গান্ধি: ইতিহাসের ক্যানভাসে

অশোক মুখোপাধ্যায়

 


আজকেও বিজেপি-র তরফে নানা অছিলায় গান্ধির নিন্দা সমালোচনা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে সেই আটচল্লিশি মনোভাবই কাজ করছে। এখন তাদের লক্ষ্য গান্ধিবাদের প্রভাব হত্যা। যারা দাঙ্গা লাগিয়ে দেশভাগ ত্বরান্বিত করেছিল— সাভারকর বা শ্যামাপ্রসাদ— তাদের জনমানসে নতুন করে সুপুত্তুর হিসাবে চাপাতে হলে, যিনি দাঙ্গা থামাতে নোয়াখালি ভাগলপুরে ছুটে যেতেন, তাঁর ভাবমূর্তিকে তো কোতল করতেই হবে

 

আবার সেই গল্পটা দিয়ে শুরু করি। আইনস্টাইনের নামে প্রচলিত। সত্য কিনা জানি না। কোথাও কোনও এক শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চক দিয়ে একটা সরল রেখা আঁকা হয়েছে। প্রশ্ন হল, না মুছে কীভাবে এটাকে ছোট করা যায়। উত্তর হল, নিচে একটা বড় সরল রেখা এঁকে দিলেই এটা ছোট দেখাবে।

আমি একজন কট্টর গান্ধিবাদ-বিরোধী লোক। তবু আজ তাঁর জন্মদিবসে তাঁকে কেন স্মরণ করতে বসেছি, বোঝানোর জন্য উপরের গল্পটা কাজে লাগবে। সেটা আগে বলে নিয়ে তারপর দু-চারটে প্রীতি ও অপ্রীতির কথা বলতে চাইব।

তিনি ধার্মিক রক্ষণশীল এবং সামাজিক ক্ষেত্রে প্রায় সমস্ত প্রগতিশীল চিন্তার বিরোধী ছিলেন। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে দু-চার কথা বললেও জাতপাতের সঙ্গে প্রায় আপসই করে গেছেন সারাজীবন। মননের গভীরে তিনি বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির ঘোর বিরোধী। সমাজতন্ত্রকে তিনি বড়ই অপছন্দ করতেন। গুজরাতের একজন খাঁটি জৈন বানিয়া পরিবারের সন্তান হিসাবে ধনতন্ত্রই তাঁর পছন্দের চায়ের কাপ। বিড়লা ট্যান্ডন থাপাররা তাঁকে প্রায় দেবজ্ঞানে ঘিরে থাকত এবং খদ্দরের টুপি পরে ঘুরত।

আজ ২০২৩ সালে সেই তাঁকে সামনে রেখেই সারা ভারতের প্রগতিপন্থী মানুষ এবং সংগঠন ধর্মীয় কট্টরতা, ঘৃণাবিদ্বেষ, জাতিবাদের ভয়ঙ্কর মশলা, দেশজোড়া নারী নির্যাতনের মাতন, ধর্ষকদের গৈরিক নৃত্যনাট্য, এবং আদানি আম্বানিদের চুরি জোচ্চুরি ডাকাতির বিরুদ্ধে লড়াইতে নামছে। রাজ্যে রাজ্যে। কেননা, নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির দল ও শাসন এই জায়গায় আজকে দেশকে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি পশ্চাদপদ ছিলেন। এরা দেখাচ্ছে, কর্পোরেট বানিয়ারাজ এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের প্রয়োজনে আরও কত পেছনে, আরও কত অন্ধকারে দেশকে টেনে নামানো যায়।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি মাঝপথে প্রগতির দিকেই আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে আছেন।

তাঁর সৌভাগ্যই বলতে হবে, জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করা সত্ত্বেও তিনি যে মনের গভীরে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী ছিলেন না, হিন্দুত্ববাদী ঘাতকদের হাতে নৃশংস মৃত্যুতে সেটা প্রমাণ করার সুযোগ পেলেন। সামনে থেকে দামোদরদাস-পূজ্য নাথুরাম আর গোপাল গডসে এবং পেছন থেকে দামোদরদাসের চিন্তাগুরু সাভারকর মিলেমিশে মোহনদাসকে শুধুই মারেনি, তাঁর সম্মানকে বাঁচিয়েও দিয়েছে।

হ্যাঁ, গান্ধির মধ্যে প্রচণ্ড স্ববিরোধ ছিল। ভাল-মন্দের। ভুল-ঠিকের। জাতিবাদ বনাম উদারতার। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা আর প্রশস্ততার। নীতি গ্রহণ ও বর্জনের। জেদ ও শোধনের। না, বিবেকানন্দের মতো নয়। একই কালে দুই দেশে দুরকম বক্তব্য নয়। শ্রোতা অনুযায়ী বক্তব্যের সুর পালটানো নয়। এ ছিল এক ধরনের দোলাচল। মানসিক দৃঢ়তার অভাব। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাব। শেষ বিচারে শ্রেণিগত ভূমিকা পালনের বাধ্যতা বনাম অনিচ্ছা। শ্রেণিস্বার্থ আর সদিচ্ছার দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যক্তির অপারগতা।

স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর যোগদান স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক নয়, বরং যথেষ্ট বিলম্বিত। নগদ টাকা রোজগারের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় গমন করে সেখানে ওকালতিতে যোগ দিয়ে তিনি নিজেকে স্বেচ্ছায় দেশের এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। কোনও এক স্টেশনে সেই সাদা সাহেব তাঁকে রেলগাড়ির প্রথম শ্রেণির কামরা থেকে কালা নেটিভ ভেবে নামিয়ে না দিলে ভারতীয়দের হয়তো আজ অবধি জাতি হিসাবে পিতৃহীন হয়েই থাকতে হত। সেই সাহেবকে মরণোত্তর ধন্যবাদ দিই আমি, না জেনে এই একটা ভাল কাজ করে ফেলার জন্য! অবুঝকে সচেতন করে তোলার জন্য।

স্বীকার করা ভাল, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধির দুটো বড় অবদান। খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, তিনি এই আন্দোলনকে দেশের ইংরেজি শিক্ষিতদের সীমাবদ্ধ প্রতিবাদী অভিভাষণ ও স্মারকলিপি নিবেদন থেকে বের করে এনে আমজনতাকে জড়িয়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনের আকার দিতে সক্ষম হন। তাঁর চরকা, তাঁর বিশ্বাস যাই হোক, স্বাধীনতার পক্ষে কোনও বড় হাতিয়ার না হলেও সেই জনতার হাতে দেশের কাজের একটা রূপক কর্ম হিসাবে জায়গা পায়। তিনি অহিংসার নাম করে যে সমস্ত আন্দোলন-পদ্ধতি নির্বাচন করেন— সত্যাগ্রহ, আইন অমান্য, অনশন, ইত্যাদি— অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য সহজপাচ্য কর্মসূচি হয়ে ওঠে। সকলেই অক্লেশে সানন্দে যোগদান করতে পারে। সেই থেকে আজ অবধি আমরা বামপন্থীরাও একই ক্রিয়াপন্থা ব্যবহার করে চলেছি। একটাও নতুন পদ্ধতি আমরা উদ্ভাবন করে বের করতে পারিনি। যদিও, সময় হয়েছে নতুন পদ্ধতি খুঁজে পাওয়ার।

দুই, তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত সার্বক্ষণিক সেবকদের জন্য আশ্রমের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপনও করেছিলেন বেশ কয়েকটি আশ্রম। সেই সব গান্ধি আশ্রম আজও নিভু নিভু হয়ে টিকে আছে। অথচ বামপন্থীদের অনেক কমিউন পার্টিমেস কিন্তু উঠে গেছে। কিংবা টিকে থাকলেও ভাল করে চলে না।

পাশাপাশি, স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধির নঞর্থক ভূমিকা তিন জায়গায়।

এক, ‘অহিংসা’কে একটা যুদ্ধের কৌশল হিসাবে গ্রহণ করার বদলে একে তিনি একটা মৌল নীতি হিসাবে চালু করতে চান। অন্য সব যায় যাক, অহিংসা রক্ষা করতেই হবে। বাস্তবে তাঁর এই অহিংসা ছিল কেবলমাত্র ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য। ব্রিটিশদের ব্যবহৃত বহুবিধ হিংসাকে তিনি সর্বান্তঃকরণে সমর্থন ও সাহায্য করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় স্থানীয় আদিবাসীদের বিরুদ্ধে, চিনের বিরুদ্ধে আফিম যুদ্ধে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও। টাকাপয়সা তুলে দিয়েছেন, মাল সরবরাহ করেছেন, সেনা নিয়োগে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে দিয়ে সহায়তা করেছেন। সেই সব ক্ষেত্রে ধারালো অস্ত্রের রক্তক্ষয়ী ব্যবহারে তাঁর প্রাণ মন হৃদয় বিবেক কাঁদেনি। তারপরেও যে তিনি বিশ্বে অহিংসার পূজারী হিসাবে গণ্য হয়েছেন, সে নিতান্তই ক্ষমতাশীল ও ক্ষমতাসীনদের নিরন্তর প্রচারের গুণে। আর সেই সুযোগে হিংসা-অহিংসার প্রশ্নটা আন্দোলনের মূল লক্ষ্যের চাইতেও বড় হয়ে উঠেছে। মূল লক্ষ্যকে গৌণ করে ফেলা সম্ভব হয়েছে।

দুই, অহিংসাকে নৈতিক শক্তি হিসাবে প্রচার করলেও রাজনীতিতে বিরোধীদের ক্ষেত্রে এই অহিংসার পূজারী বরাবরই অত্যন্ত অনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। সে গোপীনাথ সাহার ঘটনায় হোক, যতীন দাস-এর আত্মাহুতি বা ভগৎ সিং-দের ফাঁসির ঘটনায় হোক, অথবা সুভাষ বসুর দ্বিতীয়বার কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচনের সময়ে হোক। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের সময়কার কোটপ্যান্ট ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে যোগী বেশ পরে থাকার দরুন সেইসব অনৈতিক কার্যাবলি ইতিহাসে অনায়াসে চাপা পড়ে গেছে। আরও বড় ক্ষতি হয়েছে— এর ফলে কংগ্রেসি তথা ঘরোয়া রাজনীতিতে দ্বিচারিতা অনৈতিকতা একটা প্রামাণ্য আচরণবিধি হিসাবে মর্যাদা পেয়েছে।

আজ বিজেপি-র অনেক জঘন্য নীতিহীন দ্বিচারিতা ও মিথ্যাচার এরই প্রভাবে জনচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। সরল বুদ্ধিতে ধরা পড়ে না।

তিন, এক ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকে তিনি এক দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে প্রায় একাত্ম করে দিতে চেয়েছেন। করতে গিয়ে হিন্দু ধর্মের সমস্ত আচার বিচার কুপ্রথাগুলিকে বিভিন্নভাবে সমর্থন জুগিয়েছেন, সম্মান বৃদ্ধি করতে চেষ্টা করেছেন। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অনেক কথা বললেও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি, বরং নানা কায়দায় তাকে যুক্তিসম্মত প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন। ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত গোরক্ষা আন্দোলনের একজন উচ্চবাক প্রবক্তা ছিলেন তিনি।

ফলে তিনি যখন মুসলমান সম্প্রদায়কে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর কর্মসূচিতে টেনে আনতে চান, সেও মুসলিম সমাজের পিছিয়ে পড়া রক্ষণশীল চেতনাকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়েই। খলিফাতন্ত্র নামক এক মধ্যযুগীয় ধর্মাশ্রিত সামন্তরাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে তিনি স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে না পারেন মেলাতে, না পারেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে সামনের দিকে তাকাতে বলতে। রাম আর খলিফা মিলে সাম্প্রদায়িক “সম্প্রীতি”র যে স্বপ্ন তিনি খাড়া করেন, তা যত দিন গেছে স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেবল বিভক্তই করেছে, ঐক্যবদ্ধ করেনি। মুসলিম লিগের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন তাই স্বাধীনতা আন্দোলনের সমান্তরালে সেই ঝুটা সম্প্রীতির হাত কেটে বাড়তে থাকে।

তিনি যে হিন্দু ধর্মের সুর বাঁধতে থাকেন তা শেষ বিচারে মৃদু স্ব্বরে ব্রাহ্মণ্যবাদেরই গুনগুনানি হয়ে উঠতে থাকে। তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষ তাঁর প্রকল্পিত আসন্ন রামরাজত্বে শূদ্রত্ব প্রাপ্তির যে নিশ্চিতি পান তাতে তাঁদের দুশ্চিন্তা জেগে ওঠে। তাই তাঁরাও শেষ অবধি যে স্বতন্ত্র দলিত মুক্তির আন্দোলন গড়ে তোলেন তা স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠতে পারে না, এক অন্যতর পক্ষ হয়ে ওঠে।

আবার দলিতদের এক বড় অংশ তাঁরই মায়াজালের প্রভাবে দলিত-সৃজক সনাতন ধর্মের সমর্থক হয়ে ওঠে। কালক্রমে তাদেরই বৃহত্তর অংশ বিজেপি-র মুসলিম বিরোধী লাঠিয়াল পাইকে পর্যবসিত হতে থাকে।

পক্ষান্তরে, প্রকৃত ব্রাহ্মণ্যবাদীরা স্পষ্ট অনুভব করে, গান্ধির আন্দোলনে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্পষ্ট ঘোষণা নেই। সনাতন ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার কঠোর সঙ্কল্প নেই। এক উদার সর্ব ধর্মের সমন্বিত ভারতের স্বপ্নই তাতে দুর্বলভাবে হলেও বন্দিত। সুতরাং তারাও আর এক ভিন্ন ধারায় ব্রাহ্মণ্যবাদের নিজস্ব ইন্দ্রপ্রস্থ স্থাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

গান্ধির শক্তিশালী নেতৃত্বের আবেশেই, তাঁরই কর্মকাণ্ডের ফলে, স্বাধীনতা আন্দোলন এইভাবে চতুর্ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়।

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি এই ভুলগুলি জীবনের অন্তিম লগ্নে বুঝতে পেরেছিলেন। আজাদ হিন্দ সেনাবাহিনির অভ্যন্তরীণ সাফল্য ও বাহ্যিক ব্যর্থতার খবর থেকে। ১৯৪৬ সাল থেকে সেই একই গান্ধি রাজনীতি থেকে ধর্মকে ছেঁটে ফেলতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। সেই গান্ধিই অহিংসার ঠুন্‌কো চুড়িগুলি ফেলে দিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনির আটক শস্ত্রধারী সেনাদের নানাভাবে সাহায্য করতে ব্যস্ত হন। সেই তিনিই তখন গোরক্ষার আওয়াজকে কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিতে, সংবিধানের পাতায় নথিবদ্ধ করার বিরুদ্ধে কলম তুলে নেন। তখন তিনি যেন এক অন্য চরিত্র।

সারা ভারত আজ যে গান্ধিকে নিয়ে প্রতিক্রিয়ার অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাইছে, ১৯৪৬-৪৮ পর্যায়েই সেই গান্ধির আবির্ভাব ও বিকাশ। সেই তিনিই আমাদেরও শ্রদ্ধার্হ। অত বেশি বয়সে আজন্মলালিত সংস্কার এবং অভ্যাস কাটিয়ে ওঠা মোটেই সহজ কাজ নয়। তিনি পেরেছিলেন। আমাদের বামপন্থীদের মার্কসবাদীদের তা স্বীকার করতেই হবে।

দুঃখের কথা হল, একমাত্র তখনই তিনি আবিষ্কার করলেন, তিনি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনও গান্ধিবাদী নেই। তাঁর পদপ্রান্তে ভিড় জমিয়ে বসে থাকা গান্ধিটুপি পরিহিত নেতারা তাঁকে তখন রাজনীতির গুদামে বা ইতিহাসের আলমারিতে পুরে ফেলতে চান। তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেন। দেশভাগের পরিকল্পনায় কীভাবে তাঁকে প্যাঁচে ফেলে রাজি করানো যায় তার অঙ্ক কষেন!

ভারতের বুর্জোয়াদের গান্ধিনির্ভর কাজ গোছানো তখন প্রায় হাসিল হয়ে গেছে। জনরোষ জাগিয়ে ইংরেজকে ঠেলে গণবিপ্লবকে আপাতত (এখন আমরা জানি, বেশ অনেক দিনের জন্য) ঠেকিয়ে দেওয়া গেছে। দেশের বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ আর শাসকীয় কুর্সি হাতের নাগালে এসেই গেছে। ফলে “রঘুপতি রাঘব…” গানের ধুনে গলা মেলাতে তারা আর গান্ধির পেছন পেছন হাতজোড় করে ঘোরে না।

গান্ধিকে তখন সরিয়ে দেওয়া সহজ হয়ে যায়! ভারতের সবচাইতে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী দেশদ্রোহী সংগঠন আরএসএস-এর ঘৃণা বিদ্বেষের বন্দুক ঝলসে ওঠে। পঁচাত্তর বছর আগে।

আজকেও বিজেপি-র তরফে নানা অছিলায় গান্ধির বিরোধিতা নিন্দা সমালোচনা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে সেই আটচল্লিশি মনোভাবই কাজ করছে। শুধু গান্ধিহত্যার বদলে এখন তাদের লক্ষ্য গান্ধিবাদের প্রভাব হত্যা। যারা দাঙ্গা লাগিয়ে দেশভাগ ত্বরান্বিত করেছিল— সাভারকর বা শ্যামাপ্রসাদ— তাদের জনমানসে নতুন করে সুপুত্তুর হিসাবে চাপাতে হলে, যিনি দাঙ্গা থামাতে নোয়াখালি ভাগলপুরে ছুটে যেতেন, এমনকি পদব্রজে স্বাধীন পাকিস্তানে যাওয়ারও পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁর ভাবমূর্তিকে কোতল করতেই হবে।


*মতামত ব্যক্তিগত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...