প্রসঙ্গ, প্রাইড মান্থ

জয়দীপ জানা

 


ভিজ়িবিলিটির সত্যিই বড় প্রয়োজন। নাহলে কেন্দ্রীয় সরকার ম্যারেজ ইক‍্যুয়ালিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলতেন না এসব সমাজের উচ্চবর্গীয় তথা অভিজাত মানুষদের বিলাসিতা। শুরুতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা পরিবর্তনের জন্য যখন আলোচনা শুরু হয়েছিল তখনও তৎকালীন সরকার আদালতে জানিয়েছিলেন এদেশে সমকামী মানুষজন নেই। বিচারপতিরা কিন্তু তখন কলকাতায় প্রাইড ওয়াকের দৃষ্টান্তেই দেশে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন

 

রামধনু চাকতি বনবন করে ঘোরালে যেমন একটাই রং দেখা যায়, তেমন রামধনুর মতো হরেকরকম যৌনরুচি-লিঙ্গরুচি থাকলেও কুইয়ার (কিংবা LGBTIQH) মানুষ কিন্তু মানুষই।  সুতরাং সারা পৃথিবী জুড়ে মানবাধিকার বলতে যা বোঝায় তাতে কুইয়ার সম্প্রদায়েরও একই অধিকার। তাই না?

তাহলে শুধুমাত্র কুইয়ার বলে, আমাদের orientation জনে জনে বলে বেড়াবার দরকার কী? দরকারটা পড়ে কেন? কেন সমাজের নিয়মের একটু বাইরে বলে আমাদের বেডরুমে ঢুকে পড়তে দ্বিধা হয় না মানুষের? আমরা কাদের ভালবাসতে চাই, সেটা সমাজের সিদ্ধান্ত কেন?

অনেকেই বলেন হয়তো— আমার sexual orientation-টা তো আমার পরিচয় নয়, আমার শিক্ষা, কাজ, সংস্কৃতিবোধ সব মিলিয়ে তো আমি একটা পুরো মানুষ। কখনও কোনও স্ট্রেট (বিষমকামী) মানুষকে দেখেছেন নিজের যৌন প্রবণতা নিয়ে এত খোলাখুলি কথা বলতে? চিৎকার করে জাহির করতে?

তাহলে আমাদের কেন এই ঢাক বাজিয়ে চিৎকার করতে হয়?

ভেবে দেখুন তো, “coming-out” কাকে/কাদের করতে হয় এবং কেন করতে হয়? “coming-out” করতে হয় একজন সমকামী, উভকামী, ট্রান্সজেন্ডার মানুষকে; কোনও বিষমকামী, cisgender মানুষকে নয়! কিন্তু কেন? আজও আমার যৌন প্রবণতাকে এবং আমার অসংখ্য ট্রান্স বন্ধুর স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া লিঙ্গ পরিচিতিকে “স্বাভাবিক” বলে স্বীকার করা হয় না, তথাকথিত মূলস্রোতের ওই যে heteronormativity তার বিপ্রতীপে রাখা হয়। কারণ heteronormativity এতটাই normalized যে তার শুধু “বনাম” (versus) হয়, আর বনামে যা কিছু, তা সবসময়ই ‘অস্বাভাবিক’। আর সে জন্যই গে, হোমো, লেসবি এই শব্দগুলোকে নোংরা শব্দ বা গালাগালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, “straight” শব্দটাকে নয় কিন্তু।

মনে রাখা দরকার, আমাকে আর আমার বন্ধুদের নিজেদের sexual orientation আর gender identity-র জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা লড়তে হয়েছে, আজও সম্পর্কের স্বীকৃতি ও সমানাধিকারের দাবিতে লড়তে হচ্ছে— কোনও বিষমকামী, cisgender মানুষকে যা কখনওই করতে হয়নি।

তবুও নানা সময়ে, নানা মুনি, নানারকম মত দিয়ে থাকেন এই বিবিধের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। কখনও রাষ্ট্র, কখনও সমাজ, কখনও ধর্ম নিজের নিজের মতামত চাপিয়ে দেয়। এমনকি, আমাদের LGBTIQH সম্প্রদায়েরও কেউ কেউ পিছিয়ে থাকেন না নিজেদের মত সবার ওপর চাপিয়ে দিতে।

যেমন দিনকয়েক আগে, জুন মাসের শুরুতেই একজন প্রথিতযশা ট্রান্সজেন্ডার মানুষ তাঁর দেওয়ালে পোস্ট করেছেন— “শুরু হল ট্রান্সজেন্ডার মাস! এই গোটা জুন মাস ট্রান্সজেন্ডার প্রাইড মান্থ পুরো পৃথিবী জুড়ে!” LGBT প্রাইড মান্থকে অবলীলাক্রমে তিনি ট্রান্সজেন্ডার প্রাইড বলে অভিহিত করলেন বাকি মানুষের বাকি পরিচয়গুলোকে নস্যাৎ করে। অবাক নই এতটুকু। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি এভাবেই শুরু হয়…

 

ইতিহাসের কথাই  যখন উঠল, তখন একটু পেছন ফিরে দেখা যাক…

ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। তখন আমেরিকা জুড়ে চলছে মানুষের অধিকারের পক্ষে নানা লড়াই। আকাশে-বাতাসে সংগ্রামের শপথ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদিকে সরকারের তরফে চলেছে বিভিন্ন শ্রেণিকে আন-অ্যামেরিকান বা দেশবিরোধী দাগিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। কম‍্যুনিস্ট থেকে হোমোসেক্সুয়ালস— কে নেই সেই লিস্টে? রাষ্ট্র ও সমাজের বেঁধে দেওয়া সংলাপের বাইরে একটু বেচাল করলেই মানুষ দেশদ্রোহী, সন্দেহভাজন। নাম উঠে যাচ্ছে সরকারের খাতায়, নজরবন্দি হয়ে পড়ছেন  অনেকেই, এমনকি ব্যক্তিগত  চিঠিপত্রও বাদ যাচ্ছিল না সেসময় সরকারি খবরদারির আওতা থেকে।

এরই মধ্যে সমকামী রূপান্তরকামী লিঙ্গান্তরকামী পুরুষ ও মহিলা তথা যৌনকর্মীরা, মানে সমাজের চোখে বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো মানুষজন নিউ ইয়র্কের গ্রিনিচপল্লীর স্টোনওয়াল্ ইন্ নামের এক পানশালা তথা নিশিরালয়ে নিয়মিত জমায়েত হতেন। এবং পুলিশও সেখানে মাঝেমাঝেই হানা দিত। ১৯৬৯ সালে ২৭ জুন এমনই এক জমায়েতে সন্ধেবেলা এখানে হানা দিল নিউ ইয়র্ক পুলিশ— এনওয়াইপিডি। যদিও পুলিশের তাড়া খাওয়া এই সব বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানোদের কাছে নতুন কিছু ছিল না, কিন্তু সেদিন রুখে দাঁড়াল এরা। রুখে দাঁড়াল শুধু নিউ ইয়র্ক পুলিশের বিরূদ্ধে নয়, রুখে দাঁড়াল দশকের পর দশক ধরে চলে আসা অপমান আর বঞ্চনার বিরূদ্ধে। জ্বলে উঠল আগুন। পরের দিন সকাল পর্যন্ত চলল তা।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল সে বিদ্রোহ। তাদের সঙ্গে যোগ দিল অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপরাও।

পরের বছর ২৮ জুন তারিখে সূচনা হল এক নতুন অধ্যায়ের। বিশ্বের প্রথম প্রাইড্ মার্চ— গৌরব যাত্রা হাঁটল নিউ ইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, সান ফ্রানসিসকো আর শিকাগোর রাস্তায়।

ইতিহাসে লেখা হল সমকামী-রূপান্তরকামীদের আন্দোলনের প্রথম ইতিহাস— স্টোনওয়াল মুভমেন্ট।

এই কথা মাথায় রেখে ১৯৯৯ সালে কলকাতার বুকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিলিত হওয়া কয়েকজন মানুষ প্রথম বার বন্ধুত্বের পদযাত্রা (ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক) শুরু করেছিল। তার ধারাবাহিকতায় কলকাতা শহরে প্রথম রামধনু পদযাত্রা শুরু হয়েছিল তার চার বছর পরে। তখনই ঠিক হয়েছিল জুন মাসের শেষ রবিবার প্রতি বছর এ পদযাত্রা করা হবে। জুন মাস প্রাইড মাস, লড়াই আন্দোলনের ইতিহাস। ও দেশে এখন গরম। কিন্তু আমাদের এখানে বর্ষা। আর আমাদের আজকালকার কমিউনিটির মানুষজন বর্ষায় ভিজে আন্দোলন করবেন এসব ভাবা আজ বাতুলতা। তাই আজকালকার উদ্যোক্তাদের শীতের কলকাতায় কমিউনিটির ভিজ়িবিলিটি বাড়ানোর ভাবনায় কলকাতায় প্রাইড ওয়াক হয় শীতকালে। তবে শুধু কলকাতা নয়, ভারতবর্ষের সব রাজ্যেই সারা বছর ধরেই ভিজ়িবিলিটির লক্ষ্যে আজকাল রামধনু পদযাত্রা শুরু হয়েছে।

 

ভিজ়িবিলিটির সত্যিই বড় প্রয়োজন। নাহলে কেন্দ্রীয় সরকার ম্যারেজ ইক‍্যুয়ালিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলতেন না এসব সমাজের উচ্চবর্গীয় তথা অভিজাত মানুষদের বিলাসিতা। শুরুতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা পরিবর্তনের জন্য যখন আলোচনা শুরু হয়েছিল তখনও তৎকালীন সরকার আদালতে জানিয়েছিলেন এদেশে সমকামী মানুষজন নেই। বিচারপতিরা কিন্তু তখন কলকাতায় প্রাইড ওয়াকের দৃষ্টান্তেই দেশে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ভিজ়িবিলিটির এই হল মাহাত্ম্য।

আমরা অদৃশ্য নই। অবজ্ঞায়, অবহেলায়, লজ্জায় আমাদের “নেই” করে দেওয়ার সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আমাদের একমাত্র হাতিয়ার সেই ভিজ়িবিলিটির জন্যেই আজও আমাদের orientation নিয়ে ঢাক বাজিয়ে চিৎকারটা করতেই হয়…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...