অরণ্য সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল ২০২৩ এবং উত্তর-পূর্ব ভারত— আশঙ্কার সাতকাহন

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 


সংশোধন বিলে আনরেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার খুল্লামখুল্লা কমার্শিয়াল এক্সপ্লয়েটেশন শুরু হয়ে গেলে পাম অয়েল প্ল্যান্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট বৃক্ষচ্ছেদন মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। ইস্টার্ন হিমালয়-ইন্দোবার্মা বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট উত্তর-পূর্ব ভারত, বিপন্ন Bugun Liocichia পাখির হটস্পট অরুণাচল প্রদেশ, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটো জাতীয় পার্ক ধারণ করা সেভেন সিস্টার্সের অন্যতম অসম— অরণ্য সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল, ২০২৩ আরেকটা ইন্দোনেশিয়া ডেকে আনতে চলেছে কি?

 

১৮৪৫ সালের ৪ জুলাই থেকে ১৮৪৭-এর ৬ সেপ্টেম্বর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ওয়াল্ডেন পন্ড সংলগ্ন অঞ্চলে দুবছর নিভৃতাবাসের পর হেনরি ডেভিড থরো লিখেছিলেন— ‘I went to the woods because I wished to live deliberately, to front only the essential facts of life, and see if I could not learn what it had to teach, and not, when I came to die, discover that I had not lived.’ ১৭৫ বছর পর ২০২৩-এর ২৬ জুলাই ভারতীয় পরিবেশ আইনি ব্যবস্থার অন্যতম একটি পিলার আইনের রদবদল বা অ্যামেন্ডমেন্ট হল। ১৯৮০ সালের Forest (Conservation) Act-এর সংশোধন হয়ে Forest Conservation (Amendment) Bill 2023 পাশ হল লোকসভায়। কী বদল হল, তার কোনওরকম সুস্পষ্ট ধারণা অধিকাংশ সংবাদপত্র বা মিডিয়ার আলোচনায় নেই। তবে, ওয়াল্ডেনের ১৭৫ বছরের উদযাপন খুব আয়রনিকালি ভারতবর্ষে একটি আইন বদলের মাধ্যমে হয়ে গেল, এবং সম্ভবত আরও অনেক আশ্চর্য সংশোধনের গোড়াপত্তন শুরু হয়ে গেল। কোথায়, কীভাবে বদল, তাতে কার লাভ, কার ক্ষতি, দেখা যাক।

‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিব না’— এমনি একটি ক্লিশেপনার ভিত্তিতে বিলটি শুরুতেই বলে দিল কার্বন সিঙ্কের কথা। গালভরা সেই কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন এবং কার্বন সিঙ্কের মোহে বলা হল ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন টার্গেট বাড়ানো হবে ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন টন, এবং পাশাপাশি দেশের মোট স্থলভাগের এক তৃতীয়াংশকে বনভূমির আওতায় আনার এক সর্বান্তকরণ চেষ্টা হবে। এবং এই লক্ষ্যমাত্রা আসলে ২০৭০ সালের মধ্যে নেট জিরো এমিশন টার্গেটের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রার একটি অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে। অথচ, কী কী হল এই সংশোধনে? বলা হল, দেশের সীমান্তরেখার একশো কিলোমিটারের আশেপাশের সমস্ত এলাকার অরণ্য stratetic linear projects of national importance and concerning national security-র কারণে ১৯৮০ সালের অরণ্য সংরক্ষণ আইনের পর্যায়ে পড়বে না, অর্থাৎ এই সমস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অরণ্যকে কোনওরকম আইন ব্যতিরেকেই কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারবে। আরেকটু বিস্তৃত ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, কন্সট্রাকশন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে বিভিন্ন পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত দশ হেক্টর অবধি বনভূমি এবং লেফট উইং এক্সট্রিমিজম তালিকাভুক্ত অঞ্চলে জনসেবাকাজে, প্যারামিলিটারি ফোর্সের জন্য অথবা প্রতিরক্ষা বিষয়ক কাজে পরিকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত অন্তত ৫ হেক্টর পর্যন্ত বনভূমি অঞ্চল অরণ্য সংরক্ষণ আইনের আওতার ভেতর পড়বে না। এছাড়াও বলা হল, রেলট্র্যাক বা সরকার নিয়োজিত কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাস্তার আশেপাশের ০.১ হেক্টর পর্যন্ত অরণ্যকে পার্শ্ববর্তী হ্যাবিটেশন এবং রোডসাইড অ্যামেনিটিজের দোহাই দিয়ে ১৯৮০-র আইনের বাইরে রাখা হবে, এবং এখানেও সরকারের নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাচার। এতেও শেষ নয়। ১৯৮০-র আইনের section 2 অর্থাৎ exemption-এর তালিকাকে দীর্ঘ করে বলা হল, চেকপোস্ট, ফেন্সিং, ব্রিজ, চিড়িয়াখানা, সাফারি, ইকো-টুরিজম ইত্যাদি কাজে বনভূমিকে ব্যবহার করা হলে সেখানেও কেন্দ্র সরকার থেকে কোনওরকম অনুমতি লাগবে না। অর্থাৎ, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, অরণ্য, বন্যপ্রাণীর অবাধ বেঁচে থাকা হাস্যকররকম হিউম্যানসেন্ট্রিক সাফারিসাফারি খেলায় পর্যবসিত হলে তা নাকি ইকো-ট্যুরিজম, এবং এখানেও যুক্তি, বিজ্ঞান, পরিবেশভাবনার ছিটেফোঁটাও নেই।

‘Stratetic linear projects of national importance and concerning national security’— এই কারণের আওতায় পড়া সীমান্তবর্তী ১০০ কিলোমিটার অঞ্চলের ভেতরে থাকা কোনও অরণ্যই আর সেভাবে বনভূমির পর্যায়ভুক্ত নয়। গৃহমন্ত্রকের ডেটা বলছে, দেশের সীমান্ত অঞ্চলের পরিসীমা ১৫১০৬.৭ কিলোমিটার। এবং এই সীমান্তবর্তী একশো কিলোমিটারের ক্লজ ধরলে গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত চলে যাচ্ছে স্ট্র্যাটেজিক লিনিয়ার প্রোজেক্ট ইত্যাদি গালভরা গ্লসারির ভেতরে, সঙ্কট এমনই। এবং এই উত্তর-পূর্ব ভারতেই দেশের মোট dense এবং moderately dense ফরেস্ট-কভারের প্রায় ২১.৬৮ শতাংশ অবস্থিত। কন্ট্রাস্ট, কন্ট্রাস্ট, কন্ট্রাস্ট…

এই নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ শুরু হয়েছে, যা স্বভাবগত শাসক-প্রচারমাধ্যমের পেজ ওয়ানের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। গত ২২ আগস্ট মিজোরাম অ্যাসেম্বলি থেকে এই আইনি সংশোধনের বিরুদ্ধে রেজোলিউশন এনে কারণ হিসেবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে— ‘to protect the rights and interest of the people of Mizoram.’ মিজোরামের পরিবেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, এই একশো কিলোমিটারের স্ট্রাটেজিক ডেভেলপমেন্ট তত্ত্ব বজায় থাকলে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী প্রায় গোটা মিজোরাম রাজ্যের অরণ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। পড়শি নাগাল্যান্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক হিসেবে পরিচিত নাগা পিপল ফ্রন্ট থেকে নাগা অ্যাসেম্বলির স্পেশাল সেশন করে সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে হলফনামা দেওয়া হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, ত্রিপুরা, সিকিম— প্রতিটি রাজ্য থেকেই তুমুল প্রতিবাদ শুরু হয়েছে এই একশো কিলোমিটার তত্ত্বকে সামনে রেখে। কারণ এই একশো কিলোমিটারের মধ্যেই ইস্টার্ন হিমালয় এবং ইন্দো-বার্মা বায়োডাইভারসিটি হটস্পট অঞ্চল পড়ছে, যার ভেতর স্বাভাবিকভাবেই এসে যায় অসংখ্য বিপন্ন এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এই সংশোধনে সংবিধানের মূল ভিত্তিকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রথমত সংবিধানের সপ্তম তফসিলের ভেতর পড়া ইউনিয়ন লিস্ট, স্টেট লিস্ট এবং কনকারেন্ট লিস্টের বিভক্তকরণের ভেতর অরণ্য এবং অরণ্যে বসবাসকারী প্রাণীর সুরক্ষা পড়ছে কনকারেন্ট তালিকার ভেতর, অর্থাৎ অরণ্য সংক্রান্ত কোনও কিছু বদল বা সংশোধন কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য একইসঙ্গে করবে, কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে করতে পারবে না। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১ নম্বর ধারায় দেশের বারোটি রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সেই রাজ্যগুলিকে কিছু স্পেশাল প্রভিশন দেওয়া হয়েছিল। ৩৭১-এর A, C, G এবং H— এই চারটি সাবক্যাটেগরির বিশেষ সুবিধেয় পড়ছে যথাক্রমে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশের পার্বত্য অংশের বনভূমি এবং আদিবাসী অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলিতে কেন্দ্র সরকার নিজস্ব দাবিদাওয়া, স্বেচ্ছাচার ফলাতে পারে না। অথচ, অরণ্য সংরক্ষণ সংশোধন বিল সেই বিশেষ সুবিধেকে কার্যত নস্যাৎ করল। গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত এই মুহূর্তে একটি সুপ্ত আগুনের গোলার ওপর বসে। রাজনৈতিক, অধিকারগত এবং পরিবেশগত— সবদিক থেকেই, যখন যা খুশি হতে পারে।

এ-প্রসঙ্গে দেশের বৃক্ষচ্ছেদন এবং বনভূমির শতকরা পরিমাণ নির্ণয়ের একটি সাম্প্রতিক আয়রনির ওপর আলোচনা করা প্রয়োজন। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২১ সালে উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির ভেতর অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম এবং মেঘালয়ে বনভূমির পরিমাণ কমেছে যথাক্রমে ২৫৭, ২৪৯, ২৩৫, ১৮৬ এবং ৭৩ বর্গ কিলোমিটার। অথচ India State of Forest Report 2021 বলছে, সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষের বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ ২০১৯-২০২১-এর মধ্যে হয়েছে ০.২১ শতাংশ বা ১৫৪০ বর্গ কিলোমিটার, যা ২০১৩ থেকে ২০২১— এই সময়টা ধরলে বেড়ে হয়ে যায় ২ শতাংশ। কীভাবে? এখানেই আয়রনি। ‘ডাউন টু আর্থ’ পত্রিকার তরফে সুনীতা নারায়ণের নেতৃত্বে একটি দল সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্টে ফরেস্ট এরিয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭৭.৫৩ মিলিয়ন হেক্টর অথচ ফরেস্ট কভার মাত্র ৫১.৬৬ মিলিয়ন হেক্টর। এই পার্থক্য কেন? কারণ, বিশাল বনভূমি কেটে সেখানে চা-গাছ, সাধারণ গাছগাছালি লাগিয়ে ক্ষতিপূরণ করলেই তা আবার ফরেস্ট এরিয়ার আওতায় চলে যাচ্ছে, কারণ ফরেস্ট রিপোর্টে, এই টি-প্ল্যান্টেশন, মার্জিনাল এরিয়া প্ল্যান্টেশন বা কিছু কিছু মরুভূমি অঞ্চলকেও ওপেন ফরেস্ট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এ-প্রসঙ্গে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিকাল সায়েন্সেসের পক্ষ থেকে অধ্যাপক এমডি মধুসূদন বলছেন— ‘If you cut down a forest and grow tea, it can’t be called deforestation anymore, because it was forest earlier and is forest later. We have lost the vocabulary to describe this change.’ এখন, ১৯৮০-র অরণ্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দেশের ফরেস্ট এরিয়ার ভেতর শ্রেণিবিভাগ করলে তার ভেতর পড়ছে দুরকম ভাগ— ইনসাইড রেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়া (যার ভেতর পড়ে অরণ্য এবং সমস্ত স্বাভাবিক বনভূমি) এবং আউটসাইড রেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়া (যার ভেতর পড়ে টি-প্ল্যান্টেশন, আমবাগান, নারকেল প্ল্যান্টেশন ও অন্যান্য অ্যাগ্রো-ফরেস্ট্রি)। ডাউন টু আর্থের সমীক্ষা বলছে, স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্টের এই তথাকথিত ০.২১ শতাংশ বৃদ্ধি আসলে ওই আউটসাইড রেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার বৃদ্ধি, যা হাস্যকরভাবে তীব্র অরণ্যচ্ছেদনের বিকল্প হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আয়রনি এখানেই।

অন্ধকারের, প্রবল ভয়ের, আরও একটা দিক আছে। সংশোধন আইনে বলা হয়েছে, বন সংরক্ষণ আইন সেইসব বনভূমির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যে-সমস্ত বনভূমি সরকারের রেকর্ডেড এলাকার মধ্যে পড়ছে, অর্থাৎ সরকারি নথিতে ১৯৮০ সালের ২৫ অক্টোবর বা তার পর থেকে যেগুলি ফরেস্ট বলে চিহ্নিত আছে। অর্থাৎ, মানে দাঁড়াল, রেকর্ডেড নয়, এমন যে-কোনও অঞ্চল, তা যদি ঘন কোনও স্টান্ডিং ফরেস্ট এরিয়াও হয়, নির্দ্বিধাও সেগুলো কমার্শিয়াল এক্সপ্লয়েটেশনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, এবং তার জন্য কোনও অনুমতিও লাগবে না। এবং এই প্রসঙ্গে ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টে ‘টিএন গোদাবর্মণ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড আদার্স’ নামের ল্যান্ডমার্ক মামলার শুনানির বিচারটি উল্লেখযোগ্য। এই মামলা অনুযায়ী, সরকারি রেকর্ড ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে অভিধানে ‘ফরেস্ট’ বলে পরিচিত যে-কোনও অঞ্চলই বন সংরক্ষণের আওতাভুক্ত হবে এবং এইসব অঞ্চল ব্যবহার করতে গেলে সরকারের বনদপ্তর থেকে লিখিত অনুমতির প্রয়োজন। অর্থাৎ, ২০২৩ সংশোধন বিলের ফলে এই মামলার রায়ের আর কোনও বৈধতা থাকল না। সরকারি রেকর্ডেড ফরেস্ট নয়, এমন যে-কোনও অঞ্চলেই চলবে নির্দ্বিধায় বৃক্ষচ্ছেদন।

দেশের সাম্প্রতিক ২১.৭১ শতাংশ ফরেস্ট কভারের ভেতর Intact Natural Forest মাত্র ১২.৩৭ শতাংশ। এবং এই কারণেই মাত্র ২১ শতাংশ ফরেস্ট কভারের হিসেবকে অত্যন্ত মার্জিনাল এবং fragile বলে মনে করেন অধিকাংশ পরিবেশবিদ। এবং এই ফরেস্ট কভারের ২৭.৬২ শতাংশ বা ১,৯৭,১৫৯ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল তথাকথিত রেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার বাইরে পড়ছে, হিসেব করলে যার আয়তন পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কার সমান। সংশোধন বিলে এই অংশ আর সংরক্ষণের তালিকায় থাকছে না। ভারতের মোট ফরেস্ট কভার অর্থাৎ ৭,১৩,৭৮৯ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের মধ্যে রেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার বাইরে পড়া এই ১,৯৭,১৫৯ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের মধ্যে প্রথম পাঁচটি রাজ্য হিসেবে চলে আসে যথাক্রমে ওডিশা (১৯,৪৭০ বর্গকিমি), কর্নাটক (১৬,১৮২ বর্গকিমি), মহারাষ্ট্র (১৪,৭৫৮ বর্গকিমি), ছত্তিশগড় (১৩,২৫০ বর্গকিমি), ও মধ্যপ্রদেশ (১২,৭২১ বর্গকিমি)। এই আনরেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার মধ্যে ১২,০৩৭ বর্গকিমি (৬.১ শতাংশ) very dense forest, ৬৭,৩২৬ বর্গকিমি (৩৪.১৪ শতাংশ) moderately dense forest এবং ১,১৭,৭৯৬ বর্গকিমি (৫৯.৭৪ শতাংশ) open forest। অর্থাৎ হিসেব করলে এই সংশোধন বিল দেশের ১৯.৫১ শতাংশ dense এবং moderately dense ফরেস্ট এলাকার ওপর আঘাত হানছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের হিসেব ধরলে সেখানকার ৫০ শতাংশ অরণ্যই রেকর্ডেড ফরেস্ট হয়েও আনক্লাসড, অর্থাৎ কোনওরকম শ্রেণির মধ্যে পড়ছে না, যা কোনওরকম আইনের পর্যায়ভুক্ত নয়। নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, অসম ও মিজোরামে এই আনক্লাসড ফরেস্টের পরিমাণ মোট রেকর্ডেড ফরেস্টের যথাক্রমে ৯৭.৩, ৮৮.২, ৭৬, ৫৩, ৪৩, ৩৩ ও ১৫.৫ শতাংশ।

এরপর এসে যাচ্ছে, অরণ্য অধিকার এবং ট্রাইবাল-রাইটের বিষয়গুলো। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটিউট অফ রুরাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পঞ্চায়েতি রাজ-এর হিসেব অনুযায়ী দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ আদিবাসী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অরণ্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের জীবনজীবিকা চালাচ্ছেন। ২০০৬-এর ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট-এর মূল ভিত্তি ১৯৮০-র অরণ্য সংরক্ষণ আইন। এখন, ২০২৩-এর সংশোধন আইন ১৯৮০-র অনেকগুলো ক্লজ হালকা করে, দেশের প্রায় ২৮ শতাংশ অঞ্চলকে তথাকথিত ফরেস্ট এক্সপ্লয়েটেশনের পর্যায়ভুক্ত করায় আদিবাসী অধিকারে দীর্ঘকালীন এক প্রভাব ফেলে গেল। এখনও পর্যন্ত সিডিউলড ট্রাইব এবং আদার ট্র্যাডিশনাল ফরেস্ট ডোয়েলার শ্রেণিভুক্ত অরণ্যবাসীদের নিজস্ব জীবনযাপনের জন্য ফরেস্ট প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে স্থানীয় গ্রামসভা থেকে অনুমতি নিতে হত। সংশোধন বিলে এই ২৮ শতাংশ অঞ্চল অরণ্য সংরক্ষণের স্বাভাবিক সংজ্ঞার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ায় এইসব অঞ্চলের ফরেস্ট প্রোডাক্ট কিভাবে আদিবাসীদের অধিকারভুক্ত হবে, সে ব্যাপারে প্রশ্নচিহ্ন এসে গেল। এ-প্রসঙ্গে, আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা ছত্তিশগড় বাঁচাও আন্দোলন কমিটির পক্ষ থেকে অলোক শুক্লার মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ— ‘We need to realise that forests are not a commodity, forest is a way of life which is intrinsically connected to their culture. With this Bill we are taking away their rights from them.’

অন্ধকারচিন্তা একবার শুরু হলে, শুকনো দুপুরে অরণ্যে আগুনের মতো দ্রুত ছড়ায়। মনে পড়ল ইন্দোনেশিয়ার অয়েল পাম প্ল্যান্টেশনের ফলে শেষ হয়ে যাওয়া ওরাং-ওটাং প্রজাতিকে নিয়ে ২০০৯ সালে প্যাট্রিক রোক্সেল নির্মিত বীভৎস সত্য এক তথ্যচিত্র ‘GREEN’-এর কথা। ২০২৩-এর ৮ আগস্ট অসমের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন পতঞ্জলি ফুড লিমিটেডের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে রাজ্য সরকারের বৃহত্তর আকারে অয়েল পাম প্ল্যান্টেশন প্রকল্পের কথা, যার ফলে ৩,৭০,০০০ হেক্টর জমি মনোকালচার প্ল্যান্টেশনের আওতাভুক্ত হবে। পতঞ্জলি থেকে রাজ্যে ১৬টি নার্সারি তৈরি করে প্রকল্প রূপায়নের কথা ফলাও করে জানানো হয়েছে এবং সেই হিসেবে চাষিদের বীজ দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি এখনও টাটকা ২০২৩-এর জুন মাসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত মিজোরামের অয়েল পাম মনোকালচারের ভয়ঙ্কর দিক। মনোকালচার ব্যাপক হারে মাটির নিউট্রিয়েন্ট এবং জল টেনে নেওয়ায় সেইসমস্ত অঞ্চল খুব তাড়াতাড়ি খরাপ্রবণ হয়ে যায়। মিজোরামে এই অয়েল পাম মনোকালচারের ফলে চাষের পর ক্রপ পরিবহণে সমস্যা দেখা দেওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবে পচন শুরু হয় এবং অন্যান্য ফসল রোপণে অযোগ্য অনূর্বর মাটির তীব্র অনীহা দেখা যায়। এই সবের ফলাফল গোটা মিজোরামে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনোকালচার প্রকল্প। মিজোরামে এই ঘটনার পর চাষিদের বিন্দুমাত্র ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকার করে স্বাভাবিকভাবেই হাত তুলে নিয়েছিল তিন খাদক কোম্পানি— পতঞ্জলির রুচি সয়া, গোদরেজ এবং থ্রিএফ। এই স্মৃতি নিয়েই অসমে আবারও বেড়ে উঠছে মনোকালচার গডজিলা। আগুন বের করছে মুখ থেকে। এবং এখানেও খাদক সেই পতঞ্জলি। অরুণাচল প্রদেশের ৬২ শতাংশ বনভূমি আনরেকর্ডেড, আনক্লাসিফায়েড ফরেস্ট এরিয়ার ভেতর পড়ে। পতঞ্জলির রুচি সয়া কোম্পানির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়ে ২৫,০০০ হেক্টর জমিতে অয়েল পাম প্ল্যান্টেশন চলছে।

অরুণাচল প্রদেশের বিপন্ন পাখি Bugun Liocichia

কথা হচ্ছিল তথ্যচিত্র ‘GREEN’ নিয়ে। ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল প্ল্যান্টেশনের জন্য মাত্রাতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদনে বিপন্ন ওরাং-ওটাংগুলি বড় বড় বৃক্ষের শাখার অভাবে, খাবারের অভাবে, কাদা পচা গলা মাটিতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। গ্রিন তেমনই একটি ওরাং-ওটাং-এর মৃত্যুর আগের শেষ কয়েকদিনের ওপর তৈরি তথ্যচিত্র। ক্রেডিট রোলে লেখা হয়েছিল ‘ডিফরেস্টেশন ইন ইন্দোনেশিয়া ওয়াজ মেড পসিবল বাই উড ইন্ডাস্ট্রি, দ্য পাল্প অ্যান্ড পেপার ইন্ডাস্ট্রি, পাম অয়েল ইন্ডাস্ট্রি উইথ দ্য হেল্প অফ দ্য ফিনান্সিয়াল ইন্সটিটউশন্স, ক্রেডিট এজেন্সিজ, ব্যাঙ্ক অ্যান্ড ইন্সিওরার্স, দ্য পলিটিসিয়ান্স, দ্য ট্রেডার্স অফ ইন্দোনেশিয়ান উড, পাল্প অ্যান্ড পেপার, দ্য কোম্পানিজ ডেভেলপিং বায়োডিজেল ফ্রম পাম অয়েল অ্যান্ড দ্য কনজিউমার্স অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’। সংশোধন বিলে আনরেকর্ডেড ফরেস্ট এরিয়ার খুল্লামখুল্লা কমার্শিয়াল এক্সপ্লয়েটেশন শুরু হয়ে গেলে পাম অয়েল প্ল্যান্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট বৃক্ষচ্ছেদন মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। ইস্টার্ন হিমালয়-ইন্দোবার্মা বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট উত্তর-পূর্ব ভারত, বিপন্ন Bugun Liocichia পাখির হটস্পট অরুণাচল প্রদেশ, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটো জাতীয় পার্ক ধারণ করা সেভেন সিস্টার্সের অন্যতম অসম— অরণ্য সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল, ২০২৩ আরেকটা ইন্দোনেশিয়া ডেকে আনতে চলেছে কি? ক্রেডিট রোলে কেউ লিখছে ‘ডিফরেস্টেশন ইন নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া ওয়াজ পসিবল ফর …’?

 

তথ্যসূত্র:

  1. Vibhaw, Nawneet. What is the Forest (Conservation) Amendment Bill, 2023 and why it matters. ET Energy World. Jul 31, 2023.
  2. Zaman, Rokibuz. Why states in the North East are opposing the new forest law. Scroll.in. Aug 29, 2023.
  3. Sayeda, Zaina Azhar. Forest Law Amendment Will Make It Easier To Divert 28% Of India’s Forest Cover. IndiaSpend. Aug 7, 2023.
  4. India identifying, defining forests wrongly, say experts at Anil Agarwal dialogue. Down To Earth. Mar 3, 2022.
  5. Das, Nabojit. Oil palm plantations proved to be a disaster in Mizoram—is Assam next? Down To Earth. Sep 12, 2023.
  6. Chinai, Rupa. New forest laws and ‘development’ push: A prelude to a ‘land grab’ in India’s north-east? Frontline. Jun 2, 2023.
  7. Forest Conservation and Tribal Rights in Northeast India. Drishti IAS. Sep 7, 2023.

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...