অনুবাদ করতে গিয়ে যা কিছু ভাবি

জয়া চৌধুরী

 


অনুবাদ করার কাজটি আমি শিক্ষানবিশের দৃষ্টি দিয়ে করছি। ছোটবেলা থেকে যে অনুবাদকদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি তাঁদের অনেকেই মূল লেখা থেকে সরে গিয়ে বাঙালি পাঠকের চেনা স্বাদের মধ্যে এনে অনুবাদ করেছেন। তাতে সেটি মূলানুগ না থাকার দোষে দুষ্ট হল, না বহু পাঠকের মনে রয়ে গেছে সে-কারণেই সার্থক, এই দুই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অনুবাদের ভাষা খুঁজে চলেছি নিরন্তর

 

অনুবাদ করতে গেলে সমস্যা হয়? ঠিক কীভাবে অনুবাদ করলে সেটা পাঠকের কাছে ঠিক মনে হয়? শব্দার্থ-অনুবাদ গ্রহণযোগ্য না ভাবার্থ-অনুবাদ? Translation এবং Transliteration এই দুটি শব্দ নিয়ে ইদানীং অনেক ভাবতে হচ্ছে। অভিধান দেখলে দেখি Translation-এর অর্থ to change words into a different language. ধরা যাক স্প্যানিশ ভাষার একটি পদান্বয়ী অব্যয় en. একে ইংরেজিতে বলা হয় in অথবা on. যেমন, La familia come en el comedor juntos. ইংরেজিতে লিখলে বলতে হবে The family eats together at dining room. এখানে en পদান্বয়ী অব্যয়টি কিন্তু অনুবাদে in বা on কোনওটাই হল না। হল কিনা at. কেননা ইংরেজি ভাষার দিক থেকে ভাবলে ওইটি সবচেয়ে সমীচীন শব্দ এইখানে। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে স্প্যানিশ থেকে বাংলা ভাষা বা বিপরীতমুখী অনুবাদ— দুটিই করবার চেষ্টা করার সুবাদে মনে হয়েছে একজন অনুবাদক যখন গদ্য অনুবাদ করছেন, তখন তাকে গন্তব্য ভাষার ব্যাকরণ গুলে খেতে হবে। উৎস ভাষা জানার প্রয়োজনীয়তার কথা তো আমরা সকলেই জানি। কিন্তু গন্তব্য ভাষার প্রয়োজনীয়তা মনে এক মাত্রা হলেও অতিরিক্ত বেশি জানা দরকার। আরও বিস্তারিত ভাববার আগে দেখে নিই Transliteration=এর অর্থটি। সেটি হল the act or process of writing words using a different alphabet. মানে যদি বাংলায় লেখা থাকে, বর্ষা রাজীবের দিকে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। এখানে যদি দৃষ্টির জায়গায় Drishti লেখেন কেউ, সেটা হবে transliteration, যেটার মানে আদতে এই বাক্যের ক্ষেত্রে মোটেই মানাবে না। কোনও অর্থই বহন করবে না। তা বলে কি আমরা অনুবাদে এরকম প্রয়োগ করি না? নিশ্চয় করি।

অনুবাদ করতে গেলে প্রথমে মাথায় রাখি কোন ধরনের পাঠকের জন্য এটি করা হচ্ছে। সাহিত্যটি কোন সময়কালে রচনা হয়েছে সেটা জানা জরুরি। আজ কেউ যদি চর্যাপদ স্প্যানিশে অনুবাদ করেন তাহলে চর্যাপদের সময়কালের বাংলা ভাষার যে অলঙ্কার-প্রবণতা ছিল সেটিকে স্প্যানিশেও বজায় রাখতে হবে। মুশকিল হচ্ছে পাঠক এই সময়ে বাঁচছেন। অর্থাৎ তিনি আনন্দবাজারের সাধুরীতির সম্পাদকীয় মাপের লেখা পড়তে পারলেও দীর্ঘ সময় সে রীতির লেখা পড়তে অধৈর্য হয়ে পড়বেন। যদিও সম্প্রতি ওঁরা চলিত রীতিতে বদলে দিয়েছেন বলে শুনেছি। তারও আবার বিরুদ্ধ মত শোনা যাচ্ছে। সেই সাধু রীতিই নাকি ভাল ছিল। এখন পাঠক নিজে যদি দ্বিধায় থাকেন কী পড়ব আর কেন পড়ব, সেক্ষেত্রে অনুবাদকের একটি দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসতেই হয়। দিনের শেষে তিনি তো মূল সাহিত্যটিকেই গন্তব্য ভাষায় নিয়ে আসতে চাইছেন। স্পেনীয় সাহিত্যের স্বর্ণযুগের প্রথমদিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা ষোড়শ শতকে লেখা প্রথম উপন্যাসিকা Lazarillo de Tormes। এটি অনুবাদ করতে গিয়ে ঠিক এরকম সমস্যায় পড়েছিলাম। সম্পূর্ণ উপন্যাসটি এত আলঙ্কারিক ভাষায় লেখা, বলা যেতে পারে আধুনিক স্প্যানিশের গঠনকাল সেই সময়। অথচ আমার লেখাপড়া সংস্কৃত স্প্যানিশ ভাষায়। অসংস্কৃত না হলেও অলঙ্কার ও বাহুল্যে পূর্ণ একটি লেখাকে কী মন্ত্রে আজকের পাঠকের কাছে নিয়ে আসব তার জন্য আট বছরের ব্যবধানে দুইবার অনুবাদ করেছি।

পাঠক স্প্যানিশ না জানলে একবার চর্যাপদের বাংলার কথা মনে করুন। “ভাব না হোই অভাব ণ জাই। … জা লই অচ্ছম তাহের/ উহ ণ দিস।।” একে আমার মতো আজকের পাঠক এভাবে বুঝে নিই— “ভাব হয় না অভাব হয় না, এমন বস্তুতে কে ভরসা করে? যা নিতে অক্ষম, তা ভাষায় ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায় না।” প্রাচীন বাংলা যে সংস্কৃতের কাছে ছিল অনেক বেশি তার প্রমাণ পাচ্ছি নঞর্থক শব্দ ক্রিয়াপদের আগে লেখা হচ্ছে। আধুনিক বাংলায় আমরা কথ্যরীতি বেশি ব্যবহার করি। সেখানে “আমি ভাত না খাই” বলি না। না ক্রিয়াপদের পরেই বলি। তো এই চর্যাপদের বাংলা থেকে আমার আধুনিক রীতির বাংলাভাষার রূপান্তরে পৌঁছতে আমাদের একজন বঙ্কিমচন্দ্র একজন রবীন্দ্রনাথ একজন বিবেকানন্দের প্রয়োজন হয়েছিল। মুশকিল হল পাঠকের অত ধৈর্য থাকে না। পাঠক অনুবাদকের কাছে এই এতগুলো ধাপের সূক্ষ্মতম বিবর্তিত রূপ দাবি করে। সেটা পারা সম্ভব কি না তার বিচার তো পরে।

 

আমি লাসারোর গল্পটি থেকে সামান্য কয়েক লাইন স্প্যানিশ, ইংরেজি ও বাংলা তিনটি ভাষায় দিলাম। এইখানে দেখা যাবে ইংরেজি ভাষার অনুবাদে সেটি কীভাবে আসছে এবং বাংলা ভাষার অনুবাদে কীভাবে। মূল উপন্যাসটির লেখকের নাম জানা যায় না। যদিও পরবর্তীকালে গবেষকরা আমেন্দোসা নামের এক লেখককে এর রচয়িতা বলে ধরেন, তবুও সে মতটি সবাই গ্রাহ্য করেন না। তাই লেখকের নাম লিখছি না।

Bendito seáis Vós, Señor —quedé yo diciendo—, que dais la enfermedad y ponéis el remedio! ¿Quién encontrara a aquel mi señor que no piense, según el contento de sí lleva, haber anoche bien cenado y dormido en buena cama, y, aunque agora es de mañana, no le cuenten por bien almorzado? ¡Grandes secretos son, Señor, los que Vós hacéis y las gentes ignoran! ¿A quién no engañara aquella buena disposición y razonable capa y sayo? Y ¿quién pensará que aquel gentil hombre se pasó ayer todo el día con aquel mendrugo de pan que su criado Lázaro trujo un día y una noche en el arca de su seno, do no se le podía pegar mucha limpieza, y hoy, lavándose las manos y cara, a falta de paño de manos se hacía servir de la halda del sayo? Nadie, por cierto, lo sospechará. ¡Oh, Señor, y cuántos de aquéstos debéis Vós tener por el mundo derramados, que padecen por la negra que llaman honra lo que por Vós no sufrirán.

এবারে ১৯০৮ সালে ম্যাকমিলান কোম্পানি প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদে, এটি অনুবাদ করেছেন স্যার ক্লেমেন্টস মার্কহাম। সেখানে কিছুটা পড়া যাক—

A blessing on you, my lord,” I was left saying, “who gives the disease and provides the remedy.” Who would meet my master, and, judging from his satisfied look, not suppose that he had supped well and slept in a comfortable bed, and that in the morning he had had a good breakfast? Great secrets, sir, are those which you keep and of which the world is ignorant. Who would not be deceived by that fair presence and decent cloak? And who would think that the same gentleman passed all that day without eating anything but the bit of bread which his servant Lazaro had carried all day in his bosom, where it was not likely to find much cleanliness? To-day, washing his hands and face, he had to wipe them with the end of his cloak for want of a towel. Certainly no one would have suspected it. O Lord! how many such as him must be scattered over the world, who suffer for the jade they call honour that which they would not suffer for a friend.

আবার বাংলা ভাষায় যা অনুবাদ করার চেষ্টা করলাম সেটি তুলনামূলক পাঠ করে দেখা যাক—

ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন হুজুর— বলতে থাকলাম, উনি আপনাকে অসুখ দিলে তার ওষুধও দিয়ে দিন। আমার মালিকের সঙ্গে কারও যদি দেখা হয় ওঁর সঙ্গে যে জিনিসপত্র আছে, তা দেখে কেউ বুঝতে পারবে না, কাল রাতে উনি কেমন বিছানায় ঘুমিয়েছেন, কী খাবার খেয়েছেন। এখন ওঁকে দেখে মনে হচ্ছে না, উনি পেট ভরে দুপুরের খাবার খেয়েছেন? গোপন কথাটা কি জানেন ঈশ্বর? আপনি যা আসলে করেন সেসব কারও চোখেই পড়ে না। কে না ওই ভাল ভাল আদবকায়দা আর যথেষ্ট টিপটপ চাদর ও বোতামখোলা কোট দেখে ঠকে না যাবে? কে ভাবতে পারবে যে এই ভদ্রলোক গতকাল সারাদিন না খেয়ে কাটিয়েছেন? আর ওর চাকর লাসারো যে-কটা রুটির টুকরো নিয়ে এসেছিল তার থেকেই খেয়েছেন? আর ওই বিছানার ওপর শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, যেটা ভাল করে পরিষ্কার করতেও পারা যায় না? আজ সকালে হাত মুখ ধুয়েছেন ঠিকই কিন্তু হাত মোছার কাপড়টুকু পর্যন্ত ওঁর নেই? কোটের একপ্রান্তে হাতমুখ মুছে নিয়েছেন। কেউই ওঁকে এমন সন্দেহ করবেন না। ওঃ ঈশ্বর! এই ভাঙাচোরা পৃথিবীতে এরকম কতজন হতচ্ছাড়াকে আপনি রেখেছেন যারা ওই কালোরঙা অক্ষরের জন্য একেবারে মরে যায়, যার নাম সম্মান। আর যার জন্য আপনি কখনওই কষ্ট পান না?

উপরের তিনটি অংশ থেকে কয়েকটি জায়গায় আলো ফেলতে চাইছি। মূল স্প্যানিশে ছিল negra শব্দটি যার অর্থ মার্কহাম ইংরেজিতে jade করেছেন। অভিধানে দু-জায়গাতেই আছে কালো গাত্রবর্ণা নারী। অথচ মূল ভাষায় honra বিশেষ্যকে ইঙ্গিত করেই এই বিশেষণ negra ব্যবহৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত দুটো শব্দেরই লিঙ্গ নারী। অর্থাৎ শুধু কৃষ্ণবর্ণা বলে লেখক যে “সম্মান” শব্দটিকে ইঙ্গিত করে বোঝাচ্ছেন, এবং সে সংস্কৃতিতে অভিজাত শ্রেণি “সম্মান” পেত বলে তাদের খাওয়ার অর্থ ফুরিয়ে গেলেও ঠাঁট বজায় রাখতে হত, এবং সম্মানের বোঝা তখন উজ্জ্বল নয় বরং ঘোর কালো মনে হত, এতসব ব্যাখ্যা শুধু একটি শব্দ negra দিয়ে বুঝিয়েছেন। অনুবাদক হিসাবে এরকম জটিল সমস্যায় পড়লে আমি এক শব্দে অনুবাদ না করে সামান্য ব্যাখ্যা ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। এখানেও তাই করেছি। ইংরেজি ইউরোপিয়ান ভাষা হওয়াতে সে ভাষার পাঠককে এত কিছু বোঝানোর দরকার পড়েনি। বাংলায় আমি কালো নারী ধরনের কোনও শব্দ লিখে দিলে সেটা আর যাই হোক সার্থক অনুবাদ হত কি?

এই প্রচেষ্টার ফলে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে সেই বিতর্ক— উৎস ভাষা কতটা জানা জরুরি, এবং গন্তব্য ভাষাও। আর agora, aquéstos, Vós ইত্যাদি প্রাচীন স্প্যানিশ শব্দের আধুনিক অর্থ জানা তো অনুবাদকের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল।

 

লেখাটিতে পুরনো একটি লেখার তুলনামূলক আলোচনা করে দেখালেও অনুবাদকের মূল সমস্যা কয়েকটি সব কালের সাহিত্যের ক্ষেত্রেই থেকে যায়। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অচেনা সংস্কৃতি পাঠকের পড়ে ভাল লাগবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। ঠিক যেমন আমাদের অনেক মানুষই নতুন কোনও ধরনের মানুষ, ব্যবহার, পোশাক, রীতি কিছুই চট করে গ্রহণ করতে পারেন না, এমনকি চেষ্টাটুকুও করতে চান না, পাঠকরাও অনেকেই, সত্যি বলতে বেশিরভাগ পাঠকই, তেমন রুচির। অনুবাদক হিসাবে ঝুঁকি নিতে হয় গল্প বা কবিতা বা উপন্যাসের মূল আবেদনের উপর ভরসা করে। আমার একটি অনুবাদ কাজ ছিল আশির দশকের প্যারাগুয়ে দেশের রাজনীতির উপর ভিত্তি করে লেখা একটি উপন্যাস। যার মোটিফ হিসাবে জাগুয়ার প্রাণীটি উঠে এসেছে বহুবার। আমাদের দেশে যেমন হাতি বহু লোকগাথায়, এমনকি ২০২২-এর ভারতেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক, লাতিন কিছু দেশে জাগুয়ারের ভূমিকাও ঠিক তাই। বাঙালি পাঠককে সেটির আবেদন তাদের মতো করে পরিবেশন করা খুব কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু গত শতকের ঠান্ডা যুদ্ধ, তরুণ প্রজন্মের অচলায়তন ভাঙার তীব্র বিরোধ ও ঊচ্ছ্বাস এবং অন্তর্লীন প্রেম… এই সবই চিরকাল পাঠকদের কাছে আগ্রহের বিষয় হওয়াতে উপন্যাসটি অনুবাদের পরেও কিছু লোক পড়ে ভাল লাগার কথা জানিয়েছেন। সেটির দ্বিতীয় সংস্করণ করবার সাহস করতে পাচ্ছেন প্রকাশক।

অনুবাদ করার কাজটি আমি শিক্ষানবিশের দৃষ্টি দিয়ে করছি। ছোটবেলা থেকে যে অনুবাদকদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি তাঁদের অনেকেই মূল লেখা থেকে সরে গিয়ে বাঙালি পাঠকের চেনা স্বাদের মধ্যে এনে অনুবাদ করেছেন। তাতে সেটি মূলানুগ না থাকার দোষে দুষ্ট হল, না বহু পাঠকের মনে রয়ে গেছে সে-কারণেই সার্থক, এই দুই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অনুবাদের ভাষা খুঁজে চলেছি নিরন্তর।

এ-লেখাও তার একটি অঙ্গ হিসাবে পড়তে পারেন পাঠক। তাই অসম্পূর্ণ রইল। আরও অনুবাদ করি। আরও কিছু তখন যোগ করা যাবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4720 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...