এ লড়াইয়ে জিততেই হবে

প্রদীপ দত্ত

 


সরকার ও পুলিশের আচরণে দিনের পর দিন ছবিতে কুস্তিগিরদের হতাশা, অসহায়তা ধরা পড়লেও আশ্চর্য তাঁদের প্রতিজ্ঞা এবং আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই যুবতী-যুবকরা দেশের গর্ব জানার পরও তাঁদের যেন নতুন করে চিনলাম। ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগিরদের যে সমস্ত অভিযোগ রয়েছে এবং দেশ জুড়ে তাঁদের আন্দোলনের সমর্থন যেরকম বেড়েছে, তাই দেখে মনে হয় বিজেপির শত কূটকৌশল, মনুবাদী নীতি সত্ত্বেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া পথ নেই

 

কোনও রকমের প্রতিবাদই বিজেপি সহ্য করে না তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হল, মে মাসের ৩ তারিখে যন্তর মন্তরে মাঝরাতে যৌন হেনস্থাকারী ব্রিজভূষণ শরণ সিংহের গ্রেপ্তারের দাবিতে ধর্নারত কুস্তিগিরদের উপর মদ খেয়ে আসা সাদা পোশাকের পুলিশের আক্রমণ। গোড়া থেকেই বজরং পুনিয়া প্রতিবাদী মহিলা কুস্তিগিরদের সমর্থনে ধর্নায় ছিলেন। তাঁর উপর পুলিশ তর্জন করে, গায়ের জোর ফলায়। সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, যাঁরা বিচার চাইছেন তাঁদের মনোবল ভাঙতে হবে, বিচারপ্রার্থীরা আন্তর্জাতিক পদক জয় করে দেশের গৌরব বাড়ালেও তাঁদের সঙ্গে একই ব্যবহার করা হবে।

একদিন বজরং জানালেন, পুলিশ যন্তর মন্তরের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছে। তাঁদের খাবার, জল এমনকি শোয়া-বসার জন্য ‘তক্তা’ও আনতে দেয়নি। যে কর্মী সেখানে এইসব জিনিসপত্র নিয়ে আসছিলেন, তিনি বাড়ি ফেরেননি। ইঙ্গিত পরিষ্কার, পুলিশ হয়তো তাঁকে আটক করেছে। তিনি বলেন, পুলিশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে যে ধরনের ব্যবহার করছে, তাঁদের কি সেই অসম্মানই প্রাপ্য? তাহলে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে পদক জিতে আসার মানে কী?

এরপর নানা বিরোধী দলের নেতা-মন্ত্রীরা যন্তর মন্তরে গিয়ে তাঁদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে আসেন। ঠিক তারপরেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অঞ্চলটিতে ব্যারিকেড তৈরি করে, আরও বেশি পুলিশ মোতায়েন করে সরকার কুস্তিগিরদের একেবারে অপরাধী বানিয়ে ছাড়ল।

২১ এপ্রিল সাতজন মহিলা কুস্তিগির ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে দিল্লির কনট প্লেস থানায় পুলিশের কাছে লিখিত নালিশ জানিয়েছিলেন, এফআইআর দায়ের করেনি। সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে সাতদিন পরে, নিতান্ত বাধ্য হয়ে ২৮ এপ্রিল পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। পুলিশকে একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ গ্রহণ করাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলার এর চেয়ে ন্যক্কারজনক বিজ্ঞাপন আর কী হতে পারে!

এর আগে ১৮ জানুয়ারি ব্রিজভূষণকে সরানো এবং রেসলিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়াকে (ডব্লুউএফআই) ভেঙে দেওয়ার দাবিতে কুস্তিগিরেরা যন্তর মন্তরে তিনদিনের প্রতিবাদ ধর্নায় বসেছিলেন। ২৩ জানুয়ারি বক্সার মেরি কম-কে শীর্ষে রেখে বরিষ্ঠ কুস্তিগির ও কোচ যোগেশ্বর দত্ত, বরিষ্ঠ কুস্তিগির ও রাজনীতিবিদ ববিতা ফোগট, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় ত্রুপ্তি মুরগুন্ডে, সাই-এর সদস্য রাধিকা শ্রীমান ও রাজাগোপালনকে নিয়ে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে কুস্তিগিরদের যৌন হেনস্থা, ভয় দেখানো এবং স্বৈরতান্ত্রিকভাবে ফেডারেশন চালানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ওভারসাইট কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্রিজভূষণকে ফেডারেশনের শীর্ষ পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়। কমিটি রিপোর্ট জমা দেয় ৫ এপ্রিল, সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশিত হয়নি। ব্রিজভূষণ একই পদে বহাল রয়েছেন।

ওই প্রতিবাদের সময় বিনেশ ফোগটের দিদি কুস্তিগির থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা ববিতা ফোগট সরকারের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতা করার জন্য যন্তর মন্তরে এসেছিলেন। পরিচয় প্রকাশ করা হবে না এই শর্তে সেই সময় এক মহিলা কুস্তিগির লাইভমিন্টকে জানান, “আমরা ববিতার আদেশ শুনেছি… প্রতিটি ব্যাপারে সে রাজনীতি করল এবং পিছন থেকে ছুরি মেরে আমাদের এখানে রেখে গেল।”

ওই মাসেই কুস্তিগিরদের প্রতিবাদ নিয়ে বিনেশ ও ববিতার মধ্যে বাকযুদ্ধ লেগে যায়। এক টুইটে বিনেশ ববিতাকে অনুরোধ করেন আন্দোলনকে যেন তিনি দুর্বল না করেন। বিনেশ লেখেন, যদি বিক্ষুব্ধ মহিলা কুস্তিগিরদের অধিকারের পক্ষে নাও দাঁড়াও, দিদি ববিতা, জোড়হাতে অনুরোধ করি আমাদের আন্দোলনকে দুর্বল কোরো না। মহিলা কুস্তিগিরদের অনেক বছর লেগেছে তাঁদের অপব্যবহাকারীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে। তুমিও মেয়ে, আমাদের যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করো।

এবারে সরকারের কাছে দাবি ছিল, ব্রিজভূষণকে গ্রেপ্তার করতে হবে, ওভারসাইট কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে এবং রেসলিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার (ডব্লুউএফআই) একজিকিউটিভ কমিটি ভেঙে দিতে হবে। বজরং, সাক্ষী, বিনেশদের মতে, ব্রিজভূষণ একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগিরদের অভিযোগ গুরুতর হলেও বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি এবং দুটি ওয়েবসাইটে কুস্তিগিরদের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে ক্রমাগত তাঁদের এবং তাঁদের আন্দোলনের বদনাম করতে থাকে। সরকারও এ ব্যাপারে নানাভাবে সঙ্গত দিয়েছে। যেমন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ সিং ঠাকুর বললেন, প্রতিবাদীদের সঙ্গে এরই মধ্যে বারো ঘণ্টা কথা বলেছেন, এবং তিনি তাঁদের অভিযোগ শুনেছেন। কুস্তিগিররা জানালেন, তাঁদের সঙ্গে অনুরাগের দেখা হয়নি, বারবার দেখা করতে চাওয়া হলেও তিনি কোনও উত্তর দেননি।

মে মাসের ২০ তারিখ দুপুরে সাক্ষী মালিক-সহ অন্যেরা অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে আইপিএল-এর খেলা দেখতে গেলে পুলিশ তাঁদের মাঠে ঢুকতে দেয়নি। তাঁদের কাছে ৫টি টিকিট ছিল, দিল্লি পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে বলে তাঁদের নাকি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। তারপর তাঁদের এক অজানা জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, এবং চাইলেও আর টিকিট ফেরত দেওয়া হয়নি।

বিনেশ ফোগট বলেছিলেন, দিনের পর দিন অনুশীলন বন্ধ রেখে আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং কষ্ট সহ্য করে চলেছি। যে বিষয়ে এক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, এক মাসেও তা নেওয়া হয়নি। দেশে কৃষকদের আন্দোলন ১৩ মাস ধরে চলেছিল। আমাদের প্রতিবাদ যদি তেমনই আন্দোলনের রূপ নেয়, তা কিন্তু দেশের জন্য ভাল বিজ্ঞাপন হবে না।

প্রসঙ্গত, প্রতিবাদীরা শুধু ধর্নাতেই বসে থাকেননি। সমর্থন জোগাড়ের উদ্দেশ্যে ধর্না চলাকালীন রাজধানীর বাংলা সাহিব গুরুদ্বারা এবং রাজঘাটেও গিয়েছেন। ২৩ মে আন্দোলনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে মোমবাতি মিছিল করেছেন। বজরং পুনিয়া ও বিনেশ ফোগট মহিলা কৃষক সংগঠনের সমর্থন চাইতে হরিয়ানার জিন্দে গিয়েছেন, সাক্ষী মালিক ও তাঁর স্বামী গিয়েছেন পঞ্জাবে। কৃষক মহিলারা যেন বেশি সংখ্যায় ২৮ মে পার্লামেন্টের সামনে পরিকল্পিত ‘মহিলা সম্মান মহাপঞ্চায়েত’-এ যোগ দেন সেই আর্জি জানিয়েছেন।

২৮ তারিখে যন্তর মন্তর থেকে দু কিলোমিটার দূরে নতুন সংসদ ভবনের সামনে ‘মহিলা সম্মান মহাপঞ্চায়েত’ কর্মসূচি ছিল। বেলা বারোটা নাগাদ গণ্ডগোল শুরু হল। রাস্তায় ব্যারিকেড করে বিশাল পুলিশ বাহিনী মজুত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য প্রতিবাদীদের কর্মসূচি যেন সংসদ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কোনওরকম বিঘ্ন না ঘটায়। সাক্ষী, বিনেশ, সঙ্গীতারা ব্যারিকেড সরিয়ে এগোনোর চেষ্টা করতেই পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁদের কয়েকজনকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে অনেকগুলো মামলা দায়ের করে। ওদিকে যন্তর মন্তর ধর্নাস্থল থেকে প্রতিবাদীদের ব্যবহার্য সবকিছু সাফ করে তুলে নিয়ে যায়। কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি অলিম্পিকে পদক পাওয়া, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিবাদীদের সঙ্গে এই ধরনের ব্যবহার করা যায়। অবাক দেশবাসীর মধ্যে ছি ছি পড়ে গেল।

সেদিন দিল্লিতে ঢোকার সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। হরিয়ানা, পঞ্জাব থেকে আসা কৃষকদের গাজিপুর-দিল্লির সীমানাতেই আটকে দেওয়া হয়, বহু কৃষককে আটক করা হয়। তার আগে সকালে বহু নেতা-কর্মীকে নিজেদের বাড়িতেই পুলিশ আটকে দিয়েছিল।

চরম হেনস্থার পরের দিন বজরং বলেছিলেন, কুস্তিগিরদের সঙ্গে যদি এইরকম ব্যবহার করা হয় তাহলে পদক দিয়ে আমরা কী করব? বরং পদক ও পুরস্কার সরকারকে ফিরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করব। বিনেশ বলেছেন, আমরা খুবই অপমানিত হয়েছি। সম্মানের জন্য লড়াই করছি আর আমাদের পায়ের তলায়  মারানো হচ্ছে… পদক ফিরিয়ে দেব, জীবনও দিতে পারি, তবে বিচার চাই।

৩০ তারিখে ফোগট বোনদের বাবা মহাবীর ফোগট বলেন, বিচার না পেলে মেডেল ফিরিয়ে দেব। মহিলা কুস্তিগিরদের সঙ্গে আজ যা ঘটছে তার ফলে মেয়েরা কুস্তি ছেড়ে দেবে… মানুষ ব্রিটিশদের যেমন তাড়িয়েছিল বর্তমান সরকারকেও তাড়াবে। কৃষক নেতারা আমাদের মেয়েদের (ব্যথা) অনুভব করতে পেরেছেন। এবার গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ হবে, সেই আন্দোলনের চাপে সফলতা আসবে। গ্রামপঞ্চায়েত থেকে খাপ, সামাজিক এবং কৃষক সংগঠনের যোগদানে দেশের মানুষ এক বিপুল আন্দোলনের সাক্ষী হবে। এমন আন্দোলন শুরু হবে যে সরকারকে মাথা নামাতে হবে, ব্রিজভূষণ জেলে যাবে।

এই অবস্থায় সামনেই, আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই এশিয়ান গেমস। আপাতত সেদিকে তাঁরা তাকাচ্ছেন না। অলিম্পিক্সে পদকজয়ী বজরং জানিয়েছিলেন, এই মুহূর্তে এশিয়ান গেমস-এর (চিনে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তা শুরু হওয়ার কথা, যার ট্রায়াল জুলাইয়ের প্রথমেই শুরু হবে) থেকে ন্যায়বিচার তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওদিকে কয়েকদিন আগে ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর অনুরোধে সাক্ষী মালিক এশিয়ান গেমসের জন্য প্রস্তুতি শুরুর করার কথায় রাজি হয়েও ১০ জুন জানিয়েছেন, যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত তাঁরা এশিয়ান গেমসে অংশ নেবেন না। তিনি জানান, শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। সব সমস্যার সমাধান হলে তবেই এশিয়ান গেমসে অংশ নেবেন। তাই যে খেলায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের কিছুটা দাপট রয়েছে, এই ঘটনার জেরে তাতে আমরা পিছিয়ে পড়তে চলেছি।

 

কারা এই কুস্তিগির

হরিয়ানা সহ কয়েকটি রাজ্যে খেলা হিসাবে কুস্তির ব্যাপক প্রসার হয়েছে। হরিয়ানার প্রাক্তন কুস্তিগির, প্রবাদপ্রতিম কোচ এবং সিনিয়র অলিম্পিক প্রশিক্ষক মহাবীর সিং ফোগট কীভাবে তাঁর দুই মেয়ে গীতা ও ববিতাকে বড় কুস্তিগির করে তুলেছিলেন সেই বিষয়কে ভিত্তি করে ২০১৬ সালে তৈরি হয়েছিল আমির খানের ছবি ‘দঙ্গল’। ছবিতে মহাবীরের ভূমিকায় ছিলেন আমির খান স্বয়ং। গীতা ও ববিতার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অন্য দুই কিশোরী কুস্তিগির। ওই বছরই মহাবীরের জীবন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সাংবাদিক সৌরভ দুগগালের ‘আখড়া’ বইটি। সেই বইয়ে হরিয়ানার গ্রাম থেকে মহাবীর তাঁর মেয়ে এবং ভাইঝিদের কীকরে আন্তর্জাতিক কুস্তিগির তুললেন তার বিশ্বস্ত বিবরণ রয়েছে। সে বছরই সরকার তাঁকে দ্রোণাচার্য পুরস্কারে ভূষিত করেছিল।    

বাস্তবে হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার বালালি গ্রামে নিজের চার মেয়ে গীতা, ববিতা, রীতু, সঙ্গীতা ছাড়া অকালমৃত ভাইয়ের দুই মেয়ে বিনেশ ও প্রিয়াঙ্কারও প্রশিক্ষক ছিলেন মহাবীর সিং ফোগট। ববিতা ২০১২ সালে ওয়ার্ল্ড রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জপদক জয় করেন, ২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমস-এ সোনা জয় করেন। গীতা ২০১৯ সালে এশিয়ান গেমস-এ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনা জিতে নেন। তিনিই অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হওয়া প্রথম ভারতীয় মেয়ে। রীতু জাতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। সঙ্গীতা আন্তর্জাতিক কুস্তিতে বয়সভিত্তিক স্তরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনা পেয়েছেন। ভাইঝি বিনেশ ফোগট ২০১৮ সালে কমনওয়েলথ গেমস এবং এশিয়ান গেমস থেকে সোনা এনেছেন। প্রিয়াঙ্কা এশিয়ান গেমস থেকে এনেছেন রুপো।

যে রাজ্যে লিঙ্গবৈষম্য, ভ্রূণহত্যা, বাল্যবিবাহ খুব বেশি সেই হরিয়ানায় ফোগট বোনেদের সাফল্য সংবাদমাধ্যমে সাড়া ফেলেছিল। মহাবীর বলেছেন, সবাই বলত মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমি গ্রামের বদনাম করছি। ভাবতাম, একজন মহিলা যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন তাহলে মেয়েরা কেন কুস্তিগির হতে পারবে না? গ্রামে প্রশিক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না। মেয়ে কুস্তিগির ছিল না বলে ওদের দীর্ঘদিন ছেলেদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।

ফোগটরা ছাড়া রোহতক জেলার মোখরা গ্রামের সাক্ষী মালিক ২০১৬ সালে অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ এবং নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জয় করেছেন। ২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমস-এ থেকে রৌপ্য পদক এবং এশিয়ান রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক এনেছিলেন। এঁদের সাফল্য হরিয়ানায় মেয়েদের কুস্তি লড়া নিয়ে মানসিকতায় বিরাট পরিবর্তন এনেছে, মেয়েদের কুস্তির ব্যাপক প্রসার হয়েছে। শুধু কুস্তিই নয় সে রাজ্যে মেয়েদের অন্য খেলাধূলারও প্রসার হয়েছে।

বজরং পুনিয়াও হরিয়ানার কুস্তিগির। যোগেশ্বর দত্ত তাঁর কোচ। বজরং অলিম্পিক গেমস, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আরও নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি পদক জিতেছেন— ৮ বার সোনা, ৮ বার রুপো, ৬ বার ব্রোঞ্জ। বিয়ে করেছেন সঙ্গীতা ফোগটকে, মহাবীর সিং ফোগট তাঁর শ্বশুর।

কুস্তিগিরদের আন্দোলনে কয়েকটি নাম সামনে এলেও আরও দুই বড় কুস্তিগিরের নাম আলোচনায় আসেনি। তাঁরা হলেন সত্যবর্ত কাদিয়ান এবং সোমবীর রাঠী। বিনেশের স্বামী সোমবীর কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে সোনাজয়ী। এছাড়া নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও সাতবার পদক এনেছেন। সত্যবর্ত কাদিয়ানও কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা এনেছেন। এছাড়া ওয়ার্ল্ড জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ সহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তিনিও সাতবার পদক এনেছেন।

ববিতা ফোগট ও তাঁর বাবা মহাবীর সিং ফোগট দুজনে ২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। ববিতা হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির দাদরি কেন্দ্রের প্রার্থী হয়ে দাঁড়ালেও হেরে যান। বজরং পুনিয়াও বজরং দলের সমর্থক।

 

খেলার জগতে প্রতিবাদ

কুস্তিগিরদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বেশ কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড়।

১৯৮৩ সালে কপিলদেবের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা (বিসিসিআই-এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজার বিনি বাদে) ২ জুন দল বেঁধে প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে,

আমাদের চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগিরদের উপর যেভাবে নির্যাতন চলছে সেই ছবি (২৮ মে) দেখে আমরা যেমন মর্মাহত তেমনি মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছি। একথাও জানি যে, বহু পরিশ্রমে অর্জিত পদকগুলো কুস্তিগিররা গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।… ওই পদকগুলোর সঙ্গে বহু বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ, কঠোর সাধনা, একাগ্রতা ও দৃঢ়তা জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওই পদকগুলো শুধু কুস্তিগিরদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতির গর্ব ও আনন্দ।… অনুরোধ করি, এই বিষয়ে কোনও চটজলদি সিদ্ধান্ত নেবেন না।…

মদনলাল প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের উদ্দেশে বলেছেন,

…কুস্তির মতো ইভেন্ট থেকে পদক জয় কখনওই সহজ নয়… রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পাওয়া মেডেল গঙ্গায় ভাসাবেন না, লড়াই জারি রাখুন।… আমরা ওই মেডেলের মূল্য বুঝি। তা এক-দু বছরের অর্জন নয়, কুড়ি বছরের কঠোর পরিশ্রম, তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। দেশের কজন অলিম্পিক্স, এশিয়ান গেমস, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে মেডেল এনেছেন?

কীর্তি আজাদ বলেছেন,

…মিস্টার মোদি পদক সহ পদকজয়ীদের সঙ্গে ছবি তুলতে কখনও দ্বিধা করেন না। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মিস্টার খট্টর সাক্ষীকে হরিয়ানার ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পঢ়াও’ স্লোগানের ব্রান্ড অ্যাম্বাস্যাডর করেছেন। এখন তাঁরা চুপ… একটা অভিযোগ অতি মারাত্মক, তা হল পকসো। এই আইন পাশ হয়েছিল দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের পর। ওই আইন অনুযায়ী দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হয়। সেখানেই প্রশ্ন, এখনও কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি?… আমাদের মহিলা কুস্তিগিররা কঠোর পরিশ্রম করে পদক জিতে দেশকে গর্বিত করেছেন। তাঁদের প্রতি এই নির্মম অত্যাচার কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।… দেশের কুস্তিগিরদের ন্যায্য বিচার পাওয়ার আশায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, পুলিশের কাছে এফআইআর দায়ের করতে হচ্ছে দেখে আমি বিস্মিত।

আগেই এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা, টোকিও অলিম্পিক্সে জ্যাভেলিনে সোনাজয়ী নীরজ চোপড়া, অলিম্পিক্সে বক্সিং-এ পদকজয়ী বিজেন্দ্র সিংহ, ক্রিকেটে প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক অনিল কুম্বলে, প্রাক্তন ক্রিকেটার বীরেন্দ্র সহবাগ, হরভজন সিংহ, ইরফান পাঠান এবং রবিন উথাপ্পা। প্রতিবাদ জানিয়েছেন জাতীয় ফুটবলার ও প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া ও সুনীল ছেত্রী। টোকিও অলিম্পিক্সে সোনাজয়ী জাপানের মহিলা কুস্তিগির রিসাকো কাওয়াইও এই প্রতিবাদের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বিশেষ করে ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যদের সমর্থনে সরকারের উপর চাপ বেড়েছে। কারণ আমাদের দেশে খেলা হিসাবে কুস্তির তুলনায় ক্রিকেট অনেক জনপ্রিয়। তাই তাঁদের সমর্থনের প্রভাবও বেশি। তবে ক্রিকেটার ও ক্রিকেট প্রশাসক সৌরভ গাঙ্গুলি আন্দোলনকারী কুস্তিগিরদের বিষয়ে দূরত্ব বজায় রেখে সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁদের লড়াই তাঁদেরই লড়তে দিন। এমনকি, একসময় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এই মতামত জানিয়ে কৃষক আন্দোলনের সমালোচনা করে টুইট করা সচিন তেন্ডুলকরও বর্তমান ঘটনায় স্বাভাবিক কারণেই নীরবতা পালন করেছেন।

ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (আইওএ) প্রেসিডেন্ট এবং রাজ্যসভার সদস্য স্বনামধন্য পিটি ঊষার হয়েছে কূল রাখি না মান রাখি অবস্থা। কুস্তিগিররা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন বলে তিনি প্রথমে সাংবাদিকদের বলেন, ফেডারেশনের প্রধান ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে ফের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার আগে কুস্তিগিররা আইওএ-র কাছে যেতে পারত। তা না করে রাস্তায় নামাটা কুস্তিগিরদের শৃঙ্খলার অভাব, এতে দেশের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হচ্ছে।

কয়েকদিন পরে তিনি আবার কুস্তিগিরদের বলেন, সাংবাদিকরা তাঁর কথার ভুল ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি তেমন কিছু বলেননি। ঊষা ভালই জানেন, চরম অন্যায়ের জন্য দেশের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হয়, প্রতিবাদে হয় না। মহিলা কুস্তিগিরদের যৌন হয়রানির অভিযোগে একজন বাঘা সাংসদ বিনা শাস্তিতে ঘুরে বেড়ালে এবং হয়রানির শিকারদের বিচারের জন্য এইরকম লড়তে হলেই, দেশের ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লাগে। তাঁদের কথা শোনা, তদন্ত করা, সেইমতো পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে তাঁদের অবজ্ঞা করা হলেও তাই হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের আগে যার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে পুলিশের আপত্তি ছিল ফেডারেশনের সেই সর্বেসর্বা বিনাবিচারে বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ালে দেশের বদনাম হয়।

 

মহিলা কুস্তিগিরদের অভিযোগ

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে সাতজন কুস্তিগির পনেরোটি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়েছেন। প্রায় দশ বছর ধরে তাঁদের নির্যাতন ও হয়রানি করা হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এ বছরের জানুয়ারি মাসে।

এপ্রিলের ২১ তারিখে লিখিত অভিযোগ করলেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এপ্রিলের ২৮ তারিখে পুলিশ বাধ্য হয়ে দুটি এফআইআর দায়ের করে। প্রথমটিতে ছিল ছয় যুবতী কুস্তিগিরের অভিযোগ। অভিযোগে ব্রিজভূষণ ছাড়া ডব্লুউএফআই-এর সেক্রেটারি বিনোদ তোমারের কথাও ছিল। দ্বিতীয়টি করা হয়েছিল এক নাবালিকা কুস্তিগিরের বাবার অভিযোগের বয়ানে। ব্রিজভূষণ নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের চেষ্টা করার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে পকসো (পিওসিএসও) আইনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে (ওই আইনে কারাদণ্ডের মেয়াদ পাঁচ থেকে সাত বছর)। যেসব ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা ঘটেছে ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। ২ জুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, নাবালিকার হয়ে তার বাবা যে অভিযোগ করেছিলেন সেখানে বলা হয়েছে মেয়েটি “পুরোপুরি উপদ্রুত, আর কখনও শান্তি পাবে না, অভিযুক্তের (ব্রিজভূষণের) যৌন হয়রানি তাঁকে তাড়া করে চলেছে।” ব্রিজভূষণ তাঁকে শক্ত করে ধরে… নিজের দিকে টেনে আনেন, কাঁধে চাপ দেন। তারপর বুকে হাত বোলান।

দ্বিতীয় এফআইআর-এ প্রথম অভিযোগকারী বলেছেন, একদিন রাতে হোটেলের রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে ব্রিজভূষণ তাঁর টেবিলে ডেকে নেন। তারপর তাঁকে স্তব্ধ করে দিয়ে, অনুমতি ছাড়াই বুকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে হাতড়াতে থাকেন, হাত নিয়ে যান নিচে পেটে, সেখানেই না থেমে হাত আবার উপরে এনে বুক হাতড়ে ফের নামিয়ে পেটে নিয়ে আসেন, আবার উপরে তোলেন। এইভাবে তিন-চারবার বুক থেকে পেটে হাত বোলাতে থাকেন।

আরেকবার ফেডারেশনের অফিসে প্রথম অভিযোগকারীর হাতের তালু, হাঁটু, থাই এবং কাঁধ ছুঁতে থাকেন। ভয়ে বিস্ময়ে অভিযোগকারীর শরীর কাঁপতে শুরু করে। বসে থাকাকালীন ব্রিজভূষণ নিজের পা দিয়ে তাঁর পা, হাঁটু ছুঁয়ে থাকেন। শেষে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করার অজুহাতে বুকে হাত রাখেন, হাত নামিয়ে পেটে আনেন। পরিষ্কার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর শালীনতা ক্ষুণ্ণ করে শরীর নিয়ে খেলা।

দ্বিতীয় অভিযোগকারী বলেন, তিনি যখন ম্যাটে শুয়েছিলেন ব্রিজভূষণ তাঁর কাছে আসেন। কোচের অনুপস্থিতিতে তাঁকে চমকে দিয়ে, অনুমতি না নিয়ে তাঁর টি-শার্ট গুটিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করার অজুহাতে বুকে হাত রেখে পরে হাত নামিয়ে আনেন পেটে, এইভাবে বারবার বুকে পেটে হাত বোলাতে থাকেন।

ওই অভিযোগকারী একবার ফেডারেশনের অফিসে গেলে… তাঁকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠান… সঙ্গে থাকা তাঁর ভাইকে বাইরে থাকতে বলেন… ঘরে উপস্থিত অন্য একজন চলে গেলে দরজা বন্ধ করে দেন… তাঁকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে জোর করে শারীরিক সম্পর্কের চেষ্টা করেন।

তৃতীয় অভিযোগকারী বলেছেন, ব্রিজভূষণ তাঁর বাবা-মার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেন, সে সময় তাঁর নিজের মোবাইল ফোন ছিল না… যে বিছানায় বসেছিলেন আমাকে সেখানে ডাকেন… হঠাৎ আমার অনুমতি ছাড়াই জোর করে জড়িয়ে ধরেন। পরে একদিন তাঁর যৌন ইচ্ছা পূরণ করার জন্য আমার যৌন অনুগ্রহের বিনিময়ে খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় দামি নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট বিনা পয়সায় ঘুষ হিসাবে পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

এইরকম আরও বেশ কিছু অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে কুস্তিগিরদের এফআইআর-এর কথা বিস্তারিতভাবে প্রকাশের ফলে সরকারের উপর প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন ওঠে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা মহিলা কুস্তিগিরদের এইরকম যৌন হেনস্থার অভিযোগের পরও ব্রিজভূষণকে গ্রেপ্তারের দাবিতে এতদিন ধরে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হল কেন? শিবসেনা এমপি প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেছেন, ইউনিয়ন স্পোর্টস মিনিস্ট্রি এবং ন্যাশনাল কমিশন অন উইমেন (এনসিডব্লুউ) ব্রিজভূষণের ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করেনি। তিনি টুইট করে জানিয়েছেন, এনসিডব্লুউ এর আগে অনেক ক্ষেত্রেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পদক্ষেপ করেছে, এক্ষেত্রে তারা মহিলা কুস্তিগিরদের অভিযোগের অপেক্ষায় বসে রয়েছে, আশ্চর্য এই দ্বিচারিতা। শেষ পর্যন্ত এনসিডব্লুউ-র প্রধান ধর্নাস্থলে মহিলা কুস্তিগিরদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে পুলিশ তাঁকেও হেনস্থা করে, তাঁকে ফিরে যেতে বলে জোর করে তাঁর গাড়িতে তুলে দেয়।

 

ব্রিজভূষণের একনায়কতন্ত্র

ব্রিজভূষণের যৌবনের অনেকটা সময় কেটেছে অযোধ্যার আখরায় কুস্তি লড়ে। দশ বছরের বেশি ফেডারেশনের (ডব্লুউএফআই) প্রেসিডেন্ট। ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং-এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট। দু বছর আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কুস্তিগির ছেলেমেয়ের শারীরিক শক্তি বেশি, তাই তাঁদের নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী কাউকে দরকার। এখানে আমার চেয়ে শক্তিশালী কেউ কি আছে? দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেশনের কুস্তি সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ে তিনিই শেষ কথা।

সিনিয়র বা জুনিয়রদের প্রতিটি জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেখাশোনা করার জন্য উপস্থিত থাকেন। ছোটবড় কুস্তি টুর্নামেন্টে তাঁর চোখ থাকে। জাতীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মাইক হাতে চিৎকার করে রেফারিদের নির্দেশ দেন, লড়াই থামান, খেলা বন্ধ করে দেন, কখনও জাজের দিকে রুল বুক ছুঁড়ে দেন, বিচারকদের শাস্তি দেন।

কোনও প্রতিযোগিতায় যদি তিনি যেতে না পারেন, প্রতিযোগিতাস্থলের চারদিকে ক্যামেরা বসিয়ে ঘর থেকে তা দেখার ব্যাবস্থা করেন, অনুষ্ঠান ভার্চুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনই তাঁর বজ্রমুষ্টি। ২০২০ সালের মার্চে হিমাচলে অনুষ্ঠিত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে যেতে পারেননি। তাই সেখানে ক্যামেরা বসানো হয়েছিল, যেন তাঁর দিল্লির বাড়ি থেকে সবকিছু দেখতে পান। ২০২১ সালে রাঁচিতে জুনিয়র লেভেলের প্রতিযোগিতার সময় স্টেজে গিয়ে এক কুস্তিগিরকে মারতে শুরু করেন। ওই বছরই নয়ডায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের সময়ে সাইডলাইনের ধারে রেলের কোচ সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁকে সাসপেন্ড করেন। আরেকবার লড়াইয়ের সময়ে দিল্লির সমর্থকরা এরেনার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল বলে দিল্লির কুস্তিগিরকে শাস্তি দেওয়ার দাবি করলে তা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। রেফারি সেইরকম কোনও নিয়ম নেই বললেও তা নিয়ে চাপাচাপি করেন।

কুস্তিগিররা তাঁর সর্বময় ক্ষমতার কথা জানেন। তাই জাতীয় কুস্তি প্রতিযোগিতার সময় অনেক কুস্তিগিরই তাঁর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেন। কোনও ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরাজয় মেনে নিতে না পারলে জাজের কাছে না গিয়ে সরাসরি তাঁর কাছে যান। কমনওয়েলথ মেডেল জয়ী নরসিংহ যাদব ২০২১ সালের জাতীয় প্রতিযোগিতায় তাই করেছিলেন।

ওদিকে ২০২০ সালে টোকিওর পরের বছর পরবর্তী প্যারিস অলিম্পিক্সের পরিকল্পনায় তাঁর কথার আরও গুরুত্ব দাবি করে বলেন, কুস্তিগিরদের সামর্থ্য বাড়াতে যে সংগঠন সাহায্য করবে ফেডারেশন তাদের ব্যাপারে নজর রাখবে। বলেন, কুস্তিগিররা যদি জিন্ডাল সাউথ ওয়েস্ট স্পোর্টস (জেএসডব্লিউ) অথবা সরকারি অলিম্পিক্স গোল্ড কোয়েস্ট (ওজিকিউ)-এর সাহায্য নেয় তাহলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না।

ওজিকিউ নানা ধরনের খেলায় ১১ থেকে ১৯ বছরের একশোজনের বেশি জুনিয়র খেলোয়াড়কে সহায়তা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে কুস্তিতে ৩২ জন, যার মধ্যে হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রের ১৩ থেকে ১৯ বছরের ২৩ জন রয়েছেন। তারা ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় পিভি সিন্ধুকে ১৪ বছর বয়স থেকে, লক্ষ্য সেনকে ১০ বছর থেকে সহায়তা দিচ্ছে।

অনেকে বলেন, ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত টোকিও অলিম্পিক্সের আগের পাঁচ বছর দেশের ক্রীড়ার সমস্ত অংশীদার বা স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ টিমওয়ার্ক ছিল। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা সাই (এসএআই), ন্যাশনাল স্পোর্টস ফেডারেশন এবং ওজিকিউ পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে ক্রীড়াবিদদের প্রয়োজনীয় সমর্থন দিয়েছে। যেমন, ভারোত্তোলনে রৌপ্য পদক জয়ী মীরাবাই চানুর ক্ষেত্রে সাই, ওয়েটলিফটিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া এবং ওজিকিউ পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে তাঁকে প্রশিক্ষণের জন্য দু’দফায় আমেরিকার সেন্ট লুইসে পাঠিয়েছিল। তবে বিনেশ ফোগট টোকিও অলিম্পিক্সের প্রশিক্ষণের জন্য দশ মাস ধরে কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফ ইত্যাদির বিস্তারিত তথ্য সহ কয়েকবার ফেডারেশন ও টপসকে ইমেল পাঠিয়েছিলেন। কাজ হয়নি।

কুস্তিগিরদের তৈরি করার সরকারি কর্মসূচি টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম বা টপস (টিওপিএস) নিয়েও তাঁর তীব্র আপত্তি। টপস-এর বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার যেন কুস্তিগিরদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করে। ব্রিজভূষণ এতটাই মাতব্বর। তিনি বলেন, টিওপিএস, জেএসডব্লিউ এবং ওজিকিউ কুস্তিতে তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করছে। এরপর ২০২১-এর ডিসেম্বরে তাঁকে অলিম্পিকের প্রস্তুতি, নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার জন্য তৈরি সরকারি সেল ‘মিশন অলিম্পিক’-এর সদস্য করা হয়।

ক্রীড়াবিদরা প্রশিক্ষণ নিতে কোথায় যাবেন তা ঠিক করে টপস। বিনেশ কেন ফেডারেশনকে না জানিয়ে টপসকে প্রস্তাব পাঠাল তাতেও ব্রিজভূষণের আপত্তি। বলেন, কেউ এরকম করলে খেলতেই দেব না, টোকিও অলিম্পিক্সে রৌপ্য পদক জয়ী রবি দাহিয়াকেও না। “আমি রবিকে প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা দিই। কত জায়গা থেকে টাকা নেবে? আমরা সবকিছু দিতে রাজি। তারপরও যদি এই সমস্ত যোগাযোগ করে তাহলে টপসকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে চুক্তির কপি দিয়ে অন্যান্য বিষয়ও জানাতে হবে।”

ব্রিজভূষণের ফেডারেশন চালানোর মনোভাব সম্বন্ধে দ্রোণাচার্য পুরস্কার পাওয়া কুস্তিগির মহাবীর সিং ফোগট সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, তিনি কুস্তিগিরদের ডায়েট নিয়ে নাক তো গলানই, তাঁদের প্রাপ্য স্পন্সরশিপের টাকার অর্ধেক নিজের পকেটে রাখেন।

ফেডারেশনে ব্রিজভূষণের সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্য চলেছে। তিনি সিলেকশন কমিটির প্রধান, খেলোয়াড়দের গ্রিভান্স কমিটিরও প্রধান। ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও কুস্তিগির যদি অখুশি হন, তিনি গ্রিভান্স রিড্রেসাল কমিটিতে যেতে পারেন। তবে সেখানেও তার মাথায় রয়েছেন ব্রিজভূষণ। এইভাবেই তিনি ভারতীয় কুস্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

অলিম্পিক্সে পদকজয়ীদের জাতীয় শিবির এড়িয়ে যাওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু ফেডারেশনের লিখিত গাইডলাইন অনুযায়ী প্রতিটি বড় ব্যাপারে প্রেসিডেন্টই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সিলেকশন কমিটির প্রধান হিসাবে শিবির থেকে কে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে তা ঠিক করার চূড়ান্ত ক্ষমতা তাঁর হাতে। অলিম্পিক্সের ক্ষেত্রে গাইডলাইন অনুযায়ী সিলেকশন কমিটিই বিবেচনা করবে কে ট্রায়ালে যাবে কে নয়। তবে যেসব কুস্তিগিররা সংরক্ষনের সুযোগে উন্নতি করেছেন তাঁদের সবাইকে ট্রায়ালে যেতে হবে। এশিয়ান গেমসের ক্ষেত্রে ট্রায়ালে যাওয়া বাধ্যতামূলক হলেও লিখিত নিয়ম অনুযায়ী অলিম্পিক্সে বা ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ীদের প্রধান কোচ বা বিদেশি বিশেষজ্ঞের সুপারিশ অনুযায়ী বিশিষ্ট খেলোয়াড়রা সিলেকশন ট্রায়ালে যাবেন কি না তা ঠিক করার কথা। গত বছর বার্মিংহামে কমনওয়েলথ গেমসে অনেক পদক জয় করে ফেরার পরের মাসের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রায়াল থেকে পুরুষ কুস্তিগিরদের জন্য ব্রিজভূষণের ছাড় ছিল। তবে সেই সুযোগ বিনেশ, সাক্ষীদের মতো মহিলা কুস্তিগিররা পাননি। তাঁদের ফের সেই কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ফেডারেশনের গোলমেলে লিখিত গাইডলাইনের সুযোগে এইরকম স্বেচ্ছাচারিতা নিয়মিত দেখা যায়।

কুস্তিগিররা জেলা স্তর, রাজ্য স্তর পেরিয়ে জাতীয় স্তরে আসেন। সেই স্তরের প্রথম চারজন জাতীয় প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার সুযোগ পান। সিলেকশন ট্রায়ালের পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। এর মধ্যে একমাত্র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেই ফেডারেশনের গুরুত্ব রয়েছে। তার আগে কুস্তির আখড়াগুলো বা স্থানীয় অ্যাকাডেমিই সব কিছুর দেখাশোনা করে। জাতীয় স্তর থেকে প্রশিক্ষণ শিবির পর্যন্ত সরকার সব দায়িত্ব নেয়। ফেডারেশনের মাধ্যমে সেই কাজ হলেও কুস্তিগিরদের উন্নতিতে আদৌ ফেডারেশনের ভূমিকা নেই। আমাদের কুস্তিগিররা যে অলিম্পিক্স, ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে কিছু পদক জয় করেছেন তার জন্য আখড়ার ভূমিকা অসীম। সাক্ষী মালিক রোহতকের শক্তিশালী কুস্তি সংস্কৃতির ফসল। সুশীলকুমার (২০০৮ সালে ব্রোঞ্জ এবং ২০১২ সালে রৌপ্যপদক জয়ী), যোগেশ্বর দত্ত (২০১২ সালে ব্রোঞ্জ), রবি দাহিয়া (২০২০ সালে রৌপ্যপদক) এবং বজরং পুনিয়া দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামে কুস্তি শিখেছেন। তাঁদের ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় জাতীয় ক্যাম্পের বাইরেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, এবং পঞ্জাব ও কর্নাটকের আখড়ায় কুস্তিগিররা যে প্রশিক্ষণ পান ফেডারেশন তারই ফল পায়।

আগের তুলনায় খেলা হিসাবে দেশে কুস্তির অনেক প্রসার হয়েছে। এখন নিয়মিত জাতীয় প্রতিযোগিতা হয়, সারা বছর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চলে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণও ধারাবাহিক। তবে ফেডারেশনের জন্যই ভারতে কুস্তির উন্নতি হয়েছে মোটেই তা বলা যায় না।

ব্রিজভূষণ টানা তিন দফা ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। মার্চ মাসেই তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। ক্ষমতা তাঁর হাত থেকে চলে যাবে তা তিনি জানেন। বিশ্ব কুস্তি সংস্থা বারবার নির্দেশ দেওয়ার পরেও ফেডারেশন নির্বাচন করাচ্ছেন না। সেই কারণে বিশ্ব কুস্তি সংস্থা ফেডারেশনকে বরখাস্ত করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অবশেষে কয়েকদিন আগে নির্বাচনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ওদিকে ‘ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড রেসলিং’-কে প্রতিবাদীরা ডব্লুউএফআই-এর সভাপতির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর ভারত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ হোস্ট করার অধিকার হারিয়েছে। এরাই কুস্তির ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপস এবং অলিম্পিক্সের দেখাশোনা করে।

ফেডারেশন থেকে ব্রিজভূষণের বিদায় আসন্ন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কেউই তার শীর্ষপদের যোগ্য নন। তাই আশা করা যায় ফেডারেশনের প্রশাসন আগামী দিনে সুষ্ঠু হবে, পেশাদারিত্বও আসবে।

 

কে এই ব্রিজভূষণ

আশির দশকে তিনি ছিলেন অযোধ্যার সাকেত কলেজ (কেএস সাকেত পিজি কলেজ) ইউনিয়নের নেতা। আশির দশকেই তিনি রামজন্মভূমি আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ওই আন্দোলনে তাঁর জঙ্গি হিন্দুত্বের ভাবমূর্তি সবার নজর কেড়েছিল। বাবরি মন্দির ধ্বংসে তিনি একজন মুখ্য অভিযুক্ত ছিলেন।

ছ দফায় সাংসদ হয়েছেন, পাঁচবার বিজেপির, মাঝে ২০০৯ সালে একবার কাইসেরগঞ্জে সমাজবাদী পার্টির। ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ এবং ২০১৪ থেকে এখনও পর্যন্ত বিজেপিতে রয়েছেন। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দিয়ে সে বছরই ফের বিজেপির সাংসদ হয়েছেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪-র নির্বাচনের আগে পর্যন্ত ছিলেন সমাজবাদী পার্টিতে। আগে বিজেপির সাংসদ হিসাবে গোন্ডা ও বলরামপুরের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০১৯ সালে কাইসেরগঞ্জ থেকে ফের বিজেপির সাংসদ নির্বাচিত হন। টেররিস্ট অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টে (টাডা) তিনি যখন জেলে ছিলেন, সেই ১৯৯৬ সালে তাঁর স্ত্রী কেতকিদেবী সিংহ লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কেতকিদেবী জেলা পঞ্চায়েতের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে একজন বাবার স্বার্থপরতাকে দায়ী করে আত্মহত্যা করেছে, অন্যজন প্রতীক ভূষণ গোন্ডা সদরে বিজেপির দুবারের বিধায়ক।

 

ব্রিজভূষণের কালো অতীত

নব্বইয়ের দশকেই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের দলের লোককে সাহায্য করার অভিযোগে টাডা-য় কয়েকমাস জেলে ছিলেন। তাই ১৯৯৬ সালে লোকসভার প্রার্থী হতে পারেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে চুরি, দাঙ্গা, খুন, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক ভয় দেখানো, কিডন্যাপ, ইউপি গুন্ডাস অ্যাক্ট, গ্যাংস্টারস অ্যান্ড অ্যান্টিসোশাল অ্যাক্টিভিটিস (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট ইত্যাদি অন্তত ৩৮টি মামলা ছিল। বেশিরভাগ মামলা থেকেই ছাড়া পেয়েছেন। ছাড়া পাওয়ার মূল কারণ সাক্ষীদের বিরূপ হওয়া এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড়ের চেষ্টায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা।  তবে এখনও পুরনো এবং নতুন কয়েকটি মামলা চলছে।

২০১৯ সালের নির্বাচন হলফনামা অনুযায়ী ২০১৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তার মধ্যে দুটি ছিল ভোটের সময় অর্থ বিলির অভিযোগ। অভিযোগ ছিল তিনি অযোধ্যার আশারফি ভবন ক্রসিং-এ ছাত্র ও জনতার মধ্যে টাকা বিলোচ্ছিলেন। তাঁর সমর্থকরা স্লোগান তুলছিল, অস্ত্র নিয়ে আস্ফালন করছিল, রাস্তায় মদের বোতল ছুঁড়ছিল।

১৯৯১ এবং ১৯৯৯ সালে গোন্ডা লোকসভা আসনের সাংসদ ছিলেন। পরেরবার, ২০০৪ সালে বিজেপি তাঁকে গোন্ডা লোকসভা আসনে প্রার্থী করেনি, করেছিল বলরামপুর থেকে। গোন্ডায় প্রার্থী হয়েছিলেন ঘনশ্যাম শুক্লা। নির্বাচনের দিন পথদুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। ব্রিজভূষণের কথায়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ি সন্দেহ করতেন শুক্লাকে তিনি খুন করিয়েছেন। ‘স্ক্রল’-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্রিজভূষণ বলেন, আমার বিরোধীরা গুজব ছড়িয়েছিল যে তা দুর্ঘটনা ছিল না, ছিল হত্যা। বাজপেয়ী তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুম মারওয়া দিয়া?’

সেই মামলার আজও মীমাংসা হয়নি। তবে ঘনশ্যামের স্ত্রী নন্দিতা শুক্লা মনে করেন সেই মৃত্যু খুন ছিল এবং তা ষড়যন্ত্র। নন্দিতা এখন সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক। তিনি ‘দ্য প্রিন্ট’কে জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে কোর্ট থেকে নোটিস পেয়েছিলাম, তবে নিট ফল শূন্য।

সেই থেকে তাঁর সঙ্গে বিজেপির বিরোধ শুরু হয়। বিজেপি প্রার্থীকে খুনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সন্দেহ করলেও তিনি সেই দলেই ছিলেন, দল কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। ২০০৮ সালে কেন্দ্রের ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে নো কনফিডেন্স মোশন আনা হলে ব্রিজভূষণ নিজের দলের বিরুদ্ধে ক্রস ভোট দিয়েছেন বলে সংবাদপত্রে বড় খবর হয়। বিজেপি তাঁকে বহিষ্কার করে। ওদিকে সমাজবাদী পার্টি তাঁর জন্য দরজা খুলে দেয়।

গত বছর উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটের আগে ‘দ্য লাল্লনটপ’ নিউজ পোর্টালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিজভূষণ বলেন, “মেরে জীবন মে মেরে হাত সে এক হত্যা হুয়ি হ্যায়। লোগ কুছ ভি কহেঁ, ম্যায়নে এক হত্যা কী হ্যায়।” তবে আজ পর্যন্ত খুনি হিসাবে তাঁর বিচার হয়নি।

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে পঞ্চায়েতের মিটিং-এর সময় রণজিৎ এবং আরও কেউ কেউ গুলি চালিয়েছিল। তাঁর এক ব্যাবসার পার্টনার রবিন্দার সিংহ সে সময় পঞ্চায়েতে  ছিলেন। তিনি যখন একজনের সঙ্গে কথা বলছেন রণজিতের গুলিতে রবিন্দার ঘটনাস্থলেই মারা যান। এরপর তিনি রণজিৎকে গুলি করে মারেন। তারপর দুপক্ষই আরও গুলি চালায়।

বাবার মৃত্যুর সময় যার জন্ম হয়নি রবিন্দারের সেই ছেলে সূরজ ‘দ্য প্রিন্ট’কে জানিয়েছেন, তিনি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনেছেন দুই পক্ষের মধ্যে গুলি চললে তাঁর বাবা এবং অন্যপক্ষের আরেকজনের মৃত্যু হয়। ব্রিজভূষণ যে তাঁর বাবাকে মেরেছেন সে কথা তিনি বলেননি। ওই ঘটনার পর বিচারে ব্রিজভূষণের সাজাও হয়নি। তবে ‘দ্য লাল্লনটপ’কে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আযোধ্যার ফৈজাবাদ কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ এই ঘটনার সাক্ষী।

রবিন্দার ছিলেন তদানীন্তন সমাজবাদী পার্টির মন্ত্রী বিনোদ কুমার সিংহ তথা পণ্ডিত সিংহের দাদা। মন্ত্রী পণ্ডিত ছিলেন ব্রিজভূষণের ছোটবেলার বন্ধু এবং সরকারি কন্ট্রাকটর। এক সময় তাঁরা দুজন একসঙ্গেই কাজ করতেন। পরে তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান এবং ভিন্ন ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৯৩ সালে পণ্ডিত সিং-এর বল্লিপুরের বাড়িতে একদল দুষ্কৃতি তাঁর উপর গুলি চালায়। কয়েকটি গুলিতে আহত পণ্ডিতকে মুলায়ম সরকারের ব্যবস্থাপনায় লখনৌর হাসপাতালে উড়িয়ে আনা হয় এবং তিনি আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান। ওই মামলায় ব্রিজভূষণ অভিযুক্ত ছিলেন। ‘দ্য প্রিন্ট’ জানিয়েছে, ২০০৮ সালে ব্রিজভূষণ সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর উত্তরপ্রদেশের প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং ব্রিজভূষণ ও পণ্ডিতের পরিবারের মধ্যে সমঝোতার ব্যাবস্থা করেন। বিচার চালু থাকলেও পণ্ডিত সিং-এর পরিবারের কেউ আর সাক্ষী দিতে পারেননি। পণ্ডিত সিং ২০২১ সালে কোভিডে মারা যান। কিন্তু তার আগেও তিনি ওই মামলায় সাক্ষী দেননি।

পণ্ডিতের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নরেন্দ্র সিং ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাক্ষী হিসাবে বলেছিলেন, ব্রিজভূষণই পণ্ডিতকে গুলি করেছিলেন। তিনি কোর্টকে জানিয়েছিলেন, ব্রিজভূষণ তাঁকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছেন। এক বছর পর ডিসেম্বর মাসে এমপি-এমএলএ কোর্ট উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী পণ্ডিত সিংহকে খুনের প্রায় ২৯ বছরের পুরনো মামলা থেকে ব্রিজভূষণ এবং অন্য দুই অভিযুক্তকে রেহাই দেয়। কোর্ট জানায় তদন্তকারী পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য জোগাড়ের চেষ্টাই করেনি। শেষে পণ্ডিতের পরিবার এলাহাবাদ হাইকোর্টে মামলা করেছে। তাঁদের বিশ্বাস তাঁরা ন্যায়বিচার পাবে।

 

ব্রিজভূষণের সাম্রাজ্য

তিনি ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হয় মালিক নয়তো তিনি বা তাঁর পরিবার তার পরিচালক। প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩৫০০, ছাত্রসংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। সেসব রয়েছে গোন্ডা, বলরামপুর, বাহরাইচ, শ্রাবস্তী জেলায় অযোধ্যা-গোন্ডা হাইওয়ের দুপাশে। পরিবারের মালিকানায় অথবা পরিচালনায় বলরামপুরে রয়েছে ৭টি স্কুল ও কলেজ, ৮টি বাহরাইচে, ৩টি শ্রাবস্তী জেলায়। বাকি সব গোন্ডায়। প্রতিষ্ঠানের কর্মী, ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকার মানুষের উপর ব্রিজভূষণের অসামান্য প্রভাব। বাস্তবে তাঁর ব্যাবসা ঘিরেই সেখানকার অর্থনৈতিক কাজকর্ম চলে।

গোন্ডা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে নবাবগঞ্জই তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেখানে নানা ধরনের অনেক কলেজ ও স্কুল ছাড়া রয়েছে গোন্ডা হোটেল, ১০০ বেডের গোনারড হসপিটাল অ্যান্ড ট্রমা সেন্টার, শুটিং রেঞ্জ, ন্যাশনাল রেসলিং অ্যাকাডেমি। এছাড়া রয়েছে যুব ও কৃষকদের জন্য কিছু কল্যাণ প্রকল্প। তাঁর ওই বদান্যতার জন্য এখানে যারা থাকেন বা কাজ করেন, তাদের তাঁর প্রতি অটল আনুগত্য।

পৈতৃক গ্রাম বিষনোহরপুরে বেশ কয়েক একর জুড়ে তাঁর বিশাল সাদা দোতলা বাড়ি, অতি যত্নে লালিত বিশাল বাগান, বিলাসবহুল জিম। এছাড়া রয়েছে সার বাধা বড় গাড়ি রাখার বিরাট ব্যাবস্থা। বাড়ির পিছনে থাকে রবিনসন আর-৬৬ হেলিকপ্টার, দু-তিন দিন অন্তর হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে। বাড়ির বাইরে একটি হ্রদের মুখোমুখি তাঁর ৭০টি গরু রাখার গোশালা, দুটি ঘোড়া রাখার আস্তাবল। ব্রিজভূষণ শখে মাঝেমধ্যে ঘোড়ায় চড়েন।

 

বিজেপি কেন তাঁকে রক্ষা করছে

এত কিছুর পরও তাঁর সাম্রাজ্যের জনমনে তাঁর প্রভাবের কোনও টাল পড়েনি। এহেন ব্রিজভূষণকে বলা হয় ‘ডন অফ ডনস’। বড় অপরাধী হলেও সমাজবাদী পার্টি এবং বিজেপিও সমাদর করেই রেখেছিল। বারবার তিনি লোকসভার প্রার্থী হন এবং জেতেন। তাঁর অর্থবল অসামান্য। তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবাদে পাঁচ-ছটি জেলায় বিপুল প্রভাব। একটি হেলিকপ্টার-সহ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। তাঁর তৈরি ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলি ছড়িয়ে আছে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা থেকে শ্রাবস্তির ১০০ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যে। বাহরাইচ, গোন্ডা, বলরামপুর, অযোধ্যা, শ্রাবস্তি ইত্যাদি জেলায়। ওই সব জেলায় তাঁর বিপুল প্রভাব। শুধু প্রভাব বা রোজগারই নয়, সেখানকার কর্মীরা তাঁর পেশিশক্তিরও বড় উৎস। তাঁর কাছের লোকেদের অনেকের বিরুদ্ধেই জমিমাফিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জোর করে, অবৈধভাবে জমি ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে।

তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, আমি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে ওই সমস্ত কলেজ খুলিনি। কিন্তু আজ ছেলেরা আমার পিছনে দাঁড়িয়েছে। লোকে আমাকে মাফিয়া বলতে পারে, কিন্তু ছাত্রদের কাছে আমিই আইডল। আগে আমি ব্রাহ্মণদের পা ছুঁতাম, এখন তরুণ ব্রাহ্মণরা ‘গুরুজি’ বলে আমার পা ছোঁয়। এই কারণেই উত্তরপ্রদেশের বিরাট অঞ্চলে ব্রিজভূষণ তাঁর পার্টির চেয়ে বড়। তিনি তাঁর পার্টিকে চ্যালেঞ্জ করলে– উত্তরপ্রদেশ সরকার, যোগী আদিত্যনাথ, আজম খান, রাজ থাকরে বা বাবা রামদেবকে নিয়ে বেফাঁস কিছু বললেও পার্টি তাঁর প্রতি বিমুখ হয় না।

তিনটে আলাদা লোকসভা নির্বাচন কেন্দ্র— গোন্ডা, বলরামপুর ও কাইসেরগঞ্জ— থেকে তিনি ছবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। রাজপুতদের মধ্যে রয়েছে তাঁর বিপুল প্রভাব। বিজেপি জানে তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে উত্তরপ্রদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় দলের বিপদ আছে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে নানা মহল থেকে তীব্র আওয়াজ উঠলেও মোদি যেন তা শুনতেই পাচ্ছেন না।

নির্বাচনের সময় কয়েকশো কুস্তিগির তাঁর হয়ে প্রচারের কাজে সেখানে এসে জড়ো হয়। না অর্থবল, না লোকবল— কোনওটার জন্যই তিনি বিজেপির উপর নির্ভরশীল নন। অনেকে বলেন, তিনি শুধু বিজেপির নির্বাচন প্রতীক ধার নেন, জেতেন নিজের ক্ষমতাতেই। তাই ব্রিজভূষণ হয়তো বিশ্বাস করতেন বিজেপির তাঁকে যতটা দরকার তাঁর বিজেপিকে ততটা দরকার নেই। তিনি যে দল থেকে তাঁর বহিষ্কার আশা করেন না তা ব্রিজভূষণের কথা ও আচরণে আজও পরিষ্কার।

অন্যদিকে বিজেপি হয়তো আত্মবিশ্বাসী যে প্রচারের মাধ্যমে তাঁরা সাধারণ মানুষের ধারণা বদলাতে দক্ষ। তাঁদের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ যত দুখের, লজ্জারই হোক, মানুষের ক্ষোভ যত তীব্রই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়েও তাঁরা মানুষের ধারণা বদলে দিতে পারে। মন ভোলানোর খেলায় তাঁরা এতটাই পারদর্শী।

মোদি হয়তো ভাবছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কয়েকজন কুস্তিগিরের অভিযোগের প্রভাব তেমন থাকবে না। বাস্তবে যাই ঘটুক তাঁর গড়া ইমেজেই দল ভোটে জিতবে। তাই কুস্তিগিরদের এই প্রতিবাদ কত বড় আন্দোলনের চেহারা নিচ্ছে তার উপরই তাঁদের বিচার পাওয়া নির্ভর করছে। আশার কথা, এরই মধ্যে আন্দোলনের প্রভাব তুমুলভাবে বাড়ছে।

মোদি এপ্রিল মাস পর্যন্ত রবিবারের ‘মন কি বাত’-এ কুস্তিগিরদের কথা বলেননি। এরপর মে মাসে ১০০তম মাসিক রেডিও প্রোগ্রামে সরাসরি না হলেও মৌনতা ভেঙেছেন। বলেছেন, দলের কোনও লোকের অপকর্মে সরকারের মহিলা ক্ষমতায়ণের রেকর্ড কালিমালিপ্ত করা যাবে না। ২০১৪ সাল থেকে নানা কল্যাণ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি অনেক রাজ্যে মহিলাদের কাছে জনপ্রিয়। ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে মোদি মহিলা ক্ষমতায়ণের ঢাল ব্যবহার করে তাঁর দল ও সরকারকে ব্রিজভূষণের অপকর্ম থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে বিজেপির আশ্চর্যরকমের নীরব হলেও এইরকম ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০২২ সালে লখিমপুর খেরি জেলায় কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্রের ছেলে আশিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত কৃষকদের গাড়ি চাপা দিয়ে মারার অভিযোগ উঠলে বিজেপি স্রেফ তা অবজ্ঞা করেছিল। দলের সর্বোচ্চ মহল অজয়কে সমর্থন জুগিয়েছে। একইভাবে হরিয়ানার ক্রীড়া ও যুবদপ্তরের মন্ত্রী সন্দীপ সিং-এর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে মুখ্যমন্ত্রী খট্টর পুলিশি তদন্তকে প্রভাবিত করতে সেই অভিযোগকে বলেছেন, ‘অ্যাবসার্ড’। এক মহিলা কোচের যৌন হেনস্থার অভিযোগের পরও হকি প্লেয়ার থেকে হরিয়ানার রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা সন্দীপ সিং বহাল তবিয়তে আছেন, দলের নেতাদের সমর্থন পাচ্ছেন। প্রতিবাদ সত্ত্বেও, তাঁর মন্ত্রিত্ব বদল হলেও তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। এই মনুবাদী দল এবং আরএসএস নারীকে অপমান বা হেনস্থা করা, যৌন অপরাধ বা ধর্ষণকে অপরাধ বলেই মনে করে না।

তবে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সাংবাদিক এমজে আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠলে বিজেপি কিন্তু তাঁকে রেয়াত করেনি। দলের এক মহিলা সাংসদ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, এঁরা দেখে বুঝে কার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে ঠিক করে। অর্থাৎ নীতি নয় দলের স্বার্থই প্রধান।

 

হরিয়ানায় বিজেপি চূড়ান্ত অস্বস্তিতে

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে কুস্তিগিরদের প্রতিবাদে সমর্থনের জন্য ‘হরিয়ানা অ্যামেচার রেসলিং অ্যাসোসিয়েশন’ মে মাসের ৫ তারিখে তিন জেলা সেক্রেটারি এবং হিসারের কুস্তি অ্যাকাডেমির দুই ম্যানেজারকে সাসপেন্ড করেছে।

তবে প্রতিবাদী কুস্তিগিররা হরিয়ানার মেয়ে হওয়ার জন্য তাঁদের দাবির সমর্থনে জনমত দ্রুত বাড়তে থাকা এবং আগামী বছর হরিয়ানায় লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে বলে কুস্তিগিরদের প্রতিবাদ এবং কেন্দ্রের ভূমিকা সে রাজ্যের বিজেপিকে প্রবল চাপে ফেলেছে। প্রতিবাদরত কুস্তিগিরদের দৃষ্টিকটূ টানাহেঁচড়া, হেনস্থার পর তাঁদের উপর মামলা দায়ের করার জন্য হরিয়ানার মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ। ওই ঘটনার পর রাজ্যের কৃষক ইউনিয়ন, কংগ্রেস দল ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদল (আইএনএলডি) কোমর বেঁধে কুস্তিগিরদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাশালী খাপ নেতারাও কুস্তিগিরদের পক্ষ নিয়েছেন। এখন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা মতামত দিচ্ছেন সামলে।

হরিয়ানার শক্তিমন্ত্রী রজনিত সিং প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের সমর্থন করে বলেছেন, এই কুস্তিগিররা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের সন্মান বাড়িয়েছেন… খেলোয়াড়দের অধিকারের জন্য যদি তাঁদের ধর্নায় বসতে হয় তা ঠিক নয়। ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগের দ্রুত তদন্ত হওয়া দরকার এবং নৈতিক কারণে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। ওদিকে হিসারের বিজেপির লোকসভা সদস্য ব্রিজেন্দ্র সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল ভিজ আশাতীতভাবে কুস্তিগিরদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বীরেন্দ্র সিং-ও মুখর হয়েছেন, তিনি বিজেপি কেন্দ্রীয় সভাপতি জেপি নড্ডাকে বলেছেন পার্টি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। হরিয়ানার বিজেপি সভাপতি ওমপ্রকাশ ধনকড় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, তিনি কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরকে বলেছেন, প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের বিচার পাওয়া উচিত। কুস্তিগিরদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে বলে খট্টর সরকারও দিন দিন প্রতিবাদের তাপ অনুভব করছে। তবে রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব কোনও পক্ষ নেয়নি।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, কয়েকদিন আগে ডেপুটি চিফ মিনিস্টার দুষ্যন্ত চৌতালা বলেছেন, (মহিলা কুস্তিগিরদের) অভিযোগ খুবই গুরুতর। সংবাদপত্রের রিপোর্ট পড়ে মনে হয়েছে এ ব্যাপারে দিল্লি পুলিশের তদন্তের গতি বাড়ানো দরকার… আমার পক্ষে কে নির্দোষ আর কে দোষী বলা সম্ভব নয়। এফআইআর-এ কী বলা হয়েছে তা এখন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। রাজ্যের বিষয় না হলেও এই রাজ্যের সবাই মেয়েদের পক্ষে। তিনি ব্রিজভূষণের শাস্তি দাবি করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনিল ভিজ বলেছেন, কোথাও মহাপঞ্চায়েত বসছে, কোথাও ধর্না… তাঁদের (মহিলা কুস্তিগিরদের) বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে… সরকার তাঁদের কথা শুনছে… এইসব খেলোয়াড়রা জাতীয় বীর। পরিবহন মন্ত্রী মুলচাঁদ শর্মা বলেছেন, আমাদের মেয়েরা আমাদের গর্ব, আমাদের সম্মান… একজন খেলোয়াড়কে খেলোয়াড় হিসাবেই দেখতে হবে। দিল্লির পুলিশ (সংসদ অভিযানের দিন) আমাদের কন্যাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেনি। তার নিন্দা করা উচিত, তাদের (পুলিশের) বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা উচিত।

কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিবাদের মত এবারও হরিয়ানার দুই শাসক দল বিজেপি ও জেজেপি এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মতামত পোষণ করছেন। জেজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রীর ডেপুটি দুষ্যন্ত চৌতালা কুস্তিগিরদের সমর্থনে ব্রিজভূষণের শাস্তি দাবি করেছেন। ওদিকে অন্য রাজ্যের বিজেপির মহিলা সাংসদরাও একে একে ব্রিজভূষণকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সরব হচ্ছেন। সেই দাবি করেছেন মহারাষ্ট্রের প্রীতম মুন্ডে, পরে একই দাবি করেছেন মেনকা গান্ধি।

মে মাসের প্রথমদিকে বেশি রাতে ধর্না অঞ্চল থেকে দেশের তারকা কুস্তিগিরদের সরাতে মদ খেয়ে আসা পুলিশের হেনস্থা, দুর্ব্যবহার ও অতিতৎপরতায় হরিয়ানার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। হরিয়ানায় কংগ্রেসের নেতা ভূপিন্দর সিং হুডা বলেছিলেন, রাস্তায় বসে হরিয়ানার খেলোয়াড়রা বিচার চাইছে। তারপর হুডা কংগ্রেসের বিধানসভা সদস্যদের নিয়ে যন্তর মন্তরে পৌঁছে সংহতি জানিয়ে এসেছিলেন।

কুস্তিতে দেশের জন্য সিংহভাগ পদক হরিয়ানাই আনে। কংগ্রেসের আমলে হুডা সরকার খেলোয়াড়দের জন্য নানা নীতি তৈরি করেছিল। একটি ছিল ‘পদক লাও পদ পাও’ নীতি। যারা পদক আনতেন তাঁদের সরকারি চাকরি দেওয়া হত। বক্সার বিজেন্দ্র সিংহ ২০০৮ সালে বেজিং অলিম্পিকে, ২০০৯ সালে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে এবং ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে হরিয়ান পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। ববিতা ফোগটও এইভাবেই হরিয়ানার ক্রীড়া বিভাগে চাকরি পেয়েছিলেন। অবশ্য ২০২০ সালে তিনি বিজেপির সর্বসময়ের কর্মী হয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।

কুস্তিগিরদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে ৪ জুন হরিয়ানার মুন্ডলানায় মহাপঞ্চায়েত বসেছিল। তার আগে জুন মাসেই কুরুক্ষেত্রে এবং উত্তরপ্রদেশের সোরামে (মুজফফরনগর) বসেছিল মহাপঞ্চায়েত। হরিয়ানা ও পঞ্জাবের কৃষক সংগঠংগুলো ১ জুন রাজ্য জুড়ে সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। কৃষক আন্দোলনের প্রায় তিন বছর পর ১ জুন খাপ সোনেপতের গোহানায় মহাপঞ্চায়েত বসিয়েছে। একই দিনে বৈঠক ডেকেছিলেন কৃষক নেতারা। সেখানে পঞ্জাব, হরিয়ানার বিভিন্ন কৃষক সংগঠন যোগ দিয়েছে। বৈঠকে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেছেন। শুরু থেকেই সে রাজ্যের কৃষক সংগঠন ও খাপ পঞ্চায়েত প্রতিবাদীদের পক্ষে। কিন্তু ২৮ মে-র পর সমর্থন অনেক বেড়েছে।

 

ব্রিজভূষণের তৎপরতা

ওদিকে ব্রিজভূষণ প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের চাপ সৃষ্টি করতে খুবই তৎপর ছিলেন। তিনি তাঁদের নানাভাবে ভয় দেখিয়েছেন৷ এরই মধ্যে, ৫ জুন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী নাবালিকা কুস্তিগিরের বাবা তাঁর অভিযোগ তুলে নিয়েছেন। ২১ মে লিখিতভাবে অভিযোগ জানানোর পর অনেক টালবাহানা করে চার্জশিট পেশ করতে অমিত শাহ-এর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন পুলিশ তিন সপ্তাহ সময় নিল। এফআইআর দায়ের করার পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অথচ নাবালিকার ওপর যৌন নির্যাতনের মামলায় অভিযোগের পরই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার কথা, যেন নির্যাতিতার ওপর কোনও চাপ তৈরি না হয় এবং অভিযুক্ত কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে না পারে। পকসো আইনের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার, যেন নাবালিকার পরিবারকে ভয় দেখিয়ে পকসো মামলাটি তুলে না নেওয়া যায়। অথচ এক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হল। আপাতত তিনি গ্রেপ্তারি এড়িয়ে গেলেন। এখন আইনের খেলা চলবে, যে খেলায় ক্ষমতাশালীরা বিশেষ করে বিজেপি সিদ্ধহস্ত।

ওদিকে তিনি জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়িয়ে, কখনও হেলিকপ্টারে চড়ে, মিটিং করে চলেছেন। তাঁর প্রতি সমর্থনের পাল্লা কতটা ভারী, তা বোঝা এবং শক্তিপ্রদর্শনই লক্ষ্য। ৫ জুন তিনি অযোধ্যায় ‘জনচেতনা মহাসমাবেশ’ ও সন্ত সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চারটি জেলায় অসংখ্য বড় বড় পোস্টার লাগানো হয়েছিল। তিনজন বিজেপি বিধানসভা সদস্যকে নিয়ে ১১ লাখ মানুষের জমায়েতের পরিকল্পনা ছিল। বুঝতে বাকি ছিল না, ক্ষমতার আস্ফালন করতেই ওই সমাবেশ। কথা ছিল সেখান থেকে পকসো আইন সংশোধনের জন্য জোরদার দাবি তোলা হবে। পরে অবশ্য সেই ‘মহাসমাবেশ’ তিনি বাতিল করেন। কারণ হিসাবে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তের কথা বলেছিলেন।

প্রসঙ্গত, এরপর ১১ জুন মোদি সরকারের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপির ‘মহাসম্পর্ক অভিযান’ কর্মসূচি অনুযায়ী গোন্ডায় এক বড় সমাবেশের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছেন তিনি কাইসেরগঞ্জ আসন থেকেই আগামী লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়াবেন।

 

অভিযোগের তদন্ত

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগিররা পনেরোটি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি বা সিট) বিষয়টির তদন্ত করছে। সিট ১৫৮ জনের লিস্ট তৈরি করে পূর্বোক্ত চারটি রাজ্য ঘুরে ১২৫ জনের বিবৃতি রেকর্ড করেছে। দুটি এফআইআর-এ দশটি অশালীন স্পর্শ এবং শ্লীলতাহানি, যৌন নির্যাতন ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভয় দেখানো ও তাড়া করার ঘটনার কথাও বলা হয়েছে। এসআইটি কয়েকবার ব্রিজভূষণের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁকে মিথ্যা ফাঁসানো হয়েছে। ছয় মহিলা কুস্তিগিরের অভিযোগ অনুযায়ী সিট ফেডারেশনের সেক্রেটারিকেও তিন থেকে চার ঘণ্টা জেরা করেছে। ছয় যুবতী এবং এক নাবালিকা কুস্তিগিরের বিবৃতি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আইনসিদ্ধভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। ২১ এপ্রিল লিখিত অভিযোগে কুস্তিগিররা ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যে যৌন হয়রানি ও অপরাধমূলক ভয় দেখানোর কথা বলেছিলেন, এফআইআর-এও তাঁরা সে কথাই বলেছেন।

জুন মাসের ৪ তারিখে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, একজন অলিম্পিয়ান কুস্তিগির, একজন কমনওয়েলথ সোনাজয়ী, একজন আন্তর্জাতিক রেফারি আর একজন রাজ্য স্তরের কোচ কুস্তিগিরদের অভিযোগ সমর্থন করেছেন। যাদের বিবৃতি দিল্লির পুলিশ রেকর্ড করেছে সেই হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড ও কর্নাটকের কুস্তিগির এবং কুস্তির সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তিরা সম্ভাব্য ১২৫ জন সাক্ষীর অন্যতম। কোচ তদন্তকারীদের বলেছেন, ব্রিজভূষণ এক মহিলা কুস্তিগিরের কাছে অশালীনভাবে এগিয়ে আসার ছ ঘন্টা পরেই কুস্তিগির ফোনে তাঁকে ঘটনাটি বলেছিলেন। যৌন হয়রানির প্রায় এক মাস পরে দুই অভিযোগকারী অলিম্পিয়ান কুস্তিগির এবং কমনওয়েলথ সোনাজয়ীকে সে কথা জানিয়েছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সুনাম রয়েছে এমন রেফারি জানিয়েছেন, দেশে ও বিদেশে প্রতিযোগিতার সময় তিনি দেশের মহিলা কুস্তিগিরদের দুর্দশার কথা শুনেছেন। চারজন তাঁদের বিবৃতিতে তিন মহিলা কুস্তিগিরের অভিযোগ সমর্থন করেছেন।

যেখানে যৌন হয়রানি হয়েছে বলে অভিযোগ সেইরকম প্রতিযোগিতায় যারা উপস্থিত ছিলেন তদন্তকারী সিট ফেডারেশনের কাছ থেকে তাঁদের লিস্ট নিয়েছে। যৌন হয়রানির অভিযোগে সরকার নিযুক্ত বক্সার মেরি কমের নেতৃত্বে যে ওভারসাইট কমিটি তৈরি হয়েছিল তাদের রিপোর্টও তারা পেয়েছে।

পুলিশের কাছে এফআইআর-এ বলা হয়েছে, গত বছর মার্চ মাসে লখনৌ-এ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রায়ালের শেষে দল যখন ছবি তোলার জন্য পোজ দিচ্ছে, ব্রিজভূষণ এক অভিযোগকারীর নিতম্বে হাত রাখেন৷ তারপর অভিযোগকারী সেখান থেকে সরে যেতে চান। যেহেতু তিনি লম্বা তাই ছবি তোলার সময় শেষ সারিতে দাঁড়াবেন মনে করেছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে যখন অন্যদের পজিশন নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, অভিযুক্ত এসে তাঁর পাশে দাঁড়ান। হঠাৎ হতভম্ব হয়ে তিনি অনুভব করেন ব্রিজভূষণ তাঁর নিতম্বে হাত রেখেছেন। ভয় পেয়ে পিছন ফিরে দেখেন ঠিক তাই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখান থেকে চলে যেতে চেষ্টা করেন, ব্রিজভূষণ কাঁধে হাত রেখে জোর করে তাঁকে ধরে রেখেছিলেন। সবার সঙ্গে ছবি তোলা এড়িয়ে যেতে পারেননি বলে ঠিক করেন তাঁর হাত থেকে বাঁচতে সামনের সারিতে গিয়ে বসবেন। এফআইআর-এ আরও বলা হয়, ব্রিজভূষণের এই চরম আশালীন, আপত্তিকর ব্যবহারে মহিলা কুস্তিগিররা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ৯ জুন জানিয়েছে, সেই কুস্তিগিরের অভিযোগের এফআইআর-এ সাক্ষ্য হিসাবে দীর্ঘকালের আন্তর্জাতিক রেফারি জগবীর সিং-এর নাম ছিল। ব্রিজভূষণ ও অভিযোগকারীর থেকে অল্প কয়েক ফুট দূরেই ছিলেন জগবীর। দিল্লি পুলিশের কাছে তিনি সেই ঘটনা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, আমি তাঁকে ব্রিজভূষণের পাশে দাঁড়াতে দেখেছি। তিনি ব্রিজভূষণকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে সামনের সারিতে চলে আসেন। আমি তাঁকে রিঅ্যাক্ট করতে দেখেছি, সে অস্বস্তিতে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কিছু খারাপ কাজ হয়েছিল। ব্রিজভূষণ কুস্তিগিরদের স্পর্শ করতেই থাকেন, বলেন, এখানে আয়, এখানে এসে দাঁড়া। অভিযোগকারীর ব্যবহার থেকে এটা বুঝেছিলাম যে, তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার সময় কিছু বেঠিক কাজ হয়েছে। 

দ্বিতীয় আরেক সাক্ষী, কমনওয়েলথ সোনাজয়ী ভিওয়ানির কুস্তিগির অনিতার সঙ্গেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কথা বলেছে। তিনি জানান, বিদেশে প্রতিযোগিতা চলার সময় এক অভিযোগকারী তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, ব্রিজভূষণ ঘরে ডেকে তাঁকে জোর করে জড়িয়ে ধরেন। দেশে ফিরে পাতিয়ালার জাতীয় শিবিরে সেই ঘটনা তাঁকে বলার সময় অভিযোগকারী কাঁদছিলেন। এফআইআর-এ অভিযোগকারী বলেছেন, সেদিন সোনা জয়ের রাতে ঘরে ডেকে জোর করে জড়িয়ে ধরায় তিনি মানসিকভাবে আহত হয়েছিলেন।

এর আগে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল যে, তাদের কাছে ব্রিজভূষণকে গ্রেপ্তার করার মতো কোনও প্রমাণ নেই। তার উত্তরে প্রতিবাদী কুস্তিগিররা জানিয়েছিলেন যে, দিল্লি পুলিশের কাছে দায়ের করা দুটি এফআইআর-এ পরিষ্কারভাবে কখন কোন কুস্তিগিরকে যৌন হেনস্থা করা হয়েছে তা বলা হয়েছে।

 

পরিকল্পিত অপপ্রচার ও জবাব

বিজেপি-আরএসএস পরিচালিত ‘অপ ইন্ডিয়া’ ও ‘অর্গানাইজার’-এর ওয়েবসাইটে অভিযোগ করা হয়েছে ওই প্রতিবাদের স্থল থেকে ‘মোদির কবর হোক’, ‘হম ক্যায়া চাহতে, আজাদি’, ‘মনুবাদ সে আজাদি’ ইত্যাদি স্লোগান উঠেছে। অন্য কোনও সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে ওই তিনটি স্লোগানের উল্লেখ নেই, তবে মে মাসের ২৮ তারিখে একদল যুবক সহমর্মিতা জানাতে এসে ‘মোদি তেরি কবর খুঁড়েগি’ স্লোগান তুলেছিলেন। তখন বজরং পুনিয়া বলেন, এই মঞ্চ কারও রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।

ওদিকে হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি নানা অপপ্রচারে নেমেছে। যেমন, পুলিশ মে মাসের ২৮ তারিখে যে কুস্তিগিরদের শারীরিক হেনস্থা করেনি তা বোঝাতে গাড়িতে বিনেশ, সঙ্গীতারা পুলিশের সঙ্গে হাসিমুখে বসে রয়েছেন এমন ছবির প্রচার করেছে। ছবিটি যে জাল পরেরদিন নানা সংবাদপত্রে সে কথা বলা হয়েছে। সঙ্গে কুস্তিগিরদের উপর নিপীড়নের নানা ছবি ছেপেছে। দেখা যাচ্ছে ওই ইউনিভার্সিটি যাতে খুব অভ্যস্ত সেই মিথ্যা প্রচারে এ যাত্রায় তেমন কাজ হচ্ছে না।

কুস্তিগিরদের ধর্নায় ২৩ এপ্রিল থেকে ২৮ মে পর্যন্ত মোট প্রায় ১০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। শুরুতে তাঁরা ২-৩ লাখ টাকা নিয়ে এসেছিলেন, ধর্নার প্রথম পাঁচ দিনেই প্রায় তাঁদের প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। তাঁরা গদি, মাইক, স্পিকার সব ভাড়ায় নিয়েছিলেন। তার জন্য প্রতি দিন ২৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছিল। ধর্না অনেক দিন চলবে বুঝতে পেরে সেসব নিজেরাই কিনে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এর পরেও ফ্যান, জেনারেটরের মতো কিছু জিনিস ভাড়ায় নিতে হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল ধর্না শেষে সেই সব স্পিকার, মাইক, গদি কোনও গুরুদ্বার বা মন্দিরে দান করবেন। সেসব ছাড়া খাবার এবং জলের খরচও ছিল। ধর্না চলাকালীন অবশ্য তাঁরা কিছু সাহায্যও পেয়েছিলেন। কোনও রাজনৈতিক দল বা বাইরের কারও কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নেননি। কয়েকজন কোচ আখড়ায় রান্না করে খাবার পাঠিয়েছেন। একজন জলের জোগান দিয়েছেন। অন্য একজন ধর্না চত্বর পরিষ্কারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। হরিয়ানার প্রায় ৮০টি আখড়া থেকে কুস্তিগিররা ধর্নায় যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সামলানো মুশকিল হবে ভেবে তাঁদের সেখানে না এসে দূর থেকেই সমর্থন জানাতে বলা হয়েছিল।

 

শেষ কোথায়

২৩ এপ্রিল থেকে ধর্না শুরু করার পরে কুস্তিগিরদের প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন। বিজেপির মহিলা সাংসদদেরও চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র নড়ে বসেনি। উল্টে সংসদ ভবন অভিযানের সময় হেনস্থা করা হয়েছিল। সেই দুঃখ, অভিমানে সাক্ষী, বিনেশরা ৩০ মে হরিদ্বারে গিয়ে গঙ্গায় পদক ভাসিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। শেষে কৃষক নেতাদের হস্তক্ষেপে ফিরে তাঁরা ফিরলেও আন্দোলন চলছিল।

জুনের ৯ তারিখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে কুস্তিগিররা নিজেদের দাবি নিয়ে বৈঠক করেন। পরে ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের বাড়িতেও বৈঠক করেন। ব্রিজভূষণকে গ্রেফতার করার দাবি ছাড়াও তাঁরা ফেডারেশনের মাথায় মহিলা প্রধান নিয়োগ করা, সংস্থার সুষ্ঠু নির্বাচন করা, ব্রিজভূষণ ও তাঁর পরিবারের কেউ যেন ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত থাকতে না পারেন এবং ২৮ মে কুস্তিগিরদের বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজ করার দাবি জানান। দীর্ঘ বৈঠকের পরে কুস্তিগিরদের শেষ তিনিটি দাবি মেনে নেওয়া হলেও ব্রিজভূষণকে গ্রেফতার করার দাবি অনুরাগ মানেননি। তবে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ১৫ জুনের মধ্যে চার্জশিট পেশ করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। সেই কারণে প্রতিবাদী কুস্তিগিরেরা আপাতত আন্দোলন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

যৌন নিগ্রহের জন্য মহিলা কুস্তিগিরদের এতদিনের প্রতিবাদ থেকে এটুকু পরিষ্কার যে এদেশে নারী-পুরুষ সমানাধিকারের অস্তিত্ব শুধু বক্তৃতাতেই রয়েছে, বাস্তবে নেই। যৌন হেনস্থার কথা যে-ই বলুন, তাঁর বা তাঁদের দাবি যতই যথার্থ হোক বিজেপি সরকারের কাছে একমাত্র বিচার্য হল তাদের সিদ্ধান্তে ভোটের ফল কী হবে। অথচ গত বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কথাবার্তা এবং কাজে মহিলাদের অপমান করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে৷ অথচ কুলদীপ সিংহ সেঙ্গারের, চিন্ময়ানন্দের, আশারাম বাপুর, এবং হাথরস-লখিমপুর, প্রতিটি যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিজেপি অভিযুক্তদের বাঁচিয়েছে। কুস্তিগিরদের আন্দোলনের গোটা পর্বে মোদি একদম চুপ ছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, দেশের প্রধানমন্ত্রী ন’বছর ধরে মিথ্যা কথা বলে গেলেন, ফাঁকা আওয়াজ করে গেলেন।

ভোটের স্বার্থ ছাড়া সরকার কোনও সিদ্ধান্ত নেয় না। কৃষকদের দাবি যথার্থ হলেও দিল্লির বর্ডারে এক বছরের উপর চলা আন্দোলনকে তারা এই চোখেই দেখেছিল। কৃষি আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরকার, বিজেপি ও আরএসএস প্রথমে বলেছে, প্রতিবাদী কৃষকরা খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতের পুতুল। যখন দেখা গেল যে আন্দোলনে সমস্ত শ্রেণির কৃষক যোগ দিয়েছেন, তারা বলল, আন্দোলনের টাকা জোগাচ্ছে বড় কৃষক ও অপরাধীরা। আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই কৃষকদের বিরুদ্ধে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ ও ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ বলা চালু করেছে। সরকারি কর্তা ও মন্ত্রীরা বারবার আলোচনায় বসলেও বলেছেন, কৃষি আইন প্রত্যাহার করা যাবে না। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতে হলেও, কৃষকদের দাবি মেনে নিয়েও সরকার এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস)-কে আইনগত স্বীকৃতি দেয়নি।

বেশি রাতে কুস্তিগিরদের উপর যেমন পুলিশের আক্রমণ নেমে এসেছিল, প্রতিবাদী কৃষকদের উপরও পুলিশ বারবার একইভাবে হানা দিয়েছে। কুস্তিগিরদের ক্ষেত্রে যন্তর মন্তরে ব্যারিকেড করে যেমন বড় পুলিশ বাহিনি মোতায়েন করা হয়েছে, কৃষকরা যেন দিল্লি শহরে ঢুকতে না পারে সেই উদ্দেশে রাস্তায় পেরেক পুঁতে রাস্তার উপরই তারকাটার আড়াল তৈরির পরও কংক্রিটের চওড়া দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল।

সিএএ আন্দোলনের সময়ও একই রকম হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ মুসলমান প্রতিবাদীদের বলা হয় ‘সন্ত্রাসবাদী’। ওই আন্দোলনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও ইউএপিএ-র অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অন্যদের উপর লাঠিচার্জ করা হয়েছিল। গ্রন্থাগারের ভিতর ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের বেপরোয়াভাবে মারা হয়। কয়েকটি দক্ষিণপন্থী সংগঠন দেশে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। মন্ত্রীরাও মুসলমানবিদ্বেষী, ঘৃণা ছড়ানো বিবৃতি দিচ্ছিলেন। এসব ঘটেছিল দিল্লি পুলিশ এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যৌথভাবে প্রতিবাদস্থল থেকে মানুষকে উৎখাত করার আগে।

ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগের নানা দিক যত বেশি প্রকাশিত হয়েছে হরিয়ানা রাজ্য বিজেপি এবং কেন্দ্রের উপর চাপ আরও বাড়ছে। আন্দোলনের প্রভাব হরিয়ানাতেই বেশি বলে এতদিন ভাবা হত। কুস্তিগিররা বেশিরভাগই জাঠ সম্প্রদায়ের। দেখা যাচ্ছে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ এবং ভোট আসন্ন রাজস্থানের জাঠ সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্দোলনের ভাল প্রভাব পড়েছে। জাঠ সম্প্রদায় যেখানে শক্তিশালী সেইসব জেলায় সাম্প্রতিক নগর পঞ্চায়েত ও নগরপালিকা চেয়ারম্যান নির্বাচনে দেখা গেল বিজেপি যেমন প্রত্যাশা করেছিল তেমন হয়নি, আরএলডি ও সমাজবাদী পার্টি ভাল ফল করেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি ভূপেন্দ্র চৌধরি (মোরাদাবাদ জেলার জাঠ), অন্য জাঠ নেতা সঞ্জীব বালিয়ান (মুজাফফরনগর), সত্যপাল সিং-এর (বাঘপত) জেলাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জাঠপ্রধান জেলায় ৫৬টি নগরপালিকা সভাপতির শাসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে মাত্র ২০টিতে। ওদিকে ১২৪টি নগর পঞ্চায়েত আসনের মধ্যে মাত্র ৩৪টি দখল করেছে তারা।

এই ঘটনা বিজেপিকে চিন্তায় ফেলেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে যখন তারা সবরকমের ভোটেই বেশি বেশি আসন জিতে নিতে চাইছে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠেরা মূলত আখ চাষ করেন এবং প্রভাবশালী চাষি। সেখানে বারোটি লোকসভা ও চল্লিশটি বিধানসভা কেন্দ্রে তাঁদের প্রভাব রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী জাঠ সম্প্রদায় উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থান ও দিল্লির ৪০টি লোকসভা এবং ১৬০টি বিধানসভা ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এইটাই এখন বিজেপির প্রধান চিন্তার বিষয়।

মহিলা কুস্তিগিরদের প্রতি সরকার, পুলিশের অসম্মান দেখে জাঠেরা ক্ষুব্ধ। কুস্তিগিরদের অভিযোগের সত্যতা ও আইনি ভিত্তিকে এতদিন পরোয়া না করলেও বিজেপি তাই চিন্তায় পড়েছে। মহিলাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা বা আইনের জন্য না হলেও ভোটে জাঠ সম্প্রদায়ের প্রভাব কতটা তা বুঝে এবার তাদের পদক্ষেপ করতে হবে।

কুস্তিগিরদের ক্ষেত্রে সরকার ও পুলিশের আচরণে দিনের পর দিন ছবিতে কুস্তিগিরদের হতাশা, অসহায়তা ধরা পড়লেও আশ্চর্য তাঁদের প্রতিজ্ঞা এবং আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই যুবতী-যুবকরা দেশের গর্ব জানার পরও তাঁদের যেন নতুন করে চিনলাম। ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগিরদের যে সমস্ত অভিযোগ রয়েছে এবং দেশ জুড়ে তাঁদের আন্দোলনের সমর্থন যেরকম বেড়েছে, তাই দেখে মনে হয় বিজেপির শত কূটকৌশল, মনুবাদী নীতি সত্ত্বেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা ছাড়া পথ নেই। রাহুল গান্ধি বলেছিলেন, ২৫টি আন্তর্জাতিক পদক জয় করা দেশের মেয়েরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছেন, আর দুটি এফআইআর-এ ১৫টি যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত সাংসদ প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষাকবচে নিরাপদে আছেন। তবে ওই কবচের জোরে ব্রিজভূষণ এখন আর ততটা সুরক্ষিত নেই। কৃষক আন্দোলনের মতো এক্ষেত্রেও বিজেপি ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

কুস্তিগিররা অনেকদিন হল প্র্যাক্টিসে বা শারীরিক কসরতের পরিবেশে নেই। সেই ক্ষতি মেনে নিয়েও তাঁরা যে অবিচলিতভাবে আন্দোলনে রয়েছেন সে কারণে তাঁদের অভিবাদন জানাতে হয়। অবাক হতে হয় একথা ভেবে যে, ফেডারেশন প্রধান ব্রিজভূষণের অসহযোগিতা এবং অনেক বছর ধরে চলা যৌন হেনস্থায় মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে বছরের পর বছর সাক্ষী, বিনেশরা কীভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জিতে দেশের সম্মান বাড়িয়েছেন!

যে খেলা দেশকে গৌরব এনে দেয় সেই খেলায় দেশের সেরা মেয়েদের নিয়ে সরকারের এত অবজ্ঞা দেখে মনে হয় দেশের মানুষকে কি তারা আদৌ ভালবাসে? নাকি কেবল ভোটের ঘুঁটি ভাবে? তাঁদের মন নেই। ন্যায়বিচার, যৌন হেনস্থা৷ যৌন নির্যাতনের প্রতিকারের ইচ্ছা, সোনাজয়ীদের সম্মান- কিছুরই মূল্য নেই। মন জুড়ে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভোটের হিসাব আছে। মোদি এবং তাঁর সরকার বড়ই প্রাণহীন ও নির্মম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে মহিলা কুস্তিগীরদের যৌন হয়রানির অভিযোগ- এ অভিযোগ নয়, বাস্তব ঘটনা। এ ঘটনায় লেখক ব্যাথিত, লেখার ছত্রে ছত্রে প্রতিবাদ ও প্রতিবেদন যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। লেখকের সাথে আমিও সহমত পোষণ করি। প্রকৃতপক্ষে দোষী ব্যাক্তির শাস্তি হোক, কুস্তিগীররা ন্যায় বিচার পাক।

আপনার মতামত...