ব্রেশটের নাট্যতত্ত্ব, অ্যারিস্টটল, ও আমরা

দত্তাত্রেয় দত্ত

 


ব্রেশট-চর্চা আসলে নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধতারই একটা প্রকাশ, একথা নিশ্চিত। কিন্তু সেই সঙ্গে আরও একটা দায় আমাদের ওপর এসে পড়ে: সেটা এই যে ব্রেশটের তত্ত্ব সম্বন্ধে যেসব ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত, সেগুলোকেও ঝাড়াই-বাছাই করে দেখা যে ব্রেশটীয় তত্ত্বের মৌলিকত্ব হিসেবে আমরা যা জানি, সেটা সঠিক অর্থে মৌলিক কিনা, বা মৌলিক হলে ঠিক কোন্‌ অংশে মৌলিক

 

এক অভিনেত্রীকে পাশ দিয়ে যেতে দেখে হের কয়নার বললেন, ‘মেয়েটি দেখতে সুন্দর’। তাঁর সঙ্গী বললেন ‘সুন্দরী বলেই মেয়েটি ইদানীং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।‘ হের কয়নার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘মেয়েটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে বলেই সুন্দরী।—ব্রেশট

আমি হলাম আধুনিক থিয়েটারের আইনস্টাইন।—ব্রেশট

ব্রেশটকে আমরা বলি বিশ শতকের পূর্ণতম নাট্যব্যক্তিত্ব। কি নাট্যরচনায়, কি প্রযোজনায়, কি নাট্যতত্ত্বে— সর্বত্রই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন। সেই প্রতিভাকে ফিরেফিরতি স্বীকার করার অর্থ হল তাঁর অবদানকে আরও একবার করে আত্মস্থ করা। অর্থাৎ ব্রেশট-চর্চা আসলে যে নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধতারই একটা প্রকাশ, একথা নিশ্চিত। কিন্তু সেই সঙ্গে আরও একটা দায় বোধহয় আমাদের ওপর এসে পড়ে: সেটা এই যে ব্রেশটের তত্ত্ব সম্বন্ধে যেসব ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত, সেগুলোকেও মাঝে মাঝে ঝাড়াই-বাছাই করে দেখা যে ব্রেশটীয় তত্ত্বের মৌলিকত্ব হিসেবে আমরা যা জানি, সেটা সঠিক অর্থে মৌলিক কিনা, বা মৌলিক হলে ঠিক কোন্‌ অংশে মৌলিক। উপরন্তু এ-ও দেখতে হয় যে সেই মৌলিকত্ব দর্শকের অভিজ্ঞতায় কোন্‌ নতুন মাত্রা যোগ করছে।

অবশ্য প্রতিভা কোনওকালেই একেবারে আক্ষরিক অর্থে মৌলিক নয়; নিহিতার্থেই মৌলিক। তবু প্রতিভাধররা সব যুগেই পূর্বতন চর্চা ও পূর্বসূরিদের দৃষ্টিভঙ্গির যাথার্থ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, এবং চিন্তায় ও সৃজনে স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গির যাথার্থ্যের প্রমাণ রেখেছেন। সেখানেই তাঁদের প্রতিভার সার্থকতা। অথচ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পূর্বসূরিদের অবদানও যে তাঁরা আত্মস্থ করে নিচ্ছেন, সেকথা তাঁরা স্বীকার করুন বা না-করুন, আমরা লক্ষ করতে ভুলে যাই। ফলত আমাদের যে-লোকসানটা ঘটে সেটা এই যে, ঐতিহ্যের একটা ধারাবাহিকতার প্রেক্ষিতে প্রতিভাধরকে স্থাপন করে তাঁকে ঐতিহ্যের সঙ্গে সমন্বিত করে নিতে আমরা পারি না। হয়তো এর কারণ উপস্থিত প্রতিভার দ্যুতিতে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়— নিকটতর সূর্যের রৌদ্রে বৃহত্তর নক্ষত্রের দীপ্তি আমাদের নজরে আসে না। আবার আর একটা কারণ এ-ও হতে পারে যে প্রতিভাধর ও ঐতিহ্য— এ-দুয়েরই সম্বন্ধে আমাদের ধারণা কিছুটা ঝাপসা; কারণ তা শোনা-কথার ওপর নির্ভরশীল। এইসব প্রসঙ্গে দু-এক কথা— ব্রেশটের প্রথম নাটক Baal-এর প্রযোজনার শতবর্ষয় এসে— হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

 

ব্রেশটের নাট্যতত্ত্ব non-Aristotelian বা ‘অনাস্ততলীয়’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এ-প্রসঙ্গে প্রবাদ এই যে, তাঁর তত্ত্ব অ্যারিস্টটলের তত্ত্বকে খারিজ করে এক নতুন নাট্যতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রবাদটাই প্রাথমিকভাবে একটু নেড়েচেড়ে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, নাটক যে অনুকরণ, এ-বিষয়ে এই দুই চিন্তাবীরের কোনও মতদ্বৈধ নেই। ব্রেশট তাঁর নাট্য-উপস্থাপনায় ঘটনাগুলির ঐতিহাসিক বা অতীতভিত্তিক চরিত্রের ওপর এত জোর দিয়েছিলেন, “ঘটনাগুলো ঘটছে না, করে দেখানো হচ্ছে মাত্র”, এ-ব্যাপারটা অভিনয়ের মাধ্যমে এত বিশদভাবে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে অ্যারিস্টটলের অনুকরণতত্ত্বের রূপকার হিসেবে তাঁর চেয়ে সার্থক প্রয়োগবিদ্‌ মেলা শক্ত।

দ্বিতীয়ত, নাটক যে প্রমোদের সঙ্গে শিক্ষাও দেবে, এ-ধারণাটা ব্রেশট প্রত্যক্ষত শিলারের কাছ থেকে নিয়ে থাকলেও সিডনী (a speaking picture to… teach and delight), হোরেস (utile et dulce) প্রমুখদের পেরিয়ে পিছিয়ে গেলে এর উৎস অ্যারিস্টটলেই পাওয়া যাবে। পোয়েটিক্সের চতুর্থ পরিচ্ছেদে অ্যারিস্টটল বলছেন “অনুকৃতিতে আনন্দ পাওয়া সকলের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি”। তার চাইতেও দরকারি কথা: অনুকৃত বিষয় আমাদের পরিচিত বিষয় হওয়া প্রয়োজন, এবং “অনুকরণ দেখে মানুষে শিক্ষালাভ করে, বিষয়বস্তুর তাৎপর্য সংগ্রহ করে— যেমন, এই লোকটি [আসলে] এই রকম।” এইখানে নিহিত আছে শিল্প সম্বন্ধে অ্যারিস্টটলের একটি গভীর বোধ: শিল্প তার বিষয়বস্তুকে অতিপরিচিতির খোলস থেকে মুক্ত করে ভোক্তার সঙ্গে তার অপরিচায়ন ঘটায়; যার ফলে বিষয়ের স্বরূপকে আমরা নতুনভাবে ও যথার্থভাবে চিনতে পারি। এই কারণে বাস্তবে পীড়াদায়ক বিষয়ও শিল্পে উপস্থাপিত হয়ে আনন্দবিধান করতে পারে। আধুনিককালে আমরা যে শিল্পকে জীবনের ব্যাখ্যান বলে ভাবি, তার উৎস অ্যারিস্টটলের এই কথায় পাওয়া যায়।

ব্রেশটও নাটককে কখনও নিছক ঘটনার উপস্থাপনা বলে ভাবেননি: ঘটনার ব্যাখ্যান বলেই ভেবেছিলেন। সে ব্যাখ্যানের কৌশল হল ‘অপরিচায়ন’ বা ‘দূরায়ণ’-এর পদ্ধতি, এবং সে-ব্যাখ্যার ভিত্তি হল তাঁর নির্বাচিত দর্শন। এ-প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটলের বক্তব্য হল: রচনা (নাটক) ইতিহাসের চাইতে অধিকতর দার্শনিক গুণসম্পন্ন; কারণ ইতিহাসকার বলেন কী ঘটে গিয়েছিল, শুধু তার কথা; আর রচনাকার (নাট্যকার) বলেন যেভাবে তা ঘটে থাকতে পারত, তার কথা। অর্থাৎ ইতিহাসের আপতিক ঘটনাবলিকে নাট্যকার তাঁর নিজস্ব দর্শন বা দৃষ্টি অনুযায়ী কার্যকারণসূত্রে গেঁথে তার অবশ্যম্ভাবিতা দেখান। ব্রেশটের ক্ষেত্রে এই দর্শন হল মার্ক্সীয় দর্শন।

নাটকের গঠনগত ব্যাপারে ব্রেশট অবশ্য অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা করে উঠতে পেরেছিলেন, এ-কথা বলা যায়। ব্রেশট প্রচার করেছিলেন ‘এপিক’ নাট্যের তত্ত্ব (পরে যে-নাম পালটিয়ে তিনি ‘দ্বান্দ্বিক’ নাট্য করে নেন), আর অ্যারিস্টটল এপিক এবং ট্র্যাজেডিকে পৃথক প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন দুটি প্রধান লক্ষণের দ্বারা: প্রথমত, এপিক হল বিবরণ আর নাটক হল ঘটনাপ্রদর্শন; দ্বিতীয়ত এপিকে বহু সংঘটনের সমাহার থাকতে পারে, কিন্তু আদর্শ নাটকে সংঘটন একটাই। এপিক ধরনে নাটক রচনা যে অসম্ভব, এ-কথা কিন্তু অ্যারিস্টটল কোথাও বলেননি। ও-ধরনের রচনা তৎকালে প্রচলিত ছিল বলে তিনি দুটি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। এক: মহাকাব্যতুল্য ঘটনারাশির ভিত্তিতে নাট্যনির্মাণ করা উচিত নয়; আর দুই: মহাকাব্য-রচয়িতাও নিজের জবানিতে কথা বলবেন অত্যন্ত কম। বস্তুত, অ্যারিস্টটলের ধারণায়, চরিত্ররা রচনার যে-অংশে কথা বলছে না কি কাজ করছে না, সে-অংশে মাইমেসিস ঘটছেই না। অতএব সে-সব অংশ শিল্পগুণে দীন। রিপাবলিক বইয়ে প্লেটোর একটা কথাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক: প্রসঙ্গবিশেষে তিনি বলছেন “এ-কথা সব ট্র্যাজেডি সম্বন্ধেই খাটে— তা নাটকের ক্ষেত্রেই হোক আর এপিকের ক্ষেত্রেই হোক।” অর্থাৎ ট্র্যাজেডি-নাট্য যে এপিকধর্মী হতে পারে, এটা নাটকের ইতিহাসে বেশ পুরনো একটা ধারণা। ও-ধরনের নাটক গ্রিক নাট্যচর্চায় ছিল; তবে অ্যারিস্টটল তাদের নাটক হিসেবে উচ্চ স্থান দিতে চাননি। ব্রেশট দিতে চেয়েছেন।

এছাড়া, একজন ব্যক্তির জীবনে নানা ঘটনাই ঘটে থাকতে পারে; কিন্তু সেগুলোকে পরপর জুড়ে হাজির করলেই যে সেটা একটা ‘নাটক’ হবে, এ-কথা অ্যারিস্টটল মানতে চাননি। কেন মানেননি, তার ইঙ্গিত আউয়রবাখের সুবিখ্যাত মাইমেসিস বইটির ‘অডিসিউসের ক্ষতচিহ্ন’ শীর্ষক অধ্যায়টিতে আছে। মহাকাব্যকার এক ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে তার সামান্যতম অনুপুঙ্খের সূত্র ধরে যেভাবে অন্য এক ঘটনায় চলে যান, অন্য চরিত্রাদিকে নিয়ে এসে অন্য একটা গল্প জুড়ে দেন, নাটকে তেমন করা যায় না। বস্তুত ব্রেশটের নাটকও কখনওই এপিকের শৈলীতে ঘটনা থেকে ঘটনান্তরে বিচরণ করে না। আরও বলা যায় যে অ্যারিস্টটলের নাট্যকল্পনার মূলে ছিল সংঘটন; ব্যক্তি কখনওই নয়। তিনি থেকে-থেকেই আমাদের মনে করিয়ে দেন যে tragedy is an imitation, not of men, but of an action। অতএব ব্রেশটের প্রথম গুরু স্টার্নবার্গ শেক্সপিয়রীয় ও উত্তর-শেক্সপিয়রীয় নাট্যধারাকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ফসল বলে (অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিত্বভিত্তিক বলে) যে-সমালোচনা করেছিলেন— এবং যে-সূত্র ব্রেশটও সোৎসাহে গ্রহণ করেছিলেন— সে-সমালোচনার সূত্রপাত স্বয়ং অ্যারিস্টটলই করে গেছেন।

 

কার্যকালে অবশ্য ব্রেশটই নায়ক বা নায়িকার জীবনের নানা বিচ্ছিন্ন ঘটনা পরপর মঞ্চায়িত করে একটা সম্পূর্ণ নাট্যদেহ উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন। তাঁর নাটকে বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণযোগ নয়, the great/small individual-এর উপস্থিতিই হল মূল কথা। অর্থাৎ তত্ত্বগতভাবে যে ‘ব্যক্তি’-কে তিনি নাটকের কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করতে চেয়েছেন, কার্যকালে সেই ‘ব্যক্তি’ই তাঁর নাটকে ঘটনার ধারাবহের সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নাটকের তাৎপর্যের আধার হয়ে পড়েছে। দর্শকমনে এর প্রভাব কী হয়েছে তার আলোচনা ক্রমে করা যাবে; তবে এ-প্রসঙ্গে বলতেই হয় যে অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্সে কোথাও ‘নায়ক’ (hero) শব্দের প্রয়োগ নেই (অনুবাদকের প্রমাদের কথা বাদ দিলে)। তিনি সর্বদাই ক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন: tragedy is an imitation, not of men, but of an action। ব্রেশটের নাট্যকল্পনা কিন্তু সর্বদাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক: মাদার কারেজের বিচারবুদ্ধির কী ত্রুটি ছিল, শেন-তের স্বভাবে দুর্বলতা কোথায়, গ্যালিলিওর চরিত্রে কী কী নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্য ঢোকানো যায়, ইত্যাদি ব্যাপার নিয়েই তিনি সর্বদা ব্যস্ত; যেন একজন ব্যক্তির দোষত্রুটির ওপরে সারা দুনিয়ার ভালমন্দ নির্ভর করছে।

অবশ্য ব্রেশটের নাটক এপিকধর্মী না-হলেও তাতে সংঘটন নেই এ-কথা বলা নিশ্চয় বাতুলতা। কিন্তু অ্যারিস্টটলের তত্ত্বের সঙ্গে তার প্রধান বিরোধ এইখানে যে তার ঘটনাংশগুলির মধ্যে কোনও অনিবার্য কার্যকারণযোগ নেই— যে-কার্যকারণযোগ ঘটনায় থাকাটা অ্যারিস্টটলের মতে আদর্শ ট্র্যাজেডির পক্ষে অত্যাবশ্যক। ব্রেশটীয় নাট্যসংগঠন অ্যারিস্টটলের অপরিচিত ছিল না। তিনি সেগুলির ঘটনাবিন্যাসকে ‘এপিসোডিক’ বা ‘পর্বসার’ বলেছেন, এবং তাঁর মতে সেটি নিকৃষ্ট জাতের ঘটনাবিন্যাস। ব্রেশটের মতে সেটাই উৎকৃষ্ট। অন্যভাবে বলতে গেলে, অ্যারিস্টটলের নাট্যতত্ত্বের আওতায় নানা ধরনের নাটকই পড়ে; তার মধ্যে তাঁর নিজস্ব পক্ষপাত যেগুলোর প্রতি, ব্রেশটের পক্ষপাত সেগুলোর প্রতি নয়। তাতে করে তাঁদের দুজনের নাট্য-নাটক-সংক্রান্ত মূল্যায়ন আলাদা ধরনের— এ-কথা বলা যায়; কিন্তু ব্রেশট অ্যারিস্টটলীয় ছকের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে কোনও মৌলিক নাট্যতত্ত্ব উপস্থিত করেছিলেন, এ-দাবি এই ক্ষেত্রে করা যায় না।

 

কথাটা আরও পরিষ্কার হবে বিবরণ বা narration প্রসঙ্গে। অ্যারিস্টটল নাটকের বিশেষ লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিলেন ঘটনাকে ঘটমান অবস্থায় উপস্থাপিত করার মধ্যে। সেইজন্য বর্ণনা বা বিবরণ ব্যাপারটা তিনি যথাসাধ্য পরিহার করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। ব্রেশট তাঁর নাটকে নানা বিবরণ, মন্তব্য, ও মন্তব্যযুক্ত গান নির্দ্বিধায় ঢুকিয়েছেন নাটকেরই অঙ্গ হিসেবে। ফলে আমরা তাঁকে অ্যারিস্টটল-বিরোধী বলে থাকি। কিন্তু নাটকের চরিত্ররা যে ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ঘটনারই টীকাভাষ্য দিতে পারে, তাঁর এ-তত্ত্বটাও মৌলিক হতে পারত যদি না গ্রিক কোরাস প্রথাগতভাবে ওই একই কাজ করত, এবং যদি না অ্যারিস্টটল তাদের নাট্যপাত্র হিসেবে বিবেচনা করার স্পষ্ট নির্দেশ দিতেন। বস্তুত, যে-কোরাস নাট্যঘটনার মধ্যে জড়িত না থেকে শুধুই নৃত্যগীত করে, তাদের অ্যারিস্টটল নিতান্ত অকেজো কোরাস হিসেবে গণ্য করেছেন— বলেছেন: এ যেন তাদের অন্য কোনও নাটক থেকে তুলে এনে অর্কেস্ট্রায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া, ব্রেশটের এমন কোনও নাটক নেই— ধরা যাক বেকেটের Krapp’s Last Tape-এর মতো— যেখানে কোনও ঘটনাকেই ঘটমান হিসেবে দেখানো হচ্ছে না, সমস্তটাই বিবরণ। তা করতে পারলে তাঁকে সত্যিই অ্যারিস্টটল-পরিত্যাগী বা অ্যারিস্টটল-বিরোধী বলা যেত। কিন্তু শেষ অবধি ঘটনাকে যদি পাত্রপাত্রীর কাজকর্মের মাধ্যমে ঘটমান হিসেবেই দেখানো হয়, তবে তা আর ‘অনারিস্ততলীয়’ হয় কী করে?

এ-সবের থেকে যে-কথাটা স্পষ্ট হয় সেটা এই যে এপিক বা নাটক— এ-দুয়ের ইতিহাস ও চরিত্রগত মিল-অমিল যথার্থ অনুধাবন করবার আগেই ব্রেশট ঝোঁকের মাথায় পিসকাটরের উদ্ভাবিত ‘এপিক থিয়েটার’ নামটাকে অবলম্বন করে বসেছিলেন; এবং সম্ভবত সেই কারণেই পরিণত বয়সে সেটি ত্যাগ করে ‘দ্বান্দ্বিক থিয়েটার’ নামটি গ্রহণ করা সমীচীন বোধ করেন। অর্থাৎ ওই ‘এপিক’ নামটার জন্যই আমাদের যত ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে: অ্যারিস্টটলীয় নাট্য ও ব্রেশটীয় নাট্যের পার্থক্য আসলে রূপগত (formal) নয়; উদ্দেশ্যগত বা পরিণতিগত (teleological)। ব্রেশট তাঁর বিবিধ নাট্যকৌশলের মধ্যে দিয়ে যে-উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, যে-লক্ষ্যে পৌঁছোতে চেয়েছিলেন, তা অ্যারিস্টটলের বিপরীত।

বলা হয় অ্যারিস্টটলের নাট্যচিন্তায় ট্র্যাজেডির telos বা অন্তিম পরিণতি হল কাথার্সিস। কাথার্সিসের পরিবর্তে এস্ট্রেঞ্জমেন্ট/দূরায়ণ-এর তত্ত্ব (Verfremdung, উদ্বাসন বা depayser অর্থাৎ অ-পরিচায়ন বা de-acquaintance;) প্রতিষ্ঠা করে ব্রেশট নতুন নাট্যতত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন, এ-কথাও আমরা ভাবি। কিন্তু নাট্যতত্ত্বের ওপরে তাঁর মূল বক্তৃতায় অ্যারিস্টটল যদি কাথার্সিসের কথা আদৌ বলে থাকেন (বস্তুত সেটা খুবই সন্দেহস্থল) তো সেটা বলেছিলেন ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গে (আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রনীতি’ গ্রন্থে, ট্র্যাজেডির সঙ্গীত-অঙ্গ প্রসঙ্গে)। আর ব্রেশটের নাটক হল নন-ট্র্যাজিক থিয়েটার: মূলত ক্রিটিক্যাল কমেডি। কমেডির নিজস্ব প্রয়োগবিধি বা তত্ত্বের দ্বারা ট্র্যাজেডির তত্ত্বকে খণ্ডন করা কিন্তু কোনও ন্যায়শাস্ত্রেই সিদ্ধ নয়। অ্যারিস্টটলের মতে কমেডির মূল ভাব হল উপহাস, এবং উপহাস্য বিষয় হল এমন সব ভ্রান্তি বা বিকৃতি যা অপরের ক্ষতি করে না। এখন, উপহাস্য বিষয় বা ব্যক্তি থেকে আমরা যে আবেগগত স্তরে দূরস্থ হয়েই থাকি, এ-কথা নিশ্চয় বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।

এস্ট্রেঞ্জমেন্ট (যাকে অনেকে alienation বলেন) যে কমেডিরই বিশিষ্ট কৌশল, এটা ব্রেশট নিজেই লক্ষ করেছিলেন: তাঁর বিখ্যাত V-effekte যে প্রথাগত কমেডির একেবারে খাস পণ্য, এ-কথাও তিনি স্বীকার করেছেন। তাছাড়া মিলানের প্রযোজক স্ট্রেহলারকে তিনি জানিয়েওছিলেন যে নাটকে এপিক মাত্রা আনতে হলে তাকে কমেডির লাইনেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, কারণ কমেডির উৎসেই দূরায়ণ আছে। ব্যর্গসনের বক্তব্যকে খুব সংক্ষিপ্ত করে নিয়ে তিনি যখন বলছেন “Humour is a feeling of distance,” তখন কমেডিতে শেক্সপিয়রের চাইতে বেন জনসনই যে তাঁর পূর্বসূরি, এ-কথা মানতে হয়। অ্যারিস্টফ্যানিস, জনসন, মলিয়ের, প্রমুখের অনুসরণে ব্রেশটও ক্রিটিকাল বা সমালোচনী কমেডিকে সমাজ-সংশোধনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন; আর এঁদের সকলের নাটকেই বরাবর আমরা নাট্যঘটনা বা পাত্রপাত্রীদের দূর থেকে দেখে মূল্যায়ন করেছি। তাঁদের কমেডিচর্চার দ্বারা অ্যারিস্টটলের ট্র্যাজেডিতত্ত্ব খণ্ডিত হল, এ-কথা ভাববার প্রয়োজন কোনওদিন ঘটেনি; কাজেই আজও আমাদের সে-কথা ভাববার দরকার নেই।

এপিকধর্মিতা সম্বন্ধে দুটো কথা রটে, যে-দুটোকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। প্রথম কথা: এপিক দর্শককে ঘটনা ও পাত্রপাত্রীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে সমালোচনী দৃষ্টিতে ওসবের মূল্যায়ন করতে প্ররোচিত করে। এমন কথা তাদের পক্ষেই বলা সম্ভব যাদের দেশের জনমানস মহাকাব্যচর্চার থেকে বহুকাল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার দরুন মহাকাব্য সেদেশে মৃত হয়ে গেছে— যেমন, উত্তর-রেনেসাঁস ইওরোপের শহুরে জনমানস। মহাকাব্য বা পুরাকথা যে-দেশে যতকাল সজীব থেকেছে, সে-দেশে ততকাল তারা প্রথাসিদ্ধ মূল্যবোধের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করেছে। নায়ক ও তার ক্রিয়াকর্মকে তো বটেই, এমনকি প্রতিনায়ককেও— যেমন আমাদের দেশে রাবণ বা দুর্যোধনকে পর্যন্ত— শ্রোতারা কখনও বিশ্লেষণী মনোভাব নিয়ে দেখত বলে জানা যায় না। বরং তাদের নামে মন্দির পর্যন্ত আছে। তরণীসেনকে প্রপাগ্যান্ডা ও বিভ্রান্ত চিন্তার শিকার বলে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত সহজ; কিন্তু আমাদের দেশে তরণীসেনের কাহিনির প্রতি শ্রোতাসাধারণের কী প্রতিক্রিয়া, তা বিবেচনা করলেই আগের কথাটার সত্যতা ধরা পড়বে। তবে আমাদের দেশে জনকৃষ্টির নাট্যপ্রবক্তারা জনগণের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন বলে এদেশে ওই অদ্ভুত পশ্চিমা দাবিটা সর্বসত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। নইলে, সুপঠিত বা সু-গীত মহাকাব্য বরাবরই শ্রোতাকে আবেগে আপ্লুত করেছে। কাজেই genre হিসেবে এপিক দূরায়ণ ঘটায় না। বরং জর্জ টমসনের Maxism and Poetry বইয়ে দেখি, জীবন্ত এপিকের বর্ণনাত্মক অংশগুলোই আবৃত্তিকালে (বা গাইবার সময়ে) দর্শকসাধারণকে জড়িয়ে ফেলে বেশি— তারাও গানে যোগ দিয়ে বসে।

কিন্তু এই আবেগপ্রসঙ্গেই আসে ট্র্যাজেডির করুণা ও ত্রাসের প্রসঙ্গ, এবং আমাদের মানতেই হয় যে নাটক আমাদের মধ্যে কিছু আবেগ জাগিয়ে তুলবে, এটা অ্যারিস্টটলের প্রত্যাশা বা দাবি ছিল। কমেডির ওপরে তাঁর আলোচনাটা পাওয়া যায় না বটে, কিন্তু ট্র্যাজেডিতে যদি করুণা ও ত্রাস থাকে তবে কমেডিতে নিশ্চয় তার সমান্তর কোনও কমিক আবেগ থাকবে, এটা অত্যন্ত সঙ্গত একটা অনুমান। এইখানে ব্রেশট অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা করেছিলেন বলা যায়। আবেগ দর্শককে নাট্যঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে, যার ফলে তার বিশ্লেষণী বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। এতে ব্রেশটের আপত্তি ছিল। তিনি দর্শককে নাট্যঘটনা থেকে আবেগগতভাবে দূরে রাখতে চেয়েছেন, কারণ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিকভাবে (অর্থাৎ সমাজের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের নানা সূত্র সম্বন্ধে) সচেতন করা। এটাই তাঁর মার্ক্সীয় দর্শন হিসেবে কিছু আগে উল্লেখিত হয়েছে। এইখানে আবেগ এসে পড়লে দর্শকের বুদ্ধিভ্রংশ ঘটে। অতএব সেই উদ্দেশ্যে তিনি পাত্রপাত্রীর সঙ্গে দর্শকের empathy বা সমানুভূতির সূত্রটা বারবার ছিন্ন করে দিয়ে নাট্যঘটনাকে দর্শকের থেকে দূরায়িত করে দিতেন। এই তাঁর বিচ্ছিন্নতা ও দূরায়ণের তত্ত্ব ও প্রয়োগ। আর এর প্রয়োজন হয়েছিল এইজন্য যে তাঁর নাট্যকল্পনায় সংঘটন নয়, ব্যক্তিই ছিল মূল। সেখানে দ্বিতীয় স্থানে আছে সংঘটন, যার দূরায়ণের জন্য তিনি আদ্যোপান্ত ‘অনুকরণ’-এর ওপর জোর দিয়েছেন, ঘটনা ‘অতীতত্ব’ ও তার স্থানকালগত দূরত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তার ইতিহাসগত চরিত্রকে দর্শকের প্রত্যক্ষগোচর করেছেন (সন-তারিখ-স্থান-নির্দেশক পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, খবরের কাগজ, ইত্যাদির বহুল প্রয়োগে); নাটকের ঘটনাসূত্র ছিন্ন করে দিয়ে ভাষ্যকারকে এনেছেন, বা গানের মাধ্যমে কাহিনির কিছু অংশ বিবৃত করেছেন; চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রেও, অভিনেতারা যে বাইরে থেকে চরিত্রেরর আচরণ অনুকরণ করে দেখাচ্ছেন— এই ব্যাপারটায় জোর দিয়েছেন। এসবে তাঁর মৌলিকত্ব কোথায় বা কতটা, তা পরবর্তী প্রসঙ্গে বোঝা যাবে।

নাটকের এপিকধর্মিতা বিষয়ে দ্বিতীয় রটনা এই যে অ্যারিস্টটলীয় নাটকের পূর্বোক্ত আবেগগত ত্রুটিটা এপিক থিয়েটার সংশোধন করেছে। অ্যারিস্টটলীয় নাটক দর্শককে ঘটনা ও পাত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে; এপিক থিয়েটার সেটা ঘটতে দেয় না। ঘটনা এই যে অ্যারিস্টটল কিন্তু কোথাও একথা বলেননি যে ট্র্যাজেডি (বা কমেডিও) নাট্যঘটনায় দর্শককে জড়িয়ে ফেলবে। তিনি বলেছেন যে মানুষের অন্যায্য দুর্ভোগ আমাদের করুণা (eleos) উদ্রেক করে (যেমন মাদার কারেজ নাটকের কাত্রিনের প্রতি আমাদের হয়) এবং আমাদের তুল্য লোকের তেমন দুর্ভোগ হলে তা ত্রাসের (phobos) রূপ নেয়। এই দুর্ভোগ অবশ্য পাত্রপাত্রীর হামার্তিয়া বা বিচারবুদ্ধির ত্রুটির কারণে ঘটে (যেমন মাদার কারেজের দুর্ভোগ তার নিজের বিচারবুদ্ধির ত্রুটিতে ঘটে)।

বস্তুত, দর্শকরা নাট্যঘটনায় আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়বে, এ-কথা অ্যারিস্টটলের পক্ষে বলাই সম্ভব ছিল না, কারণ উপস্থাপনাগত প্রেক্ষিতে গ্রিক নাটকমাত্রই ছিল estranged theatre বা দূরায়িত নাট্য। অ্যারিস্টটল ছিলেন নাটকের একেবারে আদিযুগের লোক। তিনি একরকম বৈ দুরকমের নাট্য-উপস্থাপনা দেখেননি। তাঁর দেখা সেই একমাত্র নাট্যের বৈশিষ্ট্য ছিল এইরকম যে সেগুলো প্রায় সবই ছিল পৌরাণিক ঘটনার উপস্থাপনা, যার কালগত দূরত্ব সম্বন্ধে দর্শকরা এত বেশি সচেতন থাকত যে ওগুলো যে সত্যিসত্যিই ঘটছে না, মুখোশ পরে ‘করে দেখানো’ হচ্ছে মাত্র— এ-কথা তাদের বিশেষ করে মনে করিয়ে দেওয়ার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। দ্বিতীয়ত কোরাসের বাধ্যতামূলক উপস্থিতি, পৌনঃপুনিক নৃত্যগীত, ইতিহাসকথন, ঘটনার ওপরে ভাষ্য ও চরিত্রদের পরামর্শদান, পাত্রের কাজকর্মের সমালোচনা, ইত্যাদির মাধ্যমে ঘটনাসূত্র সেখানে ক্রমাগতই ছিন্ন হয়ে যেত এবং দর্শকরা তার ফলে নাট্যঘটনা থেকে দূরস্থ হয়ে গিয়ে আবেগচ্যুত হয়েই পড়ত। তৃতীয়ত, এই ভাষ্যকার কোরাসরাই থাকত দর্শকদের কাছে; অভিনেতারা বরং দর্শকদের থেকে বহুদূরে, মুখোশ পরে, দীর্ঘায়িত সুরে, নাচের তুল্য ভঙ্গিমাসহকারে, আড়ষ্ট অন্বয়যুক্ত পদ্যছন্দে লেখা সংলাপ আবৃত্তি করত— প্রায় সুরেলা ঘোষণার মতো (কারণ দর্শকের সংখ্যা হত পনেরো থেকে কুড়ি হাজার)। কখনও বা তারা গানও গাইত। আর ক্রমাগতই তারা মুখোশ পাল্টে পাল্টে বিভিন্ন চরিত্রে আবির্ভূত হত। গ্রিক অভিনয়রীতি সম্বন্ধে যেটুকু জানা যায়, তাতে বোঝা যায় যে তার সবটাই ছিল ‘করে দেখানো’— চরিত্র ‘হয়ে ওঠা’ নয়। উপস্থাপনার দিক দিয়ে অ্যারিস্টটল আর ব্রেশটের মডেল কতটুকু আলাদা ছিল, তা এর থেকে বোঝা যাবে।

কিন্তু এগুলো গ্রিক নাটকের স্বাভাবিক ও অনিবার্য শর্ত ছিল বলে অ্যারিস্টটল এগুলোর কোনও উল্লেখ করেননি। পক্ষান্তরে ব্রেশট সচেতনভাবে এ-ধরনের কথা কিছু বলেছেন; তাই আমরা তাঁকে মৌলিক তথা ‘অনারিস্ততলীয় দূরায়ণের স্রষ্টা’ বলে ভাবি। আসলে গ্রিক নাট্য ছিল শহরে উপস্থাপিত এক ধরনের লোকনাট্য; আর লোকনাট্যে অল্পবিস্তর দূরায়ণ সব দেশে সব কালেই আছে। ব্রেশট আবার প্রাচ্য নাট্য-ঐতিহ্য থেকে তাঁর নানা নাটকের বিষয়, আঙ্গিক, ইত্যাদিও ধার করেছিলেন। সেই সুবাদেও দূরায়ণের একটা ধাঁচ তাঁর নাটকে এসে গিয়েছিল। তবে বুর্জোয়া থিয়েটারে, অর্থাৎ প্রসিনিয়মে, ওসবের প্রয়োগ অবশ্যই তাঁর নিজস্ব অবদান। এ-প্রসঙ্গে তিনি কিন্তু এ-কথাও বলেছেন যে প্রাচ্য দূরায়ণপদ্ধতিগুলো সরাসরি ইওরোপীয় মঞ্চে আনা ঠিক হবে না; কারণ ওগুলো সেখানে ইওরোপীয় নাট্যের সম্মোহনী কৌশলগুলোর সমস্তরেই কাজ করবে। কেন এমনটা ঘটবে, সেটা বোঝা যায় ইওরোপীয় প্রসিনিয়ম মঞ্চের ব্যপারে তাঁর মনোভাব অনুধাবন করলে।

 

তত্ত্বে ও প্রয়োগে ব্রেশটীয় নাট্যের যে-সব মূল সূত্র অ্যারিস্টটলেও উপস্থিত, সেগুলোর সংখ্যা দেখা গেল নিতান্ত কম নয়। তবে ব্রেশট যেটাকে অ্যারিস্টটলীয় নাট্য বলে ভুল করেছিলেন, সেটা হল তৎকালীন illusionistic বা ভ্রান্তিভিত্তিক সম্মোহনী প্রসিনিয়ম নাট্যচর্চা। এর দর্শককুল সম্বন্ধে ব্রেশট বলেছেন:

এরা পরস্পরকে নজর পর্যন্ত করে না, এদের ভাবগতিক একেবারে ঘুমন্ত মানুষের মতন; কেবল দুঃস্বপ্নের ঘোরে লোকে যেরকম করে, এরা তেমনই পিঠ এলিয়ে, কিন্তু অস্থির হয়ে স্বপ্ন দেখে। এদের চোখ খোলা, কিন্তু এরা দেখে না— শুধু চেয়ে থাকে— ঠিক যেমন এরা সোজাসুজি শোনে না, বরং আড়ি পাতে বলা যায়।

কথাগুলো শোনামাত্র আমাদের অন্তরাত্মা সায় দিয়ে ওঠে। প্রসিনিয়মের দর্শক সম্বন্ধে এর চাইতে ধ্রুবতর উক্তি বোধহয় আর কেউ করেননি। কিন্তু এর সঙ্গে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্নও এসে জোটে: এই যে বর্ণিত পরিস্থিতি, এ তো নাটকের লিখনগত কিংবা নাট্যের প্রযোজনাগত বৈশিষ্ট্য নয়— এ তো বুর্জোয়া প্রসিনিয়মের উদ্ভবগত ও গঠনগত (বা স্থাপত্যগত) পরিস্থিতি— যে থিয়েটার উদ্ভূতই হয়েছিল দর্শককুলকে আরামে মুড়ে রেখে নিষ্ক্রিয়ভাবে প্রমোদ উপভোগ করার সুবিধে দেওয়ার জন্য। সেই থিয়েটারের কল্যাণেই উদ্ভূত হয়েছিল এই বুর্জোয়া নাট্যধারা। রাজনৈতিক জীবনে বুর্জোয়াশ্রেণি যেমন শ্রেণিসংগ্রাম থেকে সতর্ক দূরত্বে বেড়ায় পা ঝুলিয়ে বসে লক্ষ করে সংগ্রাম কোনদিকে গড়ায়, ঠিক সেই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটে তাদের থিয়েটারে: কারণ থিয়েটার আমাদের জীবনবোধেরই প্রতিফলন। নাট্যসংঘাত ও নাট্যসঙ্কট থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে তারা লক্ষ রাখে পরিণতির দিকে। এমনকি নিজের উপস্থিতির কোনও সাক্ষী পর্যন্ত রাখতে চায় না বলে তারা পরস্পরের মুখ দেখার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার করে রাখে; আর টুঁ শব্দটিও করে না। এই ধরনের alienation নিশ্চয় ব্রেশটের কাম্য ছিল না। তিনি নিজেই বলেছেন যে যে-থিয়েটার দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়, সে-থিয়েটার বাতুলতা মাত্র।

এইখানে প্রশ্ন জাগে যে তাহলে তাঁর মতো বিপ্লবী নাট্যবোদ্ধা তথা নাট্যযোদ্ধা সারাজীবন ওই প্রসিনিয়ম থিয়েটারকেই আঁকড়ে পড়ে রইলেন কেন? এমনকি তাঁর স্বদেশীয় স্বদলীয় জার্মান সরকার যখন তাঁকে থিয়েটার গড়ে দিলেন, তখনও তিনি কেন সেই বুর্জোয়া প্রসিনিয়মকেই বেছে নিলেন?

এই একটা ব্যাপারেই মনে হয় যে তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর নাট্যচিন্তা যতই দুহাত-ফেরতা হোক না কেন, নাট্যব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ। ধুরন্ধরও বলা চলে। আদর্শ নাট্যকর্মে সিদ্ধি যে-পথে আসতে পারে, সেটা যে নাট্যদুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ নয়, একথা তিনি নিশ্চয় বুঝেছিলেন। আমাদের দেশে যাঁরা নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে প্রসিনিয়মের ভেতরে এবং বাইরে The Caucasian Chalk Circle নাটকটি দেখেছেন, তাঁরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে মুক্ত অঙ্গনের উপস্থাপনায় দর্শকের বিচারবুদ্ধি থাকে ঢের বেশি সজাগ, কারণ তারা পরস্পরকে দেখতে পায় এবং প্রাত্যহিক বাস্তবের প্রেক্ষাপটে নাটককে দেখে বলে নাট্যঘটনার সামাজিক/রাজনৈতিক তাৎপর্যের ব্যাপারেও তারা ঢের বেশি সচেতন থাকে; আর নাট্যঘটনাও তার ভ্রান্তিসর্বস্ব অভিঘাত বা illusionistic charge হারিয়ে হয়ে ওঠে মন্তব্যের জন্য উপস্থাপিত এক ঘটনার অনুকরণ। সেখানে দৈনন্দিন বাস্তবের উপস্থিতি দর্শককে পাত্রপাত্রী বা নাট্যঘটনা সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়।

এই সজাগ ভাবটা আমাদের ভালই লাগুক বা অভ্যাসের কল্যাণে খারাপই লাগুক, এটা যে থাকে, সেটা অবিসংবাদিত সত্য। পৃথিবীর বিভিন্ন নাটক ও নাট্যধারার সঙ্গে পরিচিত ব্রেশটের এই ব্যাপারটা নিশ্চয় অজানা ছিল না। আর সেটা মানলে আমাদের হাতে মাত্র দুটো পরিবর্ত পড়ে থাকে। এক: তিনি বুর্জোয়া দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আজীবন বুর্জোয়া থিয়েটারকে অবলম্বন করে ছিলেন; নইলে দুই: তাঁর নাট্যবোধ এতই দুর্বল ছিল যে পূর্বোদ্ধৃত মন্তব্য নিজে করেও বুঝতে পারেননি যে প্রসিনিয়ম থিয়েটারটাই দর্শককে নিষ্ক্রিয় করে রাখছে; দর্শককে জাগাতে হলে প্রসিনিয়মের বাইরে বেরোনো ছাড়া উপায় নেই। দ্বিতীয় পরিস্থিতিটা অবশ্য অসম্ভব বোধ হয়; কিন্তু ও-দুটোর যেটাই ঠিক হোক না কেন, সেটাই নির্দেশ করে দেয় যে কেন ব্রেশট আজীবন কি তত্ত্বে, কি প্রয়োগে, প্রতিষ্ঠিত ধ্যানধারণা ও চর্চাগুলো নিয়ে শুধু জোড়াতালির কাজ করে গেলেন, আর কেনই বা তাঁর নাট্যতত্ত্বের মৌলিকত্ব প্রতিপাদন করতে গেলে অনিবার্যভাবে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের দোহাই পাড়তে হয়।

 

রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা বাদ দিলে, ব্রেশটের নাটকের যে-বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা দেখতে পাই— যেমন নাট্যঘটনাকে ‘অতীতায়িত’ বা historicize করা, ঘটনার সামাজিক/রাজনৈতিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে তোলা, সমাজের কোন্‌ অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের ফলে নাটকের ঘটনাগুলো ঘটছে, অথবা পাত্রপাত্রীদের শ্রেণিচরিত্রই যে তাদের বিশেষ বিশেষ কাজে প্রণোদিত করছে, ইত্যাদি ব্যাপার প্রকট করা— এগুলো ব্রেশটের চাইতে ঢের সার্থকভাবে (অর্থাৎ শিক্ষা ও বিনোদনের সার্থকতর সমন্বয়ে) নাটকে দেখিয়েছিলেন জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর Saint Joan নাটকে ১৯২৩ সালেই। সে-নাটকের শিক্ষা উপভোগ করতে দর্শকদের অবশ্য কোনও বিশেষ রাজনৈতিক ধর্মে দীক্ষার প্রয়োজন হয়নি বলে তার আবেদন এখনও ব্রেশটের তুলনায় অনেক সর্বজনীন হয়ে আছে। ব্রেশট যখন বার্লিনে এসে Deutsches Theatre-এ ম্যাক্স রাইনহার্ডের সহকারী dramaturg হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন রাইনহার্ড ওই থিয়েটারেই সেন্ট জোন-এর মহলা শুরু করেন। তার মঞ্চায়ন হয় ১৫ অক্টোবর ১৯২৪। নাটকের অন্তর্নিহিত দূরায়ণ ও থিয়েটারধর্মিতা স্পষ্ট করার জন্য (অর্থাৎ নাটকের ঘটনাটা আসলে ঘটছে না, করে দেখানো হচ্ছে মাত্র এইটে বোঝাতে) রাইনহার্ড তাঁর প্রম্পটারকে স্টেজের মধ্যেই খাতা হাতে বসিয়ে দেন। দৃশ্যের মধ্যেই চরিত্ররা প্রয়োজনমতো নাট্যঘটনা থেকে বিচ্যুত হয়ে তার কাছ থেকে সংলাপ ইত্যাদি জেনে নিতে থাকে। ঠিক ওই সময়ে ওই থিয়েটারে ওই নির্দেশকের অধীনে কর্মলিপ্ত থেকেও ব্রেশট সেই নাটক ও তার নাট্যায়ন সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন না, একথা ভাবা কঠিন (অবহিত না-থাকলে তাঁকে নাটক সম্বন্ধে নিতান্ত নিরুৎসুক এক নাট্যবিদ্‌ বলে ধরতে হয়)। তবু ব্রেশট বাকি জীবনে যেমন শ-এর নাটকটার অন্তর্নিহিত দূরায়ণ, ও ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক গতির ব্যাখ্যার রূপায়ণের সঙ্গে তুলনীয় কোনও নাটক লিখতে পারলেন না— মেলোড্রা্মাটিস্টের মতো এক ভিলেন গ্যালিলিও তৈরি করলেন, তেমনই প্রায়োগিক ক্ষেত্রে রাইনহার্ডের এই অসাধারণ মঞ্চায়নগত দূরায়ণও চিরকাল তাঁর অধরা রয়ে গেল।

বস্তুত অপরিচায়নের ব্যাপারটাকে ব্রেশট তত্ত্বায়িত করার চেষ্টা করলেও ওর মডেলটা তিনি শ-এর কাছ থেকে পেয়েছিলেন, এ-কথা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। Three Cheers for Shaw নিবন্ধে ব্রেশটের নিজের জবানিতেই দেখি:

[Shaw} knows that we have a horrible way of taking all the characteristics of a particular type and lumping them under a single head. We picture a usurer as cowardly, furtive and brutal. Not for a moment do we think of allowing him to be in any way courageous. Or wistful, or tender-hearted. Shaw does.

ব্রেশটীয় দূরায়ণের দার্শনিক ভিত্তি হল বিশেষ এক রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ইত্যাদি নানা প্রেক্ষিতে দর্শকের উপস্থিত অবস্থান কোথায়, সে-ব্যাপারে তাকে অবহিত করা এবং সঠিক পন্থা গ্রহণে বোধিত করা। অবশ্য বক্তৃতা বা প্রবন্ধের মাধ্যমে কেন যে ওই চেতনা সঞ্চারিত করা যাবে না, সে-ব্যাপারে ব্রেশট বিশেষ স্পষ্ট নন। উপরন্তু শিল্প সেই চেতনায় কোন্‌ বিশেষ মাত্রা যুক্ত করতে পারে, তারও বিশ্লেষণ তিনি করেননি। অর্থাৎ মাদার কারেজ নাটকে তাঁর যা বক্তব্য, সেটা দর্শকের সচেতন বিশ্লেষণী মনের কাছে পৌঁছে দিতে হলে বক্তৃতার বদলে নাটকই বা কেন করতে হবে, সে-ব্যাপারে ব্রেশট খুব একটা স্পষ্ট নন। ‘A Street Scene’ রচনায় তিনি মডেল হিসেবে যে-ঘটনাটার উদাহরণ দিয়েছেন, সেটা আমরা ঘটনার পরের দিনের সংবাদপত্রে পড়ে নিলে কি কিছু খোয়াতুম? কী খোয়াতুম?

অপরপক্ষে, রাজনৈতিক চেতনা সঞ্চারিত করতে না-পারলে শিল্পরূপ হিসেবে নাটকে কী কী ঘাটতি পড়ে, তার আলোচনাও তাঁর রচনায় নেই। পাশাপাশি, যেসব শিল্পরূপে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না— যেমন তবলা লহরা কি আলপনা— সেগুলো যে শিল্পরূপ নয়, এমন কথাও তিনি বলছেন না। অর্থাৎ একটা তত্ত্ব প্রতিপাদন করতে হলে যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণপদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়, তা মোটের ওপর পরিহার করেই ব্রেশট নাট্যতাত্ত্বিক হয়ে আছেন। তবু, পিসকাটরের কাছ থেকে ধার করা এপিক তথা রাজনৈতিক থিয়েটারের এই ধারণাটার গুরুত্ব আমাদের কাছে প্রচুর এই কারণে যে একে অবলম্বন করে ব্রেশট বহু শক্তিশালী নাটক সৃষ্টি করেছেন।

আমাদের দেশে ব্রেশটের সবচেয়ে বেশি পরিচিত তিনটে নাটকের রাজনৈতিক বক্তব্য মোটা কথায় আমরা এইভাবে বলতে পারি:

১) পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হল একটা সংগঠিত ও আইনসিদ্ধ অপরাধব্যবস্থা (The Threepenny Opera)
২) যুদ্ধকে খাটিয়ে বেঁচো না; সে তোমাকেই ধ্বংস করে দেবে (Mother Courage and Her Children)
৩) সামাজিক দায় এড়িয়ে যে-লোক বিজ্ঞানচর্চা করে সে বিশ্বাসঘাতক (Life of Galileo)

এই তিনটে প্রসঙ্গই আজও খুব জীবন্ত প্রসঙ্গ। এদের প্রাসঙ্গিকতা এবং সত্যতা সব দর্শকই স্বীকার করেন, এবং এ-নাটকগুলো সারা বিশ্বে বরাবরই খুব জনপ্রিয়। কিন্তু মজার কথা এই যে দর্শকমহলে এ-নাটকগুলোর তারিফ যা ঘটে, তা সবই ‘ভুল’ কারণে। থ্রিপেনি অপেরা বেশ মজার হুল্লোড়ের কল্পকথা হিসেবে সমাদর পায়। মাদার কারেজের মধ্যে সবাই দেখে ট্র্যাজিক পরিণতির শিকার এক অনম্য নায়িকাকে; আর গ্যালিলিও এখনও রয়ে গেছেন এক মহান বিজ্ঞাননায়ক, যিনি বুদ্ধির জোরে পশুশক্তিকে হারিয়ে তাঁর বিজ্ঞানসাধনার ফসল তুলে দিয়ে গেছেন উত্তরপ্রজন্মের হাতে। দর্শকদের এই ‘ভুল’ প্রতিক্রিয়া কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের এই ‘অশিক্ষিত’ বা ‘অদীক্ষিত’ দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। এ-প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী। কাত্রিনের মৃত্যুতে ট্র্যাজিক আবেগে ভোগেননি বা গ্রুশার সঙ্গে আবেগগত একাত্মতা অনুভব করেননি, এমন দর্শক নাট্যজগতে নেই বলাই উচিত।

আমাদের দেশে স্বঘোষিত ব্রেশট-অভিভাবকেরা কেবলই এদেশি ব্রেশট-প্রযোজনার এই নিন্দে করে থাকেন যে সেগুলো নাকি ব্রেশটের দূরায়ণ-তত্ত্বের যথার্থ রূপায়ণে ব্যর্থ হচ্ছে। সে-ব্যর্থতার দায় কিন্তু যাঁরা নাটক নিয়ে হাতে-কলমে চর্চা করেন, সেই সব সমালোচিত নাট্যনির্দেশকদের নয়। ও-ব্যর্থতা ব্রেশটের তত্ত্বের মধ্যেই নিহিত। ব্রেশটের অনুভূতিবিহীন দূরায়ণের নাট্যতত্ত্ব নাট্যপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কোথাও কোনওদিন কার্যকর হয়নি। ফলে ব্রেশট নাটকে সমানুভূতি বা empathy-র মূল্যও স্বীকার করতে বাধ্য হন। Messingkauf Dialogues-এ তিনি আবেগের মূল্য তো স্বীকার করে নেনই, উপরন্তু উনিশশো আটত্রিশ সালের ডায়ারিতে ‘a legitimate kind of empathy’-র প্রয়োজনীয়তার কথাও লিখে রাখেন। Messingkauf থেকে দু-লাইন উদ্ধৃতি দিই:

ACTOR: Does the suppression of empathy amount to suppressing every emotional element?
PHILOSOPHER: No, no. The emotional attentiveness of the audience and the actors should not be hindered, and neither should the portrayal of emotions or the actor’s use of emotions. Only one of the many possible sources of emotions needs to be left unused, or at least treated as a subsidiary source, and that is empathy.

[অভিনেতা: সমানুভূতিকে চাপা দেওয়া মানে কি তাহলে যাবতীয় আবেগগত উপাদানই বাদ দিতে হবে?
দার্শনিক: না, না। দর্শকের এবং অভিনেতাদের আবেগগত ধ্যানে (emotional attentiveness) ব্যাঘাত ঘটানো চলবে না, আর আবেগের চিত্রণ আর অভিনেতার আবেগ-ব্যবহারও নয়। আবেগের অজস্র সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে একটাকেই মাত্র অব্যবহৃত রাখা দরকার— নিদেনপক্ষে দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎস হিসেবে গণ্য করা দরকার— এবং সেটি হল সমানুভূতি।]

চরিত্রে আবেগ চিত্রিত হবে, অভিনেতা আবেগভোগ করবেন, এবং দর্শকেরও আবেগের প্রতি ধ্যান থাকবে; কিন্তু সমানুভূতি থেকে তা উৎপন্ন হবে না— এই কথা ব্রেশট বলছেন। প্রশ্ন হল: তাহলে কোথা থেকে এত আবেগ উৎপন্ন হবে, আর এত পর্যায়ে আবেগ বজায় রাখার কারণটাই বা কী?

এমন empathy বা সমানুভূতি যে এড়ানো সম্ভব হয় না, তার কারণ এই যে দর্শকমন একটা বিশেষ প্রত্যাশা নিয়ে নাটকের কাছে আসে। মৌলিক স্তরে সে-প্রত্যাশ বা চাহিদা সব শিল্পের ক্ষেত্রেই এক ও সত্যি: দর্শক (বা ভোক্তা) শিল্পবস্তুর মাধ্যমে শিল্পবিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চায়। সঙ্গীতে যতই তান-গিটকিরি আড়ি-কুআড়ির বুদ্ধিগ্রাহ্য প্যাঁচকষাকষি থাকুক, শ্রোতাকে আবেগানুভবের স্তরে সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে না-পারলে তা যেমন ব্যর্থ হয়, তেমনি যাবতীয় শিল্পেই নিছক বুদ্ধিগ্রাহ্য বিশ্লেষণের অতীত কোনও একটা স্তরে আমাদের মনকে টেনে ধরতে না-পারলে শিল্পসৃষ্টি ব্যর্থ। এই কারণেই শিল্প মানুষে-মানুষে সংযোগস্থাপনের একটা চিরকালীন ও সর্বজনস্বীকৃত পন্থা— বিযুক্তিকরণ বা দূরায়ণের নয়। শিল্পাস্বাদনের এই মূল জায়গাটায় ঝাঁকুনি দিলে দর্শকমন তক্ষুনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে এই নতুনত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে আবার আবেগগত স্তরেই শিল্পবিষয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নেয়: অর্থাৎ কার্যকালে ব্রেশটীয় নাট্যদর্শনকে নিছক নাট্যকায়দা হিসেবে গণ্য করে, এবং সেই কায়দাকে অতিক্রম করে নাট্যঘটনা ও নাট্যপাত্রদের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নেয়— যেমন আমরা মঞ্চে tormentor-গুলোর (‘উইংস্‌) উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে নাটক দেখি, সেইরকম। সেই কারণেই প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ব্রেশটের থিয়েটার-ফিলসফি শুধুমাত্র থিয়েটার-টেকনিকে পর্যবসিত হয়; তার বেশি এগোয় না।

তাই বলতে হয়, ওসব ‘অভিভাবক’-রা যখন পূর্বোক্ত সমালোচনা করেন, তখন তাঁরা খুব সততার সঙ্গেই ও-সমালোচনা করেন; কারণ তাঁদের ক্ষেত্রেও ওই একই মানসিক বিক্রিয়া অনিবার্যভাবে ঘটে। মাদার কারেজের অন্তিম নিঃসঙ্গ গাড়ি টানার মধ্যে যে ট্র্যাজিক দৃঢ়তা আছে, সেটা তার বিবেচনার অভাবের চাইতে, তার লোভ ও স্বার্থপরতার চাইতে, তাঁদের বিচলিত করে বেশি। তার দায় নাট্যের নিজস্ব চরিত্রের— নাট্যনির্দেশকের নয়। শেক্সপিয়রের তৃতীয় রিচার্ড মঞ্চে যখন ‘A horse! A horse! My Kingdom for a horse!’ বলে নিঃসহায় বীরত্ব দেখিয়ে মরে, তখন তাকে পাপিষ্ঠ জেনেও আমাদের তার সঙ্গে যেমন empathy ঘটে, সেইরকম। ট্র্যাজিক নায়কের এই মহত্ব কমাবার জন্য ব্রেশট গ্যালিলিওর জীবন বারবার পাল্টেছেন: প্রত্যেক পরিবর্তনে গ্যালিলিওকে হীন থেকে হীনতররূপে এঁকে, মিথ্যা তথ্য জুড়ে তাঁর জীবনী বিকৃত করে, গ্যালিলিওর সুখাসক্তি, ভীরুতা, ভণ্ডামি, ইত্যাদি চারিত্রিকতাগুলোকে উগ্রতর করে তুলে। আর প্রত্যেকবারই দর্শক তাঁর ঈপ্সিত গ্যালিলিওকে দেখতে অস্বীকার করে এমন এক নায়ককে ও বীরকে দেখেছে যার সঙ্গে— তার নানা মানবসুলভ ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও— একাত্ম হওয়া যায়।

 

দর্শকের প্রতিক্রিয়াসংক্রান্ত এই ব্যাপারটা যে ব্রেশট অনুভব করেছিলেন, তা বেশ বোঝা যায় তাঁর ঊনিশশো বাহান্ন সালের এক প্রচারপত্রের একটি মন্তব্য থেকে: Two arts need to be developed; the art of acting and the art of watching. মন্তব্যটা অত্যন্ত গভীর; কারণ এটি দেখিয়ে দেয় যে ব্রেশট নাট্যকর্ম করছিলেন এমন শিল্পীদের ভাবনায় রেখে, এবং এমন দর্শকদের জন্য, যারা তখনও অনাগত। যে-শিল্পী এবং যে-দর্শক তখনও অনুপস্থিত, তাদের জন্য কোন্‌ বাস্তবের কোন্‌ রাজনৈতিক ব্যাখ্যান তিনি দিচ্ছিলেন? সমস্ত ব্যাপারটাই মহাকাশে ব্যায়াম করার মতন পণ্ডশ্রম নয় কি? যতদিনে সেই অনাগত শিল্পী ও অনাগত দর্শকরা আসবেন, ততদিনে সমাজবাস্তব ও রাজনীতি, দুটোর চেহারাই তো পাল্টে যাবে— কারণ তেমন সামাজিক পরিবর্তন ভিন্ন তো শিল্পী ও দর্শকের মানসিকতার পরিবর্তন আসা সম্ভব নয়! সেক্ষেত্রে, এবং ততদিন পর্যন্ত, আজকের শিল্পী ও আজকের দর্শকের পক্ষে আজকের মতন করেই ব্রেশটের নাটক উপস্থাপন ও উপভোগ করা ছাড়া উপায় নেই।

ওই development প্রসঙ্গে আরেকটু ভাবলে অবশ্য আরেকটা চিন্তা মনে আসে। নাটক নামে চর্চাটা তো তিনজন agent-এর ওপর নির্ভরশীল: নাট্যকার, অভিনেতা, আর দর্শক। ব্রেশট কিন্তু মূলত যা বলছেন তা হল: আমি নাট্যকার, অতএব আমার খাতিরে অভিনয়শিল্প গড়তে হবে, মায় দর্শকদের পর্যন্ত পাল্টে ফেলতে হবে; কারণ নাটক দেখারও নতুন শিল্প তৈরি করে নিতে হবে, এবং সেই তত্ত্ব অবশ্যই নির্দিষ্ট করে দেবেন ব্রেশট তাঁর নাট্যভাবনা অনুযায়ী। এমন অহঙ্কার দুনিয়ায় আর কজন নাট্যকার দেখিয়েছেন বলা শক্ত; আর কেউই নিজেকে আধুনিক থিয়েটারের আইনস্টাইন বলে দাবি করেছেন বলে জানা যায় না। সম্ভবত এই কারণেই তাঁর “প্রথম গুরু” ফ্রিট্‌ৎস স্টার্নবার্গ একদা তাঁকে উদ্দেশ করে কাগজে পত্র লিখেছিলেন:

It wasn’t Marx who led you to speak of the decline of the drama and to talk of the epic theatre. It was you yourself. For, to put it gently, “epic theatre”— that’s you, Mr Brecht.

[নাটকের অধোগতি আর এপিক থিয়েটারের কথা বলতে যিনি আপনাকে প্রণোদিত করেছেন, সে ব্যক্তি মার্ক্স নন; সে আপনি নিজে। কারণ— খুব মৃদুভাষণে বলি মিঃ ব্রেশট— আপনি নিজেই হলেন গিয়ে “এপিক থিয়েটার”।]

তবে এটুকু জানা যায় যে, যে-দর্শকদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ব্রেশট নাটক করছিলেন বলে দাবি করেছিলেন, অর্থাৎ সেই মেহনতি সর্বহারা শ্রমিককুল (যাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রয়োজন), তারা কোনওদিনই তাঁর Berliner Ensemble-এর নাটকে ভিড় করেনি; তারা ভিড় করেছে অন্যান্য থিয়েটার হলে: গেছে প্রামোদিক আবেগবাহী নাটক দেখতে। আর নাটকে দূরায়ণ-চর্চার প্রভাবে তাঁর দর্শকদেরও কখনওই মনে হয়নি যে “বাঃ! কত কী শিখলুম! এসব কাজে লাগাতে হবে।” তারা সর্বদাই বোধ করেছে “বাঃ! কী চমৎকার শেখাচ্ছে! দেখা যাক কার কাজে লাগে।” অর্থাৎ তাঁর নাটকের বক্তব্যও দূরায়িত হয়ে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

 

প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এই একটা ব্যর্থতা সত্ত্বেও নাট্যকার ব্রেশটের মহত্বের অবিসংবাদিত স্বীকৃতির কারণ কী, তা এক সমালোচক অতি চমৎকার কথায় বলেছেন: মঞ্চের জাদু ধ্বংস করার জন্য তিনি যে-সব কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সেগুলোই তাঁর হাতে জাদু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর চাইতে বড় সার্থকতা বোধহয় কোনও নাট্যপ্রয়োগবিদের হতে পারে না যে, সবাই যেকালে নাটকের ম্যাজিককে বাড়িয়ে ‘ম্যাজিকতর নাটক’ বানাবার চেষ্টায় ছিলেন, তখন তিনি ম্যাজিক বর্জন করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে নাটকের আসল ম্যাজিকটা কোথায়। সেই কারণেই তাত্ত্বিক হিসেবে তিনি বিশেষ মৌলিক বা আদৌ পোক্ত না-হয়েও বিশ শতকের অন্যতম প্রধান নাট্যপুরুষ। তাঁর নাট্যভাষা এমনই অনিবার্যভাবে নাটকীয় যে তা তাঁর বুদ্ধিনির্ভর রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে অতিক্রম করে সহজেই দর্শকচিত্ত আন্দোলিত করে। ব্রেশটের নাটক সুপ্রযোজিত হলে তা আমাদের যেটা দেয়, তা একটা অনবদ্য নাট্য-অভিজ্ঞতা— কোনও রাজনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক উদ্ভাস নয়। দি ককেশিয়ান চক সার্কল-এর পশ্চাৎপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাভব, সমবায়ী ফলচাষ ও ছাগপালনের মধ্যে দ্বন্দ্ব, জমি ব্যবহারে চাষির নৈতিক অধিকার, ইত্যাদি প্রসঙ্গ কবেই অবান্তর হয়ে গেছে; কিন্তু টিকে আছে নাটকটা।

নাটক ও রাজনৈতিক সচেতনতার সম্পর্কের ব্যাপারটা আসলে বহু পুরনো। উৎপল দত্ত দেখিয়েছেন যে শেক্সপিয়রে এর ভূরি উদাহরণ পাওয়া যায়। সফোক্লিসের অয়দিপাউস তুরান্নস নাটকটা গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের ওপর একটা নাট্যায়িত ভাষ্য বললে বিশেষ ভুল হয় না। (এমনকি তাঁর ফিলোক্তেতেস নাটকটাও তৎকালীন রাজনীতিতে প্রভাব না ফেললে ও-নাটক মঞ্চস্থ হবার দু-বছরের মধ্যেই নির্বাসিত সেনাপতি আলকিবিয়াদেসের এথেন্সে পুনর্বাসন ঘটত না, এমন কথাও ভাবা হয়ে থাকে।) Politically incorrect মনোভাব বিম্বিত করত বলেই ইউরিপিডিসের নাটকগুলো সমকালে পুরস্কার পেত না (যদিও প্রগতিপন্থী যুবসমাজের চাপে সেগুলোর উপস্থাপনা ঠেকানোও যেত না), এও আমরা জানি। এ-ব্যাপারে তাঁর মেদেইয়া নাটকের খ্যাতি বিদগ্ধমহলে বিদিত। অ্যারিস্টোফানিসের নাটকগুলো তো— কমেডি বলেই— রাজনৈতিক মন্তব্য, ব্যঙ্গবিদ্রূপ, আক্রমণ, ও দিগ্‌দর্শনে একেবারে কণ্টকিত থাকত। মলিয়েরের কথাও এই প্রসঙ্গে মনে আসে। কাজেই কমেডিকাররা চিরকালই যে যার নিজের যুগের সমাজের বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করেছেন, এবং কেউই তার জন্য দর্শকের সমানুভূতিজাত আবেগের কাছে আবেদন রাখার কোনও প্রয়োজন বোধ করেননি। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের নাটকে, অথবা সমালোচনী-বিশ্লেষণী কমেডিতে, empathy চিরকালই অচল।

সংক্ষেপে, ব্রেশটীয় দূরায়ণতত্ত্ব কোনও নতুন তত্ত্ব নয়— আড়াই হাজার বছরের পুরনো একটা প্রতিষ্ঠিত নাট্যচর্চাকে মৌলিক আবিষ্কার বলে দাবি করা মাত্র। অনুমান হয়, ব্রেশটকে জার্মানিতে নিজস্ব নাট্যশালা দেওয়ার দাম হিসেবে সেকালে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর চাহিদা ছিল তাদেরও একটা নাট্যতত্ত্ব বানিয়ে দিতে হবে— একেবারে আদত মার্ক্সীয় নাট্যতত্ত্ব। ব্রেশট সেই চাহিদার জোগানদার মাত্র ছিলেন; আর কমিউনিস্ট সরকারগুলোরও নাট্য-নাটক সম্বন্ধে কোনও ধারণা ছিল না। ফলে ব্রেশট ‘মৌলিক’ বলে তাদের যা দিয়েছেন, সেইগুলোই তারা প্রচার করে গেছে। কিন্তু তিনি যে অ্যারিস্টটল না-পড়ে এবং কোনওদিন ট্র্যাজেডি লেখার চেষ্টা পর্যন্ত না-করেই অ্যারিস্টটলের ট্র্যাজেডিতত্ত্বকে খণ্ডন করে ফেলেছেন বলে রটালেন, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা এইটে যে আমরা সেই রটনায় নির্বিবাদে বিশ্বাস করে ফেললুম; একবারও যাচাই করে দেখলুম না। আমাদেরও মগজ-ধোলাই হয়ে আছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...