মিনুরানি একজন সাধারণ ছোটখাটো মেয়ে

মিনুরানি একজন সাধারণ ছোটখাটো মেয়ে | বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

সত্যি এতই সাধারণ যে তাকে নিয়ে গল্প লেখা খুব মুশকিল। শুরুই করা যায় না ভাল করে। মানে ওই যে শুরুর একটি বাক্য দিয়ে পাঠককে গেঁথে ফেলা, সেটা মিনুরানির মত এক সাধারণ নারীকে দিয়ে সম্ভব নয়। হ্যাঁ এখন সে নারী পদবাচ্য, কিন্তু আমি তো দেখেছি সেই ছোটবেলা থেকে, আর বয়স বাড়লেও কোনওভাবেই বড় কিছু হয়ে উঠতে পারেনি যে তাকে নারী বলে আলাদা একটা আসন দেওয়া যায়। মোদ্দা কথা কোনওভাবেই ছাপ ফেলার মত মেয়ে সে ছিল না কোনওকালে।

চেহারা কেমন তার? আলাদা করে বলার মত কিছু না। নাক বোঁচা, চোখ ট্যারা হলেও একটা স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়। মিনুরানির সেটাও ছিল না। নাক বোঁচাও নয়, আবার টিকালোও বলা যায় না। পটলচেরা চোখ ছিল না, না ছিল কুঁতকুঁতে। ঠিক দেখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটাই। লম্বা বলা যাবে না, বাঙালি মেয়ের নিরিখে চলনসই হাইট। শ্যামলা রঙে আরও কয়েক পোঁচ পড়লে কৃষ্ণকলি বলার সুযোগ তৈরি হত হয়তো, ওদিকে মুখে হলুদবাটা লাগিয়ে যত্ন নিলে বিকেলের নরম আলোয় ফরসা বলেও দিব্যি চালানো যায়। পোশাকআশাকে ঠিকঠাকই ছিল। বাপের অত মুরোদ নেই যে বাহার করবে, কিন্তু মলিন বা ছেঁড়া জামাকাপড়ে দেখা যায়নি কোনওদিন। মোদ্দা কথা সব মেয়ের রূপগুণ জড়ো করে সমষ্টি দিয়ে ভাগ করলে যা দাঁড়ায়, তার কিছুটা তলার দিকে, তলানি নয়।

তবে একটা অসাধারণত্ব ছিল হয়তো বা, মানে যদি সে তকমাটা লাগানো যায় ওর গায়ে কোনওপ্রকারে। সেটা হল মুখ জুড়ে প্রশান্তি। কে জানে সেটা প্রশান্তি না সহ্যশক্তি। হ্যাঁ, সেটা ছিল মেয়েটার। সাত চড়ে রা কাড়ত না। পড়াশোনায় তো ছিল ওই মানে মাঝারি মাপের। ফেল করেনি কোনও ক্লাসে কখনও, কিন্তু কোনও বিষয়েই উল্লেখ করার মত কিছু  হয়নি একবারের জন্যেও, বরং প্রায় ঘুঁটি উল্টানোর অবস্থা হয়েছে কখনওসখনও। খেয়েছে বাপের হাতে দু চার ঘা, বেশ জোরেই মনে হয়, অনাদিবাবু খুব হাঁকডাক করে মারতেন। মাও কি চুলের মুঠি ধরে ‘এই মেয়েকে নিয়ে আমি কোথায় যাই’ বলে শোকাতুরা হয়নি? কিন্তু মিনু মুখে রা কাড়েনি। চোখ দিয়ে জল বেরোতেই পারে, কিন্তু সে আর বাড়ির ভিতরে ঢুকে কে দেখতে যাচ্ছে। এমনকি স্কুলেও কতবার হয়েছে যে বিভিন্নভাবে অসাধারণ মেয়েরা— সে পড়াশোনায় হোক কি রূপেগুণে, বা নেহাতই গেছোপনায়— কোনও গোলযোগ করেছে ক্লাসে, তার দোষারোপ অম্লান বদনে মিনুরানির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেয়েটা এমন অবাক হয়ে যেত যে তার অতি সাধারণ চোখ দিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকানো ছাড়া কিছুই করতে পারত না। আরে বাবা, একটু তো কেঁদে ফেল! তাহলেও তো মানুষের মন গলে। বরং ‘দোষ করেও কেমন গরুর মত চেয়ে আছে দেখো’ বলে দিদিমণির কাছে হাতে স্কেলের বাড়ি খেয়েছে। এরকম না-ভাল না-মন্দ মেয়ের তেমন কোনও প্রাণের বন্ধুও থাকে না যে ওর পক্ষ নিয়ে বলার জন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে। তাছাড়া আঙুলের গাঁটে স্কেলের বাড়ি খেয়েও মেয়ে যদি একটু ফুঁপিয়ে না কেঁদে ওঠে, তাকে সহানুভূতি দেখাতে আর কারও বয়েই গেছে। এমন তো নয় যে অন্য কারও বিপদে সে বুক পেতে দিয়েছে। নিজের জন্যেই যে কখনও প্রতিবাদ করেনি, সে আর কারও হয়ে কীইবা বলবে।

এইরকম মেয়েদের বাড়িতে ডাকসাইটে দাদা থাকে সাধারণত। মিনুরানির ছিল একটি না, দুটি। আসলে একজনই দাদা, চার বছরের বড়। অন্যজন ভাই, দুই বছরের ছোট। কিন্তু সে তো আর মিনুর মত সাধারণ নয়, বেশ ওস্তাদগোত্রের ছোট থেকেই। অতএব দুই বটবৃক্ষের ছায়ায় লতাগুল্ম হওয়া ছাড়া গতি ছিল কোথায় সে মেয়ের। এমন নয় যে ওরা বোনের উপর কোনও অত্যাচার করত, না না সেরকম একদমই নয়। কিন্তু সব ব্যাপারে খবরদারি করতে ছাড়েনি। মিনু যদি কোনও সময় ফোঁস করে উঠত, তাহলে কি অতটা পারত? বিষ না থাকলেও তো সাপে ফণা তোলে। মিনুরানি সে ধাতের নয়। আমি কি এমনি এমনি ওকে সাধারণ মেয়ে বলেছি। অতি সাধারণ ছিল মেয়েটা।

শত সাধারণ মানুষের জীবনেও একটা সময় আসে যখন কুঁজোরও চিত হয়ে শুতে সাধ যায়। সেই সময়টা হল যৌবন। তপ্ত অপরাহ্ণে হালকা বাতাসের মত এসে গাছের ধীর স্থির পাতাকেও তিরতির করে কাঁপিয়ে দেয়। শরীরের মধ্যে যেন একটা অন্য সুর বেজে ওঠে। গানের গলা না থাকলেও কণ্ঠে সুর কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে। হাঁটতে গেলেও পাগুলো কেমন একটা ছন্দ খোঁজে, দুই পা লাফিয়ে এক পা হেঁটে মনের নাচ নাচ ভাবটা স্ফূর্তি খোঁজে। এরকম একটা বয়সে এসে মিনু ক্ষীণ স্বরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, হরেনমাস্টারের কাছে গান শিখব মা। মা সুমতি মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, হয়তো ভাবছিলেন মেয়ের যা রূপগুণ, দুই একটা গান গাইতে পারলে বোধহয় ভালই হবে। তবে এতগুলো টাকা মেয়ের পিছনে গচ্চা না যায়। অনাদিবাবু শুনে হাঁই হাঁই করে উঠলেন, ছোটকার আসছে বছর ক্লাস এইট হবে, দুটো মাস্টার রাখতে হবে খেয়াল আছে সেটা? আমার কোনও টাকার খনি নেই। শুধু তাই নয়, সুমতি বিয়ের বাজারের কথা মনে করিয়ে দিতে বাঁ হাতটা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাওয়ায় দুবার খেলিয়ে বললেন, তুমি কি গান জানতে, না রূপে লক্ষ্মী গুণে স্বরস্বতী ছিলে শুনি? বিয়ে হয়নি তোমার? অকাট্য যুক্তি। মেয়ে দরজার বাইরে কান পেতে শুনছে জেনেও সুমতি অনাদিবাবুকে কথা শোনাতে ছাড়েনি যদিও— মেয়েটা আমার মত চেহারা পেলেও তো হত, পেয়েছে তো দাসবাড়ির থোবনা। কোনও ছেলে ফিরেও তাকাবে কখনও? একটু গান নাচ জানলে—

বাইজি হবে? খ্যামটা নাচ নাচবে?— গটগট করে উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলেন অনাদিবাবু। কথাগুলো শুধু মিনু নয়, ছোটকা আর বড়কাও শুনেছে। ছোটকা, যে কস্মিনকালেও মিনুরানিকে দিদি বলেনি, হেসে গড়াগড়ি। জানো মা, মিনুটা না সেদিন ছাদে উঠে গান গাইছিল আর তাই শুনে মিন্তিদের বিড়ালটা ছাদের আলসে থেকে পড়ে যায়। এটা ঠিক, মিনুরানি মাঝেমধ্যে ছাদে উঠে আপনমনে দুচারটে গানের কলি গেয়ে ফেলে। কিন্তু বিড়াল পড়ার খবরটা কি সত্যি? ভেবেই সিঁটকে যেতে যেতে মিনু শুনল সদ্য গোঁফ ওঠা বড়কা বলছে, মিনু প্যাঁ প্যাঁ করলে কোন হাতিঘোড়া উদ্ধার হবে শুনি? আমি বান্টিদার কাছে গিটার শিখব মা। শেখা ফ্রি। কিন্তু নিজের গিটার লাগবে, বাবাকে বলে টাকাটা ম্যানেজ করে দাও দেখি।

গান শেখার ওখানেই পরিসমাপ্তি, উলটে ছাদে উঠে দু চারটে গান যে গাইত সেটাও গেল বন্ধ হয়ে। না, না কেউ জোর করে আটকায়নি, অমন কঠিনহৃদয় নয় ওর বাড়ির লোকেরা। মিনুই। গলাটা কে যে তারপর থেকে চেপে ধরল, ভিতর থেকে, ঠোঁট ফাঁক করে আর গান গেয়ে উঠতে পারল না কোনওদিন। মিন্তিকে কোনওদিন জিজ্ঞেস করেনি বিড়ালটা সত্যিই পড়েছিল কিনা, কিন্তু দেখা হলেই মিন্তির ঠোঁটের কোণায় ঝুলে থাকা হাসিটা স্পষ্টই বলে দিত যে হয়েছে এমন কোনও ঘটনা। শুধু গান কেন, ও যে স্নানের ঘরে গায়ে জল ঢালার আগে দু পাক নেচে নেয়, সেটাও বুঝি সবাই জেনে গেল এই ভেবে চড়কি পাকটা চালিয়ে গেলেও, স্নানটা ঝুপঝাপ করে সেরে নিত, যাতে দেরি হচ্ছে বলে কারও সন্দেহ না হয়। আর সেটাও বা কদিন। যৌবনের বাসন্তী হাওয়া বেশিদিনের বই তো নয়। ওই উটকো ইচ্ছাগুলো কিংবা ছুটকো স্ফুলিঙ্গ-টুলিঙ্গ উবে যায় দেখতে দেখতে। ততদিনে টেনেটুনে একটা দুটো পাশ দেওয়া হয়ে গেছে, মেয়ে পার করানোর জন্য মোক্ষম সময়, অনাদি আর সুমতি অযথা কালক্ষেপ করেনি এ ব্যাপারে। তাই বলে হুট করে তো কিছু হয় না। অ্যাভারেজের নিচের গোত্রের মেয়ে, বাপের মুরোদ কম, সুতরাং বছর দুই খুব ঘষাঘষি চলল। তবু পেয়ে গেল একটা বর। চেহারা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না, আসল কথা ছেলের আয়পত্তর আছে কিনা। সে বাবদে তার নিজের মনোহারি দোকান আছে। চালু দোকান। অনাদিবাবু একদিন বাইরে দাঁড়িয়ে দেখেও এসেছেন, বেশ কাটতি দোকানে। সেটা তো যাচাই করতেই হবে, না হলে মেয়ে জামাইসুদ্ধ ঘাড়ে এসে পড়লে তখন কে ম্যাও সামলাবে? হবুজামাই রতন চায়নি বেশি কিছু, শুধু দোকানের মূলধন বাড়ালে দোকানটা আর একটু বড়সড় করতে পারে, সে ব্যাপারে হবুশ্বশুর সাহায্য না করলে আর করবেটা কে? অনাদিবাবু একটু গাঁইগুঁই করে এক লাখে রাজি হয়ে গেলেন। তবে অন্যদিকে মেয়ের গয়নায় কিছু কাটতি করলেন। দোকান রইল জামাইয়ের, ওটাই স্ত্রীধন।

মিনুর কি পছন্দ ছিল বিয়েটা? সে কে বলতে পারে। আইবুড়োভাত খেতে এসেছিল মেয়েটা। বর কেমন রে, কথা-টথা বলেছিস এক দুবার? মাথা ঝাঁকাল। দেখেছিস তো অন্তত? ততক্ষণে খাওয়া হয়ে গেছিল। এঁটো থালায় কড়ে আঙুল দিয়ে মিনু মানুষের মুখ আঁকল। তারপর সেটা কাটাকুটি করতে করতে একটা পতঙ্গ, সেখান থেকে ডানা মেলল পাখি। তর্জনিটা বেঁকিয়ে লম্বা লম্বা টানে থালা থেকে এঁটো চেটে জিভে দিয়ে টাকরায় শব্দ তুলল, পাখিটা আটকা পরে গেল থালা জোড়া দাগের খাঁচায়। আমার তেমনি মনে হল। নির্ঘাত আমার মনের কল্পনা। এরকম কোনও বিমূর্ত শিল্পের মাধ্যমে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করবে তেমন অসাধারণ মেয়ে সে নয়। নিজেকে পাখি  যদি মনেও করে খাঁচা-টাচা বাড়াবাড়ি। মেঘ আকাশে হাতি ঘোড়া কতকিছু যে বানায়, মেঘ কি তা জানে? আমাদের দেখার ভঙ্গি বই তো নয়।

নিজের বাড়িতে বাবা মা দুই দাদাভাই। শ্বশুরবাড়িতে সেম তো সেম, সঙ্গে একটা বড় ননদ ফ্রি। বিয়েটা বড় ভাই, মানে রতনের সঙ্গে। বাড়িটা তার বাপের বাড়ির থেকে বড়, রাস্তার ওপরে। অনেক কপাল করেছ, এই বাড়িতে ঢুকেছ। এ বাড়ির বড়বৌ ভুলে যেও না। শাশুড়িমা এইসব মন্ত্র আসার দিন থেকে মনে করিয়েছে বারবার। বড়বৌ মানে সিনেমার সন্ধ্যারানির মত মুখ করে সবার খেয়াল রাখতে হবে। বড়বৌ মানে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাড়ার লোকেদের চোখের উপর নেত্য করার কোনও দরকার নেই। বড় কিন্তু বৌ, তাই বাড়ির কোনও কথায় আগ বাড়িয়ে মতামত প্রকাশ করতে যেও না বাপু। রান্না করতে চাও করো, আমি যেমন যেমন বলে দেব করো না কেন সেটা। পোশাক-আশাকে ঢংঢাং আমাদের বাড়ির ধারা নয়, হায়া ঘেন্না রেখে চলো। বাড়ির মেয়ের বারমুখো ভাব সংসার ভেঙে দেয়, তাই বেশি লেজ নেড়ো না। আমাদের বয়স হয়েছে, আমাদের আর কি, একটা নাতির মুখ দেখে শান্তিতে উপরে উঠে যাব। শুধু এইটুকু আশা।

মিনুরানি সবকিছুই যে যে যেমন যেমন চাইছে কিছুতে রা কাড়েনি। কাড়বেই বা কেন, এমনটাই তো দস্তুর আর সে এমন কিছু অসাধারণ মেয়ে কস্মিনকালে নয় যে অন্যরকম কিছু হবে। তাও তো রতন তাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে গেছে বেশ কবার। আর ফুচকা খাওয়ায়নি রাস্তায় দাঁড়িয়ে? বছরে দুবার শাড়ি জামা কিনে দেয়। এসব করত লোকটা। গায়ে হাত তুলেছে দুই-একবার, কিন্তু সে বেজায় রেগে গেলে। বিয়ের এক বছর বাদে আবার হাজার পঞ্চাশ নিয়েছে শ্বশুরের কাছ থেকে, সে যাক। কত পরিবারে মেয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে টাকার জন্য, মিনু তো লাকি। শুধু ওই নাতির আশা পূরণ করতে পারল না, হল মেয়ে। সেসময় একটা ঝড় গেছে। শাশুড়ি তার বাবাকে শুনিয়েছে খুব। বিয়ে দিয়ে একটা মেয়ে পাঠাতে বলেছিলাম, দুটো চেয়েছি কখনও? রতনও খুব হাঁকডাক করেছিল। অনাদিবাবু আরও পঞ্চাশ হাজার দেনা করলেন। শাশুড়িকে বলেন, আপনারও তো প্রথমে মেয়ে হয়েছিল, তারপর হয়নি দুটো সোনার টুকরো ছেলে? মেয়ের পয়েই তো।

মিনুর মেয়ে অত পয়মন্ত নয়, তাই ছেলে হল না। আর কোনও বাচ্চাই হল না মিনুর। দেওরের বিয়ে হল, দুটো জলজ্যান্ত ছেলে তার। বাড়ি যখন ভাগ হল, ছেলে থাকার সুবাদে রাস্তার দিকের ঘর পেল সে। মিনু পেল শ্বশুর শ্বাশুড়িকে।

মিনুর মেয়ের নাম ছন্দা। আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই নামটা মিনুরই দেওয়া, আর কেউ আপত্তি করেনি। আসলে মেয়ে হওয়ায় বাড়িতে তখন শোকের ছায়া, নাম রাখতে বয়েই গেছে। একমাস হয়ে গেল সবাই শুধু মেয়েটা মেয়েটা বলে ডাকছে। মিনু পুঁচকি, বুচকুন এমন ধারা ডাক ছাড়ছিল, কিন্তু মেয়ের তো একটা ভালমতন নাম হওয়া দরকার। সেটা নিয়ে চারদিকে নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে মেয়ের নাম রেখে দিল মিনু। ছন্দা। আর সেটা চলেও গেল। মিনুরানি এটাও দেখল চুপেচাপে দুই একটা নিজের ইচ্ছা চালিয়ে দেওয়া যায় এই সংসারে। নিজের ইচ্ছা বলে ঘোষণা না করলেই হল। এই প্রক্রিয়ায় রতন সাধুর দোকানের নাম একদিন হয়ে গেল ছন্দা স্টোর্স। শ্বশুরের জোগান দেওয়া নতুন মূলধনের কারণেই হোক বা মেয়ের নামের পয়ে দোকানটা খুব ফুলেফেঁপে উঠল, উল্টোদিকে আর একটা দোকান দিল রতন এবং এইসব প্রতিষ্ঠার কারণে রতন, রতনদা, রতইন্যা থেকে তার রতনবাবুতে উত্তরণ হল। কালক্রমে এখন সে এলাকার ব্যবসায়ী সমিতির অন্যতম কেষ্টবিষ্টু। সংসারে মিনুর উন্নতিটা তবু নিয়ন্ত্রিত। কিছুটা জাঁদরেল শাশুড়ির কারণে, তবে এটাও সত্যি সাধারণ মিনুর না ছিল ধার, না বাড়ল ভার।

যেহেতু সে সাধারণ তাই এইসব নিয়ে ভাবেনি কখনও, মানে ভাবলেও কোনও পাতা হেলেনি। শুধু সব আশা, আকাঙ্ক্ষা মেয়েটার মধ্যে জিইয়ে রেখেছে। নাচটা সে বাথরুমে নেচে নিয়েছে সারা জীবন, কিন্তু মেয়েকে নাচ শিখতে পাঠিয়েছে আট বছর বয়েস থেকে। ওড়িশি শেখে পাড়ার চিত্রাদির কাছে। এটা সহজ হত না। কিন্তু ব্যবসায়ী সমিতির আরেক হোতা রঞ্জনবাবুর মেয়েরা গান নাচ শেখে, রবীন্দ্রনৃত্য করে বাহবা পায়। সে দৃষ্টান্ত সামনে রেখে মিনু বিনীতভাবে বলেছিল, তুমিই বা কম কিসে? রতন একটু অবাক হয়েছিল। দিনকাল কেমন পালটে গেছে। আগে নাচলে ধিঙ্গিপনা হত, এখন সেটাই সমসকৃতি!

তবু গোল একদিন বাঁধল। পাড়ায় পুজো। মাইকে সকাল থেকে গান-টান চলছে। এরকম ঢক্কানিনাদের মধ্যে দিয়ে দুপুরের নিদ্রাবিলাস সেরে রতনবাবু বিকেলে দোকান খুলতে যাচ্ছেন। দেখেন প্যান্ডেলের সামনের চত্বরে হিন্দি গানের সঙ্গে তার মেয়ে ছন্দা, হ্যাঁ তারই মেয়ে, আরও দুটি ছেলের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নাচছে। বারো বছরের মেয়ে তার, কী সাহস! তখনই বলেছিলাম, এই কথাটা রতনের মাথায় এল, মিনু সামনে ছিল না, তাই মুখে নয়। তার বদলে সাইকেল দাঁড় করিয়ে সে হাঁক পাড়ল, ছন্দা! গান জোরে বাজছিল, তাই তিনবার ডাকতে হল, এর ফলে রতনের মেজাজ গেল আরও চড়ে। সাইকেল পড়ে রইল, মেয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে এল বাড়ি। চৌহদ্দিতে ঢুকে গালে, পিঠে এবং অন্যান্য সব জায়গায় চড়চাপাটি চলল। সাধারণ মেয়েদের মেয়েরাও সাধারণ, কাঁদলেও তাদের গলা চাপা, হেঁচকি ওঠে কিন্তু পাড়া মাথায় ওঠে না। শাশুড়িমা তখনও বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে মিনুর গুষ্টি উদ্ধার করা শুরু করলেন। কটা কাক উড়ে গেল।

মিনুরানির গলায় কাঁঠালবিঁচি ওঠানামা করল, শুকনো জিভে তবু কথা জোগাল না। যা একটু নড়াচড়া করছিল তা শুধু পায়ের আঙুলগুলো। শাড়ির আড়ালে সেসব দেখা যায় না। তাই বোধহয় মিনুও গা করেনি। কিন্তু তারপরেই যেন এল সুনামি। তার পুরো পা থরথর করে কাঁপতে থাকল, আর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মিনুকে মাটি থেকে যেন উপড়ে নিল। মিনুরানি উড়ন্ত বাজপাখির মত মেয়েকে রতনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, কেউ কিছু রা কাড়বার আগেই পৌঁছে গেল পাড়ার পুজোর চত্বরে। গান তখনও চলছে, কিন্তু একটু আগে যারা নাচছিল তারাও তখন চুপ মেরে গিয়েছিল। লাউড স্পিকারে শব্দতরঙ্গ উঠছে— ওয়ে ও ছোকরি, সান্তারা কে টোকরি।

আর মিনুরানি নাচছে।

হ্যাঁ, সেই খোলা পিচরাস্তায়, গাছকোমর করে শাড়ি, বিকেলের চুল বাঁধা হয়ইনি তখনও তাই চুলের গোছা সাপের ফনার মত পিঠের উপর লাফাচ্ছে, চৌত্রিশ বছরের মেয়ে মিনুরানি, এক মেয়ের মা, রতনবাবুর পত্নী, সাধুবাড়ির বড়বৌ খোলা পিচরাস্তায় হিন্দি চটুল গানের সঙ্গে নাচছে।

কাকেরা ডানা ঝাপটাতে ভুলে গেল। পল্টুর চায়ের দোকানে দুধ পুড়ল। জানালায় মুখবাড়ানো অবাক চোখেদের পলক ফেলা হল না। রতনের ফেলে যাওয়া সাইকেলটা স্ট্যন্ডে রাখা ছিল, ঝপ করে পড়ে গেল টাল সামলাতে না পেরে।

গালের শুকনো জল মুছে মেয়ে ছন্দা অবাক হয়ে দেখছিল মাকে। প্রথমে মনে হল, বাবা কি আজ রাতে মাকে মারবে? তারপর সব ভুলে সেও মায়ের সঙ্গে নাচতে শুরু করল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4726 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...