মৃণাল সেনের সিনেমা: মন্বন্তর ও বারুদঘর

মধুময় পাল

 


লেখাটি প্রথম ছাপা হয় 'শিল্প সাহিত্য'-এর জুন ২০১৮ সংখ্যায়৷ পরবর্তীতে সামান্য সংশোধন করে মধুময় পাল সম্পাদিত ও পুনশ্চ থেকে প্রকাশিত 'পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং' গ্রন্থে সংকলিত হয়। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২২। বর্তমান প্রবন্ধ তারই পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ, লেখকের সহৃদয় অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত হল

 

বাংলা ১৩৫০ সালে ৫০ লক্ষ বাঙালি অনাহারে মারা গেলেন৷ খাবার ছিল কালোবেনিয়াদের জিম্মায়৷ গরিবমানুষ ‘ফ্যান দাও’ ডেকে ডেকে লুটিয়ে পড়লেন তাঁদের ভিটেমাটি আবাদভূমি থেকে অনেক দূরে৷ আবহমান অন্নদাতা কিসান-কিসানি তাঁরা বেশিরভাগ, ছিলেন গ্রামজীবনের প্রচলিত বৃত্তিজীবী, কারিগর মানুষও৷ প্রান্তিক তাঁরা৷ সেদিন শহরাঞ্চলে এঁদের কোটি কোটি স্বজন উদাসীনলোকের পাকাপোক্ত কনস্ট্রাকশনে দিব্য সুখেভোগে থেকেছে৷ সেই আকালেই কি বাঙালি জীবনে ছেয়ে গেল সমবেদনার আকাল? না কি আরও আগে? বাংলা তো নিজেরই মড়া ডিঙিয়ে হাঁটছে দশক-শতক৷ উদাসীনলোকে তৈরি হয়েছে আমোদমুখী পাঠক-দর্শকদের জন্য লেখালেখি, ছবি-টবি৷ মুনাফার হিসেব কষে৷ দায়আকালের সেই বাতাসে মৃণাল সেন তাঁর তৃতীয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ দেখালেন আকালের দেশ, উজাড় হয়ে যাওয়া জনপদ৷ এক আকাল আরও কত আকালের জন্ম দেয়— সংবেদনা, মনুষ্যত্ব, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, রুচি, প্রতিভা, ভাষা ইত্যাদির, এখন যেমন— মৃণাল সেনের ছবিতে ক্রমে দেখা যাবে৷ তাঁর সৃজনযাত্রায় আকাল শুধু ঘটনা বা প্রসঙ্গ নয়,  ইতিহাসচেতনা, মতাদর্শ৷

 

১. বাঙালির জীবনবৃত্তান্তে দুর্ভিক্ষ মন্বন্তর যে এসেই পড়ে

কাহিনিটা ছিল একটি গ্রামবাসী গরিব পরিবারের সুখদুঃখের৷ যে পরিবারে একজন রোজগেরে পুরুষ, নাম প্রিয়নাথ, ট্রেনের হকার, বৃদ্ধা মা, বয়সের ভারে যিনি আর সংসারের ভার সামলে উঠতে পারেন না৷ রোজগার সামান্য বলে বিয়ের দায় নেয়নি সে৷ অবশেষে মায়ের পীড়াপীড়িতে মধ্যবয়সে তার চেয়ে অনেক ছোটো এক সুন্দরী অনাথ কন্যাকে বিয়ে করে৷ নাম মালতী৷ তাদের বিয়ে হয় বাইশে শ্রাবণ৷ তাদের জীবনের একটি আনন্দময় তারিখ৷ এক বিকেলে স্বামী-স্ত্রী মেলায় যায়, তুমুল ঝড় ওঠে, প্রিয়নাথের মায়ের ঘরের চালা ভাঙা পড়ে, মা মারা যান৷ পয়সার অভাবে চালা ছাওয়ানো হয়নি কয়েক বছর৷ আর-এক দুর্ঘটনায় প্রিয়নাথের পা ভাঙে৷ কোম্পানি, মানে যাদের জিনিস প্রিয়নাথ এতদিন ট্রেনে বেচেছে, তারা কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে খোঁড়া মানুষকে বিদেয় দেয়৷ বড়োমনের প্রিয়নাথ নিজের অভাব সত্ত্বেও আশ্রয় দেয় তার চেয়ে গরিব স-কন্যা বলরামকে৷ কিন্তু কাজের অভাব, খাবারের অভাব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাকে তিরিক্ষি মেজাজের করে তোলে৷ সে যাদের ডেকে আশ্রয় দিয়েছিল, তাদের তাড়িয়ে দেয় চিৎকার-চেঁচামেচি করে৷ কিছুদিন পাশাপাশি থাকার দরুণ যারা নিকটজন হয়ে উঠেছিল, তাদের চলে যাবার আঘাতে, স্বমীর পালটে যাবার বেদনায় আত্মঘাতী হয় মালতী৷

এই কাহিনিতে দারিদ্র্যই ছিল মূল কথা৷ মালতী চরিত্রের জন্য মাধবী (তখন মাধুরী) মুখোপাধ্যায়কে নির্বাচন করতে গিয়ে মৃণাল সেন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ঘর মুছতে পার? বাসন মাজতে? ঘুঁটে দিতে? গরিবের ঘরকন্নায় যা প্রতিদিন করতে হয়৷ কাহিনি তিরিশ দশকের শেষের দিকের৷ টাইটেল বলছে It was in the late thirtys. তাহলে এই ছবিতে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ কীভাবে আসে?

বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণদিবস হলেও এই কাহিনির সঙ্গে সেই বিষাদদিনের দূরসম্পর্ক নেই৷ একটা অন্য বেদনার ঘটনা ঘটেছিল সেদিন, সেই নিমতলা শ্মশানে, সেই মুহূর্তে৷ এক যুবকের কোল থেকে হারিয়ে গিয়েছিল মৃত শিশু, ভিড়ের ধাক্কায়৷ বিশ্বকবির প্রয়াণে শোকবিহ্বল সেই পরিবেশে এ শোক তুচ্ছ, নগণ্য৷ বরং প্রশ্ন উঠতে পারে, যুবক কেন অন্য কোনও শ্মশানে যায়নি? মৃণাল সেন বলেছেন, ‘এটা সত্যি যে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দিনটির তাৎপর্য আছে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কাছে, কিন্তু আমি যেটা চোখে দেখেছি তা আমি কোনওদিন ভুলতে পারিনি৷ সে-দিনটি সে-দৃশ্যটিকে মনে রেখে আমি চেয়েছি এ-কাহিনির ভেতর দিয়ে মানুষের চোখের জলকে ধরে রাখার৷’

‘চোখের জল ধরে রাখা’—কীভাবে হল সেটা?

১. ছোটো ছোটো পাওয়া না-পাওয়ার ভেতর দিয়ে বয়ে-চলা এক দরিদ্র দম্পতির অশ্রুভেজা রৌদ্রবিন্দুর মতো আলোকময় জীবন অন্ধকার হয়ে গেল দুর্ঘটনার আঘাতে, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে-পড়া অপার দারিদ্র্যের আঘাতে৷ ভেঙে খানখান হয়ে গেল তাদের যৌথজীবন শুরুর স্বপ্নছোঁয়া বাইশে শ্রাবণ৷

২. দুর্ভিক্ষের আঘাতে মৃত্যু হল মনুষ্যত্বের, নিষ্প্রাণ হল জনপদ৷ নিকটজন হয়ে গেল দূরের, আপদবিশেষ৷

রবীন্দ্রপ্রয়াণের বিষাদ ছাড়াও বাইশে শ্রাবণ বড়ো চোখের জলের দিন৷

ভারতীয় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের তরফে মৃণাল সেনকে বলা হয়েছিল, ছবির নাম তেইশে শ্রাবণ তো হতে পারে৷ মৃণাল সেন বলেছিলেন, না হয় না৷

মৃণাল সেনের বয়ানে জানা যায়, ‘বাইশে শ্রাবণ’ তৈরি হয় ১৯৬০ সালে৷ এ ছবিতে ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের চিত্র, দুর্ভিক্ষের চেহারা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। এবং আমি আবিষ্কার করলাম এই নিয়ে কীভাবে সিনেমা তৈরি হতে পারে৷

লক্ষ করতে হয় ‘স্বাভাবিকভাবেই’ শব্দটি৷ কাহিনি তিরিশ দশকের শেষের দিককার৷ আর ছবি তৈরি হচ্ছে উনিশশো ষাটে৷ তবু দুর্ভিক্ষের এসে পড়া স্বাভাবিক! বাংলা ও বাঙালির জীবনবৃত্তান্তে দুর্ভিক্ষ যে এসেই পড়ে৷

মৃণাল সেন জানিয়েছেন, ‘বাইশে শ্রাবণ’ তৈরির সময়েই আমি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, ছবিটি কোনও রিপোর্টাজ হবে না, কত মানুষ বাঁচল কত মানুষ না-খেয়ে মরল সেটাও নয়৷ শকুন আর শেয়াল লড়াই করছে শবদেহ নিয়ে সেসবও নয়৷ দুর্ভিক্ষের সময়ে ক্ষুধার্ত শিশু মৃত মায়ের স্তন পান করছে সে দৃশ্যও নয়৷ এসব আমি অনেক দেখেছি এই শহরে, আমার এই শহরের আশপাশে যখন সেই দুর্ভিক্ষ চলছিল৷ মৃত্যু দেখে দেখে মানুষের যে স্বাভাবিকভাবে মরবার অধিকার আছে সেটা আমি ভাবতে পারছিলাম না৷ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম এসব ভেবে ভেবে৷

এই ছবিতে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এসেছে৷ ধীরে ধীরে ছবির দ্বিতীয় পর্বে তা আরও কুৎসিত হয়েছে৷

বলরাম বলে, তেল চিনি কাপড় গেছে, এবার চালও আকাল হল৷ শহরে গেলে বিনেপয়সায় দু-বেলা খাবার জুটতে পারে৷  প্রিয়নাথ বলে, তা-ই যাও৷ বলরাম বলে, মাঠাকরুন, যাই৷ প্রিয়নাথ চিৎকার করে, হ্যাঁ, যাও৷ গোটা গ্রাম চলে গেল ভিটেমাটি ছেড়ে৷ গ্রামে কিন্তু তখন আড়তে চাল আছে, গোপনে পাচার হয়, গ্রামবাসী জানে, তারা প্রতিবাদ করে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে, ছিনিয়ে নিতে পারে না, দূরে কোথাও খেতে পাবার আশায় ঘর ছাড়ে, এবং ধ্বংস হয় বাঙালি৷ এ দুর্ভিক্ষ শুধু পঞ্চাশ সালের নয়৷

 

. গৌর, ফ্যান দিচ্ছে, ফ্যান দিচ্ছে

চারদিকে মানুষ মরছে। অনাহারে, অখাদ্য-কুখাদ্যের সংক্রমণে, বিনা চিকিৎসায়। রাজপথে গলিপথে সর্বত্র একটা কান্না ঘুরে বেড়াচ্ছে:  ফ্যান দাও, মা, একটু ফ্যান দাও। এতদিন যাঁরা গৃহস্থের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, রোদে-জলে মাঠে মাঠে ফসল ফলিয়েছেন, আজ তাঁরাই এসেছেন একটু ফ্যানের ভিক্ষাপাত্র নিয়ে, বাঁচার আশায় গ্রাম উজাড় করে শহরে এসেছেন তাঁরা। শহরে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গ্রামাঞ্চল থেকেও মৃত্যুর খবর আসছে। সাল ১৯৪৩।

ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যের ইতিহাসের কিংবদন্তি বিদগ্ধজন সুকুমার সেনের ভাষায় : ‘প্রেতকল্প শীর্ণকায় ক্ষুধাতুর অগণিত মানুষের একঢোক ফেন বা একমুঠো অন্নের প্রত্যাশায় কলকাতায় আগমন, আর দলে দলে রাজপথে মরে পড়ে থাকার দৃশ্য আর কাউকে যেন স্বপ্নেও না দেখতে হয়। সে দৃশ্য দেখে মানুষের সংস্কৃতি ও সভ্যতার বড়াই মিথ্যাবাদ বলেই প্রতিপন্ন হয়েছিল। তখন শুধু এই কথাই বারবার মনে জেগেছিল যে, ভাগ্যে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে নেই।’

ক্ষুধায় শুধু মৃত্যু নয়… a new item was noticeable, widespread social disintegration।  সমাজজীবন ভেঙে পড়ছে। Wordsworth on August 13 [1943] wrote a moving piece on this stressing particularly the plight of lost or parentless children – লিখেছেন ইয়ান স্টিফেন্স। ‘মনসুন মর্নিং’ নামে স্মৃতিচারিতায়। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর তৎকালীন সম্পাদক। বইটির প্রকাশকাল ১৯৬৬। লিখছেন তেইশ বছর আগের মন্বন্তরের কথা। ক্ষুধার আর্তনাদ ও মৃত্যুর মিছিলের ছবি কোনোদিন ভুলতে পারেননি ইয়ান স্টিফেন্স।  Empire’s Second City বা মহামহিম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাধের দ্বিতীয় শহর হিসেবে কথিত কলকাতায় ক্ষুধাপীড়িত হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে খবর ছাপা তাঁর নৈতিক কর্তব্য ও দায়। ১৩ আগস্ট ১৯৪৩, ওয়ার্ডসওয়ার্থ নামে এক সাংবাদিক এই দুর্দশার প্রতিবেদন লেখেন৷ আরও খবর ছাপা হয়, প্রায় রোজ। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন ও বাংলার সরকারের হেলদোল নেই। মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এবং তাঁর খাদ্যমন্ত্রী শহিদ সুরাওয়ার্দি বরং খাদ্যাভাবের বাস্তবতা অস্বীকার করতে উঠে পড়ে লাগেন। ইয়ান স্টিফেন্স বড়ো রকমের ঝুঁকি নিলেন। বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সীমান্তে জাপ-সেনা। দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে পারেন। তবু সিদ্ধান্ত নিলেন মন্বন্তরের ছবি ছাপার। স্টিফেন্স লিখেছেন-

…our photographers hadn’t the least difficulty in getting what was wanted and more. From an afternoon’s work they brought back many frightful ‘shots’, some utterly unpublishable, from which we made a cautious choice; and after two days’ pause to make the Delhi office synchronised, The Statesman came out on August 22, a Sunday with a grim pageful of ‘famine studies’; to be followed a week later by another, backed by the vast editorial.

২২ ও ২৯ আগস্ট ১৯৪৩ পাতাজোড়া দুর্ভিক্ষের ছবি ছেপে হইচই ফেলে দিয়েছিল ‘দ্য স্টেটসম্যান’। দীর্ঘ অস্বীকারের কুৎসিত কদর্য মতলবি কৌশল ছেড়ে প্রশাসন কিছুটা তৎপর হয়েছিল। ইয়ান স্টিফেন্সের কথা আমরা মনে রাখিনি।  বাংলার মহাদুর্ভিক্ষের সংবাদ-ভাষ্যকার তিনি। শুধু ভাষ্যকার কি? তিনি প্রতিবাদী। পেশাগত জায়গায় নিষ্ঠার সঙ্গে দাঁড়িয়ে মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করেছেন। দেশ বা ভাষা বা বর্ণের সংকীর্ণতা দূরে সরিয়ে দীপ্ত মানবিক অবস্থানে প্রকৃত পরিস্থিতির সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রতিবাদীর ভূমিকা নিয়েছেন।

এই মহাদুর্ভিক্ষে ৫০ লক্ষ বাঙালি মারা যান। সেদিনের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এই লক্ষ লক্ষ মৃত্যুকে নিতান্ত অবজ্ঞার চোখে দেখেছিলেন। বলেছিলেন, ওরা খরগোশের মতো বাচ্চা পাড়ে। অবজ্ঞা আসলে ছিল ষড়যন্ত্র, ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে গোপন যুদ্ধ। যথার্থ বিচারে, এটা ছিল রাষ্ট্র ও বেনিয়াতন্ত্রের গণহত্যা।

এই গণহত্যার কিছু ছবি, ইয়ান স্টিফেন্সের ভাষায় ‘ফ্রাইটফুল শটস’- মৃতদেহ ও প্রেতকল্পের মিছিল– কথা বলে উঠল মৃণাল সেনের সিনেমায়৷ ১৯৭২-এ, দীর্ঘ তিন দশকের ব্যবধানে৷ সিনেমা ‘কলকাতা ‘৭১’। সরিয়ে-রাখা ভুলিয়ে-দিতে-চাওয়া ইতিহাস চিৎকার করে উঠল এক বালকের কণ্ঠে, পিতা-মাতা-হারানো বালকদের হয়তো একজন সে, যে হারিয়েছে দেশ ও অন্নের অধিকারও: ‘গৌর, ফ্যান দিচ্ছে, ফ্যান দিচ্ছে’, হাড়জিরজিরে কাঙাল জনতা শেষ সাধ্যে ছুটতে শুরু করল ফ্যানের দিকে, আর, ক্ষুধাতুর অশক্ত এক শিশু ঘাড় একদিকে কাত করে অভিমানে রাগে ঘৃণায় দু-চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।

চার্চিলের অবজ্ঞা তথা ষড়যন্ত্রের কথা আমরা জেনেছি। নাজিমুদ্দিন-সুরাওয়ার্দিদের ঘৃণ্য মতলবের কথা জেনেছি। কিন্তু বাংলা সিনেমা দীর্ঘ তিন দশক এই গণহত্যা সম্পর্কে উদাসীন নির্লিপ্ত থেকে নিজেকে সেই দলে ঠেলে দেয়নি কি?

‘পর্দায় আকালের সন্ধানে’ শিরোনামের নিবন্ধে চলচ্চিত্র-আলোচক শান্তনু চক্রবর্তী এই প্রশ্নের জবাব সন্ধান করেছেন৷ লিখেছেন: ‘এই যে ভয়ঙ্কর মৃত্যুমিছিল, গ্রামবাংলা থেকে মরিয়া পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শহর কলকাতার বুকের ওপর আছড়ে পড়েছিল, কলকাতার ভদ্র-নাগরিক শান্তিকে তছনছ করেছিল, শান্ত-নিরুপদ্রব ভদ্রলোকের পাড়ার আলসে-আলটুসি ভোরবেলা চিৎকারে ভরিয়ে তুলেছিল, সেটা সেই সময়ের কলকাতার সিনেমা পাড়াকে কতটা প্রভাবিত করেছিল? একটুও না। অথচ প্রাসাদ-নগরীর ফুটপাথে, গাড়ি বারান্দার নীচে, রোজ কর্পোরেশনের জল দিয়ে ধুইয়ে দেওয়া ঝকঝকে-পরিচ্ছন্ন রাজপথে জমতে থাকা বেওয়ারিশ লাশ– মৃত ছেলেকে কোলে নিয়ে দোরে দোরে ফ্যান চেয়ে বেড়ানো অনাহারী মা; অথবা মরা মায়ের বুক থেকে শেষ দুধের বিন্দুটুকু শুষে নিতে ব্যগ্র রুগণ শিশু এইসব ছিন্ন কোলাজ কিন্তু বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সৃজনশীল কর্মীদের চৈতন্যে ধাওয়া করেছিল। তাঁরা তাঁদের ক্যানভাসে, নাটকে, আখ্যানে, গানে ওইসব দৃশ্যের অভিঘাত এড়াতে পারেননি।’

এই মন্তব্য ছবি, মানে চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে যতটা যথাযথ, ততটা নয় কথাসাহিত্যের, কবিতার ক্ষেত্রে৷ আমরা পেয়েছি চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন, সোমনাথ হোর, গোপাল ঘোষ-সহ বহু শিল্পীর অবিস্মরণীয় কাজ। যে মহা আকালে পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ নিঃশেষ হয়ে গেলেন, ধসে পড়ল বাংলার আবহমান সমাজযাত্রা, চরম অধঃপতন ঘটল মূল্যবোধের, মজুতদারি ও কালোবাজারি হয়ে উঠল রাজনীতির অশুভ মিত্রশক্তি, বাংলা আর আগের বাংলা থাকল না, যে মহামন্বন্তরকে তিনের দশকে পশ্চিমি দুনিয়ার মহামন্দার সঙ্গে তুলনা করা হয়, সেই বিষাদ-কালবেলার ছাপ কতটুকু পড়েছে বাংলা কথাসাহিত্যে? বাংলা সিনেমার মূল ক্লায়েন্টাল, মধ্যবিত্ত আত্মসুখী আমোদগেঁড়ে বাঙালি দুঃখ-টুঃখ পারতপক্ষে খায় না। যা খায় না, তা বাজারে কেন আনবে টালিগঞ্জ? সম্ভবত একই কারণে বাংলা কথাসাহিত্যও দুর্ভিক্ষ থেকে দূরে সরে থাকতে চেয়েছে। দূর থেকে গল্প-কবিতার কিছু খুচরো দাক্ষিণ্য ছুঁড়ে দিয়েছে। ব্যতিক্রম গোপাল হালদার।

সিনেমায় ব্যতিক্রম মৃণাল সেন৷ ‘বাইশে শ্রাবণ’ বাংলা ও বাঙালির আকালে উজাড় হয়ে যাবার বৃত্তান্তের মুখবন্ধ৷

 

. এতগুলো মানুষ যদি একবার মাথা তুলে দাঁড়াত তাইলে…

আমার বয়স কুড়ি। কুড়ি বছর বয়স নিয়ে আমি আজও হেঁটে চলেছি। হাজার বছর ধরে দারিদ্র‍্য-মালিন্য আর মৃত্যুর ভিড় ঠেলে আমি পায়ে পায়ে চলেছি। হাজার বছর ধরে দেখছি ইতিহাস–দারিদ্র‍্যের ইতিহাস বঞ্চনার ইতিহাস শোষণের ইতিহাস।

‘কলকাতা ৭১’-এর এই ইস্তেহারের জন্ম যেন মন্বন্তরের গর্ভে। দারিদ্র‍্য শোষণ বঞ্চনা নতুন ঘটনা নয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে এরকম চলতেই থাকে৷ যাদের আছে, তারা ক্রমাগত আরও আছের দিকে এগোয় আর যাদের নেই, তারা কেবলই আরও নেইয়ের অন্ধকারে ডুবে যায়। কিন্তু অবিভক্ত বাংলার মাটিতে সেই শোষণ আর বঞ্চনাকে চরম বিন্দুতে নিয়ে গেল তেতাল্লিশের মন্বন্তর। বাংলা আগেও মন্বন্তর দেখেছে, এক-আধবার নয়, বহুবার। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর তো বটেই। দেখেছে মৃত্যুর মিছিল। দেখেছে জনপদ থেকে প্রাণচিহ্ন মুছে যাওয়া। কিন্তু এবার সবকিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল। মানবিকতার সব সংজ্ঞা ভেঙে গেল। সম্পর্কের শ্রদ্ধা আদর ও আশ্রয়গুলো হারিয়ে গেল। লাভ আর লোভের সংক্রমণে গড়ে উঠতে থাকল অজস্র কদর্য বোঝাপড়া। মূল্যবোধের এত বড়ো বিপর্যয় আগে ঘটেনি। ‘মূল্যবোধ’ শব্দটাই হয়ে উঠল ক্রূর পরিহাস। আদর্শসম্মত পুরোনো ধারণা খারিজ হয়ে গেল অসহায় প্রাণধারণের প্রয়োজনে৷

‘কলকাতা ‘৭১’-এর দ্বিতীয় আখ্যানের অবলম্বন ‘অঙ্গার’ নামে একটি গল্প। লেখক প্রবোধকুমার সান্যাল। ১৯৪৩-এ লেখা। গল্পে সাবেক পূর্ববঙ্গের একটি গ্রামীণ পরিবারের শহরে এসে সমূহ সর্বনাশের ছবি বড়ো হৃদয়স্পর্শে ধরা আছে, ‘… সেই ফরিদপুরের ছোটো বাড়িটিতে ফুলের চারা আর শাকসবজি দিয়ে ঘেরা ঘরকন্নার আচারশীলা মাতৃরূপিণী পিসিমা, লাজুক একটি সদ্য ফোটা ফুলের মতন কুমারী ভগ্নী শোভনা, চাঁপার কলির মতন নিষ্পাপ নিষ্কলুষ হারু, নুটু, মীনু, এরা কি সেই তারা? কেন একটি সুখী পরিবার ধীরে ধীরে এমন সমাজনীতিভ্রষ্ট হল? কেন তাদের মৃত্যুর আগে তাদের মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু ঘটল এমন করে? কোন দয়াহীন দস্যুতা এর জন্য দায়ী?’

মৃণাল সেন গল্পটি বেছে নেন। তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন। ক্ষুধায় মৃত্যুর পাশাপাশি এই আখ্যানে আছে ‘মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু’র দরদি বিবরণ। কিছু অংশ উদ্ধৃত করে বুঝে নেওয়া যেতে পারে, যেহেতু এই টেক্সট সিনেমার ন্যারেশনে হুবহু নেই, থাকতে পারে না, নিহিত আছে বিপর্যয়ের সারাৎসার।

এই বিরাট মহানগর একদিকে হয়ে উঠেছে কাঙালিপ্রধান ও আর-একদিকে চলেছে যুদ্ধ সাফল্যের প্রবল আয়োজন। ফলে যারা অবস্থাপন্ন ছিল, তারা হয়ে উঠেছে বহু টাকার মালিক, আর যারা গরিব ছিল, তারা হয়েছে সর্বস্বান্ত৷ দেশের সবাই বলছে দুর্ভিক্ষ, গভর্নমেন্ট বলছে, না এ দুর্ভিক্ষ নয়, খাদ্যাভাব।

‘…বৌবাজারের পথের একটা অংশ এখান থেকে চোখে পড়ে। সেখানে অসংখ্য যানবাহনের জটলা- ট্রাম, বাস, মোটর, গোরুর গাড়ি আর মিলিটারি লরির চাকার আঁচড়ানির মধ্যে শোনা যাচ্ছে অগণ্য মৃত্যুপথযাত্রী দুর্ভিক্ষপীড়িতদের আর্তরব। জঞ্জালের বালতি ঘিরে বসে গেছে কাঙালিরা, পরিত্যক্ত শিশুর কঙ্কাল গোঙাচ্ছে, স্ত্রীলোকদের অনাবৃত মাতৃবক্ষ অন্তিম ক্ষুধার শেষ আবেদনের মতো পথের নালার ধারে পড়ে রয়েছে।

‘…আরে কপাল, খাবারের ঠোঙা হাতে দেখলে আর রক্ষে নেই। নেড়ি কুকুরের মতন পেছনে পেছনে আসে মেয়ে পুরুষগুলো কেঁদে কেঁদে, ছোঁ মেরে বুঝি নেয় হাত থেকে। পচা আমের খোসা নর্দমা থেকে চুষছে, দেখে এলুম গো।… এ দুর্ভিক্ষে চারটে অবস্থা দেখলুম, বুঝলে বিনোদ? আগে ঝুলি নিয়ে ভিক্ষে, যদি দুটি চাল পাওয়া যায়। তারপর হল ভাঙা কলাইয়ের থাল, যদি চারটি ভাত কোথাও মেলে। তারপর হাতে নিল হাঁড়ি, যদি একটু ফ্যান কেউ দেয়।। আর এখন কেবল কান্না– কোথাও কিছু পায় না৷ আরে পাবে কোত্থেকে— গেরস্থরা যে ভাত গুলে ফ্যানে খাচ্ছে গো। গৃহস্থের ঘরে ঢুকে মান-সম্মানটুকুও জ্বালিয়ে ছারখার করে দিল ক্ষুধা।

‘… কোথায় মান-সম্ভ্রম, ছোড়দা? আগে বুকের আগুন নিয়ে ছিলাম সবাই, এবার পেটের আগুনে সবাই খাক হয়ে গেলুম। কে বলেছে প্রাণের চেয়ে মান বড়? কোন মিথ্যেবাদী রটিয়েছে, আমাদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না? ছোড়দা, তুমি কি বলতে চাও, যদি তিল তিল করে না খেয়ে মরি, যদি পোড়া পেটের জ্বালায় ভগবানের দিকে মুখ খিঁচিয়ে আত্মহত্যা করি, যদি তোমার মা বোনের উপবাসী বাসি মড়া ঘর থেকে মুদ্দোফরাসে টেনে বার করে, সেদিন কি তোমাদেরই মান-সম্ভ্রম বাঁচবে? যারা আমাদের বাঁচতে দিলে না, যারা মুখের ভাত কেড়ে নিয়ে আমাদের মারলে, যারা আমাদের বুকের রক্ত চুষে চুষে খেলে, তাদেরই কি মান-সম্ভ্রম পৃথিবীর ভদ্রসমাজে কোথাও বাড়ল? যাও, খোঁজ নাও ছোড়দা, ঘরে ঘরে গিয়ে৷ কাঙালিদের কথা ছাড়ো, গেরস্থবাড়িতে ঢুকে দেখে এসো। কত মায়ের বত্রিশ নাড়ি জ্বলে পুড়ে গেল দুটি ভাতের জন্যে, কত দিদিমা পিসিমা খুড়িমা বোন বৌদিদিরা আড়ালে বসে চোখের জল ফেলছে একখানি কাপড়ের জন্যে। অন্ধকারে গামছা আর ছেঁড়া বিছানার চাদর জড়িয়ে কত মেয়ে-পুরুষের দিন কাটছে, জানো? বাসি আমানি নুন গুলে খেয়ে কত লাজুক মেয়ে প্রাণ ধারণ করছে, শুনেছ? মান-সম্ভ্রম! মান-সম্ভ্রম নিজের কাছেই কি রইল কিছু ছোড়দা!’

লাজুক, সদ্য ফোটা ফুলের মতো শোভনা, নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক মীনু শরীর বিক্রির পথ ধরেছে, হারু চুরির পথ৷ শিখিয়েছে তাদের সেই আচারশীলা জননী। ইয়ান স্টিফেন্স লক্ষ করেছিলেন social disintegration।  সমাজ তো ভাঙছেই, পারিবারিক জীবনও সমাজনীতি থেকে ছিটকে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

মৃণাল সেনের ছবিতে শোভনা এতদিন চেপে-রাখা অভিযোগগুলো মায়ের মুখের উপর ছুঁড়ে দেয়, তুমি মা? তুমি মা? স্বার্থপর। প্রথম দিন আমাকে কেরানি-বাগানের বাসায় কে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল? হরিশ যোগেনদের কাছে কে পাঠায় মীনুকে? মেসের ওই বুড়োধেড়ে লোকগুলোর কাছে?

হাতে ধরে মা দেহব্যবসায় নামিয়েছে মেয়েদের। খেয়ে-পরে বাঁচার অন্য উপায় নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। দেহপসারের সহবাস ছাড়া গতি নেই। সমাজটা বিকৃত হলে মানসম্ভ্রম বাঁচে কীভাবে।

প্রবোধকুমার সান্যালের আখ্যানের প্রধান চরিত্র বলে, ‘পাতালপুরীর সুড়ঙ্গলোকের কদর্যকলুষ রুদ্ধশ্বাস থেকে মুক্তি নিয়ে এসে দাঁড়ালুম রাজপথের ওপর দিগন্তজোড়া মুমূর্ষু আর্তনাদের মধ্যে। এ বরং ভালো, এই অগণ্য ক্ষুধাতুরের কান্না চারিদিকে পরিব্যাপ্ত থাকলেও কেমন একটা দয়াহীন সকরুণ ঔদাসীন্যে এদের এড়ানো চলে। কিন্তু যেখানে চিত্ত-দারিদ্র‍্যের অশুচিতা, যেখানে দুর্ভিক্ষপীড়িত উপবাসীর মর্মান্তিক অন্তর্দাহ, যেখানে কেবল নিরুপায় দুর্নীতির গুহার মধ্যে বসে উৎপীড়িত মানবাত্মা অবমাননার অন্ন লেহন করছে, সেই সংহত বীভৎসতার চেহারা দেখলে আতঙ্কে গলা বুজে আসে।’

মনে রাখতে হবে, গল্পটা লেখা মন্বন্তরের সমকালে।

১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কলকাতা ‘৭১’-এ মৃণাল সেন গল্প থেকে এগিয়ে গেলেন। তুলে ধরলেন প্রশ্ন: প্রতিবাদ হল না কেন? প্রতিরোধ ছিল না কেন? ছিনিয়ে খায়নি কেন? বাজার থেকে ঘুরে এসে চৌবাচ্চার জলে পা ধুতে ধুতে বিপন্ন মাস্টারমশাই বিবৃত করেন সেই সময়কে: যা দিনকাল পড়িছে বাঁচা যাবে না/শ্যালদা স্টেশনে দুটো বুড়ো চোখের ওপর ধুঁকতে ধুঁকতে মরি গেল/ ডেথ আউট অফ স্টার্ভেশন/ একটা বউখানা মেয়েছেলে রোগামতো লোকের মুখে পরনের কাপড় নিংড়ে জল দিচ্ছে/ জিজ্ঞেস করলুম পাত্তর-টাত্তর নেই/ বললে, আছে/ একটা ভাঙা মালসা। তাতে কিছুটা খিচুড়ি। সকালে খেয়েছে খানিকটা। বাকিটা রেখে দিয়েছে রাইতে খাবে বলে/ কই একটা লোকও তো পিতিবাদ করে না/ মানুষগুলো টপাটপ মইরছে মুখ থুবড়ে/ আজব ব্যাপার/ কই দোকানপাট তো লুট কইরছে না / এতগুলো মানুষ যদি একবার মাথা তুলে দাঁড়াত তাইলে…

প্রশ্নটা তুলেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৪৬-এ লেখা গল্প ‘ছিনিয়ে খায়নি কেন’-তে। যোগী দেখেছে, দোকানে খাবার আছে, গুদামে চাল আছে। মানুষ ফ্যান চেয়ে ঘোরে, জোলো খিচুড়ি খেয়ে ঝিমোয়, রিলিফখানায় সারি দিতে আগুপিছু নিয়ে কামড়কামড়ি করে। আর ফুটপাথে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে। তবু দু-মুঠো খেতে দল বেঁধে জেগে ওঠে না। কেন? প্রশ্নের জবাবে মানিকবাবু অনাহারের একটা অভ্যাসের কথা বলবার চেষ্টা করেন। কমিউনিস্ট পার্টির অনুগামী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সেদিনের পার্টি অনুসৃত জনযুদ্ধের লাইন অনুযায়ী একটা ব্যাখ্যা খাড়া করার চেষ্টা৷ প্রশ্নের জবাব তাই মেলেনি। সোমনাথ হোর ক্ষুধা ও মৃত্যুসমাকীর্ণ সেই পরিস্থিতির বিশ্লেষণে বলেছেন, এখন মনে হয় সাম্যবাদী দল সেদিন যদি শুধু জনযুদ্ধের স্লোগানে আচ্ছন্ন না থেকে জনসাধারণকে সংঘবদ্ধ করে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারত, তাহলে এত মৃত্যুর মিছিল দেখতে হত না৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেন, কেবল মজুতদার আর কালোবাজারকে দায়ী করা হল, গানে-নাচে-নাটকে শুরু হল মড়াকান্না, ভুখা নাচ ও ক্ষুধার্তজনের সেবার আহ্বান৷ শ্রেণিসংগ্রাম উঠে গেল।

কই, একটা লোকও তো পিতিবাদ করে না। প্রতিবাদের ভাষা ধরিয়ে দেবার কেউ ছিল না সেদিন। ক্ষুধার্ত মানুষগুলোকে সংঘবদ্ধ করার কথা ভাবেনি কোনো দল বা সংগঠন।

 

. যে বলে মোকে শালা/ তার বুনিরে দিব মালা

প্রতিবাদের একটা দুর্দান্ত সিকোয়েন্স দেখা গেল ‘কলকাতা-‘৭১’-এর তৃতীয় আখ্যান ‘১৯৫৩’-য়। একদিকে চাল পাচার করে ঘর-চালানো ছোটোলোক ছেলের দল। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত আত্মসুখী ভদ্রসমাজ। এখানেও ‘গৌর’। একদিন সে ফ্যানের পেছনে ছুটেছিল। এবার গ্রাম থেকে চাল নিয়ে শহরের দিকে ছুটছে। বেশি দামে বেচে সংসারে অভাব কিছুটা দূর করবে বলে। অভাব কেড়ে নিয়েছে তার শৈশব৷ পুলিশের খাতায় সে বেআইনি পাচারকারী। অবশ্য সে ও তার সঙ্গীরা নিজেদের বলে, ‘চালচুলো নেই বেচাল রে/আমরা যোগাই চাল।’ টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত যাত্রীদের একজন,  লোকটা ব্যায়ামবীর, এদের ‘শালা’ সম্বোধন করলে গৌরাঙ্গ গান বাঁধে, ‘যে বলে মোকে শালা/ তার বুনিরে দিব মালা।’ ফলে যা হবার, ব্যায়ামবীর যাত্রী উত্তম-মধ্যম দেয় গৌরাঙ্গকে। গৌরাঙ্গ রক্তাক্ত হয়। এক যাত্রী বাঙ্কে আরামে শুয়ে শুয়ে বলে, কাকে ছেড়ে কাকে মারবেন স্যার? পেটাতে গেলে সারা দেশটাকেই পেটাতে হয়। ব্যায়ামবীর যাত্রীর গন্তব্য স্টেশন আসে৷ দু-হাঁড়ি রসগোল্লা ঝুলিয়ে সে যাচ্ছে জামাইষষ্ঠী করতে। রেল কামরার সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় তাকে গৌরাঙ্গ ল্যাং মারে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে পিটিয়ে-ছোটোলোকদের-শিক্ষা-দেওয়া সেই মুশকো। দুটো হাঁড়িই চুরমার। এই অভাবিত পতনের দৃশ্যে অন্য যাত্রীরা স্তম্ভিত নির্বাক। ছোটোলোকদের প্রতিবাদ এবার আক্রমণাত্মক। দু-মুঠো অন্নের জন্য এরা পুলিশ ও প্রশাসনের অনেক হেনস্থা সহ্য করে। সেই সঙ্গে ভোগী-সুখী ভদ্রলোকদের ঘৃণা। গৌর আক্রমণ করল সেই ঘৃণাকে, ঘৃণার অত্যাচারকে।

পরের আখ্যানে আছড়ে পড়ে এলিট-বিলাসের প্রমোদপাড়ায় মন্বন্তরের একগুচ্ছ আলোকচিত্র ও জয়নুল আবেদিনের আঁকা বিখ্যাত ছবি: প্রেতকল্প মায়ের কোলে শোয়ানো ক্ষুধায় মৃত শিশু। মদের নেশা গাঢ়  করতে, নেশার ঝোঁকে শরীরে মাতন তুলতে উদ্দাম পশ্চিমি রক, আলোর চোখ-ধাঁধানো খেলা, সোসাইটির কপট কাটপিসগুলোর কপচানি আর মেয়েদের ন্যাকাপনা। এই পটভূমিতে মৃণাল সেন তীব্র স্যাটায়ারে আক্রমণ করেন প্রমোদক্যালানে এলিটদের মিথ্যাচার, তঞ্চকতা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে। পঞ্চাশের মন্বন্তরের অন্যতম প্রধান চিত্রভাষ্য জয়নুল আবেদিনের ছবিটি দেখিয়ে গুরু-এলিট চরিত্র শিল্পপতি মিস্টার ব্যানার্জি বলে যায়: ছবিটি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে জোগাড় করেছিলাম/ ওরিজিন্যাল/ দুর্ভিক্ষ/ মন্বন্তরের ছবি/ নাইনটিন ফরটি-থ্রি/ কুকুর-বেড়ালের মতো মানুষগুলো মরে গেল/ ফিফটি ল্যাকস অব মব/ পঞ্চাশ লাখের বেশি লোক স্রেফ না খেতে পেয়ে মরে গেল/ মেরে ফেলা হল। শিল্পপতি ব্যানার্জি জানায়, ছবিটি সে ডাইনিং টেবিলের সামনে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে। মনকে স্ট্রং রাখে, ব্যালেন্স ঠিক রাখে, চাবুক মারে, চাবুক…

কে এই শিল্পপতি ব্যানার্জি? তার এক অধস্তন জানায়: লোকটা না একটা সোয়াইন। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে একটা সওদাগরি অফিসে চাকরি করত। কলম-পেষা চাকরি। যুদ্ধের সময় চুটিয়ে কালোবাজারি করে…। হিপোক্রিট, স্কাউন্ড্রেল। ওর দুটো কারখানায় লকআউট৷ শ্রমিকরা সাড়ে বারো পারসেন্ট বোনাস চেয়েছিল।

মন্বন্তর থেকে ফায়দা তুলে ফুলে-ফেঁপে-ওঠা লোকগুলো আজ নৈরাজ্যের মওকায় আরও ধনী ও প্রভাবশালী, রাজনীতির চক্রে ঢুকে আরও বড়ো মাপের ধান্দাবাজ। গলা ভারী করে, কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে বলে: এমন একটা লিডারশিপ দরকার যা মোবিলাইজ করতে পারবে, শেপ দিতে পারবে। বলিষ্ঠ পার্টি, লিডার দরকার। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, নিউ ইন্ডিয়া ইজ বিয়িং বর্ন। একটা নতুন জাতির জন্ম হচ্ছে।

আর কথা শেষ হয় পথে পথে কাঙালির ভিড়ে।

এর একটু পরেই শিল্পপতি, তখন নেশায় ডুবুডুবু, নীতিহীনতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেয়। তুমি চারবেলা খাবে, আর ওরা একবেলাও খেতে পাবে না, এটা নীতিহীনতা নয়? আমার হাতে যদি বোমা থাকত, নিজে বোমা মারতুম। সমাজের উন্নতির জন্য, আমার কারখানার এক্সটেনশনের জন্য, আমার ট্রেড মার্কেট বাড়ানোর জন্য। আরও আরও আরও…।

মন্বন্তরের শোষকরা আজ শাসক হয়েছে। আরও চায়। নৈরাজ্যের পথে তাদের দারুণ ফুর্তি। দুর্ভিক্ষের দিনগুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখে এই লোকগুলো। মৃণাল সেনের সিনেমার রাজনৈতিক ভাবনা মন্বন্তর থেকে সংগ্রহ করা বারুদ৷ অন্যভাবে বলা যায় তাঁর সিনেমার রাজনৈতিক কম্পনের এপিসেন্টার হল পঞ্চাশের মন্বন্তর। যা পরে বিস্তৃত হয় উত্তাল গণ-আন্দোলনে, সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবে। ফিরে ফিরে আসে দুর্ভিক্ষকালের ফ্রাইটফুল শটস, পথে পথে কাঙালির ভিড়। পরদায় ফুটে ওঠে চলমান সংকটচিহ্ন: নীতিহীনতা বেকারত্ব ক্ষুধা পূর্বপুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা।

 

. আপনারা কি এ দেশের মানুষ নন?’

খুব ভোরে, তখন আশপাশে কেউ ছিল না, পুলিশ তাড়িয়ে নিয়ে ময়দানের পশ্চিম কোণে এক যুবককে গুলি চালিয়ে হত্যা করল। সেই কুড়ি বছরের যুবক, যে দেখেছে হাজার হাজার বছর ধরে ক্ষুধা বঞ্চনা দারিদ্র‍্য শোষণ মৃত্যু৷ যার কণ্ঠস্বর ‘৭১-এর প্রথমাবধি ইস্তাহারের মতো ধ্বনিত হয়েছে।

কলকাতা তথা বাংলার পথে পথে তখন লাশ। অলিগলিতে লাশ, মাটির নীচে লাশ, জলে ভাসে লাশ, জেলে লাশ, লকআপে লাশ৷ লাশের স্তূপ। রাষ্ট্র আর বেনিয়াতন্ত্রের যৌথ বাহিনী এদের হত্যা করেছে৷ কারণ এরা সুষম সমাজের কথা বলেছিল, সুষম সমাজের পথে হেঁটেছিল।

১৯৪৩-এও ছিল কলকাতা তথা বাংলার পথে পথে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের লাশ৷ তখন হত্যার অস্ত্র ছিল ক্ষুধা ও উপেক্ষা। হত্যাকারী সেই রাষ্ট্র ও বেনিয়াতন্ত্র।

১৯৬৯ থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন হত্যালীলা চালাল সরাসরি গুলিতে বেয়নেটে এবং নৃশংস নানা পদ্ধতিতে। কুড়ি বছরের যুবক তার কপাল থেকে গড়িয়ে-পড়া রক্তধারা মুছে আমাদের জানায়, আমাকে কেন হত্যা করল জানেন? আমি দেখেছি অত্যাচার অবিচার অন্যায়। যুগ যুগ ধরে দেখেছি। আমাকে কারা মেরেছে, আমি জানি তাদের। আমি চাই, আপনারা তাদের খুঁজুন৷ খুঁজতে গিয়ে কষ্ট পান, যন্ত্রণা পান। আপনারা এত নিশ্চিন্ত কেন? এত জড় কেন? আপনারা কি এ দেশের মানুষ নন?

আবার আকালের ছবি। মৃত্যু আর ধ্বংসের ছবি৷ যুবক বলে, চারিদিকে অন্ধকার। অনন্ত অন্ধকার। গ্লানি অপমান মৃত্যুর গভীর থেকে গুমরে গুমরে উঠছে একটা ভাষা। প্রতিবাদ। কৈফিয়ত তলব করছে।

 

. আমাদের সামনে কোনো প্রোগ্রাম নেই

মৃণাল সেনের ১৯৭৩-এর ছবি ‘পদাতিক’-এর শুরুতেও ইতিহাসের কণ্ঠস্বর, ইস্তাহারের কণ্ঠস্বর। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাব, অনাহারে মৃত্যু, শ্রমিক অসন্তোষ, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাজজীবনের বিশৃঙ্খলা, শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য– ক্রমাগত সংকটের পরিস্থিতি যা বাংলাকে নিয়ে চলেছে পরিত্রাণহীন অধঃপাতের দিকে। বাংলার পরিবর্তে যদিও উচ্চারিত হয়েছে ‘কলকাতা’। ‘কলকাতা আরও দুঃসহ, আরও যন্ত্রণাময়, আরও বীভৎস। দারিদ্র‍্য আরও মারছে। হতাশা আরও মরিয়া। কলকাতা এক নারকীয় শহর, যার উদ্ধার নেই, যার শিয়রে হয়তো সমুহ সর্বনাশ।’

সেই আকালের দিনগুলিরই অধিকতর যন্ত্রণাময় ধারাবাহিকতা যেন।

শুরুতেই দেখা যায়, এখানেও এক যুবক ছুটছে। পালাচ্ছে৷ মৃত্যুর বাড়ানো হাত থেকে পালাচ্ছে। ঘাতকের গুলিতে তার দুই সঙ্গী লুটিয়ে পড়ে। সে কোনোক্রমে পালায়। বেঁচে যায়। রেডিয়োর খবর জানায়, যুবক উগ্রপন্থী। অর্থাৎ বিপ্লববিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। সেই দলের নেতার কথায়, ইমপরট্যান্ট কমরেড।

এই যুবকও হেঁটেছে সুষম সমাজ গড়ার পথে, পথের বিশ্বাসে, মরিয়া উচ্ছ্বাসে। কিন্তু আজ সে প্রশ্নাক্রান্ত। সে জানতে চায়, আমরা কোন পথে চলেছি?

বলে, ধরা পড়েছিলাম। পালালাম। আবার ধরা পড়লাম। পালালাম। এরপর কী?

অসংখ্য মৃত্যুর গভীর থেকে তার মধ্যে গুমরে গুমরে উঠছে একটা ভাষা৷ সে কৈফিয়ত তলব করছে।

সে বলে, সামগ্রিক বিপ্লব চাই। সর্বস্তরে৷ আমরা কি সমর্থন পাচ্ছি? নিজের তাগিদে মানুষ আমাদের সমর্থন করছে? না ভয়ে? আমাদের সামনে কোনো প্রোগ্রাম নেই। এতগুলো লোক, তাজা জোয়ান ছেলে, সমস্ত কিছু করবার জন্য তৈরি, ডেডিকেটেড, কী করছে? কী করানো হচ্ছে তাঁদের দিয়ে? কাদের জন্য সংগ্রাম? জনসাধারণের জন্য। শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত খেটে-খাওয়া মানুষদের জন্য। এদের সবাইকে সেভাবে পেয়েছি কি? যারা আসছে, প্রাণের ভয়ে না প্রাণের তাগিদে?

কিন্তু এসব প্রশ্ন করার জায়গা কোথায়? ষাটের শেষদিক থেকে সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিপ্লববিশ্বাসী পার্টির নেতৃত্ব প্রশ্নহীন আনুগত্য চেয়েছে৷ হয়তো সবাই এরকমই চায়। প্রশ্ন তোলার প্রতিবাদ করার খেসারত দিতে হয়েছে বহু মেধাজীবীকে বিশ্ব জুড়ে। এই বাংলাতেও মরতে হয়েছে অনেক ইমপরট্যান্ট কমরেডকে৷ মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। এইভাবেই চলে আসে চিন্তার আকাল, বোধের আকাল, প্রশ্নের আকাল, প্রতিবাদের আকাল।

সেই যুবক, যে সুষম সমাজ গড়ার পথে হেঁটেছিল, পার্টি তাকে মহিলা-সংসর্গের কুৎসিত অপবাদ চাপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তার বাবা, একদা সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বাসী ‘টেররিস্ট’, যুবকের বুকে হাত রেখে বলেন, যাও, বি ব্রেভ।

এই সিনেমায়ও ক্ষুধা আর পথ জুড়ে ছড়িয়ে কাঙালি। আর আছে এলোমেলো অস্পষ্ট রাজনৈতিক ভাষণ।

 

. আকালের সন্ধান শেষ হয় না

বাংলা সিনেমা এই সংবাদ-ও-প্রশাসন কথিত ‘উগ্রপন্থী’ রাজনীতি নিয়ে বড়ো কাজ করতে পারে না৷ হাজার মানুষের আত্মত্যাগে যে বিপ্লবপ্র‍য়াস, স্বপ্নের আগুনে যে বিদ্রোহ, যে ব্যর্থতা ও রক্তক্ষয়, তার কথা বাংলা সিনেমা বলতে পারল কই?

মৃণাল সেনের ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮২) আকালের সন্ধান শেষ হয় না৷ শেষ করা সম্ভব হয় না গ্রামের মানুষের প্রতিবাদে-প্রতিরোধে।

কেন প্রতিবাদ? কেন প্রতিরোধ? গ্রামের মাস্টারমশাই এতদিন সিনেমার শুটিং ইউনিটের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবার বললেন, ‘একটা ফাঁক, ভুল বোঝাবুঝির, যেন দুটো পৃথিবী। আপনারা আর আমরা। আমিও একদিন আপনাদের মধ্যেই ছিলাম। আপনাদের মতোই। আমিও শহর থেকেই এসেছি। কলকাতা। আমার শিক্ষাদীক্ষা সবই সেখানে। দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নিজেকে ভাঙতে চেষ্টা করেছি। ভেঙেছি, বুঝতে চেয়েছি, পারিনি। তবে এ কথাও বলব, দোষটা একতরফা নয়। এদের যেমন অশিক্ষা, সংস্কার, লাভ, স্বার্থপরতা…। আর কিছু আমি বলব না৷ তা-ই বলে আপনারাও গঙ্গাজল-ধোয়া তুলসী নন৷ দোষ আপনাদেরও আছে। আপনাদের পদমর্যাদা দিয়ে, আপনাদের সামাজিক কৌলীন্য দিয়ে, আপনাদের তো privileged class-ই বলতে পারি। আপনারা এতকাল নিজেদের চাপিয়ে এসেছেন ওদের ওপর। ওরা কেন সহ্য করবে? আপনারা স্টুডিয়োতে ফিরে যান৷ বাকি কাজটুকু সেখানেই করুন। লোকজনের ভয় নেই, পুলিশেরও দরকার নেই।’

আকালের সন্ধান শেষ হয় না৷

মৃণাল সেনের উক্তি দিয়ে শেষ করি: ‘অমলেন্দু চক্রবর্তীর কুড়ি পাতার গল্পের শেষে হৃদয় বিদীর্ণ করা প্রশ্ন উঠে আসে দুর্গার: কোথায় গেলে বাবুরা? তোমরা না দুর্ভিক্ষের ছবি তুলতে এসেছিলে? কোথায় গেলে গো?

অতীত ও বর্তমানের যোগাযোগ, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের কথোপকথন ‘আকালের সন্ধানে’ বারবার এসেছে। বর্তমানের চরিত্র, অতীতের চরিত্র সব মিলেমিশে একাকার– ১৯৮০-র স্থান-কাল-পাত্র আর ১৯৪৩-এর স্থান-কাল-পাত্র– পঞ্চাশের মন্বন্তর।…

সহমর্মিতার আকাল, বোধের আকাল, রুচির আকাল— অপার আকালের পথে বাঙালি হাঁটে৷

‘ইউনিটের সবাই ছাব্বিশটা ঘরে ঘুমিয়েছে, থেকেছে, তাস খেলেছে। দুর্ভিক্ষের উপর ছবি হচ্ছে অথচ ইউনিটের সবাই চিকেন ফ্রায়েড রাইস খাচ্ছে ডিনারের সময়। চারিদিকে দামি সিগারেটের প্যাকেট পড়ে আছে। মাছ, সবজির দাম গ্রামে বেড়ে গিয়েছে। শুটিংয়ের জন্য এমন অবস্থা, গ্রামের কেউ কেউ বলল, দুর্ভিক্ষের ছবি তুলতে এসে সিনেমার লোকেরা গ্রামে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিয়েছে।’

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুব ভালো বিশ্লেষণ! মৃণাল সেন একজন সত্যিকারের রাজনীতি সচেতন চলচ্চিত্রকার ছিলেন৷ তাঁর অধিকাংশ সিনেমা হয়তো বাণিজ্যিকভাবে সফল নয়, কিন্তু যে বার্তা তিনি দিতে চেয়েছেন, সেখানে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না৷ বাংলার বিপর্যয়ের কালকে তিনি পর্বে পর্বে ধরে রেখেছেন৷

আপনার মতামত...