নিশা

হিল্লোল ভট্টাচার্য

 

নিশাদের বাড়িতে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত দুর্গন্ধ নাকে এসে ঠেকত। এমনিতেই দারিদ্র্যের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে; তার ওপর ওদের বাড়িটা ছিল খাটালের পাশে। নিশার শোওয়ার ঘরের জানালার ওপারে একটা আবর্জনাময় ড্রেন। কিন্তু সব ছাপিয়ে এই মিশ্র ঘ্রাণের মধ্যে আলাদা করে বোঝা যেত নিশার দাদার গন্ধ, অনুপাতে সেটা সবচেয়ে গাঢ় হওয়ায়। সচরাচর বাইরের ঘরে বা বারান্দায় একটা জলচৌকিতে বসে থাকতে দেখেছি তাকে। সামনের দাঁত উঁচু। পায়ে একটা সমস্যা থাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত— ক্বচিৎ কদাচিৎ যখন স্থাবরাবস্থা ছেড়ে সে জঙ্গম হত। গায়ে এক বিকট দুর্গন্ধযুক্ত চর্মরোগ ছিল দাদাটির— যার নাম কখনও জানার প্রয়োজন বোধ করিনি। যখনই সে গা চুলকাত গোটা বাড়ি সেই পুতিগন্ধময় বাতাসে ভরে যেত। আমাদের এলাকায় নিশাদের বাড়ি নিয়ে আলাপ-আলোচনা, গল্প এবং জল্পনার অন্ত ছিল না। পাড়ার লোকে বাড়িটার নাম দিয়েছিল ‘ছেলেধরা’। চার বোনের নানা বয়সের বন্ধুর দিনভর আনাগোনা লেগে থাকত ও-বাড়িতে। নিশার বাবা-মা কাউকে তেমন বারণ করতেন না; শুধু তার দাদা মাঝে মাঝে উঁচু দাঁতের ফাঁকে একটু হেসে, রোদ পোয়াতে পোয়াতে, গা চুলকে নিত।

নিশাদের চার বোনই ছিল খুব মিশুক স্বভাবের। প্রথম তিনজন যৌবনবতী; নিশার পরের বোন উদ্ভিন্নযৌবনা। তাদের কখনও ওড়না ব্যবহার করতে দেখিনি। টাইট সালোয়ার, গলা-বুক অনেকখানি উন্মোচিত করা কামিজ অথবা লো-কাট ফ্রক— এই ছিল মোটামুটি চারবোনের ইউনিফর্ম। নিশার বড়দি, মেজদি কখনও-সখনও এসে আমার মাথার চুল ঘেঁটে, গাল টিপে দিয়ে হেসে বলত— কী সুন্দর, লম্বা টিকালো নাক তোর, হীরক! তাদের ঝুঁকে পড়া ক্লিভেজ আমার লম্বা নাকের বিপজ্জনক দূরত্বে চলে আসলে, আমি চোখ বন্ধ করে কল্পনায় মৃগনাভি কস্তুরির ঘ্রাণ অনুভব করার চেষ্টা করতাম। মোক্ষম সময়ে নিশার চর্মরোগী দাদা তার গায়ে নখ চালালে, বাতাস ভারী হয়ে আসত।

নিশার সঙ্গে আমার আলাপ নাটকের দলে। কিছুদিন রিহার্সালের পরই অভিজ্ঞ সুব্রতদা একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, হাওয়া খারাপ, হীরু, সাবধানে থাকিস।

আমি নিচু পাঁচিলটার ওপর সুব্রতদার পাশে বসে, একটা বিড়ি চেয়ে নিয়ে অবাক হয়ে বললাম, কেন গো?

দুনিয়াদার হলুদ চোখ জবাব দিল, তোর পাশে দেখ, তোর পার্ট যখন চলছিল, একটা পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে ‘H’ লিখেছে।

চমকে পাশ ফিরে দেখলাম কথাটা সত্যি। পাঁচিলের ওপর বেশ গাঢ়ভাবে কেটে খোদাই হয়ে গেছে আমার নামের আদ্যক্ষর— নাটকের দলে আর কারও নাম ওই অক্ষর দিয়ে শুরু না হওয়ায়, সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। ঘটনাপ্রসঙ্গে সে-দিনই মহড়া একটু দেরিতে ভাঙায়, নিশাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ল। বাকি বোনদের সঙ্গে আলাপ আমার সে-রাতেই। প্রথমদিনই সবার মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ ব্যবহার আমাকে বেশ অবাক করেছিল। নিশার মা বললেন, জানো হীরক, কাল রাতে ভূত এসেছিল আমাদের বাড়িতে…

—সে কী, কীরকম? ভৌতিক গল্পের গন্ধ পেয়ে মোড়ার ওপর নড়েচড়ে বসলাম আমি।
—বাথরুমের বেড়ার কাছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেছে সারারাত…

বাতার বেড়া দেওয়া কলঘরের দিকে অবাক হয়ে তাকালাম আমি। নিশার বড়দির মুখে ছাইয়ের রং। আমার বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ল, রমেন মল্লিকের বড় ছেলের সঙ্গে বড়দির মাখোমাখো সম্পর্কের গল্প এখন পাড়ায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। রামকিশোর ঘোষের আমবাগানে আপত্তিজনক অবস্থায় দিন কয়েক আগেই তাদের দেখেছে গ্রামের লোক। আজই নাটকের দলে কানাঘুষো শুনছিলাম, মল্লিকবাড়ির বড় ছেলে হরিপদ খুব মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ-বাড়ির আশেপাশে রাত-বিরেতে তাকে দেখা যাচ্ছে। আন্দাজে হাতড়ে হাতড়ে একটা অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছিলাম আমি। হঠাৎ একটা শব্দে চমকে ফিরে তাকালাম। দাওয়ায় বসে উঁচু দাঁত বের করে হাসছে পঙ্গু দাদা। তার চোখে তাকিয়ে মনে হল, আমার প্রতিপাদ্যে সম্মতির শিলমোহর লাগিয়েছে। ভক করে তার চর্মরোগের গন্ধটা আমাকে নাকে এসে লাগল।

নিশাকে আমি ঘৃণাই করতাম; চারবোনকেই, কিন্তু অদম্য আকর্ষণ এড়াতে পারতাম না। কেন যে মাসে দু-একবার ও-বাড়িতে যেতাম— আমার নিজের কাছেও তা অজানা। প্রতিবার ফিরে এসে প্রতিজ্ঞা করতাম— আর যাব না; তবু দিন কুড়ি পরপর অসহ্য ছটফটে দুপুরের দহনে আমার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ত। নাটকের দলে সুব্রতদা সহ আরও অনেকে বেসুরো গলায় মান্না দের গান গেয়ে আমার পেছনে লাগার চেষ্টা করত, যদি কাগজে লেখো নাম— তবু জানতাম নিশার হৃদয় কখনও আমার একার নয়। সম্পূর্ণ, আনডিভাইডেড অ্যাটেনশন দেওয়ার মতো সমর্পিত মন তার তৈরি হয়নি। ওটা ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট, সম্ভবত ফ্যাক্টরিতেই আছে। আমি কি চাইতাম? আমি কী চাইতাম? কেন চাইতাম? এ-আশা করা কি অন্যায় ছিল না? যাকে আমি ঘৃণা করি— বুক বাজিয়ে যে অপছন্দের কথা সবার মাঝে বলে বেড়াই, তার কাছে কোন ক্ষীণ প্রত্যশা আমার ছিল? ওদের বাড়িতে বোধহয় সাজানোগোছানো ভেতরের ঘর একটাই ছিল, যেটা নিশার শোওয়ার ঘর। অবশ্য কজন সহোদরা ওই ঘরের সহ-বাসিন্দা ছিল— আমার ঠিক জানা নেই। অন্য কোনও বোনের বন্ধু আগে থেকেই উপস্থিত হলে, সেদিন ও-ঘরে প্রবেশ নিষেধ। বারান্দায় মোড়ার ওপর বসে, গল্পগাছা করে, হাতপাখার হাওয়ায় লাল চা খেয়েই উঠে পড়তে হত। বরুণ মাস্টারের ছেলেকে প্রায়ই দেখি আজকাল এ-বাড়িতে। নিশার ছোটবোনের ওপর তার কু-নজর— গাঁয়ের হাওয়ায় তাজা খবর এখন। প্রতিবছর পুজোয় নতুন জামা পরার মতো, নিজের থেকে বয়সে অনেক ছোট মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জন্য তার ঘোর বদনাম গ্রামে। মাঝেমাঝেই এ-বাড়ির ছোট মেয়েটাকে নিয়ে ভেতরের ঘরে ঢোকে, পর্দাটা টেনে দিয়ে। পর্দার আড়ালে যেতে যেতে, ডবকা মেয়েটার ফ্রক পরা পশ্চাৎদেশে হাত বুলোতে বুলোতে, আমার দিকে তাকিয়ে কালো দাঁতে ঝিলিক তোলে ছোঁড়াটা, আমি ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিই। অবশ্যম্ভাবীভাবে চোখ চলে যায় জলচৌকিতে বসা নিশার দাদার ওপর। বারান্দায় বসলে তার চর্মরোগের নৈকট্যে শ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। কোনওক্রমে বেরিয়ে নালার কাছে এসে বমি করে ফেলেছি কতদিন!

 

দুই.

নিশা কথাটা আমাকে আগেও বলেছে, একাধিকবার— জানো হীরকদা, আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার খুব শখ; নিয়ে যাবে আমাকে নর্থ-বেঙ্গলে? আমি জবাব দিইনি। কলেজে পড়ি, চাকরি-বাকরি নেই; পড়াশোনার গতিপ্রকৃতি যে পথে এগোচ্ছে— অদূর ভবিষ্যতেও অর্থ-সংস্থানের খুব একটা সম্ভাবনা দেখি না। কীভাবে এ প্রতিশ্রুতি দিই একটা মেয়েকে? খামোখা, মন রাখার জন্য কাউকে একটা ঝুটো স্তোকবাক্য দিতে আমার মন সায় দেয় না। ভেতর থেকে বিশ্বাস না করলে, স্রেফ ওপর-ওপর কোনও কথা আলগাভাবে ভাসিয়ে দেওয়া আমার ধাতে নেই। পাহাড় দেখানোর স্বপ্ন এড়িয়ে যাই আমি। প্রস্তাবখানা আগা-পাশ-তলা তলিয়ে ভাবলে অবশ্য অনেককিছু। যাকে বিয়ে করব— কোনওদিন যদি কাউকে করি— তাকে হানিমুনে নর্থ-বেঙ্গলে নিয়ে যাওয়াই যায়। খুব একটা দুরূহ কিছু নয়। কিন্ত নিশা কি আমাকে প্রচ্ছন্নভাবে সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি হঠাৎ বাড়িতে না বলে, পালিয়ে, একটা বিবাহ-বহির্ভূত অ্যাডভেঞ্চারের ইচ্ছে তার? যদি চলেও যাই আমরা কি হোটেলে একসঙ্গে থাকব? মানে একঘরেই? থাকতে দেবে হোটেল কর্তৃপক্ষ এই বয়সী দুটো ছেলে-মেয়েকে? পয়সা দিলেই কি থাকা যায়? যদি তারা মেনে নেয়, তাহলে? ফিরে এলে, যখন সব জানাজানি হবে, তখন একটা কেলেঙ্কারি হবে না? গ্রামেগঞ্জে এখনও বোধ হয় এসব দুষ্কর্মের শাস্তি হিসেবে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে দেওয়ার রীতি আছে। অসম্ভব, আমার ঢেউ খেলানো চুল আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সম্পত্তি। নিশার জন্য আমি তা কুরবান হতে দিতে পারব না। তাছাড়া, আমাদের আচার্য পরিবার গোঁড়ামির জন্য গোটা জেলায় বিখ্যাত। জ্যেঠু আমাকে খড়মপেটা করে গাঁ-ছাড়া করবেন। না, এ অসম্ভব। উফফ! মাথা ধরে বসে পড়ি আমি। আর ভাবতে পারি না।

আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে সুব্রতদার বুকে বিড়ির ধোঁয়া আটকে যায়। খানিক হেসে, কেশে, চোখের জল মুছে চোখ বড় বড় করে বলে, শালা, হীরু, তোর কি মাথা খারাপ? অ্যাদ্দুর কেউ ভাবে, বাঞ্চোত ছেলে? ওটা একটা কথার কথা। তোর বৌদিও এরকম বায়না করে মাঝেমাঝে। যে-রাতে আমার মুড হয় বলি, হ্যাঁ, সোনা, সামনের বছরই ব্যাঙ্কক-পাটায়া কনফার্ম। তার পর জল খেয়ে শুয়ে পড়লে সকালে ওর-ও আর মনে থাকে না। আমি চুপ করে বিড়ি ধরাই। মুর্শিদাবাদের কালো সুতোর তামাকের সঙ্গে বাস্তবতার তেতো স্বাদ আমার জিভে জড়িয়ে যায়।

সুব্রতদার চোখে দুষ্টুমি ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তুই-ও ইচ্ছে হলে বলিস, নিয়ে যাব— আবার পরক্ষণেই স্বর পাল্টে সতর্কবার্তা দেয়, ও বাড়িতে বেশি যাস না, হীরু, কালা জাদু-টাদু জানে ওরা। হরিপদকে দেখিস না কেমন নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে বড়মেয়েটা? ভাঙা নিচু পাঁচিলের ওপর বসে বসে দেখি রিহার্সাল শেষ হয়েছে। নতুন একটা ছেলে নিশার পাশেপাশে সাইকেল নিয়ে হাঁটছে, বোধহয় সে-ই আজ ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। কথা বলতে বলতে খুব হাসছে দুজনে। ছেলেটার হাতের উল্টোপিঠটা ঘষে যাচ্ছে মাঝেমাঝে নিশার হাতে, হয়তো অজান্তেই— নাহ, বোধহয় ইন্টেনশনালিই।

—নতুন মুরগা, তবে এ ছোঁড়া স্মার্ট আছে; তোর মতো বোকাচোদা না। মন্দারমণিতেই ডিল ফাইনাল করবে। বিড়িতে শেষ টান দিয়ে, ঘৃণাভরে ছুড়ে দেয় সুব্রতদা। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখি ঘাসের ওপর জ্বলন্ত বিড়ির টুকরো থেকে একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটবে কি? নাহ, মরা আগুন নিভে আসে ধীরে।

বাড়ি ফিরে গোলাপি রঙের ফুল-পাতা আঁকা কবিতার খাতাটাকে কুচি কুচি করে ছিঁড়লাম। তাতেও রাগ পড়ল না। ছেঁড়া পাতাগুলোকে ছাদের ওপর নিয়ে গিয়ে আগুন লাগিয়ে দিলাম। হঠাৎ আগুন বেশ দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে, ভয় পেয়ে আবার তড়িঘড়ি এক বালতি জল নিয়ে এসে ঢেলে তাকে শান্ত করলাম। কে জানে কেন আগুনকে আমার খুব ভয়, ছোটবেলা থেকেই। কোথাও একটু স্ফুলিঙ্গ দেখলেই মনে হয় বিরাট অগ্নিকাণ্ড হয়ে যাবে না তো? খবরের কাগজে যেমন পড়া যায় অসতর্কতায় বাড়ির খড়ের চালে কেউ বিড়ির টুকরো ছুড়েছে­— বিধ্বংসী আগুনে ছাই বাড়িঘর। কিংবা শহরের দিকে কোনও দাহ্য কেমিক্যাল রাখা কারখানা শর্ট-সার্কিট থেকে ভস্মীভূত। আমাদের অঞ্চলে গ্যাসের চল নেই তেমন; তবে রান্নাঘরে সিলিন্ডার লিক করে, ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গৃহবধূর মৃত্যু— এমন তো কতই শোনা যায়। আগুন নিভতেই ভয় কমে গিয়ে আবার রাগটা ফিরে এল। নিশাকে ভেবে কবিতা লিখেছি এতদিন, ছিঃ! নিজের ওপর ঘেন্না ধরে যায়। নিশার মুখে অদ্ভুত সারল্য; যেন সবাইকে বিশ্বাস করে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়। সবাইকে ভালবাসতে চায়। কাউকেই অবাঞ্ছিত ভাবে না। বঞ্চিত, অবহেলিতর তালিকায় ঠেলে দেয় না কাউকেই। কিন্তু নিশা চরিত্রহীনা; ওর মুখটাকে মনে মনে টুকরো করে কাটি। ছুরির ঘায়ে ফালাফালা করে দিই। আগুন ধরিয়ে দিই। নিশা অনেকের সঙ্গে পাহাড় যেতে চায়। নতুন ছেলেটাকেও একই কথা বলেছে— নিশ্চয়ই বলেছে। মুখের মধ্যে থুথু জমে ওঠে। কিন্তু ওর চোখ দুটো খুব নিষ্পাপ। হঠাৎ সে-কথা মনে করেই মনে মনে একরাশ জল ছুড়ে আগুন নিভিয়ে দিই। যাক ওর চোখ দুটো বেঁচে গেছে এ যাত্রায়। মুখের-ও বেশিরভাগটাই অক্ষত। অসহ্য সুন্দর মুখটাকে আমার বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ি আমি।

 

তিন.

ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার— এক অলস, ঘোলাটে রবিবারে ঘুম ভেঙে উঠে, বিস্বাদ মুখে ডায়েরির পাতা উল্টোতে উল্টোতে কথা কটা উচ্চারণ করে বললাম। দেখলাম, শেষ পাঁচদিন ধরেই আমি দিনপঞ্জিতে একই কথা লিখেছি, আন্ডারলাইন করে— ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। পাতা উল্টে দেখলাম, শুধু এখানেই থেমে থাকিনি, কস্ট-বেনেফিট অ্যানালিসিসের মতো যুক্তি-প্রতিযুক্তি সাজিয়ে একটা সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি। লেখা আছে, নিশাকে আমি ঘৃণা করি। সে-ও স্পষ্ট করে কখনও আমাকে বলেনি যে সে আমাকে ভালবাসে। একটা পাতায় দেখলাম ‘দুশ্চরিত্র’ ছাড়াও ‘চিপ’, ‘গায়ে ঢলা’ আর ‘শেমলেস’ লিখেছি। প্রত্যেকটি শব্দের পরে ‘!’ দেওয়া। একটু দুর্ভাবনা হল— ‘দুশ্চরিত্র’ কথাটা কি ঠিক লিখেছি? স্ত্রী-লিঙ্গে ‘দুশ্চরিত্রা’ হবে না? কোথাও লিখতে গিয়ে বানান বা ব্যকরণ ভুল হলে আমার খুব মন খুঁতখুঁত করে। যা-হোক সেটা বড় কথা নয়— কিন্তু কোনওভাবেই এই রক্ষণশীল বৈদিক ব্রাহ্মণ বাড়ির বউ হিসেবে তাকে কল্পনা করা যায় না। অতএব এ-সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। সুতরাং এই ল্যাঠা চুকিয়ে দেওয়াই ভাল। অথচ… অথচ কোন অলঙ্ঘনীয়, চৌম্বকীয় আকর্ষণে তার কাছে আমি ফিরে ফিরে যাই? পুড়তে? পতঙ্গের মতো? তার শরীরের স্বাদ জানিনি তো। ছুঁইনি তো এখনও। খোলামেলা পোশাকে, ভরাট শরীর শুধু বিপজ্জনক দূরত্বে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে বারবার। হাসির ছলে বড়জোর হাত ধরেছে কখনও। আমি কি চাইলেই ছুঁতে পারি না? ওদিক থেকে কি যথেষ্ট ইশারা নেই? ক্রমাগত প্রশ্রয় দেয়নি তার হাসি? তার ইঙ্গিত এখনও বুঝতে না পারা আমার নিতান্তই অপদার্থতা নয়? শুধু সাহস করে আরেকটু এগোইনি বলেই কি নিশার শরীর আজও আমার অচেনা? পর্দার আড়ালে ওকে এক ঝটকায় কাছে টেনে নিলেই সব দূরত্ব ঘুচে যাবে। কেউ আপত্তি করবে বলেও তো মনে হয় না। কিন্তু ছিঃ! এ কী ভাবছি আমি! ভালবাসব না, বিয়ে করব না— এ-কথা নিশ্চিত জেনেও শুধু শরীরের স্বাদ কি লালসা চরিতার্থ করা নয়? আমার পাপ হবে। হ্যাঁ, হ্যাঁ মহাপাপ। শাস্ত্রমতে এই ভোগ নিশ্চয়ই মহাপাতক; ঘৃণ্য অপরাধ। পাপকে আমার খুব ভয়, ছোট থেকেই— অ্যাকচুয়ালি আমাদের পুরো আচার্য বাড়িরই। আগুনের থেকেও বেশি ভয়— পাপ হয়ে গেলে! অতএব, “ব্যাপারটার একটা ফয়সালা হওয়া দরকার”— স্থির সিদ্ধান্তে উঠে দাঁড়িয়ে, গায়ে জামাটা গলিয়ে, আমি পা বাড়ালাম নিশার বাড়ির উদ্দেশে। পাপের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ করা ভাল।

নিশাদের পাড়ায় বেশ কিছুকাল আসিনি। ইনফ্যাক্ট, একটানা কলেজ চলার ফলে এবার গ্রামেই ফিরেছি অনেকদিন পর, তাই খবরটা পাইনি। নিশার বাবা-ই জানালেন, দুদিন আগে বড় মেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে রমেন মল্লিকের ছেলে হরিপদর সঙ্গে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা কালীঘাটে মালাবদল করেছে; এখন এক আত্মীয়র বাড়ি গিয়ে উঠেছে কোন্নগরে। অদ্ভুত কুণ্ঠিত মুখে, একটু হেসে, খবরটা দিলেন এ-গ্রামের প্রৌঢ় পোস্টমাস্টার। আমি তাঁর চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েও পড়ে উঠতে পারলাম না— সেখানে লোকলজ্জার গ্লানি কতটা আর ঘাড় থেকে একটা বোঝা নেমে যাওয়ার স্বস্তিই বা কতখানি। আজ বাড়ি অনেকটাই ফাঁকা। বাকি দুইবোনকে নিয়ে মা গেছেন কোনও এক আত্মীয়র বাড়ি; নিশা একা। দুঃখিত মুখে ভদ্রলোক আমার জন্য চায়ের জল চড়াতে গেলেন। অবশ্য স্থাবর সম্পত্তির মতো জলচৌকিতে আসীন দাদা আছে বারান্দার এক কোণে। আজ আর আমাকে দেখে সে হাসল না। নিশা ভেতরের ঘরে ছিল, জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। আমার পায়ের আওয়াজে ফিরে তাকাল। একটু হেসে সে আবার তার পুরনো প্রশ্নটা করল,

—এখানে ভাল লাগছে না হীরকদা, আমাকে নিয়ে যাবে পাহাড়ে? কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাতে?

নিশা আজ বোধহয় ছোটবোনের ফ্রকটা পরেছে। ওর শরীরে আরও আঁটোসাঁটো হয়ে চেপে বসেছে। জামার একটা বোতাম খোলা— বোধহয় অন্যমনস্কতার কারণেই। আমি সম্মোহিতের মতো ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। যৌবন যেন ফেটে বেরোচ্ছে। হঠাৎ জানালার ওপাশ থেকে বাতাস বইতেই এক ধাক্কায় সম্বিৎ ফিরল।

—প্লিজ, নিশা, জানালাটা বন্ধ করে দাও, গন্ধে টেকা যাচ্ছে না— আমি রুমাল দিয়ে নাকচাপা দিলাম। নিশা জানালাটা বন্ধ করে, তার ওপরে হাত দিয়ে একটা পট-পরিবর্তনের মতো ভঙ্গি করে হাসল, যেন জাদুমন্ত্রবলে ওপারের নালাটা কোনও শৈল-শহর হয়ে যাবে!
—এবার, এবার ঠিক আছে? এক-পা এগিয়ে আসে আমার দিকে।

ঘরের বাতাস তখনও ভারী হয়ে আছে। দুর্গন্ধ একবার নাকে এলে চট করে তার রেশ যায় না। আমি কিছু বলছি না দেখে, নিশা আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়। জামার আরেকটা বোতাম খুলে ফেলেছে। শরীরটা যেন ফ্রক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে এবার। পূর্ববর্তী বিপজ্জনক দূরত্বের সীমারেখা অতিক্রম করে আমার নাকের একেবারে কাছে ওর বুক নিয়ে এসে বলল,

—এখন? এখনও পাচ্ছ না আমার পারফিউমের স্মেল?

আমার মুখটাকে নিজের কাছে টেনে নেয় নিশা। নিজের ভেতরে। ঘোরের মধ্যে দরজার পর্দাটা টানতে ভুল হয়ে যায় আমার। কতক্ষণ এরকম নেশাগ্রস্তের মতো ছিলাম জানি না। দরজার কাছে একটা চায়ের কাপ-প্লেটের ঠকাঠকির আওয়াজ হতেই ছিটকে ফিরে তাকালাম। ওর বাবার দিকে দৃকপাত না করে, টলতে টলতে বেরিয়ে এলাম আমি। বারান্দায় নিশার দাদা হাসছে। প্রচণ্ড জোরে সে নিজের হাত-পা চুলকোচ্ছে। ওর চর্মরোগের একটা জমাট দুর্গন্ধ যেন আমাকে চিরতরে গ্রাস করে নিল। একটা চলমান দুর্গন্ধের অবয়ব হয়ে আমি বাইরের নালার কাছে এসে দাঁড়ালাম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4721 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...