এখনও কোচবিহার আসতে বেশ খানিকটা দেরি, সুতরাং, এরা নেমে গেলে আমি আবার ঘুমোতেই পারি। হ্যাঁ, তারপর আমি ৯টা অবধি ঘুমিয়েছিলাম। আপার বাঙ্ক থেকে নেমে জানলার দিকে তাকিয়ে দেখি সকালটা মেঘলা, ট্রেন তখন ধূপগুড়ি ছাড়িয়ে গেছে।

কোচবিহার নামক এই গোটা জেলাটার জন্মই আসলে একটি রাজনৈতিক চুক্তির ফলে। ১৭৭২ সালে ভুটানের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে কোচবিহারের রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের মধ্যে চুক্তি সাক্ষরিত হয়, যার ফলে কোচবিহার ব্রিটিশদের অধীনত্ব লাভ করে। এরপর ১৭৭৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে রাজ্যটি “কোচ-বিহার” নামে পরিচিত হয় এবং এর রাজধানীর নাম হয় “বিহার ফোর্ট”। প্রসঙ্গত বলা উচিত, “কোচবিহার” শব্দটির অর্থ হল “কোচ জাতির বাসস্থান”। কোচবিহার গেজেট অনুযায়ী, মহারাজার আদেশ অনুযায়ী রাজ্যের সর্বশেষ নামকরণটি হয় “কোচবিহার”।

ট্রেন থেকে নেমে টোটো ধরে হোটেল পূর্বাচল। হোটেলটা রাজবাড়ির একদম কাছেই। বেশি সময় নষ্ট না করে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু রিফ্রেশ করে একবারে বেরিয়ে পড়লাম ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে।

রবিবার, ছুটির দিন। শহরের ঘুম সেভাবে ভাঙেনি তখনও। বেশিরভাগ দোকানপাটই প্রায় বন্ধ। বেশ খানিকটা হেঁটে একটা খাবার দোকান পেলাম, সেখানে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে চললাম কোচবিহার রাজবাড়ির দিকে। রাজবাড়ি তখনও কুয়াশায় ঢাকা। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করার পর মনটা কেমন জানি ভিক্টোরিয়ার কথা মনে করিয়ে দিল। দুটিই ব্রিটিশ আমলের সৃষ্টি কিনা!

কোচবিহার রাজবাড়ি

ইতিহাস জানান দেয়, ১৮৮৭ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের রাজত্বকালে লন্ডনের বাকিংহাম প্রাসাদের আদলে এই রাজবাড়িটি তৈরি হয়েছিল। এটিকে অনেকে ভিক্টর জুবিলি প্যালেসও বলে। এক্কেবারে ক্লাসিকাল ইউরোপিয়ান স্থাপত্যে মোড়া দোতলা একটি প্রাসাদ, যেখানে শয়নকক্ষ থেকে বৈঠকখানা, ডাইনিং হল থেকে বিলিয়ার্ড হল, গ্রন্থাগার, তোষাখানা, লেডিজ গ্যালারি এবং দোতলায় বিভিন্ন দুষ্প্রাপ সামগ্রী ও অ্যান্টিক আসবাবও প্রদর্শনীর জন্য সাজিয়ে রাখা রয়েছে। সমগ্র রাজবাড়ি ঘুরতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল।

তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে একটা টোটো ধরে গেলাম মদনমোহন মন্দির। কোচবিহার জেলার মূল কেন্দ্রে অবস্থিত এই মন্দিরের স্থাপনকাল ১৮৮৫-১৮৮৯ সালের এর মধ্যে। এখানে মদনমোহনের বিগ্রহের পাশাপাশি, কালী, তারা এবং মা ভবানীর বিগ্রহও উপস্থিত। রাসের সময় গোটা প্রাঙ্গন জুড়ে বিশাল উৎসব ও মেলা বসে।

মদনমোহন মন্দির

পথে যেতে যেতে বেশ কিছু পুরনো সরকারি অফিস ও পুরনো বাড়ি চোখে পড়ল, যা থেকে বোঝা গেল, শহরে এখনও খুঁজলে বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে।

এরপর গেলাম বড়দেবী মন্দির। তখন বিকেলের রোদ পড়েছে লাল রঙের মন্দিরের ওপর। এই মন্দির জুড়েও ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের শৈলী রয়েছে। মন্দিরের ভেতরে আছেন স্থাপিত দুর্গাপ্রতিমা। প্রতি বছরই দুর্গাপুজো হয় এখানে।

সবশেষে পৌঁছলাম মধুপুর ধাম মন্দিরে। ১৪৮৯ সালে শঙ্করদেব শেষবারের মতো যখন কোচবিহারে আসেন, কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ তখন তাঁকে অনুরোধ করেন, নতুন বৈষ্ণব দর্শন শেখাবার জন্য, সেই উদ্দেশ্যে ষোড়শ শতাব্দীতে মধুপুর ধাম নির্মিত হয়। এই ধর্মীয় স্থানটি আচার্য শঙ্করদেবের ভক্তবৃন্দদের পূজার্চনার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্যও জনপ্রিয়।

মধুপুর ধাম থেকে বেরিয়ে পাতাবিহীন গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখি, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘগুলো দুধারে সরাতে সরাতে, আকশটা কখন ঘন নীল হয়ে গেছে…

ফেরার সময় অন্ধকার নামতেই দেখি, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আমি থাকব অথচ বৃষ্টি আসবেনা, এই দুটো বিষয়ের সমাপতন না হলে আমার বেড়াতে যাওয়াটা ঠিকঠাক জমে ওঠে না। ফিরে এসে, খাওয়াদাওয়া সেরে ঠান্ডা আবহাওয়ায় ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় জাস্ট এলিয়ে দিলাম। তারপর এক নিমেষে পরের দিন চোখ খুলে দেখি একটা হলুদ সকাল এসে গেছে।

সেদিন আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল কোচবিহার শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাণেশ্বর শিবমন্দির, যেখানে পর্যটক মূলত কচ্ছপ দেখার উদ্দেশ্যে যায়। মন্দিরের দশ ফুট নিচে ভূ-গর্ভে অবস্থিত শিবলিঙ্গটি। প্রধান মন্দিরের পাশে আরেকটি মন্দির আছে, যেখানে একটি অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি স্থাপন করা আছে। মদন চতুর্দশী ও দোলপূর্ণিমার দিনে এই মূর্তিটি কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাই মন্দিরের এই শিবলিঙ্গটিকে চলমান বাণেশ্বর নাম দেওয়া হয়েছে। মন্দির চত্বরের ভেতর একটি বড় পুকুর রয়েছে। সেখানেই খানিকক্ষণ ওত পেতে থাকলে গুটিকয়েক কচ্ছপের আনাগোনা দেখা যেতে পারে। শিবচতুর্দশীতে এখানে এক সপ্তাহ ব্যাপী ব্যাপক মেলা বসে। এরপর সামনের দোকান থেকে প্রাতরাশ সেরে চটপট গাড়িতে উঠে প্রকৃতির হাতছানিতে সাড়া দিতে এগিয়ে গেলাম আলিপুরদুয়ারের দিকে।

বাণেশ্বর শিবমন্দির

দুপাশে চা বাগান, আর খানিকটা দূরে দূরে ছোট ছোট ঝুপড়ি, আধো আধো মেঘ আর হালকা রোদের ফাঁকে হুশ করে বক্সা টাইগার রিসার্ভের ভেতরে ঢুকে পড়ে, পৌঁছে গেলাম রাজাভাতখাওয়া মিউজিয়াম।

রাজাভাতখাওয়াও আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান যেখানে, রাজায় রাজায় সন্ধি হয়েছিল। বক্সা অঞ্চল সংলগ্ন সমতল ভূ-ভাগ কেন্দ্রিক অশান্তির জেরে কোচবিহারের রাজা ধৈর্য্যেন্দ্রনারায়ন ভুটান সেনাপতি পেনশু তোমা-এর হাতে বন্দি হন। বন্দি রাজাকে প্রথমে বক্সা ও পরে তৎকালীন ভুটানের রাজধানী পুনাখাতে বন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু ১৭৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনি কোচবিহারের সমস্ত ভুটানি সেনাদের ঘাঁটি ভেঙে দেয় এবং ভুটিয়া মুক্ত করতে চায় কোচবিহারকে। যুদ্ধশেষে, রংপুরের কালেক্টর পারলিং ভুটানের রাজাকে চিঠি লিখে জানান রাজা ধৈর্য্যেন্দ্রনারায়নকে মুক্তি না দিলে ইংরেজ সৈন্যরা ভুটান রাজধানী দখল করবে। যার ফলে তিশু লামার মধ্যস্থতায় ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির সঙ্গে ভুটানের সন্ধি হয় ১৭৭৪ সালের ২৩ এপ্রিল। এরপর সন্ধির শর্তানুসারে রাজা ধৈর্য্যেন্দ্রনারায়ন ভুটান থেকে মুক্তি পেয়ে বক্সার পথে কোচবিহারের দিকে যান। রাজার মুক্তির আনন্দে রাজপুরুষগণ রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে যায় বক্সার দিকে এবং এইখানে চেকাখাতার কাছে রাজার প্রথম অন্নগ্রহণের ব্যবস্থা করেন। বহুদিন পর স্বদেশে ফিরে এখানেই ভাত খান রাজামশাই এবং এরপর থেকেই লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে এই স্থানের নাম হয়ে ওঠে “রাজাভাতখাওয়া”।

রাজাভাতখাওয়া

বনদপ্তর দ্বারা পরিচালিত এই রাজাভাতখাওয়া মিউজিয়ামে সংগৃহীত আছে নানাধরনের বন্যপ্রাণীর প্রতিকৃতি, জীবাশ্ম, সাজানো রয়েছে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ সারি সারি বাক্স ভরা। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির অর্কিড। বন্য প্রকৃতিকে কৃত্রিম রূপে সাজিয়ে তোলা হয়েছে গোটা সংগ্রহশালা জুড়ে।

প্রকৃতির একটা নিজস্ব গন্ধ আছে, যেটার ঘ্রাণ ভরপুর ভাবে আস্বাদন করা যায়, যখন আমরা অরণ্যের কাছাকাছি পৌঁছই। একটু আগেও হয়তো গুম হয়ে ছিল, কারও আসার অপেক্ষায়। তারপর নিজে থেকেই হলুদ-সবুজ পাতা ঝরিয়ে একটা আচমকা অনুরণন জাগিয়ে দিল। এটা কি কান্না নাকি উদাসীনতা? বুঝতে সময় লাগবে আরও, আরও…

এখান থেকে বেরিয়ে সূর্য যখন মধ্যগগনে, তখন নুড়ি পাথরে ঢেকে থাকা একটা শান্ত মেয়ের কাছে গেলাম, যার নাম জয়ন্তী। নাহ, চাঁদনি রাতের মোহমাখা রূপ দেখতে পাইনি বটে, তবে যা পেয়েছি সেই অনেক। যারা সারা শীতকাল জুড়ে নিজেদের উচ্ছাস গোপন করে রেখে দেয় বসন্তে আগল ভাঙবে বলে, তাদের এই সময়কার অচেনা রূপটা দেখতে আমার বড়ই ভাল লাগে। নুড়ি বালির ফাঁকে ফাঁকে খানিকটা জলখেলার পর, পেট চুঁই চুঁই করতে লাগল। তাই নদীতটের একদম সামনেই বেতের ছাউনি ঘেরা বনলতা রিসোর্টে বসে, খাওনদাওন সেরে নিলাম। এরপরই শুরু হল বাঙালির অতি পছন্দের দু ঘণ্টা ব্যাপী রহস্য রোমাঞ্চে ঘেরা, টানটান উত্তেজনার লাইভ থ্রিলার ফিল্ম, “জঙ্গল সাফারি”।

জয়ন্তী নদী

একটা হুড খোলা জিপ। সামনে ড্রাইভার ও আরও দুজন শাকরেদ আর পিছনে আমরা। পথ যত সরু হচ্ছে, জঙ্গল তত ঘন হচ্ছে। ডানদিক বা বাঁদিক থেকে আসা যেকোনও শব্দকেই তখন মনে হচ্ছে হাতির ডাক। ক্রমশ অরণ্য তার রূপ-রস-গন্ধকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের কান ঘেঁষে ফিসফিস করে কীসব বলে গেল। তখনও কিছু পাখি আর একটা বাঁদর ছাড়া আর কিছু দেখতে পাইনি। একটু এগিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম, থাবা বসানো পায়ের ছাপ, লম্বা করে এগিয়ে গেছে বালিপথ ধরে। গাইড বলল, ওটা নাকি নেকড়ের, একটু আগে ওই রাস্তা দিয়ে গেছে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর… আমরা এগিয়ে গেলাম, আর সামনের আড়াল ভেদ করে ময়ূর দেখলাম। কী আনন্দ!

গরিবের সবেতেই ফুর্তি। তারপর গাড়ি গিয়ে থামল ভিউ পয়েন্টে। একটা দোতলা কাঠের বাড়ি, নিচে ড্রাইভার ও তার শাকরেদরা মিলে তাস খেলছে। আমাদের বললেন, যান ওপরে গিয়ে বসুন, এখানে জলহস্তি জল খেতে আসে। সেই, ওদিকে শীত করছে, আলো ক্রমশ ফুরিয়ে আসবে আসবে করছে, আর আমরা চেয়ারে বসে গালে হাত দিয়ে অপেক্ষা করছি কখন বাবুমশাই তাঁর দুপুরের নিদ্রা সেরে জলপান করতে জলাশয়ে আসবেন। আমার ধৈর্য কম, ক্যমেরার লেন্সের শক্তিও কম তাই উঠে পড়লাম, ফেরার পথে যা পাব পাব এই ভাবনা নিয়ে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে মনটাও হতাশায় ডুবে যাবে, এরকম একটা সময়ে সামনে তাকিয়ে দেখি এক শিংওলা পরিবার বাচ্চাকাচ্চা সমেত আমাদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ক্লিক! ক্লিক! ক্লিক! ক্লিক!— তখন আর কিচ্ছু ভাবার টাইম নেই। ক্লিক শেষ, সিনেমাও শেষ। তারপর সব অন্ধকার।

জিপ থেকে নামার পরের অনুভূতি খুব শর্টে বলতে গেলে একদম সিনেমা হল থেকে বেরোনোর পরের অনুভূতির মতোই। শীত কাকে বলে, এবার টের পাওয়া যাচ্ছে। তাই হালকা করে লাল চা খেয়ে আমাদের সান্ধ্যকালীন পাহাড় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

আমার গন্তব্য তখন বক্সা সদরবাজারের কাছে ইন্দ্রদার বাড়ি। মোবাইল ফোন ততক্ষণে টাওয়ারশূন্য। সান্তালাবাড়িতে এসে আমাদের গাড়িটা আটকাল। রাস্তা খোঁড়া চলছে প্লাস এই সময়ে গাড়ি নিয়ে পাহাড়ের ওপর ওঠা যাবে না। হেঁটে গেলেও সঙ্গে গাইড নিতে হবে। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। ভেতরে যে উৎকণ্ঠাটা চলছিল, সেটা বাইরে বেরনোর পর একদম শান্ত হয়ে গেল। ছোট ছোট দুটো দোকানে ছিমছাম নেপালি গান বাজছে, আর মোমো তৈরি হচ্ছে। সেই নক্সাকাটা একটা ছবি, যেটা দেখবার জন্য মনটা আনচান করছিল অনেকক্ষণ।

অতঃপর খানিক বাক্যালাপের মাধ্যমে দুজন গাইডকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যেতে লাগলাম জিরো পয়েন্টের দিকে। পাহাড়ি অন্ধকার রাস্তায়, মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বেলে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছনোর এ এক বিরল অভিজ্ঞতা, আমার মত এই নতুন অভিযাত্রীর কাছে এর নামই অ্যাডভেঞ্চার। জিরো পয়েন্ট পেরিয়ে যাওয়ার পর, তখন বেশ খানিকটা এনার্জি চলে এসেছে শরীরের মধ্যে। মনে হচ্ছে, চাইলে আরও কিছুক্ষণ হাঁটতে পারি। তাই আর দেরি না করে এগিয়ে গেলাম, আমাদের ঠাঁই নেওয়ার ঘর, ইন্দ্রদার বাড়ির দিকে। পাহাড়ি রাস্তাটা যেখানে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে একটা নতুন বাঁক নিয়েছে, ঠিক সেখানেই লাল আলো জ্বলা কাঠের নীল বাড়িটাই আজ আমাদের রাত্রিনিবাস। চারপাশে ফুলের গন্ধ তখনও ম’ ম’ করছে। বাড়ি ঢুকতেই হৈ হৈ হৈ হৈ… একরাশ আনন্দ নিয়ে ইন্দ্রদা হাজির। এত দেরি কেন… এই, সেই… ঠিক নিকট আত্মীয়ের মতন। এই তো সবে আতিথেয়তার শুরু, তারপর বাকি সন্ধেটা তো মায়ায় মায়ায় কেটে গেল।

ইন্দ্রদার বাড়ি

কোন ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে পারেন না ভদ্রলোক! বাঁশি, ঢোল, হারমোনিকা… এছাড়াও রয়েছে তাঁর নিজের তৈরি বাজনা “টুনা”। শুরু হল জীবনের গল্প, মাঝে মাঝে গান… “ওরে, নূতন যুগের ভরে” থেকে “পুরানো সেই দিনের কথা”… স্বরচিত কবিতা থেকে নেপালি গান… গাছের শিকড় কেটে-ছেঁটে বানানো নানান জিনিস যার প্রত্যেকটাই হাতের ম্যাজিকের মত, আর পাহাড়ি জীবনযাত্রার গল্পগুলো। এসব আবেশে জড়াতে জড়াতে কখন যে রাত ১১টা বেজে গেল টেরই পেলাম না। মনটা আরও কিছুক্ষণ এখানে পড়ে থাকতে চাইলেও শরীর চাইছিল না। তাই বাধ্য হয়ে খেতে নামলাম নীচের ঘরে। বাইরে তখন হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। তাঁর মধ্যে, ইন্দ্রদার নিজের হাতে পরিবেশন করা গরম গরম ভাত, ডাল, তরকারি তখন অমৃতসমান। খাওয়াদাওয়া সেরে কাঁপতে কাঁপতে সটান বিছানায়। ঘুমে কাদা দুটো চোখ, মন তখনও গুনগুন করে চলেছে, “হায় মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথা…”

সকাল হল মুরগির ডাকে। বাথরুমে জল বরফঠান্ডা। তাও চটপট তৈরি হয়ে নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য মনটা ছটপট করতে লাগল। একটা সুন্দর সকাল বলতে ঠিক যা যা বোঝায়, তাঁর সবকটা উপাদানই ভরা ছিল সেদিন বাইরেটায়। পাখির ডাক, ছিমছাম একটা নেপালি গান, কুয়াশা ঢাকা ছোট ছোট বাড়ি, বাগান জুড়ে লাল-নীল ফুল, রোদ মাখামাখি করে কুকুরছানাদের খেলা আর দূর থেকে কালো হ্যাট, কালো বুট আর কালো সোয়েটার পরে হেঁটে আসা ৬২ বছরের একটা জোয়ান ছেলে— যাঁর ভাল নাম ইন্দ্রশঙ্কর থাপা।

রাতের সেই হাড়কাঁপানো নিচের ঘরটায় সকালের হিমেল আলো এসে পড়েছে তখন। ইন্দ্রদার ছোট্ট আদুরে মেয়েটা ওয়াই-ওয়াই বানিয়ে দিল আমাদের জন্য। খেয়েদেয়ে ব্যাগপত্তর ইন্দ্রদার জিম্মায় রেখে বেরিয়ে পড়লাম লেপচাখার উদ্দেশ্যে, হাতে রইল ইন্দ্রদার বানিয়ে দেওয়া রুটম্যাপ।

সকাল নটা চল্লিশে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা। মাঝে কিছুক্ষণ বক্সা ফোর্টে ঘোরাঘুরি করেছিলাম। এই ফোর্টও ব্রিটিশ সরকার দখল করে নিয়েছিল কোচবিহারের রাজার থেকে এবং বাঁশের দুর্গ ক্রমে পাথরের দুর্গে রূপান্তরিত হয়েছিল। সেকালে দুর্গটিকে মূলত ভারত ও তিব্বতের মধ্যে রেশমবাণিজ্যের পথটিকে রক্ষা করার জন্য ভুটান-রাজারা ব্যবহার করতেন। এখান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আমরা নদীর কলকল শব্দ পেয়ে উঁকি মেরে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে করতে আর লোমশ পাহাড়ি কুকুরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে-পাতাতে, একটু-একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ওপরের দিকে। একটু একটু করে এগোচ্ছি, আর দেখছি খুদে-খুদে সরল চোখগুলো আমাদের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে, পিঠে বোঝা নিয়ে। কখনও বা চ্যাপটা নাকের দস্যি ছেলেগুলো খিলখিলিয়ে হেসে উঠে, দৌড় দিচ্ছে উঁচুনিচু ওই সবুজ পথের বাঁকে বাঁকে। মাঝখানে একটা পয়েন্টে পৌঁছে, দিক নির্ধারণে খানিক কনফিউশন হলেও, স্থানীয় দু-একজন লোকের দেখা মেলাতে বিশেষ অসুবিধেয় পড়তে হয়নি। ঘড়িতে যখন প্রায় ১১টা ছুঁই ছুঁই, তখন কানে এল গভীর নিষাদ ছোঁয়ানো প্রার্থনাসঙ্গীতের স্বর।

বক্সা ফোর্টে ঢোকার মুখে শহিদবেদি

কৌতূহলবশত, ঝোপঝাড় পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম শব্দটার খুব কাছে। পৌঁছে দেখি স্থানীয় একজনের বাড়িতে, পূজাপার্বণ চলছে। অনুমতি নিয়ে পুজোর ঘরে প্রবেশ করলাম। বৌদ্ধিক বসনে আবৃত জনা দশেক পুরোহিত, নানারকম সাঙ্গীতিক আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে অদ্ভুত শান্তিময় পরিবেশ তৈরি করে চলেছেন। সামনে অধিষ্ঠিত স্বয়ং তথাগত, তাঁর সামনে রাখা আছে বিভিন্ন ফল, কেক, বিস্কুট, চকলেট ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী। ধীরে ধীরে মনের মধ্যে প্রশান্তি আসতে লাগল। বাইরে বেরিয়ে বাড়ির অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এটি একটি বিশেষ পুজো, যা বছরে একবার আজকের দিনে তিথি মেনে হয়। তাই বাড়িতে আজ বিশেষ আয়োজন। এঁদের পুজোতে আমাদের পুজোর মত নিরামিষ ভোজ হয় না। রীতিমতো শুয়োর, মুরগি ইতাদি ঝলসিয়ে রান্না করে খাওয়া হয়।

একরাশ মুগ্ধতা সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে লেপচাখা ভিউ পয়েন্টের দিকে এগোতে লাগলাম। একপাশে মনেস্ট্রি, আরেকপাশে ছোট ছোট দোকান, অন্যপাশটায় ২-৩টে হোমস্টে। আর যেদিকটা বাকি রইল সে দিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু মেঘে ঢাকা পাহাড় আর পাহাড়। লেপচাখার এই ছোট্ট গ্রামটা জুড়ে সারাটা দিন হিমেল রোদ মিশেমিলে এক অদ্ভুত লুকোচুরির খেলায় মত্ত হয়ে ছিল ওই ভুটিয়াদের বাচ্চাগুলোর সঙ্গে।

লেপচাখা ভিউ পয়েন্ট মনেস্ট্রি

লামাকে বলে কয়ে চাবি খুলিয়ে মনেস্ট্রির ভেতরে ঢুকলাম। নীরবতা যেন ইশারায় মাথা নত করে দিতে বলছে। মানুষগুলোর মধ্যে ছোট ছোট আশা আর প্রতিদিনের আনন্দে বেঁচে থাকা— এই নিয়েই প্রকৃতির গন্ধ মাখছে এরা রোজ… রোজ। ফিরে আসতে মন চাইছিল না, কিন্তু হাতে সময় কম, নেমে আসতে হবে অনেকটা, তাই বেরিয়ে পড়লাম। ফেরার পথেও সঙ্গী সেই পাহাড়ি লোমশ কুকুর, খানিকটা মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্বের মতো। সান্তালাবাড়িতে নেমে সেই গতকালের পছন্দ করে যাওয়া ছোট্ট দোকানটায় লাঞ্চ সারলাম থুকপা আর মোমো দিয়ে। এটাই বক্সা সদরের মূল কেন্দ্র। এখানকার হাট থেকেই বাজারপত্র করে নিয়ে যেতে হয় সবাইকে। তাই বেশি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বহন করতে হয়। কারণ, এতটা পথ হেঁটে বারবার আসা সম্ভব না কারও পক্ষেই, আর এলেও সবসময় জিনিস পাওয়াও যায় না। খাওয়াদাওয়া সেরে উঠে গাড়ি ধরে বেরিয়ে পড়লাম সেদিনের শেষ গন্তব্য রায়মাটাঙের দিকে।

রায়মাটাং যাওয়ার রাস্তা

রায়মাটাং হল ভুটান সীমান্তের কাছে বনদপ্তরের সংলগ্ন একটি বনভূমি অঞ্চল। এর এক ধারে রয়েছে, ছোট একটি নেপালি গ্রাম। আরেকদিকে গভীর অরণ্য। গোধূলির আলোয় অরণ্য আর আকাশের সবুজ-নীল রঙ, মিশেমিলে গেছে তখন পাখির কলতানের সঙ্গে, দূর থেকে শোনা যাচ্ছে পাতার ওপর পা ফেলার খচমচ শব্দ… প্রকৃতির রং ক্রমশ ধূসর থেকে চাপা অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে, সমস্ত বনানী জুড়ে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে গহীন মায়াজাল… ঘড়ির কাঁটায় সময় এগিয়ে গেছে ৩০ মিনিট। ডাকছে ভুটান, সামনেই…

ভিউপয়েন্ট থেকে ভুটান

গাড়ি ধরে সোজা হাসিমারা। স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় একটা হোটেল। ফোনে এসে গেছে টাওয়ার। আর ঘড়িতে যথারীতি ভুটানের সময় দেখাচ্ছে। সেদিনটা হালকা গল্পগুজব আর খাওয়াদাওয়া সেরে লোটাকম্বল গুছোতে লাগলাম। কারণ, পরের দিন রাতে ফেরার ট্রেন।

পরের দিনটা সকাল সকাল বেরিয়ে সিধে বাজারহাটের ভিড় টপকে পৌঁছে গেলাম ভুটানের প্রবেশ দ্বার ফুন্টসলিং। গরিবের বিদেশ দেখা, তাও আবার ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া। রাস্তাঘাট, মানুষজন, গাড়িঘোড়া নিয়মনিধি সবকিছু কী সুন্দর সুশৃঙ্খল! তাই দেখতেও ভাল লাগে।

প্রথমে গেলাম রিচেন্ডিং গোম্ফা মনেস্ট্রি। অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতার আবরণে ঘেরা গোটা মনেস্ট্রি জুড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের আদব-কায়দায় প্রাচীনত্বের ছাপ সেভাবে পড়েনি বললেই চলে।

রিচেন্ডিং গোম্ফা মনেস্ট্রি

এখান থেকে বেরিয়ে গেলাম সমতল থেকে ৪০০ মিটার ওপরে অবস্থিত, কারবান্ডি মনেস্ট্রিতে। একটা বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মিত হয়েছে এই মনেস্ট্রি, যার একটা অংশ জুড়ে ছোট পাহাড়ি ঢিবি রয়েছে, আরেকটি দিক থেকে দেখা যায় গোটা ভুটান, ছোট ছোট দেশলাইয়ের বাক্সের মত। এখানে আকাশ গাঢ় ঘন নীল, মাটির ওপর ঢেউ খেলে যাওয়া জমি, আর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করা মুখগুলোর নরম লালচে আভাটা দীর্ঘক্ষণ দেখতে দেখতে মায়া পড়ে গেল জায়গাটার ওপর।

কারবান্ডি মনেস্ট্রি

ওদিকে বেলা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, আমরা মনেস্ট্রি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে থামলাম আবার সেই তাসি মার্কেট। প্রায় বিদেশে হাঁটাহাঁটি করছি এরকম একটা ভাব নিয়ে আমরা এদিক-ওদিক খানিক ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। গোটা অঞ্চলটা জুড়েই রয়েছে বেশ কিছু মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং, শপিং মল, রেস্তরাঁ এবং একটি পার্ক যার মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মনেস্ট্রি। অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে প্রতিদিন এই রাস্তায়, তবে একেবারে ট্র্যাফিকের বিধিনিষেধ মেনে।

জিনিসপত্রের বেজায় দাম দেখে, আমরা অথেনটিক ভুটানিজ থালির খোঁজে খাবারের দোকানগুলোর দিকে এগোতে লাগলাম। আমি সর্বভুক হওয়ায় চাউমিন, চিকেন রাইস, থুকপা সব একটু-একটু করে টেস্ট করতে বেশ ভাল লাগল। সবমিলিয়ে দেখলাম পেট বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছে। হাতে সময় কম, তায় আবার ভুটান আধ ঘণ্টা এগিয়ে দেখাচ্ছে, এখনও আরেকটি প্রতীক্ষিত গন্তব্যে যাওয়া বাকি। তাই দেরি না করে গাড়িতে উঠে এগোতে লাগলাম, আমাদের শেষ গন্তব্য চিলাপাতা ফরেস্টের দিকে।

অরণ্যের ভেতর দিয়ে এগোতে এগোতে একটু একটু করে বাড়ি ফেরার মজাই আলাদা। এ যেন পাহাড় থেকে সমতল আর সমতল থেকে কংক্রিটে ফেরবার বৃহত্তর সার্কেল। এটাকে দু-চার দিনের গণ্ডি বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে থেকে দেখে উপভোগ করা যায় না, উচিতও নয় বোধহয়।

চিলাপাতার জঙ্গলের মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে নামবার পর টের পেলাম, এই কদিনে যে যে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করেছি, তার কাছে চিলাপাতার জঙ্গলের গভীরতা নস্যি। কান পাতলে এখানে শুধু নৈঃশব্দের চিৎকার শোনা যায়। সে চিৎকার হাওয়ায় হাওয়ায় পশ্চিমদিকে উড়ে গেলে, বনানী হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। ঠিক এমনই একটা মুহূর্তে যেখানে যাওয়া আমাদের নিষেধ, সেখান থেকে, পাতার ওপর পায়ের খচমচ শব্দ আর মৃদু স্বরে গোঙানির আওয়াজ এল। ক্রমশ আওয়াজটা ঘনীভূত হল, তারপর আরও কাছে এল, তারপর কিঞ্চিৎ ঝুঁকি নিয়ে উঁকি দিতেই তাকে আর দেখতে পাওয়া গেল না। অতঃপর সে, রাজার মত ধীর পদক্ষেপে ফের ঝোপের আড়ালে লুক্কায়িত হল।

চিলাপাতার জঙ্গলে

জঙ্গলটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই বাঁ হাতে বসেছে একটা ছোটখাটো হাট, নিত্যনৈমিত্তিক সামগ্রী নিয়ে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আনন্দ পাওয়ার কিছুই নেই, তবে এসব গ্রামীণ হাট দেখলে আমার কেমন আনন্দ হয়, ছোটবেলার কথা মনে পরে। তাই, বিকিকিনির নানান লোকের সাথে হুটহাট গল্প জুড়ে দিই যখন-তখন। কিন্তু ওদিকে ডাকাডাকি আরম্ভ হয়ে যাওয়ায়, গল্প বেশিদূর এগোতে না এগোতেই গাড়িতে উঠে পড়তে হল।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ক্রমশ পাহাড় থেকে গড়িয়ে নেমে অরণ্য ভেদ করে, দুপাশের চায়ের বাগানগুলো ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল আলিপুরদুয়ারের দিকে।

ভাল লাগছিল না কিছু। প্রকৃতিকে বলতে না পারা বাকি কথাগুলো, কুঁকড়োতে কুঁকড়োতে বিষণ্ণতার সর্পিল পথ তৈরি হচ্ছিল একটা মনে মনে। সবকিছু কি একবারে বলা যায়? এসব বলে, বুঝিয়ে তাকে খানিক সান্ত্বনা দিয়ে রাখছিলাম।

একেবারে ফেরার আগে মিনিট দশেকের জন্য নামা হল নিমতি ধাবায়। বেশ বড় একটা দোকান। এখানে গ্রসারির সবরকম সামগ্রীর সঙ্গে সঙ্গে একধারে রয়েছে খাবার হোটেলও। টুকটাক জিনিস কিনে, আর চা খেয়ে এগিয়ে চললাম নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের দিকে। হাতে সময় একদম কম। স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন ট্রেন ছাড়তে মিনিট আটেক দেরি। একটু একটু করে লাল রঙের পদাতিকের কাছে যাচ্ছি, আর ভাবছি ফেলে আসা সময়গুলোর কথা।

ফেরার ট্রেনটা যাওয়ারটার তুলনায় খানিক বেটার ছিল সবদিক থেকেই। আশেপাশে কেউ খুব একটা কথা-টথা বলছিল না বিশেষ। সবাই বোধহয় থমকে গেছিল। অরণ্য আর পাহাড়ের এ এক অদ্ভুত খেলা, শান্ত করে দিতে পারে হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য যে কাউকে। রাতের ঘুমটা ক্লান্তির জেরে ভালোই হয়েছিল, তাই টেরই পাইনি কখন ট্রেন দমদম ঢুকে গেছে।

ফেরার সময়টা বড্ড তাড়াতাড়ি এসে যায়, যতটা না আসে যাওয়ার সময়টা। ট্রেন থেকে নেমে, বাইরে এসে অনেকদিন পর দেখলাম, কুয়াশা ঘেরা সকালের শিয়ালদা স্টেশন। মনটা আবার ভাল হয়ে গেল। আচ্ছা, সময় ছাড়া আমরা আর কী কী ফেলে আসি বেড়াতে গিয়ে? ভাবতে ভাবতে, কলকাতার রাজপথ আর সরণী বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম বাড়ির পথে, নাকি উত্তরের পথে? কী জানি…!!

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

১। ঠিক এই প্ল্যানটার মতো করে বেড়াতে যেতে চাইলে টানা ৪ দিন লাগবে। আগের দিন রাতে ট্রেন ওঠা আর শেষ রাত কাটিয়ে সকালবেলা বাড়ি ফেরার সময়টা বাদ দিয়ে বললাম।

২। রাতের ট্রেনের ক্ষেত্রে হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস আর শিয়ালদাহ থেকে উত্তরবঙ্গ ধরাই ভাল সময় বাঁচানোর জন্য আমার মতে। পদাতিক ভাল ট্রেন হলেও কোচবিহার পৌঁছতে বেলা হয়ে যায় যেহেতু, তাই সারাদিনে বেড়ানোর সময় কমে আসে। ফেরবার ক্ষেত্রে চাইলে ফুন্টসিলিং ঘুরেটুরে হাসিমারা থেকে কাঞ্চনকন্যা ধরেও ফেরা যায়। যদি চিলাপাতা বা আলিপুরদুয়ার রুটের অন্য কোথাও যান, তাহলে নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে শিয়ালদহের ক্ষেত্রে পদাতিক আর হাওড়ার ক্ষেত্রে সরাইঘাট এক্সপ্রেস বেশ ঠিকঠাক ট্রেন।

৩। থাকবার ক্ষেত্রে কোচবিহারে প্রচুর হোটেল রয়েছে, তাই বুক করে না গেলেও খুব একটা অসুবিধে নেই। তাছাড়া গুগলে বেশিরভাগ হোটেলেরই যোগাযোগের নম্বর দেওয়া আছে। এবার বক্সার ক্ষেত্রে রোভার্স ইন হোমস্টে (ইন্দ্রদার বাড়ি) সবসময় আমি রেকমেন্ড করব, কারণ এরকম আতিথেয়তা আর ব্যবহার আপনি আর কোথাও পাবেন না। এছাড়াও আরও দু-একটি হোমস্টে রয়েছে কাছাকাছি। আর যদি লেপচাখায় থাকতে চান, তাহলে বলব একদম লেপচাখা ভিউ পয়েন্টেই রয়েছে হেভেন অফ ডুয়ার্স, পামশা নামক হোমস্টেগুলি। আর যদি জয়ন্তীতে নদীর পাড়ে রাত কাটাতে চান, তাহলে তো রয়েছেই নদীতীরের একদম কাছে বনলতা রিসোর্ট এবং এর কাছাকাছি আরও কয়েকটা থাকার জায়গা। এরপর আমার মতো হাসিমারায় থাকলে স্টেশনের কাছে কয়েকটা হোটেল পাবেন, তবে জাস্ট একটা রাত কাটানোর মতো হলে ঠিক আছে। কারণ, হাসিমারা স্টেশনলাগোয়া অঞ্চল কিংবা হোটেল কোনওটাই আমার সেরকম ঠিকঠাক লাগেনি। আর যদি আগে চিলাপাতা ফরেস্টে যান, তাহলে ওখানেই জঙ্গলের কাছকাছি কোন একটা হোমস্টেতে থাকতে পারেন। আমি বলব হাসিমারার থেকে সেটাই করা ভাল, তাহলে অন্তত প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ থাকবে।

৪। খাবারদাবারের ক্ষেত্রে কোচবিহার মূল শহরে বাঙালি খাবার দোকান পাওয়ার ক্ষেত্রে সেরকম কোনও অসুবিধা হবে না। এছাড়া বক্সা বা অন্যান্য জায়গায় যেখানে হোমস্টেতে থাকবেন, খাবার তো সেখানেই বলা থাকে সাধারণত। বাইরে খাবার বলতে একদম দেশীয় মোমো, থুকপা জাতীয় খাবারই পাবেন। ফুন্টসিলিং-এ তাসি মার্কেট খাওয়া-দাওয়া করবার জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা। এখানে বিভিন্ন ধরনের রেস্তরাঁ আর ছোট ছোট খাবারের দোকান রয়েছে। আপনার ইচ্ছেমতো খাবার আর দাম দেখে রয়েসয়ে ভিন্ন স্বাদের খাবার টেস্ট করতে পারবেন এখানে। তবে, চাইনিজ বা ভুটানিজ খাবারে অরুচি থাকলে চাপ আছে।

৫। গাড়ির ক্ষেত্রে ৩ দিনের সম্পূর্ণ ঘোরাঘুরির জন্য কলকাতায় আপনার বাড়ি থেকে যদি গাড়ি বুক করে যান, তাহলে সমস্ত ডিটেলস এবং টাকাপয়সার হিসেবনিকেশ করে তারপরেই সবটা ফাইনালাইজ করবেন। আর যদি না কথা বলা থাকে, তাহলে আলিপুরদুয়ার স্ট্যান্ডে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে কথা বলেও ঘোরার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমার ট্রেন, টোটো ও ৩ দিনের ওয়াগন সমেত সব মিলিয়ে ছুঁয়ে গেছিল ১০০০০ টাকা।

৬। যদি চারজনের গ্রুপে যান তাহলে কমপক্ষে এক-একজনের পুরো ট্যুর মিলিয়ে খরচ হতে পারে ৬৫০০-৭০০০ টাকা। লোকসংখ্যা বাড়লে গ্যাঁটের খরচও কমবে খুব স্বাভাবিকভাবে। যাওয়ার সময়— নভেম্বর থেকে মার্চ, আমরা জানিই সময়টা আইডিয়াল।

বাকিটা নিজের মতো করে সাজিয়ে নেবেন। অতঃপর চরৈবেতি…।

 


*সব ছবি লেখকের তোলা

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...