আমার বইমেলা

দেবকুমার সোম

 



কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

বইমেলার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক সমানুপাতিক— এমন গোলমটর ধারণায় আমার অন্তত আস্থা নেই। তবে হ্যাঁ, বইমেলায় বিভিন্ন ফিকিরে উদ্যোক্তা আর প্রকাশকদের যথেষ্ট অর্থপ্রাপ্তি ঘটে; এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। যে কারণে আজকাল জেলা ছাড়িয়ে পাড়ায় পাড়ায় বইমেলা সংগঠিত হতে দেখা যায় (যেমন দমদম বইমেলা, সোনারপুর বইমেলা, নিউটাউন বইমেলা)। আর কলেজ স্ট্রিট চত্বরের কথা নতুন কী বলার আছে? সেখানে বইমেলার মোচ্ছব এখন আর বার্ষিক নয়, ত্রৈমাসিক। এর অর্থ কি এই যে, আমি বলতে চাইছি বইমেলায় সাহিত্য একেবারেই হয় না? সেটা বললে ডাহা মিথ্যে বলা হয়। বইমেলাতেও সাহিত্য হয়; তবে তা ইকনমিক্সের ভাষায় সারপ্লাস ভ্যালু। তার বেশি কিংবা কম কোনওটাই নয়।

প্রথমেই বলে নেওয়া যাক লিখিত সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল বই— গত প্রায় তিনশো বছর সেই ছাপা বই রাজত্ব করে এখন ডিজিট্যাল প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে। তিনশো বছর আগেও দুনিয়ায় সাহিত্য ছিল, আগামীদিনেও সাহিত্য থাকবে। তবে বলে নেওয়া দরকার, সব বই কিন্তু সাহিত্য নয়— খানিকটা পাঠ্যপুস্তকে পড়া ক্ষার আর ক্ষারক সম্পর্ক। বইয়ের বিপুল সাম্রাজ্যের মধ্যে সাহিত্যের জায়গাটা খুব স্পষ্ট আর সামান্য। তাই বইমেলা মানে সাহিত্যমেলা এমনটা নয়। এমনকি লিটারারি মিট নামে করপোরেট-লালিত যে মোচ্ছব দুনিয়া-জুড়ে চলছে, সেখানেও সাহিত্যের ভাগ এতটা কম যে, সিনেমার নায়িকাদের লেখা রন্ধনপ্রণালী যতটা জায়গা পায়, অকুলীন সাহিত্যিকদের সেটুকু মর্যাদাও সেখানে জোটে না। কিন্তু এমনটা কেন? কারণ বইয়ের একটা অর্থনৈতিক মূল্য আছে; সেখানে অবিবেচকের মতো সাহিত্যকেও গুঁজে দেওয়া হয়েছে। বাংলাভাষার যাঁরা প্রকৃত সাহিত্যিক তাঁরা কিংবা তাঁদের পরিবার চিরকাল আর্থিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় মানিক বাঁডুজ্জের মতো কড়-গোনা কয়েকজন বাদে আমাদের ভাষায় সাহিত্যকে উপজীবিকা হিসেবে গ্রহণে তেমন নজির নেই— ইউরোপে কিন্তু আছে। তার মানে কি আমাদের সাহিত্যিকেরা এলেবেলে? তারা হোসে সারামাগো, কিংবা ওরহান পামুকের মতো সাহিত্যকেই তাঁদের চব্বিশঘন্টার যাপনের মধ্যে আনেননি? এমনটা ভাবলে কিন্তু ভুল সমীকরণ হয়ে যাবে। আসলে বাংলা সাহিত্যে নেপোয় দই মেরে দিয়ে যায়— বইমেলা যার সেরা জায়গা।

বই প্রকাশের অর্থনীতিতে আরও দুটো  জিনিস যোগ করছি। এক হল আজকাল বই প্রকাশের খরচ অনেক কমে গেছে। লেটারপ্রেস কিংবা অফসেট ছাপার মতো খরচ এখন আর হয় না; এ কারণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বই প্রকাশ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আর দ্বিতীয় হল লেখক-পাঠক অনুপাত। আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও লেখক-প্রতি যতজন পাঠক ছিল, সেই সমীকরণ আজ আর নেই, বরং ফাঁকটা এতটাই কমে গেছে যে, পাঠক-লেখক অনুপাতটা প্রায় সমান-সমান হয়ে গেছে। এতে একশ্রেণির প্রকাশকের হয়েছে মস্ত লাভ।

‘আন্তর্জাতিক কলিকাতা পুস্তকমেলা’ এসব দুগগিবাজির মধ্যেও সাহিত্যকে একসময় সামান্য পরিসরের হলেও জায়গা দিয়েছিল: ঠিক ততদিন, যতদিন এ মেলায় প্রবেশমূল্য ছিল। সেই ঋতুতে যেমন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘মিনিবুক’ সিরিজ হইচই ফেলে ছিল, ঠিক তেমনই লিটল ম্যাগাজিনগুলো কৃশতনু অথচ গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা প্রকাশ করে বইমেলায় ‘চার চাঁদ’ লাগিয়ে দিয়েছিল। আজ সে রামও নেই, নেই সেই অযোধ্যা। সেই মেলায় সুভাষ মুখুজ্জ্যে, বীরেন চাট্টুজ্জ্যে, কিংবা শ্যামল গাঙ্গুলিরা নিজস্ব পরিসরে ছিলেন স্বরাট। এমনকি এই সেদিন পর্যন্ত জাহিরুল হাসান কিংবা সাধন চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব এক বৃত্ত ছিল বইমেলায়।

বইমেলায় বেস্টসেলার অথরেরা যেমন অকাতরে অটোগ্রাফ বিলিয়েছেন, তেমন আমাদের মনে রাখতে হবে বিমল মিত্র কিংবা ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়দের বইয়ের বিকিকিনিতে বইমেলার কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। গত তিন-চার দশক ধরে বাংলা সাহিত্যের রাহুগ্রাসের কারণ খবরের কাগজ গোষ্ঠী— খবরের কাগজের নিয়ম মেনেই আজকের সাহিত্য কালকে কেজি-দরে বিক্রি হবে এই তার অভিপ্রায়। পাঠক, লক্ষ করে দেখবেন সে-কারণে আজকাল খবরের কাগজওলারা বইমেলায় আর দাঁত ফোটাতে পারেন না। এখন তাঁদের সাহিত্যিকদের বাজারে বড়ই মন্দাভাব; কারণ সাহিত্যের নামে ছেনালিপনায় পাঠকের যেমন আগ্রহ নেই; তেমন তেলেভাজা জাতীয় বই ছেপে আর যাইহোক সাহিত্য হওয়ার নয়। আজকের আমপাঠকদের তারা ভূতপ্রেত-দত্যিদানো কিংবা হরর-অ্যাকশনে মজিয়ে রাখতে চায়। এখনকার পাঠককে হয় ব্যোমকেশের নাতিপুতির চক্করে, অথবা ফেলু মিত্তিরের পুনর্জন্মের প্রত্যাশায় গোল-গোল সাহিত্য পরিবেশন করে। কিন্তু সাহিত্য কী তেমন দারুণ প্যালেটেবল? যাঁরা এমন সাহিত্যের পক্ষে আমার প্রশ্ন তাঁদের দিকে।

পুরনো দিনগুলো যেমনটা ছিল, স্বাভাবিকভাবে আজ আর সেদিন নেই। তখনও বইমেলায় অমিয়ভূষণ কিংবা মতি নন্দী, এমনকী দেবেশ রায়-নরারুণ ভট্টাচার্যের বই কিনতে স্টলের সামনে পাঠকের লম্বা আঁকাবাঁকা লাইন দেখা যেত না। আজও অভিজিৎ সেন কিংবা সুবিমল মিশ্র কিনতে পাঠক হামলে পড়ে না। তবু এরই মধ্যে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের সূত্রে পাঠক তার রুচি অনুযায়ী বিজ্ঞান অথবা অপবিজ্ঞানের বই কিনতে কলকাতা বইমেলায় ঢুঁ মারে। মেলার নিয়মকেতা মেনে চাড্ডি ভুলভাল বই কিনে ঢেঁকুর তোলে— ফেসবুকে বিশ্রী ফেসের সেলফি দেয়। তার সঙ্গে ফুডকোর্ট আর টিভি চ্যানেলের মাজাকি তো আছেই।

কিশোর বয়স থেকেই কলকাতা বইমেলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আদায়-কাঁচকলা। দীর্ঘ সময় প্রবাসে কিংবা বিদেশে থাকার দরুন আমি বইমেলায় যাইনি। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আমার আপত্তি সত্ত্বেও আমার বই বইমেলায় প্রকাশ করেছেন মাননীয় প্রকাশকেরা। তাতে আমার কিস্যু যায় আসেনি। বরং বিব্রত বোধ করেছি। সেই বিব্রতবোধ নিয়েই বলি যাঁরা প্রকৃত সাহিত্যের কারবারি, তাঁদের কেউ-কেউ এই বেল্লেলাপনায় নিজেদের বই প্রকাশ আর প্রচারে হ্যাংলাপনা করেন— করেন নির্মম দাদাগিরি। আর সেসব দেখে বুঝেছি বইমেলার এই মোচ্ছবকে প্রায় সকলেই নিজের মতো ব্যবহার করেন, করতে চান। কেউ কেউ সফল হন, অনেকেই হন না।

আর আমার মতো যারা, তাদের কাছে বইমেলা ফালতু মোচ্ছব ছাড়া আর কিস্যু নয়। কিছুই নয়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...