বইমেলার অপার সম্ভাবনা— আমরা কবে বুঝব

সুব্রত দাস

 


কর্ণধার, সেতু প্রকাশনী

 

 

 

 

কলকাতা ব‌ইমেলা প্রায় শেষ লগ্নে। শীতকাল বিদায়ের মুখে যখন বসন্তের আগমনী ভেসে আসে সবুজ পাতা, কোকিলের ডাকের সঙ্গেই “এই মরা শহরে পাতা গজায়, ফুল ফোটে, প্রজাপতি ওড়ে,/সোনালীরোদে ভরে ওঠে দু’ একটা মিষ্টি ফল— খুব উঁচুতে।” মাঝের করোনার দু বছর ছাড়া ব‌ইমেলা আসার কোনও অন্যথা হয়নি। আবাসিক স্কুল থেকে কলকাতায় এসে, শহরের গলিঘুঁজি সহ ঘরবাড়ির মধ্যেই, ধুলোময়লার মধ্যেই একটা শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল কলেজ স্ট্রিটের ব‌ইপাড়া। খুবই ভাল লাগত। তখন শীতকালে কলকাতায় দুটি ব‌ইমেলা হত। একটি সরকার পরিচালিত আরেকটি গিল্ড পরিচালিত। আমরা সাদা চোখে দেখতাম সরকারি মেলার থেকে গিল্ড পরিচালিত মেলায় জৌলুস লোকসমাগম বেশি হত। আমরা দুটি মেলাতেই যেতাম, ব‌ইয়ের মধ্যে ডুবে যেতাম। আর ক্লান্ত হলে মেলায় খেতাম। আবার ব‌ই দেখতাম। কিনেছি প্রচুর। সারাবছর টাকা জমিয়ে মেলায় ব‌ই কিনতাম। এমনটাও ভেবেছি মেলায় দেখি, তালিকা করে মেলার শেষে কলেজ স্ট্রিটের ব‌ইপাড়ায় কিনব। সত্যি বলতে কি অধিকাংশ সময়ে ব‌ইগুলো আর খুঁজে পাইনি। চেনা ব‌ই বা প্রকাশক ছাড়াও অনেক প্রকাশক আসেন যাদের কলেজ স্ট্রিটে দোকান নেই। তাদের ব‌ই আর পাওয়াই যেত না। ক্রমে সরকারি মেলা বন্ধ হয়ে গেল, গিল্ডের ব‌ইমেলা সগৌরবে টিঁকে থাকল। পেছনের গল্প জানি না, কিন্তু ক্রমেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মেলার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে আর আমাদের মতো অনেকেরই ব‌ইমেলায় ব‌ই কেনায় ঘাটতি পড়েনি। প্রকাশকদের কী লাভক্ষতি হয়েছে তা জানার সুযোগ হয়নি, কিন্তু ব‌ইমেলা পুরোটাই গিল্ড পরিচালনা করায় পাঠকদের একটা ক্ষতি তো হয়েছে। পাঠকরা কেবল আরেকটি ব‌ইমেলা থেকে বঞ্চিত হল তা নয়, মেলার বৈচিত্র্য বা মেলাদুটির মধ্যে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বঞ্চিত হলাম আমরা। গিল্ড পরিচালিত ব‌ইমেলায় দুটি আকর্ষণ আছে। একটি থিম প্যাভিলয়ন, আরেকটি হল বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। থিমের মাধ্যমে অন্য দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে উৎসাহ তৈরি হয়, কিন্তু বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখানে আমন্ত্রিত হয়ে ব্যবসা করতে পারলেও এখানকার প্রকাশকরা সেই সুযোগ পায় না। এত বছর ব‌ইমেলা হলেও, এতবার বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখানে এলেও প্রকাশকরা দাবি তুলতেই পারেন দুই দেশের মধ্যে ব‌ইয়ের ব্যবসায় কোনওরকম রেড টেপ থাকবে না। ইউরোপের প্রকাশকরা এই ব্যবস্থায় প্রভূত ব‌ই বিক্রি করেন। এখানকার প্রকাশকরা ন্যূনতম বাংলাদেশে একটা ব‌ইমেলার আয়োজন করতে পারলেন না। এটি এপার বাংলার সমগ্র প্রকাশনার জন্য তো বটেই, বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যও সুখবর নয়। আমরা সেই সুখবরের প্রত্যাশায় আছি।

 

প্রথম থেকেই মেলার প্রথমে সারা মেলা জুড়ে কয়েকদিন কেবল সব স্টল ঘুরতাম তারপর পছন্দের স্টলগুলোতে বারবার যেতাম। এরও পর পকেটের রেস্ত বুঝে ব‌ই কিনতাম। যথারীতি সব পছন্দের ব‌ই আর কেনাও হত ন। কিছু ব‌ই না কেনার আক্ষেপ থেকেই যেত। বলাই বাহুল্য সে ব‌ইগুলোর বেশিরভাগ আর পরে খুঁজেই পাইনি। এখনও সেই ট্র্যাডিশন চলছে। এখন একটা বিষয় নতুন যোগ হয়েছে ছাড়ের রমরমা। ব‌ইমেলা শুরুর সময় কেন, গত ব‌ইমেলাতেও ছাড় শতকরা ১০ শতাংশ দেওয়াটাই নিয়ম ছিল। এখনও জেলা ব‌ইমেলায় লেখা থাকে প্রকাশকদের ১০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে। আমরা পাঠকরা অনেক আগেই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলাম যে এটাই স্বাভাবিক। ব‌ইপাড়ায় এত ব‌ই একসঙ্গে দেখাও যায় না, আর ব‌ইমেলার যে আলাদা এক বিশাল খরচ আছে সেটা বুঝেছি ব‌ইমেলায় প্রকাশক হিসেবে অংশগ্রহণ করার পর। প্রকাশক হিসেবে মনে হয় যে সমস্ত দোকানদার সারা বছর আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের সংসার চালান তাদের আমরা বঞ্চিত করতে পারি না। এখন উলটপুরাণ। ব‌ইমেলায় কোনও কোনও জায়গায় ছাড় দেওয়া হচ্ছে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত। ব‌ইপাড়াতেই শতকরা ৩৫ ভাগ ছাড় নিয়ম হতে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এতে ব‌ইয়ের দাম তো বাড়ছেই আর ছোট দোকান ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট ব‌ইমেলায় দেখেছিলাম একটা গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান সব জায়গায় লেখা ছিল শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সেমিনার আলোচনায় উঠে এসেছে “Support the local book shops “। ইউরোপীয় প্রকাশক ও পুস্তক ব্যবসায়ীদের সংগঠন তাদের সেমিনারে তথ্য সহযোগে দেখিয়েছেন কেন স্থানীয় ছোট ব‌ইদোকান না থাকলে প্রকাশকরা টিঁকে থাকতে পারে না। কলেজ স্ট্রিট থেকে ব‌ইমেলায় যেভাবে কিছু প্রকাশকরা এই ছাড়ের খেলায় মেতেছেন তা আগামী দিনের জন্য অবশ্যই অশনিসঙ্কেত। এর পাশাপাশি অবশ্য একটা ভাল দিক হল কলকাতায় তো বটেই, সারা পশ্চিমবাংলায় অনেক নতুন প্রকাশনা ব‌ই প্রকাশ করছেন যার গুণমান অনেক উন্নত। যে বিষয়টি ভাবায় তা হল এই সব প্রকাশকদের নিজেদের মধ্যে কোনও জোট নেই। ব‌ই বিপণনের ক্ষেত্রে সাবেকি ধরন, না নতুন কিছু করব এই ভাবনায় এখনও সাবালকত্ব অর্জন করা গেল না। সোশাল মিডিয়ার কথা বলছি না, সেটা অনেকেই তাদের মতো করে করেন, কিন্তু আগামীদিনে অনলাইন না ব‌ইদোকান কোনটা কার্যকরী, বড় অনলাইন জায়েণ্ট না ছোট দোকানদার কাকে গুরুত্ব দেব? প্রকাশকদের এইসব ভাবতে গেলে তথ্য দরকার, হাওয়ায় কুস্তি করা যায় না। ফ্রাঙ্কফুর্ট ব‌ইমেলার কথা বলতেই হচ্ছে এক্ষেত্রে, কারণ পেশাদার সংস্থা দিয়ে ওঁরা সার্ভে করান শুধু তাই নয়, কোভিড-পরবর্তী সময়ে বাজারের অবস্থা, পাঠক কোন ধরনের ব‌ই পড়ছেন, আর কোন কারণে ব‌ই কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অর্থাৎ consumer behaviour পর্যবেক্ষণ করাচ্ছেন, আর তার রিপোর্ট সব সদস্যদের তো পাঠাচ্ছেনই, মেলায় সেমিনারে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করে জানাচ্ছেন সেই ধরনের উদ্যোগ বড় প্রকাশনা সংগঠনই করতে পারেন, কারণ তা ব্যয়বহুল। এগুলি এখানে এখনও হলই না, কেউ ভাবলেনই না। আমাদের কলকাতা আন্তর্জাতিক ব‌ইমেলার বয়স নয় নয় করে ৪৬ বছর হয়ে গেল, কিন্তু এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাজ গিল্ডের মতো শতাব্দীপ্রাচীন সমিতি ভাবল না, এখন প্রকাশকদের যে নটা সংগঠন আছে তারাও কেউ ভাবল না। ব‌ইমেলার মতো ফোরাম প্রকাশক-পাঠকদের সমস্যার জন্য একটা ভাবনার আদানপ্রদানের জায়গা হতে পারত। সেটা হলে খুবই স্বাস্থ্যকর হত। কলকাতা ব‌ইমেলা এমনই এক জায়গা। এটি পাঠক-প্রকাশকদের একটি স্বপ্নের জায়গা। এটি বহু বছর ধরে সবার আগ্রহের জন্যই তৈরি হয়েছে। একে ব্যবহার করতে পারলে সব স্টেকহোল্ডারদেরই মঙ্গল।

 

ব‌ইমেলায় ব‌ই ছাড়াও আরও অনেক হাজারো ভালোবাসার জায়গা ব‌ইয়ের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে। পাঠক ব‌ই দেখবেন, ইচ্ছে হলে কিনবেন, কিন্তু খেতে তো হবেই। এই খাবারের স্টলগুলি আমার তো মনে হয় মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এ নিয়ে অনেকেই খিল্লি করেন, সেটা না জেনেই করেন, পাঠকদের ছোট করেন। অনেকেই ব‌ইমেলায় ব‌ই না কিনে খেতে আসেন। বেশ করেন, তাঁরা তো কোনও পানশালায় যাচ্ছেন না। এ নিয়ে কতিপয় বুদ্ধিজীবীর গেল গেল রব দেখে সত্যিই হাসি পায় না, করুণা হয়। সবচেয়ে বড় ব‌ইমেলা ফ্রাঙ্কফুর্ট ব‌ইমেলায় খাবার স্টল দেখে তো এঁরা মূর্ছা যাবেন। ব‌ইমেলায় কপোত-কপোতী প্রেম নিবেদন করবেন, ঘুরবেন এটাই স্বাভাবিক। সাজগোজ করে ছোট ছেলেমেয়েরা প্রজাপতির মতো ঘুরবে। সেটা নিয়ে যাঁরা কটাক্ষ করেন সেটা তাঁদের হতাশার প্রতিচ্ছবি। এই লেখকও ব‌ইমেলায় এই ভালবাসার কিছুক্ষণের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। এই ট্র্যাডিশন চলুক, ব‌ইয়ের গন্ধের মধ্যে আগামী জীবন যূথবদ্ধভাবে চলার শপথ নিক, এটাই কাম্য। কিন্তু যূথবদ্ধভাবে চলার শপথের মাঝে সমাজও থাকে। ব‌ইমেলায় একসময়ে মিছিল, রাজনৈতিক পত্রপত্রিকা ঘুরেঘুরে বিক্রি, এমনকি স্টলের সামনে মিটিং করতেও দেখেছি। ১৯৯৯ সালে যখন তৎকালীন নকশালপন্থী জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির তিনজন সদস্যকে হত্যা করা হয় ভুয়ো এনকাউন্টারে, তার বিরুদ্ধে এপিডিআর স্টলের সামনে সভা হয়েছে, মেলার শেষদিনে একটি বাম সংগঠন মিছিলও করেছে, বাংলাদেশের রাজাকারদের বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে, এমনকি লালুপ্রসাদ যাদবকে কালো পতাকা দেখানো হয়েছে বিহারে নকশালপন্থী আন্দোলনের ওপর দমনপীড়নের প্রতিবাদ করে। সেই ধারা সম্পূর্ণ লুপ্ত। এতে নাকি ব‌ইমেলার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ব‌ইমেলা চত্বরেই নাট্যকর্মী রাজা বিশ্বাস সহ কয়েকজনকে বিধাননগর পুলিশ লাঠিপেটা করে, বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। মেলা কমিটি পরে হস্তক্ষেপ করে। এটা যেমন অভিনন্দনযোগ্য তেমন এই প্রতিবাদী সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া, ব‌ইমেলার সবধরনের চিন্তার স্বাধীনতা থাকাটাই স্বাভাবিক। দক্ষিণপন্থীরা যেমন স্টল দিচ্ছেন, প্রতিবাদীরাও স্টল দেবে। সবধরনের ব‌ই মানুষ পড়বে এটাই হ‌ওয়া উচিত। ফ্রাঙ্কফুর্ট ব‌ইমেলার বাইরে দেখেছি ইরানের আন্দোলনের সমর্থনে প্রতিদিনের প্রদর্শন। এই সংস্কৃতি মুক্তচিন্তার সহায়ক তো বটেই, ব‌ইমেলার জন্যও ভাল।

কলকাতা ব‌ইমেলার অনেক সদর্থক দিক আছে। যেমন লিটল ম্যাগাজিন। এখানে গতবছর পর্যন্ত বিনা পয়সায় টেবিল পাওয়া যেত। সেটি এবারে টাকা দিতে হয়েছে বলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কিন্তু সবকিছুরই খরচ আছে। তাই কর্তৃপক্ষ এটি করেছেন বলেই মনে হয়। অন্যদিকে অনেক প্রকাশনা টেবিল নিয়ে যে ব্যবসা করছেন এটা তো একদম ওপেন সিক্রেট। গাছেরও খাব, তলারটাও কুড়োব। এই মানসিকতাও ব‌ইব্যবসার জন্য মঙ্গলজনক নয়।

সবশেষে বলি সেতু প্রকাশনীরই একটি ব‌ই প্রকাশ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক অমিয় দেব নতুন ব‌ই হাতে নিয়ে প্রথমেই বললেন— “নতুন ব‌ইয়ের গন্ধ পেতে খুবই ভাল লাগে।” বলেই ব‌ইয়ের মধ্যে সেই চেনা গন্ধ, দপ্তরীদের গন্ধ পাওয়ার বাসনায় ব‌ইয়ের পাতার মধ্যে ডুব দিলেন অধ্যাপক দেব। দুনিয়া জুড়ে ইবুক, পিডিএফ, পাইরেসি সত্ত্বেও brick and mortar ব‌ইয়ের স্টল থাকবে, কাগজের ব‌ই থাকবেই। ভীষণভাবে থাকবে। ভবিষ্যৎ পাঠকদের।

এটাও বোঝার সময় এসেছে ব‌ই কেবলমাত্র একটি সাংস্কৃতিক প্রোডাক্ট নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক পণ্য যা সমাজ ও দেশকেও পুষ্ট করে। বহু মানুষের রুটিরুজি জোগায়, সরকারের কোষাগারকেও রক্ত জোগান দেয়। ব‌ইমেলা তাই কেবলমাত্র ব‌ই বিক্রি নয়, এসব ভাবনার আদানপ্রদানের জায়গা হতে পারে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4138 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...