ইতিহাসের এক অনন্য আখ্যান: প্রসঙ্গ, রণজিৎ গুহ

ধনঞ্জয় সাহা

 


গবেষক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

একদা জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের গবেষক মিলিন্দ ব্যানার্জি একটি সাক্ষাত্কারে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনার বর্তমানে বেশিরভাগ দার্শনিক লেখা ইংরেজি থেকে বাংলা ভাষায় লেখার কারণ কী?” উত্তরে রণজিৎ গুহ বলেন, “বাংলা ভাষা ছোটবেলা থেকেই আমাকে আকৃষ্ট করত কারণ ভাষা এবং সাহিত্যের ক্ষমতা বিশ্বদর্শন অনুধাবনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।” পরবর্তী প্রশ্নে তিনি বলেন আদর্শগতভাবে আমি মার্কসীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী হলেও আমার কাছে হেগেলের “গেস্ট”-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ, যার মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে সামাজিক অস্মিতা। রণজিৎ গুহ তার এই সাক্ষাত্কারে মন্তব্য করেছেন যে তিনি এক জমিদার পরিবারে জন্ম নিলেও তাঁর কাছে দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জন্য ন্যায়ের প্রশ্নটি স্পষ্ট ছিল, যা তাঁর পরবর্তী জীবনেও উপেক্ষিত হয়নি। একদা সমর সেনের “বাবু বৃত্তান্তের” একটি খণ্ড তাঁর কাছে যখন তাঁর জন্মের প্রশ্ন বিদ্রূপের সুরে পৌঁছে দেয়, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমি বাবুপরিবারে জন্ম নিলেও আমার কাছে বাবুয়ানি অসহনীয়।” আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় যে ঘরানার কথা উল্লেখিত হয়, রণজিৎ গুহর সাব-অল্টার্ন বা নিম্নবর্গীয় ইতিহাসচর্চা তাতে এক নতুন বৌদ্ধিক ইতিহাসের সূত্রপাত করে। এমন একজন মানুষ যিনি পশ্চিমি ইতিহাসচর্চার ভাবধারায় যে পক্ষপাতমূলক আদর্শের দ্বারা ক্লিষ্ট ছিলেন, তা থেকে সমগ্র উপমহাদেশের অৰ্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার ঔপনিবেশিক বিরোধী সংস্কৃতির জগৎ থেকে বেরিয়ে এক নিরপেক্ষ ব্যাখ্যান তুলে ধরেছেন। এমন একজন মহান পণ্ডিত তাঁর একশোতম বর্ষ পূরণের আগেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার জন্য ২৮ এপ্রিল ২০২৩-এ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

১৯২৩ সালের ২৩ মে বরিশালের এক খাস তালুকদার পরিবারে তার জন্ম। ১৯৩৪ সালে গুহ কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে বিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণ করে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে যেখানে তাঁর মাস্টারমশাই সুশোভন সরকারের দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন এবং পরবর্তীতে ভারতের মার্কসবাদী পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং নিজেকে নিয়োজিত করেন ইউরোপে কমিউনিস্ট পার্টির একজন কার্যকর্তা হিসেবে। জন্মসূত্রে গ্রামীণ বাংলার জমিদার-প্রজার সম্পর্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে তিনি অনায়াসেই নয়া সামন্তপ্রথার উদ্ভবের কারণ অনুসন্ধান করেন। ফলত তিনি নিম্নবর্গের মানুষের উপর অবহেলা ও বঞ্চনা পরিলক্ষিত করেন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু কার্যাবলির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন এবং প্যারিসে ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন অফ ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ-এর পদে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর বৈশ্বিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রথাগত চিন্তকের বাইরে গিয়ে তাঁকে এক অন্য পরিচিতি লাভে সহায়তা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকাকালীন সময়ে তিনি গোঁড়া মার্কসবাদকে আদর্শ রূপে গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে সোভিয়েতের পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে আগ্রাসনের নীতির প্রতিবাদে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ভারতীয় মার্কসবাদের গোঁড়া রূপকে ও আদর্শগতভাবে ইউরোপীয় প্রবণতার বৈধতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে মার্কসের বিপ্লবের দর্শনগত ভিতের উত্তরণের পথনির্দেশ করে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালীন সময়ে তিনি বাংলার ইতিহাসে জমিদারি প্রথায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রভাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে বলেন, যেভাবে মার্কেন্টাইল উৎপাদিত সম্পদ ইউরোপে পুঁজিবাদী কৃষির সূচনা করে ঠিক একইভাবে তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, নয়া-জমিদারি প্রথা কৃষিতে সম্পদের গুরুত্ব বোঝায়। অর্থাৎ তিনি অর্থনৈতিক ইতিহাসের ধারণার বাইরে গিয়ে বৌদ্ধিক ইতিহাসের ব্যাখ্যা দেন, যা অভাবনীয় এক ইতিহাসের ধারার সূত্রপাত করে। যদিও প্রথমে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের চোখে গুরুত্ব পায়নি। পরবর্তীতে তিনি যখন ইংল্যান্ডে চলে যান তাঁর লেখা সেখান থেকে প্রকাশিত হয়। এমন কিছু লেখার মধ্যে অন্যতম হল “A Rule Of Property For Bengal: An Essay on the Idea of Permanent Settlement”। এছাড়াও পরবর্তীতে “Elementary Aspect of Peasant Insurgency in Colonial India”, “An Indian Historiography: A Nineteenth century Agenda and Its Implication”, বইগুলি তাঁর অসীম প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে তাঁর বিভিন্ন লেখা কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকায় প্রকাশিত হত। ২০০০ সালে প্রকাশিত তার “History at the Limits of World History” বইতে তিনি দেখান যে মানবজীবন ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, এর সত্য অন্তর্নিহিত আছে সাহিত্যের মধ্যে যেখানে প্রাত্যহিক মানবজীবনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

তাঁর ঐতিহিসিক পরিব্যাপ্তির আধুনিকতম সংযোজন হল ইতিহাসচর্চায় নিম্নবর্গের ইতিহাস (সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ), যার লক্ষ্য, পদ্ধতি, কর্মসূচি ছিল সমাজের ইতিহাসে নিম্নবর্গের মানুষের অবদান ইতিহাসের পাতায় প্রতিষ্ঠিত করা। ইতালীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির মতবাদকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন সমাজের দু ধরনের ডোমেইন লক্ষ করা যায়, যার মধ্যে এলিট ডোমেইন জাতীয়তাবোধের বিকাশ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে উচ্চবর্গের কর্মকাণ্ড রূপে দেখিয়েছে, আর অপরদিকে গ্রামশি তাঁর প্রিজন নোটবুকে নিম্নবর্গের মানুষের কথা বলেছেন। যা থেকেই রণজিৎ গুহ তাঁর ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বহুল উপেক্ষিত নিম্নবর্গের মানুষের কথা (কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী, জনজাতি, মহিলা) তুলে ধরে ১৯৮২ সালে তার প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিকেরা। এঁরা হলেন পার্থ চ্যাটার্জি, দীপেশ চক্রবর্তী, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, শাহিদ আমিন, গৌতম ভদ্র, জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, ডেভিড হার্ডিমান প্রমুখ। এইসব ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং নৃতাত্ত্বিকেরা শোষণ, বঞ্চনা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সম্পর্ককে জাতীয় সংগ্রামের এক অপরিহার্য অঙ্গ বলে গণ্য করা হয়েছে। তাঁর রচনা “Dominance without Hegemony”-তে তিনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে দু ধরনের রাজনীতির কথা বলেছেন— একটি ব্রিটিশের রাজনীতি এবং অপরটি প্রাক-উপনিবেশিক ভারতীয় রাজনীতি। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দমনমূলক আইনের সঙ্গে ভারতীয় দণ্ডের মিশ্রণ ঘটিয়ে এক সঠিক অর্থে ধর্মের চিন্তাভাবনা। আর এখানেই তিনি ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক আইনের বদলে ধর্মবিশ্বাসের উপর নিম্নবর্গীয় মানুষের ঝোঁক লক্ষ করেছেন এবং ঔপনিবেশিক শাসক ও অভিজাতশ্রেণির দমন লক্ষ করেছেন।

নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা মার্কসবাদী হলেও মার্কসের সব তত্ত্ব নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেনি। মার্কসবাদের অন্তর্দৃষ্টি গ্রহণ করে নিচুতলার মানুষের ইতিহাস রচনার প্রয়াস চালানো হয়েছে। মার্কসের বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁরা কৃষক, শ্রমিক ও আদিবাসীদের দুঃখ, দারিদ্র্য ও বিদ্রোহী মনোভাবের কথা তুলে ধরেছেন। বিদ্রোহ হল মানুষের নিজের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। তাঁর দুখানি প্রবন্ধ ‘এলিমেন্টারি অ্যাসপেক্ট অফ পীজান্ট ইন্সার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’ এবং ‘প্রোজ অফ কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি’-তে তাঁর ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে রাজনীতির আসল নায়ক হল নিম্নবর্গ, কিন্তু উচ্চবর্ণের মানুষ এযাবতকাল ধরে যে ইতিহাস লিখেছে তা একপেশে ও প্রভু-ভৃত্যের মতো। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক দেখিয়েছেন যে এইসব ইতিহাস উদ্ধার করা খুব দুরূহ ব্যাপার কারণ নিম্নবর্গ নিজের কথা কখনওই বলতে পারে না। সুতরাং নিম্নবর্গের ইতিহাসের উপাদান কীভাবে পাওয়া যাবে তা হল এক সমস্যা। এক্ষেত্রে প্রবাদ, জনশ্রুতি, লোককথা, গান, কবিতা, ধর্মবিশ্বাস থেকে নিম্নবর্গের মানুষের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ চলছে।

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের ছয়টি খণ্ড প্রকাশের পরে তাঁর জীবনের কিছুটা সময় তিনি অস্ট্রিয়ার শহর ভিয়েনায় থেকে জীবনের বাকি সময়গুলো অতিবাহিত করেন বাংলা ভাষায় রচনার কাজের মধ্যে দিয়ে। যদিও ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি এক বিশেষ শ্রদ্ধা দেখাতেন। ২০০২-এ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একটি বক্তৃতা দেন যার মধ্যে তিনি স্পষ্ট করেন মানবজীবনে সত্য অপরিহার্যভাবে ইতিহাসে প্রোথিত থাকে না, এটি থাকে সাহিত্যের মধ্যে। পরবর্তীকালের লেখাগুলোতে তিনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে দূরে সরে নৈতিক যুক্তির সঙ্গে সমাজজীবনের বিভিন্ন বিশ্বাসকে এক পরিপূরক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠি জানিয়েছেন যে রণজিৎ গুহ নিম্নবর্গের ঐতিহাসিক জ্ঞানের পরিধিকে ব্যাপকতর ও গভীরতর করেছেন। এতদিনের ইতিহাসচিন্তায় প্রগতি, আধুনিকতা, যুক্তিবাদ, ও সমষ্টি প্রাধান্য হারায়। সমাজের এই নিচুতলার ইতিহাস ইতিহাসচর্চায় এনে দিয়েছে ভারসাম্য ও সমৃদ্ধ করেছে গবেষক, পাঠক এবং সর্বোপরি সমাজকে। রণজিৎ গুহ তাঁর জীবৎকালে যা লিখে দিয়ে গেছেন তার গুরুত্ব রয়ে যাবে আগামী প্রজন্মের ইতিহাসচর্চার মধ্যে দিয়ে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...