পিচফল

সামাদ বেহরাঙ্গি

 


অনুবাদ: সৈকত ভট্টাচার্য

 

 

 

সামাদ বেহরাঙ্গি ছিলেন ইরান দেশের উদয়ন পণ্ডিত। জন্ম ১৯৩৯ সালে তাব্রিজে। মাত্র আঠারো বছর বয়সে সে-দেশের গ্রামের ইশকুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন তিনি। বামপন্থায় বিশ্বাসী এই তরুণ ব্রত নিয়েছিলেন ইরানের শিশুদের সঠিক শিক্ষা দেওয়ার। বাচ্চাদের জন্য কলম ধরেছেন বারবার। গল্পচ্ছলে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের চোখ খোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার জন্যই চক্ষুশূল হতে হয়েছে দেশের রাজার এবং রাজার পারিষদবর্গের। উদয়ন পণ্ডিতদের মুখ বন্ধ না করলে, শিক্ষার আলো কীভাবেই বা নেভানো যায়? আর শিক্ষার আলো না নিভলে কেউ মানবে না যে! বারবার ইশকুল থেকে বিতাড়িত করেও যখন সামাদের মুখ বন্ধ করা যায় না, তখন তাঁকে এই পৃথিবীর থেকেই সরিয়ে দেওয়া সহজ বলে মনে করেন রাজপুরুষেরা। নদীর জলে ভাসতে দেখা যায় মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সী সামাদের দেহ। নিস্পন্দ নিথর। সামাদ বেহরাঙ্গির হয়তো মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের মৃত্যু হয়নি। তাঁর বই, তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে আজও বেঁচে আছেন তিনি।

বর্তমান গল্পটি পার্সি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন রস নাহিদি। বাংলা অনুবাদটি ইংরেজি থেকে ভাষান্তর।

 

ধু ধু মরুভূমির মধ্যে সে এক ছোট্ট গ্রাম ছিল। গ্রামের পাশেই ছিল পাঁচিল ঘেরা এক বিশাল ফলের বাগান। বাগানে এত গাছ ছিল যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৃষ্টি যেত না। কয়েক বছর আগে এই বাগানের মালিক তার বাকি জমিজমা বেচে শুধু বাগানটাই রেখে দিয়েছিল নিজের কাছে। কারণ, এই বাগানের মতো বাকি জমিতে না হত কোনও গাছপালা, না ছিল জল। এই বাগানটাই গোটা অঞ্চলের মধ্যে কেবলমাত্র এমন উর্বর ছিল। তাই বাকি জমিগুলো যারা কিনেছিল তারা সেখানে অল্পস্বল্প গম আর যব ছাড়া অন্যকিছু কোনওদিনই ফলাতে পারেনি।

যাই হোক, এবার আসল গল্পটা বলি।

ওই বাগানে পাশাপাশি দুটো পিচফলের গাছ ছিল— একটা একটু পুরনো আর একটা একেবারেই নতুন। এদের দুজনের পাতা বা ফুল দেখলে দিব্যি বোঝা যায় যে এরা একই প্রজাতির গাছ।

পরিণত গাছটাকে খুব যত্ন করে, অনেক পরিচর্যার সঙ্গে বড় করা হয়েছিল। তাই প্রতি বছর বড় বড় রসালো পিচফলে ভরে যায় সে। ফলগুলো এত বড়সড় হয় যে এক হাতের মুঠোর মধ্যে আঁটে না। এত সুন্দর ফলগুলোকে দেখে যেন কামড় বসাতেও প্রাণ কাঁদে।

বাগানের মালী বলে, অনেকদিন আগে এক বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার নাকি কোন দূর দেশ থেকে এনেছিল এই গাছটার চারা। বলা বাহুল্য, এই পিচগাছের ফল বাজারে বিক্রি করে বেশ মোটা টাকাই মালিকের কাছে আসে।

অতএব, দুটো গাছের ডালেই যে অনেকগুলো করে নজর-কাটানো তাবিজ ঝোলানো থাকবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

ছোট গাছটাতেও প্রতি বসন্তেই প্রচুর ফুল ফোটে। কিন্তু হয় সেসব ফুল শুকিয়ে ঝরে যায়, নাহলে ফল ধরামাত্রই শুকিয়ে পরে যায় ডাল থেকে। মালী অনেক চেষ্টা করেছে। বছরের পর বছর এ গাছ আরও তাগড়াই হয়ে উঠেছে ক্রমশ, কিন্তু তাতে একটা ফলও ফলাতে পারেনি সে।

শেষ চেষ্টা হিসেবে, মালী ওই বড় গাছটার থেকে একটা ডাল নিয়ে কলম করে ছোট গাছের গায়ে বসিয়ে দেখেছে। কিন্তু তাতেও কপাল খোলেনি। যেন ফল ধরানোর কোনও ইচ্ছেই নেই গাছটার। মালী শেষমেশ একটা করাত নিয়ে গাছটাকে ভয় দেখিয়েছে। করাতের দাঁতে ধার দিতে দিতে গাছটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে হয় ফল দাও, নয়তো ফল ভাল হবে না। গাছটাকে কাটতেও গেছিল নিচু হয়ে, নেহাত মালীর বৌ এসে আটকেছিল, তাই রক্ষে।

—থামো তুমি, কী করছ? বৌ এসে পথ আটকে বলেছিল, ও সামনের বছর ঠিক ফল দেবে, দেখে নিও। যদি তাও না দেয়, তাহলে নাহয় তখন একে কেটে ফেলো।

ভয় দেখানোর পরেও পরের বছর ঠিক একইরকম রয়ে গেল সে— একটাও ফল ধরল না তার একটা শাখাতেও।

তোমরা হয়তো মনে মনে ভাবছ যে কী এমন হয়েছে এই ছোট গাছটার যে এত করেও মালী একটাও ফলও ফলাতে পেরে উঠছে না? আমাদের গল্পটা সেটা নিয়েই।

সকলে মন দিয়ে শোনো— এই পিচফলের গাছ এবার তার নিজের গল্প বলবে…

 

আমরা প্রায় গোটা দেড়শো পিচ একটা ঝুড়ির মধ্যে বসেছিলাম। লাইন দিয়ে এরকম আরও অনেকগুলো ঝুড়ি রাখা ছিল। মালীবুড়ো সবকটা ঝুড়িকে ঢেকে রেখেছিল আঙুরপাতা দিয়ে, যাতে সূর্যের তাপে আমাদের এই নরম চামড়াগুলো বিশ্রীরকম শুকিয়ে না যায়, আর যাতে গায়েও ধুলো না লাগে। পাতার ফাঁক দিয়ে শুধু একটুখানি আলো এসে পড়ছে আমাদের মোলায়েম গায়ে।

এই সাতসকালে মালী আমাদের গাছ থেকে পেড়ে এনেছে যাতে ঝুড়িতে রাখার সময় আমরা ঠান্ডা থাকি। শরত-রাতের হিমেল ঠান্ডা এখনও আমি আমার পেটের ভিতর টের পাচ্ছি। এই হাল্কা সূর্যের তাপটা তাই তেমন মন্দ লাগছে না।

আমরা সকলে একই গাছের ফল। প্রতি বছর এই সময় বুড়ো মালী আমার মায়ের সব পিচফলগুলো পেড়ে ঝুড়ি ভর্তি করে চলে যায় শহরে, মালিকের বাড়ি। তারপর ঝুড়ি খালি করে আবার ফেরত চলে আসে গাঁয়ে।

যাই হোক, আমি এই প্রায় শ-দেড়েক পাকা টুসটুসে পিচদের কথা বলছিলাম। আমিও এদের মধ্যেই একজন— রসে এমন টইটুম্বুর যে আমার নরম আবরণটা বুঝি ফেটেই যাবে। সকালের শিশিরভেজা আমার গালগুলো এমন লাল টুকটুকে যে দেখলে মনে হয় আমার বুঝি এই আদুর গায়ে বসে থাকতে বেজায় লজ্জা করছে।

আর আমার পেটের মধ্যে থাকা বড়সড় একটা বীজ আমার মতোই ভাবছিল একটা নতুন জীবনের কথা। আমার বীজ তো আমারই অংশ।

মালী আমাকে রেখেছিল ঝুড়ির সবচাইতে ওপরে। এমনভাবে যে কেউ ঝুড়ির দিকে তাকালেই আমি তার চোখে সবার আগে পড়ব। হয়তো আমি এদের সকলের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর রসালো বলেই। না, মানে, নিজের ঢাক নিজে পেটাচ্ছি না। সব পিচকেই যদি ঠিকঠাক বড় হতে দেওয়া যায়, তবে সকলেই এমন রসেভরা টুসটুসে হয়ে ওঠে। তবে কিছু কিছু পিচ আছে যারা পোকাদের কথায় বোকা হয়ে তাদের আশ্রয় দেয় নিজের মধ্যে। আর শয়তান পোকাগুলো তাদের কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে।

আমি যদি এইভাবে ঝুড়ি চড়ে মালিকের বাড়ি পৌঁছই, তবে নিঃসন্দেহে মালিকের বজ্জাত বাচ্চা মেয়েটা আমাকে খপাৎ করে তুলে নেবে সবার আগে। তারপর এক কামড় দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেবে কোথাও। মালিকের বাড়ি সাহেবালি বা পুলাদের বাড়ির মতো তো নয়। ওদের বাড়ির লোকেরা কোনওদিন অ্যাপ্রিকট বা পিচ তো দূরের কথা, শসা অবধি দেখেছে কি না সন্দেহ আছে। ওদিকে, মালীবুড়োর মুখে শুনেছি, মালিকের মেয়ের জন্য নাকি বিদেশ থেকে ফল আসে। এরোপ্লেনে করে আসে অর্ডার করা কমলা, কলা বা আঙুর। এমনভাবে খরচ করে যেন ‘ভবিষ্যৎ’ বলে কিছুর অস্তিত্বই নেই মালিকের কাছে। একবার ভাবো যে মেয়ের ইশকুল, জামাকাপড়, খাবার, ডাক্তার, নার্স, চাকর-বাকর, খেলনা, বেড়ানো এইসবের পিছনে কত টাকাই না ওড়ায় সে। হাজার দশেক তোমান হবেই নিশ্চয়ই। বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। যাই হোক, ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই, আমার গল্পে ফেরা যাক।

এদিকে বাগানের এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় ঝুড়ি হাতে মালীবুড়ো পা হড়কাল। পড়তে পড়তেও নিজেকে আর হাতের ঝুড়িটাকে সামলে ঠিকই নিল, কিন্তু আমি সুযোগ বুঝে গড়িয়ে পড়ে গেলাম মাটিতে। আর ও অত খেয়াল না করে চলেও গেল।

ইতিমধ্যে বেশ চড়া রোদ উঠে গেছে। মাটি গরম হয়ে উঠছে, টের পেলাম। অবিশ্যি হতে পারে যে, আমার ঠান্ডা শরীরে গরমটা একটু বেশিই বোধ হচ্ছে। আমার পাতলা আবরণটা ভেদ করে সূর্যের তাপ গিয়ে লাগছে আমার শাঁসে। সেটাও ভেদ করে পেটের ভিতর থাকা বীজটাকেও আস্তে আস্তে যখন গরম করে তুলতে থাকল, আমার বেজায় পিপাসা পেল।

মায়ের সঙ্গে যখন ছিলাম, আমার তেষ্টা পেলেই মায়ের থেকে জল নিয়ে খেয়ে নিতাম খানিক। সূর্যের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বলতাম, ও সূয্যিমামা, আমায় আরও তাপ দাও, আলো দাও। তোমার থেকে তেজ আর মায়ের থেকে ইচ্ছেমতো জল আর খাবার নিয়ে দিনে দিনে আমি আরও সুন্দর হয়ে উঠি। লালচে আভা ধরুক আমার গায়ে, পরিপূর্ণ হয়ে উঠি আমি। শেষে আমি এতটাই বড়সড় হয়ে গেছিলাম যে, মায়ের যে ডালটায় আমি হয়েছিলাম, সে বেচারি আমার ভারে একেবারে নুয়ে পড়েছিল।

এই যে, আমার সুন্দরী কন্যা, আমার মা বলেছিল, সূর্যের থেকে কখনও মুখ লুকিও না। এই মাটি আমাদের খাবার দেয়, জলের জোগান দেয়, আর সূর্যের আলোয় সেইসব রান্না হয়। এই যে দিনে দিনে এমন পরীর মতো সুন্দর হয়ে উঠছ, সবই সুয্যিঠাকুরের কৃপায়। দেখো না, যে পিচগুলো পাতার আড়ালে সূর্যের আলো থেকে লুকিয়ে বসে থাকে, ওরা কেমন অপুষ্টিতে ভুগে ভুগে রোগা, বিশ্রী হয়ে গেছে। মনে রেখো, সূর্য না থাকলে, পৃথিবীতে একটাও জীব বাঁচবে না।

সেদিন থেকে সুযোগ পেলেই সুয্যিমামার আলো গায়ে মেখে নিতে ছাড়তাম না। উত্তাপ থেকে শক্তিটুকু নিংড়ে নিয়ে জমা করে রেখে দিতাম নিজের মধ্যে। লক্ষ করতাম যে দিনে দিনে আমি বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছি। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগত, আচ্ছা, একদিন যদি সুয্যিমামার রাগ হয়, আর রাগ করে আলো দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমাদের কী হবে?

এর উত্তর জানা ছিল না আমার। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা, সূর্যদেব যদি হঠাৎ করে একদিন মনে করেন যে আর আলো দেবেন না, তাহলে কী হবে?

মা দুটো পাতা দিয়ে আমার গায়ে জমা ধুলো পরিষ্কার করে দিয়ে বলল, যত আজেবাজে কথা! তুমি তো বুদ্ধিমান মেয়ে। সুতরাং জানো নিশ্চয়ই যে, কয়েকটা বাজে, স্বার্থপর লোকের উপর রাগ হয়তো সুয্যিঠাকুর করতেই পারেন, কিন্তু তাই বলে দুম করে অমন কিছু করে বসবেন না। তবে হ্যাঁ, আস্তে আস্তে সূর্যের তেজ কমবে, ক্ষমতা কমে আসবে। এত আলো আর হয়তো দিতে পারবেন না। তখন আমাদের আবার নতুন একজন সূর্য খুঁজে নিতে হবে। কারণ, সূর্য ছাড়া তো আমরা বাঁচবই না— অন্ধকারে, ঠান্ডায় জমে মরেই যাব।

যাক গে, গল্পে কোথায় যেন ছিলাম আমরা?

হ্যাঁ, বলছিলাম যে, গরমে বেজায় তেষ্টা পেল আমার। রোদের তাপে আমার চামড়ায় ফাটল ধরতে শুরু করে দিয়েছিল। এমন সময় দেখতে পেলাম একটা কালো পিঁপড়েকে। সে গুটি গুটি পায়ে এসে আমার চারদিকে ঘুরপাক খেয়ে মন দিয়ে দেখতে লাগল আমাকে।

ঝুড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আমার কিছুটা অংশ থেঁতলে গেছিল। সেখান থেকে কিছুটা রস ছিটকে পড়েছিল মাটিতে। রোদ্দুরের তাপে শুকিয়ে গেছিল সেটা। পিঁপড়েটা এবার নিজের চোষকগুলো দিয়ে সেই শুকনো রসটা মাটি থেকে চুষে খাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকল। পারল না। একটু দম নিয়ে আবার চেষ্টা করতে শুরু করল। এত জোরে টানছিল যে মনে হল ওর চোষকগুলো বুঝি খুলেই চলে আসবে এবার। যাই হোক, শেষে অনেক কষ্টে সেই শুকনো রস নিজের মধ্যে কিছুটা চালান করতে পারল। আমি পিঁপড়ের মুখে স্পষ্ট এক গাল হাসি দেখতে পেলাম। খুশি হয়ে সে নিজের বাড়ির পথ ধরল।

আর ঠিক এই মুহূর্তে আমি একটা আওয়াজ শুনলাম। দুটো বাচ্চা ছেলে বাগানের পাঁচিল টপকে ঢুকেছে। সাহেবালি আর পুলাদ। ওরা বাগানের ফল চুরি করে খেতে আসে। গ্রামের অন্যান্য লোকেদের মতো এই মালীবুড়োকে একদম ভয় করে না এরা।

বাকি লোকেরা পারতপক্ষে এদিকে তেমন ঘেঁষে না। আর এরা দুজন খালি পায়ে, ছেঁড়া জামা পরে দিব্যি মহানন্দে ঘুরে বেড়ায় এই বাগানে। মালীবুড়ো অনেকবার বন্দুক অবধি ছুড়েছে ওদের দিকে, কিন্তু ওরা দুজন ঠিক ফাঁকফোকর গলে পালিয়ে যায়।

যাই হোক, ওরা দৌড়ে দৌড়ে আমার মায়ের দিকে গেল। একটু পরেই দেখলাম খুব দুঃখভরা মুখ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। কথা শুনে বুঝলাম, মালীবুড়োর ওপর বেজায় খেপে গেছে দুজনে।

—দেখেছিস, পুলাদ বলল, একটা ফলও বাকি রাখেনি গাছে।
—কী আর করবি? সাহেবালি জবাব দিল, গোটা মাস ধরে গাছের নিচে মোটা বুড়ো বন্দুক হাতে বসে পাহারা দিয়েছে।
—মহা বদমাইশ। একটা ফল রাখেনি! আমার আজ খুব ইচ্ছে করছিল একটা পিচফল খেতে। মনে আছে, গত বছর কত ফল পেড়ে পেড়ে খেয়েছিলাম?
—হ্যাঁ, এমন ভাব করে যেন আমাদের কোনও অধিকারই নেই। সব ফল নিয়ে গিয়ে ওই শয়তান মালিকটাকে দেবে। আর ওই বজ্জাত লোকটা বসে বসে নষ্ট করবে ওগুলো। দোষ আমাদেরই। আমরা কেউ কিছু বলিনি যখন ও এই গ্রামের থেকে বাগানটাকে কেড়ে নিয়েছিল।
—আমার তো মনে হয়, হয় এই বাগান আমাদের সকলের জন্য থাকা উচিত, নয়তো দিই একেবারে লণ্ডভণ্ড করে।
—সে আমরা দুজনে একসঙ্গেই করব।
—না করলে নিজেকে মানুষ বলে মনেই করা উচিত না।
—চেনে না তো আমাদের!

ছেলেদুটো বেজায় খাপ্পা হয়ে দুমদুম করে মাটিতে পা ফেলে চলে যাচ্ছিল। পুলাদ তো প্রায় আমাকে মাড়িয়েই ফেলত যদি না ঠিক সেই সময় ওর পায়ে একটা কাঁটা না ফুটত। পা থেকে কাঁটা বের করার জন্য নিচু হতেই ওর চোখ পড়ল আমার ওপর। আমায় দেখতে পেয়ে কাঁটার কথা ভুলে আমাকে হাতে তুলে চিৎকার করে উঠল, সাহেবালি, এই দ্যাখ, কী পেয়েছি!

বাচ্চা ছেলেদুটো আমাকে পেয়ে আত্মহারা হয়ে পড়ল। একবার এ ওর হাতে দেয়, তো ও এর হাতে। ওরা আমাকে তক্ষুনি খেল না। কারণ আমি রোদের তাপে গরম হয়ে গেছিলাম। স্বাদটা পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য একটু ঠান্ডা করে নেওয়ার দরকার। ওদের খরখরে হাতের ঘষায় আমার নরম চামড়াতে লাগছিল ঠিকই, কিন্তু আমার খুব আনন্দ হচ্ছিল এই ভেবে যে এরা আমার স্বাদ যাকে বলে অন্তর দিয়ে উপভোগ করবে। খাওয়ার পর আঙুল চাটবে, তারপর বছরভর মনেও রেখে দেবে।

—পুলাদ, এত বড় পিচ দেখেছিস কখনও? সাহেবালি জিজ্ঞেস করল।
—কোনওদিন না।
—চল, পুকুরধারে যাই। একে ঠান্ডা করে খাই দুজনে মিলে।

ওরা আমাকে এত যত্ন করে নিয়ে চলল যেন আমি একেবারে মখমলের তৈরি।

পুকুরের একটা দিক বিশাল এক উইলোগাছের ছায়ায় ঢাকা। ঠান্ডা ছায়ায় এসে আমার একটু প্রাণ জুড়োল। সেখানে একটা ছোট্ট নালা গিয়ে পড়েছে পুকুরে। তার মধ্যে আমাকে চুবিয়ে দিল ঠান্ডা করার জন্য। কয়েকটা কাঠি দিয়ে আমায় ঘিরে দিল যাতে জলের স্রোতে ভেসে না চলে যাই। কী ঠান্ডা সেই জল!

একটু পরে পুলাদ ডাকল, সাহেবালি?

—বল।
—আমার মনে হচ্ছে, এটা বেশ দামী। তাই না?
—হবে হয়তো।
—কত দাম হতে পারে বল তো?

সাহেবালি একটু ভেবে উত্তর দেয়, তা অনেক দামই হবে।

—কত?

সাহেবালি আবার একটু ভাবে। তারপর বলে, তা তুই যদি এই ঠান্ডা করার দামটাও ধরিস, তাহলে অনেক হবে… এই ধর হাজার তোমান?

—ধুর, কী যে বলিস। আরও বেশি দাম হবে এর…
—হ্যাঁ, একেবারে কিং সলোমনের গুপ্তধন কি না… তুই বল তাহলে কত দাম হবে?
—একশো তোমান।
—এক হাজার তো একশোর চেয়ে বেশি।
—তাই নাকি? হতেই পারে না। আমায় কি মুখ্যু পেয়েছিস? আমি বাবার থেকে শুনেছি।
—তাই? কী জানি, হয়তো দুটো তাহলে একই। আমার যেন মনে হচ্ছে আমার বাবা বলেছিল হাজার বড়।

পুলাদ জলের কাছে গিয়ে আমায় ধরে বলল, কী ঠান্ডা রে! আমার মনে হচ্ছে এটা যথেষ্ট ঠান্ডা হয়েছে।

সাহেবালিও নিচু হয়ে আমায় ধরল, হ্যাঁ, হয়ে গেছে।

আমাকে জল থেকে তুলে নিল ওরা। জলের ওপরে আসামাত্রই গরম হাওয়া এসে ঝাপটা মারল আমার গায়ে। এবার আমি চাই যে ওরা ঝটপট আমাকে খেয়ে ফেলুক। দেখাতে চাই যে আমি কতটা সুস্বাদু। কোনওদিন এত স্বাদু ফল ওরা খায়নি। আমার ভিতরে জমিয়ে রাখা সূর্যের থেকে, আমার মায়ের থেকে আহরণ করা সমস্ত শক্তি এবার এই গরিব বাচ্চাগুলোকে দিয়ে দিতে চাই।

পুলাদ আর সাহেবালি যখন আমায় খাওয়ার তাল করছিল, আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। ভাবছিলাম, একদিন তো আমি ছিলাম ওই মাটি আর জলের সঙ্গে মিশে। আমার মা মাটি থেকে জল নিয়ে সূর্যের আলোর সাহায্যে শক্তি সঞ্চয় করেছে, কুঁড়ি ফুটিয়েছে, সেই কুঁড়ি থেকে ফুল হয়েছে, আর সেই ফুল থেকে আস্তে আস্তে জন্ম নিয়েছি আমি। আমি আবার আমার মায়ের থেকে পুষ্ট হয়েছি, সূর্যের আলো, হাওয়া, জল পেয়ে এমন শাঁসালো ফলে পরিণত হয়েছি। এবার পুলাদ, সাহেবালি আমাকে খেয়ে নিলে আমার অংশগুলো মিশে যাবে ওদের দেহের সঙ্গে। একদিন না একদিন ওদেরও মৃত্যু হবে। তখন আমার যে অংশগুলো ওদের মধ্যে মিশে ছিল সেগুলোর কী হবে?

সাহেবালি আমাকে পুলাদের হাতে দিয়ে বলল, নে, একটা কামড় দে।

পুলাদ একটা ছোট্ট কামড় দিয়ে সাহেবালির হাতে ফেরত দিল আমাকে। পুলাদ ঠোঁটে লেগে থাকা রসটা চেটে চেটে খাচ্ছিল পরম তৃপ্তিভরে। সাহেবালি এক কামড় খেয়ে আবার ফেরত দিল পুলাদের হাতে।

ঠিক যেমনটা আমি ভেবেছিলাম, আমি তেমনটাই সুস্বাদু, তাতে সন্দেহ নেই আর। একটু একটু করে আমার শাঁসগুলো চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, আমার বীজটা ভাবতে শুরু করেছে নতুন এক জন্মের কথা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে যখন আমার আর পিচফল হিসাবে অস্তিত্ব থাকবে না, তখন আমার এই বীজ স্বপ্ন দেখবে একদিন বনস্পতি হয়ে ওঠার। একই সময়ে আমি যখন আস্তে আস্তে মারা যাচ্ছি, অন্যদিকে আমিই আবার বিভোর হয়ে উঠছি নতুন এক জীবনের কল্পনায়।

পুলাদ যখন সম্পূর্ণ রসটা চুষে নিয়ে মুখ থেকে আমায় বের করল, আমি তখন কেবলমাত্র একটা বীজ— শক্ত খোলসের ভিতর লুকিয়ে রেখেছি এক নতুন জীবনসত্ত্বাকে। এবার শুধু চাই একটু জল-ভেজা মাটি আর বেশ খানিকটা বিশ্রাম, তাহলেই আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠব মহীরুহ হওয়ার জন্য।

মুখ মুছে পুলাদ বলল, এবার?

—চল জলে ঝাঁপাই।
—এই আঁটিটা খাবি না?
—উঁহু। ওটা অন্য কাজে লাগাব। রাখ এখানে।

পুলাদ আমাকে উইলোগাছের ছায়ায় রেখে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তারপর দৌড়ে এসে ঝপাং করে লাফ দিয়ে পড়ল পুকুরের জলে। পুকুরের কাদাগোলা জল ছিটকে উঠল খানিক। পুলাদ কোমরজলে গায়ে হাতপায়ে খানিক শ্যাওলা নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

—ঘুরে দাঁড়া। সাহেবালি চেঁচিয়ে বলল।
—প্যান্ট জামা খুলে ফেলছিস নাকি?
—হ্যাঁ, বাবাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে আমি সাঁতার কাটতে এসেছিলাম। খুব মারবে তাহলে।
—আরে এখন তো মনে হয় দুপুরও হয়নি, বাড়ি যেতে যেতে সব শুকিয়ে যাবে।
—আকাশে সূর্য দেখে তোর তাই মনে হচ্ছে?

পুলাদ আর কিছু না বলে অন্যদিকে ফিরে দাঁড়ায়। একটু পরে জলের মধ্যে ঝপাং করে শব্দ শুনে এদিক ফিরে সাহেবালির দিকে সাঁতার দিতে শুরু করল। দুজনে মিলে খানিকক্ষণ ঝাঁপাই জুড়ে ক্লান্ত হয়ে উঠে পড়ল জল থেকে। পুলাদ নিজের প্যান্টটা নিংড়ে যতটা সম্ভব জল ঝেড়ে ফেলে আমাকে হাতে তুলে নিল। তারপর বাগানের পাঁচিলের ফোকর গলে সাহেবালির সঙ্গে গ্রামের দিকে ফিরতি পথ ধরল।

—তুই যে বলছিলিস ওই আঁটিটা নিয়ে কী করবি? পুলাদ জিজ্ঞেস করল।
—করব তো। বিকেলবেলা রোদ পড়ুক, তোকে ডাক দেব। সাহেবালি বলল। তারপর দূরে পাহাড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই পাহাড়ের দিকে যাব। ওখানে গিয়ে তোকে বলব আমার কী প্ল্যান।

পুলাদ আমাকে সাহেবালির হাতে দিয়ে দিল।

গ্রামের ফাঁকা রাস্তায় মাছি ভনভনে গোবরের গন্ধ পাক খাচ্ছিল। হঠাৎ একটা বাড়ির পাঁচিল টপকে একটা বড়সড় লোমশ কুকুর লাফ দিয়ে এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল। পুলাদ তাকে বেশ আদর-টাদর করে ভিতরে নিয়ে চলে গেল।

বেশ খাড়া চড়াই রাস্তা। পাশের বাড়ির উঠোন পুলাদের বাড়ির ছাদের চেয়ে ওপরে। সাহেবালি আমাকে নিয়ে আরও খানিকটা চড়াই ভেঙে নিজের বাড়িতে এল। তারপর আমাকে মুঠোর মধ্যে চেপে লাফ দিয়ে পড়ল বাড়ির উঠোনে। আর সেখানে এক কোণে জমা করা গোবরের মধ্যে পা ঢুকে গেল প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত। সাহেবালির মা জানলা দিয়ে মাথা বের করে বলল, যা তাড়াতাড়ি তোর বাবার খাবারটা দিয়ে আয়।

সাহেবালি গোয়ালের এক কোণায় একটা খুপরির মধ্যে খড় চাপা দিয়ে আমাকে রেখে দিয়ে গেল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল আমার। কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, আর তার সঙ্গে গোবরের গন্ধ। মনে হচ্ছিল মরেই যাব। কয়েক ঘণ্টা এইভাবে থাকার পর বুঝতে পারলাম যে কেউ খড়োগুলো সরাচ্ছে। সাহেবালিকে দেখতে পেলাম। আমাকে বের করে প্যান্টে মুছে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তা ধরে পুলাদের বাড়ির ছাদের কাছে এসে পড়লাম আমরা। পুলাদের মা আর বোন ছাদে বসে পড়শি বৌ-এর সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুঁটে শুকোতে দিচ্ছিল।

—পুলাদ কই? সাহেবালি জিজ্ঞেস করল।
—ছাগল চড়াতে নিয়ে গেছে মাঠে। পুলাদের মা জবাব দিলেন।

পুলাদকে খুঁজে পাওয়া গেল ওই পাহাড়টার মাথায় যেখানে সাহেবালির সঙ্গে ওর যাওয়ার কথা হয়েছিল। ছাগলগুলোকে ঘাস খেতে ছেড়ে দিয়ে কুকুরটাকে নিয়ে একপাশে বসে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিল সে। সুর্যের পড়ন্ত আলোয় আমার হঠাৎ মনে হল সাহেবালি আর পুলাদের চামড়ার রং আমার বীজের গায়ের রঙের সঙ্গে মিলে গেছে বেশ। খালি গায়ে রোদে ঘুরে ঘুরে ওদের রং তামাটে হয়ে গেছে, আমার খোলসটার মতো।

পুলাদ এবার অধৈর্যভাবে জিজ্ঞেস করল, বল, তোর কী প্ল্যান?

—তোর নিজের একটা পিচগাছ চাই?
—কী বলছিস! নিশ্চয়ই চাই।
—চল তাহলে, সাহেবালি বলল।
—ছাগলগুলোর কী হবে?
—বাড়িতে গিয়ে রেখে আয়।
—না, মা বলেছে সন্ধের আগে যেন ওদের ফেরত না নিয়ে যাই।
—তাহলে তোর কুকুরকে বল ওদের পাহারা দিতে।

পুলাদ নিজের কুকুরটাকে কাছে ডেকে একটু আদর করে বলল, ছাগলগুলোকে দেখে রাখিস। আমি আসছি একটু। ঠিক আছে?

আমাকে নিয়ে ওরা এবার দৌড় দিল বাগানের দিকে।

—জলদি চল। সাহেবালি বলল।
—শোন, আমি বুঝে গেছি তুই কী করতে চাইছিস। তুই এই পিচের বীজটা পুঁতবি তো?
—সে তো বটেই। বাগানের দেওয়ালের শেষ মাথায় একটা ঢিবি আছে না, ওর পিছনে পুঁতে আসব। কয়েক বছর পর আমরা একটা পিচগাছের মালিক হয়ে যাব। কিন্তু একে অন্য কোথাও লাগানো যাবে না…
—হ্যাঁ, এই পাথুরে পাহাড়ে কোনও গাছই হবে না। জল আর নরম মাটি লাগবে তো।
—ঠিক আছে। দাঁড়া। আমি মালী কোথায় দেখে আসি একবার।

মালীবুড়ো শহর থেকে ফেরেনি তখনও। পুলাদ আর সাহেবালি ওই ঢিবিটার পিছনে একটা ঠিকঠাক জায়গা দেখে একটা ছোট গর্ত করল। তার মধ্যে আমায় রেখে আমার ওপরে কালো নরম মাটি ঢেলে দিল আবার। তারপর চেপে চেপে সেটা সমান করে চলে গেল।

কালো, ভিজে মাটি আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরল। এবার আমার দরকার আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠার জন্য শক্তি সঞ্চয়ের।

 

কিছুদিন পর আস্তে আস্তে মাটিটা যখন খুব ঠান্ডা হয়ে গেল, বুঝলাম শীতকাল এসে গেছে। চারিদিক বরফে ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু মাটির তলায় আমি বেশ দিব্যি একটা ওমের মধ্যে ছিলাম। বেশি ভাবনাচিন্তা বন্ধ করে একটা লম্বা ঘুমের চেষ্টা করতে লাগলাম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম যে বসন্ত এসে গেছে। আমিও মাটির উপর মাথাচাড়া দিয়ে ধীরে ধীরে বড় একটা গাছ হয়ে উঠেছি। পুলাদ আর সাহেবালির গাছ। কেমন সেই লাজুক মেয়েদের মতো লাল লাল রসালো বড় বড় পিচফল ধরেছে তাতে।

আরও যা যা স্বপ্ন শীতঘুমের মধ্যে দেখেছিলাম, তার সব কটা মনে নেই বটে, কিন্তু দুটো বেশ মনে আছে। একটায় দেখছিলাম যে আমি এক বিশাল পিচগাছ হয়ে গেছি। ডালে ডালে ভরা ফল। পুলাদ আর সাহেবালি ডাল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সেই সব ফল নিচে জমা হওয়া গ্রামের একগাদা কচিকাঁচার মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর তারা পড়ন্ত ফলগুলোকে শূন্যেই খপাৎ করে ধরে ফেলছে। বড় বড় পিচফলের রস তাদের মুখ, হাত বেয়ে সারা গায়ে ভরে গেছে। ওরই মধ্যে একটা বাচ্চা চেঁচিয়ে বলছে, পুলাদ, এগুলো কোন ফল? নাম বলোনি তো। নাহলে বাড়ি গিয়ে আমার ঠাম্মাকে কী করে গল্প করব? এত ভাল খেতে, আমার খিদে মেটেনি, আরও খাব।

আরও কয়েকটা ছোট ছোট ল্যাংটো বাচ্চাকেও দেখেছিলাম ওই স্বপ্নে। দুহাতে দুটো ফল নিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছিল।

আর একবার দেখলাম, এক বাদামগাছকে। আমি বেজায় নির্জীব হয়ে পড়েছিলাম। একটা খুব নরম গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওই কথার সঙ্গে একটা খুব চেনা গন্ধ মাটির তলায় ভেসে এল। শুনলাম সে বলছে, বাদামফুল, একটু কাছে সরে এসো। এই ছোট্ট পিচকে তোমার সুবাস দাও। তাতেও যদি ওর ঘুম না ভাঙে তাহলে নাহয় একটু আদর করে দিও। ওর এখন সুপ্তি ভেঙে চারাগাছ হয়ে ওঠা দরকার। বাকি সমস্ত বীজের ঘুম ভাঙছে।

বাদামফুলের মিষ্টি গন্ধ আমায় মোহিত করে রেখেছিল। ইচ্ছে করছিল সারা জীবন এমনি করে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিই। তবু উঠতে হল। আবার ঘুমিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বাদামফুল মিষ্টি হেসে বলল, আর ঘুমোলে তো হবে না। অনেক বড় হতে হবে তোমাকে। একেবারে বৃক্ষ হয়ে উঠে ফুল ফুলে ভরিয়ে ফেলতে হবে তো, তাই না?

বাদামফুলকে একেবারে পরীর মতো সুন্দর লাগছিল। তুষারের মতো পোশাক আর ঠোঁটগুলো ফুলের মতো সুন্দর। যদিও আমি তুষার দেখিনি কখনও। মায়ের মুখে গল্প শুনেছিলাম কেবল।

কে যে বাদামফুলকে বলছিল আমায় আদর দিয়ে ভরিয়ে দিতে, সেটা জানতে ইচ্ছে করছিল খুব। সে কথা জিজ্ঞেস করতেই বাদামফুল হেসে আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, দেখেছ, কত্ত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা! হাত দিয়ে পুরো জড়িয়ে ধরতেই পারছি না। তারপর একটু থেমে ফের বলল, বসন্ত এসেছে। এবার তোমার আরও বড় হয়ে ওঠার পালা।

বসন্তের কথা শুনে ঘুম ভাঙল আমার। আমার উপরের খোলসটাতে এখনও ফাটল ধরেনি। ভয় করছিল অল্প অল্প। মাটির গভীরের অন্ধকার আমাকে ঘিরে ছিল তখনও। আমার আবরণের উপরটা ভেজা ভেজা। মাটির ওপর থেকে জল এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল আমাকে। অন্য কয়েকটা গাছ-গাছড়ার চারা আমার আশেপাশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল ক্রমে ক্রমে। তাদের সদ্য গজানো শিকড় জলের খোঁজে ছড়িয়ে পড়ছিল মাটির মধ্যে এদিক-সেদিক।

কয়েকটা বেশ শক্তপোক্ত শিকড় আমার পেটে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। ওগুলো মনে হয় নদীর ধারের বাদামগাছের। মাটি থেকে জল আর পুষ্টি সংগ্রহ করে তাগড়াই হয়ে উঠেছে বেশ।

মাটির উপরের বরফগলা জলের স্রোত বন্ধ হয়ে গেল কিছুদিনের মধ্যেই।

কয়েকদিন পর একটা অদ্ভুত শব্দ শুনলাম। একটা কালো পিঁপড়ের ঝাঁক আমাকে ঘিরে ধরল। চোষক দিয়ে আমাকে ফুটো করার অনেক চেষ্টা করল। পারল না যদিও। কিন্তু ওরা সূর্যের তাপ আর বসন্তের গন্ধ বয়ে নিয়ে এল আমার কাছে। মাটির উপরে মাথা তোলার আগে এদের দলটাকে আর দেখিনি কখনও।

আমি এত জল খাচ্ছিলাম যে ফুলতে ফুলতে একদিন অবশেষে ফট করে আমার খোলসটা ফেটে গেল। আর সেখান থেকে বের হয়ে এল কচি কচি দুটো শিকড়। প্রথমে মাটির মধ্যে ভাল করে ঢুকিয়ে দিলাম ওদের। ওরাই আমার খাবার, জলের জোগান দেবে, মাটির উপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করবে। তারপর আস্তে আস্তে মাথা তুলতে শুরু করব। মাটির মধ্যে ছোট্ট একটা ফুটো করে উপরে চলে যাবে আমার এই ছোট্ট চারাগাছটা। প্রথম সূর্যের আলো দেখবে সে। আমার মধ্যে জমিয়ে রাখা সব খাবার আর শিকড়ের বয়ে আনা জল দিয়ে ওকে পুষ্ট করব আমি। আর সঙ্গে থাকবে মাটির ফাঁক গলে আসা হাওয়া, যাতে একেবারে দম বন্ধ না হয়ে যাই।

আমি যখন একটা বীজ হিসাবে ছিলাম, তখন আমি সম্পুর্ণ ছিলাম ওই বীজের মধ্যেই। কিন্তু বড় হয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিল না। এখন আমি সেই কঠিন আবরণ ভেঙে বড় হয়ে উঠব আস্তে আস্তে। একদিন একটা মহীরুহ হয়ে ওঠার স্বপ্ন আমার চোখে। অনেক কিছু শিখতে হবে, জানতে হবে। একটা সম্পূর্ণ বৃক্ষ হয়ে ওঠা তো সহজ নয়। একটা পিচফলের বীজের ক্ষমতা খুবই সীমিত। নিজেকে চারাগাছে বদলে ফেলতে না পারলে শুকিয়ে মরে যাওয়া ছাড়া খুব একটা কিছু করার থাকে না। কিন্তু যখনই একটা বীজ থেকে একটা অঙ্কুর জন্ম নেয়, আর তা থেকে একটা চারাগাছ মাথা তোলে, তখন সে আর নিতান্ত একটা ফলের বীজ থাকে না, এক সম্ভাবনাপূর্ণ ভবিষ্যতের সূচক হয়ে দাঁড়ায়। তারপর প্রতিটা মুহূর্তে হাজারো পরিবর্তনের স্রোত খেলা করে যেতে থাকে তার মধ্যে দিয়ে। আমিও ডালপালা, ফুলফলের জন্ম দিয়ে দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতাসম্পন্ন বনস্পতি হয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে চলতে থাকব ক্রমশ। প্রতি পলে আরও অনেক অনেক পাতা মেলে দিতে চাইব সূর্যের আলোয়, চাইব তারা আরও সবুজ হয়ে উঠুক। স্বপ্ন দেখছিলাম ফুলে ভরা ডালপালার, আর তাতে ভরে থাকা লাল লাল বড় বড় পিচফল। ভাবতেই পারছি না যে, এই ছোট্ট চারাগাছটার সামনে কত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে।

কিন্তু আমি পারছিলাম না।

একটা কাঠবাদামের আকারের পাথর আমার পথ রোধ করে ছিল। মাটির ভিতর ছোট্ট ফুটো করে যে বাইরে বের হয়ে আসব, সে পথ বন্ধ করে রেখেছিল পাথরটা। অনেক চেষ্টা করছিলাম। মাটির যত উপর দিকে আসছিলাম, সূর্যের উত্তাপ গায়ে লাগছিল। ওদিকে শিকড়ের দল মাটির আরও গভীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে আর আমাকে জোগান দিচ্ছিল রসদের। আমি বারবার ধাক্কা দিচ্ছিলাম পাথরটাকে। সমস্ত শক্তি দিয়ে। মাটির ওপরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই হবে আমাকে। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় অবশেষে একটা ফাটল তৈরি হল। পাথর গড়িয়ে পড়ল একপাশে। আমি মাথা তুললাম আকাশের দিকে।

বাদামগাছকে দেখতে পেলাম। শ্বেতশুভ্র ফুলে আপাদমস্তক ঢাকা তার। আমাকে দেখে বেজায় খুশি হল। ওর উচ্ছ্বাস দেখে আমিও খুব আনন্দ পেলাম।

–ও বাদামগাছ। আমি ডাকলাম।
—আমার ছোট্ট মিষ্টি চারাগাছ, মাটির ওপরের এই সুন্দর পৃথিবীতে তোমাকে স্বাগত জানাই।

আমার চারপাশের ছোট ছোট চারাগাছগুলো খানিকটা লম্বা হয়ে গেছে। তারা দিব্যি আমায় ছায়া দিতে লাগল। আমি যদিও এখন কেবল দুটো পাতা মাত্র। আরও অনেক বড় হতে হবে আমায়।

পুলাদ আর সাহেবালি যেদিন আমায় দেখতে এল আমার সেদিন অবধি সাকুল্যে বারোটা পাতা গজিয়েছে। কিন্তু আশপাশের ছোট ছোট গাছগুলোকে লম্বায় ছাড়িয়ে উঠেছি খানিকটা।

পুলাদ আর সাহেবালি তো আমাকে দেখে বেজায় খুশি। এটা আমাদের গাছ, বলে ওরা নালা থেকে আঁজলা ভরে জল এনে আমার গোড়ায় দিতে লাগল। কিন্তু মালীবুড়োর কোদালের আওয়াজ পেয়ে তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেল।

ওরা এরপর প্রায়ই আসত। আমার পাশে বসে কতরকম পরিকল্পনা করত। একদিন একটা মরা সাপ লাঠির ডগায় ঝুলিয়ে নিয়ে এল। তারপর আমার চারিদিকে গোল করে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিল তাকে।

তারপর পুলাদ হাতের ধুলো ঝেড়ে বলল, এইবারে ওর বেজায় মজা হবে।

বলা বাহুল্য যে আমার কথাই বলছিল।

—একটা সাপ তো এত্ত এত্ত গোবরসারের সমান। সাহেবালি বলল।
—আমার তো মনে হয় পরের বছরই ফল ধরবে গাছে।
—হতে পারে, দ্যাখা যাক। কোনওদিন তো কোনও গাছ লাগাইনি, জানি না।
—তা বটে, কিন্তু আমি শুনেছি পিচগাছ নাকি অন্য সব গাছের তুলনায় তাড়াতাড়ি ফল দেয়।

আমিও এটা জানতাম। আমার মা তো দ্বিতীয় বছরেই দুটো ফলও ধরেছিল।

আমি খালি ভাবি যেদিন আমি অমন ফল ধরব, আমায় কেমন দ্যাখাবে? খুব তাড়াতাড়ি সেই দিনটা আসুক, আর আমি টের পাই লাল ফলগুলো কেমন করে আমার থেকে তাদের খাবার নিয়ে আরও টুসটুসে হয়ে ওঠে। এমন বড় বড় হবে যে আমার ডালগুলো তাদের ভারে একেবারে নুয়ে পড়ে মাটি ছুঁয়ে ফেলবে।

গ্রীষ্ম চলে গেল। শরৎকাল এল।

আমার কাণ্ডের ভিতর আমি একটা সরু নল তৈরি করেছি। শিকড় যা যা রসদ যোগাড় করবে তা এই নলের মধ্যে দিয়ে পৌঁছে যাবে ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। শরতের মাঝামাঝি এসে ওই নলটাকে বন্ধ করে দিলাম, যাতে শিকড় থেকে খাবারদাবার না আসতে পারে আর। পাতাগুলো আস্তে আস্তে অপুষ্টিতে ভুগে হলদেটে হয়ে যেতে লাগল। আমি এই হলদে হয়ে যাওয়া পাতাগুলোর গোড়াগুলো আলগা করে দিলাম। যখন জোরে হাওয়া দিল, এগুলো সব টুপ-টাপ করে ঝরে পড়ে গেল আমার দেহ থেকে। আমি একেবারে ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝরাপাতার গ্রন্থিগুলো থেকে বসন্তে নতুন ফুল ফোটানোর, আর নতুন বছরে সেখান থেকে আরও নতুন নতুন শাখার জন্ম দেওয়ার ইচ্ছে ধরা রইল মনের মধ্যে। আমিও চাই আমার মায়ের মতো দ্বিতীয় বছরেই আমার শাখায় ফলও ধরুক।

চারদিক যত ঠান্ডা হয়ে এল, আমাকেও কেমন যেন ঘুমের আবেশ ঘিরে ধরল। যখন বরফে চারিদিক ঢেকে ফেলল, আমি তখন গভীর ঘুমে।

পুলাদ আর সাহেবালি একটা বস্তা দিয়ে আমার কাণ্ডটাকে ভালো করে মুড়িয়ে দিয়েছিল যাতে জমে না যায়। অবশ্য শুধু তাই নয়, খরগোশের হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্যও ছিল এটা। পিচগাছের কচি কাণ্ড নাকি খরগোশদের ভীষণ পছন্দের খাবার।

বসন্ত এলে প্রথমে আমার শিকড়গুলো জেগে উঠল। জেগে উঠেই আমার কাণ্ডে রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করে দিলো। খাবার আর জল পেয়ে কাণ্ডও কাটিয়ে উঠল তার শীতঘুম। তারপর শিকড়ের পাঠানো খাবারদাবার পৌঁছে দিল ডালে ডালে, কুঁড়িগুলোর কাছে। আমার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে প্রসুপ্তি ভেঙে উঠে বসল এবার। কচি কচি পাতা গজাতে শুরু করল। বড় বড় তিনটে কুঁড়ি ফুল হয়ে ফোটার অপেক্ষা করতে লাগল। বাকিগুলো পাখির দল এসে খেয়ে গেছিল আগেই।

যথাসময়ে তিনটে ফুল ফুটল। কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারলাম যে সবকটা ফুলে যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টির জোগান দিতে পারছি না আমি। একটা ফুল শুকিয়ে ঝরে গেল কিছুদিনের মধ্যেই। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে আমি ইচ্ছে করেই বন্ধ করে দিলাম খাবারের জোগান। একদিন এক দমকা বাতাস এসে নিয়ে গেল তাকেও। আমি সমস্ত খাবার দিয়ে তৃতীয় ফুলটাকে বড় করতে থাকলাম। আমি এর থেকে এমন একটা ফলের জন্ম দিতে চাই যে অত বড় আর সুস্বাদু ফল কেউ কোনওদিন কোথাও খেয়েছে বলে মনে করতে পারবে না।

একদিন ফুলটার পেট থেকে সত্যিই একটা সুন্দর পিচফল বের হয়ে এল।

একটা ডালের এক প্রান্তে সে আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। তার ভারে আমার নরম কচি ডাল নুয়ে পড়তে থাকল মাটির দিকে। তাই দেখে আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম এই ভেবে যে পরের বছর অনেক সংখ্যায় ফল কীভাবে আমি ধরব? আমার বোধহয় নিজের প্রতিও যত্ন নেওয়া উচিত। একটা সময় এল যে এই ফলটার ভার আর রাখতে পারি না আমি। ভেঙে পড়ে যাব মনে হয় এবার। কিন্তু খাবার জোগান বন্ধ করে নিজেকে বাঁচাতে ওকে ডাল থেকে ফেলে দিতেও মন চায় না। আগামী বছরগুলোতে যে হাজার হাজার ফল ফলানোর ইচ্ছে রয়েছে, তার পরীক্ষা এটা। বাচ্চাগুলো যে মরা সাপটা পুঁতে দিয়ে গেছিল তার থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করেই ধীরে ধীরে আমার নরম কাণ্ডটাকে শক্ত করে তুলব আমি।

পুলাদ আর সাহেবালি আজকাল খুব একটা আসে না। বাড়ির কাজেকর্মে ব্যস্ত মনেহয়। একদিন এল। হাতে একটা লাঠি। সেটা বেশ শক্ত করে আমার দুর্বল কাণ্ডের সঙ্গে বেঁধে দিল। তারপর খুব চিন্তিতভাবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা জুড়ল,

—সাহেবালি, পুলাদ বলল।
—কী?
—যদি ওই মালীবুড়ো এসে আমাদের এই গাছটা দেখতে পায়?
—তাতে কী?

পুলাদ কিছু বলে না।

—ও মোটেই কিছু করতে পারে না। এটা আমাদের গাছ, আমরা লাগিয়েছিলাম। এর ফল সব আমাদের। সাহেবালি বলে ওঠে।

পুলাদ একটু ভেবে বলে, কিন্তু জমি তো আমাদের নয়।

—তা হলেও সে পারে না। জমি হল তার যে এখানে মাটি খুঁড়ে গাছ লাগিয়েছে, এই এক টুকরো জমিটা আমাদের।

সাহেবালির কথায় পুলাদ জোর পেল একটু। বলল, নিশ্চয়ই, এটা আমাদের জমি। কেউ আমাদের গাছে হাত লাগাক, গোটা বাগান আমি তছনছ করে দেব।

সাহেবালি নিজের খোলা তামাটে বুকে একটা চাপড় মেরে বলল, আমার মরা শরীরের উপর দিয়ে তাকে আসতে হবে এই গাছের ফল নিতে। তারপর কেমন সে শান্তিতে থাকবে দেখব আমি।

সেদিন আমার সঙ্গে ওই লাঠিটা বেঁধে না দিলে ঝড়ের কবলে সেদিন রাতেই ভেঙে পড়ে যেতাম। ঝড় চলে যেতে দেখলাম দুটো ডাল ভেঙে গেছে।

দিন চলে যায়। আমি আমার পিচফলটাকে আরও বড় করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাই। সূর্যের থেকে আলো নিয়ে তার গাল রাঙাই, তাপ নিয়ে ভরে দিই তার শাঁসের মধ্যে। আমার ছোট্ট মেয়েটাও আমাকে আঁকড়ে ধরে তার সমস্ত দরকারি পুষ্টি সংগ্রহ করতে থাকে। মাঝে মাঝে ব্যথা লাগে আমার। তবু রাগ করি না, হাজার হোক আমারই তো আত্মজা সে।

সাহেবালি আর পুলাদ তো এখন আমাকে নিয়ে এতটাই বুঁদ হয়ে থাকে যে অন্য গাছের দিকে ফিরে তাকায় না। এমনকি আমার মায়ের পিচফলগুলোও ওদের নজরে পড়ে না। আমিও চাই যে ওরাই কেবলমাত্র যেন আমার ফল খাওয়ার অধিকার পায়, সেই সেবার গরমকালে যেমন আমাকে ওরা পেয়েছিল।

শরৎ এসে গেল। পুলাদ একা একদিন এল। এই প্রথম ওদের দুজনকে আলাদা দেখলাম। ভাবলেশহীন মুখ তার। এসে প্রথমে আমার গোড়াতে জল দিলো আঁজলা ভরে। তারপর এক পাশে বসে কথা বলতে শুরু করল সে।

—এই যে পিচগাছ, জানো কী হয়েছে? জানো আমি আজ একা কেন এলাম? তুমি কী করেই বা জানবে? সাহেবালি আর নেই গো। সাপে কেটেছে ওকে। ওঝাবুড়ি সারারাত বসেছিল ওকে নিয়ে। পারেনি বাঁচাতে। সাহেবালির বাবা আর আমি পাহাড় মরুভূমি খুঁজে কত ওষুধপত্র গাছগাছালি এনে দিলাম, তবু সাহেবালি বাঁচল না। কেন, চলে গেলি ভাই তুই আমায় ছেড়ে?

পুলাদ কাঁদছিল। কান্নার দমক সামলে আবার বলতে শুরু করল, কদিন আগে মরুভুমির দিক থেকে ফিরছিলাম দুজনে। তখন দুপুরবেলা। আমরা ভাবছিলাম যে আর একটা সাপ মেরে তোমার গোড়ায় সার দেওয়া যায় কি না। সেই ভেবে দুজন মিলে সাপের খোঁজে একটা খাদের মধ্যে নামলাম। ওখানে প্রচুর সাপ থাকে। একদিকে পাহাড়ের দেওয়াল উঠে গেছে, দেখলে মনে হয় আকাশ থেকে পাথর বৃষ্টি হয়ে দেওয়ালটা তৈরি হয়েছে। আর ওখানে এত সাপ থাকে যে গেলেই সাপের হিসহিসানি শুনতে পাবে।

সাহেবালি আর আমি ওই পাথরের ঢিপির নিচে নামলাম সাপ খুঁজতে। হাতের লাঠি দিয়ে এদিক ওদিক গর্তগুলোর মধ্যে খুঁচিয়ে দেখছিলাম সাপ আছে কি না। চাঁদিফাটা গরমে গায়ের জামা খুলে ফেলেছিলাম দুজনেই। এক পাথর থেকে অন্য পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। ঠিক এই সময় হঠাৎ সাহেবালি টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল নিচে। ওর চিৎকার শুনে ফিরে দেখি নিচে একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা সাপের উপর গিয়ে পড়েছে ও। আমি লাফ দিয়ে নেমে হাতের লাঠিটা সাপের মাথা লক্ষ্য করে চালালাম। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। সাহেবালির পিঠের ঠিক মাঝখানে ছোবল মেরেছে সে। আমি প্রচণ্ড রাগে এলোপাথাড়ি মেরে সে সাপটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলাম। কিন্তু সাহেবালি এলিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। হাতে বা পায়ে কামড়ালে তাও কিছু করার থাকে। কিন্তু পিঠের মাঝে কামড়ালে কীই বা করা যায়? আমি জলদি ওকে ঘাড়ের ওপর ফেলে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামে ফিরে গেলাম। আজ সকালে যখন ওকে গোর দিচ্ছি সবাই মিলে, শুনলাম ওঝাবুড়ি আমার মাকে বলছে যে ওকে আমি আরও তাড়াতাড়ি নিয়ে এলে ও নাকি বেঁচে যেত। কিন্তু আমি কী করে আরও তাড়াতাড়ি আনতাম ওকে, বলো, পিচগাছ? তুমি তো দেখেছ, ও আমার চাইতে লম্বা চওড়া সবেতেই বেশি। যদি একটা খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে আসা যেত…

পুলাদ আবার চোখের জল ফেলতে শুরু করল। আমার চিন্তাভাবনা সব গুলিয়ে যাচ্ছিলো। এই ছেলেদুটোকে আমি খুব ভালবাসি, বোধহয় নিজের চেয়েও বেশি। সাহেবালিকে আর কোনওদিন দেখতে পাব না ভেবে মনে হচ্ছিল এখুনি সব পাতাগুলো ঝরিয়ে ফেলে আমিও মরে যাই একেবারে।

পুলাদ চোখ মুছে আবার বলল, সাহেবালিকে ছাড়া ওই গ্রামে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ওই পাহাড়, ছাগল চড়ানোর মাঠ, সর্বত্র ওর স্মৃতি ছড়ানো। ওই কুকুরটাকে আদর করা, ঘুঁটে শুকতে দেওয়া, মাঠে গিরগিটি খুঁজতে যাওয়া, খেলতে যাওয়া অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে— ওকে ছাড়া কিছুতেই ভাবতে পারি না এগুলো। একলা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালেই মনে হচ্ছে এই বুঝি ‘পুলাদ, পুলাদ’ করে সাহেবালি ডেকে উঠবে আমাকে। এখানে আমি ওর স্মৃতি বয়ে পারব না থাকতে। পিচগাছ, ভাবছি আমি শহরে মামার কাছে চলে যাব। ওখানে কাজ খুঁজে নেব কিছু। আমি জানি না আমি কী করলে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম। ও তো এখনও ছোট ছিল, পিচগাছ, আমার মতোই। কত কিছুই না বাকি রয়ে গেল জীবনের। চলি বন্ধু, তুমি ভাল থেকো।

ওকে চলে যেতে দেখে ডাল থেকে টুপ করে পাকা ফলটা ফেলে দিই ওর পায়ের সামনে। নিচু হয়ে কুড়িয়ে নেয়। ধুলো মুছে গন্ধ শোঁকে। তারপর দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আবার একইরকমভাবে এক দৌড়ে চলে যায় বাগান ছেড়ে।

 

পরের বছর আমি আরও বড় হয়ে গেলাম। অনেক ডালপালা গজাল। ভরে গেলাম ফুলে।

এত লম্বা হয়ে উঠতে লাগলাম যে একদিন মালীবুড়োর নজরে পড়ে গেলাম। সে আমায় দেখে আনন্দে আত্মহারা। আমার সব ডাল, পাতা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। তার বিন্দুমাত্র পরিশ্রম ছাড়াই যে বাগানে এত সুন্দর একটা পিচগাছ হয়েছে, তাই দেখে ওর খুশি আর ধরে না। আমার মনখারাপটা বেড়ে গেল আরও। এই শয়তান মালী, যে কি না বাচ্চাদেরকে একটাও ফল না দিয়ে সব নিয়ে গিয়ে জমা করে ওই বজ্জাত মালিকের ঘরে, তার হাতে গিয়ে পড়ার কোনও ইচ্ছেই ছিল না আমার।

গোটা পনেরো ফল ধরতে শুরু করেছিল আমার ডালে। কিন্তু যেই দেখলাম সবগুলো ওই লোকগুলোর পেটে যাবে, নিজেকে ঘেন্না হল। আমাকে কত আনন্দের সঙ্গে বড় করে তুলছিল পুলাদ আর সাহেবালি, ওদের ছাড়া আর কাউকে আমি আর ফলের অধিকার দিতে চাই না।

মাথায় একটা বুদ্ধি এল। কাঁচা ফলগুলো একটা একটা করে ফেলে দিতে লাগলাম। যখন একটাও ফল বাকি থাকল না, মালী ভাবল বুঝি মাটির দোষ। বলল, দাঁড়া তোকে অন্য জায়গায় তুলে বসাব। পরের বছর তাহলে অনেক ফল দিবি।

বছর ঘুরে গেল। আমি যখন ঘুম ভেঙে উঠলাম, দেখলাম আমার জায়গা বদলে গেছে। শিকড়গুলো কয়েকটা ছিঁড়ে গেছে, কয়েকটা গেছে শুকিয়ে। যদিও বেশ কয়েকটা সুস্থ সবল আছে এখনও। আমি সেগুলোকেই ছড়িয়ে দিতে শুরু করলাম চারপাশে, জল, সার এসব সংগ্রহ করার জন্য। আরও ফুল আরও পাতার কথা ভাবতে ভাবতেই খেয়াল করলাম আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার মায়ের ঠিক পাশে।

তারপর কতগুলো বছর কেটে গেছে গুনিনি। তবে মালীবুড়োকে একটা ফলও দিইনি আমি আজ অব্ধি। ও আমায় করাতে শান দিয়ে কেটে ফেলার ভয় দেখায়। দেখাক ভয়, কত ভয় দেখাতে পারে দেখি…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4726 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...