করুণাময়ী, গগন ঠাকুর এবং অন্যান্য

শরণ্যা ভট্টাচার্য

 



ছাত্রী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

সরস্বতীপুজো আর অ্যানুয়াল পরীক্ষার মধ্যে স্যান্ডউইচ যে না-বসন্ত না-শীতকালটুকু, কলকাতা যখন সদ্য ভয়ে ভয়ে রাত্তিরবেলা পাখা চালিয়ে ঘুমোতে যাচ্ছে, সোয়েটার চাদর প্রায় গচ্ছ গচ্ছ স্বস্থানে; মোড় ঘুরলেই হায়ার সেকেন্ডারির জুজু, সার্কাসের তাঁবু গোটানো প্রায় শেষ, নতুন বছরের হোয়াটস্‌অ্যাপ মেসেজ বহু পুরনো হয়ে গেছে, প্রায় নিঝুম শহর কলকাতার শীতকালকে শেষ বিদায়টাই বোধহয় বইমেলা।

পকেট ফতুর? একদম চলেগা! গরমে আর হাঁটা যাচ্ছে না? পুজোর ভিড়? পায়ে ফোস্‌কা? উও ভি মঞ্জুর হ্যায়! বইমেলা বলে কথা দাদা— ফিফটি প্রবলেমস, ওয়ান সল্যুশন— মনখারাপের অব্যর্থ টোটকা। লাগাও পানসি করুণাময়ী। যাবেন? দুপুর দুপুর ফাঁকা থাকবে। পারলে একখানা ব্যাগ, খান দুয়েক ফাঁকা বিগশপার নিয়ে নিন। লাগবে, লাগবে, বিলকুল লাগবে। জলের বোতল, ভাল হাঁটার মত জুতো তো মাস্ট! এবার একটা এস নাইন ধরে করুণাময়ী চলে আসুন। তিন নম্বর কি চার নম্বর গেট দিয়ে ঢুকুন। এই তো, এই তো দেখতে পেয়েছি।

আনন্দ-র বাইরে প্রচুর লাইন। ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকুন। আপনিও ঠিক তাল বুঝে টুক করে ঢুকে পড়বেন। হয়তো যা বই কিনতে পারতেন সবই আছে, তাও ঢাউস ঢাউস সমগ্রগুলো দেখে আপনি লোভ সামলাতে পারবেন না। আমি যখন প্রথম আনন্দে ঢুকি, একদম বাবার ডানহাত চেপে, আমার হাইট বোধহয় ওই বই রাখার টেবিলের মতোই হবে। তাকে পরপর চার খণ্ড শীর্ষেন্দু। হলুদ-সবুজ-নীল। কোনটা চাই? ইয়া জাবদা সমরেশ-সুচিত্রা। আর একটু বড় হয়ে অঢেল সুনীল, অঢেল নবনীতা। তারপর আরও একটু বড় হয়ে কালিন্দীর তীর ঘেঁষে মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাপদ। ওপরের তাক অব্দি হাত পৌঁছে গেছে তখন। আমারই কাঁধে বড় ফাঁকা ব্যাগ।

দে’জ না পত্রভারতী? মিত্র-ঘোষ না লালমাটি? নাকি অনুষ্টুপ? একটা ম্যাপ জোগাড় করে নেভিগেট করতে করতে এই ধরুন আপনি ঢুঁ মারলেন দে’জ-এ। বড় বড় চেনা বইয়ের মাঝে ঠিক পেয়ে যাবেন এন্তার মাঝারি কিংবা ছোট্টখাট্টো অচেনা বই। চোখ পড়লেই নতুন বন্ধু পাতিয়ে ফেলুন তাদের সঙ্গে। এই ধরুন গত বছরে— প্রকাশনাটা ঠিক মনে নেই— বইপত্র নেড়ে-ঘেঁটে দেখতে গিয়ে একটা অদ্ভুত নতুন বইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি। জেদ করে বইটা কিনে ফেলেছিলাম ঠিকই, এখন মনখারাপ হলে আমি ৭৪ পাতা থেকে খানিকটা পড়ে নিই। বইটার নাম দোজখনামা। (কাকতালীয়ভাবে ওই বছরই মান্টোর কালেক্টেড ওয়ার্কসও ছিল বইয়ের ফর্দে!)

দে’জ থেকে বেরিয়ে ধরুন মিত্র-ঘোষ। প্রচুর পুরনো রেয়ার বই পাবেন এখানে। গজেন্দ্রনাথ মিত্রের মহাভারতখানা! তাও এত মানুষ এত আলো এত বইয়ের মধ্যেও মনখারাপটা খুব চেপে ধরে জানেন? আমার যখন পনেরো— মানে মাধ্যমিকের ঠিক আগে আগে, অনেকগুলো পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর ছোটখাটো লেখা নিয়ে ভীষণ আদর করে ওঁরা একটা বই বের করেন। সে বইয়ের ছেঁড়াখোঁড়া পাণ্ডুলিপির বারবার রিভিশন, ভুল ঠিক করা, বই পড়াটাকে আরও ভালবেসে ফেলাটা শিখিয়েছিল ইন্দ্রাণীমাসি। ইন্দ্রাণী মিত্র। মিত্র-ঘোষের সবটুকু উচ্ছ্বাস যাকে ঘিরে। মা-মা ঘেমো গন্ধটা ছিল, “এই বইটা দেখেছিস?” প্রচেত গুপ্তর সই জোগাড় করে দেওয়া। (জি জনাব, একদম নতুন রিলিজের প্রথম পাতায় সই আছে! প্রুফ দিতে পারি।) সবটা ছিল।

গল্পের বই না ক্যান্সার কে বেশি কাঁদাতে পারে বলতে পারেন? পারেন না, না?

আচ্ছা, খিদে পাচ্ছে না? মাঠের একদম অন্য প্রান্তে যেতে হবে কিন্তু! আদার এন্ড। অনেকটা হাঁটা। আপনাকে প্রিমিয়াম ফিশ ফ্রাই খাওয়াচ্ছি বেনফিশের। একদম ছোটবেলায় মা ভেঙে ভেঙে ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দিত। কী তার সাইজ! আহা! তারপর কিঞ্চিৎ মিষ্টিমুখ করতে চাইলে নাকবরাবর উল্টোদিকে গরম গরম গোকুল পিঠে ভাজছে। দুধপুলি, পাটিসাপটা— কী চাই?

অতঃপর ভোজনসমাপ্তে ঘেরা হলগুলোর দিকে গেলে হয়। ইংলিশে থেমে নেই। হরেক ভাষার বই পাবেন খুঁজলে। এই যে বইপুজো, বুঝলেন— এ একদম থিমের পুজো। প্রতি বছর কোনও না কোনও বেশি-চেনা কম-চেনা দেশকে ঘিরে বইমেলাটা সেজে ওঠে। কখনও বলিভিয়া, কখনও গুয়াতেমালা, কখনও রাশিয়া। সে দেশের বইপত্তর, তার ইতিহাস-ভূগোল, ভাললাগা-মন্দলাগা একটু ছুঁয়ে দেখতে চাইলে সেদিকেও যাওয়া যায় বই কি। কিংবা পেঙ্গুইন, এনবিটি, টাইমসেও ঢুকতে পারি। শেলি টু শশী সব পাবেন। গতবছর ডন কিয়োতে কিনেছিলাম এক কপি। এখনও শেষ হয়নি।

বেরিয়ে বরং বড় দোকানে না ঢুকে ছোটখাটো স্টলগুলো ঘুরে দেখি। কলতান, অণুবীক্ষণ, দাঁড়াবার জায়গা, গুরুচণ্ডালি, গাংচিল। আমাদের যখন ক্লাস সেভেন কি এইট, কিছু দুঃসাহসী এবং একটু অকালপক্ক কজন মিলে ম্যাগাজিন বের করব ঠিক করেছিলাম। তার তিন নম্বর সংখ্যা বইমেলায় প্রকাশ করেছিল দাঁড়াবার জায়গা। নাম রামধনু। পাতার সংখ্যা প্রায় বত্তিরিশ। গল্প, কবিতা, ছবি স-অ-অ-ব নিয়ে। আর একটা এডিশন বেরোলে নির্ঘাত কৃত্তিবাস হয়ে যেত, জানেন! সে বছরই আমার দুবারের বেশি বইমেলা যাওয়া। বছর তেরোর আগমনী আর শরণ্যা খুব গাম্ভীর্যের সঙ্গে তদারকি করে প্যাকেট প্যাকেট বই আনপ্যাক করেছিল। সন্ধেবেলা মায়ের কাঁথাস্টিচ (না) সামলাতে সামলাতে স্টলে বসে রহস্যজনকভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে বই পাহারা দিয়েছিল। (তারপর অবশ্য উল্টোদিকের দোকানে রতনতনু ঘাটিকে দেখতে পেয়ে দুজনেই বইপত্র টাকাপয়সা দোকান ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছিল। কিন্তু, দ্যাট’স আ ডিফারেন্ট স্টোরি।) এখন আগমনীর সঙ্গে দেখা হলে ও খুব ক্লান্তভাবে আমায় জিজ্ঞেস করে “জিই?” আমি ততোধিক হতাশভাবে বলি “ইন্টার্নাল।” তারপর আমি ওকে জিজ্ঞেস করি “ইন্টার্নাল?” ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে “জিই।” হায়রে যদুবংশ!

আহা এই সন্ধে নামল বলে। পড়তি বিকেল। চাদর আছে? পারলে মুড়ি দিয়ে নিন। একবার প্রতিক্ষণ যাবেন? আরে, শুধু বই নাকি? প্রচুর রেয়ার ছবিও আনে ওরা। রামানন্দ, গগন ঠাকুর, অবন ঠাকুর, এমনকি রবীন্দ্রনাথ। এক-একজনের এক-একটা পোর্টফোলিও। বাঁধিয়ে নেবেন। গত বছর অবন ঠাকুরের কটা মিনিয়েচার কিনেছিলাম। অসম্ভব সুন্দর।

বেরোবার আগে আজকের শেষ আইটেম কিন্তু তাও বাকি। সোনাঝুরি যাই? প্যাকেট প্যাকেট নতুন বইয়ের পর মিটমিটে হলুদ বাল্বের তলায় কিছুটা উই ধরা, বাইন্ডিং বেরোনো পুরনো বই। গত বছর ওরকম একটা স্তূপের মধ্যে থেকে ন হন্যতের একখানা কপি উদ্ধার করেছিলাম। সে বইখানা কত হাত ঘুরে এসে পৌঁছেছে বইমেলায়। তার হলদেটে পাতাগুলোয় প্রাক্তন মালিকদের স্বাক্ষর তখনও জ্বলজ্বল করছে। কতগুলো অচেনা মানুষ হঠাৎ করেই তখন আত্মীয়। আউট অফ প্রিন্ট বহু বহু বই ধুলোর একটা আস্তরণের নিচে সেকেন্ড হ্যান্ডের তকমাটা নিয়েও খুব ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। নাকে চাদরটা চেপে বসে পড়ুন।

অবশেষে এক রোল ছবি— মতান্তরে ঢেলে বিক্রি হওয়া পটচিত্র— আর ব্যাগ ভরা প্রচুর প্রচুর বই নিয়ে মাঝখানের মুক্তমঞ্চের ধার ঘেঁষে বসে পড়ুন। সন্ধে হয়ে গেছে। আলো জ্বলল সবে। এক পাশে চলছে সতেজ কবিতা পাঠ। বাবা-মায়ের হাত ধরে বাচ্চারা হাঁটছে। কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। বন্ধুর হাতে বই ধরিয়ে কেউ ছুটল অন্য স্টলে বই দেখতে। একটা মেয়ে সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। চুল উড়ছে, কপালে লাল সবুজ টিপ কী সুন্দর লাগছে। বুঝলেন তো— বুকের ভেতর যে থির থির সুখ, কোনটা আগে পড়ব এই প্রশ্নটা, কলকাতার এই মুচকি হাসিটাই আপনার, ইয়ে, বইমেলা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...