ছেলেখেলা — ষষ্ঠ বর্ষ, অষ্টম যাত্রা

স্টেশনমাস্টারের কলম

 

বিন্দিয়া গ্রামের সেরা কবাডি প্লেয়ার। কোনও কবাডি ম্যাচ থাকলেই বিন্দিয়াকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। ক্যাপ্টেনরা খেলার জন্য টস করার আগে টস করে বিন্দিয়ার জন্য— সে দলে থাকলে জয় ৯৯ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু তারপরে যেই বিন্দিয়া মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে উঠতে লাগল, এবং তার অভিভাবকরা ঠিক করলেন সে আর কবাডি খেলতে পারবে না।

ওর পা দেখা যাচ্ছে।

খেলার সময়ে ছেলে এবং মেয়েরা ওকে স্পর্শ করছে।

মহিলারা খেলে না।

মোক্ষম যুক্তি!

বিন্দিয়াকে বিয়ে করতে হবে; বিন্দিয়াকে সন্তান জন্ম দিতে হবে; বিন্দিয়াকে স্বামীর ঘরে গিয়ে হেঁশেল সামলাতে হবে— ফলত বিন্দিয়া এমন একটা খেলায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না যে-খেলায় নাকি পা দেখা যায়।

অভিনব কোনও গল্প নয়, অবশ্যই।

ভারতে মহিলা ক্রীড়াবিদদের অবস্থা সবসময়েই একটা বিতর্কের বিষয়। তাঁদের অনেক অসাধারণ পারফরমেন্সের সাক্ষী থেকেছে দেশ, কিন্তু তা সত্ত্বেও মহিলাদের খেলা বিষয়টি একটি অবহেলিত ক্ষেত্র হিসেবেই রয়ে গেছে। খেলাধূলাকে কেরিয়ার হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে মহিলাদের চ্যালেঞ্জ বহুমুখী— যেমন সামাজিক ক্ষেত্রে, তেমনই পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে।

সামাজিক চাপের বিষয়টি এরকম: ভারতীয় সংস্কৃতিতে এখনও এই ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত যে খেলাধূলা মেয়েদের জন্য নয়। তারা খেলাধূলা করবে কেন! তারা ঘরের কাজ করবে, সাংসারিক দায়িত্ব পালন করবে।

এর সঙ্গে যোগ করুন, ট্রেনিঙের সুযোগসুবিধা, যন্ত্রপাতি এবং খেলার মাঠ জাতীয় পরিকাঠামোর শোচনীয় অপ্রতুলতা।

সঙ্গে অর্থনৈতিক বাধা। খেলাকে কেরিয়ার হিসেবে নিতে গেলে বেশ অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যেটা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা মেয়েদের জন্য একটা পর্বতপ্রমাণ বাধাস্বরূপ।

লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্নটিও বিদ্যমান। একই খেলার একজন পুরুষ প্রতিযোগীর চেয়ে একজন মহিলা প্রতিযোগীর সুযোগও কম, অর্থও কম।

আর আছে প্রচারের বিষয়টি। ভারতের মহিলা ক্রীড়াবিদরা সাফল্য অর্জন করলেও তাঁর মতোই সফল একজন পুরুষ ক্রীড়াবিদের তুলনায় কি খ্যাতি, কি অর্থ, সবেতেই অনেক পিছিয়ে থাকেন। ফলে একজন উঠতি মহিলা খেলোয়াড় তার সামনে রোল মডেল হিসেবে আরেকজন মেয়েকে প্রায়শই খুঁজে পায় না।

অথচ খেলাধূলা কিন্তু মেয়েদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। শুধু শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিই নয়, খেলাধূলা মেয়েদের সেই প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস জোগান দিতে পারে, যা তাদের জীবনের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। বক্সিং-এ ছবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী মেরি কম একবার যেমন বলেছিলেন— “স্পোর্টসের দুনিয়াকে বদলাবার ক্ষমতা রয়েছে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার, ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষমতা যেমন স্পোর্টসের রয়েছে, তেমন অন্য কিছুরই নেই।”

কিন্তু, বাস্তবতা বলছে, ভারতীয় মেয়েদের খেলাধূলার জগতে কেরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত বাধাগুলি পর্বতপ্রমাণ হয়ে বিরাজ করে থাকে।

এতসব সত্ত্বেও, ভারতের মহিলা ক্রীড়াবিদদের সাফল্যের খতিয়ান কিন্তু কম নয়। পিটি ঊষা, মেরি কম, সাইনা নেহাওয়াল, পিভি সিন্ধু, দীপা কর্মকার, হিমা দাস থেকে সানিয়া মির্জা, মিতালি রাজ, কর্ণম মালেশ্বরী… তালিকা দীর্ঘ। সম্প্রতি টোকিও অলিম্পিকে মহিলা হকিদলের জয় দেশের মহিলা ক্রীড়াজগতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

আর এটাও একটা স্পষ্ট সত্য— অলিম্পিক্সে ভারতের পুরুষ ক্রীড়াবিদদের তুলনায় মহিলা ক্রীড়াবিদদের সাফল্য অনেক বেশি। ২০১৬-র রিও অলিম্পিকে ভারতের ৪টি পদকের ২টি এনেছিলেন মেয়েরা, ২০১২-র লন্ডন অলিম্পিকে ৮টির মধ্যে ৬টি পদকই ছিল তাঁদের। এগুলিতেই প্রমাণ হয় খেলাতে লিঙ্গবৈষম্যের কোনও ভূমিকাই নেই। প্রয়োজন সঠিক সহায়তা এবং যথাযথ পরিকাঠামোর।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের এই মার্চ মাসের সংখ্যাটিতে আমরা আলোচনা করেছি এই মহিলাদের নিয়েই। রিজার্ভ বগিটির নাম রাখা হয়েছে ‘ছেলেখেলা’। ব্যাখ্যা, সুধী পাঠক, নিষ্প্রয়োজন।

অন্যান্য বিভাগও সব রইল যথাবিধি…

ভাল থাকবেন।

সম্পাদকমণ্ডলীর পক্ষে
আত্রেয়ী কর

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4584 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...