মিলান কুন্দেরার উপন্যাস— বিস্মরণের বিরুদ্ধে শেষ ব্যারিকেড

সর্বজিৎ সরকার

 


কুন্দেরা বলেছিলেন— আমরা সবাই‌, যারা ইতিহাস হারানো, বিস্মরণের এই দুনিয়াটায় ঢুকে পড়েছি, তারা সকলেই আসলে এক একটা “আর্চ নভেল” লেখার কথা ভাবছি। যে নভেলে আমাদের বারোক ঐতিহ্য, আমাদের স্বপ্ন আর কল্পনা, আমাদের যৌথ স্মৃতির ভাণ্ডার, আমাদের উপকথা আর হারিয়ে যেতে থাকা ইতিহাস, পুনরুজ্জীবিত হতে পারে

 

ধরা যাক, বহুদূরে কোথাও, কোনও রাতের অন্ধকারে একা বসে, নিঃসঙ্গ একটি লোক, কি যেন কী লিখে চলেছে।

লোকটি কে?

নির্বাসিতের কি কোনও নাম হয়? মানুষটা উদ্বাস্তু। নির্বাসিত। নিজের দেশ, নিজের ঘর, নিজের আপনজনদের, ছেড়ে আসতে হয়েছে তাকে। বস্তুত, পালিয়েই আসতে হয়েছে একরকম। নিজের যে দেশ সে ছেড়ে এসেছে বাধ্য হয়ে, সেই দেশে সে অনাহুত, ব্রাত্য, উৎপাটিত। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সবরকমভাবেই। নিজের যে দেশ সে ছেড়ে এসেছে, সেই দেশটাকেও একসময় চিনতে পারছিল না সে। তার মনে হয়েছিল, টোটালিটেরিয়ান (সর্বগ্রাসী), স্বৈরাচারী, নিয়ন্ত্রক, এই সমাজব্যবস্থাটা, আসলে বিরাট একটা “ঠাট্টা”।

এই নামে একটা উপন্যাসও লিখেছিল সে। তার ফলশ্রুতিতে অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হতে হল তাকে। পার্টি থেকেও উৎখাত হতে হল। বইটা নিষিদ্ধ হল তার নিজের দেশে। ১৯৭৫-এ একদিন নিজের দেশও ছাড়তে হল তাকে, পলাতকের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিয়ে।

যে দেশে সে আস্তানা বানাল, সে দেশের ভাষা তার অপরিচিত। সেখানকার মানুষজন, তাদের আচার আচরণ, চালচলন, সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যবহারবিধি, সবই নতুন করে শিখতে হবে তাকে। সহজ কাজ তো নয়!

যৌবনে, নিজের দেশে থাকতে ভেবেছিলেন মিউজিশিয়ান হবেন। পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন। সেই লেখাই কাল হল তাঁর নিজের দেশে। সোভিয়েত একনায়কতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা মনে করলেন, এই লোকটা বিপজ্জনক।

দেশ ছাড়লেন ঠিকই। কিন্তু উপন্যাসকেই বেছে নিলেন তাঁর প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে।

লোকটা কে? সারা দুনিয়া তাকে চেনে মিলান কুন্দেরা নামে।

 

কিন্তু সেটা তো তাঁর ব্যবহারিক পরিচয় মাত্র। আসল পরিচয়টা কী?

আর ঠিক এই প্রস্থানভূমি থেকেই তাঁর সারাজীবনের কাজের মৌলিক প্রশ্নটা উঠে আসতে থাকে একের পর এক উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। আত্মজীবনী নয়। আত্মপরিচয়। নিজের অস্তিত্বের মধ্যে দিয়ে দেশ, কাল, সমাজ, ইতিহাস, তথাকথিত সভ্যতার বিবর্তন, দর্শন, ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সমীকরণগুলি, সবদিকেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

কেন তোলেন?

তোলেন, কেননা তিনি হুসার্ল ও হাইডেগার-এর মতো করেই চিনতে পারেন যে আধুনিক সভ্যতা, (যেটাকে দেকার্ত মনে করেছিলেন, মানুষ শুধুমাত্র তার প্রযুক্তিগত আবিষ্কার আর একরৈখিক জ্ঞান লাভের মধ্যে দিয়েই নিজেকে জানতে পারবে) শুরুর সময় থেকেই একটা মৌলিক জিজ্ঞাসাকে এড়িয়ে গেছে। হাইদেগারের ভাষায়, “সত্তা’র প্রকৃত রূপ কী, সেই প্রশ্নটাই করতে ভুলে গেছে।” “কে আমি?” এই প্রশ্ন ব্যতিরেকে মানবীয় সভ্যতার বিবর্তন ধরা সম্ভব নয়। “কে আমি”, এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও যেটা জড়িয়ে থাকে সেটা এই যে, ‘কী আমার প্রকৃত স্বরূপ?’

এই বিস্মৃত সত্তার অনুসন্ধানই কুন্দেরার যাবতীয় লেখালেখির মূল আধার।

কিন্তু তিনি তো দার্শনিক নন। তিনি উপন্যাস লেখেন। নির্বাসে থাকা একজন মানুষ তার আত্মপরিচয় খোঁজেন যখন তখন দুটো জিনিস হতে পারে। এক, তিনি নস্টালজিয়ায় ফিরতে চাইবেন। দুই, তিনি তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে বারবার প্রশ্ন এবং প্রতিপ্রশ্ন তুলবেন। কুন্দেরা প্রথম রাস্তাটা পরিহার করেন। কেননা তিনি জানেন, নস্টালজিয়া শেষ পর্যন্ত আমাদের রোমান্টিক আইডিয়াল এর আরেকটা রূপ মাত্র। তাই দিয়ে জীবনের স্বরূপ ও সভ্যতার তথাকথিত অগ্রগতিকে কিছুমাত্র বোঝা যায় না। প্রতিরোধ করাও যায় না। তিনি জানেন যে অগ্রগতি বলে আদৌ কিছু হয় না। হিংসা, হিংস্রতা, বিদ্বেষ, আগ্রাসন, ক্ষমতার প্রচার ও প্রসরণ, সার্ভিলেন্স বা রাষ্ট্রের নজরদারির, যুদ্ধের মহড়া, কোনও কিছুকেই আটকানো যায় না। যাবতীয় আইডিয়ালিজম শেষ অবধি ব্যর্থ হয়ে যায়।

রোমান্টিক ভাবধারার শেষ পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় ‘kitsch’। যাকে বাংলায় বললে দাঁড়ায়, ‘সেন্টিমেন্টাল ন্যাকামি’।

কুন্দেরা দ্বিতীয় রাস্তাটা বেছে নেন।

সেটা কী?

 

এখানে একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক। ঊনবিংশ শতকে উপন্যাসের জঁর শুরু হচ্ছে রাবলে, দিদেরো-র হাত ধরে। “আমি কে” বা সত্তা কী, এটা জানার জন্য তাঁরা লিখে রাখছেন ব্যক্তিমানুষের অ্যাডভেঞ্চারের কথা। কিন্তু সেই অনুসন্ধান মূলত বাইরের বাস্তবের কথা লেখে। সের্ভান্তেস এসে মোড় ঘোরালেন। দেখালেন বাইরের বাস্তবতা আসলে একটা নয়, অনেকগুলো। আর তাদের সর্বসম্মত সত্য বলে কিছু হয় না।

তাহলে কোথায় খুঁজব ব্যক্তিসত্তাকে? কীভাবেই বা বুঝব তার পারিপার্শ্বিককে? অবস্থান নির্ণয়ের মাপকাঠি কী হবে তাহলে?

ফ্লব্যের নিয়ে এলেন মাদাম বোভারিকে। দেখালেন, না, বাইরে জগতে নয়। বাইরের বাস্তবতা যখন দুর্বোধ্য ও দুর্ভেদ্য মনে হয় তখন সত্তাকে খুঁজতে হবে তার মনোজগতের ভেতর। মনে রাখতে হবে পাশাপাশি মনোবিজ্ঞান আবিষ্কার করছে মানুষ। জ্ঞানচর্চার নতুন দিক উন্মোচিত হচ্ছে।

কিন্তু এত সব জ্ঞানের আড়ালে মানুষটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে গেল কোথায়?

উপন্যাসের শুরু মানুষের যে অ্যাডভেঞ্চার থেকে সেই জার্নি যদিও তখনও চালু আছে। শুধু বাইরের থেকে সে মুখ ফিরিয়েছে নিজের ভেতর দিকে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই অনুসন্ধানের ভিত্তিটাই পালটে যাচ্ছিল। মানুষ ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আর তার মারণযজ্ঞ দেখে নিয়েছে। দেখেছে রাষ্ট্র আর তার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলি কীভাবে মানুষকে হয় যন্ত্র, নয়তো পুতুল, না হলে দণ্ডিত করে তুলতে পারে। অথচ তার কার্যকারণ ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে তার কাছে। কাফকার ‘কে’-কে মনে পড়বে আমাদের। ‘কে’ জানে না কোন দণ্ডাজ্ঞার ছায়া বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। জানে না কেনই বা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এটাও সে জানে না কারা তার দণ্ডদাতা। ঠিক আমরা যেভাবে জানতে পারি না, ‘কে’ মানুষটা আসলে কে? কী তার পরিচয়? কী তার অতীত? তার কোনও পুরনো স্মৃতি আছে কি না?

মানুষের স্মৃতি ধ্বংস করা হয় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। সমকালীন পৃথিবীর ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে এই নিয়ন্ত্রণবিধি কায়েম করতে পেরেছে। কুন্দেরা জানেন এই কথা। জানেন যে নির্বাসিতের পৃথিবীতে স্বপ্ন নেই, স্মৃতি নেই, পুরাণকল্প নেই, কল্পনাও নেই। জানেন যে নির্বাসিত মানুষ জানে না কোনটা তার সঠিক পরিচয়। কোনটাই বা তার আসল ঠিকানা। এই আত্মপরিচয়হীন দুনিয়ায়, কোথায় তার মিডিয়ান কন্টেক্সট, সে জানে না। সে জানে না, দুটো সীমানার ঠিক মাঝের জায়গা কোনটা যে স্থানে সে তার ভরকেন্দ্র রাখবে। এ এমন এক দুনিয়া যেখানে জন্মাবধি সে ট্র্যাপড। কে সেই ট্র্যাপ পেতেছে তার জন্যে সেটাও যেমন সে জানে না, তেমনি এটাও জানে না কোথায় তার পরিত্রাণ আছে।

মিলান কুন্দেরা ফাঁদে পড়া আধুনিক মানুষের এই অবস্থানকে, এই দুর্বোধ্য বাস্তবকে শুধু যে চিরে চিরে দেখান তাই নয়, এই তথাকথিত প্রগতির ইতিহাসকে তাঁর উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে এমন এক স্তরে পৌঁছে দেন, যেখানে সেটা এক ভয়ঙ্কর মিথ্যা হয়ে ওঠে। একটা বিরাট ধাপ্পা যেন। যেটাকে তার আপাত সিরিয়াসনেসের বাইরে একটু ঠেলে দিলেই একটা অ্যাবসার্ডিটি, একটা বিধ্বংসী অট্টহাসি হয়ে উঠতে পারে। তার এই নির্মম ঠাট্টা-টাই উপন্যাসের বিবর্তনে তাঁর নিজস্ব সাক্ষর।

উপন্যাসে প্রবলভাবে যৌনতার অনুষঙ্গ নিয়ে আসেন কুন্দেরা। প্রেমের প্রগাঢ় সব মুহূর্ত তৈরি করেই তারপর অবলীলায় সেই উন্মাদনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে নিয়ে আসেন হাস্যকর সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। পড়তে পড়তে আমরা পাঠকরা বুঝি যে আসলে যৌন উত্তেজনা, প্রেম, কামনা, এসব কিছুই তাঁর বিষয় নয়। তাঁর লেখার আসল উদ্দেশ্য এসবের আড়ালে যে মিথ্যা আর প্রবঞ্চনার ইতিহাস কাজ করে চলেছে তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখানো। এ দেখাও এক অর্থে ক্ষমতার সমীকরণের বিনির্মাণ। আর একভাবে খুলে দেখানো যে এই সমস্ত চারুশীল কর্মকাণ্ডের আড়ালেও কীভাবে আত্মগোপন করে থাকে ক্ষমতার লিপ্সা আর অবদমনের জটিল মানচিত্র।

কুন্দেরা, তাঁর বন্ধু, লাতিন আমেরিকান লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেসকে এক চিঠিতে লেখেন, প্রিয় কার্লোস, তুমি আমি, আমরা সবাই‌, যারা ইতিহাস হারানো, বিস্মরণের এই দুনিয়াটায় ঢুকে পড়েছি, তারা সকলেই আসলে এক একটা “আর্চ নভেল” লেখার কথা ভাবছি। যে নভেলে আমাদের বারোক ঐতিহ্য, আমাদের স্বপ্ন আর কল্পনা, আমাদের যৌথ স্মৃতির ভাণ্ডার, আমাদের উপকথা আর হারিয়ে যেতে থাকা ইতিহাস, পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।

মিলান কুন্দেরার উপন্যাসের এই ধারাই, আজকের এই স্মৃতি ধ্বংসের মহোৎসবে, হয়তো আমাদের শেষ ব্যারিকেড হয়ে রয়ে যাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5411 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.