গির অরণ্য ও এক সিদ্ধার্থের গল্প

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

সিদ্ধার্থের গল্প। এ সিদ্ধার্থও সাধনা থেকে উঠে আসা সিদ্ধার্থ। এ সিদ্ধার্থও মুক্তি কথা বলে। মানুষের মুক্তি। অন্যরকমভাবে। সময়ের থেকে, সমাজের থেকে এগিয়ে…

গুজরাটের জুনাগড়ের বছর পঁচিশের সার্টিফায়েড পারমাকালচারিস্ট সিদ্ধার্থ কুবাভতের ছোটবেলা থেকে আইআইটিতে পড়ার স্বপ্ন। খুব স্বাভাবিক নয় কি? এক মধ্যবিত্ত মেধাবী তরুণ ভারতীয়র প্রতিনিধি…। সিলেবাস ঘাঁটা। কোচিং। টিউশন। মুখস্থ। পড়ার বইয়ের বাইরের পৃথিবী তেমনভাবে সাধনায় আসেনি, আসে না সেই স্বপ্নে।

এখানেই ছন্দপতন। আর সেই পতনের ছন্দেই আলোর খোঁজ। প্রথাগত শিক্ষা থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন হঠাৎ। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার ইচ্ছেটা চলে গেল। দিশেহারা সময়। কী করবেন? বছরদুয়েক লাগল দিশা খুঁজে পেতে। নানারকম ছোটখাটো কোর্সওয়ার্ক, ভোকেশনাল ট্রেনিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ— এসব চলল। তবু, সিদ্ধার্থ যেন আলো খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

আর তখনই একটা ন্যাচারাল ফার্মিং ওয়ার্কশপ। বুঝলেন কৃষি নিজেই এক্সপ্লোর করার জন্য একটা বিস্তীর্ণ জায়গা। একটা উঠোন পেলেন। কিন্তু কীভাবে এগোবেন? দিগন্তবিস্তৃত এই মাঠে কীভাবে লাঙল চালাবেন যুবক? গোটা দেশ জুড়ে পারমাকালচার আর ন্যাচারাল ফার্মিং নিয়ে অসংখ্য প্রশিক্ষণে গেলেন। জোর চাপল। কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়লেন। কৃষকদের সঙ্গে মাঠে নেমে কাজ বুঝলেন। নিজে চাষ করলেন। বুঝলেন, জৈব চাষের ম্যাজিক।

আর তারপর ২০২০। গির অরণ্য। জমি কিনলেন সিদ্ধার্থ। নাম দিলেন ‘জয় জাঙ্গল’। স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মশালার আয়োজন করলেন। শেখালেন কীভাবে জৈব, একমাত্র জৈব চাষেই মাটি ফিরে পেতে পারে স্বাস্থ্য। কৃষির মূলগত ভিত্তিগুলো বুঝিয়ে বললেন তরুণদের। আর তখনই অতিমারি। বাকি ভারতবর্ষের মতো আঘাত পেলেন সিদ্ধার্থ নিজেও। বন্ধু, পরিজনের বিয়োগ। কাজে পিছিয়ে আসা। সাময়িক বিরতি। আবার লেগে পড়া লড়াইয়ে। আবার সবাইকে বোঝানো, মাটির সঙ্গে, গাছের সঙ্গে লেগে পড়ে থাকা, মানুষের সঙ্গেও…

এখনও পর্যন্ত খানদশেক বড় বড় কর্মশালার ব্যবস্থা করে চল্লিশের কাছাকাছি যুবককে নিজের মতো গড়ে তুলতে পেরেছেন সিদ্ধার্থ। তরুণদের বলছেন, চারার প্যাটার্ন অনুযায়ী চাষ করতে। বলছেন কম্প্যানিয়ন প্ল্যান্টিং-এর কথা। কিছু কিছু গাছ আলো ভালোবাসে, কিছু গাছ ছায়া। যদি এঁদের একসঙ্গে লাগানো যায়? একটি শর্ত তাহলে তো আরেকটির পরিপূরক হবে খুব সহজেই। রাসায়নিক ব্যবহার না করে শুধুমাত্র জৈব চাষের ওপর ভিত্তি করে লাগালেন পেঁপে, আম, ড্রাগন ফ্রুট, বেগুন, বিন, উচ্ছে এবং আরও অনেক সবজি। গোলাপ এবং জুঁইয়ের মতো ফুল লাগিয়েও সফল হলেন এই সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে।

এর পরে কী? সিদ্ধার্থ কি এখানেই থেমে যাবেন? যতটা এগিয়েছেন এভাবেই চলবে সময়? তা তো হওয়ার কথা নয়? সিদ্ধার্থ নাম যাদের হয়, তারা তো উত্তরণের পথ দেখায়। আত্মতৃপ্তি তাদের জন্য নয়। সিদ্ধার্থ কর্মশালাগুলোকে বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামের আওতায় ফেললেন তাঁর কৃষিপদ্ধতি। একটি মাড হাউজ তৈরির পরিকল্পনা আছে সিদ্ধার্থর। কাজকর্মও চলছে পুরোসোমে। এবছরের মাঝামাঝির দিকে সেখানে পাকাপাকিভাবে উঠে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তাঁর। এখন যেখানে আছেন, সেটি পরে স্টোরেজ হিসেবে থেকে যাবে। মাঠের ভেতর, ঘাসের ভেতর, গাছের ভেতর থেকে যাবেন মানুষটি।

সিদ্ধার্থ বলছেন, ‘প্রতিদিন সকালে উঠে পাখির ডাকের ভেতর চোখ মেলতে ভালোবাসি। তারপর প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়ে এক কাপ চা খাই? কেন করব বলুন তো অন্য কিছু? প্রকৃতি তো আমাদের সবকিছু দিচ্ছে। ফার্মে প্রতিটা দিন সুন্দর এবং কর্মব্যস্ততামুখর। অথচ সহজ, সরল। আর তাছাড়া, যখন কাজ করি না, তখন আমি এমনিই প্রকৃতিকে দেখি। একটা পাখি পোকা খাচ্ছে, ফুলের ওপর বসছে একটা পোকা… এসব কিছুই কী অদ্ভুত অবাক করে আমাকে! জীবন ধীর, সহজ এবং সুন্দর। একে অনর্থক জটিল করা কেন?

আরও অনেক সহজ, সুন্দর, স্থির সিদ্ধার্থ কুবাভত জন্মাক ভারতবর্ষে…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...