গদর: নীরব হল আগুনপাখির গান

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 


গদর ও জননাট্যমণ্ডলীর সাফল্যের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল এক বৈপ্লবিক মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ যতদিন জীবন্ত থাকবে ততদিন বিপ্লবী গণসংস্কৃতি বেঁচে থাকবে। গদর একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে আমি এক স্বাধীন দেশে জন্মেছি কিন্তু সত্তর বছর পর্যন্ত স্বাধীনতা কী বুঝলাম না। এই স্বাধীনতার আকাঙ্খা, এক শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন যতদিন বেঁচে থাকবে গদররা কিন্ত জন্মাতেই থাকবেন

 

সাতাত্তর বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বিপ্লবী গণশিল্পী গদর, পুরো নাম গুমাড্ডি ভিট্টল রাও। ভারতবর্ষে বিপ্লবী বামপন্থী সংস্কৃতির অন্যতম অগ্রদূত তথা প্রতিবাদী চেতনার মূর্ত প্রতীক গদর ছিলেন একজন আদ্যন্ত রাজনৈতিক শিল্পী যিনি বিশ্বাস করতেন শ্রেণি ও মতাদর্শ-নিরপেক্ষ সংস্কৃতিচর্চা নেহাৎই কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো বিষয়। আত্মরতিসর্বস্ব ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ স্লোগানে বিশ্বাসী সংস্কৃতিচর্চার পুরোহিততন্ত্রে বা ভদ্র-পরিশীলিত-মধ্যবিত্ত প্রগতিবাদী নিরাপদ সংস্কৃতি যাপনে নিজেকে নিয়োজিত করার বিপ্রতীপে গদর নিজেই ছিলেন একটা ‘আস্ত গান’ যা কোনওরকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-ভণিতা না রেখেই শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নেয়। সেই কারণে শ্রেণি-রাজনীতিকে বাদ দিয়ে, অন্ধ্রপ্রদেশের গৌরবময় কমিউনিস্ট বিপ্লবী আন্দোলনের কথকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বা জননাট্যমণ্ডলীর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থেকে পৃথক করে বা তেলেঙ্গানার মাটি ও মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা থেকে বিযুক্ত করে এই আগুনপাখির মূল্যায়ন সম্ভব নয়। গদর ছিলেন জনযুদ্ধের সন্তান এবং একই সঙ্গে একথাও ঠিক যে শেষজীবনে এসে সেই বিপ্লবী মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্ক তিনি ছিন্ন করেছিলেন। নিজেকে আম্বেদকরপন্থী ঘোষণা করে পৃথক রাজনৈতিক দল তৈরি করার পরিকল্পনাও তাঁর ছিল। বিপ্লবী বামপন্থী আন্দোলনে এ ঘটনা নতুন নয়। শেষ পর্বে তাঁর এই পরিবর্তন সত্ত্বেও একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে জনগনের স্বার্থবিরোধী কোনও কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত হননি।

গদর আমাদের দেখিয়েছেন গান শুধু কথা ও সুরের যুগলবন্দিতে গড়ে ওঠা এক নান্দনিক অভিযাত্রা নয়। গান হয়ে উঠতে পারে বিদ্রোহের প্রতীক, গানের কথা স্থিতাবস্থা ও বিদ্যমান অসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করে দিন বদলের নতুন ইস্তেহার লিখতে পারে। সেই ইস্তেহারের আগ্নেয় আখরকে রাষ্ট্র ভয় পায়, খাঁচাবন্দি করতে চায় সেই জ্বলন্ত প্রতিস্পর্ধাকে। ছোটবেলায় খুব কাছ থেকে দেখা অস্পৃশ্যতা, দিনমজুরির অভিজ্ঞতা, জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকা বিপ্লবী জীবন, বারংবার জেলবন্দি হওয়া, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ডালকুত্তাদের গুলিতে প্রাণ সংশয় হওয়া— গদর খুব কাছ থেকে জীবন ও মৃত্যুকে দেখেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শরীরে বয়ে নিয়ে চলেছেন আততায়ীর বুলেট। গদরের জীবনটাই যেন এক রূপকথা যার কেন্দ্রে রয়েছে দরিদ্র, অবহেলিত, নিরন্ন, শোষিত মানুষ, তাদের হাসি-কান্না, রাগ-অভিমান, সর্বোপরি পাল্টে দেওয়ার অপাপবিদ্ধ স্বপ্ন। গুমাড্ডি ভিট্টল রাও থেকে গদর হয়ে ওঠা এক সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। উর্দু শব্দ ‘গদর’-এর অর্থ বিপ্লব, ঔপনিবেশিক আমলে দেশকে স্বাধীন করতে পাঞ্জাবের বিপ্লবীরা গড়ে তুলেছিলেন গদর পার্টি। অবশ্য উচ্চারণ বিভ্রাটের কারণে ‘গদ্দর’ নামেই তাঁর বেশি পরিচিতি।

 

১৯৪৮ সালে হায়াদ্রাবাদের সন্নিকটে মেডক জেলার টোপারান গ্রামে তার জন্ম। বাবা শেষাইয়া ও মা লাচ্ছুমাম্মা ছিলেন পেশায় মজুর। হায়াদ্রাবাদের এক জুনিয়র কলেজ থেকে পিইউসি (এখনকার দ্বাদশ শ্রেণি) পাশ করার পর গদর ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন, কিন্তু উপার্জনের প্রয়োজনে এক বছর পরে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। ১৯৬৯ সালে পৃথক তেলেঙ্গানার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে তিনি তাতে যোগ দেন। এরপর শুরু হয় তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। ‘মহাত্মা বুরাকথা’ (লোকশিল্প) নামে এক ট্রুপের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। তাদের কাজ ছিল তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে পরিবার পরিকল্পনা সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের প্রচার করা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। গদর এরপর দিনমজুরিতে কিছুদিন এক রাসায়ানিক কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা তাকে কোথাও থিতু হতে দেয়নি। গদর এরপর আর্ট লাভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংস্পর্শে আসেন এবং এখান থেকেই তাঁর বিপ্লবী শিল্পী হওয়ার যাত্রা শুরু হয়। এই অ্যাসোসিয়েশনই পরে জননাট্যমণ্ডলীতে রূপান্তরিত হবে।

আর্টস লাভার্স অ্যাসোসিয়েশনে সভাপতি ছিলেন চিত্র পরিচালক বি নরসিমা রেড্ডি যাঁর মাভূমি সহ দুটি ছবিতে গদর অভিনয় করেছিলেন। গদর ও জননাট্যমণ্ডলী আদতে এক অভিন্ন সত্তা যা বৃহত্তর অর্থে সমকালীন পৃথিবীর বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিভূ। গদরের মধ্যে গণসংস্কৃতি ও বিপ্লবী রাজনীতির মিল ঘটেছিল। তবে গদর ও জননাট্যমণ্ডলী শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। চল্লিশের দশক থেকে কমিউনিস্ট মতাদর্শ অন্ধ্রপ্রদেশে প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতির পথ প্রস্তুত করে। ১৯৪৩ সালে প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন (তেলেগু ভাষায় আরাসাম) তৈরি হয় আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ময়দান থেকে। শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচারের জন্য তৈরি হয় প্রজা নাট্যমণ্ডলী। এই সব সংগঠনের মধ্যে দিয়ে নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যে থেকে বহু লেখক, শিল্পী ও কবি উঠে আসেন। এঁদের উপস্থিতি এতদিনের রক্ষণশীল ও মধ্যবিত্ত মানসিকতা জারিত সংস্কৃতিচর্চার এক গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। তারপর আসে নকশালবাড়ি আন্দোলন যা সংসদীয় বাম রাজনীতির প্রচলিত ধারাকে প্রত্যাখ্যান করে সশস্ত্র পথে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আহ্বান জানায়। সেই রাজনীতির প্রভাবে তৈরি হয় রেভেলিউশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন (তেলেগু ভাষায় বিরসাম)। এই কথাগুলো বারবার উল্লেখ করা প্রয়োজন কারণ বিপ্লবী রাজনীতি এখানে নতুন যুগের সংস্কৃতিচর্চার দিশানির্দেশক। নকশালবাড়ি আন্দোলনের আপাত ব্যর্থতার পর বিপ্লবী আন্দোলনের পুনর্গঠনের জন্য তৈরি হল সিপিআই(এম-এল) (পিপলস ওয়ার)। এই রাজনৈতিক দিশাই জননাট্যমণ্ডলীর জন্ম দেয়।

গদর ও জননাট্যমণ্ডলীর সদস্যদের কাছে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল জনগণের মধ্যে বিপ্লবী মতাদর্শ প্রচারের জন্য উপযুক্ত ‘ফর্ম’ তৈরি করা। গদর মৌখিক ও লিখিত সংস্কৃতির মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপন করেন। এতদিন পর্যন্ত প্রগতিবাদী সাহিত্য (গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ) ছিল মুদ্রিত অক্ষর-নির্ভর যা নিরক্ষর শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে আলোকবর্ষ দূরে। জননাট্যমণ্ডলী গান ও লোকনৃত্যের মাধ্যমে এমন এক শৈল্পিক ফর্ম তৈরি করে যা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এখানে গদর যেমন লোকায়ত ফর্মগুলোকে আত্মস্থ করেন তেমনি সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তনও করেন। গদরের এই উদ্যোগকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পি কেশবকুমার মন্তব্য করেছেন:

The genre, the form, the context, the tune and the musical instruments, all have got totally revolutionised under the cultural performance of Gaddar and have been used for a revolutionary cause.

জননাট্যমণ্ডলী একাধিক লোকায়ত আর্ট ফর্ম ব্যবহার করে তাদের বক্তব্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। প্রথমে ‘বুরাকথা’ দিয়ে শুরু হলেও পরে যুক্ত হয়েছে ওগু কথা, ভিডি ভাগোথাম (গান, সংলাপ ও নাচের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ব্যালাড) এবং ইয়েলাম্মা কথা (স্থানীয় দেবতাদের উপকথা)। গদর এক সাক্ষাৎকারে জননাট্যমণ্ডলীর শিল্পীদের পোশাক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

আমরা প্রথমে লুঙ্গি পরে গান গাইতাম কিন্তু যখন লক্ষ করলাম দর্শকদের মধ্যে একটা বড় অংশ মহিলা, তখন গোচি (ধুতি) পরতাম। গায়ে থাকত গোঙ্গালি (খর উলের তৈরি একধরনের কম্বল)। আর জঙ্গলে থাকার সময়ে পায়ে অ্যাঙ্কেলেট এবং কাঁধে লোডেড বন্দুক। প্রকাশ্যে আসার পর বন্দুকের জায়গা নেয় লাঠি।

এই গোটা চিত্রটা দর্শকদের জন্য এমন এক মনোমুগ্ধকর উদ্দীপনা তৈরি করত যাতে জননাট্যমণ্ডলীর অনুষ্ঠানে তিলধারণের জায়গা থাকত না।

গদর ও জননাট্যমণ্ডলীর সামনে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ। নিখাদ রাজনৈতিক ভাষাবন্ধ ব্যবহার করে সে কাজটা সম্ভব ছিল না, প্রয়োজন ছিল এমন এক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংবেদ তৈরি করা যা নিপীড়িত জনগণের তন্ত্রীতে ঘা মারবে। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তুর মধ্যে দুটি উপাদান (content) গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমটি হল এই অসম ব্যবস্থার উন্মোচন, দ্বিতীয়টি হল মার্কস-লেনিন-মাও সেতুং-এর ভাবনায় ও নকশালবাড়ির পথে জনগণকে উদীপ্ত করা। আশি সালের সেই ঝোড়ো দশকে অন্ধ্রপ্রদেশে পিপলস ওয়ারের বিস্তার ও জননাট্যমণ্ডলীর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুব্বারাও পানিগ্রাহী, চেরবান্দা রাজু, নজরের ধারাবাহিকতায় গদরের উত্থান। সেই কারণে জননাট্যমণ্ডলীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘শ্রমিকশ্রেণি’, ‘নয়া গণতন্ত্র’, ‘শ্রেণিহীন সমাজ’, ‘পুঁজিপতিশ্রেণি’-র মতো রাজনৈতিক শব্দগুলো অনায়াসে ব্যবহার করা হত। এই মণ্ডলীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল লোককথার বিপ্লবী রাজনীতিকরণ। গদরের গানে তাই বারবার উঠে এসেছে কৃষক ও ভূমিহীন কৃষি মজুরের (রায়তু কুলি) কথা।

এক্ষেত্রে দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। গদরের অতি জনপ্রিয় গান ‘ভারতদেশ ভাগ্যসীমারা’র বিষয়বস্তু ছিল ভারতের মতো সম্পদশালী দেশের কেন এত দারিদ্র্য? গানের মধ্যে গদর নিজেই তুলে ধরতেন এর কারণ এক তীব্র বৈষম্যের সমাজ। কিন্তু শোষণের বারোমাস্যাকে বিবৃত করে গদর থেমে থাকেননি। বরং বুনে দিয়েছেন প্রতিরোধের বার্তা। ‘ওরু মানদিরা’ গানে গদর বলছেন একদিন এই গ্রাম, শহর, জনপদ, কলকারখানা আমাদের হবে কারণ আমরাই এর সৃষ্টিকর্তা। জনগণের মধ্যে থেকে শেখার যে রাজনৈতিক লাইন পিপলস ওয়ার নিয়েছিল তার সফল প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই গদরের গানে:

আগুন এ যে আগুন
খালি পেটের আগুন
এ যে অশ্রুজলের অঙ্গার
এ যে দুখীজনের হাহাকার
দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে এ যে
দিক থেকে দিকে ছুটছে যে

(অনুবাদ: কাঞ্চনকুমার)

 

আমাদের দেশের প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটা বড় আক্ষেপ হল রাষ্ট্রের সহযোগিতার অভাবে ও কর্পোরেট প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁদের সৃষ্টি বৃহত্তর জনগণের কাছে পৌঁছতে পারে না। গদর ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করেছিলেন। জননাট্যমণ্ডলী প্রায় ৩,০০০ গান সৃষ্টি করে। ১৯৮০ সালের হিসাব অনুযায়ী জননাট্যের গানের বই সাড়ে চার লাখ বিক্রি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বিক্রি হয়েছে জননাট্যমণ্ডলীর গানের ক্যাসেট। পরবর্তীতে তাদের বহু গান হিন্দি, মারাঠি, গুজরাটি, কন্নড়, উড়িয়া, তামিল ও অন্যান্য আদিবাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আসলে গদর তথা জননাট্যমণ্ডলীর পরিবেশনার মধ্যে এমন এক বিপ্লবী উদ্দীপনা ছিল যে ভাষাগত দুর্বোধ্যতা সত্ত্বেও শ্রোতার হৃদয়কে স্পর্শ করত। শহিদ মিনারের ময়দানে নকশালপন্থীদের সমর্থনে, অল ইন্ডিয়া লিগ অব রেভেলিউশনারি কালচারের কলকাতা সম্মেলনে এবং শেষবার কলকাতার মেট্রোচ্যানেলে অপারেশন গ্রিনহান্ট-বিরোধী সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গদরের গান শুনতে গিয়ে দেখেছি কীভাবে শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যেকার দূরত্ব ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় এক জনজোয়ার। মূল ধারার বিনোদনশিল্প গদরকে নিয়ে, তাঁর গান নিয়ে, জননাট্যমণ্ডলীকে নিয়ে কোনও আলোচনা করতে চায়নি। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের সিনেমায় গদর ও জননাট্যমণ্ডলীর প্রভাব অনস্বীকার্য। এমনকি বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজারের সিনেমা ‘হু-তু-তু’-তে দলিত চারণকবি হিসাবে যে চরিত্রটি উঠে আসে (অভিনয়ে নানা পাটেকর), তার অনুপ্রেরণা স্পষ্টত গদর। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কাঞ্চা ইলাইয়া তাই মন্তব্য করেছেন:

Gadar was the first Telangana intellectual who established a link between the productive masses and the literary text and of course, that text established a link between the masses and educational institutions.

 

এবার আমরা গদরের ব্যক্তিজীবনের দিকে চোখ ফেরাতে পারি। জননাট্যমণ্ডলীর সদস্য হিসাবে গদরের বৈপ্লবিক ভূমিকা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৯৮৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশম জেলার করমচেদু গ্রামে উচ্চবর্ণের জমিদারদের দ্বারা একাধিক দলিত হত্যার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব হিসাবে। পুলিশ গদরের বাড়িতে সার্চ অপারেশন চালালে তিনি আত্মগোপন করেন। শুরু হয় গদরের বিপ্লবী জীবন। অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ওডিশার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তিনি গানের মাধ্যমে বিপ্লবের বার্তা বয়ে নিয়ে যান। ততদিনে পিপলস ওয়ারের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে জননাট্যমণ্ডলীকে রাষ্ট্র চিহ্নিত করে দিয়েছে। সাড়ে চার বছর আত্মগোপন করে গদর আবার জনজীবনে আত্মপ্রকাশ করেন যখন অন্ধ্রপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী চেন্না রেড্ডি নকশালদের জন্য তুলনামূলক নরম নীতি নেন। আত্মপ্রকাশের কয়েকদিন পর জননাট্যমণ্ডলীর ১৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে হায়াদ্রাবাদের নিজাম প্যালেস গ্রাউন্ডে দুই লাখ মানুষের উপস্থিতিতে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় যা আজ লোককথায় পরিণত। এরপর থেকে গদর একদিকে যেমন তাঁর সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধাদের নিয়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন, তেমনি অন্ধ্রপ্রদেশে নকশালপন্থীদের উপর নামিয়ে আনা একের পর এক ভুয়ো সংঘর্ষে হত্যার বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন। গদর বারবার বলেন নকশালদের ইস্যুগুলি আর্থ-সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে তার মোকাবিলা সম্ভব নয়। ১৯৯৭ সালের ৬ এপ্রিল গদরের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে গুলি করে আততায়ীরা। চারটে গুলির মধ্যে তিনটি অস্ত্রোপচার করে বার করা সম্ভব হলেও চতুর্থ গুলিটি তাঁর শরীরে থেকে যায়। পরবর্তীকালে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই আততায়ীদের পেছনে রাষ্ট্রের মদত ছিল স্পষ্ট। এই ঘটনার পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। গদর নিজে মনে করতেন এই আক্রমণ কুখ্যাত গ্রেহাউন্ড বাহিনির কাজ। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের আন্দোলনে যোগ দেন। ২০১৮ সালে তিনি সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তেলেঙ্গানা ঘিরে তাঁর স্বপ্ন দুর্বল হতে শুরু করে। বিপ্লবী গণশিল্পী গদর তখন পথভ্রষ্ট। আম্বেদকরপন্থী রাজনীতিবিদ ডঃ একে পালের সঙ্গে যুক্ত হন, এমনকি কংগ্রেসের এক সভাতেও তাঁকে দেখা যায়। এইবার অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি নিজেই গদর প্রজা পার্টি বলে এক রাজনৈতিক দল তৈরির কথা ঘোষণা করেন, যদিও মৃত্যু সেই সম্ভাবনাতেও ইতি টেনে দিল।

 

এখন প্রশ্ন হল গদর আমাদের স্মৃতিতে কীভাবে থেকে যাবেন? গদরের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা মনে রাখব একজন বিপ্লবী গণশিল্পী হিসাবে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা, মনে রাখব গানকে আয়ুধ হিসাবে ব্যবহার করে শ্রমজীবী জনতার কাছে দিনবদলের স্বপ্নকে পৌঁছে দেওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কথা, মনে রাখব জননাট্যমণ্ডলীকে এক বিপ্লবী সাংস্কৃতিক সংগঠনে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদায়ী ভূমিকার কথা। কিন্তু একই সঙ্গে ভুলে যাব না তার বিচ্যুতির কথা, আজীবন কমিউনিস্ট থাকতে না পারার ব্যর্থতার কথা। কিন্তু এই দ্বান্দ্বিকতার বাইরেও একটা সত্য থেকে যায় যা নিয়ে অনেকেই সচেতনভাবে আলেচনা করতে চান না। গদর ও জননাট্যমণ্ডলীর সাফল্যের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল এক বৈপ্লবিক মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ যতদিন জীবন্ত থাকবে ততদিন বিপ্লবী গণসংস্কৃতি বেঁচে থাকবে। গদর নিজে বিপ্লবী সংস্কৃতির বন্ধুর পথের যাত্রী না থাকলেও তাতে সেই যাত্রার সমাপ্তি ঘটেনি। কোনও ব্যক্তিমানুষের সরে যাওয়া বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বা নিষিদ্ধ করার হুকুমনামা দিয়ে সেই জোয়ারকে রোখা যায় না। ঝাড়খণ্ডের জিতেন মারান্ডি, তামিলনাড়ুর কোভান বা মহারাষ্ট্রের কবীর কলা মঞ্চের তরুণ সদস্যরা এবং আরও অনেক নাম না জানা শিল্পীরা গদরের ফেলে যাওয়া ব্যাটন হাতে তুলে নিয়েছেন। গদর একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে আমি এক স্বাধীন দেশে জন্মেছি কিন্তু সত্তর বছর পর্যন্ত স্বাধীনতা কী বুঝলাম না। এই স্বাধীনতার আকাঙ্খা, এক শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন যতদিন বেঁচে থাকবে গদররা কিন্ত জন্মাতেই থাকবেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...