তিনি চলে গেলেন কিন্তু রয়ে গেলেন— প্রসঙ্গ রণজিৎ গুহ

তাপস দাস

 



গবেষক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতায় সেই পথটাই বেছে নিয়েছিলেন যে পথ এখনও বহু পথিকদের কাছে অনাবিষ্কৃত। তাঁর মনে হয়েছে এই পথ তাঁকে অন্যদের থেকে অনন্য করে তুলেছে। প্রকৃতপক্ষে রবার্ট ফ্রস্ট এই কবিতার মধ্যে দিয়ে আমাদের বাতলে দিতে চেয়েছেন প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপরীতে গিয়ে চিন্তা করার পথকে। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে রণজিৎ গুহর অবস্থান অনেকটাই এরকম। ইতিহাসকে দেখার প্রচলিত ধ্যানধারণার উল্টোমেরু থেকে ইতিহাসকে বোঝার এক নতুন পথের সন্ধান দেন তিনি। সামগ্রিক ইতিহাসকে বোঝার এক নতুন ব্যাখান বা মেথডোলজি আমাদের সামনে হাজির করেন। শুরু হয় নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা বা সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ। বরাবর ইতিহাসের পাতাজুড়ে থাকা রাজাদের যুদ্ধ, বণিকদের ব্যবসাবাণিজ্য, অভিজাতশ্রেণির আন্দোলনের বিপরীতে তাঁর কলমের পথ ধরে ইতিহাসে জায়গা করে নেয় মহিলা, শোষিত কৃষক এবং তাঁদের বিদ্রোহ।

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। প্রথম সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ সম্মেলন হয় ১৯৮৩ সালে। এই ব্যাখ্যান সাধারণত দুটি বিষয় আমাদের সামনে তুলে নিয়ে আসে। প্রথমত, ঔপনিবেশিক ভারতে উচ্চবর্গের পাশাপাশি নিম্নবর্গও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, কৃষক আন্দোলনের একটি স্ব-ক্রিয় বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি। ইংরেজিতে সাব-অল্টার্ন বা নিম্নবর্গ বলতে অধীনস্থ অফিসারদের বোঝায়। ইতালির কমিউনিস্ট নেতা এবং দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির প্রিজন নোটবুক বা ‘কারাগারের নোটবই’-এ এই শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়।

তবে গ্রামশি এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন দুইটি অর্থে। প্রথমত, সর্বহারাশ্রেণি বা প্রলেতারিয়েতদের প্রতিশব্দ হিসেবে। সেক্ষেত্রে পুঁজিবাদী সমাজে সাব-অল্টার্ন হল শ্রমিকশ্রেণি। দ্বিতীয়ত, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ডমিনেটিং ক্লাস অর্থাৎ প্রভুত্বকারী শ্রেণির বিপরীতে তিনি সাব-অল্টার্ন শ্রেণিকে বুঝিয়েছেন। গ্রামশির এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই ভারতবর্ষে নিম্নবর্গের ইতিহাসের সাধনা শুরু হয়। শুরু হয় ভারতীয় ইতিহাসকে বোঝার এই প্রতিকূল স্রোত। তবে গ্রামশির পাশাপাশি রণজিৎ গুহ এবং নিম্নবর্গ চর্চা গোষ্ঠী অনুপ্রাণিত হয়েছিল রোলা বার্ত ,ক্লদ লেভি স্ট্রসের চিন্তার দ্বারা। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথ, সমর সেন, জীবনানন্দ, হাইডেগার এবং হেগেলের দ্বারাও বিশেষভাবে রণজিতের চিন্তা প্রভাবিত হয়।

রণজিৎ গুহ বাংলাদেশের ভূতপূর্ব বাখরগঞ্জ জেলার (বরিশাল) সিদ্ধকাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ, ২৩ মে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে। সিদ্ধকাটিতে তাঁদের পৈতৃক তালুকদারি ছিল ‘গুহ-বকশি’ নামে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর ১১ মাস ৫ দিন। ১৯৩৮ সালে মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে বৃত্তিসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৩৮ সালে রণজিৎ ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে, ইতিহাস অনার্সের ছাত্র হিসেবে। ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স, অস্ট্রেলিয়ায় অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সহ দেশের ও বিদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। শেষ দুই দশক ধরে তিনি অস্ট্রিয়ায় বাস করছিলেন। অস্ট্রিয়াতেই ভিয়েনা উডসের বাসভবনে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

তাঁর লেখা বইগুলির মধ্যে অন্যতম আ রুল অফ প্রপার্টি ফর বেঙ্গল, এলিমেন্টারি অ্যাসপেক্টস অফ পীজ্যান্ট ইন্সার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, হিস্ট্রি অ্যাট দা লিমিট অফ ওর্য়াল্ড হিস্ট্রি, অ্যান ইন্ডিয়ান হিস্টেরিওগ্রাফি অফ ইন্ডিয়া: এ নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি অ্যাজেন্ডা অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস, ডোমিন্যান্স উইদাউট হেজেমনি: হিস্টরি অ্যান্ড পাওয়ার ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, দ্য স্মল ভয়েস অফ হিস্টরি, রাজা রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা, প্রেম না প্রতারণা, কবির নাম ও সর্বনাম, ছয় ঋতুর গান। গৌতম ভদ্রের ‘মুঘলযুগে কৃষি অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ’ বইটি বাদ দিলে নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদদের প্রথমদিককার প্রায় সব লেখালেখি ছিল ইংরেজিতে। ১৯৮২ সালে রণজিৎ গুহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে বাংলায় দুটি বক্তৃতা করেন যা এক্ষণ পত্রিকায় ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ শিরোনামে ছাপা হয়। রণজিৎ গুহই প্রথম সাব-অল্টার্নের বাংলা হিসেবে ‘নিম্নবর্গ’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। তারপর থেকেই বাংলার অ্যাকাডেমিক আলোচনায় নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

রণজিৎ গুহের যে চিন্তা এবং রচনার বহর সেগুলি একসঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয়। সে-কারণে এই লেখায় শুধুমাত্র নিম্নবর্গের বিদ্রোহ কীভাবে তাঁর লেখায় একটি অল্টারনেটিভ হয়ে উঠেছে সেই বিষয়কেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করব। ঐতিহাসিক হিসাবে তাঁর পরিচিতি থাকলেও, শুধুমাত্র এই পরিচিতির মধ্যে তাঁকে বেঁধে রাখা যায় না। তিনি শুধু ইতিহাসের পরিচর্যা করেননি, ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষদের তিনি ইতিহাসের আলোচনায় নিয়ে এসে একটি স্বতন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন।

সাধারণ অর্থে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার উদ্দ্যেশ হল জাতীয়তাবাদী-উচ্চবর্গের ইতিহাসের বিরোধিতা করা। গুহ লিখেছেন, “…শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম ও শহরের গরিব জনতা ইত্যাদি গণ্য তো বটেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক সমাজে প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটা যাদের জীবনে খুবই প্রকট অথচ যারা আমাদের ইতিহাসচিন্তায় এখনও প্রায় অনুপস্থিত সেই আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও নারীদের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ করে ভাবতে ও লিখতে হবে।” সেক্ষত্রে প্রচলিত ইতিহাসজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি একাধারে তার্কিক এবং তাত্ত্বিকের শিরোপা লাভ করেছেন।

তিনি মনে করেন শ্রেণিবিভক্ত সমাজে যে ইতিহাস রচিত হয় তা শুধুমাত্র উচ্চবর্গের শ্রেণিস্বার্থে। স্বাভাবিকভাবে সেখানে শুধুমাত্র উচ্চবর্গের চিন্তারই প্রতিফলন ঘটে, নিম্নবর্গের চেতনা সেখানে ব্রাত্য থাকে। এই সমস্যাকেই কেন্দ্র করে রণজিৎ গুহ রচনা করেন ‘এলিমেন্টারি অ্যাসপেক্ট অফ পীজ্যান্ট ইন্সার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’। এতে তিনি দেখিয়েছেন, কৃষক বিদ্রোহকে কতকগুলি অর্থনৈতিক শর্ত দিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আপাত দৃষ্টিতে যে বিদ্রোহকে মনে হয় আকস্মিক, কিছু অবাস্তব কল্পনা দ্বারা চালিত, আসলে তার পিছনে থাকে প্রস্তুতি, সংগঠন, রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের নির্দিষ্ট ছক। এই ছকে নিহিত আছে কৃষকচেতনা।

কৃষক বিদ্রোহের জনচরিত্র ব্যাখা করতে গিয়ে কোল ও সাঁওতাল বিদ্রোহের উদাহরণ টেনে গুহ দেখান, আদিবাসীদের একসঙ্গে সংগ্রহবৃত্তি এবং খাদ্যগ্রহণ কিংবা সামাজিক পরবের সামাজিক যৌথতার সংস্কৃতি জনবিদ্রোহের ক্ষেত্রে তাদের একাত্ম হতে সহযোগিতা করে। জনবিদ্রোহের ক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং তথ্যের বিস্তারকে খুব গুরুত্ব দিয়ে ব্যাখা করেছেন গুহ। বিশেষ করে নিম্নবর্গের তথ্য, তথ্য স্থানান্তর, যোগাযোগের নানা মাধ্যম এবং পরিসর কিংবা ইশারা-প্রতীক-সঙ্কেত ও চিহ্নর নিজস্ব কারিগরি সবকিছুই নিজেদের ভেতর তথ্যের আদানপ্রদানকে সমুন্নত রাখে।

রণজিৎ গুহের নিম্নবর্গের ইতিহাসভিত্তিক লেখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদী এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের চেতনার নিজেস্বতাকে তুলে ধরা। কারণ বিশেষ শ্রেণিস্বার্থ দ্বারা রচিত ইতিহাসে তাদের কথা উঠে আসে না। তিনি প্রচলিত ইতিহাসকে এক পুনঃনির্মাণের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই পাঠ্য ইতিহাসের সামান্য অংশ জুড়ে থাকা কৃষক, সাঁওতাল, কোল বিদ্রোহীদের তিনি মানবচেতনায় জাগ্রত করতে চেয়েছেন।

ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থাকা কৃষক, শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম ও গরিব জনতা, আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, স্ত্রীলোক আজীবন তাঁর কলমের বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করতেন শুধুমাত্র ইতিহাসপাঠের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসকে বোঝা সম্ভব নয়। সাহিত্যের মধ্যেও আমাদের ইতিহাসের উপাদান খুঁজতে হবে। তাই হয়তো কালজয়ী উপন্যাসগুলির প্রধান বিদ্রোহী চরিত্রগুলির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসচেতনার স্বতঃস্ফূর্ত উন্মাদনা। তাই হয়তো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’য়ে ট্যাক্সিচালক খিজির, কৃষক কামরুল, নিম্নবর্ণ চেংটুর স্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইতিহাসের ব্যাখ্যায়।

বর্তমানে যখন ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠ্যবই থেকে বিশেষ কোনও অধ্যায়কে সরিয়ে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে পাঠ্য-কর্মসূচির ইসলামিকরণ করে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হয় তখন রণজিৎ গুহ আমাদের কাছে গ্রামশি হয়ে ধরা দেন। রবীন্দ্রনাথ যেমন নেয়ামত খলিফাকে তাঁর জীবনস্মৃতিতে বিশেষ জায়গা দিয়েছেন, অমর্ত্য সেন যেমন আব্দুল মাঝিকে তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন, সেই বিশ্বচিন্তার পথ ধরে রণজিৎ গুহর কলম ধরে কোটি কোটি নিম্নবর্গের মানুষ প্রান্ত থেকে কেন্দ্রীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। এই কারণেই শারীরিকভাবে রণজিৎ গুহ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও ইতিহাসকে দেখার যে মেথডোলজি তিনি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, তার মধ্যে দিয়েই মৌলিক একজন গবেষক, তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক হিসেবে তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।


তথ্য সূত্র:
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. রণজিৎ গুহর শতবর্ষে প্রকাশিত গদ্য, প্রবন্ধ, প্রয়াণসংবাদ: একটি তালিকা – ভাবুক সভা || Bhabuk Sabha

আপনার মতামত...