একশো দিনের কাজ: রাস্তাই একমাত্র রাস্তা

সুমন সেনগুপ্ত

 


দিল্লির যন্তরমন্তরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জড়ো হয়েছেন দেশের বিভিন্ন রাজ্যের একশো দিনের কাজের কর্মীরা। কেউ বলছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বছরে ছয় হাজার টাকার বদলে তাঁদের একশো দিনের কাজ দিতে হবে। একশো দিনের কাজে যাঁরা নিযুক্ত হয়েও টাকা পাচ্ছেন না, তাঁরা বলছেন, ‘কেন্দ্র রাজ্য বুঝি না, কাজ দাও আর কাজের মজুরি দাও’

 

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে রাজ্যের প্রাপ্য একশো দিনের কাজের টাকা মিটিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। সে দাবিও প্রায় বহুদিন হল। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রাজ্য সরকারের প্রাপ্য। এই টাকা না দিলে, যাঁরা এতদিন এই প্রকল্পে কাজ করেছেন, তাঁদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না— এই অভিযোগ উঠছে রাজ্যের শাসকদলের পক্ষ থেকে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অবশ্যই এই বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসা জরুরি, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায়, রাজ্য সরকারের অধীনে চলা এই একশো দিনের কাজের প্রকল্পের টাকা কেন্দ্রীয় সরকার দিতে চাইছে না কেন? আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে মাঝেমধ্যেই এই বিষয়ে অস্বচ্ছতার নানান অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই কারণেই হয়তো তারা এই সংক্রান্ত বিষয়ে একটু ধীরে চলো নীতি নিয়েছে। সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। বিজেপির তরফ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, একশো দিনের কাজে এই রাজ্যের তৃণমূল সরকার এমন দুর্নীতি করেছে যে কেন্দ্রীয় সরকার টাকা বন্ধ করে দিয়েছে।

দুর্নীতি নিয়ে যা অভিযোগ উঠছে, তার খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে কীভাবে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থাকা মানুষজনই একমাত্র এই প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন, কীভাবে সেই প্রকল্পের টাকায় দুর্নীতি চলছে, কীভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে একশ্রেণির তৃণমুল-আশ্রিত দুষ্কৃতি। বিমলা মণ্ডল, নদীয়া জেলার বাসিন্দা, তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। কীভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে, শুধুমাত্র শাসকদলের কাছাকাছি থাকা মানুষজনকেই এই একশো দিনের কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে। যখনই তাঁরা পঞ্চায়েতে অভিযোগ করছেন কেন তাঁদের কাজ দেওয়া হচ্ছে না, সেখান থেকে বলা হচ্ছে তাঁরা যেন বিডিও অফিসে গিয়ে চারের ক ফর্ম পূরণ করে এই অভিযোগ করেন। বিডিও থেকে পঞ্চায়েতে বলে দিলে কখনও কখনও হয়তো পাঁচ–ছয় দিনের কাজ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তা-ও অনিয়মিত। বেশিরভাগ পঞ্চায়েতব্যবস্থাই প্রায় উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। যা চলছে, তা হয় শাসকদলের অফিস থেকে না হয় পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অনেক সমস্যার সমাধান হলেও ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি পঞ্চায়েতব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করছে। একমাত্র শাসকদলের কাছাকাছির মানুষেরাই লাভবান হচ্ছে। তাদের নাম দিয়েই একশো দিনের কাজের মাস্টার রোল সম্পুর্ণ করা হচ্ছে। সেই মাস্টার রোল অনুযায়ী হিসেব করা হচ্ছে, তাদেরই ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়মনীতি মেনে। সেই টাকা শাসকদলের নেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তালিকায় থাকা মানুষদের কাছে টাকার একটা ক্ষুদ্র অংশ এলেও বেশিরভাগ টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হচ্ছে শাসকদলের নেতা এবং গুন্ডাদের মধ্যে। শাসকদলের সন্ত্রাসের ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে রয়েছে, কেউ কোনও প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। একেকজন মানুষের একশো দিনের কাজ বাবদ যদি ন্যূনতম মজুরি অনুযায়ী দৈনিক দুশো টাকা প্রাপ্য হয়, তাহলে এই দুর্নীতির মোট পরিমাণ কত টাকার তা সহজেই অনুমেয়। এই দুর্নীতির ফলই হচ্ছে, শাসকদলের কাছাকাছি থাকা বেশ কিছু মানুষের প্রাসাদোপম বাড়ি, যা নিয়ে নানা সময়ে নানা সংবাদপত্রে খবরও হয়েছে। কিছুদিন আগে যখন রামপুরহাটের বগটুইের ঘটনায় ভাদু শেখদের ফুলেফেঁপে ওঠার খবর প্রকাশ্যে আসা শুরু হয়, তখন বিভিন্ন জেলা বিভিন্ন গ্রাম থেকে এইরকম বহু ভাদু শেখদের অট্টালিকার ছবি আসতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে এবং গণমাধ্যমে, তখন সেই ক্ষোভ চাপা দিতে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেন তিনি আবারও ‘দিদিকে বলো’ গোছের কর্মসূচি চালাতে চান, যাতে মানুষ সরাসরি তাঁদের ক্ষোভের কথা তাঁকে জানাতে পারেন। এখন তো আবার নতুন কর্মসূচি এসেছে— ‘মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি’। এই কথা শুনে বিমলার বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী কি জানেন না, তাঁর গুণধর ভাইদের কীর্তি? তাহলে নতুন করে তাঁকে অভিযোগ করে আর কী হবে? এইগুলো তো শুধুমাত্র মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা। যদি তাঁর কাছে তথ্য না-ই থাকে, তাহলে তিনি কী করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি লিখে একশো দিনের কাজের বকেয়া টাকার জন্য দরবার করছেন? সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার কতটা সাধারণ মানুষ পাবেন, আর কতটা অঞ্চলের শাসকদলের নেতাদের পকেটে ঢুকবে, তা কি বলে দিতে হবে? বিমলা মণ্ডলকে মনে করাতে হয় না লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের কথা। তিনি নিজে থেকেই বলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বছরে ছয় হাজার টাকার বদলে তাঁদের একশো দিনের কাজ দিতে হবে, সেই দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করতে রাজি।

এই বিমলা মণ্ডলদের মতো মানুষজন কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন কী বিষয় নিয়ে, কী পদ্ধতিতে আন্দোলন করতে হবে। তাঁকে প্রশ্ন করতে হয়নি, তিনি নিজেই বললেন, বিজেপির হয়ে যারা এখন এই বিষয়ে কথা বলতে আসছে, তারা তো কিছুদিন আগেও তৃণমূলের এই দুর্নীতির সঙ্গী ছিলেন। বখরার হিসেবে গোলমাল হওয়াতে তারা এখন বিজেপি করছেন, তাদের কি আদৌ ভরসা করা যায়? তারা যে আবার কিছুদিন পরে তৃণমূলে যোগ দেবে না, তা-ও কি জোর দিয়ে বলা যায়? আমাদের নিজেদের লড়াই নিজেদেরই করতে হবে, আমরা সংগঠিত হচ্ছি। বলছিলেন বিমলা মণ্ডল-সহ বেশ কিছু মহিলা। আরও একবার বললেন— আচ্ছা, বলুন তো এই তৃণমূল তো মানুষের থেকে চাঁদা তোলে না, তাহলে পঞ্চায়েত-সহ বিভিন্ন নির্বাচনে এই এত টাকা খরচ করে কী করে?

আমরা ভাবছি, বলছি, তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত দল, অথচ গ্রামের সাধারণ মানুষ এমনকি বাংলার গ্রামের একজন সাধারণ মহিলা কিন্তু দেখিয়ে দিলেন দুর্নীতির একটি অন্যতম উৎস। বাতলে দিলেন লড়াই করার রাস্তা। আরও বললেন, আমরা একশো দিনের কাজ চাই এবং ভবিষ্যতে যাতে তা দুশো দিনে রূপান্তরিত করতে পারি, সেই লড়াই লড়তে চাই। সেই লড়াই তো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি, তাহলে সেই লড়াইয়ের বিরোধিতা তো তৃণমূল করতে পারবে না।

 

এবার একশো দিনের কাজ নিয়েই অন্য একটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।

এই মুহূর্তে, বিহার কিংবা ঝাড়খণ্ড, কিংবা হয়তো বা দেশের অন্য কিছু রাজ্যে গ্রামের দিকে গেলে দেখা যাবে, বেশ কিছু মানুষ একশো দিনের কাজে নিযুক্ত আছেন। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও একটি দৃশ্য দেখা যাবে, কোনও একজন মানুষ, সেই কাজের জায়গাটিতে সেই শ্রমিকদের ছবি তুলছেন। তার দায়িত্ব, প্রাথমিকভাবে কাজ শুরুর আগে শ্রমিকদের একবার ছবি তুলে পাঠানো, তারপরে দিনের শেষে আবার সেই মানুষদেরই আবার ছবি তুলে পাঠানো। যদি কোনও কারণে দুটো ছবি না মেলে, তা প্রযুক্তির কারণেই হোক, চিত্রগ্রাহকের ব্যক্তিগত অদক্ষতার কারণে বা আলো কমবেশির কারণেই হোক, তাহলে সেই শ্রমিকটি সেইদিনের হাজিরা থেকে বঞ্চিত হবেন। শুধু এখানেই হয়রানির শেষ নয়, এই শ্রমিকদের মজুরিও কিন্তু হাতে হাতে দেওয়া হবে না, দেওয়া হবে তাঁদেরই যাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আধার সংযুক্ত করা আছে, যার সরকারি নাম ‘আধার বেসড পেমেন্ট সিস্টেম’।

দিল্লির যন্তরমন্তরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জড়ো হয়েছেন বেশ কিছু মানুষ। বেশিরভাগ মানুষ যাঁরা এই ধর্নায় বসেছেন, তাঁরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যের একশো দিনের কাজের কর্মী। এই আন্দোলন প্রায় ১০০ দিন হতে চলল। মালতী রুইদাস, পূর্ব বর্ধমানে বাড়ি। একশো দিনের কাজের জন্য যে অবস্থান চলছে দিল্লির বুকে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সোজা বক্তব্য, সবার কি স্মার্টফোন থাকতেই হবে, না থাকলে কি তিনি একশো দিনের কাজ করলেও টাকা পাবেন না? মালতী রুইদাসের মতো এইরকম অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা গত ১৪ মাস একশো দিনের কাজে নিযুক্ত ছিলেন, কিন্তু নানা কারণে মজুরি পাচ্ছেন না। তাঁরা আপাতত ১০০ দিন ধরে এই ধর্নায় বসবেন বলেছেন। যাঁরা এই ধর্নায় বসেছেন, তাঁদের দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের এই বছরের বাজেট থেকে যে একশো দিনের কাজের টাকা কমিয়ে দিয়েছে, তা চলবে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই বছরের বাজেটে, কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। তাঁদের আরও দাবি, বহু মানুষের বকেয়া হয়ে আছে বহুদিনের মজুরির টাকা, তা অবিলম্বে দিতে হবে। তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি, সমস্ত শ্রমিক, যাঁরা এই প্রকল্পে কাজ করছেন, তাঁদের হাজিরা বাধ্যতামূলকভাবে প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য যে বহু মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, এই আধার-ভিত্তিক নয়া ব্যবস্থাতে মাত্র দেশের ৪৩ শতাংশ একশো দিনের কর্মীরা যুক্ত হতে পেরেছেন। এই হ্রাসকে অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি হওয়ার ফলে এই ধরনের কাজের চাহিদা কমেছে, কিন্তু সত্যি কি তাই?

একশো দিনের এই প্রকল্পটির সরকারি নাম মহাত্মা গান্ধি জাতীয় গ্রামীণ আয় প্রকল্প বা এমজিএনআরইজিএ। ২০০৫ সালে ইউপিএ সরকারের আমলে কার্যকর হওয়া এই আইন বা প্রকল্পটি হিসেবমতো দেশের ৭০০টি জেলার গ্রামীণ মানুষদের কাজ এবং আয়ের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। কোভিডের সময়েও যখন বহু শ্রমিক, পায়ে হেঁটে শহর থেকে গ্রামে ফিরেছিলেন, তখন গ্রামে ফিরে, তাঁদেরও আয়ের অন্যতম উপায় ছিল এই প্রকল্পটি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস অবধি, বাজেটে ব্যয়বরাদ্দ কমানো ছাড়া তেমন সমস্যা ছিল না, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিন থেকেই, ওই প্রযুক্তিনির্ভর, ন্যাশানাল মোবাইল মনিটরিং সিস্টেম বা এনএমএমএস দিয়ে প্রতিটি শ্রমিকের প্রতিদিনকার ছবি, জিও ট্যাগ, অর্থাৎ সেই সময়ে কোথায় উপস্থিত আছেন, তা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিনে দুবার জানাতে হবে। এই ভ্রাম্যমাণ নজরদারি করা যে উদ্দেশ্যে, যে গরিবদের হাতে যাতে সহজে কাজ এবং টাকা পৌঁছয়, তা আজকে গরিব মানুষের জন্যেই অনধিগম্য হয়ে উঠেছে। যাঁরা এই হাজিরা তোলার কাজে নিযুক্ত আছেন, তাঁদের প্রশ্ন, বিভিন্ন সময়ে নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে, যদি কোনও একজন শ্রমিকের ছবি ওই মোবাইল অ্যাপলিকেশনের মাধ্যমে না পৌঁছয়, তাহলে কি সেই ব্যক্তিটির সেদিনের হাজিরা উঠবে না? যাঁরা দিল্লিতে এই আন্দোলনে বসেছেন, তাঁদের মধ্যে জঁ দ্রেজ সহ বহু সমাজকর্মীর বক্তব্য, সরকার দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য এই যে পদ্ধতি নিয়েছেন, তার ফলে তো বেশিরভাগ মানুষই বাদ পড়ছেন, প্রযুক্তিগত অসুবিধার কারণে। হয়তো বেশ কিছু রাজ্য থেকে এই একশো দিনের কাজ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, কিন্তু তা বন্ধ করার জন্য সেই রাজ্যের প্রাপ্য টাকা বন্ধ করে দেওয়া বা এই সমস্ত প্রযুক্তির প্রবর্তন করা, যেখানে ভারত এবং ইন্ডিয়ার মধ্যে এখনও বিস্তর ফারাক, সেখানে তো সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষেরাই ভুক্তভোগী হচ্ছেন।

এখনও অবধি যা খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যিনি নিজেকে গরিবের বন্ধু বলে দাবি করেন, যিনি বলেন, তাঁর জন্যেই দেশের ৮০ কোটি মানুষ, বিনামূল্যে রেশন পাচ্ছেন, তিনি কিন্তু এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ফেরত নেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেখাননি। ওদিকে প্রতিদিনই কোনও না কোনও শ্রমিকের হাজিরা সংক্রান্ত সমস্যা হচ্ছে, প্রায়দিনই কাজ করার পরেও আধার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তাঁদের প্রাপ্য ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কোনও না কোনও শ্রমিক। যাঁরা এই দাবিগুলো নিয়ে অবস্থানে বসেছেন, তাঁদের যুক্তি পরিষ্কার— যত দ্রুত এবং সরলভাবে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া যাবে, ততই মাঝখানের দালালচক্রের রমরমা বন্ধ করা সম্ভব। তাঁদের আরও যুক্তি, যদি এই একশো দিনের কাজের দুর্নীতি বন্ধ করতে হয়, তবে মাস্টার রোল, অর্থাৎ একটি ত্রুটিহীন নির্ভুল তালিকা তৈরি করা জরুরি এবং তা একেবারে নিচু স্তর থেকে। সামাজিকভাবে কাদের এই কাজের প্রয়োজন, তা দেখে তবেই এই তালিকা প্রস্তুত করা উচিত, এবং তা নিয়মিত মিলিয়ে দেখলে তবেই এই দুর্নীতি আটকানো সম্ভব, শুধু প্রযুক্তির ওপর ভরসা করলে, কখনওই ভারতের মতো দেশে সঠিক অঙ্কে পৌঁছনো যাবে না।

অবাক হতে হয়। ইতিহাসের নানান সন্ধিক্ষণে, সাধারণ মানুষজনই লড়াই করার রাস্তা দেখিয়েছেন। নকশালবাড়িতে সাতজন কৃষক রমণী রাষ্ট্রের গুলিতে প্রাণ দিয়ে সেদিন কিন্তু রাস্তা দেখিয়েছিলেন, আজও নদীয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের ‘বাংলার মেয়ে’ই কিন্তু বলে দিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং শাসকদলের অপশাসনের বিরুদ্ধে, লড়াই কিন্তু রাস্তাতেই হবে। শুধুমাত্র সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে বা সামাজিক মাধ্যমে এক বামদল অন্য দলকে কটাক্ষ করে কিন্তু এই লড়াই জেতা যাবে না। একশো দিনের কাজের দাবির আন্দোলন দিয়ে কীভাবে কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকারের দিকে আঙুল তোলা যায়, তাও দেখিয়ে দিলেন। একশো দিনের কাজে যাঁরা নিযুক্ত হয়েও টাকা পাচ্ছেন না, তাঁদের এখন একটাই দাবি, ‘কেন্দ্র রাজ্য বুঝি না, কাজ দাও আর কাজের মজুরি দাও’। বিমলা মণ্ডল বা মালতী রুইদাসের মতো মানুষেরা কিন্তু আবারও দেখিয়ে দিলেন, রাস্তার লড়াইতে থাকা মানুষজন রাজনীতি কিছু কম বোঝেন না। সবসময়ে হয়তো স্পষ্ট করে বোঝাতে পারেন না, কিন্তু বলে দিতে পারেন সেই অমোঘ কথাটা— ‘রাস্তাই একমাত্র রাস্তা’।


*মতামত ব্যক্তিগত। নামগুলি পরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4722 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...