বাংলা ভাষা, বাংলা লিপি, বর্ণমালা ও রবীন্দ্রনাথ

বাংলা ভাষা, বাংলা লিপি, বর্ণমালা ও রবীন্দ্রনাথ | সুশান্ত ঘোষ

সুশান্ত ঘোষ

 


প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

 

 

 

 

বাংলা ভাষার উৎপত্তি বিবর্তন

বাংলা ভাষার প্রাচীন পণ্ডিতদের মতে এবং এখনও অনেকের মতে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষাই বাংলা ভাষার জননী। স্যার জর্জ গ্রিয়ারসান, ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ সুকুমার সেন, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রভৃতি ভাষাবিদগণ এই মতে বিশ্বাসী নন। তাঁদের মতে আদিম প্রাকৃত ভাষার একটি অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে।

“বাংলাভাষাপরিচয়” গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, প্রাচীন মাগধি ভাষা থেকেই প্রাকৃত বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। এই ভাষাতেই চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি লেখা হয়েছিল।

“বাংলা শব্দতত্ত্ব” গ্রন্থের ভূমিকাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছেন,

বলা বাহুল্য যথার্থ বাংলা ভাষা, প্রাকৃত ভাষা, সংস্কৃত ভাষা নয়।

বাংলা গদ্যভাষার দুটো রূপ আছে— সাধু এবং চলিত বা প্রাকৃত। ইংরেজ শাসকের নির্দেশে তাদের অর্থানুকূল্যে সংস্কৃত পণ্ডিতদের দ্বারা যে বাংলা ভাষা সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল সংস্কৃত শব্দে পূর্ণ। তাতে বাংলা শব্দের সংখ্যা ছিল খুব সামান্য। এই ভাষাই ছিল সাধু বাংলা। এই ভাষা সাধারণের বোধগম্য হয়নি। বাঙালির কথ্য ভাষার সঙ্গে এই ভাষার কোনও সম্পর্ক ছিল না। সাধু বাংলা ভাষা ছিল সংস্কৃত ব্যাকরণনির্ভর। তখন বলা হত লেখ্য ভাষা আর কথ্য ভাষা এক হওয়া উচিত নয়। সাধু ভাষা হল সাহিত্যের ভাষা। “বাংলা শব্দতত্ত্ব” গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

বাংলা গদ্যসাহিত্যের সূত্রপাত হইল বিদেশীর ফরমাসে এবং তার সূত্রধার হইলেন সংস্কৃত পণ্ডিত, বাংলা ভাষার সাথে যাদের ভাসুর ভাদ্রবৌয়ের সম্বন্ধ। তাঁরা এই ভাষার কখনও মুখদর্শন করেন নাই। এই সজীব ভাষা তাঁদের কাছে ঘোমটার ভিতর আড়ষ্ট হইয়া ছিল। সেজন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিলেন না। তাঁরা সংস্কৃত ব্যাকরণের হাতুড়ি পিটিয়া নিজের হাতে এমন একটা পদার্থ খাড়া করিলেন যাহার কেবল বিধি আছে, গতি নাই। সীতাকে নির্বাসন দিয়া যজ্ঞকর্তার ফরমাসে তাঁরা সোনার সীতা গড়িলেন।

যদি স্বভাবের তাগিদে বাংলা গদ্যসাহিত্যের সৃষ্টি হইত, তবে এমন গড়াপেটা ভাষা দিয়া তার আরম্ভ হইত না, তবে গোড়ায় তা কাঁচা থাকিত এবং ক্রমে ক্রমে তার বাঁধন আঁট হইয়া উঠিত। প্রাকৃত ভাষা (চলতি ভাষা) বাড়িয়া উঠিতে উঠিতে প্রয়োজনমত সংস্কৃত ভাষার ভাণ্ডার হইতে আপন অভাব দূর করিয়া লইত।[1]

বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের লেখা বাংলা গদ্য ছিল আগাগোড়া সংস্কৃত শব্দে পূর্ণ (ব্যতিক্রম প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা “আলালের ঘরের দুলাল”)। কালীপ্রসন্ন সিংহের “মহাভারত” অতি জটিল সাধু বাংলায় লেখা হয়েছিল যাতে সংস্কৃত শব্দের প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু তাঁরই লেখা “হুতোম প্যাঁচার নক্সা” সম্পূর্ণ চলিত ভাষায় অর্থাৎ কথ্য ভাষায় লেখা। সেই ভাষা বর্তমান কথ্য ভাষা থেকে বিশেষ পৃথক নয়।

পণ্ডিতদের বিধান উপেক্ষা করে ক্রমশ প্রাকৃত অর্থাৎ চলতি বাংলার শব্দ বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাস সাধারণের বোধগম্য হয়। ‘বিষবৃক্ষ’, ‘চন্দ্রশেখর’, ও ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ উপন্যাসগুলিতে চলিত ভাষার শব্দের ব্যবহার আরও বেশি পরিমাণে হয়।

রবীন্দ্রনাথ প্রথমদিকের উপন্যাসগুলি সাধু বাংলায় লিখলেও ‘ঘরে বাইরে’ থেকে পরবর্তী উপন্যাসগুলি অর্থাৎ ‘চার অধ্যায়’, ‘যোগাযোগ’, ‘শেষের কবিতা’, ‘দুইবোন’ ও ‘মালঞ্চ’ তিনি চলিত ভাষায় লেখেন।

পরবর্তী সাহিত্যিকরা চলিত ভাষাতেই গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপন্যাস লেখেন যা আজও অব্যাহত। চলিত বাংলাই আজ বাংলা ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

প্রাকৃত বাংলার ঠাটে যখন লিখিব তখন স্বভাবতই সুসংগতির নিয়মে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাব বাংলা ভাষার বেড়া ডিঙাইয়া উৎপাত করিতে কুন্ঠিত হইবে।[2]

সাধু বাংলা এখন প্রায় ইতিহাসে পরিণত। তবুও চলিত বাংলাকে এখনও সংস্কৃত ব্যাকরণের বিধি মেনে চলতে হচ্ছে!

 

বাংলা লিপি বর্ণমালার উৎপত্তি বিবর্তন

বাংলা লিপির উৎপত্তির ইতিহাস সুদীর্ঘ। অতি প্রাচীনকালে ভারতে দুটি লিপি ছিল: ১। ব্রাহ্মী, ২। খরোষ্ঠী। দুই লিপি লেখার ধরন ছিল বিপরীত। ব্রাহ্মী— বাম থেকে দক্ষিণে, আর খরোষ্ঠী দক্ষিণ থেকে বামে। খরোষ্ঠী লিপিটির উৎপত্তি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের আরামিক লিপি থেকে। এই লিপি ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কুষাণ যুগে খরোষ্ঠী ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার বেড়াচাঁপা ও চন্দ্রকেতুগড় থেকে পাওয়া কুষাণ মুদ্রায়, পোড়ামাটির সিল ও মৃৎপাত্রে খরোষ্ঠী লিপি পাওয়া গিয়েছে। তবে এই লিপি থেকে বাংলা লিপির উদ্ভব হয়নি।

ব্রাহ্মী লিপি থেকেই বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে। ব্রাহ্মী ভারতের প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত লিপি। এ লিপির উদ্ভব কোথা থেকে হল তা নিয়ে মতভেদ আছে। কারও মতে এটা বিদেশ থেকে এসেছে। অন্যরা মনে করেন ব্রাহ্মণরা এই লিপি তৈরি করেছেন বলেই এর নাম ব্রাহ্মী।

ব্রাহ্মী লিপির প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে নেপালের তরাই অঞ্চলে প্রিপ্রারা স্তূপ থেকে। যে কৌটোতে গৌতম বুদ্ধের অস্থি রাখা ছিল তার উপরে এই লিপিটি খোদাই করা ছিল। এটার সময়কাল খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৮৭ সাল নাগাদ। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপি ও স্তহ্মলিপিতে ব্যাপকভাবে ব্রাহ্মীলিপি পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এই লিপি হল ব্রাহ্মী লিপির অনেক পরিণত রূপ। মনে হয় বহুপূর্ব থেকে দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে ব্রাহ্মী অক্ষরগুলি শিলালিপির অক্ষরে পরিণত হয়েছে।

১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ পণ্ডিত জেমস প্রিন্সেপ ব্রাহ্মীলিপির পাঠোদ্ধার করেন। সেই সূত্র ধরেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের লিপিগুলির পাঠোদ্ধার হয়। তারপর উনিশ শতকের শেষদিকে কয়েকটি এবং বিশ শতকের শুরুতে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের লিপির পাঠোদ্ধার হয়। এগুলো থেকে বাংলা লিপির উৎপত্তি ও বিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে।

উত্তরভারতের ব্রাহ্মীলিপির দুটো ধারা ছিল— পূর্বি ধারা ও পশ্চিমি ধারা। পূর্বি ধারার ব্রাহ্মীলিপি থেকেই বাংলা লিপির উদ্ভব হয়েছে। বঙ্গদেশে ব্রাহ্মীতে উৎকীর্ণ প্রধানত দুটি নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। একটি মহাস্থান লিপি, অপরটি পূর্ববাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালি জেলায় প্রাপ্ত শিলুয়ামূর্তি থেকে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের  বেড়াচাঁপা ও চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত সিলমোহর ও পোড়ামাটির সিল ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশে উৎকীর্ণ ব্রাহ্মীলিপিই বাংলার প্রাচীনতম। এটি মহাস্থান লিপি এবং সম্ভবত মৌর্য যুগের শেষদিকে এই লিপির প্রচলন হয়েছিল।

অষ্টম থেকে নবম শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার লিপিতে উত্তরভারতের নাগরি লিপির প্রভাব পড়ে। এর ফলে যে বাংলা লিপি তৈরি হয় তাকে লিপি-বিশারদেরা প্রোটো নাগরি নাম দেন। পাল রাজবংশের রাজত্বকালে এই লিপির উদ্ভব হয়। এগারো ও বারো শতকে, সেনযুগে, বাংলা লিপি আরও বিবর্তিত হয়। এইসময় বাংলা লিপি প্রোটো বাংলা থেকে বাংলায় পরিণত হয়। তেরো থেকে সতেরো শতকের পাণ্ডুলিপি থেকে বাংলা লিপির পূর্ণাঙ্গ রূপ স্পষ্ট হয়।[3]

চার্লস উইলকিন্স ও পঞ্চানন কর্মকার ১৭৭৮ সালে তৎকালে প্রচলিত প্রাচীন পুথির বাংলা অক্ষরের আদলে বাংলা বর্ণমালা তৈরি করে হুগলিতে প্রথম বাংলা মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বছরই ওই মুদ্রণযন্ত্র থেকে হ্যালহেডের “এ গ্রামার অফ দি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ (A GRAMMAR OF THE BENGALI LANGUAGE)” বইটি ছাপা হয়। হ্যালহেডকে এই কাজে সহায়তা করেন পঞ্চানন কর্মকার। পঞ্চানন কর্মকার ও হ্যালহেড স্থির করে দিয়ে গেলেন বাংলা বর্ণমালার রূপ!

সূত্র: বাংলা লিপি-বাংলাপিডিয়া

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আগে বর্ণমালা শেখার যেসব বই রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল তার অধিকাংশই বস্তুতপক্ষে শিশুর বাংলা প্রথম পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শ্রীরামপুর মিশনের ‘লিপিধারা’ (১৮১৫), ‘জ্ঞানারুণোদয়’ (১৮২০), রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ (১৮৩৩), ‘শিশুবোধক বঙ্গবর্ণমালা’ (১৮৩৫), রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের ‘শিশু সেবধি বর্ণমালা’ (১৮৪০), স্কুল বুক সোসাইটির ‘বর্ণমালা প্রথম ভাগ’ (১৮৫৩) ও ‘বর্ণমালা দ্বিতীয় ভাগ’ (১৮৫৪) বইগুলি জনপ্রিয় হয়নি।

বাংলা ভাষাশিক্ষার প্রথম পাঠ হিসেবে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ’ (১৮৪৯) বইটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালে ‘বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ’ বইটি লিখে সারা দেশে সাড়া ফেলে দেন। ওই বছরই তিনি ‘বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগ’ বইটি লিখেছিলেন।

বিদ্যাসাগরের লেখা বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ বই দুটি জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছয়। বই দুটি লেখার পরে একশো ষাট বছরের বেশি অতিক্রান্ত হয়েছে তবুও তাদের জনপ্রিয়তা কমেনি। এত বছরে বিদ্যাসাগর প্রস্তাবিত বাংলা বর্ণমালা প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। বাংলা ভাষায় শিক্ষিত জাতি নির্মাণে বিদ্যাসাগর অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

বাংলা বর্ণমালা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

তিনটে স, দুটো ন ও দুটো জ শিশুদিগকে বিপাকে ফেলিয়া থাকে।… এছাড়া দুটো ব-এর মধ্যে একটা ব কোনো কাজে লাগে না। ঋ, ঌ, ঙ, ঞ-গুলো কেবল সং সাজিয়া আছে।[4]

এ-বিষয়ে কি এত বছর পরেও আমরা ভাবনাচিন্তা করব না?


[1] ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। বাংলা শব্দতত্ত্ব; রবীন্দ্র রচনাবলী। পঃবঃসঃ। ১৯৮৯। পৃঃ ৬০০।
[2] পূর্বোক্ত, পৃঃ ৬০৩।
[3] ইসলাম, মো. শরীফুল। বাংলাপিডিয়া। বাংলা লিপি।
[4] দ্রষ্টব্য, টীকা ১। পৃঃ ৬১০।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...